Home প্রেমের নীলকাব্য প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৪৭ (২)

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৪৭ (২)

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৪৭ (২)
নওরিন কবির তিশা

—“তিহুর সঙ্গে আমাদের যেতে দিলে না কেন? বেচারীটা না জানি কি অবস্থায় গিয়েছে!
মাহা কিছুটা রাগী কন্ঠে কথাগুলো বললেও রাওফিন হেলদোল দেখালো না তাতে; তার এমন ভাবান্তরহীন ভঙ্গিমায় মেজাজটা আরো বেশি গরম হলো মাহার। রিশাদ আর নাহাদের সঙ্গে সেও বেরিয়ে যেতে নিতেই,রাওফিন তার হাত আঁকড়ে নিজের সঙ্গে শক্ত করে বদ্ধ করে রিশাদের উদ্দেশ্যে বলল,,

——“হেই ব্রাদার, তুমি একটু কাইন্ডলি নাহাদের বাসায় পৌঁছে দিতে পারবে?
রিশাদ জলদি কণ্ঠে বলল,,——“ শিওর;হোয়াই নট।
——“থ্যাংকস ব্রাদার।
——“ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম।
বলেই নাহাদের নিয়ে সেখান থেকে প্রস্থান করলো রিশাদ।তবে রিশাদ আর নাহা চলে যেতেই মাহা অগ্নিশর্মা হয়ে ফিরে তাকাল রাওফিনের দিকে। তার দুচোখে তখন রাজ্যের অভিমান আর ক্রোধের মেঘ জমেছে;বেশ ঝাঁঝালো গলায় সে বলল,,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

——“ছাড়ো আমায়!
রাওফিন মাহার এই তর্জন-গর্জনে বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। বরং তার ঠোঁটের কোণে খেলে গেল এক চিলতে রহস্যময় হাসি। মাহার মেজাজ তাতে আরও কয়েক ডিগ্রি চড়ে গেল।সে গটগট করে চলে যেতে উদ্যত হতেই রাওফিন এক ঝটকায় মাহার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে পুরে নিল।যেন এক অদৃশ্য শিকলে মাহাকে নিজের সত্তার সাথে বেঁধে ফেলল সে।
মাহার রাগী চাহনিকে একপাশে সরিয়ে রেখে রাওফিন অত্যন্ত কোমল হাতে মাহার অবাধ্য কিছু চুল কানের পিছে গুঁজে দিল;মৃদু স্বরে বলল,,

——“বোকা নারী আমার। তুমি ভাবলে কি করে নীলের বিপদে আমি এখানে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবো? কিচ্ছু হয়নি ওর। এটা জাস্ট একটা ট্রিকস। লাভ ট্রিকস লাভলাইন। আজকের রাতটা একান্ত ব্যক্তিগত ওদের। তাই আমি চাইনা কেউ ওখানে গিয়ে ডিস্টার্ব করুক। বোঝাতে পেরেছি?
রাওফিনের কথার মর্মার্থ বুঝে মাহার ক্রোধের মেঘ ততক্ষণে একটু একটু করে কাটতে শুরু করেছে। মাথা নাঁড়িয়ে সে বলল,,

——“হুম।
——“তাহলে এই ক্ষণটা আমরা দুজন উপভোগ করি? শুধু দুজনে।
রাওফিনের কণ্ঠের গভীর সুরে মাহা, নিষ্পলক চেয়ে রইল। রাওফিন আরেকটু কাছে এগিয়ে এসে তার কপালে কপাল ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলল,,
——“পৃথিবীর সব ব্যস্ততা আজ অন্য কারো জন্য তোলা থাক, এই মুহূর্তে আমার পুরোটা আকাশ জুড়ে শুধু তুমি আর তোমার ওই মায়াভরা চোখ দুটো থাক।
মাহা মোহাচ্ছন্ন দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। রাওফিনের গভীর সে স্বর যেন আচ্ছন্ন করে ফেলেছে তাকে।

🎶 বেসামাল….
হয়েছি আজ বেসামাল
তুই তাকালি এমন করে….
ও,হোহো এই কদিন হয়েছে দেখা তোর আমার….
দিলি মনটাকে কেমন করে…
তোকে জানাতে জানাতে চাই….
আমি বেসেছি ভালোবাসায়….
মনের কোনে….
আপন মনে…
ঠিকানা জামাতে চাই….

পঞ্চমবারের ম্যাসেজে বিরক্ত হয়ে ফোনটা হাতে তুলতেই গানে কলিগুলো দৃষ্টিগোচর হলো মুন্নির। বিরক্তিতে চোখ মুখ কুঁচকে আসলো খানিক। আজ প্রায় এক সপ্তাহ হয়েছে অপরিচিত নাম্বারগুলো থেকে বারংবার ম্যাসেজ করেই চলেছে। একটা ব্লক করলে অন্যটা দিয়ে আসে।
দীর্ঘদিন এমন চলায় বেশ বিরক্ত মুন্নি। শেষমেষ রেগে এবার রিপ্লাইটা দিয়ে বসলো সে।
——“নির্লজ্জ বেহায়া ইতর, এতবার ব্লক খাওয়ার পরেও লজ্জা হয় না তাই না তোর?
মুন্নির মেসেজ দিতে দেরি সেকেন্ডের মাঝেই অপর পাশে থেকে রিপ্লাই,,

——“আরে আরে ম্যাডাম একটু আস্তে গালাগালি দাও। গালাগালি তোপে তো এবার উড়ে যাব মনে হচ্ছে।
——“বেহায়া ইতর, আমার জুতার বাড়ি না খাইতে চাইলে এক্ষুনি মেসেজ দেওয়া বন্ধ কর। নয়তো আমাকে চিনিস না।
——“আরে আরে ম্যাডাম এত হাইপার হয়ে যাচ্ছ কেন? একটু কথাই তো বলতে চেয়েছি।
——“লুচ্চার ঘরের লুচ্চা তুই মেসেজ দেওয়া বন্ধ করবি কিনা বল?
——“তখন থেকে অনেক বড় বড় কথা বলছো তুমি।আমি লুচ্চা?
নিজের থেকে মেসেজ দিয়ে আবার নিজের ক্যারেক্টার কে সুন্দর বলা মানবটিকে দেখে শুধুই হাসি আসলো মুন্নির সেই সঙ্গে রাগের আগুন বেড়ে গেল দ্বিগুণ। কটমট কণ্ঠে যে বলল,,

——“না তুই হচ্ছিস ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ শুদ্ধ পুরুষ। তা আমাকে মেসেজ দিচ্ছিস কেন হ্যাঁ।
——“সুন্দরী মেয়েদের কথায় নাকি বোম্বাই মরিচের ঝাল থাকে; আজকে প্রমাণ পেলাম।
——“আজাইরা বকবক বাদ দিবি নাকি।।
——“তুমি যখন সুন্দর করে একটা রিপ্লাই দিবা ঠিক তখনই বন্ধ করে দেব প্রমিস।
মুন্নি যখন রেগে মেগে একপ্রকার ফোনের মধ্যেই অপর প্রান্তের মানবটিকে খুন করার পরিকল্পনা করছে ঠিক তখনই হুট করে রুমে প্রবেশ করলেন রুমিন আরা খান। মাকে দেখেই দ্রুত ফোনটা কেটে সাইডে সরিয়ে রাখলো মুন্নি।

জনমানবহীন নির্জন প্রান্তরে-নির্জীবভাবে পড়ে থাকা কক্ষটাতে হঠাৎ নিজের পরিচিত কণ্ঠের নুর’ ডাক তা কর্ণগোচর হওয়া মাত্র তিহুর চঞ্চল পদক্ষেপ যেন এক থমকে গেল এক লহমায়।বাইরে বৃষ্টির আগের সেই ভ্যাপসা গরম আর ভেতরে পুরনো কাগজের স্তূপের এক অদ্ভুত গন্ধ। খোলা কাঁচ ভেদিয়ে জানলা দিয়ে শ্রাবণের ঝোড়ো হাওয়া যখন ভেতরে ঢুকছে, তখন কোণের ওই পুরনো ক্যালেন্ডারটা পতপত করে শব্দ তুলছে।
নিস্তব্ধতা এতটাই যে, তিহু নিজের হৃৎপিণ্ডের ধকধকানি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে। নিঝুম ‌সেই কক্ষে ফের ‘নুর’ সম্মোধনটা প্রতিধ্বনিত হলো, প্রতিধ্বনিত সেই শব্দে বাতাসের প্রতিটি কণা যেন কেঁপে উঠল পুনরায়।তিহু ভীত সন্ত্রস্ত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা সূচকস্বরে বললো,,

——“নেতা সাহেব?
দীর্ঘদেহী মানবটা এগিয়ে এলো,,——“নুর?
তিহু দ্রুত পদক্ষেপে এগিয়ে গিয়ে জাপ্টে ধরল তাকে। সঙ্গে সঙ্গে ঘরের জমাট বাঁধা অন্ধকার এক নিমিষেই কর্পূরের মতো উড়ে গেল। হঠাৎ এক মায়াবী আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল সারা ঘর। তিমির বিদায় করে সেই আলোর রোশনাই যখন চারদিকের দেয়ালে খেলা করতে লাগল, গোলাপ বেলির মিশ্রতাই পুষ্প বর্ষন শুরু হলো তাদের দুজনের উপর।তিহু বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে দেখল—এ তো কোনো কক্ষ নয়, এ যেন এক নন্দনকানন!

পার্টি অফিসের সেই ​রুমের চারপাশ জুড়ে ফুটে আছে রাশি রাশি শ্বেতশুভ্র রজনীগন্ধা আর রক্তিম গোলাপ। সেই স্নিগ্ধ সুবাসে ঘরের গুমোট ভাবটা কখন যে বসন্তের মাতাল হাওয়ায় রূপ নিয়েছে, তা টেরই পাওয়া যায়নি। দেয়াল জুড়ে ছোট ছোট আলোকবিন্দুরা তারার মতো মিটিমিটি করে হাসছে। মধ্যিখানে এক চিলতে কাঁচের টেবিল, তার ওপর শোভা পাচ্ছে বনস্পতির মতো সাজানো এক বিশাল কেক—যাতে সযত্নে খোদাই করা তিহুর নাম পাশে জন্মদিনের শুভেচ্ছা বাক্য।
​তিহু তখনও নীলের বুকে মুখ লুকিয়ে থরথর করে কাঁপছিল। নীল তার দুই বাহু দিয়ে তিহুকে আগলে ধরে অতি লঘু স্বরে, যেন কোনো এক শ্রাবণ-সন্ধ্যার বাঁশির সুরে বলে উঠল,,

——“হ্যাপি বার্থডে মাই অর্কিড!
​তিহু মুখ তুলে চাইল। তার সজল চোখের তারায় তখন সহস্র প্রদীপের প্রতিফলন। ব্যাকুল কণ্ঠে সে বলল,,
——“আপনি-আপনি ঠিক আছেন তো?
নীল খানিক হেসে বলল,,——“আমার আবার কি হয়েছে?
——“আ-আপনার মাথায় আ-আঘাত।
——“মানে? কি বলছো তুমি?
——“আপনি আঘাত পেয়েছেন না.?
——“না তো!
ব্যাস! নীলের এই একটা কথাতেই যেন তিহুর সমস্ত প্রশ্নের উত্তর ছিল। হুট করে ব্যাকুল উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে রাজ্যের ক্ষোভেরা বাসা বাঁধল, অগ্নিকণ্ঠে সে বলল,,

——“আপনি কি পাগল? জানেন আমি কতটা টেনশনে ছিলাম?প্রত্যেকটা মুহূর্তে মনে হচ্ছিল আমার দম বন্ধ হয়ে আসবে. এত বড় মিথ্যা কেন বললেন আমাকে? নেতা সাহেব কেন?
নীল বুঝলো না কিছু; কি বলছে তিহু এসব? তবে সে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে কিছু বলার আগেই তিহু এক ঝটকায় নিজেকে তার বাহু থেকে ছাড়িয়ে বলল,,

——“আপনাকে আর কখনো বিশ্বাস করবো না আমি; জানেন আজকে সারাটা দিন আমি কি পরিমান অপেক্ষা করেছি আপনার জন্য? প্রত্যেকটা ক্ষণে ক্ষণে দরজার বাইরে চেয়েছি হয়তো আপনি আসছেন।কিন্তু না; আপনার কোনো খোঁজই নেই। আপনি তো ব্যস্ত, ভীষণ ব্যস্ত। ৩০ টা মিনিটের জন্য সময় হয়নি আপনার; কিন্তু তাতেও আমি কিছু মনে করিনি বিশ্বাস করুন। তবুও এত বড় বিশ্বাসঘাতকতা কেন করলেন? কেন ব্রাদারকে দিয়ে বলে পাঠালেন যে আপনি, আপনি আঘাতগ্রস্ত। কেন মিস্টার পলিটিশিয়ান কেন?

এতক্ষণে সবটা স্বচ্ছ কাছের ন্যায় পরিষ্কার হলো নীলের সম্মুখে। তারমানে রাওফিন করেছে এই ভাওতাবাজি। হাঁ*দাটাকে নীল পাঠিয়েছিল তিহুকে পাঠানোর জন্য অথচ ও যে এত বড় মা*ত*লামি করেছে সে সম্পর্কে নীল একদমই অবগত ছিল না। তবে নীল যতক্ষণে তিহুকে বোঝাবে ততক্ষণে অনেকটা দেরি হয়ে গিয়েছে। হাতছাড়া হয়ে গিয়েছে অনেক কিছু,তিহুতো রীতিমতো রেগে আগ্নেয়গিরি হয়ে আছে।
তিহুর আর এক মুহূর্ত সেখানে না দাঁড়িয়ে ঝড়ের বেগে‌ প্রস্থান করল। কিন্তু প্রকৃতির খেয়াল হয়তো অন্যরকম ছিল।সে বাইরে পা রাখতেই আকাশ ভেঙে নামল ঝিরিঝিরি বৃষ্টিকণা। শ্রাবণের সেই শীতল জলকণাগুলো তিহুর তপ্ত কপালে ছোঁয়া লাগলেও তার মনের ভেতরের অভিমানের আগুন নেভাতে পারল না। সে বৃষ্টির মাঝেই হাঁটতে শুরু করল।
হঠাৎ পেছন থেকে নীলের গম্ভীর অথচ আকুল ডাক ভেসে এল,,

——“নুর! শোনো আমার কথা। এক মিনিট দাঁড়াও!
তিহু থামল না। বৃষ্টির বেগ বাড়ছে, সাথে বাড়ছে তার চোখের জলের ধারাও। নীল দ্রুত পায়ে এসে তিহুর পথ আগলে দাঁড়াল। বৃষ্টির ঝাপটায় নীলের চুলগুলো কপালে এসে লেপ্টে আছে, পরনের সাদা শার্টটা গায়ের সাথে সেঁটে গিয়ে তার বলিষ্ঠ অবয়বকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
——“নুর, রাগ করো না। বিশ্বাস করো, রাওফিন যে এমন কিছু বলবে আমি জানতাম না। আমি শুধু চেয়েছিলাম তোমাকে একটা সারপ্রাইজ দিতে।
তিহু ঝাপসা চোখে নীলের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল,,,

——“সারপ্রাইজ? কারো মৃ*ত্যুর খবর দিয়ে কেউ সারপ্রাইজ দেয়? আপনি জানেন না আপনাকে হারানোর ভয় আমার কাছে কতটা ভয়াবহ?
নীল আর নিজেকে সামলাতে পারল না। এক হেঁচকা টানে তিহুকে নিজের বুকের একদম কাছে নিয়ে এল সে। বৃষ্টির অঝোর ধারায় দুজন ভিজে একাকার। নীলের উষ্ণ নিশ্বাস তিহুর কানের কাছে আছড়ে পড়ছে। সে খুব নিচু স্বরে, গভীর আবেগে বলল,
——“ভুল হয়ে গেছে নুর। এই অবাধ্য নেতাকে আজ মাফ করা যায় না? দেখ, আকাশটাও আজ আমাদের এই মান-অভিমানের সাক্ষী হতে চাইছে।

——“না যায় না।
পার্টি অফিস থেকে ভেসে তীক্ষ্ণ আলোকরশ্মিতে নীল দেখল তিহুর বৃষ্টি সিক্ত রাগী মুখশ্রী। লাল আপেলের ন্যায় দেখাচ্ছে তাকে; নীলের দৃষ্টিটা হঠাৎই বড্ড বেসামাল হয়ে উঠেছে। চাইলেও নিজেকে সামলাতে পারছে না নীল। এ কেমন ব্যাকুলতা? নিজেকে বোঝানোর চেষ্টাতেও ব্যর্থ সে,শুকনো ঢোক গিলে সে শুধু বলল,,
——“অফিসের ভেতর চলো নুর!
প্রত্যুত্তরে এমন কথা হয়তো আশা করেনি তিহু, বিরক্তি কণ্ঠে সে বলল,,
——“কোথাও যাচ্ছি না আমি!
——“এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে বৃষ্টির কারণে ঠান্ডা লাগবে।
——“তাতে আপনার কি?
——“শেষবারের মতো বলছি ভেতরে চলো।

নীলের কন্ঠে শাসনের স্বর থাকলেও একগুয়ে কন্ঠে তিহু বললো——“যাবনা!
বোঝানোর চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে;শেষমেষ তিহুর কোনো আপত্তি;তর্জন-গর্জনের তোয়াক্কা না করেই নীল এক লহমায় তাকে নিজের কাঁধের ওপর তুলে নিল তাকে। নীলের আকর্ষিক এমন কাণ্ডে তিহু বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে হাত-পা ছুড়তে লাগল,কিন্তু নীলের সেই ইস্পাতকঠিন বাঁধন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসা তার মতো লতাগলি নারীর পক্ষে অসম্ভব ছিল।
বৃষ্টির ঝাপটায় ভিজে একাকার নীল তাকে কাঁধে নিয়েই দৃপ্ত পায়ে হেঁটে চলল সেই আলোক সজ্জিত পার্টি অফিসের অভিমুখে। ভিতরে এসেই, তিহুকে নামালো নীল।তিহু রাগী দৃষ্টি নিক্ষেপ পূর্বক নীলের উদ্দেশ্যে বলল,,

——“এভাবে আনলেন কেন আমায়?
নীল দ্রুত পাশ থেকে একটা শুকনো কাপড় এনে তাকে মোছাতে যেতেই তিহু তাকে ছাড়িয়ে বললো,,,
——“সরে যান।
নীল তিহুর এমন আচরণে মুচকি হাসলো খানিক। তাকে কাছাকাছি টেনে দূরত্ব ঘছিয়ে বলল,,
——“রক্ত লাল রক্তজবা? রাগে অভিমানিতা;আমার মরুভূমিতে হঠাৎ ফুটে ওঠা কোনো নাম না জানা এক বনলতা,রাগলেও তুমি তিলোত্তমা প্রিয়তা।
তিহু নিজেকে ছাড়াতে চেষ্টা করছে তখন থেকে।নীল এবার সত্যিই বিরক্ত হলো।রেগে তিহুকে নিজের সঙ্গে শক্ত করে আবদ্ধ করে;নিজের বক্ষদেশে ইশারা করে বলল,,

——“বুঝছো না,তোমাকে এইরুপে দেখে অলরেডি আমার এখানে ব্যাথা শুরু হয়ে গেছে।আর কিছুক্ষণ এমন থাকলে মৃ*ত্যু অনিবার্য হবে আমার।
নীলের বলা শেষ কথাটাতে হয়তো মিশে ছিল কোন তীব্র প্রতীক্ষার ব্যাকুলতা।তিহু হৃদয়ে হঠাৎই অদ্ভুত উচাটন শুরু হলো।নীলের গভীর দৃষ্টিকে কিছুতেই অবজ্ঞা করতে পারল না সে, না চাইতেও অস্ফুট স্বরে বলল,,
——“কি বলছেন?
নীল উন্মাদের ন্যায় তাকে নিজের সঙ্গে আবদ্ধ করে;তিহুর ভেজা গলায় মুখ গুঁজে মোহগ্রস্তের ন্যায় বলল,,
——“আই নিড ড্রা*গস অর্কিড। ইটস এমার্জেন্সি। এক্ষুনি এই মুহূর্তে না পেলে আমি হয়ত মা*রাই যাব।
পূর্ববর্তী-পরবর্তী কোনো কথাই তিহুর কর্ণগোচর হলো না যেন; সে শুধু শুনতে পেলে ড্রা”গস কথাটা! ছিটকে দূরে সরে সে বলল,,,

——“আপনি ড্রা*গস নেন?
তিহুর হঠাৎ এমন সরে যাওয়া যেন পছন্দ হলো না নীলের, বিরক্তিতে সে বলল,,
——“হ্যাঁ নেই, তো?
তিহু নাক কুঁচকে বলল,,——“ওয়া, ছিঃ!
নীল তার দিকে এগিয়ে আসতে আসতে ঘোর লাগা কণ্ঠে বললো,,——“ড্রা*গস যদি হও তুমি; তাতে আজীবন নেশাগ্রস্থ থাকতে রাজি এই আমি।
তিহুর কাছে নীলের কন্ঠটা, আজ কেন যেন অন্যরকম শোনাচ্ছে। অদ্ভুত ঘোরালো আর নেশাগ্রস্থের ন্যায় তার কণ্ঠস্বর।তিহু ভীত কন্ঠে প্রশ্ন করল,,
——“মা-মানে?

নীল এগিয়ে আসলো তার দিকে;তার লালিত্যে ভরা ওষ্টের প্রথম ছোঁয়া এসে লাগল তিহুর বৃষ্টি ভেজা গ্রীবাদেশে। নীলের এরূপ সান্নিধ্য আর ওষ্ঠের এহেন স্পর্শে কেঁপে উঠল তিহুর দেহবল্লরী। এর আগেও বহুবার নীলের সান্নিধ্য অনুভব করেছে উপভোগ করেছে সে। তবে আজকেরটা সম্পূর্ণ ভিন্ন; কোনো এক অজানা জাদু বলে থমকে গিয়েছে তিহুর তোতা পাখির ন্যায় অবিরত বকবক করা জবানখানা।
তিহুর স্তব্ধতায় বাঁকা হাসে নীল, তবে পরবর্তীতেই আরেক সর্বনাশা কান্ড ঘটায় সে। এতক্ষণ যাবৎ ওষ্টের নরম স্পর্শবিদ্যমান জায়গাটিতে হুট করেই দন্তস্পর্শে এক গভীর ক্ষত আর সোহাগের চিহ্ন ফুটিয়ে তোলে সে,‌সঙ্গে সঙ্গে আবেশে মুদে থাকা তিহুর কণ্ঠ চিরে ‌বেরিয়ে এল এক অস্ফুট আর্তনাদ ।
তিহুর মনে হলো এ এক অদ্ভুত যন্ত্রণা,অথচ এর মাঝে লুকিয়ে আছে এক স্বর্গীয় তৃপ্তি। নীলের এই বন্য অথচ সুনিপুণ ভালোবাসার দংশন তার হৃদয়ের গহীনে এক কম্পন সৃষ্টি করলো। নীল ধীরে ধীরে মুখ তুলে চাইল; বেশ কিছুক্ষণ পূর্বেই সে টের পেয়েছে তিহুর ক্ষীণ কায়ার থরথর কাঁপুনি আর ঢোঁক গেলারে মৃদু শব্দ।নীল মৃদু হেসে তিহুকে নিজের সঙ্গে আষ্টেপিষ্টে বদ্ধ করলো।
তিহু নিজের প্রকম্পিত কন্ঠে শুধু উচ্চারণ করল,,,

——“ক-ক-কি করতে চাইছেন?
নীল নিজের সঙ্গে তাকে বদ্ধ করেই; পার্টি অফিসের নরম কাউচটাতে তাকে ধাক্কা মেরে ফেলে;মুহূর্তের মধ্যে তিহুর দেহের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করল সে। তিহুর বৃষ্টিভেজা অবিন্যস্ত কেশরাজ কানের পিছে গুঁজে; কানের একদম কাছে নিজের মুখটা নিয়ে গেল। তার উষ্ণ নিশ্বাস তিহুর কানের লতিতে এক শিহরণ জাগানিয়া ঢেউ তুলছে। নীল খুব নিচু-ভাঙা-নেশাগ্রস্ত কণ্ঠে গেয়ে উঠল,,

Hain joo iraaden bata doon tumko
(আমার মনে যে ইচ্ছেগুলো আছে,
তা যদি তোমাকে বলে দিই)
Sharma hi jaaoge tum…
(তবে তুমি লজ্জাই পেয়ে যাবে…)
Dhadkane jooo suna doon tumko….
(আমার হৃদস্পন্দন যদি তোমাকে শুনিয়ে দিই)
Ghabra hi jaaoge tum…..
(তবে তুমি ঘাবড়েই যাবে বা চমকে উঠবে…..)

নীলের কণ্ঠের সেই নেশাতুর সুর আর গানের কলিগুলো তিহুর হৃদপিণ্ডে যেন এক প্রলয়ঙ্করী ঝড়ের পূর্বাভাস বয়ে আনল। লজ্জায় আর আবেশে তিহু যখন আড়ষ্ট হয়ে চোখ বুঁজে আছে, ঠিক তখনই নীল যেন তার অপেক্ষার সমস্ত হিসেব চুকিয়ে দিতে চাইল।সে ধীরে ধীরে নুয়ে এল তিহুর ওষ্ঠাধরের খুব কাছে। বর্ষার সেই শীতল রাতে তাদের দুজনের তপ্ত নিঃশ্বাস একে অপরের সাথে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে।

তিহু অনুভব করল, নীলের ঠোঁট দুটো তার ঠোঁটের ওপর নেমে এসেছে—এক অত্যন্ত গভীর, নিবিড় আর সর্বগ্রাসী চুম্বনে। এ দীর্ঘদিনের জমে থাকা মান-অভিমান, বিরহ আর ভালোবাসার এক চূড়ান্ত বিস্ফোরণ এই রাজনৈতিক কর্মস্থলের আঙিনায় । নীলের সেই সর্বনাশা স্পর্শে তিহুর মনে হলো সে যেন এক অতলান্ত মায়াবী নেশার ঘোরে তলিয়ে যাচ্ছে। বাইরের জগতের সমস্ত কোলাহল স্তব্ধ হয়ে গেল, শুধু রয়ে গেল তাদের হৃৎস্পন্দনের সেই দ্রুত তাল।

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৪৭

ঠিক সেই মুহূর্তে শ্রাবণের আকাশ যেন তাদের এই মিলনের সাক্ষী হতে আরও ব্যাকুল হয়ে উঠল। বাতাসের ঝাপটায় জানালার কপাটগুলো সশব্দে নড়ে উঠল, ছোট আবহাওয়ার মাঝেই এক জোড়া কপত-কপতি একে অপরের মাঝে হারিয়ে গেল এক গভীর আলিঙ্গনে।ঝোড়ো হাওয়ার শব্দকে ছাপিয়ে জেগে রইল কেবল দুটি তৃষ্ণার্ত আত্মার নীরব কথন।

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৪৮