প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৩৫
নওরিন কবির তিশা
খুলনার প্রাণকেন্দ্রে বিশাল এলাকা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে হক ম্যানশন নামক হক পরিবারের পৈত্রিক ভিটে।যার পরতে পরতে ইতালীয় স্থাপত্য আর বংশীয় গাম্ভীর্যের ছাপ স্পষ্ট।ইউরোপীয় বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ব্যবসার সুবাদে বাড়ির আনাচে-কানাচে ইউরোপীয় রুচির ছোঁয়া স্পষ্ট।
হঠাৎ কাঙ্ক্ষিত গাড়িটি এসে ভিড়লো হক ম্যানশনের সিংহদুয়ারের সামনে। সঙ্গে সঙ্গে শব্দের ঝংকার তুলে, প্রকাণ্ড ভারি লৌহ শৃঙ্খল খোলার আওয়াজে মুখরিত হলো চারিধার। ধীরে ধীরে মন্থর গতিতে বিলাস বহুল গাড়িটি প্রবেশ করল প্রাচীন ঘেরা এলাকায়। নরম-সবুজ ঘাসের গালিচার উপর দিয়ে গাড়িটি ধীরে ধীরে প্রবেশ করল ভেতরে।
রাস্তার দুই ধারে দৃশ্যমান সুবিন্যস্ত পাম গাছ আর মাঝেমধ্যে ইতালীয় শৈলীর মার্বেল পাথরের তৈরি ভাস্কর্য। কিছু দূর এগোতেই সম্মুখে উন্মোচিত হলো শ্বেত মার্বেলপাথরের প্রাসাদোপম বাড়িটি;উঁচু সিলিং আর বিশাল সব খিলান—সব মিলিয়ে এক প্রাচীন আভিজাত্যের গাম্ভীর্য বেষ্টন করে রেখেছে বাড়িটিতে।
তিহু ধীরে ধীরে নামলো গাড়ি থেকে। সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির সকলের একপ্রকার ছুটে আসলো।নব কুড়িগুলো তিহুকে একত্রে চতুরর্দিক থেকে জড়িয়ে সমস্বরে বলল,,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
—’আপুই।
তিহু সবগুলোর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,,—’কি অবস্থা তোদের?
পিহু তাকে জড়িয়েই বলল,,—’খুব,খুব,খুব মিস করেছি তোমায় টিয়াপু।
নুসাইন হক পিহু তিহুর ছোট চাচার বড় মেয়ে। বয়সে ছয় বছরের ছোট হলেও বান্ধবীর মতো সম্পর্ক তাদের;খুনসুটিপূর্ণ আর আবেগাবৃত।তানহা ধীরে ধীরে মাথা তুলে বলল,,
—’আপিই?
নুসাইজা হক তানহা তিহুর ছোট চাচার ছোট মেয়ে। তিহু তার দিকে এগিয়ে চুলে হাত বুলিয়ে বলল,,—’তোর চুলগুলো তো অনেক লম্বা হয়েছে বুড়ি।
তাদের দেখাদেখি সারা মুখ ফুঁলিয়ে বললো,,—’এরা দেখি কেউ আমাকে পাত্তাই দিচ্ছে না।
সারা তিহুর ছোট ফুপি আইরিন হকের মেয়ে। যেমন দুষ্টু তেমন অভিমানী। তিহু তার চুল টেনে বলল,,—’এতো হিংসুটে হয়েছিস কেন তুই? হ্যাঁ?
সারা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,—’তুমি তান্নুর সাথে কিভাবে কথা বলছে আমার সাথে?
তিহু,সারার এমন কথায় দূরে দাঁড়িয়ে থাকা তার ছোট ফুফুর দিকে চেয়ে বলল,,—’ও পিপি? তোমার মেয়ে এত হিংসুটে হয়েছে কেন বলতো?
আইরিন হক হেসে বললেন,,—’তোর-ই তো বোন।
তিহু মুখ বাঁকিয়ে বলল,,—’তোমারও মেয়ে!
কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা তাজহীর হাতে থাকা আপেলটাতে কামড় দিতে দিতে বলল,,—’এত ঢংয়ের কি আছে? চলে আসছে তো আমার হাড় জ্বালানি।আবার আগের মতো ফুল স্পিডে জ্বালাবে আমায়,সো নাটক কমাই কর সব।
তাজহীর তিহুর ছোট ভাই পুরো নাম নিশান হক তাজহীর। দুটোর একেবারে দা কুমড়ার সম্পর্ক সারাদিন মারামারি আর একে অন্যের পিছনে লেগে থাকা ছাড়া আর কোনো কাজই নেই তাদের।তিহু তাজহীরের কথায় রেগে তেড়ে গিয়ে বলল,,
—’তোরে আজকে আলু ছাড়া চিপস বানাবো দাঁড়া। শয়তান।
কিছু দূর এগোতেই তার দাদা নুরুজ্জামান হক আর তার সহধর্মিনী আফরোজা খানম এগিয়ে এসে বললেন,,—’মারামারি পরে করবি পুতুল,আর একটু কাছে আয় তো কতদিন দেখিনা তোকে।
অতঃপর নুরুজ্জামান হক, সকলের উদ্দেশ্যে সতর্ক কণ্ঠে বললেন,,—’আর কেউ যদি আমার পুতুলকে কিছু বলেছিস,খবর আছে তোদের।
তিহু আহ্লাদে গদগদ হয়ে বলল,,—’কেমন আছো দাদুভাইয়া?
—’এই তো আছি আল্লাহর রহমতে, আলহামদুলিল্লাহ।আর তুমি আসছো না? এবার আমি পুরো ফিট অ্যান্ড ফাইন হয়ে যাব।
তিহু এক গাল হাসলো, পাশ থেকে আফরোজা খানম বলল,,—’দেখো বুড়োর সব ঠিক হয়ে গেছে এবার। এতক্ষণ কি না করছিল আমার সাথে।
তিহু দাদাকে জড়িয়ে ধরেই দাদীর উদ্দেশ্যে বলল,,—’আমার দাদু ভাই বুড়ো নয় তুমি বুড়ি।
অতঃপর সে দাদার দিকে ফিরে বলল,,
—’দাদুভাইয়া? তুমি এমন হিংসুটে বুড়ি কেন বিয়ে করেছিলে শুনি?
তার কথায় নুরুজ্জামান হক হাসলেও;আফরোজা খানম তেড়ে এসে বললেন,—’আমি হিংসুটে? তবে রে?
তবে তিনি এগিয়ে এসে তিহুর কপালে উষ্ণ চুম্বন এঁকে বললেন,, —’কেমন আছিস পুতুল তুই? কতদিন দেখিনা!
—’আমি বিন্দাস আছি দাদু।
পেছন থেকে আইরিন হক , নাসরিন হক,তিহুর মা আর চাচি নিশাত মজুমদার এগিয়ে এসে তার মাথায় আদুরে হাত বুলিয়ে বলল,,—’আমাদের আম্মাটা।
হঠাৎ নওশাদ হক এগিয়ে এসে বললেন,,—’অনেক হয়েছে এবার ভেতরে চলো সবাই।
এতদিন পর বাবাকে দেখে,তিহু আবেগে আপ্লুত হয়ে বলল,,—’আব্বু।
তবে নওশাদ হকের মুখ থমথমে বেশি কিছু বললেন না তিনি ভেতরে প্রবেশ করলেন। তিহুর ছোট চাচা অর্থাৎ নিহাল হকও এতক্ষণ এখানে ছিলেন তবে কিছু না বলে তিনিও ভেতরে প্রবেশ করলেন।তিহু বেশ অবাক হলো যেখানে তাকে আনতে যাওয়ার কথা ছিল ছোট চাচার। তিনি তো যানইনি আবার একবার স্যরিটাও বললেন না।
তিহু যখন বিস্ময়ের চূড়ান্তে, তখনই পাশ থেকে তার ছোট চাচী নিশাত মজুমদার হেসে বললেন,,—’চল চল ভেতরে চল।
আবেগময় উষ্ণতার বেষ্টনী থেকে কোনোমতে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে তিহু বাড়ির মূল ফটক পেরিয়ে ভেতরে পা রাখলো। পুরো পরিচিত সেই পরিবেশে বিষন্নতা ছাপিয়ে তার হৃদয়টা দুলে উঠলো খুশির আমেজে।
তিহুদের বাড়িটা বিশাল;প্রবেশদ্বার বেরোতেই প্রথমেই চোখে পড়ে বিশাল হলঘরের মতো ড্রয়িং রুমটা। মেঝেতে ধবধবে শ্বেত মার্বেলের কারুকাজ, তার উপরে হাতে বোনা পার্সিয়ান কার্পেট পাতা,দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়। ছাদটা বেশ উঁচু, সিলিং-এর কোণে কোণে খোদাই করা প্লাস্টারের কাজ, মাঝখানে ঝুলে আছে কয়েকশো বছর পুরোনো এক ঝাড়বাতি—যার কাঁচের ফলকগুলো আজও ঝলমলে আলোক।
রুমের কেন্দ্রবিন্দুতে এক বিশাল, গাঢ় কাঠের সোফা। উল্টো দিকের দেয়াল জুড়ে ঝুলছে হক পরিবারের পূর্বপুরুষদের তৈলচিত্র; গম্ভীর আর সম্ভ্রান্ত মুখগুলো নীরব সাক্ষী হয়ে যেন সময়ের হিসাব রাখছে। একটা টেবিলের ওপর রুপোর ট্রেতে বসানো প্রাচীন ফোন সেট আর ফ্রেমে বাঁধানো পারিবারিক ছবিগুলো জানান দিচ্ছিল যে, এই বাড়িতে পুরোনোকে ধরে রাখার একটা চেষ্টা সব সময়ই আছে।
ঘরের এক কোণে একটা বিশাল কাঠের বুকশেল্ফ, সেখানে যত না বই, তার চেয়ে বেশি সাজানো ইউরোপের বিভিন্ন জায়গা থেকে আনা শোপিস আর চীনামাটির বাসনপত্র। আসবাবপত্রগুলোর রঙ, পালিশ, আর বিন্যাসে রুচির এমন একটা ছাপ, যা সহজে অন্য কোনো বাড়িতে দেখা যায় না—ঐশ্বর্যের সাথে মিশে আছে এক ঠান্ডা মেজাজ আর বংশের অহংকার।
তির্যকভাবে এসে পড়া দুপুরের আলো কাঁচের শার্শির পর্দা ভেদ করে ড্রয়িং রুমের মার্বেলে পড়ছিলো।ভেতরে পা রাখতেই তিহুর মনটা এক পরিচিত শান্তিতে ভরে গেলো।
কিছুক্ষণের মধ্যেই মেডরা হাজির হলো শরবত, আর নানান খাবারের পসরা নিয়ে।তিহু এগুলো গ্রহণ না করেই সোজা সর্পিলাকার সিঁড়ির পেরিয়ে উঠে গেল দোতলায়। নিজের রুমের উদ্দেশ্যে।
দোতলায় উঠেই তিহু দ্রুত পদচারণায় নিজস্ব কক্ষের প্রবেশ করলো। সুবিশাল কক্ষটি আধুনিক রুচিতে সজ্জিত।লম্বা জানালার পাশেই তার শখের পড়ার টেবিলটি,আর বিছানার ঠিক মাঝখানে এখনো নিজেদের অবস্থানটা ধরে রেখেছে একগাদা নরম তুলতুলে টেডি বিয়ারের দল—যেন তাহারা তিহুর প্রতীক্ষাতেই ছিল। সেই প্রিয় পরিচিত পরিবেশে প্রবেশ করতেই তিহুর সকল বিষণ্ণতা মুহূর্তে দূরীভূত হল।
ধপ করে বিছানাটার উপর বসে, টেডি বিয়ারের মধ্য থেকে তার সবচেয়ে পছন্দের একটি হাতে তুলে,তাকে যত্নে মগ্ন হলো তিহু। মুহূর্ত কয়েক অতিবাহিত হতেই; ফ্রেশ হতে চটজলদি পায়ে প্রবেশ করল ওয়াশরুমে।
ঘড়ির কাঁটায় দুইটা বেজে পনেরো মিনিট। প্রায় দশ মিনিটের উর্ধ্বে নীল অপেক্ষা করছে ভার্সিটির বাইরে। বারংবার হাত ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে সময় যাচাই করছে সে। শেষমেষ অধৈর্য হয়ে তিহুর ফোনে ডায়াল করল।
এদিকে সবে একটা লম্বা শাওয়ার নিয়ে বেরিয়েছে তিহু। চুলে পেঁচানো টাওয়াল। রিংটোনের শব্দে দ্রুত বেরিয়ে আসলো সে। স্ক্রিনের উপর জ্বলজ্বল করছে সেভ করা নিক নেম টা,’Mr Politician’ মুচকি হেসেই ফোনটা রিসিভ করল সে। বলতে চাইলো,,’আমিই তো আপনাকে ফোন করতাম।’
কিন্তু তার আগেই ভেসে আসলো নীলের ভরাট-উব্দিগ্ন কণ্ঠস্বর,,—’কই থাকো তুমি হ্যাঁ? সে কখন থেকে ভার্সিটির বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। বের হবে কখন?
তিহু চরম বিস্মিত নীলের এমন কথায়। পরক্ষণেই সে হেসে বলল,—’আমি ভার্সিটিতে কি করব? ভুলে গেলেন আমি তো আজকেই খুলনায় এসেছি।
তিহুর ধ্যান ছুটলো নীলের। কিঞ্চিৎ হতাশ কন্ঠে সে বলল,,—’ওহ স্যরি।আসলে ভুলে গেছিলাম।
তিহু হেসে বলল,,—’ব্যাপারনা আসলে প্রতিদিনের অভ্যাস তো! যাই হোক দুপুরে খেয়েছেন আপনি?
—’না এখনো বাসায় যাইনি।
তিহু দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,,—’সে কি? দুপুর গড়িয়ে গেল তো, দ্রুত বাসায় যান আর খেয়ে আমাকে জানান।
—’না এখন আর বাসায় যাব না।
—’কেন?
—’সমাবেশ আছে।
—’ওসব সমাবেশ-টমাবেশ পরে হবে আগে বাসায় যান গিয়ে খেয়ে আমাকে আপডেট জানান. নইলে কিন্তু আমিও খাব না।
—’খাবে না মানে?অসুস্থ হয়ে পড়লে না,একদম কানের নিচে..!
—’কিচ্ছু করতে পারবেন না মিস্টার। তাই বলছি গিয়ে খেয়ে নিন নইলে আমিই..!
—’আচ্ছা যাচ্ছি।
—’হুম জলদি।
—’হুম।
ফোন কেটে দিল তিহু। বাতাসের ঝাপটায় চুল থেকে খুলে দিয়েছে টাওয়ালটা, উন্মুক্ত হাওয়ায় বাঁধনহীন ভাবে দুলছে তারা। হঠাৎ দরজায় দেওয়া টোকার শব্দে তিহু মুচকি হেসে পিছনে ঘুরলো। সঙ্গে সঙ্গে হাসি গায়েব হয়ে অন্ধকারে ছেয়ে গেল মুখশ্রী; গ্রে কালার ফিটেড শার্ট পরিহিত দীর্ঘ পুরুষের মুখের হাসি মুহূর্তই কেড়ে নিল তার হাসি খানা।আরহাম হাসতে হাসতে এগিয়ে এসে বলল,,
—’হোয়াটস আপ মিস তিহুরানি,ওরফে সব সময় বকবক করা তোতা পাখি?
তিহু আরহামের এমন সম্বোধনে মুখ কুঁচকে বলল,,—’আলহামদুলিল্লাহ। বাই দ্যা ওয়ে আপনি কখন আসলেন?
—’এইতো এক্ষুনি।
—’তো? আমার রুমে আপনার কি?
—’নাথিং জাস্ট তোমার সাথে দেখা করতে আসলাম তোতা।
পুনরায় এমন সম্বোধনে কুঞ্চিত ভ্রুদ্বয় আরো কুঁচকে গেল তিহুর,,—’আমার নাম তিহু। আর আমাকে আমার নামে ডাকলেই খুশি হব।
—’তিহু বলে তো সবাই ডাকে, আমি না হয় অন্য কিছু বললাম। আর এমনিতেও তোমাকে দেখলে আমার তোতা পাখির কথা মনে পড়ে। যেভাবে বকবক করতে।
—’তাহলে আমিও না হয় আজ থেকে আপনাকে গাধা বলে ডাকবো। আরহাম বলে তো সবাই ডাকে। আর এমনিতেও আপনার গাধার মতো বকা আমার ভালো লাগছে না।তাই আমার রুম থেকে এখন গেলেই খুশি হবো।
আরহাম তার কথায় অবাক হলেও তৎক্ষণিক তা প্রকাশ না করে শুধু মুচকি হেসে মাথার পেছনে হাত রেখে বলল,,—’কিছুদিন পর এমনিতেও তোমার রুম আমেরিকাতে হবে ডিয়ার। আর তখন সব সময় আমাকেই পাশে পাবে।সো অ্যাডজাস্ট করে নাও।
তিহু অন্যমনস্ক থাকার দরুন শুনতে পেলো না তার কথাগুলো।আরহাম মুচকি হেসে বেরিয়ে গেল রুম থেকে।
নীল সিগারেট ধরাতে গিয়েও অগ্নিশিখা বিদ্যমান সিগারেটটা হাত দিয়ে মুড়িয়ে দূরে ছুঁড়ে মারল। সঙ্গে সঙ্গে অগ্নি রেখার দাগ স্পষ্ট হলো তার ফর্সা তালুতে। পাশ থেকে ইফাজ এগিয়ে এসে বলল,,
—’কি করছেন টাকি ভাই?
—’নাথিং। জাস্ট লিভ মি আলন ইফাজ। আউট।
—’কিন্তু ভাই?
—’শাট আপ, স্টুপিড। আউট।
—’ভাই রাগটা কি ভাবীর উপর?
—’নো, নিজের উপর।
—’কেন।
নীল স্থির ইফাজের দৃষ্টিতে তাকিয়ে শান্ত হল। নির্জীব ভঙ্গিমাতে পাশের ইজি চেয়ারটাতে বসতে বসতে বলল,,
—’ওর উপর রাগ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি অক্ষম তাতে।
—’এতটা ভালবাসেন?
—’নিজের থেকেও।
—’কিভাবে এতটা ভালোবেসে ফেললেন?
নীল মলিন হাসলো,কেবিনের সুউচ্চ কাঁচের বেড়া ডিঙ্গিয়ে অপর বিল্ডিং এ তাকিয়ে বলল ,,
—’এটা কিংবা দুদিনে হয়নি।
—’মানে?
ইফাজ চূড়ান্ত বিস্মিত। তার জ্ঞান সীমানা অনুসারে, নীল আর তিহুর বিয়ে হয়েছে সবে কিছুদিন। নীল হেসে বলল,
—’সব প্রশ্নের জবাব হয় না.।
ইফাজ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে বলল,,—’আচ্ছা ভাই ভাবি কি আপনাকে ভালোবাসে?
—’বাসে,তবে অপ্রকাশিত।
—’তাহলে আপনি বুঝলেন কিভাবে?
—’ওর দৃষ্টি সেটা বলে দেয়। বোকা নারী আমার; এইটুকু বোঝে না যে ওর দৃষ্টির দিকে তাকালে আমিও ওর মনের অবস্থা পড়তে পারি।
—’আপনি সত্যিই অনেক ভালোবাসেন ভাবিকে। আমি একটা ছেলে হয়ে বলছি, এতটা ভালোবাসা সম্ভব নয়। ভাবি সত্যিই অনেক ভাগ্যবতী।
—’আমরা তোমার বিয়ে ঠিক করেছি, আরহামের সঙ্গে। আর এই সপ্তাহেই।
নিহাল হকের কথায় রীতিমতো বিস্ফোরণ হল কক্ষজুড়ে। সকলে হাসিমুখে তাকালেও তিহুর মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। একঝলক আরহামের দিকে তাকিয়েই অকপটে সে বলল,,
—’আমি এই বিয়ে করতে পারব না।
সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা বজ্রপাত, তবে এবার কক্ষের অন্যদের জন্য। আদ্রিতা আনম মিষ্টি হাতে তার দিকে এগিয়ে আসতে গিয়েও থমকালো। নওশাদ হক এবার বললেন,,
—’আমরা তো তোমার মতামত চাইনি।
বাবার এমন কথায় চমকে তাকালো তিহু। বাবার থেকে এমন কথা কখনো হয়তো আশা করেনি সে,,—’কি আজিব? বিয়েটা তো আমার নাকি?
—’চুপচাপ যা বলা হচ্ছে সে টা মেনে নাও।
—’সম্ভব নয় আব্বু। তোমরা আমার কথাটা বোঝার চেষ্টা করো।
—’মুখে মুখে তর্ক করছো কোন সাহসে?
—’তোমরা যদি আমার কথা না মানো তাহলে তো আমাকে তর্ক করতেই হবে।
—’তিহু? কি করছিস টা কি? আজ পর্যন্ত ভাইয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলিনি আমরা কেউ।
—’আমি বাধ্য হচ্ছি চাচ্চু। আপনারা হয়তো এমন কোনো সিচুয়েশনে পড়েন নি।
—’তিহু?
তাদের এমন বাক-বিতণ্ডার মধ্যে বেরিয়ে গেল রুম থেকে সকলে। আদ্রিতা আনম তৈয়্যেবা জামানের দিকে ফিরে বলল,,
—’মেয়েটাকে রাজি করাইয়েন ভাবি। আপনি জানেন তো আমার ছেলের ব্যাপারে, আর আমার ছেলের যদি কিছু হয়…!
—’আমাকে চোখ রাঙিয়ে লাভ হবেনা আদ্রিতা। আমার মেয়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমি এক চুলও নড়ব না। কেননা আমি জানি আমার মেয়ে কেমন।
তৈয়্যিবা জামানের এমন কথায় অসন্তুষ্ট হল আদ্রিতা আনম। বিরক্তি ফুটে উঠলো তার চোখে মুখে, তবে সে কিছু বলার আগেই আরহাম তাকে সরিয়ে নিয়ে যেতে যেতে বলল,,
—’ব্যাপারনা মামিমা, ও ছোট তো। এইজন্য হয়তো এমন করছে। সমস্যা নাই আঙ্কেলরা বুঝালেই ঠিক হয়ে যাবে।
অতঃপর সে আদ্রিতা আনমের দিকে চেয়ে বলল,,—’তুমি চলো আম্মু।
তারা বেরিয়ে যেতেই গর্জে উঠলেনা নিহাল হক,,—’বড্ড বেয়াদপ হয়েছিস তুই তিহু। এই জন্যই আমি ভাইজানকে বারণ দিয়েছিলাম, বারণ দিয়েছিলাম তোকে দূরে পাঠাতে।
—’এখানে বেয়াদবির কি দেখলেন চাচ্চু? যেটা সত্যি আমি সেটাই বলেছি।
—’বেয়াদবির প্রমাণ চাস? তোর মত বেয়াদব আমাদের পুরো খান্দানে দুইটা নাই।
—’চাচ্চু?
—’তুই কি ভেবেছিস? তোকে ছেড়ে দিয়েছি বলে একেবারে উড়তে দিয়েছি? একদম নয়। সার্বক্ষণিক আমাদের নজর ছিল তোর উপর। তোর প্রত্যেকটা কুকীর্তির কথা আমরা জানতাম। কি বলেছিলিস আমাদের তুই? ভার্সিটি ট্যুর? অথচ বিগত দুই মাসে ভার্সিটি থেকে কোনো ট্যুরেই যাওয়া হয় নি। দ্বিতীয়ত জাফলংয়ে রিশাদের কোন নানুবাড়িই নাই। তৃতীয়ত তুই যেসব কুকর্ম করেছিস আমাদের না জানিয়ে;সেগুলো সব সম্পর্কেই আমরা অবগত। তাই তুই নিজের পড়াশোনার অধিকার হারিয়ে ফেলেছিস।
পাশ থেকে তিহুর মেজ ফুপু সাজরিন হক মুখ বাঁকিয়ে বলল,,—’পড়াশোনা করতে দিছিলো শান্তি হয়নি, আবার লাং পাতাইতে গেছে। যাস নিজের লাঙ্গের কাছে। দেখি তোর লাং আর কোথা থেকে আসে।
মেজফুপির এমন কথায় তিহু অগ্নিঝরা কন্ঠে বলল,,—’মুখ সামলিয়ে কথা বলো ফুপ্পি, আমার স্বামী হয় সে। আর তাকে নিয়ে একটাও আজেবাজে কথা বললে আমি ভুলে যাব তুমি আমার কি হও। আর কি বললে তুমি? এ কথা সে কোথা থেকে জানবে? মনে রেখো সে শুধু একবার এই কথাটা জানুক, তোমাদের এই শখের হক ম্যানশন এ র’ক্তগঙ্গা বইয়ে দেবে।
প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৩৪
তার এমন কথা এই রেগে গিয়ে নিহাল খান বললেন,,—’তিহু, ওই মুখে আর একটা বড় কথা বললে টেনে ছিঁড়ে দেবো একদম।
তিহু তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল ,,—’তোমাদের ভাষ্যমতে বেয়াদব যখন হয়েইছি, তখন আরেকটু হতে ক্ষতি কি? কিন্তু মাইন্ড ইট চাচু আমি বাংলা সিনেমার নেকি নায়িকা নই যে আমাকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করতে বাধ্য করলে আমি মুখ বুঁজে মেনে নিব বা সুইসাইডের চেষ্টা করব।আমি সেই যে পুরো খান্দানকে নিশ্চিহ্ন করে ছাড়বো।আই রিপিট পুরো খান্দানকে নিশ্চিহ্ন করে ছাড়বো। আর ডোন্ট ওয়ারি চাচু এসব শিক্ষা আমি আপনাদের কাছ থেকেই পেয়েছি। বংশের মান রাখতে হবে তো…!
