প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৫৩
নওরিন কবির তিশা
সমগ্র বাংলাদেশ যেন এক আগ্নেয়গিরির উত্তপ্ত জ্বালামুখে দাঁড়িয়ে। উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম;চৌষট্টিটি জেলার প্রতিটি ধূলিকণা আজ থরথর করে কাঁপছে এক উন্মাদ প্রেমিকের আর্তনাদে। সেই আর্তনাদের প্রতিটি শব্দের প্রতিধ্বনি আছড়ে পড়ছে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শিখরে। মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে পড়ল তথাকথিত শৃঙ্খলা।আইনের শাসন আজ নতজানু হয়ে দাঁড়িয়েছে এক উন্মাদ প্রেমিকের জিঘাংসার সামনে।
আকাশের বুক চিরে গর্জে উঠছে একের পর এক সামরিক হেলিকপ্টার। তাদের প্রখর সার্চলাইটের আলো রাত্রির অন্ধকারকে ফালাফালা করে খুঁড়ে বের করতে চাইছে সেই কালনাগিনীর গর্ত,যেখানে লুকিয়ে রাখা হয়েছে তার প্রাণপ্রিয় অর্কিডকে। রানওয়েতে বিমানের চাকা থামবার জো নেই, প্রতিটি প্রহর আজ সজাগ, প্রতিটি সীমান্ত আজ রুদ্ধ। জলপথে নৌবাহিনীর রণতরিগুলো উত্তাল ঢেউ তুলে চষে বেড়াচ্ছে প্রতিটি মোহনা। বনের গভীরে কিংবা লোকালয়ের ভিড়ে—কোথাও নিস্তার নেই।
যেন প্রলয় বিষাণ বেজে উঠেছে বাংলাদেশ প্রাণোচ্ছল আকাশ-বাতাসে। যে শান্ত বিকেলের মেঘদল কিছুদিন আগেও রাঙা আলোয় অলস খেলা করছিল, মুহূর্তেই তারা যেন কালবৈশাখীর ঘন কৃষ্ণরূপ ধারণ করছে।রাজপথের মোড়ে মোড়ে জ্বলছে অগ্নিশিখা, টায়ার পোড়া কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেছে নীলিমা। সাধারণ জনপদ আজ নিস্তব্ধ, ভীত-সন্ত্রস্ত।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
মানুষ দেখছে এক অন্য নীলকে, যার কাছে আজ তুচ্ছ দেশ, তুচ্ছ রাজনীতি, তুচ্ছ এই কোটি কোটি টাকার সাম্রাজ্য। তার জগতের একমাত্র ধ্রুবতারা আজ কক্ষচ্যুত, আর সেই তারাকে ফিরিয়ে আনতে সে আজ বিশ্বচরাচর ছারখার করে দিতেও দ্বিধাবোধ করছে না।আইয়াজ থেকে শুরু করে বড় বড় রথী-মহারথীরাও আজ নীলের সামনে দাঁড়াতে সাহস পাচ্ছে না।প্রতিটি দপ্তরে, প্রতিটি থানায় আজ কেবল একটাই নির্দেশ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে,
—‘খুঁজে বের করো আমার নুরকে, নইলে এই দেশের মানচিত্র থেকে শান্তি শব্দটা মুছে যাবে চিরতরে।
নীলের ব্যক্তিগত কার্যালয়ে এখন দেশের তাবড় তাবড় গোয়েন্দা কর্মকর্তারা কুঁকড়ে বসে আছেন। নীল টেবিলের ওপর সজোরে মুষ্ঠাঘাত করে গর্জে উঠল,,
—’সিসিটিভি ফুটেজে ওই র*ক্তমাখা গলিটা ছাড়া আর কিছু নেই কেন? একটা আস্ত মানুষ কি কর্পূরের মতো বাতাসে মিলিয়ে গেল? আমি আগামী এক ঘণ্টার মধ্যে ওই ভ্যানটার অবস্থান জানতে চাই, নইলে এই শহরের প্রতিটা ইঞ্চিতে আমি আগুন জ্বালিয়ে দেব!
একজন সিনিয়র ডিটেকটিভ যথেষ্ট অভিজ্ঞ কণ্ঠে বললেন,,
—‘মিস্টার ওয়াহাজ, আপনি শান্ত হোন। আমাদের সাধ্যের অতীত কিছুই আমরা বাকি রাখিনি। দেশের চৌষট্টিটি জেলায় এই মুহূর্তে রেড অ্যালার্ট জারি করা আছে। ডিপিডিটি থেকে শুরু করে সাইবার ক্রাইম ইউনিট—সবাই পঙ্গপালের মতো হন্যে হয়ে খুঁজছে। কিন্তু অপরাধীরা রুটিনমাফিক তাদের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট মুছে দিচ্ছে। আমাদের সিস্টেমের একটা নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া আছে, সেই লজিক আর প্রটোকলের বাইরে গিয়ে তো আর—’
নীল আর সহ্য করতে পারল না। সম্মুখে রাখা দামি কাঁচের গ্লাসটা সজোরে দেয়ালে আছাড় মারল সে। ঝনঝন শব্দে কাঁচের টুকরোগুলো ছড়িয়ে পড়ল সারা ঘরে। সে সিংহের মতো ক্ষিপ্রতায় ডিটেকটিভের কলার চেপে ধরে তার মুখের খুব কাছে নিজের মুখটা নিয়ে এল; বজ্রকন্ঠ হিসহিসিয়ে বলে উঠল,
—‘ফাক ইয়োর সিস্টেম, মিস্টার আফনান! ইয়োর ড্যাম সিস্টেম ইজ ফেইলড! যখন আমার অর্কিডকে ওই অন্ধকার গলিতে একা পেয়ে ওরা টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন কোথায় ছিল আপনাদের এই প্রটোকল? কোথায় ছিল আপনাদের এই তথাকথিত লজিক?
ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা যেন এক নিমেষে কয়েক ডিগ্রি বেড়ে গেল। নীল ডিটেকটিভকে এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে ঘরের মাঝখানে পায়চারি করতে করতে উন্মত্তের মতো বলতে লাগল,,
—‘সিস্টেম দিয়ে সাধারণ চোর ধরা যায়, ওয়াহাজ খান নীলের কলিজায় হাত দেওয়া অপরাধীদের নয়। নূর আমার সিস্টেমের অংশ নয়, ও আমার প্রাণ। আর প্রাণের জন্য কোনো নিয়ম খাটে না। আমি আপনাদের এক ঘণ্টা সময় দিয়েছিলাম, তার মধ্যে পনেরো মিনিট পার হয়ে গেছে। মনে রাখবেন, পরবর্তী পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মধ্যে যদি ওই ভ্যানটার শেষ লোকেশন আমার টেবিলে না আসে, তবে আমি নিজের হাতে এই সিস্টেমের কবর দেব। আমি পলিটিক্স করি মানুষের সেবা করতে, কিন্তু নূরের জন্য আমি পুরো মানচিত্রকে নরক বানিয়ে দিতেও হাত কাঁপাব না!’
নীলের কথা শেষ হতে না হতেই কোণার টেবিল থেকে এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা, আরভিদ চৌধুরী, বেশ কিছুটা দম্ভ আর বিরক্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে উঠলেন। তিনি চশমাটা ঠিক করে গম্ভীর গলায় বললেন,,
—‘মিস্টার ওয়াহাজ, আপনি বোধহয় ভুলে যাচ্ছেন আপনি কার সাথে কথা বলছেন। আমরা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্তরের কর্মকর্তা। আপনার সহধর্মিণীর নিখোঁজ হওয়াটা দুঃখজনক, কিন্তু তার জন্য আপনি পুরো দেশ অচল করে দেবেন? আপনি আইন হাতে তুলে নিচ্ছেন, যা আপনার পলিটিক্যাল ক্যারিয়ারের জন্য সুইসাইডাল হতে পারে। আমার মনে হয় আপনি এবার একটু বেশি বেশি করছেন!’
‘বেশি বেশি?’—শব্দটা শোনামাত্র নীল স্থির হয়ে গেল। ঘরের নিস্তব্ধতা যেন কয়েক গুণ বেড়ে গেল। নীল ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে চৌধুরীর দিকে তাকাল। তার মুখে এক পৈশাচিক হাসি ফুটে উঠল, যা দেখে উপস্থিত সবার মেরুদণ্ড দিয়ে এক হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল।
নীল ধীর আরভিদ চৌধুরীর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার শান্ত ভঙ্গিটি ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতার চেয়েও ভয়াবহ। হঠাৎ নীল ডান হাতে টা দিয়ে বজ্র গতিতে সামনে থাকা ভারী পেপারওয়েটটা এক ঝটকায় গুঁড়িয়ে দিল।
—‘বেশি বেশি দেখছেন কোথায় চৌধুরী সাহেব? প্রেমিকের হাহাকার যদি প্রলয় না আনে, তবে সেই প্রেম তো কেবল কাগজের পাতায় সীমাবদ্ধ! ক্যারিয়ার? ক্যারিয়ারের কথা বলছেন আমাকে? নূরকে ছাড়া এই ওয়াহাজ খান নীল কেবল একটা রক্ত-মাংসের কঙ্কাল! আর একটা কঙ্কালকে ক্যারিয়ারের ভয় দেখাচ্ছেন? জাস্ট শাট আপ!’
নীল এবার ড্রয়ার থেকে নিজের রিভলবারটি বের করে সজোরে টেবিলের ওপর আছাড় মারল। তার গলার শিরাগুলো টানটান হয়ে ফুলে উঠেছে। সে উন্মত্তের মতো সবার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল,,
—‘এই যে বাইরে হেলিকপ্টারের গর্জন শুনছেন, এই যে রাজপথে আগুনের লেলিহান শিখা দেখছেন—এগুলো তো মাত্র শুরু। আমার অর্কিডের চোখে যদি এক ফোঁটা জল পড়ে, তবে আমি কথা দিচ্ছি, এই ড্যাম সিস্টেমের একটা ইটও আর আস্ত থাকবে না। আপনারা প্রটোকল দিয়ে ভাত খান, আমি নূরকে দিয়ে শ্বাস নেই। আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে, আর আপনারা আমাকে আইনের সবক শেখাচ্ছেন?
নীলের সেই ভয়াবহ রুদ্রমূর্তি দেখে গোয়েন্দাদের কপালের ঘাম চুইয়ে পড়ছে। তাদের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে এমন কোনো মানুষ তারা দেখেনি, যে প্রেমের জন্য আস্ত একটা দেশের মানচিত্রকে বাজি ধরতে পারে। চৌধুরী সাহেব থতমত খেয়ে চেয়ারে বসে পড়লেন, তার সমস্ত দম্ভ নীলের সেই আগ্নেয়গিরির উত্তাপে মোমের মতো গলে গেছে।
পুরো ঘরে তখন পিনপতন নীরবতা। কেবল নীলের ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ আর দেওয়াল ঘড়ির টিকটিক আওয়াজ। নীল আবার তার জানালার দিকে ফিরে গেল, বাইরে আকাশের বুক চিরে এখনো তার নির্দেশে পাঠানো হেলিকপ্টারগুলোর শব্দ শোনা যাচ্ছে। সেদিকে তাকিয়েই নীল অদ্ভুত ভয়াল কন্ঠে বলল,,
—‘আর মাত্র চল্লিশ মিনিট। নূরকে ছাড়া যদি ওই সূর্যটা কাল সকালে ওঠে, তবে সেই সূর্যোদয় দেখার জন্য আপনারা কেউ জীবিত থাকবেন না। গেট আউট অফ মাই সাইট! এন্ড ডু ইয়োর জব!
গোয়েন্দারা আর এক সেকেন্ডও অপেক্ষা করলেন না। প্রায় দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন তারা। নীল একা দাঁড়িয়ে রইল সেই বিশাল কক্ষের মাঝখানে। তার চোখের কোণে এক ফোঁটা অশ্রু টলমল করছে, কিন্তু তার চোয়াল পাথরের মতো শক্ত। সামনেই বিশাল থাই গ্লাসের দেয়াল, যার ওপারে পুরো ঢাকা শহর আজ তার নির্দেশে থমকে আছে।
হঠাৎ করেই নীলের দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল স্বচ্ছ কাঁচের ওপর। বাইরের অন্ধকার আর ঘরের ভেতরের আলোর খেলায় থাই গ্লাসে ফুটে উঠেছে এক অস্পষ্ট প্রতিবিম্ব। অবিকল তিহুর ন্যায়! নীল দু’পা পিছিয়ে এল। তার ঝাপসা চোখে তখন অশ্রুক কনারা টলমল করছে সে অস্ফুটস্বরে আর্তনাদ করে উঠল,
‘নূর? আমার অর্কিড!’
সে উন্মাদের মতো কাঁচের দেয়ালের কাছে গিয়ে হাত বাড়াল। কিন্তু স্পর্শ করল কেবল এক শীতল, প্রাণহীন কাঁচ। তার ভ্রম ভাঙল মুহূর্তেই। ওটা তার নূর নয়, ওটা কেবলই এক শূন্য প্রতিবিম্ব। নিজের হৃদয়ের হাহাকার আর সহ্য করতে পারল না সে। এক তীব্র আক্রোশ আর যন্ত্রণায় নীল ডান হাতটা মুষ্টিবদ্ধ করে সর্বশক্তি দিয়ে আঘাত করল সেই থাই গ্লাসে।
‘ঝনঝন’ শব্দে পুরো ঘর কেঁপে উঠল। মজবুত কাঁচের দেয়ালটা মুহূর্তেই মাকড়সার জালের মতো ফেটে গিয়ে কয়েক হাজার টুকরোয় ভেঙে পড়ল।কাঁচের তীক্ষ্ণ ধার নীলের হাতের শিরা-উপশিরা কেটে বসে গেছে। টপ টপ করে তাজা র”ক্ত ঝরতে শুরু করল মেঝেতে, কিন্তু তার সেদিকে খেয়াল নেই। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপত্তারক্ষী আর আইয়াজ শব্দ শুনে ঝড়ের গতিতে কামরায় প্রবেশ করল। তবে ভেতরে ঢুকেই তাদের র*ক্ত হিম হয়ে গেল।
র’ক্তা’ক্ত হাতে নীল দাঁড়িয়ে আছে ভাঙা কাঁচের স্তূপের সামনে। তার চোখের কোণে জমে থাকা সেই এক ফোঁটা অশ্রু এবার বাঁধ ভেঙে গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। লাল টকটকে চোখ দুটো যেন আগুনের গোলক।
আইয়াজ আর্তনাদ করে উঠল,,
‘স্যার! আপনার হাত! ডক্টরকে ডাকছি আমি—’
“কেউ আসবে না!”——নীলের বজ্রকণ্ঠ আইয়াজকে থামিয়ে দিল। নীল তার র’ক্তা’ক্ত হাতের দিকে একবার তাকিয়ে বিষণ্ণ হাসল। তারপর সেই ভেজা চোখেই সবার দিকে একবার তাকাল। তার চাউনিতে এখন আর রাগ নেই, আছে এক অন্তহীন হাহাকার।
সে টলতে টলতে দরজার দিকে এগোলো;কারো নিষেধ না শুনেই লিফটের দিকে এগিয়ে গেল।
খুলনা সহ সমগ্র বাংলাদেশে রেড এলার্ট জারি হয়েছে গতকাল রাত থেকে। একটা মাছি ও গলতে পারবে না, ব্যবস্থাটা তেমনি। হক ম্যানশন এর আনন্দঘন পরিবেশ মুহূর্তেই বিষাদ বেদনায় পরিণত হয়েছে। প্রত্যেকটা মানুষের চোখে মুখে হাহাকার। যে বাড়িটা বিয়ের আনন্দে মুখরিত থাকার কথা ছিল তা এখন বিষাদ আচ্ছন্ন। খান মহলের সকলেই আজ সকালে এসেছে এখানে।
মির্জা সূচনা, মির্জা সায়মা রুমিন আরা খানসহ হক ম্যানশন এর প্রত্যেক রমণী বসে আছেন আফরোজা আনমের শিয়রে। নাতনী হারাবার শোকের বিছানা শয্যা হয়েছেন তিনি। মাহাও উপস্থিত সেখানেই। অসুস্থতায় বারংবার জ্ঞান হারাচ্ছে সে। বাড়ির পুরুষ গুলো যত্রতত্র হন্যে হয়ে খুঁজে ফিরছে তিহুকে। খুলনার সম্ভ্রান্ত পরিবার হওয়ার দরুন, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরাও উপস্থিত ম্যানশনে।
মুন্নির মনটাও কিঞ্চিৎ বিষন্ন। তিহুর তার চিরশত্রু কথাটা এখনো মনে প্রাণে বিশ্বাস করে সে। তবে হোক সে শত্রু কিংবা তার ঘাতক কিন্তু মানুষ তো। সর্বোপরি তার প্রিয় মানুষের প্রিয়জন তিহু। তাই আর যাই হোক কখনোই তিহুর ক্ষতি চাইতে পারবে না সে।
ঢাকা চট্টগ্রাম রাজপথে নীলের পোরশে গাড়িটা বাতাসের বেগে ধেয়ে চলেছে। রক্তাক্ত হা*ত আর অশ্রু মিশ্রিত দৃষ্টিতে এসে চেয়ে আছে সম্মুখে। অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ঝড়ের বেগে এগিয়ে চলেছে সে;এক হাতে স্টিয়ারিং, অন্য হাতটা রুমাল দিয়ে মোড়ানো থাকলেও র*ক্তে ভিজে সপসপে হয়ে গেছে। রাস্তার দুপাশে টায়ার পোড়া ধোঁয়া আর মানুষের হাহাকার তাকে আজ স্পর্শ করছে না। হঠাৎ ড্যাশবোর্ডের ওপর রাখা ফোনটা তীব্র স্বরে বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নম্বরটা দেখা মাত্রই নীলের চোখের মণি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।
এক গোপন গোয়েন্দা কর্মকর্তার ফোন। ওপাশ থেকে হন্তদন্ত হয়ে কেউ একজন বলল,,
—’স্যার, হদিশ পাওয়া গেছে! ওই ভ্যানটা সিসিটিভি ফাঁকি দিয়ে সরাসরি কুর্মিটোলার একটা পুরনো হ্যাঙ্গারে গিয়ে ঢুকেছিল। ওরা একটা প্রাইভেট জেট আগে থেকেই হায়ার করে রেখেছিল স্যার। আমাদের রাডার সিগন্যাল বলছে, বিমানটি আকাশসীমা পেরিয়ে গেছে এবং এর সর্বশেষ গন্তব্য দেখাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র!
আমেরিকা! শব্দটা নীলের মগজে হাতুড়ির মতো আছড়ে পড়ল। সে সজোরে ব্রেকে চাপ দিতেই পোরশে গাড়িটা রাজপথের বুক চিরে এক বীভৎস শব্দে থেমে গেল।নীল স্টিয়ারিংয়ে নিজের র’ক্তা’ক্ত হাতটা সজোরে আছাড় মেরে চিৎকার করে উঠল,,
—‘ফা*ক! এক হাত দূর থেকে ওরা আমার নূরকে নিয়ে বর্ডার পার করে ফেলল আর তোরা আঙুল চুষছিলি? ড্যাম ইট!
সে এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে ড্যাশবোর্ড থেকে ফোনটা তুলে নিল। কন্টাক্ট লিস্টে গিয়ে একটা স্পেশাল এনক্রিপ্টেড নম্বরে ডায়াল করল। ওপাশে কল রিসিভ হতেই নীলের কণ্ঠস্বর হাড়হিম করা শীতল হয়ে এল,,
—‘নাহিয়ান, হোয়্যার দ্য হেল আর ইউ? আমার নূরকে ওরা কিডন্যাপ করে ইউএস নিয়ে গেছে। শোন, আই ডোন্ট গিভ আ ড্যাম অ্যাবাউট ইয়োর ইন্টারপোল প্রটোকল অর সিআইডি রুলস! আই ওয়ান্ট মাই নূর ব্যাক। এনিহাউ!
এতদিন পর প্রিয় বন্ধুর কল তবে প্রথমেই এমন কথায় অবাক হওয়ার পরিবর্তে অপর পাশ থেকে ভেসে আসলো আমেরিকার সিআইডি চিফ নাহিয়ান চৌধুরী গম্ভীর অথচ ধূর্ত কণ্ঠস্বর,,
—‘কাম ডাউন নীল! আই জাস্ট গট দ্য সিগন্যাল। তোর পাগলামিতে অলরেডি এখানে রেড অ্যালার্ট বেজে গেছে। বাট হু দ্য ফা*ক হ্যাজ দ্য ড্যায়ারিং টু টাচ ইয়োর গার্ল?
নীল দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে বলল,,
—‘সেটা আমি ওখানে এসে ওই জা*নোয়া*র*গুলোর ক*লি*জা চিবিয়ে বের করে তোকে বলব। জাস্ট মেক শোর, ওরা যেন এয়ারপোর্ট থেকে বের হতে না পারে। আমি আমার প্রাইভেট জেটে আসছি। যদি আমার অর্কিডের একটা চুলও কেউ ছোঁয়, তবে আমেরিকার মাটিতে আমি এমন তান্ডব করব যা তোর সিআইডির বাপদাদারাও দেখেনি। গট ইট?
নাহিয়ান ওপাশ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,,
প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৫২
—‘জানি তুই কতটা ডেসপারেট। জেট রেডি কর, জেএফকে (JFK) এয়ারপোর্টে আমার টিম থাকবে। কাম ফাস্ট, ব্রো।
নীল ফোনটা ছুঁড়ে ফেলে দিল পাশের সিটে। তার চোখে এখন কেবল তার অর্কিডকে ফিরে পাওয়ার উন্মাদনা আর খু*নের নেশা। আইয়াজকে কল দিয়ে ছোট করে অর্ডার দিল,,
—‘আইয়াজ, হ্যাঙ্গারে আমার পার্সোনাল জেট রেডি কর। উইদিন টেন মিনিটস।
গাড়িটা এক ঝটকায় ঘুরিয়ে নিয়ে সে বিমানবন্দরের দিকে রওনা হলো। পিছে তখন পুরো শহর জ্বলছে, তবে নীলের হৃদয়ে আছে এক অন্য অন্তদহন।
