প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৩১
নওরিন কবির তিশা
পূর্ব-দিগন্তে রক্তিম আভার ছোঁয়া লাগে নি তখনো, কেবল আকাশের গাত্রে একটি স্নিগ্ধ, শুভ্র আলোর আগমনী বার্তা। বাতায়নের ফাঁক দিয়ে সেই ফ্যাকাশে আলো এসে পড়ছে নিদ্রিত তিহুর ঈষৎ আরক্তিম মুখে। উত্তাপের রেশ তখনো সম্পূর্ণ কাটে নি, তবে জ্বর কমেছে খানিকটা।
নীল তখনো গাঢ় ঘুমে মগ্ন। সারারাত নির্ঘুম কাটিয়ে মাঝরাতে ঘুমানোর দরুন, তন্দ্রাচ্ছন্নতা দ্বিগুন আজ।তবে তার বলিষ্ঠ বক্ষঃস্থল আঁকড়ে ধরে আছে তিহুকে, যেন কোনো মহার্ঘ্য ধন। সমগ্ররাত সে অভিমানীর অসুস্থ শরীরের উষ্ণতা নিজের মধ্যে নিয়ে, তাকে শান্তিতে ঘুম পাড়াতে ব্রত নিয়েছিল। গভীর নৈকট্যের ফলস্বরূপ দুইজনের শয্যা-বন্ধন তখন নিবিড়তম।
আলোক রশ্মি ঘুমন্ত ডাগর চক্ষুদ্বয় গ্রাস করতেই পিট পিটিয়ে তিহু চোখ মেলল। তবে প্রথম মুহূর্তেই সে অনুভব করল—একটি দুর্ভেদ্য আলিঙ্গন তাকে বেষ্টন করে রেখেছে। তার হৃদস্পন্দন হঠাৎ দ্রুত হলো, পরক্ষণে সে নীলের ঘুমন্ত প্রশান্ত মুখের দিকে দৃষ্টি ফেরালো। এই রাঙা প্রভাতে তার পৌরুষ-দীপ্ত মুখখানা যেন সমস্ত দ্বিধা দূর করে এক অনির্বচনীয় নির্ভরতার আভাস দিচ্ছে।
তিহু মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকলো অনিমেষ। হুট করে চোখ মেলে চাইল নীল।তিহু এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে;ঘুম ঘোরে মুচকি হাসলো, ঘুম জড়ানো কন্ঠে বলল,,—’সুপ্রভাত, মিসেস খান সাহেবা।।
ঘুম জড়ানো গভীর সে কন্ঠে যেন মিশে আছে আ*ফি*মের মাদকতা। ঘোর লেগে গেল তিহুর।কণ্ঠস্বরের সেই গভীরতা, সেই পুরুষালী স্নিগ্ধতা তিহুর বুকে এক অচেনা শিহরণ জাগালো।বহু কষ্টে নিজেকে সামলে, সে বললো,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
—’সরুন।
দুর্বল এক ধাক্কা দিল সে। নীল তাতে নড়লো না এক ইঞ্চিও। বরং ঘুমঘোরে মুচকি হাসলো ফের। তিহু এবার বেশ রেগে গেল। এক ধাক্কায় তাকে সরিয়ে, উঠে গেল বিছানা থেকে। তার ধুপধাপ পদধ্বনিতে সেদিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো নীল। ফের পাড়ি জমালো ঘুমের রাজ্যে। কাল সারারাত জেগে প্রিয়তমার সেবা-শুশ্রূষা করেছে যে। শরীরটা বড্ড ক্লান্ত, সামান্যতেই রাজ্যের ঘুম এসে উপস্থিত হলো চোখের পাতায়।
দীর্ঘ একটা শাওয়ার শেষে, সমস্ত ক্লান্ততা ধুয়ে মুছে সাফ করে তবে বের হলো তিহু। বেরোতেই দেখতে পেল এখনো বিছানার উপর উপুড় হয়ে ঘুমাচ্ছে নীল। কিছুটা চোখ সরু করে সেদিকে তাকিয়েই পর মুহূর্তে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল দীঘল আয়নাটার দিকে। নিজের জলস্নাত সুস্নিগ্ধ অবয়বের পানে তাকিয়ে এর আরেকবার আতসীতে বিদ্যমান নীলের ঘুমন্ত প্রতিচ্ছবির পানে তাকালো সে।
কি জানি কি ভেবে আনমনে মুচকি হাসলো;তখনই হুট করে তাকালো নীল, তার মুখে লাজুক হাসি রেখা দেখে পুনরায় ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বললো,,
—’কি দেখছো?
আবারও একই কন্ঠে থমকালো তিহু, এ কেমন মোহ? এ কেমন ঘোর?কোনো পুরুষের ঘুম জড়ানো কণ্ঠ যে এতটা আবেদনময় হতে পারে সেটা হয়তো নীলের কন্ঠ না শুনলে কখনোই বিশ্বাস হতো না তিহুর। নীল তখনও একই কন্ঠে বলল,,
—’নুর?
এবার যেন ধ্যান ভাঙল তিহুর। দ্রুত দৃষ্টি ঘুরিয়ে চটজলদি কণ্ঠে সে বলল,,
—’আমি কখন দেখলাম?
নীল ততক্ষণে উঠে বসেছে, তিহু এক ঝলক ঘুরে তাকালো তার দিকে। সঙ্গে সঙ্গে ভেজা চুলের জল কণারা ছিটকে পড়ল নীলের চোখে মুখে। দ্রুত চোখ বন্ধ করে মুচকি হাসলো নীল, সামান্য পিটপিট করে চোখ খুলে বলল,,
—’সাচ আ লাভলী স্মেইল, আই রিয়েলি অবসেসড উইথ ইট।
তিহু বিস্মিত কন্ঠে বলল,,—’এত সামান্য জলকনা? এখানে আপনি স্মেইল পেলেন কোথায়?
নীল বিছানা থেকে নামতে নামতে বলল,,—’ও তুমি বুঝবে না।
বলেই বোকা দৃষ্টিতে চেয়ে থাকা তিহুর দিকে এগিয়ে আসলো সে। পার্শ্ববর্তী হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রাখা টাওয়াল টা নিজের হাতে নিয়ে এগিয়ে আসলো বাঁধনহারা কেশরাজীর তার অপরূপা রমণীটির দিকে। ঠিক পিছনে এসে দাঁড়ালো তিহুর, আয়নায় নীলের প্রতিচ্ছবি নিজের একেবারে কাছাকাছি দেখে কিঞ্চিত বিস্মিত হয়ে তিহু পিছন ঘুরলো।
—’আপনি?
নীল তাকে ফের আয়নার দিকে ঘুরিয়ে, আলতো হাতে তার ভেজা চুল গুলো মুছিয়ে দিতে দিতে বলল,,
—’ডান হাতের ইনজুরিটা বেশ ডিপ। নিজে নিজে চুল শুকাতে পারবেন না ম্যাডাম।
তিহু বিস্মিত দৃষ্টিতে আয়নায় প্রতিচ্ছবির পানে চাইল। নীল কিভাবে জানল তার হাতে ব্যথার কথা? নীল তিহুর এমন বিস্মিত প্রতিচ্ছবি দর্পণ দেখা মাত্র মৃদু হাসলো। সুদীর্ঘ কেশরাজ টাওয়াল দিয়ে আলতো করে মোছা পরবর্তী হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে শুকিয়ে দিল তা। তবে পরমুহূর্তে বেশ চিন্তিত কণ্ঠে বলল,
—’চুলে কি বিনুনি করবে?
তিহু চোখ কুঁচকে বলল,,—’আপনি বিনুনী করতে পারেন?
—’উমম…..! ট্রাই করতে পারি।
তিহু লুক্কায়িত হাসলো, মুখে বললো,,—’কেন? আগে কোনো মেয়ের চুল বিনুনি করেছেন নাকি?
—’উল্টাপাল্টা কথা বলোনা। জাস্ট সে,চুল কি বিনুনি করতে চাও?
—’না খোঁপা। এই চুল বিনুনি করলে গরমে সারাদিন অস্বস্তি লাগবে।
—’ওকে, অ্যাজ ইউর উইশ।
নীল পরমুহুর্তেই নিজের মোবাইল অন করে, ইউটিউবে খোঁপার টিউটোরিয়াল সার্চ দিলো। তার এমন কাণ্ডে মুখ চেপে হাসতে হাসতে শব্দ করে হেসে উঠল তিহু। তাকে এমন হাসতে দেখে, ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তাকালো নীল। তিহু নিজেকে সামলাতে সামলাতে বলল,,
—’স্যরি,স্যরি।
পরমুহূর্তেই ফের হেসে বলল,,—’কিন্তু খোঁপার টিউটোরিয়াল সার্চ করে কে?
নীল মাথা ঘামল না তার কথায়। বরং ইউটিউব থেকে মনোযোগ দিয়ে টিউটোরিয়াল টা দেখে ধীরে ধীরে বাঁধতে লাগলো তিহুর চুল। কিন্তু বিপত্তি বাঁধলো অন্যথায়, তিহুর হাঁটু ছাড়ানো চুলগুলো আয়ত্তে আনতে বেশ বেগ পেতে হলো নীলকে। আয়নায় তার এমন নাজেহাল দশা দেখামাত্র হেসে চলেছে তিহু।
—’পারবেন না পারবেন না রেখে দিন। সবকিছু সবাই পারেনা।
—’আর যদি পারি।
—’পারবেন না।
—’যদি পারি।
—’উমম…. তাহলে আপনি যা চাইবেন তাই দিব।
নীল বাঁকা হাসলো সামান্য,,—’শিওর?
তিহু কিছু না ভেবেই বলল,,—’আ’ম অলওয়েজ শিওর।
—’ওকে, বাট মাইন্ড ইট। যা চাইবো তাই কিন্তু।
—’হুম, হুম,মিস্টার। এই নুরাইন হক তিহু কখনো কথার খেলাপ করে না।
কি জানি কি ভেবে বাঁকা হাসলে নীল।
অবশেষে দীর্ঘ এক প্রচেষ্টা শেষে, সুদীর্ঘ সে কেশরাজ অপটু হাতে খোপা বদ্ধ করতে সফল হলো নীল। বিশ্বজয়ীর ন্যায় বিজয়ী হাসলো সে। কিন্তু তিহু পড়লো বিপাকে। নীল তার এমন অবস্থা দেখে, আয়নায় তার দিকে তাকিয়েই বলল,,
—’সো? মিস নুরাইন হক তিহু ওরফে মিসেস খান সাহেবা, আর ইউ রেডি টু ফুলফিল ইওর কমিটমেন্ট?
তিহু ভেতরে ভেতরে ঘাবড়ে গেলেও বাইরে তার লেশ মাত্র প্রকাশ করল না,,—’কি চান আপনি?
খাদে নামানো কন্ঠে নীল বলল,,—’যদি বলি তোমাকে।
‘মানে?——অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে তাকালো তিহু।
তার এমন দৃষ্টিতে শব্দ করে হেসে উঠল নীল। আলতো হাতে তিহুর নেকলেস টা ঠিক মতো পরিয়ে দিয়ে প্রস্থান করল ওয়াশরুমের দিকে। সে চলে যেতেই তিহু, তার প্রস্থান পথের দিকে চেয়ে বলল,,
—’ইউ নো মিস্টার গিটারিস্ট? আমি অনেক আগেই আপনার হয়ে গিয়েছি। এখন শুধু আপনি সেটা বুঝে নিন। অধিকার দেখান;ছিনিয়ে নিন,যত সময় লাগে লাগিয়ে নিন, তবে বুঝতে আপনাকেই হবে। আপনার খান সাহেবা ভালোবেসে নিঃস্ব হলেও কক্ষনো শিকার করবে না তা। আপনাকেই বুঝে নিতে হবে।
—’আই ওয়ান্ট টু ব্যাক বিডি আম্মু।
বহুদিন পর ছেলের মুখে বহুল প্রতীক্ষিত কথাটা শুনে গলা ধরে আসলো আদ্রিতা আনমের। স্পষ্ট কর্নগত হওয়া কথাগুলোও ভ্রান্তির ন্যায় লাগল তার। ভেজা কন্ঠে ফের শুধালো,,
—’সত্যি বলছিস বাবা। সত্যিই ফিরবি তুই?
মায়ের কান্না জড়িত কন্ঠে আরহাম তাকে শান্ত করতে বলল,,—’রিল্যাক্স আম্মু। আমি খুব দ্রুতই ফিরছি। হয়তো এই সপ্তাহেই।
খুশি ধরে রাখতে পারলেন না আদ্রিতা আনম। আনন্দ অশ্রুতে চোখ বেয়ে জলের ফোয়ারা নামল তার। তার ১৮ বছরের নিতান্তই নাবালক ছেলেটি, সেই যে বিদেশ গিয়েছিল আজ প্রায় দশ বছর পর, একজন সফল ডাক্তার হয়ে দেশে ফিরছে সে। খুশিতে আনন্দের জোয়ার বইছে রন্ধে রন্ধে তার।
—’চলে আয় বাবা, যত দ্রুত পারিস আয়। তোর মায়ের শূন্য কোলটা বহুদিন খা খা করছে। আনন্দের বন্যায় সজীব কর সেটা।
আরহাম হাতে থাকা তিহুর ছবির পানের দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বলল,,—’ফিরব আম্মু। ইনশাআল্লাহ এই সপ্তাহেই ফিরবো। তুমি শুধু তোমার ছেলের সুখকে তার কাছে আনার ব্যবস্থা করো।
—’তুই আয় বাবা, সমস্ত ব্যবস্থা করে রাখবো আমি। তোর সুখ তোর তোতা পাখি শুধু তোরই হবে ইনশাআল্লাহ।
আরহাম মৃদু হাসলো। এই গোটা ধরণীতে একটাই মানুষ, যে কিনা সবচেয়ে ভালো বোঝে তাকে। তার তোতা পাখির সম্বন্ধে জানে। তার তোতা পাখিকে তার কাছে আনার ক্ষমতা রাখে। দীর্ঘ সময়ের বাক্যালাপ শেষে ফোন রাখলো সে। ফ্লোরা ততক্ষণে তার কেবিনের বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে। আরহাম ফোন রেখে; দ্রুত তিহুর ছবিটা ড্রয়ারে রেখে; ফ্লোরার উদ্দেশ্যে বলল,,,
—’কিছু বলবে ফ্লোরা?
—’তুমি বিডি ব্যাক করতে চাচ্ছ?
আরহাম খুশি মনে বলল,,—’হুম।
ফ্লোরা মলিন হেসে বলল,,—’ওহ দ্যাটস গ্রেট। তা কবে যাবে?
—’এইতো এই সপ্তাহেই।
—’এই উইকেই? তা আমাকে তো কিছু জানালে না?
—’ভেবেছিলাম বলব কিন্তু বলা হয়ে ওঠেনি।
—’ওহ।
দীর্ঘক্ষণের পিন পতন নিরবতা, হঠাৎ ফ্লোরা বলল,,—’আমাকে সাথে নেবে?
আরহাম বিস্মিত দৃষ্টি জোড়া তার দিকে স্থির করে ভ্রু কুঞ্জনপূর্বক বলল,,—’মানে?
—’আই ওয়ান্ট টু সি ইউও লাভবার্ড। বাংলাদেশ অলসো।
আরহাম কিছু একটা ভাবল, পরক্ষণে সম্মতিসূচক মাথা নাড়িয়ে বলল,,—’ওকে যেও না হয়। আমি এবার গিয়েই আমার তোতাকে আপন করেছি। অ্যাজ মাই ক্লোজ ফ্রেন্ড তোমার সেখানে উপস্থিত থাকা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
—’ওকে, তাহলে আমি লাগেজপত্র গোছানো শুরু করি?
—’হুম, অফকোর্স।হোয়াই নট?
ফ্লোরা মলিন হেসে স্থান ত্যাগ করল।আরহাম তার প্রস্থান পানে চেয়ে, মুচকি হাসলো শুধু।
—’ওয়াটস আপ মিস চুন্নি? আমাকে ধাক্কা দিয়ে লাভ হলো না তো? কিভাবে হবে বলো, নীল ছিল না?
তার এমন কথা রাগের আগুনে ঘি ঢালার ন্যায় কাজ করলো মুন্নির। তবে তাতে তিহুর কি? সে তো মুন্নিকে জ্বালাতেই কথাটা বলেছে। মুন্নিই যে ধাক্কাটা মেরেছিল তা শতভাগের নিশ্চিত তিহু।কেননা তখন তার পাশে একমাত্র মুন্নিই ছিল।
এদিকে তার কথায় ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালো মুন্নি। দোতলার করিডোর পেরিয়ে নিচের দিকে যাচ্ছিল সে। হুট করে মাঝপথে তিহুর এমন কথায় থামলো তার পদচরনা। তাকে কিছু বলতে যাওয়ার আগেই তিহু ফের বলল,,
—’তুমি রিসোর্ট ম্যানেজমেন্টের লোকটার ব্যাপারে শুনেছ তো তাই না? না শুনলেও বলি, নীল তার পাকোড়া বানিয়ে দিয়ে এসেছে। আর রইল বাকি তোমার কথা? ও এখনো তোমার সম্পর্কে অবগত নয়,আর আমি জানাতেও চাচ্ছি না। জানো,চলতি পথে এমন দু-একটা কাটা সবার বাঁধে; তাই বলে রাস্তায় কুকুর আমায় কামড়ালে কুকুরকেও কি আমি কামড় দিব নাকি? কুকুরের কাছে কামড় দেওয়া, আর কাল নাগিনীর কাজ কাজ ফোঁস করা। তাই বলে আমি তো আর তাদের ক্যারেক্টারে যেতে পারি না!
নতুবা যেখানে নীল কোন দোষ না থাকা সত্ত্বেও জাস্ট ফর মি ম্যানেজমেন্টের লোকটার অমন অবস্থা করতে পারে।সেখানে আসল কালপিট কে হাতে পেলে ও কি করতে পারে, সেটা হয়তো তোমাকে আর বোঝাতে হবে না?
তার প্রত্যুত্তরে মুন্নি কিছু কিছু বলার আগেই সেখানে উপস্থিত হয় জুনাইয়া,,—’আরে নুরাইন? তুমি এখানে? এখন কি সুস্থ বোধ করছ?
জুনাইয়ার উপস্থিতিতে কথাটা চাপা পড়ল, তিহু মুন্নিকে একপ্রকার অবজ্ঞা করে পাশ কাটিয়ে জুনাইয়ার সঙ্গে চলে যেতে যেতে বলল,,
—’হুম আপু।
হাজারো আলাপচারিতা সারতে সারতে স্থান ত্যাগ করল দুজনে।তবে তিহুর দিকে ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তখনও চেয়ে আছে মুন্নি,ক্রুর হাসি হেসে সে বললো,,
—’প্রথমবার সফল হয়নি তাতে কি? জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তোমাকে, শেষ করার প্রচেষ্টা চালাবো আমি। একদিন না একদিন তো সফল হবই।
সময়টা দুপুর, তপ্ত রৌদ্র কিরণে আবৃত ধরনী।খাওয়া দাওয়া শেষে মির্জা মহলের বৃহৎ ড্রয়িং রুম যেন পরিনত হয়েছে ছোট-খাটো আলোচনা সভায়। কালকেই খান মহলের সকলে ঢাকা ফিরবে।মাস দুয়েক পরই নির্বাচন হওয়ায় বেশ চাপে আছেন এমপি ওয়ালিদ খান। তাই তাড়াহুড়োয় এমন ফেরার প্রস্তুতি। আর এইসব ব্যাপার নিয়েই চলছে আলোচনা। মহলের প্রত্যেকটা পুরুষ উপস্থিত সেখানে। বাড়ির কর্তৃরা রান্নাঘরের কাজে নিয়োজিত। মাঝে মাঝে গৃহপরিচারীকারা বিভিন্ন খাবার সরবরাহ করছে আলোচনার মাঝে।
সেখান থেকে কিছুটা দূরে ল্যাপটপে কাজ করছে নীল। পাশে মূর্তির ন্যায় বসে আছে আইয়াজ, নীলের বিভিন্ন কথার জবাবে যান্ত্রিক বস্তুর ন্যায়ের মাথা নাড়ছে মাঝে মাঝে। তিহু সবে নুরজাহান বেগমের রুম থেকে বেরিয়েছে। হস্তজোড়া শোভিত স্বর্ণের পুরু বালায়। নাসাপুটে দৃশ্যমান নক্ষত্রের ন্যায় একখানা হীরের নোলক। করিডোর বেয়ে কাঙ্ক্ষিত রুমের দিকে যাচ্ছিল সে। হুট করে সে দেখতে পায়, করিডোরের রেলিং আঁকড়ে নিচে ঝুঁকে উঁকি মারছে নাহা। তাকে দেখে কিঞ্চিত বিস্মিত হয় তিহু।
তৎক্ষণাৎ কিছু না বলে নিঃশব্দে,অগোচরে,লুকায়িত পায়ে সে এসে দাঁড়ায় নাহা’র পিছনে। তার দৃষ্টি অনুসরণপূর্বক তাকায় নিম্নপানে। সেখানে উপস্থিত নীল আর আইয়াজ। তবে নাহার দৃষ্টি আইয়াজেতে স্থির, মুগ্ধতার এক মহাসমুদ্রে অবগাহন করছে সে। অন্ততপক্ষে দৃষ্টি তো তাই বলছে!তিহু কিছুক্ষণ নিরব থেকে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করলো। বোঝা মাত্র হালকা কেশে বলল,,
—’কি হচ্ছে ননদিনী? সামথিং সামথিং নাকি?
তিহুর কথার ধ্যান ভাঙলো নাহার। মুগ্ধ দৃষ্টিতে হঠাৎ মিশলো লজ্জার আভা। হচকিত কন্ঠে সে বলল,,
—’বউমনি?তুমি?
—’হুম,আমি । তা লুকিয়ে লুকিয়ে কাকে দেখা হচ্ছিল শুনি?
নাহা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। তাকে এমন বিভ্রান্ত হতে দেখে তিহু অভয় দিয়ে বললো,,
—’তোমার মনে যদি আইয়াজ ভাইয়াকে নিয়ে কিছু থাকে তাহলে উইথ আউট অ্যানি হেজিটেশান ইউ ক্যান টেল মি। আই প্রমিস আমি কাউকে কিচ্ছু বলবো না।
তিহুর কথাগুলোতে নাহা ভরসা পেলো যেনো;স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো সে। মনে জমিয়ে রাখা কথাগুলো এখন অন্তত কারো কাছে শেয়ার করা যাবে। বড্ড বিশ্বাস করে সে তিহুকে একে একে খুলে বললো সবটা। সবশুনে তিহু এক প্রকার স্থির হয়ে গেছে। ঠোঁট উল্টে বাহবার স্বরে সে বলল,,
—’বাহ,বাহ। হোয়াট আ লাভ স্টোরি!জাস্ট ফোনে কথা বলতে দেখে ক্রাশ!ওএমজি!
তার কথায় লাজুক হাসলো নাহা,,—’হুম,আর তার কিছুদিন পরই কাকতালীয় ভাবে উনি ভাইয়ার অফিসে জয়েন করেন।
—’হুম।তাও যেনতেন পোস্টে নয়। একেবারে পিএ হিসাবে।
—’হুম।
হঠাৎ তাদের কথোপকথনে ছেদ পড়লো মনোয়ারা বিবির ডাকে। দু’জনেই ডাক শুনে নিচে যেতে, তিহু নাহাকে বলল,,
—’বাই দ্যা ওয়ে আই রিয়েলি লাইক ইউর লাভ স্টোরি।
—’আমারটা তো শুনলে এবার তোমারটা বলো।
—’আমারটা মানে?
—’এমা, কেন তোমার আর ভাইয়ার লাভ স্টোরি।
মুহূর্ত কয়েকের জন্য পা থামল তিহুর। তাদের আবার কোনো লাভ স্টোরি আছে নাকি? তাকে এমন থামতে দেখে নাহা হেসে বললো,,
—’ডোন্ট ওয়ারি। পরে একদিন শুনবো না হয়। আজ থাক।
নাহা নেমে গেল সিঁড়ি বেয়ে।তিহু ক্ষনিকের জন্য স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লেও পরমুহূর্ত উদ্বিগ্ন হলো পরবর্তীতে কি বলবে ভেবে।
সময়টা বিকেলের কিছুটা পর, সন্ধ্যা হতে চলেছে প্রায়।কোলাহলপূর্ণ মির্জা মহলের আঙিনা,কিছুটা নিশ্চুপ। সবাই ব্যস্ত যে যার কক্ষে। কাল ফেরার প্রস্তুতি চলছে।তিহু মনোয়ারা বিবির ঘর থেকে মাত্র বেরোলো। করিডোর পেরিয়ে কাঙ্খিত রুমের দিকে যাচ্ছিল সে। খোঁপা বদ্ধ চুলগুলো সামান্য বাধনহারা। কপালের ওপর অবাধ্য প্রেমিকের ন্যায় খেলা করছে একগুচ্ছ কেশরাজ।
কারো উপস্থিতি বুঝতে এক ঝলক পাশে তাকালো সে। সঙ্গে সঙ্গেই নজর বিদ্ধ হলো পার্শ্ববর্তী দেয়ালে বিদ্যমান আতসীর মাঝে থাকা নিজের এলোমেলো চুলের মুখশ্রীতে। হাত দিয়ে চুলগুলো ঠিক করতে গিয়ে অন্যরকম একটা ভালো লাগা কাজ করলো তার। মনে পড়ে গেল সকালের কথাগুলো। নীলের সুদর্শন মুখশ্রী নিজের চোখের পাতায় ভেসে উঠতেই। এক মুচকি হাসির রেখা খেলে গেল তার গোলাপি অধর জুড়ে।
কি জানি কি ভেবে,আনমনে সে পলক ঝাপটে হাতের চুড়ির রিনিঝিনি শব্দ তুলে;গেয়ে উঠলো,,
🎶 তুই চুল করে দে এলোমেলো……
ভেঙে দেনা চুড়ি….
তোর প্রেমে এখন আমি সুতো কাটা ঘুড়ি…..🎶
তার গানের কলিটা হাওয়ায় মিলাতেই হুট করে পিছন থেকে, ভেসে আসলো অনেকগুলো কন্ঠের একযোগ স্বর,,
—’ওওওওহ ….!
পেছন ঘোরামাত্র তিহু দেখতে পেল, পিছনে মুখে হাত দিয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিমায় তাকিয়ে;দাঁড়িয়ে আছে সবগুলো নবীন প্রাণ। মাঝখানে উপস্থিত নীলও। তাদের সবাইকে দেখে বেশ অপ্রস্তুত-অপ্রতিভ হয়ে উঠল তিহু। এদিকে তার এমন কাণ্ডে, চোখ সরু করে তাকিয়ে আছে নীল। ঠোঁটে বিদ্যমান লুক্কায়িত চাপা হাসির রেখা। অন্যদিকে সকলে একে অন্যের দিকে দৃষ্টি বিনিময় করে একযোগে তাকে ভেঙিয়ে চিৎকার করে বলল,,
—’তোর প্রেমে এখন আমি সুতো কাটা ঘুড়ি।
বলেই হো হো করে হেসে উঠল সবগুলো। নাহা আর মাহাতো প্ল্যান করেই নিয়েছে তিহুকে কিভাবে কিভাবে খ্যাপানো যায়। এদিকে রাফা নীরা আর ফারিসা ঠোঁট চেপে হাসি সংবরণের চেষ্টায় ব্যাস্ত। এতসব কাণ্ডের মাঝে অপ্রস্তুত হয়ে উঠেছে তিহু।
তবে এ যাত্রায় তাকে বাঁচিয়ে দিয়ে নীল সকলকে পাশ কাটিয়ে রুমের দিকে যেতে যেতে বলল,,,
—’রুমে আসো নুর। কুইক।
তিহু আর কিছু না ভেবে কোনো দিকে না চেয়ে পিছু নীলের।
—’হয়েছে তোমার?
কথাটা বলতে বলতে নীল এক ঝলক তাকালো আয়নার পানে।তিহু হিজাবের শেষ পিনটা লাগাচ্ছিল। নীলের পানে চেয়ে বললো,,
—’লাস্ট পিন।
—’ওকে দ্রুত করো তাহলে।
—’হুম।
—’আচ্ছা আমি এগোই তুমি আসো।
—’আচ্ছা।
নীল ঘড়িটা পড়তে পড়তেই বেরিয়ে যায়।তিহু দ্রুত হিজাবের পিন লাগিয়ে; এক ঝলক আয়নায় তাকায়। তবে কেমন অপূর্ণ অপূর্ণ লাগছে নিজেকে। পরক্ষণেই বুঝতে পারে ওষ্টাধর ফাঁকা তার। দ্রুত ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখার রঞ্জক দিয়ে দ্রুত আবৃত করে সেটি।
অতঃপর, জলদি পায়ে এগিয়ে চলে বাইরের দিকে। সে বুঝতে পারল না? হুট করে আজ বেরোনোর কি দরকার? কালকেই তো ঢাকা ফিরছে তারা। তবে এখন হঠাৎ, নীলের ভ্রমণ পিপাসু হওয়ার কারণ কি? হাজারটা জল্পনা কল্পনা করতে করতে তিহু এসে পৌঁছায় মির্জা মহলের পার্কিং এরিয়ায়।
নীল ইয়ামাহা খচিত নেভি ব্লু কালার বাইকটার উপর হেলমেট পড়ে তার জন্য অপেক্ষমান।তিহু এগিয়ে আসতেই সে একখানা লেডিস হেলমেট এগিয়ে দেয় তার দিকে।তিহু সেটা পড়েই ওঠে পরে বাইকে।
ধীরে ধীরে বাইকটা এগিয়ে গেল মির্জা মহলের সুবিশাল গেইটটা ছাড়িয়ে।
গোধূলির রঙিন আভায় রঙিন হয়ে উঠেছে আকাশটা। চারিদিকে রক্তিম আলোক ছটা। নীলের বাইকটা এসে থামে, কোলাহল পূর্ণ এক পাহাড়ি পাদদেশে। ধীরে ধীরে বাইক থেকে নামে নীল-তিহু। সম্মুখে কয়েকশত কপতো-কপোতির ঢল। জোড়ায় জোড়ায় অবস্থান করছে সকলে।
তিহু বিস্মিত-পুলকিত দৃষ্টিতে নীলের পানে চায়। নীল বুকে থাকার সানগ্লাসটা চোখে পড়ে, তিহুর হাত ধরে সম্মুখপানে যেতে যেতে বলে,,
—’চলো।
তিহুও এগিয়ে চলে নীলের সঙ্গে। অদ্ভুত মুগ্ধতা বিরাজমান তার দৃষ্টিতে।
কিছুদূর এগোতেই তারা দেখতে পেল,তাদের সামনেই গুচ্ছে-গুচ্ছে গোলাপের পসরা সাজিয়ে বসেছে বিক্রেতারা।নীল সেখান থেকে একটা রক্তলাল লাল গোলাপ তুলে নিল। পরমুহূর্তে সেটা গুঁজে দিল তিহুর হিজাবের কিনারে বিদ্যমান পিনটার ফাঁকগলিয়ে।তিহু যেন বিষ্ময়ের চূড়ান্ত সীমায় আরোহন করছে। গোধূলি আলোর মাঝে নীলের নীল চক্ষুর পানে চেয়ে তার মনে পড়ে যাচ্ছে রবীন্দ্রনাথের সেই বিখ্যাত পংক্তিটি চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করছে নিজের মতো করে ,,,
—’প্রহর শেষে আলোয় রঙা আজ জৈষ্ঠ্য মাস, আপনার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ।
তবে তার কথাগুলো যেন বদ্ধ হলো হৃদয়ের মনিকোঠায়; টাকা পরিশোধ করেই নীল তাকে নিয়ে এগিয়ে গেল সম্মুখে।
সামনেই বাহারি কানের দুলের পসরা সাজিয়েছে, একটা স্টল। নানা রঙা পাথরে, স্বচ্ছ আলোকরশ্মি প্রতিফলিত হচ্ছে। তৈরি করছে অদ্ভুত মোহিত সৌন্দর্য, তিহু মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকালো সেদিকে। নীল হয়তবা দেখলো তার প্রিয়তমার মুগ্ধ দৃষ্টি।তিহুকে নিজের শক্ত পৌরুষিক বন্ধনে আবদ্ধ করেই সে এগিয়ে গেল;দুল গুলোর দিকে।
পাথুরে দুল গুলো বাহারি;কোনটা ছেড়ে কোনটা নেবে তাতেই বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে তিহু। ইচ্ছা করছে সবগুলোই নিয়ে নিতে।এদিকে তিহুর মুগ্ধ দৃষ্টিতে, অনিমেষ চেয়ে আছে নীল। হঠাৎই সে কর্মচারীটির উদ্দেশ্যে বলল,
—’দুল গুলো সব প্যাকেট করার ব্যবস্থা করো।
ছেলেটি বিস্মিত হলো বেশ, দুলগুলোর দিকে চেয়ে বলল,,—’ভাই? এখানে তো দুলের সংখ্যা অনেক। সব দিবো?
—’কতগুলো আছে?
—’প্রায় ২২ জোড়া।
—’প্যাক করে দাও।
ছেলেটির সঙ্গে বিস্মিত হলো উপস্থিত সকলের। তবে নীল সেদিকে পাত্তা না দিয়ে, সমস্ত বিল পরিশোধ করে। তিহুকে নিয়ে সামনের ফুচকার স্টলটার এদিকে যেতে যেতে বলল,,
—’কিছুক্ষণ পর আমার হয়ে একটা ছেলে এসে সবগুলো নিয়ে যাবে।
ছেলেটি বিস্মিত নয়নে চেয়ে, সম্মতি সূচক মাথা নাড়ুলো শুধু।
—’আপনি কি পাগল? অতগুলো দুল কেউ কেনে?
—’আমি কিনি। এখন বেশি কথা না বলে, ফুচকা গুলো শেষ করো।
তিহু নাক কুঁচকে তাকালো ফুচকা গুলোর দিকে। সেগুলো লোভনীয় লাগলেও আপাতত বিরক্তির কারণ হচ্ছে তিহুর। কিছু না ভেবেই দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে সে বলল,,,
—’খাব না আমি।
—’আর ইউ শিওর?
—’হুম।
—’ওকে। অতঃপর সে পাশের একটা ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল,,—’এই এটা নিয়ে যাও তো।
তিহু দ্রুত তার হাত থেকে ফুচকার প্লেটটা কেড়ে নিতে নিতে বলল,,—’বললেই দিয়ে দিবেন নাকি? মানুষ তো একবার জোর করে নাকি? আনরোমান্টিক।
প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৩০
তিহু এমন কাণ্ডে, মুখ চেপে হাসলে নীল। তবে পরমুহূর্তেই তার বলা শেষ কথাটা মস্তিষ্ক ধারণ করার সঙ্গে সঙ্গে সে বলল,,—’কি বললে তুমি? আমি আনরোমান্টিক? তা আমি রোমান্টিক হলে, নিজেকে সামলানোর গ্যারান্টি দিতে পারবে তো,মিসেস নুরাইন ওয়াহাজ খান?
সবে খাওয়া ফুচকাটা গলার মাঝেই আটকে গেল তিহুর। ভিষম লাগল সঙ্গে সঙ্গে; নীল দ্রুত পাশ থেকে পানি এনে তাকে খাওয়াতে খাওয়াতে; বাঁকা হাসলো খানিক। তিহু বিস্ফোরিত নয়নে তাকালো তার দিকে।
