Home প্রেমসন্ধিক্ষন প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ১১

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ১১

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ১১
সাইদা মুন

–তাহসান তুই এতো রাতে এখানে?
তালহার কথায় মেহরীন এবার তার থেকে চোখ সরিয়ে পাশে থাকা তাহসানের দিকে তাকাল। তাহসান মেহরীনের দৃষ্টি টের পেয়ে হালকা হেসে উত্তর দিল,
–ফুফু বলছিল এখানে থেকেই ব্যবসা সামলাতে, তাই চলে এলাম।
তালহার কণ্ঠ কিছুটা ভারী হয়ে উঠল,
–এতদিন তো আসিসনি, এখন হঠাৎ?
–ওই রান্নাবান্নার ঝামেলা হয়, একা মানুষ…
–তোর বাসায় তো বোয়া আছে।
তাহসান এবার চোখ ছোট করে বলল,
–এ বাসায় থাকলে তোর প্রবলেম নাকি?
তালহা কিছু বলার আগেই তিতলি বেগম এগিয়ে এসে বললেন,

–আরে কী হয়েছে কী? তাহসানকে আমিই বলেছি চলে আসতে। বোয়ার রান্না নাকি তেমন জমে না, ঠিকমতো হয় না। ছেলেটা খেতে পারে না ভালো করে। যা তো বাবা, ফ্রেশ হয়ে আয়। আর তুইও তো মাত্রই এলি, ফ্রেশ হয়ে আয়। দুজনের জন্য খাবার বাড়ছি।
তালহা আর কথা না বাড়িয়ে মেহরীনকে পাশ কাটিয়ে সোজা রুমে চলে গেল। তাহসানও চলে গেল গেস্টরুমে। মেহরীন ভোতা মুখে দাঁড়িয়ে রইল। তালহা কি আনেনি ওড়না? হ্যা না কিছুই তো বলল না। চুপচাপ সেও রুমে চলে গেল। কিন্তু ভেতরে ভেতরে খচখচ করছে, মনে হচ্ছে সরাসরি গিয়ে তালহাকে জিজ্ঞেস করবে। কত আশা নিয়ে বসে ছিল সে! এভাবে কি তার আশা ভেঙে যাবে? তা তো হতে পারে না। তাই সিদ্ধান্ত নিল, যাবে তালহার রুমে।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বসে রইল। গুনে গুনে এক ঘণ্টা পর বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। এতক্ষণে নিশ্চয় খাবার শেষ, তালহাও রুমে ফিরে এসেছে। এদিকে তাহিয়া মুখে ফেইস প্যাক লাগিয়ে নিশ্চিন্তে বসে আছে। মেহরীনকে বের হতে দেখে বলল,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

–কিরে, আবার কই যাস? এদিকে আয়, মুখে এটা লাগা।
মেহরীন নাক তুলে বলল,
–আমার এসবের দরকার নেই, নিজেই মাখ, বেশি করে। আমি আজেবাজে জিনিস মুখে দিই না।
তাহিয়া মুখটা মোড়া মেরে বলল,
–হাহ! ভালোর জন্যই বলছিলাম। একটু স্কিন কেয়ার করলে তোকে আরও সুন্দর দেখাবে। তখন ছেলেরাও তাকাবে।
ছেলেদের কথা শুনতেই মেহরীন দ্রুত পায়ে তাহিয়ার সামনে গিয়ে বলল,
–তোর ভাইও তাকাবে?
তাহিয়া চোখ থেকে শসার টুকরো সরিয়ে পিনপিনে চোখে তাকাল,

–তোর কি আমার ভাইকে মেয়ে মনে হয়?
মেহরীন চমকে উঠে দু’গালে হালকা চাপড় মেরে বলল,
–তওবা, তওবা, নাউজুবিল্লাহ! কীসব বলিস, মেয়ে মনে হতে যাবে কেন?
–তো আবার জিগাচ্ছিস কেন?
মেহরীন মুখটা চুপসে পাশ ঘেঁষে বসল তাহিয়ার। তা দেখে তাহিয়া ভান করে বলল,
–কী ব্যাপার? এত ঘেঁষাঘেঁষি কিসের? আমাকে আবার গে ভেবেছিস নাকি? আমি কিন্তু ওরকম না, সর সর।
–আরে না, মানে বলছিলাম, আমাকেও একটু লাগিয়ে দে..
তাহিয়া মনে মনে হেসে উঠল। তবু উপরে উপরে গম্ভীর মুখে বলল,

–কেন? তুই না আজেবাজে জিনিস মাখিস না? যা সর, কী কাজে যাচ্ছিলি যা।
এবার মেহরীন তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ইনোসেন্ট মুখ করে বলল,
–আরে এমনি ঢং করছিলাম, দে না দে…
তাহিয়া এবার হেসে ফেলল। বাটি থেকে নিজের বানানো ফেইসপ্যাক তুলে মেহরীনের মুখে মাখাতে লাগল,
–আমার ভাইটাকে পটানোর পুরোদমে প্রস্তুতি চলছে হু…
–লাভ নাই, পটাতে পারব না মনে হয়। তোর ভাইটা নিরামিষ। তোর কথামতো যত্ন করার চেষ্টা করি, তাও তো আমার দিকে ফিরেও তাকায় না।
–এত অধৈর্য হলে চলে? আমার ভাই কিন্তু যেই-সেই না। একটু সময় লাগবেই। হ্যাঁ, গম্ভীর ঠিকই, তবে মনের দিক দিয়ে খুব ভালো।
কথার মাঝেই ফেইসপ্যাক লাগিয়ে দিল সে। মেহরীন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে রাত প্রায় ১১টা। তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে গিয়ে কফি বানিয়ে তালহার রুমের দিকে ছুটল। দু’বার টোকা দিতেই ভেতর থেকে সেই পরিচিত গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল,

–কাম।
এই এক শব্দ যেন প্রতিদিনের শোনার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। একদিন না শুনলে মন অস্থির হয়ে যায়। যেমন, দুইদিন আগে অনেক রাতে ফিরেছিল তালহা অফিসিয়াল কাজে আটকে। খেয়েই ঘুমিয়ে গিয়েছিল, তাই যেতে পারেনি মেহরীন তার রুমে। সেজন্য সারারাত ছটফট করে শেষে ভোরে গিয়ে চোখ লেগেছিল মেয়েটার।
মুচকি হেসে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই সে দেখল, আগের মতোই ল্যাপটপ হাতে তালহা বসে আছে। এগিয়ে গিয়ে কফির কাপটা বাড়াতে গিয়ে, চোখ আটকে গেল তালহার মুখে। চারপাশ যেন থমকে গেছে তার। তালহার চোখে মোটা খয়েরি ফ্রেমের চশমা, চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কপালে ঝুলছে, মাঝে মাঝে চিকন ঠোঁটজোড়া কামড়ে মনোযোগ দিয়ে কিছু করছে। মেহরীন যেন আগের তুলনায় আরও গভীরভাবে ক্রাশ খেল। অবাধ্য মনে নানা অনুভূতিরা আবারও ঝেকে বসলো। ইচ্ছে করছে এভাবে তাকিয়েই কয়েক যুগ কাটিয়ে দিতে।
এদিকে কফি ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, তালহার মধ্যে এতোটাই ডুবে আছে যে সে ডাকতেও ভুলে গেছে। কেবল তাকিয়েই আছে তালহার দিকে। বেশ কিছুক্ষণ কোনো সারাশব্দ না শুনে তালহা মাথা তুলে তাকাল। মেহরীনের দৃষ্টি পেয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,

–কী ব্যাপার, এভাবে দাঁড়িয়ে আছ কেন?
তালহার কথায় মেহরীনের হুশ ফিরল। দ্রুত চোখ সরিয়ে কফি এগিয়ে দেয়। তালহা একবার তাকিয়ে কফি হাতে নিয়ে বলল,
–থ্যাংক ইউ, এটার দরকার ছিল খুব।
বলে চুমুক দিতে যাবে, অমনি যেন কিছু মনে করে মাথা তুলে তাকাল আবার। অবাক চোখে বলল,
–এসব কী মাখিয়েছ মুখে?
মেহরীন নিচের ঠোঁট কামড়ে বলল,
–ফ…ফেইসপ্যাক।
তালহা যেন কিছুটা বিরক্ত হলো,

–এসব মুখে লাগিয়ে মুখটা নষ্ট কোরো না হুদাই। আল্লাহ যা দিয়েছে, তাতেই তুমি মাশাল্লাহ সুন্দর দেখতে। তাহিয়াকে বলেও বুঝাতে পারি না। যেদিন সাইড ইফেক্ট হবে, সেদিন বুঝবে বেয়াদবটা।
তালহা জ্ঞান ঝাড়তে লাগল, কিন্তু মেহরীন আটকে রইল প্রথম দু’লাইনে। তালহা তাকে সুন্দর বলেছে। তার প্রশংসা করেছে। অবাক হয়ে তার কানে আর কোনো শব্দ ঢুকল না, কেবল বাজতে থাকল সেই বাক্যটা “তুমি মাশাল্লাহ সুন্দর দেখতে।”
তবে ধ্যান ভাঙল তালহার হাতের নড়াচড়ায়। একটা শপিং ব্যাগ এগিয়ে দিল সে মেহরীনের হাতে।

–তোমার ওড়না..
মেহরীন ব্যাগ হাতে নিতেই চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। এই তো সারাদিনের প্রতীক্ষা। তালহার দেওয়া প্রথম উপহার। যদিও বা নিজেই খুজে নিয়েছে, তবে তার দেওয়া প্রথম জিনিস তো। আগ্রহ নিয়ে খুলে দেখল ভেতরে অনেকগুলো হিজাব। একেকটা একেক রঙের। অবাক হয়ে তাকাল তালহার দিকে,
–এতগুলো কার জন্য?
–তোমার।
–কিন্তু আমার তো এত দরকার ছিল না। হুদাই টাকা নষ্ট করলেন।
–একটা করে আনতে কেমন লাগে, তাই পুরো সেট এনেছি। আর এটা নাও।
বলেই আরেকটা ব্যাগ এগিয়ে দিল। মেহরীন সেটাও নিল। তার ভেতরে অনেকগুলো চকোলেট। আরও অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,

–চকোলেট কেন?
তালহা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গলা ঝাড়ল,
–তাহিয়া বলেছিল আনতে।
মেহরীন খুশি মনে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল,
–ওহ, আচ্ছা। তাকে দিয়ে দিবোনে।
তাকে চলে যেতে দেখে তালহা হঠাৎ ডেকে উঠল,
–শোনো..
মেহরীন ঘুরে তাকাতেই তালহা মিনমিনে গলায় বলল,
–দ..দুজনের জন্যই এনেছি। তুমিও খেয়ো।
মেহরীন শুধু “আচ্ছা” বলে রুমে ফিরে এল। তার খেয়াল সেদিকে নেই। সে কেবল রঙে ভেসে আছে, তালহা তার জন্য নিজে পছন্দ করে এতগুলো হিজাব এনেছে। আনন্দে সে দৌড়ে গিয়ে তাহিয়াকে বসিয়ে একে একে ওড়নাগুলো দেখাতে লাগল। মেহরীনের খুশি দেখে তাহিয়া হাসল। মেয়েটাকে এমন হাসিখুশি দেখতে তার ভীষণ ভালো লাগে। রক্তের কেউ না, অথচ বড্ড আপন লাগে।

– হয়েছে হয়েছে, আমি দেখেছি ভাই। এবার যা, মুখটা ধুয়ে আয়। ঘুমাতে হবে। সকালে যে কলেজ আছে, খেয়াল আছে তো?
মেহরীন খিলখিল করে হেসে উঠল। তাহিয়া একদম মায়ের মতো শাসন করে, অথচ বয়স তো প্রায় সমান। ওড়নাগুলো রেখে ওয়াশরুমে গেল। ফ্রেশ হয়ে বেরোতেই দেখে তাহিয়া সন্দিগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে। এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,
–কী হলো, এভাবে তাকাচ্ছিস কেন?
–সত্যি করে বল, তোর আর ভাইয়ার মধ্যে কিছু চলছে নাকি?
–আরে না, কেন?
–তো ভাইয়া তোকে এতগুলো চকোলেট দিল কেন? আমি চাইলে তো দেয় না, বলে দাঁতে পোকা হবে।
মেহরীন চমকে জিজ্ঞেস করল,

–তুই বলিসনি আনতে?
–পাগল কুত্তা কামড়াইছে নাকি? ভাইয়াকে চকোলেটের কথা বললেও দেয় না। তাই বলিও না।
মেহরীন ভাবনায় পড়ল। তালহা তো বলেছিল, তাহিয়া বলেছে আনতে।
–কিন্তু তোর ভাই তো বলল…
কথার মাঝেই তিতলি বেগম দু’গ্লাস দুধ হাতে রুমে ঢুকলেন।
–কী ব্যাপার, এখনো শোওনি কেউ? নে, তাড়াতাড়ি গ্লাসটা শেষ করে ঘুমাতে যা দুটো।

তিতলি বেগমের কথায় আর কথা বাড়াল না মেহরীন। চকোলেটের প্রসঙ্গও মাথা থেকে সরিয়ে দিল। দুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ল দুজন। তবে ঘুম কি আর সহজে আসে? প্রায় রাত একটা পর্যন্ত গল্প চলল। প্রথম ক্লাসে কী করবে, কীভাবে থাকবে, এসব নিয়েই উচ্ছ্বাসে ভরা পরিকল্পনা। তাহিয়া শিখাচ্ছিল, দুজন সবসময় একসাথে থাকবে, কেউ কিছু বলতে এলে ডিসুমডিসুম করে প্রতিরোধ করবে। কোনো মেয়ে ফ্রেন্ড বানাবে না, বানালেও ভালোভাবে দেখে নেবে, যাতে তাদের ঝগড়া না বাধায়, অন্য কারো আন্ডারে থাকবে না। এসব নানান প্ল্যানিং করেই রাত কেটে গেল।
পরের দিন সকাল সকাল উঠে রেডি হয়ে নিচে নামল দুজন। বেশ এক্সাইটেড। তালহাও ইতিমধ্যে নেমে এসেছে, তাদের ড্রপ করে দিয়ে যাবে অফিসে। নাশতা শেষে সবাই বেরিয়ে পড়ল। কলেজের সামনে পৌঁছেই তারা নামল। তালহা তাদের দাড়াতে বলে গাড়ি সাইড করতে চলে যায়।

মেহরীন চারিদিকে চোখ বোলাচ্ছে। অবিশ্বাস্য চোখে কলেজের গেট, নামফলক আর আশেপাশ তাকিয়ে দেখতে লাগল। সে এতো ভালো কলেজে পড়বে, এটা কি সত্যি? এতদিন তো ভেবেছিল স্কুল পর্যন্তই শেষ। চাচা-চাচি তাই বলেছিল। শহরে এসে টিকে থাকতে যুদ্ধ করতে হবে ভেবেছিল। অথচ তার যেন সব সহজেই মিলল। সব কি এতোই সহজ স্বপ্নপূরণের প্রথম ধাপে দাঁড়িয়ে সে নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছিল না।
গাড়ি সাইড করে তালহা এগিয়ে এলো। মেহরীনের হাসোজ্জ্বল মুখ সাথে বিস্ময়ভড়া চোখ দেখে পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
–কী ভাবছো?
মেহরীন আনমনে বলল,
–আমি কি স্বপ্ন দেখছি?
তার কথায় তালহা আর তাহিয়া দুজনেই হেসে উঠল,
–না ম্যাম, আপনি বাস্তবেই আছেন।

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ১০

তালহার মুখে ‘ম্যাম’ শুনে মেহরীনের গাল লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। তিনজনেই হাসল। এরপর স্যারের সাথে কথা বলে দুজনকে ক্লাসরুমের দিকে এগিয়ে দিয়ে চলে গেল তালহা।
মেহরীন আর তাহিয়া আনন্দে এগোতে লাগল নতুন মুখভর্তি সেই ক্লাসের দিকে। মাঝের সারিতে সিট পেয়ে বসতেই মেহরীন আশেপাশে তাকায়। হঠাৎ চোখ আটকে গেল দরজার দিকে। কাউকে দেখে সে চমকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। মুখে হালকা ভয়ের ছাপ…

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ১২