প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৬৪
সাইয়্যারা খান
হেমন্ত ছেলে আর শ্রেয়া সহ বাড়ী ফিরেছে। পৌষ তৌসিফ দেখে এসেছে আবার। সাত দিনের আকিকায় থাকবে তারা৷ বিয়ের পর এ বাড়ীতে পা রাখে নি পৌষ। ভীষণ জেদী মেয়েটা, এমন জেদি অবশ্য হওয়া উচিত। যেখানে আত্মসম্মানে আঘাত লাগে সেখানে আপোষ করা নিজের আত্মসম্মানকে অসম্মানিত করার সমান৷ হেমন্ত সব জেনেও অবুঝ হয়। মন চায় পৌষটাকে এনে রাখতে। ছেলেটাকে পৌষের হাতে দিয়ে বলতে, নে পেলেপুষে বড় করে দে। পৌষ দক্ষ হাতে তা করবে সেটা হেমন্ত জানে। ইনি, মিনিকে পৌষ পেলেই বড় করেছে। মায়ের সাথে হেমন্তের কথাবার্তা স্বাভাবিক হয় নি। আদৌ হবে কি না হেমন্ত জানে না৷ তার মন মরে গিয়েছে। সম্মান নড়বড়ে হয়েছে। এখন শুধু মা বলে যতটুকু সম্মান আর কর্তব্য তা পালন করে যাচ্ছে হেমন্ত, এর বেশিকিছু না৷
“আপনি একটু ঘুমান হেমন্ত।”
শ্রেয়ার কথায় ধ্যান ভাঙে হেমন্তের। চোখ তুলে একপলক দেখে অর্ধ জাগ্রত শ্রেয়াকে৷ কোলে তার ছোট্ট দুই দিনের সন্তান। বাবার বাড়ীতে নিতে চেয়েছিলো শশুর-শাশুড়ী কিন্তু হেমন্ত দেয় নি। তারা জোর করেছিলো খুব। একটামাত্র সন্তান তাদের, গর্ভবতী থাকাকালীনও হেমন্ত কাছ ছাড়া করে নি৷ এখন অন্তত দিক একটু কিন্তু অনড় হেমন্তের একই কথা, “স্ত্রী-সন্তান যেহেতু আমার দায়িত্বটাও তো আমার। চাইলেই ছাড়তে পারছি না৷ কিছুসময় যাক, এরপর যাবে।”
তার যুক্তিতর্ক বেশ গোছানো, শশুর শাশুড়ী সন্তুষ্ট জামাতার ওপর। তারা যাতে রোজ আসে হেমন্ত সেটা নিশ্চিত করেছে। হেমন্ত ঘুমন্ত ছেলেকে আলগোছে রাখে বিছানায়। দু’দিনের ছানা বিছানা পছন্দ করে না৷ কোলে ছাড়া ঘুমাতে চায় না৷ শ্রেয়ার পাশে এসে হেমন্ত একটু ঝুঁকলো। শ্রেয়ার কমফোর্ট খেয়াল করে তা নিশ্চিত করলো। হাত ধুয়েমুছে আসতেই দেখলো শ্রেয়া পুরোপুরি তাকিয়ে আছে। হেমন্ত একটু আদর দিলো ওর কপালে। মেয়েটা অল্প আদরের কাতর হয়ে যায়। এই যে হেমন্ত ওর আদরযত্ন করে, এটা তো হেমন্তের একান্ত দায়িত্ব তাহলে কেন শ্রেয়া এতটা আবেগী হয়ে যাচ্ছে? শিয়রে বসে হেমন্ত ওর কপালে হাত রাখে। জিজ্ঞেস করে,
“গলা শুকিয়েছে? রাত হলো অনেক। একটু জুস খাবে?”
শ্রেয়া মাথা নাড়ে। চোখে তার পানি৷ হেমন্ত ওর চোখ মুছে। শ্রেয়া নতমুখী হয়ে বলে,
“আমার খারাপ লাগছে হেমন্ত। আপনি এসব কেন করছেন?”
“আমি না তো কে?”
“কেউ না৷ আম্মু করতো।”
“বউ আমার, সন্তানের মা আমার। ভালোবাসি আমি অথচ আমার ভাগের কাজগুলো অন্য কেউ করবে? কেন শ্রেয়ু? আমার কাজে তুমি সন্তুষ্ট না?”
“আমার খুব গিল্ট ফিল হচ্ছে হেমন্ত।”
“এটা তো আমার হওয়ার কথা। আমার সন্তান এতটা মাস তুমি একা বহন করলে অথচ বাবা বাবা সুখটা আমি পাচ্ছি।”
“আপনি কি জানেন আপনি একজন মহাপুরুষ?”
“নাহ্, এই উপাধিতে ভূষিত হওয়ার যোগ্যতা নেই আমার।”
“আমার কাছে। আমার কাছে আপনি একজন যোগ্য পুরুষ হেমন্ত। একটু বেশিই যোগ্য।”
দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে দু’জন তাকালো ওদিকে। হেমন্ত গিয়ে দরজা খুলতেই চৈত্রকে পেলো৷ হাতে গরম পানির বোল। পেছনে নরম কাপড় হাতে জৈষ্ঠ্য দাঁড়িয়ে। দুই ভাই একটু বোকা বোকা হেসে বললো,
“ভাতিজাকে দেখতে এলাম? ও কি ঘুমায়?”
হেমন্ত সরু চোখে তাকিয়ে বললো,
“জেগে থাকলে শব্দ শুনতি না?”
“ভাবীর পা ব্যথা। গরম পানিতে পা সেঁকতে হবে। এটা নাও।”
হেমন্তের হাতে বোল আর কাপড় দিয়ে দুই ভাই চলে গেলো। শ্রেয়া উঠে বসেছে ততক্ষণে। সন্ধ্যায় একবার বলেছিলো ওর পা ব্যথা।
সেই সন্ধ্যা থেকে পৌষকে নিয়েই আছে তৌসিফ। জ্বরের ঘোরে মেয়েটা একদম মূর্ছা গিয়েছে৷ চোখ মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। ডেঙ্গি হওয়ার সম্ভাবনা করছিলো ডাক্তার। জ্বর এই আসছে, এই যাচ্ছে। এদিকে তৌসিফের দম গলায় আটকে আছে। জ্বরটা ছাড়তেই পৌষটা ছটফট করে। হাত-পা ভীষণ ব্যথা। হেমন্তের ছেলেকে দেখে সোজা হাসপাতালে গিয়েছিলো। রিপোর্টে জ্বরের কারণ তেমন কিছু নেই৷ আয়রন ডিফেসিয়েন্সি পৌষের আগে থেকেই। আজ আবার স্যাম্পল নিয়েছে। ডেঙ্গি নিশ্চিত হয়ে ঔষধ পত্র দিয়েছেন। লাভের লাভ তো কিছুই হচ্ছে না। পৌষটা সুস্থ হচ্ছে না। কিছুক্ষণ আগেই বমি করেছে। বললো, গলা জ্বলছে। পৌষের মাথায় হাত রাখলো তৌসিফ। রাতের ঔষধটা বাকি৷ তখন অবশ্য খায়িয়েছিলো, বমি করে ফেলেছে পৌষ। ডাক্তারকে ফোন দিয়েছিলো তৌসিফ। উনি বললেন আবার খাওয়াতে৷ তৌসিফ ঢোক গিললো৷ তার এই মূহুর্তে কাউকে প্রয়োজন। একা পৌষকে কতটা ভালো দেখবাল করতে পারছে তাও বুঝতে পারছে না ও অথচ তৌসিফ যখন গু লি খেলো কতটাই না সুন্দর মতো সামনে নিলো পৌষ। বিছানা থেকে উঠতে পর্যন্ত দেয় নি তৌসিফকে। মা জাতি বলেই কি এতটা পটুত্ব তার মাঝে?
মাথাটায় হাত বুলিয়ে ডাকে তৌসিফ ক্ষীণ স্বরে,
“পৌষরাত?”
খুব ধীরে ডাকায় পৌষ শুনলো না৷ ওর ফ্যাকাসে ঠোঁট দেখে তৌসিফ ভয় পাচ্ছে। গালটা বেশ গরম৷ গালে হাত দিয়ে ডাকে মুখটা পৌষের মুখের উপর তুলে। নরম স্বরে ডাকতে লাগে পুণরায়,
“হানি, প্লিজ ওয়েক আপ। একটু উঠো৷”
ঘুমের মধ্যে অর্ধচেতন পৌষের মস্তিষ্ক সামান্য কাজ করে। দূর্বল দেহ টলমলে তার৷ চোখটা একটু খুলতেই তৌসিফের বুক চিলিক দিয়ে উঠলো। লাল হওয়া এই চোখ দুটো ওর ভেতরে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। নাহ্, এমন কিছু আগে দেখে নি সে। তার পৌষরাত অসুস্থ। ভীষণ অসুস্থ। তৌসিফ দুই হাতে তুলে পৌষের চিকন দেহটা নিজের বুকের মাঝে নিলো। তপ্ত কপালে চুমু খেয়ে বললো,
“একটু খাবে তোতাপাখি। ঔষধ খেতে হবে।”
পৌষ মাথা নাড়ে। তৌসিফের কপালে মাথাটা ঠেকিয়ে বলে,
“একটা নাপা দিন শুধু।”
তৌসিফের কপালে ভাজ পড়ে। আদুরে স্বরে বলে,
“মেডিসিন দিয়েছে ডক্টর। আগে কিছু খেতে হবে তোতা।”
“আমি তো নাপা খেয়েছি দুপুরেই। আরেকটা দিন। কমে যাবে।”
বেশ ভেঙে ভেঙে জড়ানো কণ্ঠে বললো পৌষ। তৌসিফের কপালের ভাজ বাড়লো৷ দুপুরে আন্দাজে নাপা কেন খেয়েছে পৌষ? তখন তো জ্বর ছিলো না৷ তৌসিফ তো আর জানে না এমন জ্বরের আগে আগেই বড় চাচি নাপা খায়িয়ে দিতো ওকে ছোট থেকে। উটকো ঝামেলা মাথায় নিবে কে? পরে তো পৌষ নিজেই বুঝতে শুরু করলো। জ্বর আসা মাত্রই নাপা খেয়ে নিতো তবুও বেহায়া জ্বরটা মাঝেমধ্যে মানতো না৷ উঠার হলে সে উঠতোই তখন সেবাযত্নটা হেমন্ত করতো। এটা কি কম নোংরা কথা শুনেছে পৌষ? সেঝ চাচি এক চুল পরিমাণ ছাড় দিতো না পৌষকে।
ঠোঁটের সামনে তরল পদার্থের ছোঁয়া পেতেই মুখ ফেরালো পৌষ। তৌসিফ জোর করলো,
“আই প্রমিজ পৌষরাত, শুধু দুই চামচ খাবে৷ ঔষধটা খেতে হবে।”
পৌষের কানে আসে চিন্তিত তৌসিফের কণ্ঠ। ঠোঁট দুটো ফাঁকা করে অল্প খেলো পৌষ। তৌসিফ ঠোঁট মুছে দিলো। পৌষকে একদম বুকের ভেতর নিয়ে রেখেছে সে৷ দুই চামচ কোনমতে গিলেই পৌষ মাথা নাড়লো। তৌসিফ ঔষধের পাতায় হাত দিবে এমন সময়ই পৌষ গুঙ্গিয়ে উঠে,
“আমার শরীর ব্যথা করছে।”
তৌসিফ ব্যতিব্যস্ত হলো,
“এই তো, এই যে ঔষধটা নাও৷ দেখবে ব্যথা চলে যাবে।”
পৌষ খেলো৷ তৌসিফ ওকে শুয়িয়ে নিজে পা দুটো চেপে দিচ্ছে। পৌষ ছটফট করে উঠলো। মুখ চেপে ধরতেই তৌসিফ ধরে বাথরুমে নিলো। পেটে কিছু নেই৷ পিচ্ছিল তরল বেরিয়ে এলো মুখ দিয়ে। প্রচন্ড খুঁতখুঁত স্বভাবের তৌসিফের সামান্যতম ঘৃণা লাগলো না। দুই হাতে আগলে ধরলো পৌষকে। সাদা বেসিনটায় লাল তরল দেখেই মাথাটা নষ্ট হয়ে গেলো ওর। পৌষকে নিজের সাথে চেপে ধরে ডাকতে লাগলো উচ্চস্বরে,
“বুয়া? বুয়া?”
পৌষের কানে ঢুকে না কিছু। সম্পূর্ণ অচেতন হয়ে পড়ে রইলো ও তৌসিফের বুকে। তৌসিফের দুনিয়াটা তখন ছোট হয়ে গেলো। রক্তশূণ্য মুখে আয়নায় দেখলো দু’জনের প্রতিবিম্ব। ভেতরটা চিৎকার করে জানাচ্ছে তাকে, পৌষরাত ছাড়া বেঁচে থাকা অসম্ভব তার নিকট। এই পৌষরাত তার পুরো সত্তা জুড়ে রাজত্ব করে। তৌসিফ তাকে ছাড়া আজ-কাল নিজ অস্তিত্ব কল্পনা করতে ব্যার্থ।
বুয়া সহ মিনু এসেছে তড়িঘড়ি করে। তৌসিফ ততক্ষণে পৌষকে নিয়ে বেরিয়ে এসেছে। ফোনটা কোনমতে পকেটে নিয়ে তারাহুরো করে বলে,
“গাড়ি বের করতে বলো। ফাস্ট!”
বুয়া ছুটে যায়। তৌসিফ বিছানা থেকে পৌষের ওরনা নিলো। কোনমতে ঢেকে দিলো ওকে। পাঁজা কোলে তুলে বেরিয়ে গেলো বাসা থেকে। উদভ্রান্ত ভাবে তৌসিফ সিঁড়ির ধাপগুলো অতিক্রম করছে৷ হঠাৎ করে পৌষকে ভারী মনে হলো। তৌসিফ ভয়ে কুঁকড়ে গেলো ততক্ষণাৎ। বুকে জড়িয়ে রাখা পৌষকে ডাকতে লাগলো বারংবার,
“পৌষরাত? পৌষরাত, প্লিজ চোখটা খুলো। আমার ভুল হয়ে গিয়েছে পৌষরাত৷ তোমাকে তখন বাসায় আনা উচিত হয় নি। তুমি আমার কথা শুনলে না। উঠো, তাকাও প্লিজ। প্লিজ না তোতাপাখি, জাস্ট লুক এট মি।”
এভাবে এলোমেলো ভাবে তৌসিফ বের হয় না৷ বাসায়ও যথেষ্ট পরিপাটি হয়ে থাকার বতিক আছে তার৷ গোছানো এক শক্তপোক্ত পুরুষ সে। পুরুষটাকে নিজের নরম, দূর্বল হাতে যত্ন করে ভেঙেছে পৌষ। তৌসিফ নিজেও সায় দিয়েছে সেই ভাঙাচোরার কাজে। ভাঙার পর আর গোছানো হয় নি তৌসিফের নিজেকে। পৌষের হাতে নিজেকে ভেঙে বরং সে খুশি ছিলো। এতটা যত্ন করে মায়ের পর কেউ ভেঙে মেলে দেখেনি তৌসিফকে৷ উপরটা সবাই দেখেছে। কাছে টেনে ছুঁড়ে ফেলেছে। তৌসিফ ভাঙে নি৷ ভাঙার প্রয়োজন পরে নি তার কিন্তু এবারে মনে হচ্ছে শক্ত থাকা যাবে না৷ পৌষ তাকে খোলস থেকে বের করে ফেলেছে। কিভাবে নিজের কঠোরতা জাহির করবে তৌসিফ? সে তো পৌষের কদমে নিজের প্রেম উজার করেছে। দু-হাত পেতে ভিক্ষা চেয়েছে ভালোবাসা। ফিরতিতে রিক্ততা অবশ্য পৌষ দেয় নি৷ নিজের সবটা উজাড় করে ভালোবাসা দিয়েছে, আদর দিয়েছে, যত্ন দিয়েছে। তৌসিফের বুকের ভেতর প্রচন্ড তান্ডব চললো। নিশ্চুপ থাকা তোতাপাখির বৈশিষ্ট্য না। এই চুপচাপ ভাব মানতে পারলো না তৌসিফ। একটুও না৷
তৌসিফের কণ্ঠ শুনা মাত্রই তুরাগ বেরিয়ে আসে। আদিত্য পৌষকে দেখামাত্রই বাসার পোশাকে বেরিয়ে এলো। মীরা আর অদিতিও নিচ পর্যন্ত নামলো। গাড়িতে উঠে তিনটি পুরুষ ছুটলো পৌষকে নিয়ে। তৌসিফ শান্ত নেই। শান্ত থাকার পরিস্থিতি তার জন্য কেউ তৈরী করে নি।
প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৬৩
গাড়ীটা বাড়ীর গেইট দিয়ে বেরিয়ে যেতেই মীরা আফসোস করলো। পলককে সামান্যতম পছন্দ না করলেও পৌষ কিছুটা মানানসই। একটু ভালোমন্দ রান্না করলেই বাটি করে দিয়ে পাঠাবে। সেই যে একদিন শুনলো অদিতি চিংড়ি মালাই পছন্দ করেছে এরপর থেকে কতবার রেঁধে পাঠালো। মেয়েটা সেকেলে ধরণের। সংসার নিয়ে পড়ে থাকে শুধু। বুয়া থাকতেও নিজের যত্ন না নিয়ে সংসার আর তৌসিফ নিয়েই খেটে যাচ্ছে। সেদিনও মীরা আড়ালে প্রশংসা করেছে ওর।
