Home প্রেমের নীলকাব্য প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৪৪

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৪৪

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৪৪
নওরিন কবির তিশা

শহরের এক জীর্ণ প্রান্তে পরিত্যক্ত এক গুদামঘর। নিশীথ রাতের স্তব্ধতা চিরে বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে ডাক কানে আসছে।নোনা ধরা দেয়ালের ফাটল দিয়ে ইঁদুরের অবাধ যাতায়াত সেই নিস্তব্ধতাকে আরও ঘনীভূত করে তুলছে।চারদিকে জমাটবদ্ধ অন্ধকার, শুধু ঘরের মাঝখানে কড়িকাঠ থেকে ঝুলে থাকা একটা ফ্যাকাসে হলুদ বাল্ব থেকে আসা ক্ষীণ আলো পরিবেশটা আরও বিভীষিকাময় করে তুলেছে।

এই আলোর বৃত্তের মাঝে চেয়ারে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা এক পড়ে আছে দীর্ঘদেহী এক অবয়ব। লোকটার ললাট ফেটে রুধিরধারা গড়িয়ে পড়ছে, চোখে রাজ্যের আতঙ্করা এসে ভিড় জমিয়েছে। কারণ একটাই অগ্রবর্তী লোকটা;তার সম্মুখেই একটি চেয়ারে এতক্ষণ পাথরের মূর্তির মতো বসে ছিল নীল। দীর্ঘ সময়ের অমানুষিক নিপীড়নের চিহ্ন নীলের শার্টের হাতায় সিক্ত রক্তের দাগে স্পষ্ট।
নীল ধীরে ধীরে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো।হাতে লেগে থাকা র’ক্তটুকু রুমালে মুছতে মুছতে সে লোকটার খুব কাছে গিয়ে থামলো।গুদামের দেয়ালে নীলের দীর্ঘ ছায়াটা এক আদিম দানবের রূপ নিয়ে লোকটার ছায়ামূর্তিটুকু গ্রাস করতে উদ্যত হলো।
সে ধীরহস্তে লোকটার চিবুকটা তুলে ধরল। তার দুচোখে তখন হিমশীতল শূন্যতা, যেন কোনো অতলান্ত গহ্বর। শান্ত কিন্তু অত্যন্ত ধারালো গলায় সে প্রশ্ন করল,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

—’কে পাঠিয়েছিলো তোকে?
এতক্ষণ যাবৎ ভয়াল অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হওয়ায়, লোকটার বিবেক বিবেচনা লোপ পেয়েছে সব। বর্তমান উদ্দেশ্য প্রাণে বেঁচে থাকা,তাই কাঁপতে কাঁপতে অস্ফুট স্বরে সে বললো,
—’জালাল করিম… জালাল করিম আমাকে টাকা দিয়েছিল।
ক্ষিপ্র বেগে তাচ্ছিল্যের সহিত, লোকটার চিবুক যেন এক লহমায় ছুঁড়ে মারল নীল। সে খুব ভালো করেই জানতো এটা জালাল করিমের কাজ। তবুও নিশ্চিত হতে এ আয়োজন।
নীলের মস্তিষ্ক আর কোনো নির্দেশনা নিল না;চোখের মণি এক মুহূর্তের জন্য জ্বলে উঠলো তার।ক্রোধে চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। হাতের রিভলভারটা এক ঝটকায় লোকটার কপালে স্পর্শ করালো ও। লোকটা তখন প্রাণের ভয়ে ফুঁপিয়ে উঠছে। মৃত্যুর এই শীতল পরশ যেন চারিপাশে অনুভব করছে সে।

আদনান,ইফাজ,আবির,আদিব মূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে। প্রস্তুতি নিচ্ছে কোনো এক বিভর্ষ মূহুর্তের।
নীল ট্রিগারে আঙুল রাখলো। ঠিক সেই মুহূর্তে ওর মনের কোণে ভেসে উঠলো একখানা স্নিগ্ধ মুখশ্রী। শিউলি ফুলের মতো পবিত্র, ভোরের শিশিরের মতো নির্মল একজোড়া চোখ। নীল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিভলভারটা নামিয়ে নিল। লোকটা অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে।
ঘরের কোণে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে থাকা আদনান আর ইফাজ পরস্পরের দিকে তাকালো; তাদের চোখে বিস্ময়। নীল যে এভাবে মাঝপথে থেমে যেতে পারে, তা তাদের কল্পনাতীত। আবির আর আদিব দরজার কাছে অতন্দ্র প্রহরীর মতো স্থির হয়ে ছিল, নীলের এই আকস্মিক শান্ত ভাব দেখে তারাও কিছুটা নড়েচড়ে বসল।
ইফাজ এগিয়ে গিয়ে নীলের পাশে দাঁড়ালো। বিস্মিত কন্ঠে বলল,,—’ভাই?
নীল রিভালভারটা ইফাজের হাতে দিয়ে বলল,,—’এই জা’নো’য়া’র’টাকে টুকরো টুকরো করে কাল নদীতে ভাসিয়ে দিবি।

—’কিন্তু ভাই? আপনি…!
নীল র’ক্তা’ক্ত রুমালটা দূরে ছুঁড়ে বলল,,—’যে হাতে আমি আমার হৃদয়ের পবিত্র ফুলটাকে ছুঁয়েছি, আমি চাইনা সে হাত কোনো পাপিষ্ঠের র’ক্তে র’ঞ্জিত হোক।
গুদামঘরের সেই গুমোট পরিবেশে নীলের কথাগুলো যেন এক দৈববাণীর ন্যায় প্রতিধ্বনিত হলো। সবাই যখন তার দিকে বিস্মিত দৃষ্টিতে চেয়ে আছে তখন নীল এক মুহূর্ত সেখানে না দাঁড়িয়ে ধীর পায়ে বাহিরের দিকে পা বাড়াল।

আকাশটা আজ যেন অকারণে একটু বেশিই প্রসন্ন, মেঘের দল সাময়িকভাবে ছুটি নিয়েছে বলেই তপ্ত রোদে চারপাশটা ঝলমল করছে; স্নিগ্ধ সে রোদ্দুরে ধরণীর সবটুকু মলিনতা যেন মুছে গিয়েছে। সকাল থেকেই খান মহলের আঙিনায় সাজ সাজ রব। স্নেহের তনয়ের সাফল্যের উদযাপনে তৎপর ওয়ালিদ খান।আড়ম্বরপ্রিয় মানুষ তিনি, তাই আয়োজনটা ‘ঘরোয়া’ হলেও তার ভেতরে একটা বনেদিয়ানার ছাপ স্পষ্ট।
আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে বেশিরভাগ সবাই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আর নয়তো ব্যাবসায়িক সম্পর্ক ওয়ালিদ খানের সঙ্গে।বাড়ির বিশাল ফটক থেকে অন্দরমহল পর্যন্ত সবখানেই ব্যস্ততার ছোঁয়া। ঝাড়লণ্ঠনের কাঁচগুলো নতুন করে ঝকঝক করছে, বারান্দার কোণে রাখা পিতলের ফুলদানিগুলোতে তাজা রজনীগন্ধার গুচ্ছ।

সকাল সকাল নীল একটু বেরিয়ে ছিল পার্টি অফিসের উদ্দেশ্যে। তিহু আজ যথাসম্ভব ভোর বেলায় উঠেছে। গোসল সেরে দীঘল চওড়া আতশির সম্মুখে দাঁড়িয়ে বর্তমানে নিজের দীর্ঘ কেশরাজে চিরুনি চালনায় ব্যস্ত সে।
চুলগুলোকে বিনুনি বদ্ধ করে সামান্য একটু সাজুগুজু করল সে। তার পরনে ডার্ক মেরুন কালার পাকিস্তানি থ্রি পিস। কিছুদিন আগে নীল এটা তাকে দিয়েছিল উপহারস্বরূপ। কি জানি ভেবে আজকে পরেছে সে এটা।
সমস্ত রকম প্রস্তুতি শেষে সে অপেক্ষমান নীলের জন্য। হঠাৎ মনে হলো নীলের ড্রেস গুলো বের করে রাখা প্রয়োজন। তাই আলমারি থেকে একটা একরঙা পাঞ্জাবি বের করল সে। হঠাৎ তার নাকে ভেসে আসলো তীব্র পুরুষালী পারফিউমের ঘ্রাণ।ঘোর লাগা সে ঘ্রাণে যেন নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ল তিহু।
পাঞ্জাবি টাকে আরো কাছে এনে, নিজের সঙ্গে জড়িয়ে তাতে মুখ লুকালো । অজানা ভালোলাগা বেষ্টন করলো তাকে। আনমনে মুচকি হেসে সে গেয়ে উঠলো,,

🎶 তুমি বুকে টেনে নাও না প্রিয় আমাকে….
আমি ভালোবাসি …..
ভালোবাসি…
ভালোবাসি তোমাকে….🎶
নীলের পাঞ্জাবির ঘ্রাণে তিহু যখন বিভোর হয়ে গানের কলিটুকু গুনগুন করছিল, ঠিক তখনই ঘরের দরজার পাল্লায় সামান্য শব্দ হলো। এতক্ষণ তিহুর একদৃষ্টে চেয়ে থাকা মানবটি কক্ষে প্রবেশ করল। তিহু এতটাই তন্ময় ছিল যে পায়ের শব্দ সে টেরই পায়নি। হঠাৎ এক জোড়া বলিষ্ঠ হাত পিছন থেকে তার কোমর জড়িয়ে ধরল। মুহূর্তেই শিউরে উঠল তিহু।

সে থতমত খেয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য যেই না ঘুরে দাঁড়াতে চাইল, অমনি নীল তাকে নিজের দিকে এক হ্যাঁচকা টানে ফিরিয়ে নিল। অপ্রস্তুত তিহু ভারসাম্য হারিয়ে সরাসরি আছড়ে পড়ল নীলের প্রশস্ত বক্ষ দেশে। শক্ত করে ওকে ধরে রাখল নীল, যেন একচুলও নড়বার সাধ্য নেই ওর।
তিহুর কপালে অবাধ্য চুলের গুচ্ছগুলো এসে পড়েছে, আর তার ডাগর দু’টো চোখ তখন বিস্ময় আর আবেশে নীলের চোখের ওপর স্থির। নীল আলতো হাতে তিহুর ললাটে পতিত কেশরাজ সরিয়ে;বাঁকা হেসে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে গেয়ে উঠলো,

🎶 অনেক সাধনার পরে আমি…..
পেলাম তোমার মন…..
পেলাম খুঁজে এই ভুবনে…..
আমার আপনজন….🎶
নীলের গানের প্রতিটি কলি হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হলো তিহুর। লজ্জায় সে মাথা নুইয়ে খামচে ধরল নীলের শার্টের কলার। বিড়াল ছানার ন্যায় মুখ লুকালো তার প্রশস্ত বক্ষদেশে।নীলও অতি যত্নে আগলে নিল নিজের অর্কিডকে।
অতিবাহিত হলো মুহূর্ত খানিক। তিহু এবার সরে আসতে গিয়ে টের পেলো নীল আষ্টেপিষ্টে বেঁধে রেখেছে তাকে নিজের সঙ্গে। নিজেকে ছাড়াতে সে হালকা একটু নড়তেই নীল বিরক্ত কণ্ঠে বললো,,

—’উসস, ডোন্ট মুভ।
নীলের এমন আদেশ সূচক কন্ঠে তিহু কিছুটা বিচলিত হয়ে বলল,,
—’তো ছাড়ুন না প্লিজ।
—’কষ্ট হচ্ছে?
তিহু না বলতে গিয়ে ও নিজেকে ছাড়ানোর প্রয়াসে মিথ্যা বলে বলল,,–‘হুম।
নীল খুব ভালো করে ধরে ফেলেছে প্রিয়তমার বলা মিথ্যাটাটা। মুচকি হেসে সে আরো শক্ত করে তিহুকে জাপ্টে ধরে বলল,,—’তাহলে সহ্য করার অভ্যেস করে নাও অর্কিড। কেননা এ কষ্ট থেকে তোমার নিস্তার নেই।
তিহু কিছু বলতে গিয়েও আনমনে বলে ফেলল,,,—’কষ্ট যদি এমন সুখকর হয় তবে তাতে আমার কোনো আপত্তি নাই।

আইয়াজের আত্মীয়-অনাত্মীয় কেউই ঢাকায় থাকে না।একটি নির্জন ফ্ল্যাটে তার একাকিত্বের বসতি। শরীরের এই ঘোরতর অসুস্থতার দিনে সেখানে তাকে দেখবার বা এক গ্লাস জল এগিয়ে দেবার মতো কোনো দ্বিতীয় প্রাণী নেই। অগত্যা হাসপাতাল থেকে তাকে সরাসরি খান মহলে আনা হয়েছে। বাড়ির সকলে এখন তার সেবা-শুশ্রূষায় বিশেষ তৎপর; অনাদরে পড়ে থাকা সেও যেন এখানে এসে স্নেহের পরশ খুঁজে পেয়েছে।
বেলা গড়াতে শুরু করেছে। উৎসবের আমেজ এখন মধ্যগগনে। আইয়াজ বিছানায় শুয়ে শুয়ে বাইরের শোরগোল শুনছিল। তার শরীর এখনও বেশ দুর্বল, কিন্তু মনের ভেতর এক অস্থির ছটফটানি। সে চায় না এই আনন্দঘন দিনে সে নিভৃত কোণে পড়ে থাকুক।

সে ওঠে সবে পা বাড়াতে যাবে;ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের দরজার পাল্লা সরিয়ে প্রবেশ করল নাহা,পরনে ল্যাভেন্ডার রঙের একটা সিল্কের থ্রি-পিস। কামিজের সামনের দিকে সুক্ষ্ম কারুকাজ আর গলায় একটা চিকন নেকলেস। স্লিভলেস কামিজের সাথে ভারী কাজের ওড়নাটা সে এক কাঁধে পিন করে রেখেছে, যা তাকে বেশ সপ্রতিভ আর গর্জিয়াস দেখাচ্ছে। খোলা চুলে হালকা কার্ল আর চোখের ঘন কাজলে নাহার চেহারায় এক ধরনের আভিজাত্য ফুটে উঠেছে হাতে;তার এক বাটি গরম স্যুপ আর কিছু ওষুধ।আইয়াজকে উঠে বসতে দেখে সে ভ্রু কুঁচকে শাসনের সুরে বলে উঠল,,

— ‘এই যে মিস্টার পেশেন্ট, আপনি আবার ধস্তাধস্তি শুরু করেছেন কেন? আপনার এখন একদম বিশ্রাম নেওয়ার কথা।
আইয়াজ নিজের অজান্তেই এতক্ষণ যাবৎ মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকলেও ‌নাহা’র এমন কথায় হঠাৎ ক্ষীণ হেসে দৃষ্টি ফেরালো। মেয়েটা প্রায়শই এমন অধিকারবোধ দেখায় তার ওপর। ব্যাপারটা মন্দ নয় তবে, এমন অযাচিত অধিকারের মধ্যে অভ্যস্ত নয় আইয়াজ।

—’আপনি এখানে?
নাহা স্যুপের বাটিটা বেড সাইড টেবিলে রাখতে রাখতে বলল,,—’হ্যাঁ আমি। সবাই ভীষণ ব্যস্ত।আর আপনি নিশ্চিত ঔষধগুলো খাননি? এজন্য।
আইয়াজ শার্টের হাতাটা ঠিক করতে করতে বলল,—’আমার জন্য এতটা উদ্বিগ্ন হওয়ার জন্য ধন্যবাদ আপনাকে। কিন্তু আমার মনে হয় আপনাকে নিচে প্রয়োজন। বাড়ির মেয়ে হয়ে অনুষ্ঠানে না থাকাটা বড্ড বেমানান।
নাহা ভ্রু কুঁচকে বলল,,—’আমি আপনার থেকে কত বছরের বড় মিস্টার?
নাহা’র এমন প্রশ্ন ভ্রু জড়ালো আইয়াজ। মেয়েটাকে দেখলেই বোঝা যায় বয়সে কম করে হলেও পাঁচ বছরের ছোট হবে সে আইয়াজের। এদিকে তার এমন ভাবে চেয়ে থাকায় নাহা ভ্রু নাচিয়ে বললো,,

—’বলুন বলুন?
—’আপনি কেন বড় হবেন?বড় তো আমি…!
তার কথাটা শেষ হয়ে পারল না তার আগেই খপ করে তার কথাটা ধরে ফেলল নাহা,,
—’তাহলে আমাকে আপনি কেন বলেন, হ্যাঁ? মনে তো হয় আমি আপনার দাদীর বয়সী।
আইয়াজ বিমূঢ় দৃষ্টিতে চেয়ে আছে নাহা’‌র এরূপ কথায়।নাহা ফের কিছু বলতে যাওয়ার আগেই একজন পরিচারিকা এসে দরজার কড়া নেড়ে বলল,,
—’নাহা আপু তোমাকে মা সাহেবা ডাকে।
নাহা মায়ের নামটা কর্ণগোচর হতেই, চটজলদি কণ্ঠে বললো,,—’তুই যা আমি আসছি।
মেয়েটা চলে যেতেই; নাহা রুম থেকে প্রস্থান করার পূর্বে আইয়াজের উদ্দেশ্যে ফিরে আরেকবার সতর্ক কণ্ঠে বললো,,
—’স্যুপটা খেয়ে ওষুধ খেয়ে তবেই নিচে আসবেন।
বলেই দ্রুত প্রস্থান করল সে।আইয়াজ মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকালো তার প্রস্থান পথের দিকে। অচেনা কারণে ঠোঁটের কোনে ভেসে উঠলো মুচকি হাসির রেখা।

—’রাওফিনের বাচ্চা!!!!
মাহা চিৎকার করে উঠলো।সেই তখন থেকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অনবরত হাত চালাচ্ছে,কিন্তু চুলের বিনুনিটা যেন আজ অবাধ্য হয়ে উঠেছে। কিছুতেই মনঃপুত হচ্ছে না।তার উপর রাওফিনের এমন হেঁয়ালিপূর্ণ কথায় মেজাজের সপ্তম আকাশে চলছে তার। এদিকে তার এমন রাগান্বিত কন্ঠেও রাওফিন মুচকি হেসে বলল,,
—’বাচ্চা হয়নি এখনো জানেমান।বাট তুমি চাইলে হতে প….!
তাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে আরেকবার চিৎকার করে উঠলো মাহা,,

—’চুপ করবে তুমি!
মাহার এমন তপ্ত কন্ঠে রাওফিন দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে অসহায় কণ্ঠে বলল,,
—’বিগত এক ঘন্টা যাবৎ চুপ করেই দাঁড়িয়ে আছি।
—’আরো কিছুক্ষণ থাকো।
—’কতক্ষণ ম্যাডাম?
—’যতক্ষণ না চুলটা বাঁধতে পারছি।
—’এজন্যই তো আমি বলছি, আমি এসে বেঁধে দেই। না হলে ফ্ল্যাটের নিচে চাচারা যেভাবে আমার দিকে তাকাচ্ছে, মনে হচ্ছে আর কিছুক্ষণ থাকলেই গণ দিবে ধরে।
তার কথায় হেসে উঠল মাহা। প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন তার। তবুও রাওফিনকে জ্বালানোর জন্য এতটা দেরি করছিল সে। কিছুক্ষণ বাদেই রুমগুলো তালাবদ্ধ করে নেমে আসলো সে। রাওফিন সবে অন্যদিকে দৃষ্টি সরিয়েছে। হঠাৎ কারো পদচারণার শব্দে এক ঝলক সম্মুখে তাকালো সে।

সঙ্গে সঙ্গে তার চোখের পলক যেন থমকে গেল ক্ষণিকের তরে। পরনে পেস্ট গ্রিন রঙের একটি জর্জেট সারারা যা স্নিগ্ধ রোদ্দুরের মতো ঝলমল করছে। অবাধ্য চুলগুলো অনেক কসরতের পর আজ মাহার পিঠের ওপর এক সর্পিল বিনুনি হয়ে শান্ত হয়ে আছে। মাহা ধীরপদে এগিয়ে এসে ফ্ল্যাটের দরজায় তালা লাগাল। সেই চাবির মৃদু শব্দটুকুও যেন আজ এই দ্বিপ্রহরের নিস্তব্ধতায় এক অপূর্ব সুর হয়ে বাজল।
রাওফিন বাইকে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। মাহার নামার ভঙ্গি, সাজগোজ সব যেন চোখ দিয়ে মুখস্ত করছিল সে। মাহা এগিয়ে আসতেই সে কিছুটা হেসে বলল,—’লুকিং লাইক আ ফ্রেশ টিউলিপ লাভ লাইন।
মাহা ঠোঁট উল্টে কৃত্রিম বিরক্তি নিয়ে বলল,—’বড্ড কথা বলতে পারো তুমি! চলো এখন, এমনিতেই দেরি হয়ে গিয়েছে অনেক।

রাওফিন স্মিত হেসে বাইকটা স্টার্ট দিল। মাহা সন্তর্পণে বাইকের পেছনে বসল। বাইক চলতে শুরু করল, দুপুরের ঝিরঝিরে বাতাস মাহার আঁচলটাকে উড়িয়ে নিয়ে রাওফিনের কাঁধ স্পর্শ করছে। রাস্তার দুপাশে সারিবদ্ধ গাছগুলো যেন এক অদ্ভুত সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
বাইকের গতির সাথে সাথে বাতাসের ঝাপটা যখন মাহার চোখেমুখে এসে লাগছিল, সে অজানিতেই রাওফিনের কাঁধটা একটু শক্ত করে চেপে ধরল। রাওফিন আয়নার প্রতিবিম্বে মাহার সেই স্পর্শ আর লাজুক হাসিখানি দেখে নিল। তপ্ত রোদেও এক পশলা বৃষ্টির মতো শীতল এক অনুভূতি তাদের দুজনকে আবিষ্ট করে রাখল।

মহলের সুপ্রশস্ত অন্দরমহল বর্তমানে‌ এক অভিনব উৎসবে মুখরিত। বিশাল ড্রয়িংরুমটা যেন এক মূর্তিমতী আভিজাত্যের পীঠস্থান। কক্ষের উপরিভাগে দোদুল্যমান ঝাড়লণ্ঠনের স্ফটিকখণ্ড হতে বিচ্ছুরিত আলোকধারা দেওয়ালে ঝোলানো তৈলচিত্র ও আসবাবের বার্নিশে প্রতিফলিত হইয়া এক মায়াবী পরিবেশের সৃষ্টি করছে। বায়ুমণ্ডলে রজনীগন্ধার তীব্র সুবাস।
উপস্থিত আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ। তাদের বেশির ভাগেই দেশের প্রথিতযশা রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ নয়তো গণ্যমান্য ব্যবসায়ী‌।তাদের গাম্ভীর্যপূর্ণ আলাপন ও উচ্চহাস্য কক্ষের স্তব্ধতাকে এক বিশেষ প্রাণচঞ্চলতা দান করছে। গৃহের ভৃত্যগণ ব্যাস্ত তাদের বিবিধ খাদ্য পরিবেশনায়। ওয়ালিদ খান গল্পে মশগুল হয়েছেন তাদের সঙ্গে এক প্রসন্ন আনন্দধারা যেন নিঃশব্দে প্রবাহিত হচ্ছে।

নীলও একে একে আলাপ সারছে সবার সঙ্গে। বিশেষত তার বাবার ব্যবসায়িক সহচরদের পুত্রদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ করছে সে। রাওফিন-মাহা এসে পৌঁছেছে কিছুক্ষণ পূর্বে। এসেছে রিশাদও; নিহিত নিজে গিয়ে তৈরি করে এনেছে তাকে।রাওফিন নীলের সঙ্গে যোগ হলেও;মাহা এসেই সোজা গিয়েছে তিহুর কক্ষে।
রাফা আর নীরা টুকটাক সাজুগুজু করে বেরিয়েছে সবে। যেন দুটি স্নিগ্ধ প্রদীপ। রাফার পরনে ছিল একখানি পিচ রঙের লং ফ্লোরাল আনারকলি কুর্তি।আর নীরার পরনে রয়্যাল ব্লু রঙের ফ্রক স্টাইল কুর্তি। হালকা রঞ্জকে আবৃত দুজনের গোলাপি ওষ্টাধর। আর চোখে হালকা আইলাইনারের আঁচড়।
দোতলার সিঁড়ির পেরিয়ে সবে নিচে পৌঁছেছে তারা। হঠাৎ পিছন থেকে ভেসে আসলো এক যুবক কন্ঠস্বর,,

—’নীর?
নীরা-রাফা দুজনেই পিছন ঘুরলো। দেখলো গম্ভীর দৃষ্টিতে তাদের দিকে চেয়ে আছে নিহিত। রাফা নীরাকে রেখে চলে যেতে নিতেই; নিহিত আদেশের স্বরে বলল,,
—’ নীর তুই যা নাহা ডাকছিল তোকে।
রাফা একটু থমকালো নিহিতের এমন কণ্ঠে। অতঃপর নীরা চলে যেতেই রাফা যখন যাওয়ার জন্য উদ্ধত হল নিহিত করা নির্দেশে বলল,,—’সাহস থাকলে এক পা বাড়িয়ে দেখ।
রাফা অবাক দৃষ্টিতে পিছন ঘুরে বলল,,–‘কি বলবে?
নিহিত তার দিকে দু’কদম এগিয়ে এসে এক ঝলক আশেপাশে তাকালো। কেউ না থাকায় রাফার কানে হাত মুড়িয়ে দিয়ে বলল,,—’এত সাজগোজ করে ঢঙ্গির মতো ঘুরে বেড়ানো কি দরকার হ্যাঁ? যা গিয়ে এক্ষুনি মেকআপ তুলবি।
রাফা কিছু বলতে গিয়েও টের পেল, কানে রাখা নিহিতের হাতটা ক্রমশ ব্যথা দিচ্ছে তাকে‌। আর্তনাদ করে সে বলল,,

—’কান ছাড়ো নিহিত ভাই।
নিহিত আরো জোরে কান মুড়িয়ে বলল,,—’এক্ষুনি গিয়ে এসব সাজগোজ তুলবি নাকি আরো জোরে দিব?
—’কিন্তু আমি সাজগোজ টা কোথায় করলাম?
—’ঠোঁটে-চোখে এসব শাক’চু ন্নি’র মত কি করেছিস?
—’এগুলোকে সাজগোজ বলে? তাহলে তো নীরাও সাজগোজ করেছে।ওকে কিছু বলছ না কেন?
—’ও আর তুই সেম হলি?
রাফা কিছু না বুঝে বোকার মত বলল,,—’তা নয় তো কি?
নিহিত ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ছাড়লো,অতঃপর রেগে বলল,—’এসব সম্পর্কের সমীকরণ পরে বোঝাচ্ছি তোকে আগে যেটা বলছি সেটা কর যা।
বেশি জোরেই কান মুড়িয়ে ধরেছে নিহিত। রাফা ছাড়া পাওয়ার প্রয়াসে বলল,,—’আচ্ছা ছাড়ো যাচ্ছি।
‘গুড গার্ল’——নিহিত তাকে ছেড়ে দিতেই রাফা কানে হাত বোলাতে বোলাতে বলল,,
—’শা’লা ড্যাশ ড্যাশ ড্যাশ। তোমাকে আমি পরে দেখছি।
নিহিত অন্যদিকে চলে যাওয়ায় শুনতে পেল না তার কথাটা।

নীরা সবে নাহা’র রুমের উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়েছে, হঠাৎ কারো সাথে ধাক্কা লেগে পড়ে যেতে নিলেই তার হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরল কেউ। উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো—’আর ইউ ওকে?
নাহা থতমত খেয়ে কিছু বলতে যাওয়ার আগেই সম্মুখের মানবটাকে দেখল। সঙ্গে সঙ্গে হৃদয়ে উঠল অদ্ভুত ঘূর্ণিঝড়। কোনোমতে তা সামাল দিয়ে সে বলল,,
—’জ্বী? ইটস ওকে!
রিশাদ তাকে ছেড়ে দিয়ে বলল,,—’আরে তুমি নীর না?
—’হুম।
—’সো? হোয়াটস আপ? পড়াশোনার কি অবস্থা সামনে তো তোমার হাফ ইয়ারলি।
—’জ্বী আলহামদুলিল্লাহ ভালো ‌।
রিশাদ আর কি বলবে বুঝে পারলো না, তাই অস্বস্তি দূর করতে বলল—’ওহ, আচ্ছা থাকো তাহলে আমি যাই ওদিকে।
নীরা মাথা নাড়িয়ে বলল,,—’আচ্ছা।

ব্যবসায়িক বিভিন্ন বিষয়ে আর রাজনৈতিক মতাদর্শের আলোচনায় ভরপুর ড্রয়িংরুমটা।নীল বিষয়ে আলোচনা করছে তাদের সাথে। সবার শুভকামনা নিয়ে আগামী দিনগুলোর শুরু করায় তীব্র প্রত্যাশী সে। একে একে পরিবারের সকলের সঙ্গে আলাপ সেরেছে উপস্থিত সকলে।
হঠাৎ সেখানে উপস্থিত হলো তিহু।ডার্ক মেরুন রঙের সেই বসনে তাকে স্বর্গীয় অপ্সরা লাগছে। তার ডাগর চোখের পল্লবে এক লাজুক আবেশ, অথচ ললাটে এক দৃপ্ত সতীত্বের তেজ।নীল এতক্ষণ রাজনৈতিক আলাপে মগ্ন থাকলেও, তিহুর আগমনে তার সকল বাক্য যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। তার মুগ্ধ নয়নজোড়া অন্দরের সেই সহস্র আলোর রোশনাইকে উপেক্ষা করে কেবলই একটি মুখের ওপর স্থির হয়ে রইল।
পূর্ব পরিচয়ের খাতিরে উপস্থিত সকলের পরিবারের সকলকে চিনলেও;তিহু সম্পূর্ণ অজ্ঞাত তাদের। হঠাৎ তাদের মধ্য থেকে কেউ একজন বলল,,

—’হু ইজ সি?
সেখানকার চঞ্চলতা মুহূর্তেই এক গভীর স্তব্ধতায় রূপ নিল। জিজ্ঞাসু একজোড়া নয়ন নয়, বরং উপস্থিত প্রতিটি মানুষের দৃষ্টি তখন তিহুর ওপর নিবদ্ধ। তিহু ললাটে ঈষৎ সঙ্কোচ আর অধরকোণে এক চিলতে জড়তা নিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হলো, এই অসংখ্য চোখের উৎসুক দৃষ্টি যেন তাকে ঘিরে এক অদৃশ্য বেষ্টনী তৈরি করেছে।তিহু এবার ভীষণ অস্বস্তিতে ভুগছে। ভাবছে চলে যাবে না থাকবে। ওয়ালিদ খান তাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য কিছু বলার আগেই; নীরবতা ঘুচিয়ে ভেসে আসলো নীলের ভরাট কণ্ঠস্বর,,,
—’সি ইজ মাই ওয়াইফ মিসেস ওয়াহাজ খান নীল।
মুহূর্তেই যেন বিস্ফোরণ হলো কোথাও। সকলে হতবাক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল নীলের দিকে। নীল এগিয়ে গিয়ে তিহুর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে তার বাহু নিজের বাহু দ্বারা আঁকড়ে বলল,,

—’সি ইজ নুরাইন হক তিহু। এন্ড মাই বি লাভড ওয়াইফ মিসেস নুরাইন ওয়াহাজ খান।
সকলে বাকরুদ্ধ, সামান্য গুঞ্জন শোনা গেল হঠাৎ,,—’নীল বিয়ে করল কবে?
তখনই পাশ থেকে ওয়ালিদ খান বললেন,,—’কিছুদিন আগেই । একটা বিশেষ কারণে এটা আমরা এখনো প্রকাশ করি নাই, তবে ইনশাআল্লাহ কিছু দিনের মাঝে আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে খান বাড়ির বউয়ের মর্যাদা দেওয়া হবে।
সকলে বিস্মিত হলেও;নীলের সেই দৃপ্ত ঘোষণা তিহুর হৃদয়ে যেন এক আকস্মিক শ্রাবণ-ধারা নামিয়ে দিল। জনসমক্ষে নিজের অস্তিত্বের এমন অকুণ্ঠ স্বীকৃতি সে আশা করেনি; তার কুমারী মনের নিভৃত কোণে যে সংশয় আর সঙ্কোচ এতদিন বাসা বেঁধেছিল, এক মুহূর্তের বজ্রনির্ঘোষে তা ধুলিসাৎ হয়ে গেল। নীলের বলিষ্ঠ বাহুর আশ্রয়ে নিজেকে সমর্পণ করে দিয়ে সে অনুভব করল, তার পরিচয় আজ আর কোনো অলীক মিথ্যার কুয়াশায় ঢাকা নেই—বরং তা রবির আলোয় উদ্ভাসিত এক চরম সত্য।

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৪৩

লজ্জার রক্তিম আভা তার কপোলে খেলে গেলেও, অন্তরের গভীরে এক পরম নির্ভরতার আনন্দ তাকে এক অপূর্ব গাম্ভীর্য দান করল। জীবনের এই কণ্টকাকীর্ণ পথে সে যে আজ একলা নয়, বরং প্রিয়তমের পার্শ্ববর্তিনী এক অর্ধাঙ্গিনী—এই বোধটুকু তাকে এক নিমিষেই পৃথিবীর সবথেকে ভাগ্যবতী ও শক্তিময়ীরূপে প্রতিষ্ঠিত করল।

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৪৫

1 COMMENT

Comments are closed.