Home প্রেমসন্ধিক্ষন প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩৩

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩৩

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩৩
সাইদা মুন

—ত..তাহিয়া? তুই এখানে…?
তালহার কণ্ঠে বিস্ময়, চোখমুখে হালকা ভয়ের ছাপ আর অস্বস্তিরতা। তাহিয়া দুই হাত গুজে গুরুগম্ভীর মুখে দুজনের সামনে এসে দাঁড়ায়। তালহা থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে। মেহরীনও দ্রুত উঠে দাঁড়ায়। দুজনের অবস্থা ঠিক যেন চুরি করতে যেয়ে ধরা পড়েছে।
তাহিয়ার চোখ-মুখ শক্ত হয়ে যায়, ফের প্রশ্ন করে উঠে,

—আগে তোমরা বলো, তোমরা এখানে কি করছো?
তালহা আমতা আমতা করে কথা ঘুরাতে চেষ্টা করে,
—আ..আমি তো এমনি এসেছিলাম। তুই এখানে কি করছিস?
তাহিয়া এবার কোমরে হাত দিয়ে কপাল কুচকে প্রশ্নবিদ্ধ চোখে ভাইয়ের দিকে তাকায়।
—আমি তো এসেছিলাম বলতে তোমাকে সবাই ডাকছে। তবে এসে যে এতো বড় সত্য উন্মোচন হবে, জানলে তো এমনি আসতাম।
তালহা একবার মেহরীনের দিকে তাকায়। মেয়েটা মাথা নিচু করে নিচে তাকিয়ে। তারপর পূর্ণ চোখে আবার তাকায় তাহিয়ার দিকে। অস্থির স্বরে জিজ্ঞেস করে,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

—তুই… কি শুনতে পেয়েছিস?
—তোমরা বিবাহিত?
মেহরীন তড়াক চোখ তুলে তাকায়। চোখ হঠাৎ বড় হয়ে ওঠে, তাতে অস্থিরতা স্পষ্ট। তালহাও হালকা ঢোক গিলে। যা ভয় করছিল ঠিক তাই হলো। মুহূর্তেই যেন তার মাথা ফাঁকা হয়ে যায়। এখন কি বলবে, কোথা থেকে শুরু করবে। বোনকে কি-ই বা বোঝাবে কিছুই ঠিক বুঝতে পারছে না।
সে দ্রুত সামনে এসে দাঁড়ায় তাহিয়ার, যেন তাকে বোঝানোর চেষ্টা করতে চাইছে।
—আ..আসলে তাহিয়া… তুই যেমনটা ভাবছিস, আসলে তেমন না…
ভাইকে এতো ঘাবড়াতে দেখে তাহিয়া থামিয়ে বলে,

—আসলে-নাসলে পরে হবে। আগে বলো, তোমরা সত্যিই বিবাহিত কি না?
তালহা কপালে দু’আঙুল রাখে, স্লাইড করতে থাকে। চিন্তারা যেন তাকে চেপে ধরেছে। অসস্থিরতায় হাঁটা শুরু করে এদিক ওদিক। তালহাকে চুপ দেখে তাহিয়ার কৌতূহল, অস্থিরতা আরও বেড়ে যায়। সে আর নিজেকে থামাতে পারে না। হঠাৎ এগিয়ে গিয়ে ভাইকে থামুয়ে হাত ধরে ঝাঁকায়।
—বলোনা ভাইয়া!মেহরীন কি আমার ভাবি? তোমার বউ?!
তালহা অসহায় চোখে একবার মেহরীনের দিকে তাকায়। মেয়েটা নিশ্চুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে তার উত্তরের আশায়। কি বলবে এখন সে। ছোট বোনটা কিভাবে নিবে ব্যাপারটা। এসব কি ছোট বোনকে খোলামেলাভাবে বলা যায়? নানান চিন্তা আর দ্বিধা একসাথে মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগে তালহার। আর এদিকে তাহিয়ার তো একের পর এক প্রশ্ন চলছেই। শেষমেশ উপায়ন্তর না দেখে হঠাৎই সব দ্বিধা সাইডে রেখে বলে ফেলে,

—হ্যা, আমরা বিবাহিত। মেহরীন আমার ওয়াইফ…
কথাটা যেন পুরো পরিবেশটা নিস্তব্ধ করে দিয়েছে। শুধু মেহরীনের ঘনঘন শ্বাসের শব্দ হচ্ছে। তাহিয়া স্থব্ধ দাঁড়িয়ে। যেন একদম জমে পাথর হয়ে গেছে। অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে। কখনো ভাইকে দেখছে, তো কখনো মেহরীনকে দেখছে। দুজনেই যেন এখন অপরিচিত কেউ।
মেহরীন অপরাধী চোখে চেয়ে আছে তাহিয়ার দিকে। সে তো ইচ্ছে করে আড়াল করেনি। তবুও নিজেকে অপরাধী লাগছে। আর তাহিয়া! তার চোখ তো ধীরে ধীরে পানিতে ভরে উঠছে তীব্র অভিমানে।
সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজিত হয়ে সে চিৎকার করে উঠে,

—কিইইই? তোমরা এতো বড় কথা লুকিয়ে এসেছো এতোদিন ধরে? আর মেহরীন, তুই? ছি! তোকে আমি আমার বেস্ট ফ্রেন্ড কম বোন ভেবেছিলাম, আর তুইও কিনা এতোদিন ধরে আমার কাছ থেকে সব লুকিয়ে আসছিলি?
তালহা দ্রুত বোনর হাত ধরে শান্ত করার চেষ্টা করে,
—ডোন্ট বি হাইপার তাহিয়া, কাম ডাউন। ভাইয়া বুঝিয়ে বলছি শোন তুই।
তাহিয়া অভিমানী চোখে ভাইয়ের দিকে চেয়ে বলে উঠে,
—আর কি বাকি আছে বলার? আর কি কি লুকিয়েছো?
তালহা চুপসে যায়। নিজের চুল টেনে ঘনঘন শ্বাস ফেলে ফের বলল,
—ভাইয়াকে ভুল বুঝিস না। সিচুয়েশনে পরে বিয়েটা করতে হয়েছিল আমাদের। আমি আস্তে ধীরে সব সকলের সামনে আনবো। প্লিজ, এর আগে এসব নিয়ে কাউকে কিছু বলিস না, লক্ষী বোন আমার…
তাহিয়া তার হাত ঝাটকা দিয়ে ছাড়িয়ে নেয়। ভাইয়ের উপর তার ভীষণ রাগ জমেছে। রাগে-অভিমানে কান্নামিশ্রিত কন্ঠে বলল,

—তুমি জানোনা তোমার বিয়ে নিয়ে আমার কতো শখ ছিল? সব তুমি এভাবে ভেস্তে দিলে? আমার একটা মাত্র ভাইয়ের বিয়ে, আমি খেতে পারলাম না? আনন্দ করতে পারলাম না? থাকতে পারলাম না। কিছু করতে পারলাম। তুমি এতো সেলফিশ কিভাবে হলে ভাইয়া?
তার শ্বাস ভারী হয়ে আসে। কথাগুলো যেন আর নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই।
—আর আম্মু? আম্মুর কি হবে হঠাৎ এসব শুনলে? তার ছেলে যাকে সে অন্ধবিশ্বাস করে সেই তাকে এতোদিন ধরে মিথ্যা বলে এসেছে? এটা শুনলে কষ্ট পাবে আম্মু একবারও ভাবোনি? ওইদিন তুমি আম্মুকে কেন মিথ্যা বলেছিলে। আম্মু কি ফেলে দিতো মেহরীনকে?

তালহার মুখ যেন হঠাৎ-ই বন্ধ হয়ে গেছে। চোখে-মুখে এক অদ্ভুত শূন্যতার ছাপ। যদি প্রথম দিনই সব কিছু খুলে বলত, আজ পরিস্থিতি এতো জটিল হত না। সে বুঝতে পারছে এখন যা হচ্ছে বা ফিউচারে যা হবে, সবই তার নিজের ভুলের ফল। নিজের চুপ থাকার জন্যই আজ চারপাশ জটিল হয়ে গেছে, সম্পর্কগুলো যেন এক অদ্ভুত চাপের মধ্যে চাপা পড়ে আছে। সে নিজেই দায়ী, পুরোপুরি দায়ী। এই পরিস্থিতির জন্য কোনো বাইরের দোষ নেই। স্বর এবার নিচু করে প্রশ্নাত্মক চোখে চেয়ে থাকা তাহিয়ার দিকে চেয়ে বলল,
—আমি মিথ্যা কিছু বলিনি ওইদিন। যা বলেছি সব সত্যই ছিল। শুধু মাঝে আমাদের বিয়েটা স্কিপ করেছি। আমার কাছে আর অপশন ছিল না। আমাদের বিয়েটা খুবই বাজে একটা সিচুয়েশনে হয়েছে। বিয়েতে কারোই মত ছিল না। এর ফিউচার আধো হবে কি না সেটারও গ্যারান্টি ছিলনা। ভেবেছিলাম এসব জানাজানি হলে মেয়েটার ফিউচারে এফেক্ট পড়বে…
তাহিয়া ভাইকে থামিয়ে জেদি কণ্ঠে বলে ওঠে,

—আমি এই বিয়ে মানি না। আর না, এই মিথুক মেহরীনকে আমি ভাবি মানি। ও একটা প্রতারক আমার বিশ্বাস ভেঙেছে। ওকে আমি কিছু হিসেবেই মানিনা..!
কথাটা যেন ছুরির মতো মেহরীনের গায়ে বিধল। মুহূর্তের মধ্যে তার চোখ-মুখ আরও নিস্তেজ হয়ে আসে, ভেতরের শক্তি যেন ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। কি এক অদ্ভুত শূন্যতা অনুভব করছে সে, যাকে জীবনে সুখ-দুঃখের সঙ্গী হিসেবে পেয়েছিল, তাকেও কি হারাতে হবে? তার জীবনে কি মানুষ হারানো ছাড়া আর গতি নেই?
তালহা দ্রুত এগিয়ে আসে এবং ছাদের দরজা টেনে বন্ধ করে দেয়, যেন কোনো শব্দ বাইরে না যায়। ফিরে এসে দাঁড়ায় তাহিয়ার সামনে, অনুনয়ের স্বরে বলল,

—প্লিজ তাহিয়া, তুই আমার লক্ষী আপু না? এভাবে চিল্লাস না। সকলে জানাজানি হলে বিষয়টা ব্যাডলি প্রেজেন্ট হবে। মেহরীনের এতে কোনো দোষ নেই। হুদাই তার ওপর রাগ করে থাকিস না।
তাহিয়ার ভেতরটা যেন হঠাৎ করেই ভীষণ মনখারাপ, রাগ, অভিমানে ভরে উঠেছে। বুঝতে শেখার পর থেকেই ভাইয়ের বিয়েকে ঘিরে সে কত স্বপ্নই না বুনেছে। লেহেঙ্গা ঠিক করা, গানের লিস্ট বানানো, হুলস্থুল আয়োজন। আর এখন হঠাৎ করেই শুনতে হচ্ছে, তার ভাই নাকি বিয়েও করে ফেলেছে। অথচ তারা কেউ জানেই না।
তার চেয়েও বেশি কষ্ট পেয়েছে মেয়েটা মেহরীনের জন্য। যে মেয়েটাকে সে অল্পতেই নিজের আপন করে নিয়েছিল, যাকে সে বোনের মত আগলে রেখেছে, যার সঙ্গে নিজের সবচেয়ে গোপন কথা পর্যন্ত শেয়ার করেছে। যাকে সে বিশ্বাস করতো। সেই মানুষটাই কিনা এতো বড় বিষয়টা ওর কাছে লুকিয়ে রেখেছে।

এই ভাবনাগুলো মাথায় ঘুরতে ঘুরতেই তাহিয়ার বুকটা আরও ভারী হয়ে ওঠে। গলায় হঠাৎ একটা দলা তৈরি হয়, চোখে পানি এসে জমতে থাকে৷ আমাদের আশেপাশে এমন কিছু মানুষ থাকে। যারা খুব দ্রুতই অন্যকে আপন করে নেয়, এবং বিনিময়ে অপরপক্ষ থেকেও এটা আশা করে বসে যে তারাও একইভাবে আপন করে নিবে, একইভাবে যত্ন নিবে, একই গুরুত্ব দিবে। আর পরবর্তীতে প্রত্যাশীত মানুটা থেকে সেইম গুরুত্ব না পেলে, তারা তাড়াতাড়ি আহতও হয়ে যায়। এসব নরম মনের মানুষদের জন্য দুনিয়াটা বড্ড আলাদা। তাহিয়াও ওমনি একজন, সে মেহরীনকে নিজের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গী ভেবেছিল। ভেবেছিল তাদের মাঝে কোনো সিক্রেট নেই। আর সেই কিনা এতো বড় কথা আড়াল করেছে। বিষয়টা তার ছোট্ট মনটাকে বড়সড় ধাক্কা দিয়েছে।
তাহিয়া নিজেকে সামলে ভাইয়ের হাতে হাত রেখে থামিয়ে বলল,

—ভাইয়া, তুমি কি জানো, এই মেহরীনকে আমি নিজের বোনের মতো ভালোবাসি। আর তুমি আমার জান। আমি সবসময় চাই তোমরা দুজনেই সুখে থাকো। কিন্তু তাই বলে দিনের পর দিন এভাবে মিথ্যা বলবে…
তালহা শান্ত কন্ঠে বলল,
—তুই ভুল বুঝছিস ভাইয়াকে…
—তুমি কি পাগল, ভাইয়া? আমি ভুল বুঝব? এত বড় খবর শুনে আমি ভুল বুঝব তোমাকে? আমি তো অনেক খুশি আমার ভাইয়ার লাইফে তাকে ভালো রাখার মতো একজন মানুষ চলে এসেছে। তবে হ্যা, একটু খারাপ লাগছে…
বলেই মেহরীনের দিকে তাকালো হতাশ চোখে,

—আমার বেস্ট ফ্রেন্ড, যাকে আমি বোন ভাবতাম, সে এতো বড় কথা লুকিয়েছে আমার থেকে। আমি তো ওর কতো সিক্রেট জানি, কই আজ অব্দি কাউকেই তো সেসব বলিনি। তাহলে এই সিক্রেটটা কেনো জানায়নি? আমি তো বিশ্বাসের মর্যাদা রেখেছি, তবে ও কেনো বিশ্বাস করল না?
বলতে বলতে তাহিয়ার গলা ভেঙে আসে। চোখে পানি চলে আসে। তালহা বুঝতে পারে বোনটা কষ্ট পেয়েছে। বোনকে আগলে নিল সে, শান্ত করার চেষ্টা করল। একবার মেহরীনের দিকে চোখ যেতেই দেখে তার চোখেও পানি। হয়তো অনুতপ্ত। চোখের ইশারায় কাছে ডাকতেই মেহরীন এগিয়ে আসে। তালহা এক হাতে মেহরীনের হাত শক্ত করে ধরে স্বান্তনা দেয় সব ঠিক হয়ে যাবে। অন্য হাতে বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে নরম সুরে বলে,

—মেহরীনের এতে কোনো দোষ নেই। ভাইয়া যে তাকে বলতে নিষেধ করেছিলাম।
ভাইয়ের আদুরে কন্ঠে তাহিয়া আরও কেদে উঠে। কান্নাভেজা কণ্ঠে অভিযোগ করতে লাগল,
—কেনো না করেছিলে? আমি কি খুব খারাপ বোন, যে সবাইকে বলে দিবো?
—উহু, একদম না, আমার বোন তো দুনিয়ার সবথেকে বেস্ট বোন।
—তাহলে বললে না কেনো আমাকে?
—আমি চাচ্ছিলাম না এসব এখন বলব, যদি এতে তোর উপর খারাপ প্রভাব পড়…
তালহা থেমে তপ্ত শ্বাস ফেলে। ফের বলল,
—তোর উপর যদি খারাপ প্রভাব পড়ে, আমি নিজেকে মাফ করতে পারব না। ব্যর্থ ভাই হয়ে যাবো। সমাজ যে সবসময় তীক্ষ্ণ নজর রাখে আমাদের উপর। তারা সুযোগ খুজে আম্মুর লালন-পালনে আঙুল তুলতে। এসব জানাজানি হলে আম্মু-আব্বু, তুই এমনকি আমাদের পুরো পরিবারের সকলের দিকে আঙুল তুলবে এই সমাজ। আমি চাই না কেউ আমার বোনের চরিত্রে, বউয়ের চরিত্রে আঙুল তুলুক। আমি চাই না আমাদের আম্মুর দিকে কেউ আঙুল তুলুক। মরা বাপকে নিয়ে কেউ খোটা দিক…
তাহিয়া ফুঁপিয়ে কেদে উঠে। ভাইয়ের বুক থেকে মাথা তুলে, করুণ চোখে চেয়ে বলল,

—ভাইয়া, আমি আর সেই ছোট্ট তাহিয়া নই যে ভালোমন্দ বুঝব না। আমি সব বুঝি। আমি এমন কোনো কাজ করবো না যাতে কেউ আমাদের নিয়ে কটুকথা বলতে পারে। তুমি নিশ্চিন্তে থাকো। যতদিন না নিজ ইচ্ছায় সব সামনে আনবে, ততদিন কোনো কথা আমার মুখ দিয়ে বের হবে না। আমি চাইও না, তোমাদের বিয়ের কথা খারাপভাবে লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ুক। মেহরীনকে সসম্মানে, এ বাড়ির বউরূপে আনবে তো ভাইয়া? মেহুটা জীবনে অনেক কষ্ট-অপমান সহ্য করেছে, এবার তোমার পালা তাকে সুখী করার।

বোনের মুখে এমন পরিপক্ক কথাগুলো শুনে তালহা কয়েকপলক নিশ্চুপ হয়ে তাকিয়ে থাকে। আসলেই কি তার বোন বুঝতে শিখেছে সব। হঠাৎ বুকে এক অচেনা চিনচিনে ব্যথা ঘেঁষে গেল, বোনটা ধীরে ধীরে বড় হয়ে যাচ্ছে। মনে নাড়া দিল, হয়তো কয়েক বছরের মধ্যে তাকে অন্য কারও ঘরে পাঠাতে হবে। সেই চিন্তাটা মাথায় আসলেই মনটা ভারী করে তুলল। হৃদয় যেন এক অদ্ভুত কাঁপন অনুভব করে। যেই বোনটাকে নিজের হাতে বড় করেছে। তাকে নিজের কাছে আজীবন রাখতে পারবে না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে সামলে তালহা মুচকি হেসে তাহিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,

—অবশ্যই, আমি আমার স্ত্রীকে সসম্মানে সকলের সামনে আনবো। আর আমার বোনও অনেক আনন্দ করবে তার ভাইয়ের বিয়েতে।
ভাইয়ের কথায় এতোক্ষনে তাহিয়ার মুখে হালকা খুশির ঝলকের দেখা মিলে।
—সেটা কবে, ভাইয়া?
তালহা ফুঁস করে শ্বাস ছেড়ে মেহরীনের দিকে চোখ রেখে বলল,
—সময় হোক…
তাহিয়াও মেহরীনের দিকে চেয়ে নরম সুরে বলল,

—সময় যখনই হোক, মেহরীনের চরিত্রে যেন কোনো দাগ না লাগে, ভাইয়া।
তালহা বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে হালকা মাথা নেড়ে, নিচে নামার উদ্দেশ্যে হাঁটা ধরল। তাদের দুজনকে নিজেদের মধ্যের সব মিমাংসা করার সুযোগ দিয়ে সময় চলে গেল। মেহরীন অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে তাহিয়ার দিকে। বুঝতে পারছে, মেয়েটা অভিমান করছে। কিভাবে তাকে মানাবে, ভাবতে ভাবতে দু’পা এগিয়ে আসে।
মেহরীন হাত বাড়িয়ে তাহিয়ার হাত ধরতে গেলে তাহিয়া হাত সরিয়ে নিল। মেহরীন অনুতপ্ত সুরে বলল,
—আসলে সত্যিই আমি তোর থেকে ইচ্ছে করে এসব লুকাইনি..
তাহিয়া সাথে সাথে এক হাত তুলে তাকে থামিয়ে বলে। রাগী সুরে বলল,
—হয়েছে, কারো থেকে এক্সট্রা কৈফিয়তের দরকার নেই। এখন সবাই মেডিকেল যাওয়ার জন্য বের হবে। যেতে চাইলে কেউ নিচে নেমে তৈরি হতে পারে।
বলেই ধপধপ পা ফেলে তাহিয়া নিচে নামল। মেহরীন হতাশার শ্বাস ছাড়ল। মেয়েটা অভিমান করে বসেছে, কিভাবে সামলাবে ভাবতে ভাবতে সেও পেছন পেছন নামছে।

—তুই যাবি না, রিতু?
রিতু বিরক্তিতে ‘চ’ করে মাথা নাড়িয়ে বলল,
—নাহ, এতো মানুষের ভিড়ে আমার একদম ভালো লাগে না। তুই তো জানিসই ফারহা, আমার একসাথে বেশি লোক ভালো লাগেনা।
ফারহা চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে বলল,
—তার মানে আমাদের উপস্থিতিতেও তুই বিরক্ত?
রিতু ধপ করে উঠে দাঁড়ায়। কান থেকে ইয়ারফোনটা সরিয়ে ফারহার দিকে এগিয়ে গিয়ে তার মাথায় একটা গাট্টা মেরে জড়িয়ে ধরে,

—উহু, তোদের সাথে তো আমার একটা কম্ফোর্ট জোন তৈরি হয়ে গেছে গাধি, তাই তোদের সাথে ভালোই লাগে।
ফারহা মুচকি হেসে, সেও দুহাতে জড়িয়ে ধরে তাকে। মেয়েটা যাদের সাথে সে মিশে, তাদের কাছে ভীষণ সফট প্রকৃতির। ফারহা তাকে ছেড়ে দিয়ে রিতুর ড্রেসিং টেবিলের সামনে যায় চুল আঁচড়াতে। হঠাৎ টেবিলের উপর একটি ছেলের ছবি দেখে কপাল কুচকে তা হাতে নেয়। তা দেখতে দেখতে রিতুর সামনে এসে দাঁড়ায়,

—এটা কে, রে?
রিতু একপলক তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে,
—রায়হান..
ফারহা ঝট করে তাকিয়ে বলে,
—তুই না, ওর সাথে ব্রেকআপ করে ফেলেছিস? তবে ওর ছবি তোর কাছে কি করছে?
রিতু ছবিটা ছু মেরে নিজের হাতে নিয়ে মনোযোগ সহকারে দেখে। হঠাৎ বিরবিরিয়ে বলে,
—কিছু মানুষ আমাদের মনে থাকে, তবে ভাগ্যে না।
রিতুর কথায় অবাক চোখে তাকায় ফারহা। মোবাইলে যতদূর ওদের টেক্সট, মেসেজ হয়েছে। তাতে তো রিতুর কথা অনুযায়ী সে রায়হানকে একপ্রকার ঘৃণা করত। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে উলটো।অবাক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,

—রায়হানকে এখনো তুই ভালোবাসিস?
রিতু চুপসে যায়। তবে চোখ-মুখে কাঠিন্য এখনো স্পষ্ট। ফারহা উত্তর না পেয়ে নিরবতাকেই সম্মতি ভেবে এগিয়ে এসে রিতুর সামনে বসে,
—তাহলে তুই বিয়েতে মত দিয়েছিস কেনো?
রিতু তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল,
—সে আমার সেল্ফ রেস্পেক্টে আঘাত করেছে।
এন্ড উই নো, আমার কাছে আবেগের চেয়ে সেল্ফ রেস্পেক্ট বড়। তাই ছেড়ে দিয়েছি।
ফারহা চুপচাপ তার কথা শুনে শান্ত গলায় বলল,
—ভালোবাসায় ইগো দেখালে চলে না রিতু। সেক্রিফাইস করলেই পূর্ণতা মিলে।
রিতু চোখ-মুখ কুচকে বলে ওঠে,

—এটা আমার ইগো না, ব্রো। আমার সেল্ফ রেস্পেক্ট এতটাই হাই যে কেউ আমাকে ইগ্নোর করলে, তার দিকে ফিরে তাকানোর ইচ্ছাও আমার মরে যায়। হোক সে আমার কলিজার টুকরা। আর সে আমাকে ইগ্নোর করেছে এখন দেখবে রিতু কি জিনিস।
ফারহা হতাশ হয়ে তাকায়,

—একদিন তুই বুঝবি রিতু। তোর এসব কাজের জন্য একদিন ভীষণ পস্তাবি। সময় থাকতে আমার কথা কানে নে। আমি তোর খারাপ চাই না ইয়ার। আমি তোর ভালো চাই।
—উফ, ইয়ার! বন্ধ কর, আবার শুরু করলি?
ফারহা হতাশ হয়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। এতদিন ধরে চেষ্টা করেও সে পারেনি রিতুকে বোঝাতে। তার চিন্তাধারা,আচার-আচরণ, সবই ভুল জায়গায় গড়াচ্ছে। বারবার বুঝানোর চেষ্টা করেও আজও রিতুকে বুঝাতে পারেনি যে এই আচরণগুলো একদিন তাকে গভীর আফসোসে জর্জরিত করবে।

মেয়েটা অদ্ভুত জটিল। সে কেবল তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে যাদের সাথে সে কম্ফোর্ট ফিল করে, যাদের উপস্থিতি তাকে আত্মবিশ্বাসী বা সুবিধাজনক মনে হয়। বাকিরা? তাদের যেন মানুষই মনে করে না। অবহেলা, রুঢ়তা আর একধরনের শ্রেষ্ঠত্ববোধ, সব মিলিয়ে তার আচরণ এমন যে মনে হয়, সম্পর্ক তার কাছে কিছু নয়। নিজেকে বড় প্রমাণ করাটাই যেন বেশি জরুরি।
এটা কি শুধু ইগো? নাকি অহংকার ও?

একে একে সকলেই বেরিয়ে পড়েছে। এক গাড়ি ইতিমধ্যেই চলে গেছে। আরেকটি গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, তাতে তালহার মামি-মা আর চাচি উঠে বসেছে। মেহরীন ও তাহিয়ার অপেক্ষায় বসে আছে সককেই। তারা এলেই সবাই রওনা দিবে।
—মেয়ে দুটো আসছে না কেনো? একটু দেখ তো, আব্বু।
মায়ের কথায় তালহা মোবাইল পকেটে রেখে হাত ঘড়িটা ঠিক করতে করতে বাড়ির দিকে এগোয়। দরজার সামনে আসতেই চোখে পড়ে মেহরীনকে। হালকা পিংক কালারের গ্রাউন পরেছে, সঙ্গে হিজাব। তাকে দেখতেউ হালকা মুচকি হেসে এগিয়ে যায়। জুতো পড়ছে মেয়েটা। আশেপাশে একবার তাকায়, কেউ নেই, তাহিয়া হয়তো উপরে। সেই সুযোগে এগিয়ে গিয়ে এক হাটু গেড়ে বসে পড়ে।

মেহরীনের হাত থামাতেই তার নজরে আসে তালহা। ফরমাল গেটাপে তার সামনে হাটু মুরে বসে আছে। চোখাচোখি হতেই মেহরীন মুচকি হেসে ওঠে। তবে পরমুহূর্তে হকচকিয়ে যায়। তালহাকে নিজের পায়ে হাত দিতে দেখে। আজ একদিনেই দুবার পায়ে হাত দিয়েছে লোকটা।
দ্রুত পা সরাতে গেলে মেহরীনের পায়ের গোড়ালির আরেকটু উপরে চেপে ধরে থামিয়ে দেয় সে। সাথে সাথে সে থেমে যায়। অতঃপর তালহার দিকে তাকাতেই সে চোখ দিয়ে ইশারা করে পা না নড়াতে। তালহা আস্তে ধীরে হাতটা নামায় নিচে। সময়টুকু তালহার স্পর্শে মেহরীন দাতঁ কিচে দাঁড়িয়ে।

তালহা মেহরীনের জুতোর ফিতা লাগাতে শুরু করে। একটা লাগিয়ে আরেকটায় হাত দিতে গিয়ে হালকা সুরসুরি দিতেউ মেহরীন নড়ে ওঠে। তালহাও মৃদ্যু হেসে ওঠে। এরপর সেটাও লাগিয়ে দেয়। মেহরীন চুপচাপ তালহার দিকে চোখ রাখে। তাকে দেখতে ব্যস্ত। দুজনেই নিজেদের কাজে ডুবে। চারপাশের কোনো হুশ নেই।
হঠাৎ তাহিয়ার কণ্ঠ তালহা উঠে দাঁড়ায়। দুজনেই সিড়ির দিকে তাকায়। হন্তদন্ত পায়ে নামছে তাহিয়া, মেইন দরজার দিকে তাকিয়ে জুড়ে বলছে,

—ওহ, ভাইয়া! তুমিই লাগিয়ে দিচ্ছো? আসলে মেহরীনের কোমড়ে একটু ব্যথা। নিচু হতে পারে না? আমিই সাহায্য করতাম।
তার কথায় তালহা কপাল কুচকে তাকায়। মেহরীনের অবাক চোখ, তার কোথায় কোমরের ব্যথা? দুজনের অবাক দৃষ্টি দেখে তাহিয়া কড়া চোখে পেছনে ইশারা করে। সেদিকে তাকিয়ে জোরপূর্বক হেসে বলে,

—আরে, মামানি! তুমি এখানে, বের হওনি?
তালহা চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। চুলে হাত দিয়ে ঠিক করার ভঙ্গিতে পেছন ফিরে তাকায়। দেখে ছোট মামি তাদের দিকেই চেয়ে আছে। মুহূর্তেই মেজাজ গরম হয়ে যায়, নিজের উপর রাগ হচ্ছে। সে কি করছে, নিজেও বুঝছে না। হুটহাট এসব কি করে বসছে। এভাবে যে বাশ খাবে তা কি ভুলে যাচ্ছে।
ছোট মামি এগিয়ে এসে বললেন,
—তোদের দেরি হচ্ছে, দেখে নিতে এসেছিলাম।
তালহা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—হ্যা হ্যা, আয় তোরা তাড়াতাড়ি…

বলেই ধপধপ পা ফেলে বেরিয়ে যায়। বাকিরাও পেছন পেছন বের হয়। গাড়িতে উঠে বসে। তবে ছোট মামির চোখে সন্দেহ থেকেই যায়। পুরো রাস্তা সে তালহা আর মেহরীনের দিকে তাকিয়ে ছিল।
মেডিকেল পৌঁছে সবাই একে একে তাহসানের সাথে টুকটাক কথা বলে নেয়। কালকে সকালে সিট কেটে বাড়ি নিয়ে যেতে পারবে। তালহারা আসতেই তার বড় মামা-মামীকে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়, খেয়ে ফ্রেশ হয়ে আবার আসবেন তারা। তালহা তাদের রেখেই চাচাদের সঙ্গে অফিসে চলে যায়। দুদিন ধরে অফিসে ঠিকমতো সময় দিচ্ছে না। কাজ জমেছে অনেক।

এদিকে তাহিয়া-মেহরীন দাঁড়িয়ে আছে তাহসানের কেবিনের বারান্দায়। মেহরীন তাহিয়ার সাথে কথা বলার চেষ্টায় তবে তাহিয়া কথা বলবেই না জিদে। এদিকে তাহসান বারবার ঘার ঘুরিয়েমেহরীনকে দেখছে। বেড থেকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা মেহরীনকে স্পষ্ট দেখছে। হঠাৎ ভেতর থেকে দীর্ঘশ্বাস একটা বেরিয়ে আসে তার। মেহরীন একের পর এক কথা বলছে, আর তাহসান তা মনোযোগ সহকারে দেখছে।
কেবিনের একপাশে পাতানো সোফাতে বসে আছে তালহার দাদি-নানি। তিতলি বেগম তাহসানের কাছেই বসে ছিল এতক্ষণ। হঠাৎ তালহার ছোট মামি তাকে বাইরে ডেকে নেয়।
করিডোরের শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে আছে দুজন।

—কি হয়েছে? বলবি তো?
—আপা, আমার কিন্তু ওই মেহরীনকে সুবিধার মনে হচ্ছে না।
ছোট ভাইয়ের বউয়ের কথায় তিতলি বেগম কপাল কুচকে বললেন,
—কি বলছিস? মেয়েটা যথেষ্ট ভালো, ভদ্র, মনমানসিকতাও ভালো।।
—তা ভালোই, তবে আমার ঠিক লাগছে না।
—কিন্তু কেনো? কি করেছে মেহরীন?
—তালহা জোয়ান বিয়ের বয়সী ছেলে। তার সাথে এই মেয়ের বেশি মেলামেশা হচ্ছে না?
তিতলি বেগম ছেলের নামে এমন শুনতেই রাগ চেহারায় ভর করে,
—তুই কি বলতে চাস? আমার ছেলে কেমন, আমি ভালো করেই জানি। সে তার সীমা জানে। আজেবাজে কথা আমার ছেলের নামে বলবি না।

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩২

—আরে আপা, উত্তেজিত হচ্ছো কেনো? আমি খারাপ কিছু বলছি না। ভালোর জন্যই বলছি একটু চোখে রাখো। এখনের যুগ ভালো না..
তিতলি বেগম কথা এড়িয়ে চুপচাপ চলে আসেন। তার ছেলের প্রতি তার অটুট বিশ্বাস আছে। এসব শুনতেও বিরক্ত তিনি। তার উপর এতোদিন ধরে সে থাকতে সে দেখতে পায়নি মেহরীন কেমন? তাই এসব কানেই নিলেন না।

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩৪