Home প্রিয় মোনালিসা প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৩৪

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৩৪

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৩৪
নীতি জাহিদ

সারাদিন প্ল্যান থাকলেও ইশানের মন খারাপ দেখে কেউ আজ বের হয়নি। ইমরান নিজের কাজ শেষ করে সন্ধ্যায় সবাইকে নিয়ে বের হবে জানালো। ইশান জানালো সে দূরে যেতে চায় রবিনের সাথে। ইমরান ছেলের মতিগতি দেখে আর বাঁধা দেয় নি। রবিনের সাথেই পাঠিয়ে দিয়েছে। সাথে প্রটোকল তো ছিলোই। মোনা রুমে রেডি হচ্ছে। ইমরান তৈরি হয়ে বাইরে বীচের সামনে দাঁড়িয়ে ঢেউয়ের আনাগোনা দেখছে।
মোনা শাড়ি পরেছে। হঠাৎ মনে হলো শাড়ি পরবে। বিয়ের পর ইমরানের গিফট করা সফট জর্জেটের ফ্লোরাল শাড়ি পরেছে। ফুল স্লিভের ব্লাউজ এবং গায়ে হাতের কাজের পাতলা চাদর জড়ালো। মোনা প্রস্তুত হয়ে রুম কি দিয়ে লক করে হাতে পার্স নিয়ে বের হলো। মাঝ পথে একজন ওয়েটার মোনার দিকে এগিয়ে এসে একটা ফুল এবং চিঠি দিলো। ইমরান দিয়েছে জানিয়েছে।

চিঠি হাতে নিতেই কড়া ফুলের গন্ধ। মনে হচ্ছে তাজা ফুলের জলে ডুবানো হয়েছে এই চিঠি। চিঠির উপর যে খাম তা বাদামী কাগজে তৈরি। মোমের প্রলেপে সিলগালা করা। মোনা আলতো হাতে প্রলেপটুকু তুলে চিঠি বের করলো। হালকা বাদামী রঙা কাগজের চিঠি। লাল ফিতায় মোড়ানো। চিঠির সাথে আরেকটা কাগজ, মোটা অংকের একটা টাকার চেক। মনে পড়ার সাথে সাথে মোনা চমকে উঠলো। এই টাকা তো সেই টাকা, মোহরানার ধার্যকৃত টাকা। কেনো শোধ করলো? টাকা তো দুটো কারণে শোধ করার কথা। নতুন সম্পর্ককে মজবুত করতে, শরীয়তের নির্দেশ নতুবা ভাঙনে। ভাঙবে কেনো? আর এটা তো ঢাকা গিয়েও দিতে পারতো এখানে কেনো?
চিঠিটা দ্রুত খুলতেই মনে হলো এই পারফিউমের ঘ্রান মোনার পরিচিত। ডানহিল আইকনের। ফুল এবং পারফিউম দুইয়ের সমন্বয়ে মনে হয় যেন চারপাশটা একটা উদ্যান। কি রাজকীয় সাজে সাজানো চিঠি! সব মনোযোগ সরিয়ে চিঠিতে মনোনিবেশ করলো যা এখন গুরুত্বপূর্ণ। বিড়বিড়িয়ে পড়তে লাগলো চিঠির প্রতিটি বাক্য,
প্রিয় মোনালিসা,

একটি অসাধারণ সন্ধ্যার শুভেচ্ছা। বসন্তের সন্ধ্যা গুলো হয়তো খুব সুন্দর হয়, তবে এটিই আমার জীবনে প্রথম বসন্ত যে বসন্তে আমি কারো জন্য চিঠি লিখতে বসেছি। পূর্বে চিঠি টুকটাক লিখা হত। তবে চিঠি লিখে প্রেম নিবেদনের রেকর্ড আমার নেই। চিঠি লেখা হয়নি বহু বছর। পত্রের শুরুতে কি লিখে বা সম্ভাষনের সূচনা ভুলে গিয়েছি। তবুও বলছি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। কি যে এলোমেলো লিখছি জানিনা। চিঠির সাথে আপনার পাওনা টুকু মিটিয়ে দিলাম। সরাসরি দিতে অসংকোচ বোধ হত। এর যথেষ্ট কারণ ও আছে। বিয়ের পর থেকেই সুস্থ মুহুর্ত আমাদের খুব কম। তাই নিভৃতে নিরবে আপনার প্রাপ্যতা টুকু বুঝিয়ে দিলাম।
এবং একান্তে সময় কাটাতে এই নিরামিষ প্রেমিক আপনাকে আজ নিজের মতো করে চাচ্ছে। শহরের অসুস্থ পরিবেশ ছেড়ে একটু স্বস্তি পেতে এখানে আসা। সব রকমের বিষন্নতা ছেড়ে তার কাছে একটি সুস্থ মন নিয়ে আসার অনুরোধ। হয়তো সে আপনার মতো গুছিয়ে আনন্দ নিয়ে কথা বলতে পারেনা। তবে এতটাও নীরস নয় যে আপনার প্রতি অনুভূতি ব্যক্ত করতে দ্বিধা বোধ করবে। নিবিড়,গম্ভীর, স্বল্পভাষী মানুষটার এলোমেলো মনের অব্যক্ত বাক্য সাজিয়ে নেয়ার একান্ত উপরোধ। ছোট্ট পদযুগল ফেলে যদি অধমের নিকট হাজির হতেন তবে বড়ই কৃতজ্ঞ বোধ করতো। অধীরতা নিয়ে অপেক্ষারত তৃষ্ণার্ত মানবের এই অনুরোধ কি রাখা যায়?

ইতি,
অপ্রিয় ইমরান সাহেব
গুটি পায়ে মোনা রিসোর্টের বাইরে এসে ইমরানকে ফোন দিলো। ইমরান একটু সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ওই পাশটা বেশ সাজানো। ফেইরী লাইট গুলো জ্বলজ্বল করছে। নারকেল গাছটাতে মোড়ানো টুকরো আলোর বাতিগুলো। মৃদুমন্দ হাওয়া।
ফোনে কথা বলতে বলতে কাছে আসার ইশারা দিলো। মোনা এক পা এক পা করে এগিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ মনে অন্যরকম শিহরণ। মনে হচ্ছে ইমরান পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবে তো। খুশিতে চোখ ভরা জল চিকচিক করছে। হাত পা চলছে না। ইমরানের পেছনে এসে দাঁড়ায়।
ইমরান পেছন ফিরে মোনাকে দেখে চমকে উঠলো। ফ্লোরাল শাড়িতে সমুদ্রকন্যা লাগছে। লাল,নীল হলুদ সব ফুল। চুল গুলো এক পাশে বেঁধে ছেড়ে দিয়েছে। ঠোঁটের লিপ গ্লস চিকচিক করছে। কিন্তু চোখের কোনে জল কেনো? একটু খানি জল গড়ালেই সুন্দর আঁখি থেকে কাজল গুলো গলে পড়বে। হাত ধরে কাছে টানতেই মনে হলো মেয়েটা বরফ শীতল হয়ে জমে গিয়েছে। ঠান্ডা লাগছে নাকি। রিসোর্টের সামনে নৌকার মত করে সিটিং এরিয়া করা আছে। সাজানো হয়েছে সিটিং এরিয়া টুকু কাঁচা ফুলে। এখানে বসলে সমুদ্রের পানি একেবারে পায়ে এসে লাগে। মোনাকে পাশে বসিয়ে কিছু বলতেই মেয়েটা চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। হাতে গোলাপ এবং একটি চিঠি। গোলাপটা মোনার কানে গুঁজে চিঠিটা হাতে নিতেই মোনার কম্পিত গলায় বলে,

– চিঠি…
মোনার ঠোঁটে আঙুল দিয়ে ইমরান বললো,
– শুষ…. কথা নয়।
চিঠিটা দেখে ইমরান খানিকটা হেসে মোনার পার্সে ঢুকিয়ে সহধর্মিণীকে একেবারে কাছে টেনে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো। কালো লেদারের জ্যাকেটের উমে মোনা লেপ্টে আছে বুকের বাঁ পাশে। মেয়েটা কাঁপছে। বলীয়ান কন্ঠে আবৃতি করলো,
– তোমারেই যেন ভালোবাসিয়াছি
শত রূপে শত বার,
জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার।
চিরকাল ধরে মুগ্ধ হৃদয়
গাঁথিয়াছে গীতহার-
কত রূপ ধ’রে পরেছ গলায়,
নিয়েছ সে উপহার
জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার।
মোনার দিকে তাকালো। পুরোপুরি স্তব্ধ মেয়েটা। বাক হারিয়েছে। ইমরান সাহেব কবিতা বলেছে তাও আবার রবী ঠাকুরের অনন্ত প্রেম?

– কবিতাটা ভালো না? অনেক আগে আবৃতি করতাম আজ মনে হলো একটু করি।
মোনা জোরেই কেঁদে দিলো। ইমরান মোনাকে বুকে নিয়ে বললো,
– কাঁদবে না। যে কটা দিন এখানে আছো আনন্দে কাটাও। ফিরলে তো আবার ব্যস্ততা শুরু।
হঠাৎ তৃতীয় পক্ষের স্বর শুনে ইমরান মোনা চমকে উঠলো। লজ্জা পেয়ে মাথা উঠালো।
– আসসালামু আলাইকুম ভাবী সাহেবা।
ইমরান বহু বছরের পুরোনো বন্ধুকে দেখে কিছুটা অপ্রস্তুত হলেও জড়িয়ে ধরলো। জহির হেসে বলে উঠলো,
– স্যরি, ভাবীসাহেবা। একান্তে মুহুর্তে বাগড়া দিলাম তাই। দোষটা আপনার বরের।
ইমরানকে উদ্দেশ্য করে বললো,
– ব্যাটা নিজ থেকে তো যোগাযোগ রাখবিনা। আমি রাখতে চাইলেও কথা বলিস না। একটু আগেই এসেছি। তুই এখানে আছিস জেনে সব ফেলে রয়াকে নিয়ে ছুটে এসেছি। তোর রিসোর্টটা গেট টুগেদার এর জন্য আমি সিলেক্ট করেছি। লন্ডন থেকে ফিরে তোর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেছি। নয়নকে জানিয়েছিলাম তুই নাকি বলেছিস কারো সাথে যোগাযোগ করবিনা। এখনো এত রাগ!

মোনার সাথে রয়া আলাপ করছে। ইমরান জহিরকে বসতে বললো। ইমরান চুপচাপ রইলো। কিছুক্ষণ পর বললো,
– তোরা এসেছিস আমি খুব খুশী হয়েছি তবে অহেতুক আলোচনা ভালো লাগেনা। সকালে হাসিবের ওয়াইফের সাথে একটু মন কষাকষি হলো মোনালিসার। আমি জানি এসব ব্যাপার ঘটবে। বন্ধু হলেই হয়না জানিস তো বন্ধুত্বটাও রাখতে হয়। বুয়েটের দিনগুলো যখন মনে পড়ে তখন আর কাউকে মনে রাখতে ইচ্ছে হয়না। তাই ইচ্ছে করে কারো সাথে যোগাযোগ করিনি। তুই লন্ডন চলে গেলি, আমি একা হয়ে গেলাম ক্যাম্পাসে। তৌসিফ ও চলে গেলো অস্ট্রেলিয়াতে। আমার ছেলেটাকে নিয়ে একা কিভাবে সারভাইভ করেছি একবার ভেবে দেখ? হাসাহাসি করতো ওরা। আমার রেজাল্ট নিয়ে কটুক্তি করতো। রিটেক তো নিতেই হতো। রিটেক নিয়ে কথা বলতো। বন্ধু পরিচয় দিতে ওদের তখন লজ্জা লাগতো। যখন ঘুরে দাড়ালাম তখন ওদের মাইন্ড চেঞ্জ হলো। বন্ধু হিসেবে পরিচয় দিলো। তখন আমার রুচিতে বাঁধলো। সবাই বলে আমি গোমড়ামুখো, কাটখোট্টা, রাগী,বদমেজাজি হয়েছি। ভালো আচরণ কি করিনি আমি? তুই তো সাক্ষী ছিলি?
জহির হেসে মোনার দিকে তাকিয়ে বলে,

– ভাবী আগে নাহয় এমন ছিলো, এখন কি পরিবর্তন হয়েছে?
মোনা দু পাশে মাথা নাড়লো। জহির বললো,
– দেখছিস। কষ্ট গুলো মনে রেখেছিস। এখানে আসার আগে তোর উপর রিসার্চ করে এসেছি ব্যাটা। নয়নের সাথে যোগাযোগ ছিলো। ভেতরেও সব শুনেছি সকালের কান্ড। একটা সিক্রেট বলি। যদিও কূটনামি হবে। হাসিবের বউয়ের মাথায় সমস্যা। কারো সুখ সহ্য হয়না। আর হাসিবের সমস্যা বউরে বকে ধমকে সোজা করতে যায়। বুঝেনা লেবু বেশি চিপলে তিতা হবে। এইজন্যই এরা এমন। বাদ দে এদের একেকজনের একেক সমস্যা। কিন্তু তোর সমস্যা কোথায়?
– আমার কি সমস্যা?
জহির, রয়া আর মোনাকে বললো,
– শোনেন জীবনে বাটার মাখানো ভদ্র ছেলে দেখছেন কখনো ভাবী? রয়া দেখছো?
রয়া হেসে বলে,

– এটা কেমন কথা?
– জ্বি আমাদের ইমরান এমন ছিলো। বাটার মাখানো ভদ্র ছেলে। দেখতে কালা মানিক শান্ত শিষ্ট কিন্তু এই কালা মানিকের পিছনেই মেয়েরা ঘুরতো। কালা মানিক যে কি সুন্দর বাটার মাখতো। প্রেজেন্টেশন এর সময় কেউ শাড়ি পড়লে কালা মানিক বলতো,
– দোস্ত শাড়ি টা কি বানানোর সময় তুই ছিলি? মানে যে বানিয়েছে তোকে ভেবেই বানিয়েছে। এত সোবার কালার।
মোনা হাঁ করে ইমরানের দিকে তাকালো। ইমরানের জহিরের পিঠের উপর ধুম করে একটা দিয়ে বললো,
– বেয়াদপ। তুই কি আমার সংসার ভাঙবি? কখন কি বলেছি? আমি উদ্দেশ্য ছাড়া বলিনা।
মোনা ইমরানের দিকে তাকিয়ে বললো,
– কি উদ্দেশ্যে বাটার মেখেছেন?
– কত কি কারণে কত কি বলেছি কতজনকে? মনে আছে নাকি?
– এতজনকে বলেছেন? আমি আপনাকে ভদ্র ভেবেছিলাম।
জহির হাসতে হাসতে বলে,

– ভাবী ভদ্র তো। এসব ফ্লার্ট করে শেষ লাইনটা শোনেন কিভাবে বলতো, শাড়ির লাইনের শেষে বলতো আমার মায়ের মতো লাগছে একেবারে।
আরেকটা শোনেন, রাজিয়া আমাদের ক্লাসের সবচেয়ে সুন্দরী, আউটস্ট্যান্ডিং মেয়ে ছিলো। ওর নোট ইমরানের দরকার। ইমরান গিয়ে বলে, রাজিয়া তোমার হাতের লিখা খুবই সুন্দর। অনেক গুছিয়ে লিখো। ক্লাস ওয়ার্কের খাতাই এত সুন্দর না জানি নোট কত সুন্দর হবে। যিনি তোমাকে লিখা শিখিয়েছেন তিনি ধন্য তোমার জন্য। রাজিয়া যেই না নোট খাতা দিত। এক সপ্তাহ পর খাতা ফেরত দেয়ার সময় তো ওই বেচারী আরো কিছু কমপ্লিমেন্ট আশা করতো তখন এই ভদ্র ছেলে বলতো, জানো রাজিয়া আমার বড় বোন তোমার লিখা দেখে বলেছে আপা যদি তোমাকে কাছে পেত তোমাকে বোন বানাতো। অন্তত তুমি বোন হয়ে ভাইয়ের মানে আমার হাতের লিখা গুলো সুন্দর করে শিখিয়ে দিতে। বিশ্বাস করবেন না ভাবী রাজিয়ার চেহারা দেখার মতো ছিলো।
ইমরান মুখটা বেজার করে রেখেছে। এদিকে রয়া জহির হাসতে হাসতে লুটোপুটি খাচ্ছে। মোনা মুখ চেপে রেখেছে হাসি আটকাতে না পেরে। ইমরান ধমকে বলে,

– চুপ কর ব্যাটা স্বার্থ আদায়ের জন্য করা লাগে। রাজিয়া কি দিত নাকি খাতা! স্যারের সাথে ভাব জমিয়ে সব নোট করতো। কেউ চাইলে তো হিংসা করতো তাই তো আমি ট্রিক্স খাটাতাম। কিন্তু আমি অসভ্য ছিলাম না।
– না খুবই সভ্য ছিলি আমি মানছি। তবে সেই সাথে ভীষণ রোমান্টিক। অবশ্য তা ভাবী ভালো জানবে।
মোনা হেসে বলে,
– ভাই আমি কিছুই জানিনা। উনি আমার মতে একটা নিরামিষ। ঠিকভাবে দুটো ভালো কথা বলতে উনার জিভে আটকে।
জহির ইমরানের দিকে তাকিয়ে টেনে বললো,
– ইমরান তুমি নি রা মি ষ….
ইমরান চোখ রাঙালো। জহির ভদ্র ছেলের মতো চুপ হয়ে গেলো। ইশান দূর থেকে ছুটে এলো। মায়ের গলা জড়িয়ে ধরলো। সামনে বসে থাকা লোকদের সালাম দিতেই বাবা পরিচয় করিয়ে দিলেন। মায়ের কাছ থেকে রুম কিই নিয়ে চলে গেলো। বেশ রাত অবধি আজ সবাই জাগবে। রিসোর্টে বুয়েটের ব্যাচ বারবিকিউ করছে।
আলোচনার এক পর্যায়ে জহির জানালো,

– ইমরান অনন্যা জয়েন করেছে ইউনাইটেড ইউনিভার্সিটিতে।
– ভালো তো।
– এখন গাড়িতে। কাছাকাছি চলে এসেছে।
– আসবে নাকি?
– প্রথমে কিছুতেই রাজি হয়নি। পরে হাসিব ফোন দিয়ে বললো তুই ও আছিস এখন আসছে।
– আসুক অনেক দিন তো দেখা হয় না, কথা হয়না।
ইমরানের ফোন বেজে উঠলো। ফোন রিসিভ করতেই ও পাশ থেকে সালাম জানালো,
– আসসালামু আলাইকুম আংকেল।
– ওয়ালাইকুমুস সালাম।
– আংকেল মোনাশা আছে? আমি ওর ভার্সিটির সিনিয়র জুয়েল।
ভালো মুডটা ধপ করে জ্বলে উঠলো। মোনার দিকে তাকালো। মোনা তখন রয়ার সাথে গল্পে মত্ত। ইমরান তৌসিফের সামনে রেগে কিছু বলতে পারছেনা। স্বাভাবিক গলায় বললো,
– আছে।
– ওকে কি দেয়া যাবে? একটু প্রয়োজন ছিলো।
মোনাকে একটু ভারি আওয়াজে ডাক দিয়ে ইমরান ফোন ধরিয়ে উঠে দাঁড়ায়। মোনা ফোন কানে দিয়েই বুঝতে পারে সেই ছেলে। একটু দূরে গিয়ে কথা শেষ করে ইমরানের কাছে ফোন ফিরয়ে দেয়। ইমরান তৌসিফের সাথে আলোচনায় ব্যস্ত থাকলে মন পড়ে ছিলো মোনার আলাপে। মুখ টিপে হাসছে মোনা।
তৌসিফ এবং রয়া কটেজে ফিরে যেতেই মোনার হাত চেপে ধরে বললো,

– কি কথা হয়েছে?
– আপনাকে কেনো বলবো?
– আমি আংকেল?
– সে কি আর জানে আপনি কে?
– বলোনি কেনো?
– আপনিও তো সহজে বলেন না।
– আমাকে রাগাবেনা।
– রাগার কিছু নেই। একটা সুখবর দিলো?
– কি সুখবর?
– উনার জব হয়েছে।
– তোহ?
– বাসায় প্রপোজাল দিতে চাইছে। বাবাকে বলবে বলছে আমাকে বিয়ে করার কথা…
ইমরান মোনার হাত ছেড়ে দিয়ে মোনাকে ফেলে সামনে পথ ধরলো। আচমকা ইমরানের এমন কাজে মোনা হতবাক। মোনা পিছন থেকে ডাকলো ইমরান কোনো কথা না বলে নিজের মত হাঁটছে। মোনার এই প্রথম মনে হলো ইমরান বাচ্চা প্রেমিকের মত জেদ করছে। শাড়ির কুচি খানিকটা তুলে পিছু ছুটলো। পেছন থেকে ডাকছে ইমরান শুনছেই না। ছুটে গিয়ে ইমরানের হাত ধরে বললো,

– আশ্চর্য এখানে রাগ করার কি আছে? রিমি, কাঁকন আপনার ক্যাম্পাসের ফ্রেন্ডরা,শুধু কি চারদিকে সব আপনাকে পছন্দ করে এমন মানুষ থাকবে? আমি কি এত টাই অসুন্দর যে আমাকে পছন্দ করতে পারে না কেউ?
ইমরান নিজের হাতের বাহু থেকে মোনার হাত সরিয়ে কথা না বলে পুনরায় নিজের মত হাঁটছে। এক পর্যায়ে মোনা চেঁচিয়ে বললো,
– আরেক পা এগুলে আমি ঝাঁপ দিব সমুদ্রে।
পা চালানো থেমে গেলো। চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। মোনা ইমরানের দু কাঁধ ধরে নিজের দিকে ফিরিয়ে বলল,
– এখানে এমন রাগ করার কি হলো? মানুষের পছন্দ হতে পারে না? গত চার বছর দূরে ছিলেন। এর মধ্যে তো ওই ছেলের সাথে সম্পর্কে জড়ালে আপনি আমার অতীত হয়ে যেতেন। এখন এত প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন কেনো?
ইমরান মুখ ফিরিয়ে নিলো। মোনা থুতনি ধরে বললো,

– আপনাকে এখন কেমন লাগছে জানেন? পুরা নব্য অনুভূতি জাগা প্রেমিকের মত ।
– বেশি করছোনা? কথা বলতে ভালো লাগছেনা। আমি রুমে যাবো।
– যেয়ে কি করবেন?
– মাথা ধরেছে। শুয়ে থাকবো।
– আমি কি করবো?
– যা ইচ্ছে করো।
মোনা ধপ করে বালুতে বসে পড়লো। ইমরানের দিকে তাকিয়ে বললো,
– আপনি যান। আমি পরে আসবো।
– এত রাতে এখানে থাকা ঠিক হবেনা। এছাড়া সমুদ্র কিছুক্ষনের মাঝেই উত্তাল হবে। পানি বাড়ছে।
– ভাসিয়ে নিক আমাকে।
– থাপ্পড় দিব।
– দিন।
– জেদ না করে চলো।
– জেদ আমি করছিনা আপনি করছেন। অবান্তর বিষয় নিয়ে রাগ করে আমার মুড খারাপ করছেন।
মোনার হাত ধরে টেনে একটানে উঠিয়ে নরম দু বাহু চেপে ধরে দাঁত খিঁচে বললো,

– আমার সহ্য হচ্ছেনা ওই ছেলেকে। ও তোমাকে ঠিক কিভাবে কল্পনা করলে তোমার প্রেমে পড়ে?
– আপনি যে আরেকজনের স্বামী ছিলেন। ঠিক কতটা অন্তরঙ্গ হলে আপনাদের সন্তান হয়। যদি ও জানি সন্তান হওয়াটা সম্পূর্ণ বৈধ ছিলো। আপনাকে যে আপনার প্রাক্তন আমার সামনে জড়িয়ে ধরে।আপনাকে পছন্দ করে যে রিমি আমার সামনে প্রকাশ করেছে, তার বেলায়?
মোনার হাত ছেড়ে দিলো ইমরান। নিজের ভেতরটা কেঁপে উঠেছে। বিব্রতবোধ করলো ইমরান। দুজনই নিরব,নিস্তব্ধ। কথা আটকে গিয়েছে। নিজের অজান্তে মোনার দু চোখে অশ্রু। আড়াল করার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। দুজনের মনের অবস্থা করুন। ইমরানের মনে হলো, মোনার সামান্য ব্যাপার তার সহ্য হচ্ছেনা, তবে মোনা এতটা দিন কিভাবে কাঁকনকে সহ্য করে আসছে। নাহ! ইমরান নিজেকে যতটা ভারী খোলসে আবদ্ধ করুক না কেনো, প্রকৃতপক্ষে ইমরান একেবারে ভঙ্গুর। সেই তুলনায় মোনা অনেক শক্ত মনের অধিকারী। ইমরান গলা ঝেঁড়ে বললো,

– চলো, ঠান্ডা এখানে।
মোনা কথা না বাড়িয়ে পা ফেললো সামনে। অকস্মাৎ হাতে ঝাঁকুনিসহ টান অনুভব করলো মোনা। শক্তপোক্ত ইমরানের বুকে বাড়ি খেলো। মোনার মাথা বুকে চেপে ধরে ইমরান অনুভূতি ব্যক্ত করলো,
– স্যরি, কি করবো হঠাৎ সহ্য হয়নি। আমি কি জানতাম, আমি এত দূর্বল। এতটুকু ও সহ্য করতে পারিনা।
মোনা হেসে দিলো। হেসে বললো,
– কি কি জানতেন আপনি?
– লজ্জা দিবেনা।
মোনা হেসে মাথা কাত করে বললো,
– আচ্ছা। তবে যতটা প্রকাশ করছেন আপনি বোকাসোকা, মোটেও তা নন। মনে হচ্ছে সেই সিনিয়রের ঠিকুজি গুষ্টি উদ্ধার করতে ইতিমধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছেন।

– আমার অনেক কাজ। এসবে আমার আগ্রহ নেই।
– চার বছর আগে না হওয়া প্রেমিকার জন্য বিয়ে বাড়ির ওই ছেলের কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছেন আর এখন আপনি নাকি বউয়ের ক্ষেত্রে চুপ থাকবেন এটাও বিশ্বাসযোগ্য?
– চুপ থাকো। আজে বাজে কথা যত্তসব। আমি কেন কারো মুখের কথা বন্ধ করবো?
– ইশ সব জানি আমি।
– ভুল জানো।

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৩৩

মোনা নিশ্চিত জানে ইমরান বসে থাকার পাত্র নয়। তৌসিফ তখন থেকে ফোন দিয়ে যাচ্ছে। মোনাকে নিয়ে রিসোর্টের দিকে রওয়ানা হলো। পুনরায় শান্ত হলো ইমরান। মোনার হাত শক্ত করে ধরে আছে যেন ছেড়ে দিলেই মোনা পালিয়ে যাবে। মোনার মিটমিট হাসি যেন সরছেই না মুখ থেকে। ইমরান যে এমন জেদী মোনার অজানা ছিলো না। তবে পাগলামো রূপ টা নতুন, আজ ইমরানের আরেকটা রূপ দেখলো।

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৩৫