প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৩৬
রোজ ও রুশা
“সামনে থেকে সরে দাঁড়াও।”
গভীর, ভারী কণ্ঠটা পুরো ডাইনিং স্পেসে ধাক্কার মতো বাজতেই সবাই থমকে তাকালো।
কাজল খান দু’হাত পেছনে গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে, চোখে দাপট… যেন এক কথায় পুরো ঘর চুপ করিয়ে দিতে পারে।
জাওয়াদ খান ভ্রু তুলে শান্ত গলায় বললো—
“তুমি কোথায় যাচ্ছো?”
কাজল খান ঠান্ডা চোখে তাকালো তার দিকে।
“জাহান্নামে। যাবেন?
এক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর জাওয়াদ খান ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো।
“ তুমি নিয়ে গেলে যাবো। আগে তো কোলে উঠে যেতে আমার। তখন ছোট ছিলে তুমি আদুরে বউ ও ছিলে আমার তাই কোলে নিয়ে বেড়াতাম … এখন তো বড় হয়ে গেছো। এখন কি আমায় কোলে তুলে নিয়ে যাবে?
পুরো টেবিল স্তব্ধ। রোজ মুখ চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করছে, রুশা নিচে তাকিয়ে হাসি চাপানোর চেষ্টা করছে। হেরা তো চোখ বড় বড় করে বাবার দিকে তাকিয়ে আছে—আর নাভান? সে চুপচাপ খাচ্ছে। যেন এসব তার জীবনের নিত্যদিনের নাটক।
কাজল খান দাঁত চেপে তাকালো। ছেলেমেয়েদের সামনে কি সব বলছে।
“আমার সাথে মশকড়া করছো?
“করতেই পারি,( জাওয়াদ খান)
জাওয়াদ খান নির্লজ্জ ভঙ্গিতে বললো,
“ সম্পর্ক কিন্তু আছেই একটা আমাদের।
“ সম্পর্কের মানে বুঝেন আপনারা?( কাজল খান)
“ তুমি বুঝিয়ে দাও। ( জাওয়াদ খান)
“ আমার আপনার মতো আজাইরা টাইম নেই। এই বাড়িতে থাকতে চাইলে থাকেন বাট আমি কই যাবো না যাবো নাক গলাতে আসবেন না।
জাওয়াদ খান নিরলস জবাব দিলো!
“আমি যাবো তোমার সাথে।
“ বাড়িতে থাকছেন ওকে,
কাজল খান আঙুল তুলে হুঁশিয়ারি দিলো,
“ বাট আমার সাথে আগলা পিরিত করতে চাইলে মাথা বরাবর শুট করবো, মনে রাখবেন। নাতি-নাতনির মুখ দেখার আগে অক্কা পাবেন।
“এ মা!!!
অধীর নাটকীয়ভাবে বুক চাপড়ে উঠে দাঁড়ালো।
“ নাতি-নাতনি কই থেকে আসলো? বাবা তো আবার ভাই বা বোন আনার প্ল্যান করছে !
এইবার রুশা আর রোজ আর ধরে রাখতে পারলো না হাসি । দু’জন একসাথে হেসে ফেললো। হেরা মাথা নিচু করে ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকাচ্ছে, কিন্তু চোখ দুটো বারবার কাজল খান আর জাওয়াদ খানের দিকে চলে যাচ্ছে। জাওয়াদ খান তার কাজল রেখাকে রাগতে দেখে মজা নিচ্ছে। মূলত তিনি চাচ্ছেন সব স্বাভাবিক হোক। তাদের নিয়ে যাতে ছেলে মেয়ে টেনশন না করে ।
আজ সকালেই অনেকক্ষণ কথা হয়েছে কাজল রেখার সাথে। বহু বছরের জমে থাকা দূরত্বের বরফে যেন প্রথমবার গলতে শুরু করেছে। তাই মানুষটার রাগের মাঝেও আজ এক ধরনের অদ্ভুত উষ্ণতা লাগছে জাওয়াদ খান এর কাছে। ছেলের এমন নির্লজ্জ কথায় বেজায় ক্ষেপে যায় কাজল খান। ধমকিয়ে উঠে।
“অধীর!
কাজল খান এবার কড়া চোখে তাকালো ছেলের দিকে।
“ থাপ্পড় দিয়ে গাল লাল করে ফেলবো।
অধীর সাথে সাথে মুখ বন্ধ করে বসে পড়লো।
কিন্তু চোখের দুষ্টুমি কমলো না একটুও।
“ এই লোককে তার মতো চলতে বলো,
” কাজল খান বিরক্তিতে বলে উঠলো,
“ আমার ব্যাপারে নাক গলাতে আসবে না। তা না হলে আমি বাসা থেকে বের হয়ে যাবো বলে দিলাম।
জাওয়াদ খান সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হয়ে গেল।
এক মুহূর্ত আগেও যে মানুষটা হাসছিল, সে এখন পুরো সিরিয়াস।
“এক পা-ও বের হবে না তুমি।
কাজল খান ভ্রু কুঁচকালো।
“আদেশ দিচ্ছেন?
“না, ( জাওয়াদ খান)
জাওয়াদ খান ধীরে ধীরে বললো,
“ভয় পাচ্ছি।( জাওয়াদ খান)
পুরো ঘর আবার চুপ। এই মানুষটা… যে একসময় নিজের অনুভূতি মুখে আনতো না… আজ সবার সামনে এত সহজে ভয় স্বীকার করছে। জাওয়াদ খান নিচু স্বরে আবার বললো—
“ দুই যুগ আগে একবার হারিয়েছিলাম তোমায়। দ্বিতীয়বার সেই ভুল করবো না।
– বার বার একি কথা। কাজল খান কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইলো তার দিকে।
চোখের ভেতরের কঠিন আগুনটা যেন একটু নরম হয়ে এলো। অধীর পাশে বসে ফিসফিস করে বললো—
“আমি নিশ্চিত,এরা ঝগড়া করছে না এরা দুজন দুজন কে সময় দিচ্ছে।
রোজ এবার হেসে পানিতে বিষম খেল।
রুশা টেবিলে মাথা ঠেকিয়ে হাসছে। আর হেরা? সে চুপচাপ বসে আছে…বুকের ভেতর অদ্ভুত শান্তি নিয়ে।
এতদিন পরে প্রথমবার সত্যিকারের “পরিবার” মনে হচ্ছে তার এই বাড়িটির প্রতিটি সদস্যকে। কাজল খান সবাইকে উপেক্ষা করে বের হয়ে যায় বাড়ি থেকে। হেরা জাওয়াদ খান ও বের হবে বাসা থেকে, নাভান রাসভারি কন্ঠে বলে।
” তোমরা কেউ কি আমার কথা শুনবে না। ঠিক করেছো।
” হেরা চুপ চাপ দাড়িয়ে আছে। হেরাকে বাবার সাথে যেতে দেখে অসহায় চোখে তাকায় নাভান। শরীরে এখোনো জ্বর একটু ও কমে নি। জাওয়াদ খান বলে উঠে।
” এভাবে থাকা যায় না মাই সন , দেখি তোমার মায়ের রাগ কমে কি না।
নাভান কিছু বলে না চুপচাপ গট গট পায়ে চলে যায় নিজ রুমে। কাজল খান ভিতরে ভিতরে ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছিলেন।
বাহির থেকে এখনো তিনি সেই কঠিন, তেজি, অটল নারী—যার চোখের দিকে তাকাতে ভয় পায় মানুষ। কিন্তু বুকের গভীরে? সেখানে বছরের পর বছর জমে থাকা অভিমান, অপেক্ষা আর নিঃসঙ্গতার পাহাড় ধসে পড়ছে নীরবে।
তিনি তো শুধু চেয়েছিলেন—একদিন তার প্রিয় মানুষটা ফিরে আসুক। ভুল বুঝুক। নিজের অপরাধ স্বীকার করে বলুক
“ কাজল… আর দূরে থেকো না।( জাওয়াদ খান)
– এই একটি কথার আশায় কত রাত তিনি নির্ঘুম কাটিয়েছেন! কত ভোর জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সূর্য উঠতে দেখেছেন! একেকটা দিন পার করেছেন বুকভরা আশা নিয়ে—আজ হয়তো সব ঠিক হবে। আজ হয়তো জাওয়াদ খান তার হাতটা ধরে কাছে টানবে।
কিন্তু না… জীবনের অন্তিম অধ্যায়ে এসেও তার একাকীত্বের শাস্তি শেষ হলো না। বরং শামসুলের পাতা ফাঁদে আবারও অসহায়ের মতো আটকে গেলেন তিনি। এখন কিভাবে সবাইকে রক্ষা করবেন?
– নিজেকে তো বহু আগেই হারিয়েছেন।
কিন্তু সন্তানদের? তাদের ভাঙতে তিনি কখনো দেখতে চাননি। তবুও আজ সেই দৃশ্যই দেখতে হচ্ছে তাকে।
– ছেলেও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে তার দিক থেকে।
যে ছেলে হাজার সুযোগ পেয়েও বাবার কাছে যায়নি, শুধু মায়ের পাশে দাঁড়ানোর জন্য… আজ সেই ছেলের চোখেও জমেছে দূরত্ব। অধীরের দিকে পলকহীন চোখে তাকিয়ে ছিলেন কাজল খান। ছেলেটার মন তিনি খুব ভালো করেই বুঝেন। অধীর কখনোই নাভানের কষ্ট সহ্য করতে পারে না। পারবেই বা কীভাবে?
— যে বয়সে একটা ছেলে বন্ধুদের সঙ্গে মারামারি করবে, খেলাধুলা করবে, দুষ্টুমি করবে—সেই বয়সে নাভান হয়ে উঠেছিল সংসারের ঢাল। বাবার জায়গাটা নিঃশব্দে নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল সে।
নিজের পড়াশোনা বাদ দিয়ে অধীরকে পড়াতো।
স্কুলে কেউ বকলে অধীরের হয়ে ঝগড়া করতো।
রাতে কাজল খান বাসায় ফিরতে দেরি করলে ঘর গুছিয়ে রাখতো, মায়ের জন্য খাবার রেডি রাখতো।
ছোট্ট বয়সেই ছেলেটা যেন সংসারের পুরুষ হয়ে উঠেছিলো ।
আর অধীর?
সে তো ভাইয়ের ছায়া ছাড়া কিছুই বুঝতো না।
তারপর তাদের জীবনে আসে সৃজন আর ঝিনুক।
সেটাও ছিল এক ভয়ংকর দিনের গল্প ।
নাভান একবার পুকুরে পড়ে গিয়েছিল।
মুহূর্তের মধ্যেই ঝিনুক কোনো কিছু না ভেবেই পানিতে ঝাঁপ দিয়েছিল তাকে বাঁচাতে। আর তার ঠিক পরেই ঝাঁপ দেয় সৃজন।
কিন্তু পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, শেষ পর্যন্ত সৃজনকেই প্রাণপণ লড়াই করে দু’জনকে টেনে তুলতে হয়েছিল। দুই-এক মিনিটের ব্যবধানে সেদিন হয়তো তিনজনই মারা যেত।
সেদিন নতুন জীবন পেয়েছিল তারা।
আর সেই দিন থেকেই সৃজন, ঝিনুক আর নাভান—একটা আলাদা বন্ধনে জড়িয়ে যায়।
আজও তাদের একসাথে দেখা যায়।
আর অধীর? সেই ঘটনার পর থেকে পানি দেখলেই তার জ্বর চলে আসে। আজ পর্যন্ত সে পুকুরে নামেনি।
ভার্সিটিতে একবার হুজুগের বসে নাভান অধীরের ফোন লেকে ফেলে দিতে দেখে অধীর ঝাঁপ দিয়েছিল ঠিকই… কিন্তু বাসায় ফিরেই প্রচণ্ড জ্বরে পড়ে যায়।
নাভান আগেই বুঝেছিল এমন কিছু হবে। তাই মেডিসিন পর্যন্ত রেডি করে রেখেছিল। এই ছোট ছোট ঘটনাগুলোই তো বলে দেয়—তাদের সম্পর্কটা কেমন ছিল। কাজল খানের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো।
গতরাতে যখন তিনি ছেলের কাছে গিয়েছিলেন, নাভান একবারও তার দিকে তাকায়নি।
নীরবে উঠে ছাদে চলে গিয়েছিল।
সেই মুহূর্তেই কাজল রেখার শক্ত মুখোশটা ভেতরে ভেতরে ভেঙে গিয়েছিল। তবুও তিনি কাঁদেননি।কারণ কাজল খান কাঁদতে ভুলে গেছেন বহু আগেই। আর রাত গভীর হলে… সবার আড়ালে জাওয়াদ খান এসেছিল তার কাছে।
— বছরের পর বছর যাকে কাছে পাওয়ার অপেক্ষা করেছেন, সেই মানুষটা যখন সামনে দাঁড়িয়েছিল—তখন বুকটা যেন কেউ ছিঁড়ে ফেলছিল ধীরে ধীরে।চোখ দুটো জ্বলে উঠছিল অসহ্য যন্ত্রণায়।
— তবুও তিনি একফোঁটা কান্না করেননি।
শুধু নিজেকে শক্ত করে নিয়েছিলেন।
আর তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।
** কারণ কিছু ভালোবাসা থাকে!! যেখানে মানুষ ভীষণ ভালোবেসেও ফিরে যেতে পারে না। অভিমান সেখানে ভালোবাসার থেকেও বড় হয়ে দাঁড়ায়!!**
আর কাজল খান? তিনি আজও জাওয়াদ খানকে ভালোবাসেন। ভীষণ ভালোবাসেন।
কিন্তু সেই ভালোবাসার নিচে চাপা পড়ে আছে, বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা ভাঙাচোরা হৃদয়ের আর্তনাদ।
আজ ঠিক তিন দিন। , অস্বস্তিকর, অদ্ভুত তিনটা দিন।
ভার্সিটির করিডোরে প্রতিদিনের মতো হইচই হয়, ক্লাস চলে, ক্যান্টিনে ভিড় জমে… কিন্তু হেরা শুধু একটা জিনিসই খেয়াল করে— নাভান নেই।
প্রথম দিন সে ভেবেছিল হয়তো ব্যস্ত।
দ্বিতীয় দিন একটু বিরক্ত হয়েছিল।
তৃতীয় দিনে এসে বিরক্তিটা কেমন যেন অকারণ অস্থিরতায় বদলে গেছে।
বারবার চোখ চলে যায় গেটের দিকে।
কেউ গিটার হাতে ঢুকলেই বুক ধরফরিয়ে ওঠে।
কেউ সাদা গেঞ্জি কালো শার্ট পরলে মনে হয়— নাভান?
তারপরই হতাশা। রোজ কয়েকবার জিজ্ঞেস করেছে,
“ তোর কী হয়েছে? এত চুপচাপ কেন?
হেরা প্রত্যেকবারই ঠোঁট বাঁকিয়ে বির বির করেছে!!
“ আমার আবার কী হবে? একটা অসভ্য গিটারওয়ালা তিন দিন আসে নাই তো আমি কাঁদবো নাকি ?
কিন্তু কথা বলার সময়ও তার চোখ অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল। সে নিজেও বুঝতে পারছে না কেন ভিতরটা এত ফাঁকা লাগছে।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো— সে কাউকে নাভানের কথা জিজ্ঞেসও করতে পারছে না। কেন করবে? তার কী অধিকার? তবুও মনটা কেমন ছটফট করছে।
অন্যদিকে নাভানের অবস্থা আরও ভয়ংকর।
তিন দিন ধরে সে নিজের বেডে ঠিকমতো ঘুমাতে পারে নি।
** কারণ একটাই হেরা**
সেদিন বৃষ্টিভেজা রাতে হসপিটাল থেকে হালকা ভেজা শরীর নিয়ে কয়েক ঘণ্টা এই বিছানাতেই ছিল হেরা। চাদরে, বালিশে, পুরো রুমে এখনো হেরার মিষ্টি শরীরের ঘ্রাণ লেগে আছে।
****অদ্ভুত এক নেশার মতো***
প্রথম রাতে নাভান বিছানায় শুয়েছিল।
চোখ বন্ধ করতেই মনে হয়েছিল হেরা এখনো ঠিক পাশেই আছে।
তার ভেজা চুল…
নরম শরীরের উষ্ণতা…
মৃদু কাঁপুনি…
সবকিছু এত বাস্তব লাগছিল যে বুকের ভেতর কেমন হিংস্র অস্থিরতা জমে উঠেছিল। ফলাফল?সারারাত ঘুম নেই। জ্বর আরও বেড়ে গিয়েছিল।
পরদিন সে রেগে গিয়ে সোফায় গিয়ে শুয়েছিল।
কিন্তু তাতেও শান্তি নেই। বিছানার দিকে তাকালেই মাথা কাজ করা বন্ধ করে দেয়।
তাই তিন দিন সে প্রায় নিজেকে রুমবন্দি করে রেখেছে। ফোন ধরছে না। মেসেজের রিপ্লাই দিচ্ছে না। কারো সাথে তেমন কথা বলছে না।
আজ দুপুরে সৃজন আর অধীর দরজা ঠেলে রুমে ঢুকতেই দুজনই থমকে গেল।
নাভান সোফায় আধশোয়া হয়ে আছে।
চোখ লাল, চুল এলোমেলো।
জ্বরের ক্লান্তি এখনো মুখে স্পষ্ট।
কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল তার চোখের দৃষ্টি।
অদ্ভুত রকম খিটখিটে। অধীর স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“ ওই গিটার ওয়ালা হিরো মরছিস নাকি? তিন দিন ধরে গায়েব কেন?
বলেই সে অভ্যাসমতো বিছানার দিকে গিয়ে ধপ করে বসতে নিল। ঠিক তখনই নাভানের গর্জন শোনা গেল।
“স্টপ।”
অধীর জমে গেল।
নাভান ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকালো।
গলা কর্কশ।
“ আমি না বলা অব্দি তোদের যাতায়াত ওই দরজা পর্যন্ত। কেউ আমার রুমে ঢুকবি না।
অধীর ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কেন? তোর রুমে কি খাজানা রাখা আছে নাকি ?
নাভান এবার ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে বলল,
“ তোদের শরীরের বিষাক্ত ঘ্রাণে বমি আসছে। বের হ!!
সৃজন আর অধীর দুজনই কয়েক সেকেন্ড হেবলার মতো তাকিয়ে রইলো।
তারপর অধীর নিচে নিজের শার্ট শুঁকে মুখ বাঁকালো।
“ আমার শরীরে আবার কীসের বিষাক্ত ঘ্রাণ? আমি তো আজকে পারফিউমও মারছি! এই চুমুর সাপ্লাইম্যান এদিকে আয় দেখি তো, তোর শরীরে কি গন্ধ নাকি। আয়’ আয়। আমার ফুল বনুর কি হবে রে তোর শরীরে গন্ধ। ও ভাবি গো এ কি সব্বোনেস হলো গো তোমার!!
সৃজন ঠোঁট চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করল।
কিন্তু পরক্ষণেই তার চোখ সরু হয়ে এলো।
সে ধীরে ধীরে পুরো রুমটার দিকে তাকালো।
বিছানাটা একদম অগোছালো না।
বরং অস্বাভাবিকভাবে পরিষ্কার।
যেন কেউ ছুঁয়ে ও দেখে নি। তিন দিন এই বিছানায় যে কেউ শুয়েছিলো মনে হচ্ছে না এক বিন্দু ও। আর নাভান? সে সোফায় পড়ে আছে।
সৃজনের মাথায় হঠাৎ কিছু একটা ক্লিক করলো।
সে ধীরে ধীরে বলল!
“ নাভান…”
“ কি?
“তুই বিছানায় ঘুমাস না কেন?”
“তোর সমস্যা না, তোর’ বাপের সমস্যা?”
“সমস্যা না। কৌতূহল রে দোস্ত কৌতূহল!!
অধীর এবার নাটকীয়ভাবে হাঁ করে বলল,
“শোন চুমুর সাপ্লাই ম্যান
তারপর চোখ বড় বড় করে ফিসফিস করল,
“আমি বুঝছি!”
সৃজন বিরক্ত চোখে তাকালো। এই বেটা যে রুমান্টিক মুহুর্ত কে ভয়ার্ত মুহূর্ত বানাবে তা নিশ্চিত, সিরিয়াস মোমেন্টে যেহেতু,ভন্ডামিতে সিরিয়াস হয়,সেখানে রুমান্টিক মুহুর্তকে ভয়ানক হরর মুহুর্ত বানাতে আর কি লাগে! সৃজন তাও পকেটে দু হাত গুজে বললো!
“ কি বুঝছিস?
অধীর বিছানার দিকে আঙুল তুলে বলল,
“ এই বিছানায় নিশ্চয়ই কোনো অতৃপ্ত আত্মা আছে! তাই আমার গিটার ওয়ালা হিরো ভাই ঘুমায় না!”
সৃজন এবার কপালে হাত ঠুকলো।
“ তুই সত্যি একটা গাধা।
“ তাহলে?
সৃজন ঠোঁট বাঁকিয়ে নাভানের দিকে তাকালো।
“ আত্মা না… অন্য কারো অস্তিত্ব আছে এখানে।
নাভানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
অধীর কিছুক্ষণ বোকার মতো তাকিয়ে থেকে হঠাৎ লাফ দিয়ে উঠল। তার রসুন রানী তো একদিন বলেছিলো!
” জানো তোমার শরীরের ঘ্রান । তুমি যেখানে থাকো সেখানে গেলেই পাই আমি। যদিও তখন উপন্যাস এর ডায়লগ মনে হয়েছিলো,,কিন্তু রুশা দূরে যেতে, তা উপলব্ধি করতে পেরেছিলো। তার কথাই ঠিক, অধীর বুঝতে পেরে বলে উঠে!
“ ওহ মাই গড!
মুখ চেপে বলল,
“ কিউটি পাই ভাবি বনু ”
পুরো রুম নিস্তব্ধ।
নাভানের চোখের দৃষ্টি মুহূর্তে ভয়ংকর ঠান্ডা হয়ে গেল। অধীর এবার আরও উৎসাহ নিয়ে বলল,
“ এই জন্য কাউকে বিছানায় বসতে দিচ্ছিস না? কারণ সেখানে এখনো কিউটি পাই ভাবি বনুর ঘ্রাণ আছে?
নাভান কোনো উত্তর করলো না। কিন্তু তার চুপ করে থাকাটাই যেন সব স্বীকার করে দিল। সৃজন এবার মৃদু হেসে দেয়।
“ তুই শেষ রে দোস্ত! খাতাম টা’ টা’ বায় বায়,গায়া !!
নাভান ভ্রু কুঁচকালো। জ্বরের ঘোরেই বললো।
“ মানে?
“ মানে তুই ডুবে গেছিস।
অধীর সঙ্গে সঙ্গে যোগ করলো,
“ পুরা টাইটানিকের মতো ডুবে গেছে ভাই আমার!!
নাভান বিরক্ত হয়ে কুশন ছুঁড়ে মারলো ওর দিকে।
“ চুপ কর ইডিয়ট এর দল!
অধীর কুশন বুকে জড়িয়ে নাটকীয় গলায় বলল,
“ না ভাই… এটা প্রেমের শেষ স্টেজ। মানুষ এই স্টেজে প্রিয় মানুষের চুল, ঘ্রাণ, পানির বোতল— সব জমিয়ে রাখে।
সৃজন হেসে বলল,
“ আর আমার ভাই পুরো বিছানা সংরক্ষণ করে ফেলছে। কেয়া সিন হে। পেয়ার কা লাভিং লাভিং।
নাভান এবার ধীরে ধীরে উঠে বসলো।
চোখ দুটো ক্লান্ত।
কিন্তু গভীরে অদ্ভুত এক কোমলতা।
খুব নিচু গলায় বলল,
‘ মুছে যাক চাই না।
সৃজন আর অধীর দুজনেই চুপ হয়ে গেল।
নাভান মাথা নিচু করে বিছানার দিকে তাকালো।
“ অদ্ভুত না?
তার ঠোঁটে তিক্ত হাসি ফুটলো।
“ একটা মানুষ কয়েক ঘণ্টা ছিল শুধু… অথচ মনে হচ্ছে পুরো রুমটা ওকে ছাড়া খালি।
অধীর এবার আর মজা করলো না।
সে ধীরে ধীরে বলল,
“ তুই ওকে খুব বেশি ভালোবেসে ফেলেছিস, তাই না?
নাভান কিছুক্ষণ চুপ রইলো।
তারপর জানালার বাইরের বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করলো—
***ওই মিসাইল গার্ল কে আমি ভালোবাসবো, নো— নেভার । ও আমার টাইপ না, আর না আছে তার প্রতি কোনো কিউরিসিটি ! বাট সমস্যা হলো… ওর কাছাকাছি গেলে শান্তি লাগে। আর দূরে গেলে? দম বন্ধ হয়ে আসে****
নাভান চোখ বন্ধ করলো। জ্বরের ঘোরে ঠোঁট কাঁপছে।
শ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে। তারপর খুব আস্তে… প্রায় অস্পষ্ট গলায় কী যেন বিড়বিড় করলো। এতটাই নিচু স্বর যে শব্দগুলো স্পষ্ট বোঝা গেল না।
কিন্তু সৃজন মনে হয় কিছু শুনেছে নাকি মনের ভাবনা থেকে বলছে। সৃজনের চোখ কেমন থমকে গেল।
অধীর সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকে বলল,
“ কি বললো?
সৃজন কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে নাভানের দিকে তাকিয়ে রইলো। জ্বরের ঘোরেও ছেলেটার ভ্রু কুঁচকে আছে। যেন ভেতরে ভেতরে কোনো অদৃশ্য যন্ত্রণার সাথে লড়াই করছে ।
নাভান ধীরে বলল,
” পরি বউ , আরেকটু থাকো।
পুরো রুম কয়েক মুহূর্তের জন্য নিশ্চুপ হয়ে গেল।
অধীরের মুখ হাঁ হয়ে গেল।
তারপর নাটকীয়ভাবে বুক চেপে বললো,
“ইন্নালিল্লাহ! ভাইটা তো সত্যি সত্যি প্রেমে শহীদ হয়ে গেছে!
সৃজন এবার সত্যি হাসলো।
“চুপ কর। জ্বরের মধ্যে আছে।
অধীর এবারও থামলো না।
“না দোস্ত, আমি চিন্তিত। মানুষ জ্বরের ঘোরে মা-বাবার নাম নেয়,আল্লারহর নাম নেয় । আর আমার ভাই তার জনম শত্রুর নাম নিয়েছে। কেমনে কি ভাই? এটা পিউর খাটি ট্রু লাভ!!
নাভান হঠাৎ চোখ না খুলেই গর্জে উঠলো,
“ অধীর… চুপ না করলে তোরে জানালা দিয়া এক কিক মেরে ফেলে দিবো ইডিয়ট …
অধীর সঙ্গে সঙ্গে মুখ চেপে ধরলো।
“ দেখ! মরতে বসছে, তবু রাগ কমে নাই!
সৃজন মাথা নাড়িয়ে ফোন বের করলো।
“ তুষারকে কল দে। জ্বর অনেক বেশি।
অধীর এবার সিরিয়াস হলো।
দ্রুত ফোন লাগালো। প্রায় আধাঘণ্টার মধ্যে তুষার আর ঝিনুক ছুটে এলো কাজল ভিলায়। ঝিনুক ঢুকেই নাভানের অবস্থা দেখে আঁতকে উঠলো।
“এ কী অবস্থা! তিন দিন ধরে কেউ ঠিকমতো খেয়াল রাখছিস না?
অধীর সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করলো,
“ আমি তো স্যুপও বানিয়েছিলাম!
তুষার ভ্রু তুললো।
“ তারপর?”
“নাভান খেয়ে বলছে—
‘ এটা কি স্যুপ, না রাস্তার ড্রেনের পানি ?
ঝিনুক হেসে ফেললো এতো চিন্তার মাঝে ও।
সৃজন বিরক্ত মুখে বললো।
“ তুই রান্না করলি কেন সালা!
অধীর গর্বিত গলায় বললো,
“ ভাই আমার, দায়িত্ব আমার!!
“ ভাইগিরি করতে গিয়ে মানুষ মারতে বসছিলি।
এদিকে তুষার নাভানের কপালে হাত দিল।
গরমে হাত প্রায় পুড়ে যাচ্ছে। তুষারের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
“এই পাগলটা ঠিকমতো ওষুধও খায় নি।
ঝিনুক দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
“ কারণটা তো বুঝতেই পারছি।
নাভান চুপচাপ বিছানার দিকে তাকালো।
হেরার সেই হালকা বেবি লোশোন বা পাউডারের ঘ্রান এখনো যেন পুরো রুমে ভাসছে।
আর নাভান?
সে এই ঘ্রাণটুকু হারানোর ভয়েই নিজের ঘুম, শরীর, জ্বর— সব ভুলে বসে আছে। অদ্ভুত এক ভালোবাসা।
যেটা এখনো মুখে স্বীকার করার সাহস হয়নি।
কিন্তু হৃদয় অনেক আগেই স্বীকার করে ফেলেছে।
এদিকে হেরার অবস্থাও ভালো না।
বরং প্রতি ঘণ্টায় তার অস্থিরতা বেড়েই চলেছে।
রুমে বসে বই খুলে আছে ঠিকই…
কিন্তু একই লাইন দশবার পড়েও কিছু মাথায় ঢুকছে না।
বারবার মন অন্যদিকে চলে যাচ্ছে।
একটা মানুষ তিন দিন ভার্সিটিতে আসে না—
এতে তার কী? আসুক বা না আসুক। তবুও বুকের ভেতরটা অদ্ভুত রকম করছে। হেরা বিরক্ত হয়ে বই বন্ধ করে রেখে দিলো । তারপর নিজের মাথায় চাপড় মেরে বললো,
“ অসভ্য হেরা মন! তোর কি মাথা গেছে?
হেরা উঠে এদিক-ওদিক হাঁটতে লাগলো।
“ তুই না ওই অহংকারী গিটারওয়ালার অহংকার ধুলিসাৎ করতে এসেছিস? এখন কী? সম্পর্কের খাতিরে সব মাফ করে দিবি? না হেরা এসব করা যাবে না,
নিজেকেই নিজে উত্তর দিল,
“ না! কখনো না!
তারপর হঠাৎ প্রিয়র কথা মনে হতেই মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল।
“ প্রিয়র সাথে যা হয়েছে… তার জন্য দায়ী কে?
মাথার ভেতর উত্তর এলো—
নাভান এই লোকটার কারণেই তো প্রিয় দূরে চলে গেছে। এই লোকটার কারণেই সে এখানে এসেছে। তাহলে এখন কেন…কেন তার মন নাভানকে নিয়েই ভাবছে? হেরা বিরক্তিতে চুল খামচে ধরলো।
“ না! আর ভাববো না ওই অসভ্য লোকটার কথা।
সে আবার বই খুললো। পরীক্ষা সামনে। মন দিয়ে পড়তে হবে। কিন্তু সমস্যা হলো—পরীক্ষা…” শব্দটা মাথায় আসতেই তার মনে হলো— নাভানেরও তো পরীক্ষা সামনে।
তাহলে লোকটা কোথায়?
তিন দিন ধরে একদম উধাও কেন?
ঠিক আছে তো?
খেয়েছে ঠিকমতো?
জ্বর-টর হলো নাকি?
ভাবনাটা মাথায় আসতেই হেরা নিজেই থমকে গেল।
তারপর চোখ বড় বড় করে বললো,
“ ইশশ! আমি আবার ওর খাওয়া নিয়ে ভাবছি কেন!
রাগে নিজের গালেই ঠাস করে এক থাপ্পড় মারলো।
তারপর আরেকটা।
“ ভাববি না! ভাববি না!
এত জোরে মেরেছে যে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে গাল লাল হয়ে ফুলে উঠলো। গালে ব্লাসন স্টিকার লেগে গেছে। রুশাকে বলতে বলতে নিজেই নিজের গালে সিল মেরেছে রমনী।
ঠিক তখনই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রুশা ধীরে ধীরে বললো—
“ কিরে… তোর গালে কে ব্লাশন স্টিকার লাগাইছে?
হেরা চমকে তাকালো। দেখে রুশার পাশে রোজও দাঁড়িয়ে। দুজনের মুখেই সন্দেহজনক হাসি।
হেরা চোখ কুঁচকে বললো,
“ তোরা এখানে কী করছিস?
রোজ বিছানায় লাফ দিয়ে উঠে বললো,
“ তোকে ফলো করতেছিলাম রেএএ বান্ধবী ইইইই
“ আমায় ফলো করবি কেন ?
রুশা নাটকীয় গলায় বললো,
“ কারণ তুই গত তিন দিন ধরে এমন ভাব করছিস যেন তোর জামাই বিদেশ চলে গেছে।
হেরা হাঁ করে তাকালো। বিরক্ত নিয়ে বললো
“ কি বললি? রসুন রানী
রোজ এবার হেসে কাত।
“ না মানে… তুই ক্লাসে বসে জানালার দিকে তাকিয়ে থাকিস, ক্যান্টিনে গিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলিস, গিটার দেখলেই চমকাস— এগুলা আমরা খেয়াল করি নাই ভাবছিস?
হেরা সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করলো,
“ আমি মোটেও—
“মোটেও প্রেমে পড়িস নাই?
রুশা কথা কেটে বললো।
হেরা থেমে গেল। রোজ এবার কাছে এসে চোখ ছোট করে তাকালো।
“ সত্যি করে বল… নাভান ভাইকে মিস করছিস?”
“ না!
উত্তরটা এত দ্রুত এলো যে দুজনেই হো হো করে হেসে উঠলো।
রুশা বললো,
“এই ‘না’ টার ভেতরে যে ‘হ্যাঁ’ লুকানো আছে সেটা পুরো পাঠক / পাঠিকা মহল বুঝে গেছে । হেরা এবার বালিশ ছুঁড়ে মারলো ওদের দিকে।
“ চুপ কর!
রোজ বালিশ ধরে নাটকীয় গলায় বললো,
“ আহারে… রাগ দেখাচ্ছে। প্রেমের প্রাথমিক লক্ষণ।
“ আমি প্রেমে পড়ি নাই! ( হেরা)
ঠিক আছে।( রুশা)
রুশা মাথা নাড়লো।
“ তাহলে তুই নিজের গালে থাপ্পড় মারলি কেন?
হেরা থমকে গেল।
“ কারণ… কারণ…
রোজ চোখ টিপে বললো,
“ কারণ মন বলছে— ‘নাভান কোথায়?’ আর ব্রেইন বলছে— ‘ওই অসভ্যরে ভাববি না।’ তাই দুই পক্ষের মারামারিতে গাল শহীদ হয়ে গেছে।
প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৩৫
রুশা এবার সত্যি সত্যি হেসে গড়িয়ে পড়লো।
আর হেরা? সে চুপ করে রইলো। কারণ ভয়ংকর ব্যাপার হলো— ওদের কথাগুলো পুরোপুরি মিথ্যাও লাগছে না। কিন্তু এটা যে কোনোভাবে সত্যি হতে সে নিজেই দিবে না। এসব থেকে বের হতেই হবে তাকে। বিরক্ত নিয়ে দুজন কে দেয় এক ধমক।
