Home প্রেমসুধা সিজন ২ প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৭৫

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৭৫

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৭৫
সাইয়্যারা খান

নাস্তার টেবিল জমজমাট। তুহিন খাচ্ছে কম চেঁচাচ্ছে বেশি। হিংসায় জ্বলে যাচ্ছে প্রায়। পৌষকে বলার পরও ওকে তৌসিফের মতো করে নাস্তা দেওয়া হয় নি। পৌষ তৌসিফের নাস্তার পরাটাটা নিজ হাতে বানায়। এদিকে তুহিন অধৈর্য হয়ে যাচ্ছে। তৌসিফ নিজের প্লেটেরটা দিতে চাইলেও মুখের বারোটা বাজিয়ে বসে আছে তুহিন। পৌষ রান্নাঘরে খুব দ্রুত হাত চালাচ্ছে। সে জানতো না হুট করে তুহিন আর আদি আসবে। আদি আসলে অদিতিও চলে আসে। আজ ডো বেশি বানায় নি পৌষ। ওদের দেখে ভেবেছিলো ব্রেড দিয়ে চালিয়ে দিবে কিন্তু তুহিন আয়েশ করে বসেই হুকুম জারি করেছে, সে নাকি মুচমুচে পরাটা খাবে। পৌষ সেই থেকে রান্নাঘরে কাজ করছে। এখানেও তুহিনের সমস্যা। কেন পৌষ আগে তৌসিফকে দিলো? তার প্লেটে কেন দেওয়া হলো না? পৌষ অবাক হয়েও হচ্ছে না। তৌসিফ যাবে বাইরে। সারাদিন যেহেতু বাসায় মেহমান থাকবে তাই সকালেই একবার সাইডে যাবে। এজন্যই পৌষ ওকে আগে দিয়েছে নাস্তাটা। এটা নিয়ে সে কি রাগ জনাবের। মনে হচ্ছে পৌষ মা আর টেবিলে তার বাচ্চাকাচ্চা বসা যারা আগে পরে খাওয়া নিয়ে ঝগড়া করছে। চেঁচাচ্ছে।

“অ্যাঁই ফুপাতো বোন! হয় না তোমার? মানুষকে এভাবে হা ভাতে করে বসিয়ে রেখে রান্নাঘরে ডেরা গেড়েছো? কাজ চোরা কোথাকার।”
গরম তেলে পরাটা উল্টে কাঁধের দিকে মুখ ঘষে ঘাম মুছলো। আজ ভোর থেকেই প্রচুর গরম৷ সেই সকাল এসিটা বন্ধ করার পর থেকেই গরম। যদিও এই ফ্ল্যাটের রান্নাঘরে যথাযথ ঠান্ডা কিন্তু পৌষ উইন্ডোজ খুলে রাখায় রোদ একদম ওর মুখে এসে পরে। ওরনাটা মাথায় দেওয়াতে গরম আরো বেশি লাগছে। এদিকে তুহিন প্রচুর জ্বালাচ্ছে। পৌষ খেঁকালো রান্নাঘর থেকে,
“মুখে চাবিহীনা তালা লাগান নাহয় কপালে কঁচুও জুটবে না।”
তুহিন শোনা মাত্র তৌসিফের দিকে তাকালো। মাত্রই হিংসের দৃষ্টি ছিলো যা মূহুর্তে বিচারের দৃষ্টিতে বদলেছে। তৌসিফ মুখটা গম্ভীর করে নিলো৷ সে এই দুই নমুনার মাঝে বাজে ভাবে ফেঁসে গিয়েছে। তুহিন পানির গ্লাস হাতে তুললো। আদিত্য পরিস্থিতি গরম দেখে ফাঁকা গলায় কোনমতে বললো,

“ছোট চাচ্চু পানি খেও না৷ পেট ভরে গেলে নাস্তা খাবে কিভাবে।”
“ভালো কথা বলেছিস।”
পৌষ প্লেট হাতে দ্রুত পা ফেলে আসছে এদিকে। তুহিনের প্লেটে পরাটা দিয়েই তারাতাড়ি করে ডাল-ভাজি দিলো। গতরাতের বেঁচে যাওয়া গোস্তও গরম করেছে ও। মেহমান আসবে জানলেই না আয়োজন বাড়াতো। লজ্জায় পড়েছে কিছুটা পৌষ। ডিম ভাজা তুহিনের প্লেটে দিয়ে কোনমতে চুপ থেকে বললো,
“গোস্তটা গতকালের।”
“পঁচে গিয়েছে?”
“না না৷ তুলে রেখেছিলাম৷”
তুহিন প্লেট তুলে দিলো। বুঝা গেলো সে খাবে। পৌষ খুব যত্ন করে খাবার বাড়লো। দুটো ডিম তুলে দিলো। পানিটা সহ ঢেলে দিয়ে বললো,

“চা দিব নাকি কফি?”
“যেটা তুমি দিবে।”
তুহিন আয়েশ করে খাবার মুখে দিলো। পৌষ আদিত্য আর অদিতিকে বেড়ে দিতেই তৌসিফ এবারে মুখ খুললো,
“খেতে বসো তোতাপাখি।”
“অহহো অহহো জরু কা গুলাম।”
অপমানজনক কথাবার্তা অথচ তৌসিফের গায়েই লাগলো না কারণ সে স্বেচ্ছায় জরু কা গুলাম হয়েছে। মাথা সামান্য ঢুকালো তৌসিফ। পাশ ফিরে ঠোঁট কামড়ে হাসলো। তার সৌভাগ্য সে জরু কা গুলাম হতে পেরেছে তাও কিনা তার পৌষরাতের। পৌষ বসলো না। খানিকটা নত মুখে বললো,
“তোমরা সবাই আরেকদিন আসবে নাস্তায়। আজ তো আমি কিছুই পারছি না৷”
“তুমি পাগল পুষি? এতসব তো নাস্তায় এমনিতেও খাই না।”
“তবুও।”
তৌসিফ এবারে ওকে হাত ধরে বসালো। পৌষ খেতে বসেও নজর দিয়ে রেখেছে বাকিদের প্লেটে। অদিতি খাবার চিবুতে চিবুতে বললো,

“তুমি অনেক সুস্বাদু করে রাঁধো।”
“তোমার যখন মন চাইবে চলে আসবে অদি।”
“তোমার চিংড়ি মালাই এর কথা তো আমি সবাইকে বলি।”
“আজ করতাম কিন্তু তোমার চাচ্চু রূপচাঁদা আনিয়েছে। আরেকদিন করে দিব।”
মুখে খাবার পুরে পৌষ চা আনতে দ্রুত যেতে নিলেই ওরনার কোণায় টান অনুভব করলো। থেমে গিয়ে পেছনে ফিরতেই দেখলো তুহিন ধরে আছে। এক কোনা টেনে ধরে ঠোঁট দুটো উল্টে বললো,
“আরেকটা খাব।”
পৌষের কুঁচকানো মুখে হাসি চলে এলো। হাত বাড়িয়ে নিজের আধ খাওয়াটা আগে তুলে দিলো তুহিনের প্লেট পরপরই বললো,
“এখনই আনছি।”
“আমিও পুষি।”
“আদিত্যর বাচ্চা!”
ধমকে চলে গেলো পৌষ। তৌসিফের খাওয়া তখন শেষ প্রায় কিন্তু ও উঠে যায় নি৷ বসে আছে ঠাই। ওর বুকের ভেতর হঠাৎ কিছু ভাঙার মতো অনুভূতি হলো৷ এটা কি ছিলো? এই দৃশ্যটা তো ও চিনে। তুহিন যেভাবে পৌষের ওরনার কোনা ধরলো, এই দৃশ্য ওর এই দুই চোখ আগেও দেখেছে। তৌসিফের চোখ দুটো লাল হতে চায়। পানি জমলো কি? তৌসিফ জানে না। নিজেকে সামলাতে ব্যার্থ হওয়ার আগেই উঠে চলে গেলো তৌসিফ।

“শ্রেয়ু? তুমি রেডি?”
শ্রেয়ান বাবার বুকের মাঝে খানিকটা জায়গা দখল করে আছে। কিছুক্ষণ আগেই তাকে দুধ খায়িয়ে দিয়েছে মা। তারপর কোথায় জানি চলে গিয়েছে। বাবা তাকে পোশাক বদলেছে। মুখে, হাতে, পায়ে লোশন মেখে পাতলা সোনালী চুলে জনসন তেল দিয়ে কিছুটা আঁচড়ে দিয়েছে। গলায় সামান্য বেবি পাউডারও দিয়েছে। ছোট্ট প্যান্টের নিচে ডায়াপারও আছে। পায়ে ছোট্ট দুটো কুশিকাটার জুতা। একদম তৈরী সে। দরজার বাইরে শ্রেয়ানের তিন ফুপি আর দুই চাচাও আছে। শুধু নেই শ্রেয়ানের মা।
ইনি, মিনি হালকা আকাশি রঙের ফ্রক পড়েছে। চোখে হাসি। চুল গুলো ছেড়ে সাইড কেটে সিঁথি করা। মা তাদের তৈরী করে পাঠিয়েছেন। পিহা হাত মুচড়ে যাচ্ছে। জৈষ্ঠ্য দরজায় আঙুল বাড়িয়েও থেমে গেলো। বড় ভাইয়ের দরজায় ঠক ঠক করতেও লজ্জা লাগে। চৈত্র ঘড়ি দেখছে। দুপুর হলো বলে। কখন যাবে আপার কাছে। তাদের তর সইছে না। ছোট চাচা লুঙ্গি তুলে দুইপাশ ধরে আসছেন ভেতরে। হেমন্তের ঘরের বাইরে সব কটাকে দেখে দূর থেকেই হাঁক ছাড়লেন,

“কিরে পৌষের পাকবাহিনী, হেমুর দরজায় কি?”
“আপাল কাতে যাব।”
দুই মেয়ের উত্তরে ছোট চাচা মনে করার ভঙ্গিতে বললেন,
“ওও, আজ তো যাওয়ার কথা শুনলাম। আমাকে নিবে নাকি?”
“না না না। তুমি তোমাল আপাল বালি যাও।”
“আমার তো আপা নেই মা।”
ছোট চাচা এগিয়ে এলেন। দুই মেয়েকে কোলে তুমি আদর করলেন। তার মেয়ে দুটো শুকিয়ে গিয়েছে আগের থেকে। যেদিন পৌষের বাড়ী যায় সেদিন পেটটা একটু উঁচু হয়ে থাকে। আরামে ঘুমায়। সাধারণ দিনে ঘুমের মধ্যে কাঁদে। প্রথম প্রথম না বুঝলেও পরে দুধের বোতল মুখে ধরতেন৷ ঘুমন্ত অবস্থায় খেয়ে শান্ত হয় দুবোন। পৌষ আসলে কে ছিলো? ওদের বোন নাকি আরেক মা। উত্তরটা বাড়ীর প্রতিটা সদস্য জানে কিন্তু স্বীকার করতে রাজি না কেউ।
শ্রেয়া বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলো দ্রুত৷ চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে বললো,

“দেড়ী করে ফেললাম?”
“হ্যাঁ কিন্তু আমরা অপেক্ষা করছি।”
হেমন্ত হেসে বুকে থাকা ছেলেকে দুলালো। শ্রেয়া ঘোমটা টানলো৷ বাইরে যেতে যেতে বললো,
“আমি তৈরী।”
হেমন্ত বেরিয়ে গেলো পৌষের পাকবাহিনীর দল নিয়ে। বাড়ীতে কেউ কিছু বলে নি। বলার মুখ কারো বাকি নেই। ও বাড়ী পৌঁছাতে অবশ্য সময় লাগলো না৷ দশ মিনিটেরই তো দূরত্ব।

“হানি?”
“ইয়েস।”
“কাম ফাস্ট।”
“নো।”
“প্লিজ।”
“দুই মিনিট।”
পৌষ বাথরুমের দরজায় টোকা দিলো। ভেতর থেকে তৌসিফ ডাকছে বারবার। দরজা একটু ফাঁকা করে তৌসিফ হাত বাড়িয়ে দিলো। খালি ভেজা হাত বলে পৌষ রেগে নিজের হাত দিয়ে চাপড় দিলো। তৌসিফ খপ করে টেনে ভেতরে নিলো ওকে। পৌষ বিরক্ত হয়ে বললো,
“কি চাই?”
“আমার পিঠে স্ক্রাবিং করে দাও হানি।”

পৌষ আর না করলো না। বেরীর স্ক্রাব থেকে মিষ্টি ঘ্রাণ বেরুচ্ছে। পৌষ ঘ্রাণ টেনে দিলো। হাতে নিয়ে তৌসিফের ফর্সা পিঠেজুড়ে হাত ঘুরালো। মুখ অবশ্য থেমে নেই। এটা থেমে থাকবার মতোই না। তৌসিফ হুঁহা করে উত্তর দিচ্ছে। উত্তর দিতে দিতে তৌসিফ হঠাৎ চমকে উঠেছে। আজ তার জন্য বিশেষ দিন কারণ তার পিঠে পানি ঢেলে বুলেট বিধার দাগে পৌষ চুমু খেয়েছে।
হাত ধুয়ে বের হতেই পৌষ দেখা পেলো সবার। এক প্রকার ঝাঁপিয়ে পড়েছে সকলে। ড্রয়িং রুমে বসে পড়লো পৌষ। তার বুক জুড়ে কিলবিল করলো ইনি, মিনি আর পিহা। কি চায় এরা? কে হয় পৌষ এদের? আপা আপা ডাকে মুখরিত চারপাশ তখনই গলা উঁচিয়ে ডাকলো শ্রেয়ান,
“আ আ আ।”
তাকে কেন এভাবে চাচা, ফুপিদের মতো আদর করা হচ্ছে না এটাই বিচার দিচ্ছে সে। পৌষ হাত বাড়ালো বসা অবস্থায়ই। হেমন্ত ছেলেকে দিতেই পৌষ ওর ছোট্ট নাকে নাক ঘষলো। ডাকলো মধুর স্বরে। শ্রেয়ান বুকে ঘেঁষল। কিছুতো আছে পৌষের মাঝে যা প্রতিটা প্রাণকে টানে তার প্রতি, তার মাতৃস্নেহের সুধার প্রতি।

দুপুর নাগাদ সবাই এসেছে। গমগমে আজ তালুকদার বাড়ীর দোতলার বাম পাশের ফ্ল্যাট। তুহিন এসেছে থেকে ইনি, মিনিকে নিয়ে আছে। খেতে বসেও পৌষকে ওর পাশে থাকতে হয়েছে। পানিটা সহ ঢেলে খাওয়াতে হয়েছে। পৌষ মানুষ পছন্দ করে, মেহমানদারি পছন্দ করে। তুহিনের সাথে তার দুষ্টমিষ্ট সম্পর্কও সবার চোখে মধুরই বটে তবে একজন বাদে। সেই একজনের কিছুতেই সহ্য হচ্ছে না এই সুখ। নিজের কপালে সুখ না থাকলে অন্যেরটাতো চোখে বিঁধবেই।
বিকেলে যখন শ্রেয়ান একটু ঘুমালো তখন তৌসিফ ওকে কোলে নিয়ে বসে রইলো। সে বাচ্চা পছন্দ করে। পৌষ খুব খেয়াল করছে বিষয়টা৷ এতগুলো মানুষ তখন বসে আছে। ওদের মাঝে তুহিন হঠাৎ বললো,

“আমিও যাব হানিমুনে।”
আদিত্য অবুঝ স্বরেই বললো,
“তুমি না হানিমুনে গিয়েছো?”
মাঝে শ্রেয়াও বলে উঠলো,
“আবার যাবেন ভাইয়া? আপু জানে নাকি সারপ্রাইজ।”
“আমি মেঝ ভাইয়ার কথা বলছি। মেঝ ভাইয়া আর পৌষের সাথে যাব।”
সকলে হতবাক, বাকরূদ্ধ হয়ে গেলো। এ যেন ছয়, সাত বছরের দেবড় আবদার করছে ভাই, ভাবীর সাথে হানিমুনে যাবে? এত বড় দামড়া ছেলের মুখে এই কথা বেমানান৷ তৌসিফ চোখ গরম করে তাকাতেই তুহিন রেগে গেলো,

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৭৪

“কি? এভাবে তাকাও কেন?”
পৌষ মুখে কিছুই বললো না৷ শুধু ভাবলো সে কিছুদিন আগেই তৌসিফকে বলছিলো তাকে জ্বালানোর মতো শাশুড়ী, ননদ নেই অথচ সে ভুলেই গিয়েছিলো জ্বলজ্যান্ত তুহিন নামক দেবর আছে তার যে তার হাড় জ্বালাতে সক্ষম।

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৭৬