প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ২৪
সাইদা মুন
—আপনি আছেন বলেই আমি এতো ভালো থাকি,
আপনি না থাকলে আমি কোনোদিনই ভালো থাকতে পারব না….
তালহা থমকে গেছে, চোখ দুটো ছানাবড়া। মেহরীনের কথা যেন তাকে অপ্রস্তুত করে তুলেছে। মেয়েটার চোখ পানিতে টলমল করছে। অবিশ্বাস্য কণ্ঠে সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করল,
—কি বললে মাত্র?
মেহরীন হঠাৎ ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে। নিজের নিয়ন্ত্রণ হারানো, কিশোরী মনটা আর ধরে রাখতে পারল না। ভেতরের জমাট যন্ত্রণারা হঠাৎ বহিঃপ্রকাশ হতে শুরু করেছে। তালহার ডান বাহু দু’ হাতে ঝাপটে ধরে কপাল ঠেঁকে ধরে সেখানে। আর কাঁদতে কাঁদতেই থরথর কণ্ঠে বলতে লাগে,
—আপনি আমার জীবনের সবচেয়ে সুখময়, সবচেয়ে সুন্দরতম অধ্যায়। এ অধ্যায় আমি সারাজীবন নিজের বুকে জড়িয়ে রাখতে চাই। এ অধ্যায়ের একটা পাতাও হেরফের হলে আমি মরেই যাবো….
বাক্যগুলো শেষ হওয়ার আগেই আবারও ডুকরে কেঁদে উঠে। হাহাকারভরা কান্না, যা দমিয়ে রাখা দায় এখন। তার ছোট্ট শরীরটা কেঁপে কেঁপে উঠছে, শ্বাস যেন আটকে যাচ্ছে প্রতিবার। চোখের পানি নাকের পানি মিলে তালহার শার্টের হাতাটা ভিজিয়ে একাকার করে দিচ্ছে। তালহার সেদিকে খেয়ালই নেই, সে শুধু তাকিয়ে আছে মেহরীনের ভাঙা দেহভঙ্গির দিকে।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
একটা মানুষ ঠিক কতটা অসহায় হলে এভাবে কারো সামনে কান্নায় ভেঙে পড়ে? তার এ কান্নায় কোনোভাবেই অভিনয়ের কাতারে ফেলতে পারছে না। এ ভেঙে পড়াটা সত্যিকারের, গভীর, এবং বেদনামথিত। তবু…তবু সে এখনও হিসাব মিলাতে পারছে না।
তবে কি তার ভাবনা ভুল? তাকে ভুল বুঝানো হয়েছে? নাকি মেহরীনই ডাবল গেম খেলছে? ভাবনাটা মাথায় আসতেই মন সোজাসুজি সেই ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে। মন থেকে মানতে পারল না তা। এইভাবে কাঁপতে থাকা মেয়েটা, এভাবে আঁকড়ে ধরা হাত, এই অসহায় ফুপিয়ে ওঠা, এগুলো অভিনয় হতেই পারে না। তার মন হাজার চেষ্টা করেও সন্দেহটাকে জায়গা দিতে পারছে না।
কিন্তু তাহসানের বিষয়টা কি একদমই ফেলে দেওয়ার মতো? তাহসানকে তো সে আশাই দিয়েছে, তাহলে..? ঠিক এই জায়গাতেই তালহা আটকে যায়। হিসাব-নিকাশের খেলায় যে ছেলেটা সবসময় মুহূর্তেই সমাধান টেনে ফেলত, আজ সে সামান্যতম সমীকরণও মিলাতে হিমশিম খাচ্ছে।
মস্তিষ্ক জানান দিচ্ছে, সন্দেহ পুরোপুরি অমূলক নয়। কিন্তু মন বলছে আরেক, তার সামনে কাঁদতে থাকা এই মেয়েটি মিথ্যে হতে পারে না। এই কান্না কোনো চাতুর্য না। দু’ দিকের টানটান স্রোতে তালহা অস্থির হয়ে ওঠে। এ যেন এমন এক দ্বন্দ্ব যেখানে সঠিক-ভুল নেই, আছে শুধু অনুভূতি আর তিক্ত সন্দেহের লড়াই।
এদিকে কাঁদতে কাঁদতে একসময় মেহরীন তালহার কোনো হেলদোল না দেখে ভেজা চোখদুটো তুলে তাকায় তার দিকে। তাকে এতক্ষণ চুপচাপ, স্থির দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভেতরে অদ্ভুত একটা রাগ চেপে বসল। সে তো আর পাথর নয়, কান্নায় ভেঙে পড়া মেয়েটিকে মানবতার খাতিরেও তো কিছু সান্ত্বনা দেওয়া যায়। অথচ তালহা চুপচাপ দাঁড়িয়ে। ক্রোধ আর দুঃখ মিলেমিশে আচমকা ফেটে পড়ল মেয়েটি। তাকে ছেড়ে দিয়ে হঠাৎ তীক্ষ্ণ উঁচুস্বরে বলে ওঠল,
—কি হলো, কিছু বলছেন না কেনো?
মেহরীনের এই আকস্মিক উচ্চস্বরে তালহা হালকা নড়ে ওঠে। তাকাতেই মেয়েটির ভেজা তীরের ন্যায় চোখজোড়ায় চোখ পড়ে। পানিতে টলমল করছে যেন পানি আবার উপচে পড়ার অপেক্ষায়। দৃশ্যটি তার ভেতর অদ্ভুত এক খচখচে ব্যথা তৈরি করে। কোনো দ্বিধা না করেই সে হঠাৎ এগিয়ে আসে, এক হাত তার মুখের দিকে বাড়িয়ে দেয়। মেহরীনের চোখের পানি মুছে তার গাল আলতো করে চেপে ধরে। এক নিঃশ্বাসে বলে উঠে,
—কাঁদবে না কাঁদলে ভীষণ বাজে দেখায় তোমায়…
“বাজে দেখায় তোমায়” এই চারটি শব্দেই যেন মেহরীনের কান্নার বাঁধ আবার ভেঙে যায়। যেন এতো দিনের জমে থাকা যন্ত্রণারা একসাথে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। সে তালহার হাত ঝারা মেরে সরিয়ে দিয়ে দু’ কদম পিছিয়ে যায়। মাথা নুইয়ে আবারও কাঁদতে লাগে, অসংযত, সেই অস্থির কান্না। তার কান্না বাড়তে দেখে তালহার ভেতরকার অস্থিরতাও যেন বারছে। হাসফাস করতে করতে বিরক্ত গলায় ঝারি মেরে বলল,
—বললাম না, কাঁদবে না..
এই বাক্যটা শেষ হতে না হতেই বিপরীতে আচমকা মেহরীন পালটা ঝাড়ি মেরে বসল। যা তালহার কোনো হিসেবেই ছিল না। মেহরীন আক্রোশে ভরা কণ্ঠে চেচিয়ে উঠল,
—একশোবার কাঁদব! আপনার কি? আমাকে বাজে দেখায় তো ওইদিন নেচে-নেচে বিয়ে করেছিলেন কেনো? অন্য কারো ঘাড়েও তো চাপানো যেতো। এই বিচ্ছিরি মেয়েকে বউ হিসেবে কবুল করলেন কেনো?
তালহা পিটপিট করে তাকিয়ে আছে। যেন বুঝতে চেষ্টা করছে মেয়েটা কি আসলেই মেহরীন। যেই মেয়েটা তার সামান্য কথাতেই ভয়ে গুটিয়ে থাকত, আজ সেই মেয়েই তার সামনে দাঁড়িয়ে তাকেই ঝাড়ি দিয়ে কথা বলছে? শুধু ঝাড়িই নয়, তাকে একেরপর এক প্রশ্ন করছে। তার কথাগুলো তালহার মুখের ভাব যেন মুহূর্তেই থমকে দিয়েছে। এক সেকেন্ডের জন্য তারও মাথায় খেলে, সেদিন চাইলেই সে অন্য কারো ঘাড়ে এই বিয়েটা চাপিয়ে দিতে পারত। তালহা একবার বেকেঁ বসলে তার সিদ্ধান্ত বদলানোর ক্ষমতা কারো বাপেরও নেই। তাহলে তখন কেন সে মেহরীনের দিকে হাত বাড়িয়েছিল? সেদিন তার মনে হয়েছিল, শুধু তার কাছেই এই মেয়েটা সেইফ থাকবে। বাঁচবে, বাঁচবে সঠিকভাবে। অন্য কারো উপর ভরসা হয়নি। শুধু এ কারনেই এতোবড় বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গেল?
তালহার এই দীর্ঘ, ভারী নীরবতা এবার মেহরীনের অসহ্য লাগে। আজ যেন সে নিজের স্বরূপেই নেই। আজ তার ভেতরে তীব্র এক জেদের স্রোত, কিছু না কিছু পাওয়ার জেদ, কিছু দাবি করার জেদ।
রাগে, দুঃখে, সাহসে করে এক কদম এগিয়ে এসে তালহার মুখোমুখি দাঁড়ায়। তালহা মাথা নিচের দিকে ঝুঁকে তাকানো তার দিকে, কারণ মেহরীন তার থেকে তুলনামূলক খাটো। মেহরীন মুখ তুলে শক্ত চোখে চেয়ে তার পানে। মেয়েটার মুখটা যেন সচ্ছ জলের নেয় ফুটে উঠেছে। তার জমে থাকা তীব্র অভিমানটা স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে, চোখে, ঠোঁটের কোণে, দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে, শ্বাসের প্রতিটি টানে।
মেহরীন তীক্ষ্ণ স্বরে ফের বলে উঠল,
—কি হলো বলুন, কেন করেছেন বিয়ে?
তালহা ভারী নিঃশ্বাস ফেলে গম্ভীর গলায় উত্তর দিল,
—আমার মনে হয়েছিল তুমি একমাত্র আমার কাছেই সেইফ থাকবে। অন্য কারো উপর ভরসা হয়নি, তাই…
মেহরীন সঙ্গে সঙ্গেই ক্ষুব্ধ গলায় বলে উঠল,
—তাই বলে বিয়ে করে ফেলবেন? যদি বউ মানার ইচ্ছেই না থাকে, তাহলে বিয়ে করলেন কেন? বিয়ে কি আপনার কাছে ছেলেখেলা?
তার কথায় তালহা মাথা ধীরে নেড়ে, অনুতাপ মেশানো স্বরে বলল,
—না, তবে তখন আর কোনো রাস্তা ছিল না।
মেহরীন অসহায় চোখে তাকিয়ে তালহার মুখপানে। শুকনো ঢুক গিলে কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠল,
—এখন আমারও তো কোনো রাস্তা নেই। আমি তো আপনাকেই স্বামী হিসেবে মেনে নিয়েছি। মনের সবটুকু জায়গা তালহা সিকদারের নামে দলিল করে ফেলেছি। এখন আমি কি করব..? কি নিয়ে বাচঁব?
তালহা মেহরীনের আচমকা কথায় আরও থমকে যায়। যেন প্রতিটি বাক্যগুলো তার বুকে গিয়ে ধাক্কা খাচ্ছে। কয়েক মুহূর্ত স্থবির থাকার পর হঠাৎ দ্রুত পায়ে মেহরীনের দিকে এগিয়ে আসে। তার আচমকা তেড়ে আসা দেখে মেহরীন ভড়কে ওঠে। অচেতন মনে ভাবনা আসে তালহা রেগে থাপ্পড় না মেরে বসে। তবে এসেই তালহা তার দু’ বাহু শক্ত করে চেপে ধরে উৎসুক স্বরে প্রশ্ন করে,
—এখন কি বললে তুমি? তোমার মনের সবটুকু জুড়ে আমি? এটাই বললে তো..?
মেহরীন ভেজা চোখে শুধু মাথা নেড়ে সায় দেয়। তার চোখে যন্ত্রণা, আকুলতা আর নীরব স্বীকারোক্তির মিশেল। তালহা বিস্ফারিত নয়নে তাকিয়ে আছে সেই চোখে। মেয়েটিও তার চোখে চোখ রেখেই দাঁড়িয়ে, অটল সেই চাহনি যেখানে তালহা অনুভব করে এক নিঃশব্দ আকর্ষণের টান। যেখানে সে স্পষ্ট ভালোবাসা দেখছে, কোনো আবেগের ছোয়াঁ নয়। তবে কি তাহসানকে নিয়ে তার ধারনা ভুল? হঠাৎই কথাটি মাথায় আসতেই তালহার বুকের ভেতর জমে থাকা সন্দেহ আর আটকে রাখতে পারল না। দম নিয়ে তীক্ষ্ণ গলায় প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়,
—তুমি কি ডাবল টাইমিং করছ মেহরীন?
কথাটা শুনে মেহরীন হতচকিত চোখে তাকায়। শব্দটাই যেন তার মাথার উপর দিয়ে গেল। কপাল কুঁচকে বিস্মিত গলায় জিজ্ঞেস করল,
—ডাবল টাইমিং…?
তালহা তাকে ছেড়ে পেছন ফিরে যায়। নিজের করা প্রশ্নে নিজেই যেন অস্বস্থিতে ভুগছে। বিরক্তির শ্বাস ফেলে আঙুল দিয়ে কপাল স্লাইড করতে লাগে, এটা তার মানসিক চাপ কাটানোর পরিচিত অভ্যাস। এদিকে মেহরীন দাঁড়িয়ে আছে একই প্রশ্নে আটকে। তালহার নীরবতা তাকে আরও অস্থির করে তোলে। সে আবার একই প্রশ্ন করল। তালহা আবার ফিরে তাকায়, চোখমুখে এবার শক্ত ভাব। কাঠকাঠ গলায় বলল,
—ডাবল টাইমিং মানে, একসাথে দু’জন কন্টিনিউ করা। দুজনকে একই আশা দিয়ে…
বাকিটুকু বলতে গিয়েও থেমে যায় তালহা। কথাগুলো উচ্চারণ করতেও কেমন যেন শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। মেহরীনের তো শব্দগুলো শুনতেই মুখ হা হয়ে যায়। এতক্ষণকার দুঃখ, ক্ষোভ এক মুহূর্তে বদলে গিয়ে বিস্ময়ে রূপান্তরিত হয়েছে। সারাদিনে তালহাকে নিয়েই যে ভেবে কুল পায় না, সে আবার এক সাথে দুজন কন্টিনিউ করবে। এ চিন্তাটাই তো কেমন অবাস্তব শোনাচ্ছে মেহরীনের কাছে। তালহার এমন সন্দেহে বোকা বনে যায়। অবাক কন্ঠে প্রশ্ন করল,
—কিসব বলছেন আপনি? কিসের ভিত্তিতেই বা এসব বলছেন আপনি?
তালহা নির্লিপ্ত, শান্ত ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে মেহরীনের দিকে। হৃদয়ের ওজন লুকিয়ে মুখে কঠোরতা ফুটিয়ে রেখে সমানস্বরে বলে,
—তুমি তাহসানকে পছন্দ করো না?
কথাটা যেন আকাশ ফুঁড়ে নেমে আসা বজ্রের মতো কানে লাগল মেহরীনের। যা মাথার ভেতর বিকট শব্দে গর্জে ওঠেছে। যাকে নিয়ে সে নূন্যতম কোনো ভাবনাও ভাবে না, তার সম্পর্কে এমন প্রশ্ন। আর তার জন্য যে এতো পাগলামি করে, সেদিকে খেয়ালই নেই লোকটির। ভাবনাটি তাকে মুহূর্তে ক্ষিপ্ত করে তোলে। রাগেভরা কন্ঠে বলে উঠল,
—কি আবুল-তাবুল বকছেন আপনি। মাথা গেছে আপনার? আমি কেন তাহসান স্যারকে পছন্দ করতে যাবো?
তালহা কপালে সূক্ষ্ম ভাজ ফেলেই বলল,
—তুমি তাহসানকে পছন্দ করা না?
মেহরীন চোখমুখ কুঁচকে, বিরক্তিমাখা ভঙ্গিমায় সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল,
—নাহ, উনাকে কোন দুঃখে পছন্দ করতে যাবো। আজব!
তালহা অবাক হয়ে তাকায়, মনে মনে কিছু হিসাব মিলাতে চেষ্টা করল, তারপর দ্রুত জিজ্ঞেস করল,
—তাহলে ওই চিঠি?
মেহরীন সন্দিহান চোখে তাকিয়ে অস্থির কন্ঠে প্রশ্ন করল,
—আপনি কি সেদিনের ওই চিঠির কথা বলছেন?
তালহা ডানে-বামে মাথা নাড়তেই মেহরীনের চোখের সামনে সব কিছু স্পষ্ট হয়ে গেল। তাহলে সেদিন তাকে নিয়ে চিঠি লেখার জন্য তাকে এতোগুলো কথা শুনায়নি। উল্টো তাকে ভুল বোঝে এতোগুলো কথা শুনিয়েছে। ভাবতেই মনের ভেতর কেমন করে উঠে, যাকে নিয়ে কোনো ভালোমন্দ চিন্তাও করেনা তাকে কিনা সে চিঠি লেখবে।
চুপ করে থাকা মেহরীনকে দেখে, তালহা দাঁত কিরমিরিয়ে ফের প্রশ্ন করল,
—ওটা তো তাহসানের জন্যই ছিল… রাইট?
তার প্রশ্নে মেহরীন নাক ফুলিয়ে তাকাল তালহার দিকে, রাগে যেন ফুসে উঠছে সে। এত বড় হয়েও এত অবুঝপানা করবে তালহা, এমনটা ভাবতেও পারেনি। মেহরীন উল্টো ভাবছিল তার মনের সব কথা বোঝে গেছে, কিন্তু এই বলদ উল্টো বোঝে বসেছে। রাগ যেন একদম পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছে গেছে। তাকে এখনো চুপ দেখে এবার তালহাও ধৈর্য হারিয়ে চিল্লিয়ে উঠল,
—উত্তর দাও মেহরীন! সেদিন তুমি কার জন্য সেজেছিলে, কাকে দেখাতে…?
মেহরীন সঙ্গে সঙ্গে কোমড়ে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে মুখ বাঁকিয়ে বলল,
—একটা আহাম্মককে দেখাতে।
কথাটি বলার সঙ্গে সঙ্গে মেহরীন তালহার দিকে বড়বড় চোখ করে কড়া চাহনি দেয়, পরমুহূর্তে মুখ ভেংচে ধপধপ পা ফেলল নিচে যেতে। তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে তালহা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিনারায় এসে দাঁড়াল। মানুষ কখনও কখনও যে অনুভূতিকে দূরে সরিয়ে রাখতে চায়, ভাগ্যের অদৃশ্য সুতো ঠিক সেই অনুভূতির দিকে মনকে আরও নিবিড়ভাবে টেনে নিয়ে আসে। অবাক লাগে, কেন এমন অস্থিরতা ভেতরে জমে ওঠে? কেন বুক হঠাৎ ভারী হয়ে নুয়ে আসে? কেন সবকিছু এত ফাঁকা ফাঁকা লাগে?
সমগ্র অন্ধকারাকাশকে সাক্ষী রেখে, মনে মনে উচ্চারিত হলো এক নিঃশ্বাসে কিছু স্বীকারোক্তি,
—দুর্বলতার হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতেই তো আমি পিছু হটতে চেয়েছিলাম। তবু আশ্চর্য, যাদের থেকে দূরত্ব চেয়েছি, তারা যেন এসে আমার অন্তরজুড়ে অদ্ভুত এক দখল নিয়ে বসেছে।
এরমধ্যে কারো হাপানির শব্দে পেছন ঘুরে তাকায়। দেখে মেহরীন দাঁড়িয়ে জুড়ে জুড়ে শ্বাস নিচ্ছে। হয়তো দৌড়ে গিয়ে দৌড়ে এসেছে। তালহা শান্ত চোখের তাকে পরখ করতে লাগে। মেহরীন আর না দাঁড়িয়ে হন্তদন্ত পায়ে এগিয়ে আসে তালহার দিকে। ঠিক সামনে এসেই তার ডান হাত নিয়ে তাতে কয়েকটা কাগজ ধরিয়ে দেয়। তারপর নির্লিপ্ত কন্ঠে বলল,
—আপনি একটা বলদ।
মেহরীনের কথা শুনে তালহা চোখে প্রশ্ন নিয়ে একবার হাতে থাকা কাগজগুলোতে চোখ রাখে তো আবার মেহরীনের দিকে। তা দেখে মেহরীন আরও রেগে বলল,
—এই আপনি না বলতেন আমি ছোট আমি কিছু বুঝিনা। এখন তো দেখছি পুরোই উল্টো, আপনি আস্ত একটা গেদা বাবু যে কিচ্ছুটি বুঝেনা। চোখের সামনে সব রেখেও অবুঝ। মানে সিরিয়াসলি আমি চিঠি তাহসান ভাইকে লিখেছি?
বলতে বলতে সেদিনের চিঠিটা মেলে ধরে,
—চিঠিতে কোথায়…কোথায় তাহসান ভাইয়ের নাম আছে? আমাকে দেখান একবার..
তালহা বাকি কাগজগুলো হাতের মুঠোয় নিয়ে মেহরীনের হাতের চিঠিটা ধরে। একদম শেষের লাইনটা দেখিয়ে তাকাতেই মেহরীন কড়া চোখে তাকায়।
—ত তে কি বাংলাদেশে খালি একটাই নাম আর সেটা তাহসান?
তালহা মাথা ঝাকিয়ে স্বল্পস্বরে উত্তর দিল,
—না
—তো আপনি তাহসান ভাবলেন কেনো? আরও কতো নাম আছে সেগুলো ভাবেননি কেনো?
তালহা এবার ক্ষীপ্ত কন্ঠে গর্জে উঠল,
—ওইদিন তুমি এইটা তাহসানকেই দিয়েছিলে। সো এটা পরিস্কার কথা।
মেহরীনের তো ইচ্ছে করছে নিজের মাথা নিজে ফাটাতে। লোকটা তাকে এতো ভুল ভেবে বসে আছে, ছি তাকে কতোই না খারাপ ভাবছিল। নিজেকে নিজে শান্ত করে বলল,
—হাতে থাকা কাগজগুলোতে একটু চোখ বুলালেই উত্তর পেয়ে যাবেন। আমার আর আপনার সঙ্গে এক্সট্রা কথা বলতে ভাল্লাগছে না।
মেহরীনের কথায় তালহা পড়তে লাগল, মোবাইলের টর্চ ধরিয়ে। আর তার ঠিক সামনেই মেহরীন দাঁড়িয়ে আছে তার চোখে চোখ রেখেই। আজ যেন মেহরীনের মধ্যে অন্যরকমই একটা অধিকারবোধ কাজ করছে। ভয় লজ্জা সাইডে রেখে নিজেরটা নিজে বুঝে নেওয়ার মিশনে নেমেছে। তালহা এক লাইন এক লাইন পড়ছে আর মেহরীনের দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছে। এভাবেই প্রায় মিনিট দশেক লাগিয়ে সবগুলো চিঠি পড়ে নেয়। এবার যেন নিজের মনে অপরাধবোধের জন্ম নেয়, মেহরীনকে ভুল বোঝার অপরাধবোধ। কিন্তু এটাও চিন্তায় আসে সেদিনের সব কি তবে মিথ্যা?
সোজা হয়ে দাঁড়ায় নিজের সকল অনুভূতি ধামাচাপা দিতে মুখ গম্ভীর করে তুলে। চিঠিগুলো ফিরিয়ে দিয়ে প্রশ্ন করল,
—কিন্তু আমার প্রশ্ন তোমার চিঠি তাহসানের কাছে কি করছিলো?
—ইংলিশ শীটের মাঝে ছিল ভুলবশত চলে গেছে।
তা শুনতেই তালহা দুহাতে চুল টেনে ধরে চোখমুখ রাগে লাল হয়ে উঠেছে। রাগে হিসহিসিয়ে বিরবির করল,
—তবে ও আমাকে মিথ্যা বলেছে?
তালহার হঠাৎ রাগ বুঝে উঠল না তার কথা শুনে জিজ্ঞেস করল,
—কে..?
তালহা কিছুই বলল না চোখ বন্ধ করে জুড়ে জুড়ে নিশ্বাস নিতে লাগল, মনটা কেমন হালকা লাগছে এখন। যেন বুকের উপর থেকে ভাড়ি কিছু নেমেছে। শ্বাস নিয়েও শান্তি পাচ্ছে। এতোদিন সে ভুল ধারনায় নিজেকে কষ্ট দিয়েছে ভাবতেই নিজের উপর নিজের রাগ উঠছে। তার উচিত ছিলো আগেই মেহরীনের সাথে এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করার। তবে… তবে যদি এই কান্ড না হতো সে হয়তো জানতই না সে মেহরীনকে কতোটা চায়। মেহরীনকে অন্যের সাথে না দেখলে হয়তো ফিল করতে পারত না মেহরীন যে তার ব্যক্তিগত। কথাটা মাথায় খেলতেই দ্রুত চোখ মেলে তাকায় মেহরীনের দিকে।
মেয়েটি এখনো আশাহত চোখে চেয়ে আছে তার দিকেই। হতাশ কন্ঠে তাচ্ছিল্য নিয়ে বলে উঠল,
—একজন নারীর পেছনে হাজার পুরুষ ঘুরলেও, সেই নারী নির্দিষ্ট একজনকেই ভালোবেসে বসে। আর শেষ পর্যন্ত সেই একজনকেই না পেয়ে নিজের জীবনটাকেই ধ্বংসের পথে ঠেলে দেয়।
একটু থেমে ধরা গলায় ফের বলল,
—তবে শুনুন তালহা সাহেব, আপনাকে পাওয়ার জন্য আমি একবার নয়, দু’বার নয়, বারবার নিজেকে ধ্বংস করতে প্রস্তুত।
তার কথা শেষ হতেই হন্তদন্ত পায়ে তার কাছে এগিয়ে আসে তালহা। হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,
—Good touch or bad touch?
তালহার আকস্মিক প্রশ্ন মেহরীন ঠিক বুঝলোনা। তবে তালহার চোখে উত্তর পাওয়ার অপেক্ষা দেখে সে বলল,
—Good touch..
—But, i’m going to touch you badly…
কথাটুকু বলার সঙ্গে সঙ্গে তালহা হঠাৎ ঝাপিয়ে পড়ে মেহরীনের উপর। এক ঝটকায় তাকে জড়িয়ে ধরে বুকের সঙ্গে এমনভাবে চেপে রাখে, যেন বহুদিনের হারানো কিছু অবশেষে ফিরে পেয়েছে। তার আলিঙ্গনের চাপে মেহরীনের শ্বাস পর্যন্ত আটকে আসছে। এক অজ্ঞাত তীব্রতায় যেন সে তাকে আর এক ইঞ্চিও সরে যেতে দেবে না। তালহার মনটা এখন অব্যক্ত এক শান্তিতে ডুবে, যেন বুকের ভেতরের হারিয়ে যাওয়া জিনিসটা অবশেষে ফিরে এসেছে, ঠিক নিজের জায়গায়।
এদিকে মেহরীন তালহার এই আকস্মিক উন্মাদনায় কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ উপলব্ধি করে তার পা মাটি ছুঁইছে না আর। চমকে ওঠে সে, মনে হচ্ছে কেউ তাকে এক ঝটকা টেনে নিয়ে দেওয়ালের গায়ে ঝুলিয়ে রেখেছে।
তবে যখন সে বুঝলো, সঙ্গে সঙ্গে সেও দুই হাতে তালহার গলা জড়িয়ে ধরে। ভীষণ ভালো লাগছে তার, এ জীবনের সকল কষ্ট যেন নিমিষেই মিলিয়ে গেছে। আজ তালহাকে কেমন আপন আপন লাগছে, যেন মেহরীনেরই কেউ। তবে কি তালহা অবশেষে তাকে বুঝলো। সজ্ঞানে এটা তাদের প্রথম স্পর্শ এই সুখকর মুহূর্তের অপেক্ষায়ই তো ছিল।
আবেশে চোখ বুজে ফেলে মেহরীন। তালহার হাতের বাঁধন যেন আস্তে আস্তে আরও শক্ত হচ্ছে, পারলে তাকে বুকের ভেতরেই গুটিয়ে নিত। এভাবেই দশ মিনিটেরও বেশি সময় কেঁটে যায়।
তালহার মুখ থেকে এখন অব্দি টু শব্দও বের হয়নি, শুধু তাকে আঁকড়ে ধরেই দাঁড়িয়ে আছে।
মেহরীন এবার ছাড়া পেতে নড়তে থাকে। নেমে যেতে চাইছে, সে কি কম ভারী নাকি। এতক্ষণ ধরে একটা ভারী মানুষকে তুলে রাখা মুখের কথা নয়। কিন্তু তালহার সেসবে কোনো হেলদোল নেই। সেই একই ভঙ্গিতে তাকে জড়িয়ে ধরে তার গলায় মুখ গুঁজে আছে। সে তো মেহরীনের শরীরের ঘ্রাণ নেওয়াতেই ব্যস্ত।
না পেরে শেষে মেহরীনই কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠল,
—ছ.. ছাড়ুন, কেউ দেখবে..
কয়েকসেকেন্ড নিরবতার পর তালহা হ্যস্কি স্বরে ফিসফিসিয়ে বলে উঠল,
—উই আর ম্যারিড, সো আই ডোন্ট কেয়ার.
“ম্যারিড” এই শব্দটা তার মুখে উচ্চারণ হতেই মেহরীন তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে ঝাঝালো কণ্ঠে সটান জবাব দিল,
—এখন আসছে ম্যারিড! এই চিন্তা এতদিন কোথায় ছিল?
তালহা একটুও বিচলিত হলো না। বরং মেহরীনকে দু’হাতে তুলে ছাদের রেলিঙের ওপর বসিয়ে দিল। তারপর দু’পাশে হাত রেখে তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে পড়ল একদম কাছে, চোখে চোখ রেখে। মেহরীন তালহার গলা ধরে আছে এখনও। তালহার গভীর দৃষ্টি যখন তার চোখে আঘাত করল, তখনই সে হঠাৎ ভড়কে গেল।
এই চাহনি স্বাভাবিক নয়, এ এক অন্যরকম দৃষ্টি। এমন দৃষ্টি যা মেয়েদের বুকের ভেতর কেমন যেন শিরশিরে উষ্ণতা জাগায়। লজ্জার উত্তাপ উঠে গেল মেহরীনের গাল বেয়ে। চোখে চোখ রাখা দায় হয়ে উঠল, সে চোখ নিচু করে ফেলল। হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক দ্রুত হয়ে উঠল।
তালহা মনোযোগ দিয়ে তাকে দেখছে। ফোলা-ফোলা গাল। সরু নাক। সাথে টানা চোখের ঘন পাপড়ি। মাথার ঘোমটাখানা কবেই পড়ে গেছে, সামনের এক-দুটি চুল মুখে নেমে এসেছে। তা চোখে পড়তেই আচমকা ফুঁ দিয়ে সরিয়ে দিতেই মেহরীন চোখ বুজে নেয়, একটা ক্ষুদ্র লজ্জার কাঁপুনিতে যেন নিভে গেছে।
এতক্ষণের চরম সাহসী মেয়েটা, এখন লজ্জায় যেন গলে যাচ্ছে। তালহা আলতো হেসে ফেলল। তারপর শীতল মন-গলানো কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
—ভালোবাসতে পারেন, ম্যাডাম?
চমকে উঠে ফট করে চোখ মেলে তাকায় মেহরীন।
“আপনি” আর সঙ্গে “ম্যাডাম” তালহার মুখে উচ্চারিত এই সম্বোধন দুটো যেন সরাসরি হৃদয়ে গিয়ে লাগল। এত সুন্দর শোনালো যে সেই তব্দা খেয়ে বসেছে। লোকটা কি তাকে গায়েল করতে চাইছে? তবে সে তো এমনিতেই গায়েল এই ছেলের উপর। তার চোখের প্রশ্নবোধক দৃষ্টি পেয়ে তালহা আবারও জিজ্ঞেস করল,
—বলুন ম্যাডাম, ভালোবাসতে পারেন?
মেহরীন লজ্জায় মুঁচকি হেসে মাথা নেড়ে বলল,
—আলবাত পারি। আপনার মতো নিরামিষ নাকি?
তালহা হো হো করে শব্দ করে হেসে উঠল মেহরীনের কথায়। তার এ মনখোলা হাসি দেখে মেহরীনও আনমনে হাসল। তালহা ঠোঁটে হাসির রেখা টেনে রেখেই বলল,
—আমিও কিন্তু ভালোবাসতে পারি, ম্যাডাম। আমার ভালোবাসা প্রকাশ করা শুরু করলে আপনি হার মানতে বাধ্য হবেন।
মেহরীন পরম আগ্রহে জিজ্ঞেস করল,
—আপনি ভালোবাসেন আমায়?
তালহা এবার মেহরীনকে রেলিং থেকে নামিয়ে আলতো করে ছেড়ে দাঁড়াল। দু’হাত পকেটে গুঁজে ফিসফিসিয়ে বলল,
—ভালোবাসার মতো দুর্ঘটনাটায় আমি শেষ পর্যন্ত আঘাতপ্রাপ্ত হয়েই গেলাম, ম্যাডাম।
বাক্যটা শোনার সাথে সাথেই মেহরীনের চোখ টলমল করে উঠল। দু’ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল আনন্দে। মৃদু উল্লাসে ঝটপট তালহাকে জড়িয়ে ধরল। ঠোঁটের কোনে অপ্রত্যাশিত সুখের হাসি,
—এই আঘাতের জখম সারাজীবন আপনার অঙ্গে রাখবেন তো?
তালহা মেহরীনের মাথায় পরম আদরে হাত বুলিয়ে আশ্বাসের হাসিতে বলে,
—তালহা সিকদার মুখে নয়, কাজে বিশ্বাসী। শেষ বয়সে নাহয় দু’জনে চা খেতে খেতে আড্ডার ফাঁকে হুট করে বলব, আমার জখম কিন্তু আমি আগলেই রেখেছি, ম্যাডামজি।
তালহার কথায় মেহরীন আরও গভীরভাবে মুখ ডুবিয়ে দিল তার বুকে। চোখ বেয়ে পানি পড়ছে। প্রশান্তির পানি। সব যেন স্বপ্ন-স্বপ্ন লাগছে। এতো তাড়াতাড়ি সে তালহাকে পেয়ে যাবে, এটা তার কল্পনারও বাইরে ছিল। যাকে পাওয়াই অসম্ভব ধরে নিয়েছিল, সে কিনা এতো সহজে ধরা দিল। মাথায় হাজারটা চিন্তা, সবকিছু কি সত্যি? নাকি নিছক কল্পনা? নাকি কোনো অলৌকিক সুখের মুহূর্ত? এ মুহুর্ত চিরস্থায়ী নাকি অল্পস্থায়ী? যা-ই হোক, এই মুহূর্তে তালহার বুকের আশ্রয়টাই তার কাছে সত্যি মনে হচ্ছে।
প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ২৩
ছাদের দরজার হঠাৎ আওয়াজে মেহরীন ভয়ে তালহার থেকে সিটকে দাঁড়ায়। দুজনেই চমকে সেদিকে তাকাতেই ছায়ার মতো কিছু একটা দ্রুত আড়াল হয়ে যেতে দেখ। মেহরীনের বুক কাঁপছে, চোখে ভয়ের ঝলক। কেউ দেখে ফেলল না তো!
তালহা সঙ্গে সঙ্গে সেদিকে এগোতে লাগল, যেতে যেতে কয়েকবার ডাকে,
—কে ওখানে…কে?
