প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৮৭
সাইয়্যারা খান
আড়মোড়া ভেঙে তুহিন আবারও গা এলিয়ে দিলো সোফায়। পায়ের কাছে বসা ইহান টিফিতে কার্টুন দেখছে। তুহিনের মনোযোগও সেখানেই৷ ইরা মায়ের সাথে দুপুরের খাবার তৈরি করছে। তায়েফা রান্নাঘর থেকেই তুহিনকে জিজ্ঞেস করলো,
“তুসু আজ আসবে না এখানে?”
“জানি না তো আপা।”
“জানিস না মানে কি তুহিন? ফোন দে।”
“ফোন দেওয়া যাবে না এখন।”
“আমি আসলে কিন্তু চট করে একটা চড় বসাব গালে। আসব?”
তুহিন বিরবির করলো,
“এখন মনের ভুলেও কল দিব না আমি৷ আমাকে রিহ্যাবে পাঠালো অথচ নিজে কাল কি কান্ডটাই না দেখালো।”
“তুহিন!”
“কিইইই!”
“চেঁচাবি না। ওরা আসবে কি না খবর নে। তুসুর পছন্দের খাবার রান্না করছি।”
“তোমার হাতের সবই মেঝ ভাইয়া পছন্দ করে।”
“তুরাগটাকেও বল আসতে।”
“এরপর দেশে সব তো কুকুরবিড়াল খেয়ে নিবে আপা।”
তায়েফার গলা শোনা গেলো না আর। তুহিন ফোন হাতে নিয়েও রেখে দিলো। সে বের হবে খেয়েদেয়ে। মেঝ ভাইয়া বিয়ারই খায় ওকেশনালি সেখানে সে স্কচ খেলে এমন দশা করবে তা ভাবতেও তো অবাক লাগছে। তুহিন বিশেষ নজর রেখেছিলো। কাল ক্লাবে পিয়াসী ছিলো না। ওর তো অতটা সাহস হওয়ার কথাও না। সেদিন চরম শিক্ষা দিয়েছিলো মেঝ ভাইয়া এরপরও কি পিয়াসী আসতে পারে? তুহিন ঠোঁট কামড়ে ভাবলো। তার ভাবনা বহুদূর পর্যন্ত ছুটে চলছে। ইহান পায়ে ধাক্কা দিতেই তুহিন ছিটকে ওঠে। ধমকে বলে,
“বেয়াদব! মামাকে ধাক্কা দিস।”
“আরে ভয় পেলে ছোট মামা?”
“একদম ঘাড়টা মটকে দিব পৌষের মতো।”
ইহান হেসে ফেললো। বললো,
“মেঝ মামিকে আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। শি ইজ সো কুল।”
“কুলের হাতে কেলানি খেলে কূল খুঁজে পাবা না। বহুত শিয়ানা ঐ পৌষ।”
“আমার তো কাল অনেক চিন্তা হচ্ছিলো মেঝ মামির জন্য। বেচারী একা ছিলো।”
“আরে ও মেঝ ভাইয়াকে সামলে নিয়েছে। মেঝ ভাইয়া তো এমনিই জরু কা গুলাম।”
“গতকাল খুব নেশা ধরেছিলো মেঝ মামার। আমাদের তো তেমন কিছু হলো না। মামার ড্রিংক কেউ স্পাইক করেছে।”
তুহিন একটু দিকভ্রান্ত হলো। ইহানের মতো ছেলেও এটাও ভাবছে। এরমানে কি তুহিনের চোখের আড়ালে কিছু ঘটেছে?
“হানি, প্লিজ ওপেন দ্যা ডোর।”
তৌসিফ বাথরুমের দরজায় শব্দ করছে। পৌষ উত্তর দিচ্ছে না। নিজের গোসল শেষ করে ইচ্ছে করে বসে আছে এখানে। খুলবে না ও। তৌসিফের কথা তো আরো বেশি করে শুনবে না৷ ব্যাটা বান্দর। তোর মাতলামি পৌষ ছুটিয়ে দিবে। তৌসিফ আবারও ডাকলো,
“পৌষরাত, একটাবার খুলো। দেখো, আমি দাঁড়িয়ে আছি।”
পৌষ উত্তর দিলোই না। তৌসিফ খুব কাকুতিমিনতি করেও গতি করতে পারলো না। পৌষ নিজের মতো সময় নিয়ে বের হলো। বাথরোব পরেই বেরিয়ে এসেছে ও। খুব শান্ত মেজাজে বেরিয়ে এসে এদিক ওদিক খুঁজে নিজের ফোনটা নিতেই তৌসিফ পাকরাও করলো ওকে। দুই হাত বাড়িয়ে ধরতেই কারেন্ট লাগার মতো পৌষ ছিটকে উঠলো। তৌসিফ ভয় পেলো। সরলো একটু। নিজেকে ধাতস্থ করে আবারও পৌষের কাছে এলো। পৌষ ফোন হাতে তুলেছে। উদ্দেশ্য তুহিনকে কল করা। ডায়াল করতে দেড়ী রিসিভ হতে দেড়ী হয় নি। পৌষ খুব শান্ত মেজাজে বললো,
“আমার জামা কাপড়ের লাগেজ সহ প্রয়োজনীয় সব এখানে দিয়ে যান।”
“কি হয়েছে?”
“কিছু হয় নি ভাইয়া। আপনি পারবেন নাকি আমি আপাকে বলব?”
“আচ্ছা, আসছি আমি।”
পৌষ ফোন রাখতে নিলেই তৌসিফ নিজে নিলো। কানে ধরেই বললো,
“তুহিন, লাগবে না কিছু। আমি ব্যাবস্থা করে রেখেছি।”
“তুমি কাল খুব খারাপ করেছো মেঝ ভাইয়া। পৌষ ভয় পেয়েছিলো মনে হয়েছিলো। এই প্রথম ওকে ভয় পেতে দেখেছি।”
তৌসিফ উত্তর দেওয়ার মতো অবস্থায় নেই তবুও কোনমতে বললো,
“আমি দেখছি।”
বলেই কল কাটলো। পৌষ ততক্ষণে রুমে থাকা ক্লোজড থেকে সুইটার, প্যান্ট সহ প্রয়োজনীয় সব বের করেছে। তৌসিফ ওর সামনে এসে ওকে ঘুরালো নিজের দিকে। পৌষ সাথে সাথে হাত দিয়ে নাক চেপে ধরলো। তৌসিফ ঢোক গিললো। একটু দূরে সরে বললো,
“আ.আমি এখনই শাওয়ার নিয়ে আসছি।”
তৌসিফ যাওয়াতে পৌষের সুবিধা হলো। কাপড় পরে ভেজা চুল ছেড়ে দিয়ে রুমটা দেখলো। এলোমেলো রুমটা দেখে ক্ষুদ্র শ্বাস ফেললো ও৷ দেশে ফোন করলো শ্রেয়াকে। দ্বিতীয় বারে ফোন রিসিভ হয়েছে। স্ক্রিন এড দিলেও পৌষ কেটে দিলো। মুখটা দেখানোর মতো নেই আপাতত। অডিও কলে কথা বলতেই শ্রেয়া বললো,
“সবাই দেখতে চাইছে পৌষ। ভিডিওতে আসো।”
“পরে আসব ভাবী। এখন একটু কথা বলব।”
“আচ্ছা, ইনি, মিনি তো পাগল হয়ে যাচ্ছে। কতদিন দেখে না৷ হানিমুনে কি কি করলি? ঘুরেছো কোথায় কোথায়?”
“জাহান্নাম ঘুরানো শেষ ভাবী। তুমি বলো, শ্রেয়াণ কি করে?”
পৌষের কথাবার্তা এমনই৷ একটু লাগামহীন তাই শ্রেয়া ততটা ঘাটলো না। উত্তরে বললো,
“এই যে হাত-পা ছুঁড়ে খেলছে। আজকাল খুব চিনে সবাইকে।”
“আমাকে ততটা চিনবে না। না চেনাই ভালো। আমি সুবিধার না ততটা৷ ফুপি ডাকটায় কেমন জানি৷ মনের শয়তানি জেগে ওঠে।”
শ্রেয়া হাসছে। তৌসিফ বেরিয়ে এসেছে। ঘন্টা খানিক লাগিয়ে গোসল নিয়ে এসেছে সে। তৌসিফ কোমড়ে তাওয়াল পেঁচিয়েই পৌষের কাছে এসেছে। পৌষ প্রথমে সরে গেলো, তৌসিফ ওর থেকে সরছেই না৷ পৌষ কল কাটলো। উঠে দূরে গিয়ে হাতের বোতল ছুঁড়ে দিলো তৌসিফের দিকে।
“আহা, আহা, মাবুদ! পৌষরাত, শুনো তো আমার কথা।”
নিজেকে বোতলের আঘাত থেকে বাঁচিয়ে তৌসিফ নিজ বক্তব্য রাখতে চাইলো। তার তো নিজের মাথায়ই কিছু ঢুকছে না বউকে বুঝাবেটা কি? চেষ্টায় অবশ্য কমতি রাখা যাবে না। তৌসিফ পৌষের হাত ধরলো। অনুরোধ করে নরম স্বরে বললো,
“স্কচ খেয়ে মাতাল হয় না হানি।”
পৌষ মৌন রইলো এতে জ্বালা বাড়ালো বৈ কমলো না। কপাল ঘামতে শুরু করলো। তৌসিফের কোনভাবেই মনে পরছে না কিভাবে এসব হলো৷ কেউ নিশ্চিত আকাজ করেছে তার ড্রিংক নিয়ে। পৌষ কথাবার্তা বলে চেঁচালে নাহয় তৌসিফ বুঝাতে পারতো। কথা মানাতে পারতো। এই প্রথম সে নীরবতা বেছে নিয়েছে। তৌসিফের শ্বাস গলায় আটকে আসতে চাইছে। বউ তার খুব আদরের। তৌসিফ নিজেই তাকে অসুস্থ বানিয়ে ফেলেছে। এত সুন্দর দিনটাই মাটি হয়ে গেছে। তৌসিফ পৌষের হাত ধরলো। পৌষ তাকিয়ে রইলো অন্যদিকে। তৌসিফ খুব বুঝানোর ভঙ্গিতে বললো,
“কথা বলো প্লিজ। তুমি কথা বলছো না। আমার খুব খারাপ লাগছে পৌষরাত। আমি ভুল করেছি, মাফ চাইছি। শুনো তো। একটু তাকাও।”
পৌষ ঠ্যাটার মতো ঘাড় ঘুরিয়ে রাখলো। তৌসিফ ঠোঁট চেপে মাথা নিচু করলো। কিভাবে বুঝাবে ও পৌষকে। ওর নিজের মাথাই তো খালি হয়ে আছে। তৌসিফ মনে মনে তওবা কাটলো। সে জানতো না পৌষ ড্রিংক করা নিয়ে এতটা রিএক্ট করবে। তার ধারণার বাইরে ছিলো সবটাই। তৌসিফ বুঝাতে চাইলো,
“আমি ইচ্ছে করে কিছু করি নি৷”
পৌষ কথাই বললো না। তৌসিফ খুব বিপাকে পড়লো। অস্থির হলো। সে আজ আরেকবার বুঝলো পৌষ তার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে তার কথা না বলা নিয়ে তৌসিফ অস্থির হয়ে পড়েছে। পৌষের গাল দুটো ধরে নিজের মুখোমুখি করে খুব মিনতি করলো,
“আমাকে মা’রো, কাটো কিন্তু কথা বলো। তুমি আমার তোতাপাখি না? তোতাপাখি কথা বললে হয়? আমি ইচ্ছে করে কিছু করি নি হানি।”
দাঁত মুখ শক্ত করে ফেললো পৌষ। ওভাবেই বললো,
“আমি নিজ চোখে বোতল গিলতে দেখেছি।”
“ওটা সামান্য স্কচ ছিলো।”
“আমি শুনতে চাই নি। আপনি মদুক্তি আমি জানতাম না৷ আল্লাহ, এই এতিমকে এক মাতাল, নেশাখোর দিলে সবশেষে? তার চাইতে একটা রিক্সা ওয়ালা দিতে।”
তৌসিফ পৌষকে দুই হাতে বুকে চাপলো। পৌষ থাকলো না। ধস্তাধস্তি লাগতেই তৌসিফ ওকে শান্ত করতে চাইলো। কপালে অসংখ্য চুমু খেয়ে বললো,
“আমি নেশাখোর না পৌষরাত।”
“চোখে দেখেছি, ভুগেছি। আরো কিছু বলার আছে আপনার?”
তৌসিফ এবারে ভালো মতো তাকালো পৌষের দিকে। ঠোঁট দুটো খুব জখম হয়েছে। হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিলো ও। চরম ব্যাথিত হয়ে গেলো সাথে সাথেই।
“আমি কিভাবে যে এতটা…”
“এসব খুব স্বাভাবিক। নেশাখোড়দের বউ হলে এমন তো হবেই।”
“পৌষরাত।”
তৌসিফ খুব অনুতপ্ত। পৌষের পায়ের দিকে দেখে বললো,
“এটা একটু ব্যান্ডেজ করিয়ে দেই।”
বলেই ফোন হাতে নিয়ে কল দিলো রিসিপশনে। পৌষ সাথে সাথে না করলো,
“এগুলোর অভ্যাস করতে হবে তো। কপালে লাত্থি উষ্টাই তো আছে।”
“এভাবে বলো না হানি৷ আ’মি তোমাকে আঘাত করতে পারি?”
“লজ্জা করে না ফাইজলামি করতে? কাল পা বাড়িয়ে ল্যাং দিয়ে ফেলে দিয়েছেন আমাকে।”
“আমি?”
তৌসিফ হতভম্ব হলো। পৌষ সরতে নিলো। করাবে না চিকিৎসা। তৌসিফ অনুরোধ করলো,
“তুমি আমাকে যেকোনো শাস্তি দাও তবুও পায়ের ব্যান্ডেজটা করো।”
“একটা শর্তে।”
“সব মেনে নিব।”
“হয়েছে?”
তৌসিফের ঠোঁট দুটো সাদা হয়ে এসেছে। পৌষ তখন আপন মনে লেবু চিপছে আরেক গ্লাসে। সুন্দর মতো তৌসিফের হাতে দিয়ে বেশ আগ্রহ নিয়ে বললো,
“কেমন লাগে?”
“উম, ভালো।”
মুখে টকটক শব্দ করলো তৌসিফ। পৌষ আরেক গ্লাস এগিয়ে দিলো। তৌসিফের মুখটা একদম চুপসে যাওয়া লেবুর মতোই দেখাচ্ছে। তৌসিফ এক ঢোকে গিলে নিলো সবটা। পৌষ আরেকটা শট বানিয়ে মুখের সামনে ধরলো। তৌসিফ এই আপদ নিজে ঘাড়ে এনেছে। চেয়ে চেয়ে শাস্তি নিয়েছে। এখন ভুগছে। শেষ এবারে করতে পারলো না ও। মুখে বমি চলে এসেছে। দৌড়ে বাথরুমে চলে যেতেই পৌষ দাঁতমুখ শক্ত করে নিলো পুণরায়৷ কর ব্যাটা তুই বমি। বমি করে করে সিডনি শহর ভাসিয়ে দে। তোকে ঘোল না খাওয়ালে পৌষও পৌষ না৷
“হলো?”
“আসছি।”
তৌসিফ মুখ মুছে বেরিয়ে এলো। পৌষ আরেকটা গ্লাস এগিয়ে দিলো। ময়াদায়ার ছিটেফোঁটাও নেই ওর মুখে। তৌসিফ বসলো। দাঁত দিয়ে আগামী দুই দিন বোধহয় কিছু খাওয়া যাবে না। বসা মাত্রই বেল বাজলো। তৌসিফই খুলেছে। একজন স্টাফ আর নার্স এসেছেন৷ তৌসিফ পৌষের দিকে অসহায় ভাবে তাকালো। পৌষ দায়সারা ভাবে বললো,
“অর্ধেক ব্যান্জেজ করুক।”
“প্লিজ।”
“করুক অর্ধেক।”
তৌসিফ কাপটা হাতে নিয়ে গট করে গিলে নিলো। পৌষ পা বাড়িয়ে দিলো। শুধু মাত্র তৌসিফ চেয়েছিলো বলে ব্যথা পায়ে নিয়ে হিল পরেছিলো ও অথচ এই লোক ওকে জ্বালিয়ে মেরেছে।
মাত্রই খাবার দিয়ে যাওয়া হয়েছে রুমে। পৌষ মুখেও তুলবে না। তৌসিফ ওর সামনে বসলো। হাত দুটো ধরে নিজের কাছে নিয়ে বললো,
“তুমি কোনদিন বলো নি ড্রিংক পছন্দ করো না।”
“আমি জেনে বসে আছি আপনি মদুক্তি?”
পৌষের ঝাঁঝালো কণ্ঠ। তৌসিফ নিচু স্বরে জানালো,
“বিয়ার তো পার্টি অফিসে প্রায় খেতাম আগে। এখন কম খাই। অনেকদিন পর এত কাছাকাছি এসে সামলাতে পারি নি। আর এতটা মাতাল আমি প্রথম হয়েছি পৌষরাত।”
“কি গর্বের কথা। আহারে, গর্বে আমার পেট ফুলে উঠছে।”
“পৌষ…”
“বারবার আমার নাম ডাকবেন না৷”
“খেয়ে নাও।”
“ওয়াদা করুন এসব ছাইপাঁশ খাবেন না আর। কোনদিনও না।”
তৌসিফ আঁতকে উঠলো। বুকটা কেঁপে উঠলো। এত কঠিন ওয়াদা সে কিভাবে করবে? পৌষ বলতেই থাকলো,
প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৮৬ (২)
“যে নারীসঙ্গ ত্যাগ করতে পারে সে নেশাপানিও ত্যাগ করতে পারবে।”
তৌসিফ মুখ তুলে তাকালো। পৌষের হাতটা আরো শক্ত করে ধরে বললো,
“তোমার জন্য।”
“পানি আনুন।”
তৌসিফ উঠে পানি আনতে যাবে তখনই নিজের ব্যান্ডেজ করা পা এগিয়ে দিলো তৌসিফ। ল্যাং দিয়ে ফেলে দিলো তৌসিফকে। তৌসিফ ধপ করে পরেছে। পৌষের দিকে তাকিয়েছে আহম্মকের মতো।
