প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৫০
জান্নাত নুসরাত
থোকা থোকা মেঘ জমেছে পূর্ব দিগন্তে। সূর্যের প্রকট রশ্মি তখন মাটিতে পড়ছে হেলে।খান বাড়ির উঠোনে ভীর জমিয়েছে সবাই। বিদায় পর্ব গত ঘন্টা যাবত ধরে চললেও, এখনো শেষ হয়নি,এতে সামান্য বিরক্ত পুরুষগণ। ইসরাতকে কারোর কাছ থেকে বিদায় না নিতে দিয়ে, টেনে এনে গাড়ির ভেতর বসানোতে সবার কাছ থেকে বিদায় নেওয়া হয়নি তার। তাই গাড়ি থেকে নামতে নেয়, বিদায় নেওয়ার জন্য, এমন মুহুর্তে জায়িন তার হাতের কব্জি চেপে ধরল শক্ত করে।। গুরু গম্ভীর কন্ঠে শুধাল,”কোথায় যাচ্ছো?
ইসরাত টিস্যু দিয়ে মুখ মুছে নিয়ে বলল,
‘“বিদায় নিতে যাচ্ছি…
কথাটা ফোরাবার পূর্বেই জায়িন আরো শক্ত করে চেপে ধরল ইসরাতের কব্জি। বলল,”প্রয়োজন নেই।
ভ্রু কুঁচকে আসলো মেয়েটার। নাকের পাটা ফুলিয়ে ধমক দিল,”চুপপ.. একদম বেশি বুঝতে মানা করেছি না, তাহলে বেশি বুঝছেন কেন? প্রয়োজন আছে, আপনাকে কে বলেছে প্রয়োজন নেই?
জায়িন গোমড়া মুখে তাকিয়ে রইল ইসরাতের দিকে। প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে মিনমিন করে বলল,”ধমকাচ্ছেন কেন?
“ ধমকাব না তো কী করব, চুমু খাব?
ইসরাত দাঁতে দাঁত পিষে কথাটা শেষ করতেই, জায়িন নিরীহ ভঙ্গিতে গাল এগিয়ে দিল সম্মুখে। গলা খাদে নামিয়েই বলল,”চাইলে দিতে পারেন, আমি কিছু মনে করব না। একদম চুপ থাকব এ-বিষয়ে। আপনার আর আমার টপ সিক্রেট থাকবে।
ইসরাত জায়িনের বাহুতে চাপড় বসিয়ে দিল ধুপধাপ শব্দে পরপর কয়েকটা। গোমড়া মুখো স্বামীকে বসিয়ে রেখে বের হলো গাড়ি থেকে।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
নুসরাত আরশের মুখের দিকে দু- মিনিট যাবত হতবাক নয়নে তাকিয়ে আছে। তার সামনে পা এলিয়ে বসা লোকটা হাসছে। বিশ্রী! পৈশাচিক হাসি! ভীষণ মজা পেয়েছে যেন নুসরাতের মুখের ভাবগতি দেখে। নির্বাক মুখে তা দেখল মেয়েটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। ইচ্ছে করল দাঁত কেলিয়ে মিচকে শয়তানের মতো হাসা লোকটার টুটি চেপে, দাঁতগুলো সব ভেঙে দিতে। নির্জীব বদনে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে, আকস্মিক ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে উঠল স্মিত। বলল,”আসছি দু-মিনিটের ভেতর। অপেক্ষা করুন! এসেই আপনার কোলে চড়ে বসব, কোল থেকে আর নামব না।
ভ্রু আপনা আপনি উচিয়ে গেল আরশের। তখনো ঠোঁটে লেগে থাকা মৃদু হাসি মিটেনি। নুসরাত কল কেটে রোমানা খাতুনের দিকে এগিয়ে গেল।বলল,”চলে যাচ্ছি, দোয়া করবেন। এসে কষ্ট দিয়েছি… এমন বলব ভাবছেন মোটেও না, এখানে এসে আমি বাচ্চা মেয়েটা অনেক কষ্ট পেয়েছি। মরতে মরতে বেচেছি, এই জীবন থাকতে আর এই বাড়িতে না, তাহলে আজ বিদায় নিচ্ছি, ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন, আল্লাহ হাফেজ। আসসালামু আলাইকুম!
রোমানা খাতুন মিনমিন করে সালামের জবাব দিলেন। ড্রাইভিং সিটে বসা হেলাল সাহেবের হাতে জোর করে টাকার নোট গুজে দিলেন সালামি হিসেবে। এমনকি জায়িন, লিপি বেগম, আরশকে ও দিলেন। শুধু দিলেন না নুসরাত আর ইসরাতকে। রোমানা খাতুনের এমন কান্ডে তার অগোচরে মুখ ভেঙচাল নুসরাত, অতঃপর হাত পাতল তার সামনে। ভদ্রমহিলা ভ্রু উচালেন। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,”কী?
নুসরাত প্রশ্নের উত্তর দিল সহজ ভঙ্গিতে,
“সালামি!
রোমানা খাতুন গম্ভীর কন্ঠে বললেন,
“ নেই।
নুসরাত গো ধরল। আজ সালামি দিতেই হবে তাকে। সবাইকে সালামি দিল, সে কী দোষ করেছে তাকে দেয়নি। রোমানা খাতুন অটল এক টাকা ও দিবেন না সালামি। ইসরাত ও সমান তালে হাত পাতল সালামি পাওয়ার আশায়। অনেকক্ষণ নুসরাত আর রোমানা খাতুনের তর্ক-বিতর্ক চলল। শেষ পর্যন্ত বয়স্কা রাজী হলেন টাকা দিতে। শাড়ীর আঁচলের কোণ থেকে টাকা বের করতেই, নুসরাত আর ইসরাত দু-জনে খুশিতে বাক-বাকুম করে ওঠল। দু-জনের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল সালামির পাওয়ার লোভে। শেষ পর্যন্ত রোমানা খাতুন দুটো হাজার টাকার নোট বের করলেন। দুজনের হাত পাতা তখন, কিন্তু টাকাগুলো তিনি ইসরাত ও নুসরাতের দিকে এগিয়ে না দিয়ে ভাঁজ খুললেন আয়েশ করে। একে একে ভাঁজ থেকে বেরিয়ে আসলো দশ টাকা, দু-টাকা,পাঁচ টাকার নোট। দু-জনেই অদ্ভুত ভঙ্গিতে তাকিয়ে থেকে দেখল। শেষ পর্যন্ত হাজার টাকার নোট আবার শাড়ীর আঁচলে সামলে রেখে দু-জনের হাতের মুঠোয় দু-টাকা দু-টাকা করে চার টাকা গুজে দিলেন। গম্ভীর গলায় বললেন,”চানাচুর খেয়ে নিও।
না চাইতেও দু-বোনের মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসলো,
“এ্যাহ, মাত্র দু-টাকা।
ইসরাত হাতের মুঠোয় গুজে দেওয়া টাকা হা করে দেখলেও নুসরাত বলেই ফেলল,”ফকিরকে-ই তো দু-টাকা দিলে এখন নেয় না, আর আপনি আমাদের দিলেন দু-টাকা, আমরা কী ফকিরের থেকেও বেশি গরীব। চ্যা চ্যা চ্যা…!
গাড়ি চলছে আপন গতিতে। নুসরাত আরশের কোলে বসে। মুখের ভাবগতি সুবিধার না। এই বোম ফাটবে কারোর মাথায় এমন এমন ভাব। গাড়িতে ওঠার সময় সবাইকে চাপতে বলল সে, কেউই তার কথা কানে তুলল না। জায়িন নামক ভন্ড ব্যাটা ও তার সাথে শত্রুতা করেছে। বলে কিনা,”বসে যান আরশের কোলে, এক ঘন্টার তো রাস্তাই, ফটাফট চলে যাব।
ইসরাত মেকি অসহায়তা চেহারায় ভাসিয়ে বলল,
“বোন আমার দেখ, আমি ওদিকে কীভাবে চাপব? জায়গা আছে? দু-জন বসার সিটে একে তো তিনজন বসেছি কষ্টমষ্ট করে, এখন আরেকজনের জায়গা হবে কীভাবে? বসে যা না, একটুই তো রাস্তা।
তার বোনটাও এমন করতে পারল নুসরাত মেনে নিতে পারল না। তাই রেগে মেগে বলল,“তুই তোর জামাইয়ের কোলে বসে আমাকে তোর সিট ফাকা করে দে৷
ইসরাতের নিরিহ, নিষ্পাপ ভঙ্গিতে উত্তর আসলো,
“আমি এত বড় মেয়ে একজন মানুষের কোলে বসব? কেমন দেখায় না? তুই বসে যা, ছোট মানুষ আছিস।
নুসরাত কথাটা শুনতেই বলল,
“ তাহলে আমি তোর কোলে বসব।
নুসরাতের কথা কানে যেতেই ইসরাত নাটক জুড়ে দিল। চোখ বন্ধ করে মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যাওয়ার ভান করল। নুসরাতের মতামতে মাথা ঘুরিয়ে যখন পড়ল, তাহলে তো মাটিতে পড়া উচিত ছিল, কিন্তু মেয়েটা মাটিতে না পড়ে সরাসরি গিয়ে স্বামীর কোলে পড়েছে। এসব কত নাটক সে করেছে, অভিজ্ঞ নাটকে, সেই মেয়েকে নাকি নাটক দেখায় তার বোন! যুগে যুগে কী কী দেখতে হবে ভেবেই নুসরাত দীর্ঘ শ্বাস ফেলে। আরশের কোলে বসেই নাক মুখ কুঁচকে নুসরাত বোনের মীরজাফরির কাহিনি ভাবল। এই বোনের জন্য কিনা, নাওয়া খাওয়া বাদ দিয়ে সে এসেছিল এই চিপায়, আর এই বোন তার সাথে ধোকা করল, এখান থেকে ফিরে গিয়ে সব সম্পর্ক শেষ করে দিবে বোনের সাথে, এমনকি শ্বশুর বাড়ির মানুষ উরাধুরা পিটিয়ে হত্যা করে ফেললেও, সে টু শব্দটি করবে না, নিজ মনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করল। প্রতিজ্ঞা শেষে সোজা হয়ে বসুতেই উদরের কাছে সূক্ষ্ম ব্যথার সৃষ্টি হলো। বুঝতে বাকি রইল না, এই ব্যাটা আরশ চিমটি কেটেছে। শূণ্যে হাত তুলে আরশের হাঁটু বরাবর কয়েকটা কিল বসাল নুসরাত। জায়িনের কাছে বিচার দিল,”জায়িন ভাইইইই…
জায়িন নুসরাতের দিকে তাকাল। আরশকে হাসতে দেখে নিজেও হালকা হাতে ভাইয়ের গালে চাপড় বসাল। চোখ পাকিয়ে বলল,”ওকে জ্বালাবি না।
আরশ মেনে নিয়ে উপর নিচ মাথা দোলাল ভদ্র বাচ্চার মতো। বলল,”আচ্চা।
দু-মিনিট অতিবাহিত হতেই আবারো শুরু হলো তার জ্বালানো। নুসরাত দাঁতে দাঁত পিষল। অত্যন্ত কষ্টে গলবিলে জমা হওয়া গালিগুলো গিলে নিল। হুমকি স্বরুপ বলল,”আপনার নামে আমি মানহানির মামলা করব, দেখে নিয়েন।
আরশ নির্লিপ্ত কন্ঠে বলল,
“আইচ্চা করিস..!
“ আপনি আসলেই একটা খারাপের খারাপ।
“সেম টু ইউ বেইবি..!
ক্যালেন্ডারের পাতা ত্রিশ আগষ্টের ঘরে। ঘড়ির কাটায় তখন বাজছে রাত দশটা আঠারো। ইরহাম এখনো যায়নি সৈয়দ বাড়িতে, তাই স্ত্রীর সাথে ঝগড়ার শব্দ আসছে উপর থেকে। স্বামী-স্ত্রী রোজকার কলহে তিক্ততা ধরে গেছে সবার। নাছির সাহেব ঘন্টাখানিক আগে দু-জনকে বসিয়ে বুঝিয়েছেন এসব কলহ, মান-অভিমান, অভিযোগ দু-জন দু-জনের সাথে ভাগ করে নিতে হয়, রুমের বাহিরেই যাতে স্বামী স্ত্রীর ঝগড়া ঝাটির শব্দ না বের হয়, কিন্তু এক ঘন্টা যেতে না যেতে তারা কী শুরু করছে? পুরো সোসাইটিকে জানিয়ে দিচ্ছে দু-জনের নিত্যদিনের উঠতে বসতে কথা কাটাকাটি, ঝগড়া, আর চিৎকার চেচামেচি।
সেদিন নাকি আবার নাজমিন বেগম করিডোর পার হয়ে যাওয়ার সময় খোলা দরজা দিয়ে দেখেছেন ইরহাম স্ত্রীর গায়ে হাত তুলতে গিয়েছে। এটা দেখেই ক্ষেপে গেলেন তিনি। শাস্তি হিসেবে একদিন খাবার খেতে দেননি। ইরহাম নিজের দোষ স্বীকার করেছে, এখানে তার ভুল, ক্ষমা ও চেয়েছে সৌরভির কাছে, কিন্তু ব্যাপারটা খতিয়ে দেখলে এখানে আসলে তার দোষ নেই দোষটা সৌরভির।
নাছির সাহেব দু-জনকে মাত্র বোঝানোর পর আবারো ঝগড়া দেখে দীর্ঘ শ্বাস ফেললেন, এরা এভাবে মানবে না। আগামীকাল আলোচনায় বসতে হবে সবাইকে নিয়ে। নিত্যদিন এসব কারোর ভালো লাগে না দেখতে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরপর ড্রয়িং রুমে উপস্থিত হলো এসে নুসরাত। নাছির সাহেব তাকে অদেখা করে মোবাইল দেখতে লাগলেন। ওই বাড়ি থেকে ফিরে আসার পর থেকেই বিয়ে করার ভুত চেপেছে মাথায়। সন্ধ্যার দিকে রোমানা খাতুন ফোন দিয়ে নুসরাতের নামে নালিশ কেটেছেন মোরগ চুরির দায়ে৷ উনার ছেলেরর বৌয়ের তিনটা জোয়ান জোয়ান মোরগ চুরি যাওয়ায় প্রায় অসুস্থ হয়ে গেছেন, বাড়ির চৌকাঠে বসে মাথা চাপড়াচ্ছেন আর হাই হুতাশ করছেন। নুসরাতকে ডেকে এনে এই বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে, সে স্বীকার করেনি চুরি করেছে, আবার অস্বীকার করেওনি, হেসে উড়িয়ে দিয়েছে কথাটা।
এখন আবার এসেছে আরেকটা বায়না নিয়ে নাছির সাহেবের সামনে। নাছির সাহেব জানেন কী বায়না করবে, তাই চশমা পরে মনোযোগ সহকারে মোবাইল গাটাগাটিতে ব্যস্ত হলেন, ভাব করলেন মেয়েকে দেখেননি তিনি। নুসরাত এসেই প্যানপ্যান শুরু করল মাছির মতো,”আব্বা আপনি বলেছিলেন, এইচ-এস-সি তে ফেইল করলে এক বাচ্চার বাপের সাথে বিয়ে দিবেন। কিন্তু এখন দু-বাচ্চার বাপের সাথে ও বিয়ে দিচ্ছেন না। ইচ্ছে করে ফেইল করলাম, এতে লাভ হলো কী?
নাছির সাহেব অবাক কন্ঠে জানতে চাইলেন,
” ইচ্ছে করে?
নুসরাত জিভ কাটল।আমতা আমতা করে বলল,
“ওই আর কি, ইচ্ছে করে ফেইল করেছিলাম। পেপারে কিছুই লিখিনি, সাদা পেপার জমা দিয়ে এসেছি। এবার বলেন কবে বিয়ে দিবেন আমার?
নাছির সাহেব বললেন,
” পরে।
নুসরাত জোর দিল কথায়। জেদি কন্ঠে বলল,
“বিয়ের বয়স হয়ে বুড়ি হয়ে যাচ্ছি, এখনো বিয়ে দিলেন না আপনি! আজ বলতেই হবে কবে বিয়ে দিবেন আমার? আপনার ছেলে থাকলে এতদিনে বিয়ে দিয়ে দিতেন না? সত্যি করে বলেন আব্বা, দিতেন না?
নাছির সাহেব শান্ত মুখে বসে রইলেন। মোবাইলের দিকে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করলেন,” বয়স কত? বিয়ের বয়স হয়েছে তোমার?
নুসরাত হাতের আঙুলের হিসাব করল। বলল,
“কাটায় কাটায় ঊনিশ বছর, আট মাস, বারো সেকেন্ড এখনই তো বিয়ে করার ঠিক সময়। আমার মতামতে ষোলো বছরেই স্বামীর ঘরে মেয়েদের পাঠিয়ে দেওয়া উচিত, সেই আনমান, আমার বয়স তো তিন বছর বেশি।
নাছির সাহেব বললেন,
“এখনো সময় আছে পরে।
নুসরাত নাছির সাহেবের পা ধরে ঝুলে গেল। কন্ঠে মায়া ঢেলে অবিচল কন্ঠে একই বুলি আওড়াল,” ও আব্বা, বিয়ে দিয়ে দেন না! আব্বা, বিয়ে দিয়ে দিলে আর বেশি কথা বলব না, একদম গৃহিনী নারী হয়ে যাব, সারাদিন স্বামী সেবা করব, আপনাকেও জ্বালাব না। আব্বা গো বিয়ে দিয়ে দিন না, আর কোনো আবদার করব না, এটাই শেষ আবদার, বিয়ে দিয়ে দেন নায়ায়ায়ায়া.!
“হবে না, মানে হবে না, পরে বিয়ে দিব। এবার ভাগো..!
বলেই আবার মোবাইলে ব্যস্ত হলেন। নুসরাত পা টিপে দিতে লাগল। বাবাকে তোষামোদ করল রাজী হয়ে যাওয়ার জন্য, নাছির সাহেব নিজের না থেকে হ্যাঁ তে আসলেন না। আবারো বিরক্ত ভঙ্গিতে বলে ওঠলেন,” তোমার বয়স হয়েছে বিয়ের? বিয়ের বয়স হলে এসে আমাকে জানিও, আমি বিয়ে দিয়ে দিব।
নুসরাত দু-ভ্রুয়ের মধ্যভাগে ভাঁজ ফেলল। মনে মনে কথা গোছাল,” দু-বাচ্চার মা হওয়ার বয়সে আপনি কেমন করে জিজ্ঞেস করেন আমার বিয়ের বয়স হয়েছে কিনা! এতদিনে বিয়ে দিয়ে দিলে তো আমি নাতী নাতনীর মুখ দেখে তাদেরও বিয়ে দিয়ে দিতে পারতাম।
মোবাইল হাত রেখে মেয়ের মুখটার দিকে তাকালেন ভদ্রলোক। কন্ঠে গম্ভীরতা বজায় রেখে বললেন,” আল্লাহর ওয়াস্তে কোনো উল্টাপাল্টা কথা বলবে না, বাপ হই তোমার, একটু লজ্জা শরম করো..!
নুসরাত ভেংচি কাটল। বাবাকে ভেঙচিয়ে ভেঙচিয়ে বলল,” নজ্জা শলম কলো..! এত লজ্জা শরম করে হবে কী, এক ট্যাকা তো দেয় না কেউ।
আবারো ভেঙাচাল,
“নজ্জা শলম কলো..!
ঘড়ির কাটায় সকাল দশটা৷ ঘুম থেকে উঠে নুসরাত এলোমেলোভাবে হাঁটছিল। চুলগুলো পাখির বাসা হয়ে মাথার মাঝখানে দলা পেঁকে আছে। হাত উপরে তুলে অলস ভঙ্গিতে আড়মোড়া ভাঙতেই স্কিনি টি-শার্ট উপরের দিকে উঠে উদরের একাংশ বের হয়ে গেল। তখনই পেছন থেকে আরশের গলা ঝাঁড়ার শব্দ আসলো। নুসরাত ভ্রু বাঁকিয়ে পিছু ফিরতেই, আরশ খোঁচা দিয়ে বলে ওঠল,”ক্যালভিন ক্লাইনের আন্ডারওয়্যার পরেছিস,তাই সেটা বের করে সবাইকে দেখাচ্ছিস নাকি?
নুসরাত কপাল কুঞ্চিত করে তাকিয়ে থাকল সামান্যক্ষণ। ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। অতঃপর তৎপরতা নিয়ে গলার কাছের কাপড় সরিয়ে অন্তর্বাসের স্ট্রেপ দেখিয়ে উত্তর করল,”শুধু ক্যালভিন ক্লাইনের আন্ডাওয়্যার পরিনি ব্রা ও পরেছি। এই যে, এই দেখুন… দেখুন..!
আরশ নুসরাতের মাথায় ঠাস করে একটা চাপড় বসাল৷ ঘাড় সামান্য বেঁকে গেল তার। দাঁতে দাঁত পিষে ভৎসনা করল,”নির্লজ্জ!
কথায় ধরে ফেলল নুসরাত। গতকাল তাকে কোলে বসিয়ে নিয়ে আসার সময় চিমটি কেটেছিল এই বেয়াদপ। উদরের কাছে কাতুকুতু ও দিয়েছিল মিচকেটা। তাই কোমরে এক হাত রেখে দাঁড়িয়ে, মুখ ঝামটা মারল। বলল,”আর আপনি কী, মনে হচ্ছে আকাশ থেকে নেমে আসা সাধু জ্বীন। আপনি যে আস্ত একটা লুইচ্চা, বইদমাশ, তা আমার থেকে ভালো দুটো কেউই জানে না।
আরশ ভ্রু উচিয়ে হাসল। বলল,
“অবশ্যই আমি সাধু ব্যক্তি, নাহলে বিয়ের তেরো বছর পরও তুই অক্ষত, বিনা বাচ্চায় ঘুরছিস এটা কীভাবে সম্ভব হয়!
ধুপ করে একটা কিল বসাল আরশের পিঠে নুসরাত। আঙুল তুলে শাসাল,”একদম খারাপ কথা বলবেন না।
নিষ্পাপ ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল আরশ। জিজ্ঞেস করল,“কোথায় খারাপ কথা বললাম, আমি তো তোকে বাস্তবতা দেখালাম।
নুসরাত কিছু একটা বলতে গিয়ে মুখ আটকাল। নির্জীব মুখে বলে ওঠল,“আপনার বাস্তবতার মাইরি বাপ।
আরশ হাসল। নুসরাতকে চ্যাতিয়ে দিতে আঙুল দিয়ে খোঁচা দিল পিঠে। নুসরাত ঘুরে তাকাতেই, গলা খাদে নামিয়ে গুরু গম্ভীর কন্ঠে বলে ওঠল,”নডী ফুরি।
কপালে ভাঁজ ফেলল মেয়েটা। পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে আরশের মুখোমুখি হলো, শক্ত হাতে টেনে ধরল চুল। নিজেও গালি দিল,”তুই নডী ফুয়া। শালা নষ্টের নষ্ট…
আরশ নিজের চুল আলগোছে ছাড়িয়ে নিতে চাইল নুসরাতের হাতের কবল থেকে, পারল না। চুল ধরে টানায় ঘাড়ে ব্যথা পেল, তাই ঝুঁকে আসলো নিচের দিকে। হিসহিসিয়ে বলল,”চুল ছাড়, বোকা!
“ছাড়ব না।
“কেন? তোর কী হয়েছে? চুল টানছিস কেন বাঁদরের মতো?
“আমি বাঁদর না।
“চুল ছাড়… ব্যথা পাচ্ছি..!
“আগে বলুন আর গালি দিবেন?
আরশ দু-পাশে মাথা নাড়াল, তারপর আবার উপর নিচ দোলাল। নুসরাত ভ্রু উচিয়ে জিজ্ঞেস করল,”এসব কী বলছেন? মুখ দিয়ে বলুন, বাক-প্রতিবন্ধীদের ভাষা আমি বুঝিনা।
নুসরাতের হাতের মুঠো থেকে আরশ চুল ছাড়াতে না পেরে, তার গাল টেনে ধরল দু-দিকে। মেয়েটা চ্যাঁচাল,”গাল ধরে টানাটানি করবেন না আরশ ভাই।
“একশো বার করব। চুল ছাড়, স্টুপিড!
“ আপনি স্টুপিড, আপনার চৌদ্দ গুষ্টি স্টুপিড।
“হ্যাঁ স্টুপিড হওয়ার জন্যই তো তোর মতো গাধী একটার জন্ম হয়েছে।
“তো আপনি কী? নিজেকে কী মনে করছেন? কোন দেশের আইনস্টাইন আপনি?
“ফ্রান্সের আইনস্টাই..! এবার চুল ছাড়, নাহলে মাথায় তুলে আছাড় মারব।
নুসরাত জিভ বের করে ভেঙাচাল। ঠোঁটের বিকৃতি ঘটিয়েও একইভাবে ভেংচি কাটল। অতঃপর শক্তি খাটিয়ে জোরে চুলে টান দিয়ে ছেড়ে দিল আরশকে। বিড়বিড় করে গালি দিতে দিতে চলে গেল অন্যদিকে।
আরশ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ঘাড় দু-দিকে ঝাঁকাতেই মটমট করে উঠল। চুল হাত দিয়ে পেছনে ঠেলে দিয়ে তাকিয়ে রইল নুসরাতের যাওয়ার দিকে। শক্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,”ওড়না কই তোর?
নুসরাত হেঁটে যেতে যেতে থামল। ঘাড় বাঁকিয়ে অবলোকন করল ওভাল আকৃতির কালো হয়ে আসা মুখখানা। প্রতিত্তোরে বলল,”আপনার শ্বশুর বাড়িতে।
“নাক দিয়ে বাচ্চাদের মতো সর্দি পড়া মেয়েটাকে আমি বিয়ে করব না। সারাবছর সর্দি লেগে থাকে ওর। তাছাড়া বয়স বিশের গোড়ায়, কিন্তু এখনো ভাইদের কোলে চড়ে ঘুরে বেড়ায়। উপর থেকে নিচ পুরোই ন্যাকামিতে ভরপুর
একসাথে কথাটা বলে শেষ করল মমো। মাহাদি মিনমিনে স্বভাবের মেয়েটার দিকে তাকাতেই মুখ বাঁকিয়ে ভেংচি কাটল, তারপর চলে গেল কিচেনে। গতকাল দিনে থেকে রাত পর্যন্ত রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে শেষ পর্যন্ত আজ সকালে এ বাড়িতে এসে উঠেছে সে। সকলে স্বাভাবিক কথাবার্তা চালালেও, মমো এসেছে থেকে মুভ ভেঙচাচ্ছে, সাথে একই বাক্য বিরতিহীনভাবে বলে চলেছে। মাহাদি ভীষণ বিরক্ত। এই মেয়ের এমন বাচ্চামি আচরণে। তার বোনটাকে ও বলিহারি, ভিডিওটা এভাবে ফাঁস দিতে পারল কীভাবে? মাহাদি তো মনে করেছিল মজা করছে মেয়েটা, কিন্তু সত্যি সত্যি যে ফাস করে দিবে তা তার কল্পনাতীত ছিল।
এই বাড়িতে আসার আগে এতটা অস্বস্তি কাজ করেনি, এখন যেমন করছে। ওই নাক দিয়ে সর্দি মেয়েটাই একটা বাক্য বারংবার বলে তাকে এমন লজ্জা দিচ্ছে কেন! এই মেয়ে যখন এই ভিডিও দেখেছে, তার মানে সবাই ওই ভিডিও দেখেছে, এমনকি এটা ও জেনে গেছে সবাই, তার বউ হিসেবে প্রথমে বাবা এ মেয়েকে পছন্দ করেছেন।
মাহাদি নিজের ভাবনার গভীরে হারিয়ে গিয়েছিল এমনভাবে যে, রুহিনী বেগম কখন এসে তার সামনে হাজির হয়েছেন তা বুঝতেও পারেনি সে। মাহাদি চোখ তুলে তাকাতেই ভদ্রমহিলা হাসলেন। এ পর্যন্ত যতবার দেখা হয়েছে উনাকে হাসি মুখ ছাড়া কখনো দেখেনি সে। বসতে বসতে শুধালেন,”কেমন আছো মাহাদি?
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো মামনী!
রুহিনী বেগম আবারো অমায়িক হাসলেন। হেসে হেসে জানতে চাইলেন,”তা পরিবারের সবাই ভালো আছে তো? তোমার আম্মুর শরীর কেমন?
“আলহামদুলিল্লাহ সবাই ভালো আছেন।
“ তা বিয়ে করবে কবে?
হঠাৎ এই প্রশ্নে নড়েচড়ে বসল সে। ঠোঁট টিপে উত্তর দিল,“করব তাড়াতাড়ি..!
রুহিনী বেগম সময় নিলেন প্রশ্ন করতে গিয়ে। দ্বিধায় পড়লেন সামান্য। তবুও তা একপাশে ফেলে শুধালেন,”তুমি নাকি বিয়ে করতে চাচ্ছো না, কারণ কী? কাউকে পছন্দ আছে? থাকলে বলতে পারো, আমি ভাবীর সাথে কথা বলব।
মাহাদি আঁতকে উঠল। দু-পাশে সমানতালে মাথা দুলিয়ে জানাল,”না, না, আমার কোনো পছন্দ নেই।
রুহিনী বেগম মৃদু হাসলেন। সরাসরি জানতে চাইলেন,”এত উত্তেজিত হচ্ছো কেন? আমি শুধু জিজ্ঞেস করেছি।
এরপর থেমে আবারো সন্দেহি গলায় জানতে চাইলেন,”সত্যিই কী কোনো পছন্দ নেই? এভাবে পাত্রী দেখতে গিয়ে বারবার পালিয়ে আসার মানে তো এই দাঁড়ায় তুমি কাউকে পছন্দ করো।
মাহাদি দু-পাশে মাথা নাড়াল রুহিনীর কথায় অসম্মতি জানিয়ে। রুহিনী বেগম বিনয়ী থাকার চেষ্টায় রপ্ত থেকে বললেন,”বিয়ে থেকে পালিয়ে আসা কোনো পুরুষের কাজ হতে পারে না, যদি কাউকে পছন্দ করে থাকো, তাহলে বলো। মেয়েদের মতো বিয়েকে ভয় পাচ্ছো কেন তুমি? বিয়েতে কোনো ফোবিয়া আছে তোমার? নির্দ্বিধায় বলতে পারো আমাকে।
প্রশ্নগুলোর উত্তর নেই মাহাদির কাছে তাই পাংশুটে মুখে চেয়ে রইল ভদ্রমহিলার দিকে। রুহিনী বেগম আবারো জড়তাহীন গলায় অকপটে জানতে চান,”মমোকে পছন্দ? পছন্দ হলে আমাকে বলতে পারো, লজ্জা পাওয়ার দরকার নেই, আমাকে তোমার বান্ধবী মনে করো। আরে আরে বলো, মমোকে পছন্দ করো নাকি?
রুহিনীর কথা শুনে লজ্জায় মাহাদির কান, গাল, নাক লাল হয়ে উঠল, একদম টমেটোর মতো। শব্দ ব্যয় করতে পারল না সে। মানা করতে জড়তা-সংকোচে থেমে গেল গলার আওয়াজ। ঠোঁট কামড়ে দু-পাশে মাথা নাড়াল, যার অর্থ দ্বারায় না।
রুহিনী বেগম আরেকটু কাছ ঘেঁষে বসলেন, নিজেদের ভেতরের দু-হাত লম্বা দূরত্ব কমিয়ে দিলেন। সামান্য জোর দিলেন কন্ঠে,”আরে বলো না, আমি কিছু মনে করব না। পছন্দ হলে বলতেই পারো, আমি ঘটকালি করব। লজ্জা পাচ্ছো কেন, আশ্চর্য! আমি তো তোমার বয়সী। হ্যাঁ, বয়সে চাচী মামীর বয়সী, কিন্তু অন্তরের দিক থেকে একদম যুবতী।
মাহাদি লজ্জায় ভাষা হারিয়ে ফেলল কথা বলার। কোনো প্রকার উত্তর না দিয়ে উঠে একপ্রকার পালিয়ে গেল ওই স্থান থেকে। সিঁড়ির বেয়ে উপরে উঠতে গিয়ে সংঘর্ষ হতে লাগল নিচের দিকে নামা মমোর সাথে, নিজেকে সামলে নিল সে, নিমেষে নিরাপদ দূরত্ব বাড়িয়ে নিল। মমোকে পেরিয়ে হন্তদন্ত পায়ে রুমের দিকে ছুটতে নিয়ে থেমে গেল৷ পেছন থেকে ভেসে এলো মেয়েটার উপহাস মিশ্রিত স্বর,”নিজের চেহারা কখনো আয়না দেখেছিল, যে আমাকে বলে ন্যাকামি করি, নাক দিয়ে সর্দি পড়ে, একবার যদি দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখত তাহলে আমাকে জীবনেও এসব কথা বলত না। হনুমানের মতো চেহারা হওয়া সত্ত্বেও এত অহংকার, বোকারহদ্দ। নিজেকে কী ভাবে, প্রিন্স চারমিন নাকি প্রিন্স জুলিয়েট! হুহ..
কানে সিসা ঢালার মতো শব্দগুলো শ্রবণন্দ্রিয়ে প্রবেশ করল মাহাদির। এত বড় অপমানের স্বীকার হয়ে, এক পা ও আগাল না সম্মুখে। মেয়েটা এবার বেশি বাড়াবাড়ি করছে৷ সামান্য এক কথা কী না কী বলেছে, এসেছে থেকে সেই কথার জন্য শুনিয়েই যাচ্ছে তো যাচ্ছে,থামাথামির নাম গন্ধ নেই।
সে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকাল নিচের দিকে নেমে যেতে থাকা মেয়েটার পানে, তখনো অবিচল কন্ঠে বিড়বিড় করছে। মাহাদিকে হাজারটা বকতে বকতে মমো ও পিছু ঘুরে তাকাল। সেকেন্ডের ভেতর চোখাচোখি হলো দু-জনের। ছেলেটা তাকিয়ে পরখ করল গুলুমুলু, ফোলা ফোলা গাল, নিষ্পাপ চেহারার অধিকারী মেয়েটাকে। সময় গড়াল।
ধীরে ধীরে সেকেন্ডের কাটা মিনিটের কাটার দোরগোড়ায় পৌঁছাল৷ চেয়ে রইল একে অন্যের দিকে নির্মিশেষ। অতঃপর দু-জন দু-জনকে মুখের বিকৃতি ঘটিয়ে ভেংচি কেটে চলে গেল নিজ নিজ পথে। মাহাদি মমোর শোনার মতো করে নাক টেনে বলে ওঠে,”ন্যাককা একটা..!
মমোও সিঁড়ি বেয়ে নিচের দিকে নেমে গেল। মাহাদির মতো টেনে টেনে বলে ওঠে,“হন্নুমান একটা..!
আরশের সাথে তুমুল ঝগড়া লেগেছে নুসরাতের। হাঁটতে গিয়ে ভুলে আরশের গায়ে ধাক্কা লেগে গেছে আর এতেই শুরু কথা কাটাকাটির। দু-জনের একজনও থামাথামির নাম গন্ধ নেই। এমন ভাব লক্ষণীয়, ঝগড়া করে আজ এভারেস্ট জয় করে ফেলবে। কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে নুসরাত বলে বসল,”আমাদের বাড়িতে কী? দু-দিন পরপর এখানে চলে আসেন কেন? নিজের বাড়ি নেই? এসেই দেখি গান্ডেপিন্ডে গিলেন।
কথাটা নুসরাতের মুখ থেকে বের হতেই সমানতালে ঝগড়া করা আরশ থেমে গেল। অনেকক্ষণ ভ্রু কুঁচকে মেয়েলি মুখটা দেখল। কপালে গাঢ় ভাঁজ পড়েছে তার। নিঃশব্দে মুখটা কয়েকবার পরখ করে নিয়ে উল্টো পথে হাঁটা ধরল। যেতে যেতে অস্বাভাবিক গম্ভীর কন্ঠে বলল,”আর আসব না।
নুসরাত হা করে তাকিয়ে রইল আরশের যাওয়ার পানে। মাইন্ড করে ফেলবে তার কথা শুনে লোকটা সে বুঝতেই পারেনি। অপরাধবোধ নিয়ে আরশের যাওয়ার পানে তাকিয়ে থাকল দরজার সামনে। ফিরে তাকানোর আগেই পিঠে পড়ল কয়েকটা কিল। নুসরাত আর্তনাদ করে উঠল। নাজমিন বেগম শুনলেন না, বাহুতে আরো কয়েকটা বসালেন, সাথে পিঠে, গালে, হাতে। যেদিকে পারলেন অদিকেই লাগাতার বসালেন। ক্রোধে মুখ লাল হয়ে আছে উনার। মেয়ের এমন উগ্রতা দেখে আক্রোশে ফেটে পড়ছেন। ছেলেটা এসেছে কয়েকবার তাদের বাড়িতে৷ দেশে ফিরার দু-মাস পেরিয়ে তিনমাস হতে চলল, এখনো পর্যন্ত মাত্র পাঁচবার এসেছে এ বাড়িতে, আর এতেই খোটা দিয়ে বসেছ এই মেয়ে। কতটা কষ্ট পেয়েছে ছেলেটা ভেবেই নাজমিন বেগমের মেয়ের প্রতি রাগ বাড়ল। চটপটে হাতে আরো কয়েকটা বসিয়ে দিলেন পিঠে। বললেন,”বেয়াদবের বাচ্চা, বড় ছোট তোর চোখে লাগে না? অনেকদিন যাবত তোর নামে নালিশ আসছে আমার কানে, কিছু বলছি না বলে কী মাথা কিনে নিয়েছিস? আজ তোর একদিন কী আমার একদিন।
পায়ের জুতো খুলে হাতে নিলেন। সপাটে বসালেন নুসরাতের পিঠে বারি। যতক্ষণে সরে যেতে চাইল ততক্ষণে দেরি মা রণচন্ডী হয়ে গেছেন। এখন আর বাঁচার উপায় নেই। এই কথাই শুনতে হলো ভদ্রমহিলাকে। দৌড় দিল সামনের দিকে নুসরাত, পিঠে হাত বুলাল, ব্যথা পেয়েছে অনেকটা। পিছন থেকে আবার খ্যাপাটে পায়ে এগিয়ে আসছেন নাজমিন বেগম, তাই না থেমে ব্যথার জায়গায় হাত বুলাতে বুলাতে দৌড়াল সোফার পেছনে। সেখানে দাঁড়িয়ে চোখ বড় বড় করে চ্যাঁচাল,”আম্মায়াআ…
নাজমিন বেগম জুতো ঢিল মেরে নুসরাতের মাথা বরাবর ছুঁড়লেন। ক্রোধে অন্ধ হয়ে নিজেও চ্যাঁচালেন,”আমাকে চোখ দেখাস তুই? আমাকে? বাহিরের মানুষকে চোখ দেখাতে দেখাতে আমাকে দেখাচ্ছিস? দাঁড়া ছাগলের বাচ্চা, হাতের কাছে পেলে আস্তো রাখব না।
ভদ্রমহিলা মেয়ের পিছু পিছু ছুটলেন। হাতের কাছে পেলে ভর্তা বানিয়ে দিবেন মনোভাব এমন। সাথে সব রাগ উগলে দিতে এতদিনের জমানো কথা হরবর করে বললেন,”তুই নাকি আনোয়ার সাহেবের সাথে ও বেয়াদবি করেছিস?
নুসরাত মুখ ফসকে জিজ্ঞেস করে বসল,
“ওই বুইড়া বলেছে আমি বেয়াদবি করেছি?
কথা শেষ হতেই নাজমিন বেগমের অন্য পায়ের জুতো এসে মুখ বরাবর পড়ল নুসরাতের। কঁকিয়ে উঠল ব্যথায়। কহাতে নাক চেপে ধরে আর্তনাদ করল। চোখ দিয়ে পানি বেয়ে পড়ল একটুখানি। নাজমিন বেগম ফিরেও দেখলেন না তা৷ বললেন,” চুপচাপ আরশের কাছে ফোন দিয়ে ক্ষমা চাইবি, এরপর নাস্তা খেতে আসতে বলবি, যদি না আসে আরশ তাহলে তোকে পিটিয়ে লাশ বানিয়ে দিব।
নুসরাত মনে মনে মাকে কয়েক হাজারটা ভেংচি কাটল। মুখের বিকৃতি বানিয়ে বিড়বিড় করল,”বয়েই গেছে আমার ক্ষমা চাইতে।
মেয়ের কথা শুনলেন হয়তো, তাই হুশিয়ারী দিলেন একপ্রকার,“আরশ যদি না আসে, তোর জিনা হারাম করে দিব আমি।
নুসরাত কিৎকাল মায়ের গুরু গম্ভীর, ক্রোধানিত চেহারা দেখল। অতঃপর প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইল বের করে কললিস্টে ঢোকে আনব্লক করল চ্যাঙ্গিস খান নামক নাম্বারটা। কল মিলাল, কানে লাগিয়ে অপেক্ষা করল অপাশ থেকে কল ধরার। কল তো ধরল না, উল্টো নুসরাতকে হতবাক করে দিয়ে অপাশ থেকে বিজি আসলো নাম্বারটা। মোবাইল হাতে রেখে কিৎকাল স্ক্রিনে তাকিয়ে ঠোঁট বেয়ে আনমনে উচ্চারণ হলো, “আম্মা, ব্লক মেরে রেখেছে আমায়, চ্যাঙ্গিস খানটা।
নাজমিন বেগম কানেই তুললেন কিনা কথাটা বোঝা গেল না। নিজের হাতের মোবাইল এনে ধরিয়ে দিলেন নুসরাতের হাতে। ইশারায় বললেন কল দিতে। নুসরাত কল দিল এবার, কয়েক সেকেন্ড রিং হওয়ার পর অপাশের ব্যক্তিটি কল তুলল। দু-জনেই কিছুক্ষণ চুপ রইল। যান্ত্রিক মুঠোফোনের অপাশ থেকে ভেসে এলো,”কথা না বললে ফোন রাখছি।
বলা শেষেই কলকাট হয়ে গেল, সেকেন্ডই দিরুক্তি করল না। নুসরাত শক্ত হাতে আবারো কল মিলাল আরশকে। কল পিক হতেই, ক্যাচক্যাচে কন্ঠে বলে ওঠল,”হ্যালো, আরশ ভাই!
নুসরাতকে অষ্টম আশ্চর্যে পৌঁছে দিয়ে ব্যক্তিটি শুধাল,“কে বলছেন?
নুসরাত হতবিহ্বল নয়নে তাকিয়ে থাকল দেয়ালের দিকে। উত্তর দিল না সেই কথার। জিজ্ঞেস করল,”নাস্তা না করে গিয়েছেন কেন?
“উত্তর দিতে ইচ্ছুক নই।
দন্ত কপাটি পিষল সে। কড়মড় করে বলল,
“আপনি নিজেকে যতটা ভদ্র, সিধেসাদা দেখান আসলে অতোটা ভদ্র আর সিধেসাদা নন, এক নাম্বারের ঘাড়ত্যাড়া, বজ্জাত, খবিস।
“ফোন রাখছি।
নুসরাত চ্যাত করে উঠল। ধমকে উঠল,
“একদম আমাকে রাগাবেন না আরশ ভাই৷ মুখের উপর কল কেটে দেওয়ার মতো বেয়াদবি কোথা থেকে শিখেছেন! চুপচাপ এসে নাস্তা করে যান, আর ক্রিপা করে আমাকে ক্ষমা করে দিন।
“এত সহজে তোমাকে আমি মাফ করব না।
মৃদু চিৎকার বেরিয়ে আসলো নুসরাতের মুখ দিয়ে। আক্রোশে ফেটে পড়ে কর্কশ কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,“তাহলে কীভাবে ক্ষমা করবেন?
আরশ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,
“আমার সাথে চ্যাঁচাচ্ছো, ফোন রেখে দিব কিন্তু।
নুসরাত দন্ত কপাটি পিষল, তাকে হুমকি দেয় এই আরইশ্শার বাচ্চা। চিৎকার করে জিজ্ঞেস করতে চাইল,”আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন কল কাটার? কাটুন না কাটুন, আমি ভয় পাই নাকি, কিন্তু বলতে পারল না। মেকি তোষামোদ করল,”জ্বি ফারমাইয়ে নাবাব সাহাব, আপনার জন্য এই অভাগীর জান কুরবান।
আরশ হয়তো হাসল সামান্য। অতঃপর গলা খাঁকারি দিয়ে গম্ভীর স্বরে বলে ওঠল,”এখন জান কুরবান না করলেও চলবে, আমি আবার মানব দরদী মানুষ। মানুষের জান কুরবান করতে পারব না।
নুসরাত দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। কত কথা বলে এই ব্যাটা। তবুও শুধায়,”কী করতে হবে বলুন? কী করলে আপনার আকাশ ছোঁয়া রাগ কমে জমিনে নামবে?
আরশ শীতিল কন্ঠে বলল,
“বর্তমানে আমার দুটো শর্ত মেনে নিলেই, আকাশ ছোঁয়া রাগ, জমিনে নেমে যাবে।
“দুটো শর্ত বকুন..!
“ আমি কুত্তা নই যে বকব, সুন্দর করে কথা না বলতে পারলে কল কাটো, আমি আসব না নাস্তা করতে।
নুসরাত ঠোঁট টেনে হাসল। মেকি বিনয়ী কন্ঠে এনে বলল,“প্লিজ ভাইজান, আপনার দুটো শর্ত বলে আমার মতো একজন নিরিহ প্রাণীর উপরে ক্রেপা করুন, দয়া করে।
আরশ সময় নিল কিছুক্ষণ। বলল,
“লোকেশন পাঠাচ্ছি এসে দেখা করো।
নুসরাত ফট করে বলল,
“ পারব না।
“তাহলে আমিও নাস্তা করতে আসব না।
চোখ বন্ধ করে প্রলুব্ধ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল সে। এই আরশের বাচ্চা জ্বালিয়ে মেরে ফেলছে তাকে।। বলল,”লোকেশন সেন্ড করুন, হাফ এন হাওয়ারের ভেতর আসছি।
প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৪৯
“ভেতরে আসার দরকার নেই, বাহিরে এসো।
“ আরশ ভাইইইইউইইইই…আপনি আমার জীবনটা জ্বালিয়ে ত্যানা ত্যানা করে দিচ্ছেন। বুঝতে পারছেন, আপনি আমার জীবনের একটা ত্যক্ত, বিরক্তিকর অধ্যায়।
আরশ ও নুসরাতের মতো একই ভঙ্গিমায় বলল,
“আর আপনি আমার জীবনটা মধুর করে দিচ্ছেন৷ আপনি হলেন আমার জীবনে দেখা সবথেকে সুন্দর প্রাণী, সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়। এবার দয়া করে ম্যাম নিজের পা ফেলুন বাড়ির বাহিরে। সাথে আমাকে ধন্য করুন, আপনার পায়ের ধুলো মাড়িয়ে।

প্লিজ আপু তারাতাড়ি পরের পার্টটা দিও🙏🙏🙏🙏🙏
Next part den 🥹
প্লিজ আপু একটু তারাতাড়ি দিয়েন
Apu ektu trtry dwa jy na!!
R vallage nh w8 krte….
Ami onk hoyran hoye gesi…
Khrp lge jokhon dekhi tumi nxt prt dw nai…
Emotion amr ata…
Plz try koro..
Plzz
Plzzz
Apu ektu trtry dwa jy na!!
R vallage nh w8 krte….
Ami onk hoyran hoye gesi…
Khrp lge jokhon dekhi tumi nxt prt dw nai…
Emotion amr ata…
Plz try koro..
Plzz
Plzzz
Apu aktu taratari dio plz ato din por akta kore part dile kmne hobe dekha jay onk somoy emotions gula kmn jani hoi jay mane sob gulay jay akta story akshate na porle valo lage na oikhane ai part ta onk din hoi gese den na
Apu porer part ta aktu taratari Dan plz apu
Aktu taratari Dan
Ar w8 Korte Mon chay nh
Apuu plz
Aktu taratari diyen apu
Plzz
Plzz
Plzz
Plzz
Apuu kobe diben?eto late e dile ar porar mood thke na even vule o jai etar kotha 😭🙂
Apu plz taratari porer part ta den
আপু একটু তাড়াতাড়ি দাও
আপু একটু তাড়াতাড়ি দাও
আপু তাড়াতাড়ি দেন
Apu next part ki asbe 😶🌫️😛
Boin tarataridau ami to bari theke vote dia aisha bhabsi tinta na hoileo ontoto dui ta thakbe tumi to aktao daonai
আপু পরের পার্টটা তাড়াতাড়ি দেন plz!
আপু তারাতাড়ি পরের পার্টটা দাও 🙏🙏🙏🙏🙏
ei apnar somosha ki apu taratari porbo dita na parle uponnash lakhan kan. Ratra ghum ashana etar jonno . taratari dita na parle uponnash likban na. 🤬🤬🤬🤬🤬🤬🤬😡😡😡😡😡😡
এই জাউরা লেখিকারে কেউ উগান্ডায় পাঠায়
plz! 🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏
গত এক সপ্তাহ ধরে, আমি চেক করতেছি, কিন্তু আপু পর্বগুলো দিচ্ছেন না কেন, মেজাজ কিন্তু ১০০ ডিগ্রী হয়ে যাচ্ছে, এত রানীং উপন্যাস একটুও ভালো লাগেনা
Apu are soite partasena doa Kore next part den are koto opekkha koraben protidin I D te dukhe dekhse next part asche kina
Apu please Aber deye Dan are kosto dean na
Apu next part Kobe diben ami toh er modde onno arektah novel pore pelsi ekhon o next part den nai plzzzzzz Apu next part
কবে পড়ছি এখনো আসে নাই 🥺🥺🥺🥺🥺