Home প্রিয় জারুলফুল প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১০

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১০

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১০
সাদিয়া সাদু

ঘড়ির কাঁটা ১১ টা পেরিয়ে ২৫ মিনিটে পৌঁছেছে । খান বাড়ির দিনের সমস্ত ব্যস্ততা অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো বাড়িটা নীরব হয়ে পড়েছে। বিশাল অট্টালিকার প্রতিটি কক্ষের দরজা বন্ধ। পরিবারের সবাই নিজ নিজ রুমে বিশ্রাম নিচ্ছে। করিডোরজুড়ে হালকা সাদা আলো জ্বলছে। দেয়ালে টাঙানো ঘড়ির কাঁটা ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছে, আর তার টিকটিক শব্দই যেন এই গভীর নীরবতায় সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

বাইরেও একই রকম শান্ত পরিবেশ। প্রধান ফটকের সামনে দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তারক্ষীরা সতর্ক দৃষ্টিতে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করছে। বাগানের বড় বড় গাছগুলো রাতের বাতাসে আস্তে আস্তে দুলছে। দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। সব মিলিয়ে চারদিকে এক গভীর, নিশ্চুপ পরিবেশ বিরাজ করছে।
ঠিক সেই সময় বাড়িতে প্রবেশ করল দিগন্ত।
তার হাঁটার ভঙ্গি স্বাভাবিক, মুখে গম্ভীরতা। কোনো দিকে না তাকিয়ে ধীর পায়ে সে ভেতরে এগিয়ে গেল। প্রধান হলরুম পেরিয়ে সোজা সিঁড়ির দিকে এগোল। বাড়ির এত বড় নীরব পরিবেশেও তার জুতোর ক্ষীণ শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে , জুতার গটগট আওয়াজ নিস্তব্ধ হলরুমটার দেয়ালের পিঠে বারি খাচ্ছে । সেই আওয়াজ দৃঢ়ে দৃঢ়ে হলরুমে পেরিয়ে দ্বিতীয় তলায় উঠে করিডোর ধরে হাঁটতে লাগল দিগন্ত। একে একে সব কক্ষ পেরিয়ে সে করিডোরের শেষ প্রান্তে এসে থামল। সেখানেই জহুরার রুম। দরজার নিচ দিয়ে হালকা আলো বেরিয়ে আসছে। বোঝাই যাচ্ছে, এত রাত হলেও তিনি এখনও ঘুমাননি।
দিগন্ত কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে হাত তুলে দরজায় তিনবার নক করল ভেতর থেকে জহুরার কণ্ঠ ভেসে এলো,

— “এসো, দরজা খোলা আছে।’
দিগন্ত দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল। জহুরা তখন বিছানায় হেলান দিয়ে বসে ছিলেন। সামনে রাখা টেবিলে কয়েকটি ফাইল আর এক কাপ চা। মনে হচ্ছিল, তিনি দিগন্তের জন্যই অপেক্ষা করছিলেন।
দিগন্ত ভেতরে ঢুকতেই জহুরা তার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “বসো। তোমার সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।’
দিগন্ত কোনো প্রশ্ন না করে সামনের সোফায় গিয়ে বসল। দুজনের মাঝেই কয়েক মুহূর্ত নীরবতা বিরাজ করল। কিছু মূহূর্ত পর নীরবতা ভেঙ্গে জহুরা ধীরে চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রেখে শান্ত গলায় বললেন,
_’কোথায় ছিলে ? থাকো কোথায় তুমি ? অর্ধেক বেল অফিস করে কোথায় যাও ?”
দিগন্ত নির্বাক স্থির দৃষ্টিতে দাদির দিকে তাকিয়ে রইল। কোনো জবাব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলো না ।
জহুরা দিগন্তের অবস্থা বুঝতে পেরে খটমট করলো মনে মনে ,মুখের কোণে একটু গম্ভীরতা টেনে বলল ।
—” তোমার অনুপস্থিতিতেই আমি জিসার সঙ্গে তোমার বিয়ের কথা চূড়ান্ত করেছি।”
কথাটা বলেই তিনি দিগন্তের মুখের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করতে লাগলেন।
কিন্তু দিগন্তের চেহারায় কোনো বিস্ময়, রাগ কিংবা উচ্ছ্বাসের ছাপ ফুটে উঠল না। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে সে শান্ত স্বরে বলল,

— ‘আমার মতামত জানার প্রয়োজন মনে হলো না, দাদি?’
জহুরা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন । মনে মনে অনেক কিছু ভেবেও বসলেন। জহুরা কিছুটা সময় নীরব থেকে। কন্ঠস্বর নামিয়ে একটু অধিকার স্বরুপ বলল ।
— “মনে হয়েছে। কিন্তু আমি এই পরিবারের বড়। অনেক সময় পরিবারের ভালোর জন্য এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যেখানে ব্যক্তিগত মতামতের অপেক্ষা করলে সবকিছু জটিল হয়ে যায়। জিসার পরিবারও সম্মতি দিয়েছে। আমি কথা দিয়ে ফেলেছি। বিয়ে যেহেতু হবে তাহলে আগে হলে মন্দ কি বলো ?’
দিগন্ত ধীরে সোফায় হেলান দিল। তার দৃষ্টি স্থির। ভারী চোঁখের নীরব চাহনি নিক্ষেপ করে , সোফায় এলিয়ে দুই আঙ্গুল এর সাহায্যে মাথার কাছে স্লাইট করল ‌। একই ভাবে বলল ।
— “কথা দিয়ে ফেলেছেন? নাকি আমার ভবিষ্যৎও ঠিক করে ফেলেছেন?”
জহুরা এবার একটু নড়েচড়ে বসল । ভবিষ্যত ঠিক করে ফেলেছে কথাটায় চোয়াল শক্ত হয়ে পড়লো । জহুরা এবার গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,

— ‘দুটোই। এখন আমি শুধু জানতে চাই, এই বিয়ে নিয়ে তোমার আপত্তি আছে কি না।’
দিগন্ত সোফা ছেড়ে সটান দাঁড়িয়ে পড়ে ।
মুখাবয়ব অত্যন্ত স্বাভাবিক ‌ ।
জহুরা গোল গোল চোখে দিগন্তের প্রতিক্রিয়া বোঝায় চেষ্টায় ব্যস্ত ‌ ।
তার দেওয়া তীরটা ঠিক জায়গা মতো লেগেছে কি না সেটাই বোঝার চেষ্টা করছে ।
_’নেই ।’
দিগন্ত গম্ভীর কণ্ঠে কথাটা ছুঁড়ে হনহনিয়ে বেরিয়ে আসে । জহুরা দিগন্তের প্রস্থানে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে , কিছু সময় তাকিয়ে থেকে মুখের কোণে একটা চিলতে হাসির রেখা ঝুলিয়ে রেলিং চেয়ারে বসে পড়ে ।

দিগন্ত দাদির রুম থেকে বের হতেই মায়ের মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠে ।
দীনা বেগম এতোক্ষণ সময় দাঁড়িয়ে দুজনের সকল কথায় শুনেছে । দিগন্ত মাকে দেখে কিছু না বলে সাইট কেটে হাটা ধরে ।
দীনা বেগম দৃঢ় পায়ে ছেলের পথ অনুসরণ করে ‌ ‌। তার রুমে পোঁছে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলে ‌ ।
_’ নিজের জীবন অন্যের মতের উপর ছিড়ি দিচ্ছিস!’
দীনার উচ্চ ঝাঁঝালো কণ্ঠে দিগন্ত ঘাড় ঘুরিয়ে পিছু ফিরে মায়ের শান্ত মুখের দিকে তাকায় কিছু বলতে গিয়েও গিলে ফেলে ।
এগিয়ে এসে মায়ের কাঁধে হাত রেখে বলে ।
_’ তুমি কি কাউকে পছন্দ করে রেখেছ?’
দীনা তাজ্জব বনে গেল ছেলের কথায় । সে অবাক হয়ে বলল।
_’ ও মা লাইফ তোর পছন্দ ও তোর আমি কেনো পছন্দ করে রাখব। তুই কি এই বিয়েটা আসলেই করবি ?’
দিগন্ত দীর্ঘ শ্বাস ফেলে ।

শান্ত চোখে মায়ের সরল মুখের দিকে এক পলক তাকিয়। দীনা ছেলের নির্লিপ্ততা দেখে ফের বলল ।‌
_’ তোর দাদি আমাকে কক্ষন শান্তিতে থাকতে দেয়নি । বিয়ে হয়েছে ৩১ বছর কখনো এই সংসারকে নিজের সংসার বলতে পারিনি এখন যদি তুই এই মেয়েকে বিয়ে করিস ভবিষ্যতে বৃদ্ধা শ্রমেও আমার আশ্রয় হবে না । ‘
কথা বলতে বলতে চোখ দুইটা ছলছল করে উঠল । দিগন্ত মায়ের উপচে পড়া চোঁখের দিকে তাকায় । তার সব কিছু বলে দিতে ইচ্ছে হচ্ছে কিন্তু আসল কালপিট কে না ধরে কিছু বলা যাবে না । দিগন্ত একটা লম্বা শ্বাস ফেলে মায়ের কাঁধে রাখা হাতটা শক্ত করে ধরে বলল ।
_’ যা হচ্ছে হতে দাও । শেষটা এমন হবে তুমি কল্পনাও করতে পারবে না । সকল চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে ঘুমোতে যাও।’
দীন আর দাড়ায় না । ছেলের কথায় কিছুটা আশার আলো দেখতে পেয়ে ধীর পায়ে বেরিয়ে আসে ।

কাল ১০ টা পেরিয়েছে । জারুল নিচে বসে হলরুমটা পরিষ্কার করতে ব্যস্ত। গত দুদিন ছুটিতে ছিলো । দুদিন পর আবারো নিজের কাজে ফিরেছে সে ।
খান বাড়ির হলরুমে তখন সকালবেলার ব্যস্ততা চলছে। কেউ নাশতা শেষ করে নিজের কাজে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, কেউ আবার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে-নিচে যাতায়াত করছে। কাজের লোকেরাও যে যার দায়িত্ব পালন করতে ব্যস্ত।
হলরুমের মাঝখানে মাথা নিচু করে মেঝে মুছছে জারুল। এক হাতে পানিভরা বালতি, অন্য হাতে মগ। মনোযোগ দিয়ে এক কোণা থেকে আরেক কোণা পরিষ্কার করে যাচ্ছে সে। মুখে কোনো ভাব নেই। কারও দিকে তাকানোরও প্রয়োজন বোধ করছে না। নিজের কাজ নিয়েই ব্যস্ত।
ঠিক তখনই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এল জিসা।
আজ তার মুখে অন্যরকম উচ্ছ্বাস। ঠোঁটের কোণে প্রশস্ত হাসি, চোখেমুখে আত্মতৃপ্তির ছাপ স্পষ্ট। ধীর পায়ে হলরুমে এসে দাঁড়াতেই তার দৃষ্টি গিয়ে আটকাল মেঝে পরিষ্কার করতে থাকা জারুলের ওপর।
কয়েক মুহূর্ত নীরবে তাকিয়ে থেকে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল সে। তারপর ধীরে ধীরে জারুলের দিকে এগিয়ে এলো। একটু ঝুঁকে ব্যঙ্গাত্মক স্বরে বলে ।‌

_’ আহারে , চু চু । আশিকের বাড়িতে কাজের লোক হিসেবে কাজ করতে হচ্ছে আহারে । ‘
জারুল হাতের মগটা শব্দ করে ফ্লোরে রেখে নাকের ফাটা ফুলিয়ে তাকায় ।
জিসা তার দিকে তাকিয়ে আবারো আগের ভঙ্গিতে বলে ।
_’চাকরানি থেকে রাজরানী হওয়ার স্বপ্নটা বৃথা গেল আহারে । ‘
জারুল উঠে দাঁড়ায় ।
শান্ত মুখে শান্ত কণ্ঠে বলে ।
_’কু’ত্তার লেজ কখনো সোজা হয় না । এতো মা’র খাস তাও গায়ে লাগে না । ‘
জিসা কথাটা ইগনোর করে বলল ।
_’নোক্সট ফ্রাইডে তোর আশিক দিগন্তের সাথে আমার বিয়ে । ‘
জারুল আগের মতোই নির্বাক। শান্ত মুখশ্রী ।
জিসা তার মুখের ভাবভঙ্গি বদল হতে না দেখে চোয়াল শক্ত করে তাকিয়ে রইল ।
জারুল তার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল ।

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ৯

_’ তোর মতো নর্দমার কীট এর সাথে কথা বলতে চাচ্ছি না। সর । ‘
জিসাকে ধক্কা মেরে হলরুম ত্যাগ করতে করতে বিরবিরায়।
_’ আমি জারুল । দিগন্তের প্রিয় জারুলফুল।
তার চোখের মণি আমি। তার হৃদস্পন্দন আমি । মনের মনিকোঠায় যার স্থান , তুই সেই জায়গা নিবি ! তুই বড়ই নাদান রে জিসা । আরেকটু বড় হ পড়ে সেই সাহস করিস । ‘

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here