Home প্রেয়সীর অনুরাগ প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২২

প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২২

প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২২
Sadiya Jahan Simi

কাঠফাঁটা দুপুরে সূর্য মামা উঁকি দিয়ে তাকিয়ে আছে। ভ্যাপসা গরম চারদিকে। পড়ন্ত দুপুরে আশেপাশে লোকজন গুটি কয়েক। থেকে থেকে দুই একজন দেখা যাচ্ছে। তবুও পায়ের জোরে বোঝা যায় বাড়ি ফেরার তাড়া। নিরিবিলি পরিবেশে দাঁড়িয়ে আছে শিকদার বাড়ি। কোচিং সেন্টার থেকে দশ মিনিট হেঁটে গেলেই দেখা যায় বাড়িটি। আশে পাশে তেমন বাড়ি ঘর নেই। কিছুটা দূরে গুটিকয়েক বাড়ি আছে।রাফসা হাঁটতে হাঁটতে দাঁড়ালো রোডের মাথায়। পেছনে সবাই দাঁড়িয়ে।রাফসা আশেপাশে তাকালো। জনমানবহীন পথ দেখে ঠোঁটের হাসি চওড়া হয়। আভিয়ান তা দেখে বুকের বা পাশে হাত রেখে বিড়বিড় করে বলল,

“খুন করে ফেললো।”
সায়মা জুহুরি চোখে পরোখ করে চারদিকে।ভীত স্বরে বলল, “এই সাদি আমরা ধরা পড়া গেলে! তখন কি হবে? আমার তো ভাবলেই হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে।”
আভিয়ান ভ্রু কুঁচকালো সায়মার কথায়। কিসের ধরা পড়ার কথা বলছে এই মেয়ে।নিজেকে আর দমিয়ে রাখতে না পেরে বলে উঠলো,
“কিসের ধরা? তোমরা এখানে কেন এসেছ?”
সায়মা কিছু বলতেই যাবে ওমনি রাফসা এক হাত দিয়ে সায়মার মুখ চেপে ধরল। সায়মা ছাড়া পাওয়ার জন্য অনবরত ছটফট করতে লাগলো।রাফসা জোর খাটিয়েই চেপে ধরেছে মুখ। অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে হেসে বলল,
“আমরা একটা কাজে এসেছি। আপনাকে কিন্তু বিশ্বাস করে এনেছি সাথে করে। বেঈমানি করলে একদম গুলি মেরে মাথার খুলি উড়িয়ে দেবো বলে দিলাম।”
আভিয়ানের এইবার সন্দেহ হলো বেশ। গতি সুবিধার মনে হচ্ছে না।
“আচ্ছা করব না বেঈমানি।আগে বলো কাহিনী কি?”
রাফসা আশেপাশে তাকালো।আভিয়ান এতে আরো অবাক হয়ে গেল।চুরি করতে এসেছে নাকি এরা। এমন করছে কেন আজব!

“ইয়ে মানে আমরা এখানে চুরি করতে এসেছি।”
বিস্ময়ে চোখজোড়া মুহূর্তেই কপালে উঠে গেল আভিয়ানের। কি বলছে ওর মায়াবী! চুরি করতে এসেছে এখানে? কিসের অভাব পড়েছে আভিয়ান শিকদারের, যে ওর মায়াবীর চুরি করা লাগবে। মানুষ শুনলে কি বলবে। আভিয়ান শিকদারের ভবিষ্য বউ চুরি করতে এসেছে। মানসম্মান লুটে নেওয়ার ধান্দায় নেমেছে বোধহয় এই মেয়ে।
“তোমার কি লাগবে আমায় বলো। চুরি করা ভালো কাজ নয়।”
“আপনি বুঝবেন না। আজ শিকদার বাড়ি লুট করেই ছাড়বো।”
বিস্ময়ে থ হয়ে গেল আভিয়ান। শিকদার বাড়ি তো ওর।ওর বাড়িতেই চুরি করতে এসেছে ওর মায়াবী। আশেপাশে আভিয়ানের ছাড়া আর কারো শিকদার বাড়ি নেই। তারমানে সত্যি সত্যিই রাফসা শিকদার বাড়িতে চুরি করতে এসেছে! আর শিকদার বাড়িই বা চিনল কি করে। আগে বাজিয়ে দেখতে হবে।
“শিকদার বাড়িতে চুরি করবে কেন? তুমি চেনো শিকদার বাড়ির কোনো ব্যক্তিকে!”
“হুঁ ? উঁহু চিনি না। তবে এ বাড়ির ছেলের প্রতি প্রচন্ড রাগ আমার। যদি সামনে পেতাম তাহলে মারতে মারতে তন্দুরি চিকেন বানিয়ে দিতাম।”
আভিয়ান ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল রাফসার পানে। কি বলছে এই মেয়ে? শিকদার বাড়ির ছেলে তো একজনই। আভিয়ান শিকদার।রাফসা রেগে আছে কেন? আভিয়ান নড়েচড়ে দাঁড়ায়। কন্ঠ যথেষ্ট স্বাভাবিক রেখে বলে উঠলো,

“শিকদার বাড়ির ছেলের প্রতি এতো রাগ কেন তোমার? কি করেছে সে?”
“ওই আবাল শ্লা আমার বাবার গাড়ি এক্সিডেন্ট করিয়েছে দুইদিন আগে। আল্লাহ বাঁচিয়েছে বাবাকে। মন চাইছে চটকে গাল লাল করে দেই।”
আভিয়ান কেশে উঠলো। বিস্ময়ে চোয়াল ঝুলে যায়।এই ছিল কপালে ওর।প্রথমে আঙ্কেল তারপর ভাইয়া।আর এখন বিশ্ব বিখ্যাত ডায়লগ আবাল! আর কি কি বাকি আছে। এক এক করে না এসে সব একসাথে এলেই তো পারে। অজ্ঞান হয়ে কতক্ষণ পড়ে থাকবে। বার বার শকড্ দেওয়ার কি আছে। আভিয়ানের অবস্থা ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি।
সামনেই শিকদার বাড়ি দেখা যাচ্ছে। দুই তলা বিশিষ্ট ভবন। চারদিকে দেয়াল তুলে দেওয়া।
“আমি যাবো না ভাই।”

সায়মার কথায় রাফসা চোখ গরম করে তাকালো।হাত চেপে ধরে টেনে নিয়ে যেতে যেতে বলল, “আজকে শিকদার বাড়ি লুট করেই ছাড়বো। চল শালি।”
আভিয়ান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একজায়গায়।আভিয়ানকে এগোতে না দেখে রাফসা ধুম করে বলল, “আপনি আসছেন না কেন? নাকি ভয় পেয়েছেন?”
“আসছি।” আভিয়ান পা চালালো সামনে।
বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালো ওরা। আপাতত কোনো গার্ড নেই। এমন সময় সবাই খেতে যায়। রাফসা সায়মার হাত ছেড়ে দিল। উল্টো ঘুরে আভিয়ানকে বলে, “দেয়াল টপকান।”
“অ্যা?”
“অ্যা না হ্যাঁ। জলদি দেয়াল টপকে ওপাশে গিয়ে গেইট খুলে দিন। নয়তো আমরা ঢুকব কি করে! জলদি করুন নয়তো ধরা পড়ে যাবো।”
আভিয়ান একবার গেইটের দিকে তাকায়। তালা ঝুলছে গেইটে।চাবি আছে সাথেই। চাইলে নিমিষেই চাবি দিয়ে গেইট খুলতে পারে আভিয়ান। তাতে তো ধরা পড়ে যাবে।

“তোমরা উল্টো ঘুরে দাঁড়াও।”
রাফসা চোখ ছোট ছোট করে বলল, “উল্টো ঘুরে দাঁড়াবো কেন?”
“আমার লজ্জা লাগে। তোমরা তাকিয়ে থাকবে আমি দেয়াল টপকাব! তোমরা উল্টো ঘুরে দাঁড়াও।”
রাফসা এখনো খেয়াল করেনি গেইটে তালা ঝুলছে।
“লজ্জা লাগবে কেন ভাইয়া? আপনি কি হিশু করবেন?”
মুহূর্তেই চোখজোড়া কপালে উঠে গেল আভিয়ানের।আজ কার মুখ দেখেছিল ঘুম থেকে উঠে। মনে পড়ছে, রনির মুখ দেখেছে। আজ আসুক খবর হচ্ছে।রাফসা কথাটা বলে নিজেই স্তম্ভিত হয়ে গেল। জলদি করে উল্টো ঘুরে দাঁড়ায়। সাথে সাবিকুন সায়মা ও।
আভিয়ান তাড়াতাড়ি করে পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে আনে। ভেতর থেকে চাবিটা এনে আস্তে করে গেইট খুলে ঢুকে। চাবিটা পকেটে ঢুকিয়ে ফেলল। তারপর মেঝেতে দাঁড়িয়েই জোরে একবার লাফ মারে। গেইট খোলার মতো আওয়াজ করে বলল, “হয়ে গিয়েছে। পেছনে ঘুরতে পারো।”
চট করে পেছন ঘুরে তাকালো। আভিয়ানকে ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, “এমা আপনি ওপাশে কি করে গেলেন?”

“দেওয়াল টপকে।”
“এতো তাড়াতাড়ি কি করে সম্ভব!”
আভিয়ান গেইট খুলে দিল।রাফসা সাবিকুন সায়মা ভেতরে ঢুকে।
“এখন কি করবে বলো?“
“পেয়ারা চুরি করব।”
রাফসার কথায় ভরকে যায় আভিয়ান। কি বলছে এই মেয়ে? সব ছেড়ে পেয়ারা চুরি!
“গাছে উঠুন জলদি।”
আরেক দফা অবাক হয় আভিয়ান। গাছে উঠতে হবে এখন।আভিয়ানকে নিজের দিকে এইভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে রাফসা তাড়া দিয়ে বলল, “আরে বড় ভাই তাড়াতাড়ি করুন তো। দেখে ফেললে সর্বনাশ।”
আভিয়ান তাকায় গাছের দিকে। তেমন বড় না হাত দিয়েই টেনে ছিঁড়তে পারবে। আভিয়ান গেল গাছের সামনে। চটপট করে হাত বাড়িয়ে কাছে থাকা পেয়ারা গুলো পেরে ফেলল। রাফসা একে একে ব্যাগে ঢুকালো। তৎক্ষণাৎ কারো পায়ের শব্দ শোনা যায়।রাফসা এক হাতে ব্যাগ ধরে অপর হাতে সাবিকুন সায়মা কে ঠেলে গাছের পিছনে লুকিয়ে পড়ে। আভিয়ান কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কপাল চাপরে বলল,

“অ্যাইই বড় ভাই অ্যাইইই এখানে এসে লুকিয়ে পড়ুন।নয়তো হাত পা ভাঙবে।”
রাফসার কথামতো আভিয়ান পাশের গাছের পিছনে লুকিয়ে পড়ে। তিনজন কালো কাপড় পড়া গার্ড হাজির হয় বাগানে। বসার জায়গায় আরাম করে বসে। আভিয়ান একটু নাটক করে বলল,
“মায়াবী আমাদের ধরে যদি ওরা ঠ্যাং ভেঙ্গে দেয়? তখন কি হবে?”
রাফসা মৃদু ধমকে বলল, “অ্যাই মিয়া চুপ থাকুন তো।ধরা তো এখন আপনার জন্য খাবো।এতো ফটরফটর করছেন কেন? আর ধরা খেলেও আপনাকে ফেলে আমি পগারপাড়। ওদের মাঝে ফেলে যখন উওম মধ্যম দিবে না, তখন ঠিক হবে।”
রাফসার ধমকে কেঁপে উঠলো আভিয়ান।এই মেয়েই প্রথম এভাবে কথা বলার সাহস পেয়েছে।রাফসার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে এতোক্ষণে ঘ্যাচাং ফু হয়ে যেত।আভিয়ান নিজের দিকে তাকালে মাঝেমধ্যে আফসোস হয়।বয়সে এতো ছোট মেয়ের কাছে হুলোবিড়াল হয়ে থাকতে হয়! প্রেমে পড়লে সবই সম্ভব বুঝি।আভিয়ানের আকাশ কুসুম ভাবনার মাঝেই রাফসা হালকা চেঁচিয়ে উঠলো।

“ডিংকা চিকা, ডিংকা চিকা, পেরেছি।উফফ , ও মজা!”
আভিয়ান চেয়ে দেখলো রাফসার খুশিটা।এতে যেন মনে একটা প্রশান্তি বয়ে গেল। রাফসাদের পেছনেই লিচু গাছ। সেখান থেকেই লিচু ছিঁড়তে পেরে রাফসার খুশি।
“এখন আমরা দৌড় দিব ঠিক আছে? আমি রেডি সেডি বললেই সবাই একসাথে দৌড়, ওকে?”
সবাই মাথা নাড়ল।
“রেডি সেডি ওয়ান টু থ্রি দৌড়ড়ড়।”
বোরকা তুলে এক দৌড় লাগায় ওরা। পেছনে আভিয়ান। বেচারা নিজের বাড়িতে নিজের চুরি করতে হয়েছে। গার্ডরা শব্দ পেয়ে দৌড়ে আসে। এভাবে দৌড়ে যেতে দেখে চেঁচিয়ে পিছু নিল।রাফসার পেছনে তাকানোর ফুরসৎ নেই। জান নিয়ে পালাতে পারলেই হবে। বাড়ির বাইরে আসার পরেও গার্ডরা না থামাতে দৌড়াতে দৌড়াতে আভিয়ান পেছনে তাকিয়ে চোখ পাকিয়ে বুঝালো, “থেমে যা গাঁদার বাচ্চা।নয়তো আজ হচ্ছে তোদের।”
আভিয়ানকে দেখে নিমিষেই দাঁড়িয়ে গেল সকলে। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।

গোসল শেষ করে বেরিয়েছে উদ্যান। যা গরম পড়েছে। এই লোকের সকাল থেকে অলরেডি দুইবার শাওয়ার নেওয়া শেষ।কোমড়ে শুধু একটা ধবধবে সাদা তাওয়াল জড়ানো।শাওয়ার নেওয়ার পর উদ্যান যেন একদম নতুন করে সতেজ হয়ে উঠেছে। তার শরীর থেকে হালকা পানির ফোঁটা ধীরে ধীরে গড়িয়ে পড়ছে, যা তার গঠনকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে। ভেজা চুলগুলো কপালের উপর নরমভাবে লেগে আছে, আর কিছুটা ঘাড় বেয়ে নেমে এসেছে।
তার কাঁধ চওড়া ও শক্ত, যেন নিয়মিত যত্ন আর ব্যায়ামের ছাপ স্পষ্ট। বুকটা প্রশস্ত, হালকা ওঠানামা করছে শ্বাসের সাথে। বাহুগুলো দৃঢ় ও গঠিত, শিরাগুলো একটু একটু ফুটে আছে, যা তার শক্তিমত্তার ইঙ্গিত দেয়। পেটের অংশে হালকা অ্যাবসের রেখা দেখা যায়—অতিরিক্ত নয়, কিন্তু ফিটনেসের একটা সুন্দর ভারসাম্য আছে।
কোমরটা ছিমছাম, আর পুরো শরীরের গঠন এমন যে চোখে পড়ার মতো আকর্ষণীয়।

উদ্যান কাভার্ড থেকে কালো ট্রাউজার এবং কালো গেঞ্জি বের করে। তা গায়ে জড়িয়ে নিল। দুইদিন পর মেডিকেল জয়েন দিবে। দু’টো দিন বাড়িতে থেকেই সময় দিবে ভেবেছে।মিররের সামনে দাঁড়িয়ে চুল ব্রাশ করার মাঝেই ফোনটা বেজে উঠলো। উদ্যান ভ্রু কুঁচকালো এতে। ভরদুপুরে কে কল করবে।ফোনটা ড্রেসিং টেবিলের উপরেই ছিল। চেনা নাম্বার দেখে খানিক অবাক হলো।দেয়াল ঘড়িতে সময় দেখে বিড়বিড় করে শুধায়,
“এখনো আসেনি বাড়ি?”
ফোনটা বাজতে বাজতে কেটে গিয়েছে। উদ্যান ব্যাক করে এপাশ থেকে।
“হ্যাঁ বল কি হয়েছে?”
ওপাশ থেকে যদিওবা কিছু শোনা যায়নি। ও পাশের ব্যক্তির কথা শুনে মুহূর্তের হাত জোড়া মুষ্টিবদ্ধ করে নিল।
“আচ্ছা দেখছি আমি। আর সবসময় খবর রাখবি ওর। উল্টো পাল্টা দেখলেই আমাকে জানাবি।”
বলেই খট করে ফোন কেটে দিল। ছুঁড়ে মারে তা বিছানার উপর। ধুপধাপ পা ফেলে বেরিয়ে গেল রুম থেকে।

আধ ঘন্টা আগে বাড়ি ফিরেছে রাফসা। গরমে চেহারা লাল হয়ে আছে। যেন লাল মরিচের গুঁড়া মুখে লাগিয়েছে।এসেই চটপট করে শাওয়ার নেয়। ব্যালকনিতে গিয়ে ভেজা তাওয়ালটা ছড়িয়ে দিল।ভেজা চুলগুলো কোমর ছাড়িয়ে নিচে নেমে এসেছে। ইচ্ছে করছে গা এলিয়ে দিতে বিছানায়।
এখন ল্যান্স এর সময়।নিচে না গেলে ডাকাডাকি শুরু হবে। অগ্যতা বিরক্ত নিয়েই পা বাড়ালো ড্রয়িং রুমের উদ্দেশ্য।
টেবিলে খাবার দেওয়া হচ্ছে। রান্নাঘর থেকে একে একে সব এনে টেবিলে সাজিয়ে রাখছে।রুম থেকে আসার সময় বাইরে ঘুরঘুর করা অ্যাশকে সাথে করে এনেছে রাফসা। খাবার টেবিলে এখনো কেউ বসেনি।আপাতত প্রস্তুতি চলছে।সোফায় বসল রাফসা।কোলে অ্যাশ।মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
“তোর প্রিপারেশন কেমন পাখি?”

রিশান আজ বাড়িতেই আছে। জার্নি কম হলো না ইদানিং। ভাইয়ের কথায় রাফসা ঘাড় বাঁকিয়ে তাকালো। ততক্ষনে রিশান পাশের সোফায় বসে পড়েছে।
“ভালো ভাইয়া। ফিজিক্সে প্রবলেম ছিল। এখন নেই,তবে বায়োলজি দুটো চ্যাপ্টার একটু প্রবলেম।”
রিশান শুনল বোনের কথা। কিছু একটা ভেবে বলল,
“চিন্তা করিস না। বাড়িতে হার্ট সার্জন থাকতে এতো প্যারা কিসের? উদ্যান ভাইকে বলব আমি তোকে যেন সন্ধ্যার পর বায়োলজি পড়ায়।”

আঁতকে উঠে রাফসা। আর মানুষ পেলো না নাকি।যার থেকে পালাই পালাই করে তার কাছেই কিনা পড়তে হবে। অসম্ভব ব্যাপার স্যাপার।রাফসা তড়িঘড়ি করে বলে, “না ভাইয়া লাগবে না।আমি একাই পারব।”
রিশান বাঁধ সাধলো, “কোনো রিস্ক নিতে চাইছি না। বায়োলজি মোস্ট ইম্পর্ট্যান্ট সাবজেক্ট মেডিকেলের জন্য।সো কোনো হেলাফেলা করা চলবে না।”
ব্যাস হয়ে গেল কাহিনী।রাফসার মন চাইছে হাত পা ছড়িয়ে কাঁদতে।এ কোন পাল্লায় পড়ল।
ঊষা এসে বসে। বেচারির ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হবে কয়েকদিন পর থেকে।রিশান তাকায় ঊষার পানে।ঊষার মুখটা গভীর দৃষ্টিতে পরোখ করে।
রাফসা উঠে চলে যায় ডাইনিং এ।রিশান ডাকলো,

“ঊষা।”
“হুঁ।”
“কেমন আছিস?”
“যেমন রেখেছো।”
“অভিমান জমেছে?”
ঊষা হাসল ঠোঁট বাঁকিয়ে। দৃষ্টি নিক্ষেপ করল রিশানের পানে। তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল,
“অভিমান করার আমি কে?”
রিশান অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
“কেউ না তুই?”
“উহুঁ ,কে হবো আমি!”
“আমার জান।”
“দিবা স্বপ্ন দেখা বন্ধ কর।”
উঠে চলে যায় ঊষা।রিশান তাকিয়ে রইল গমন পথে।
“আজ আমার ললনা ছলনা কাছে নেই বলে এতো প্রেম দেখাতে পারিনা।খুব দুঃখ পেলাম।”
রিশান ভ্রু কুঁচকে বলে, “ললনা ছলনা কে আবার?”
রোহান কলার নাড়াচাড়া করতে করতে বলে, “আমার একশ আটএিশ নম্বর ক্রাশ।”
রোহান অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে রইল।

সবাই বসেছে খেতে। এবেলায় কর্তারা বাইরে থাকে। উদ্যান এসে রাফসার মুখোমুখি বসে। গম্ভীর মুখে তাকায় রাফসার পানে।যার দৃষ্টি খাবারের প্লেটে। হুমাইরা ফরাজী মেয়ের পাতে মাছ তুলে দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
“আজ এতো দেরি হলো কেন কোচিং থেকে বাড়ি ফিরতে?”
রাফসার হাত থেমে যায় প্লেটে।আজ যা কাহিনী করে বাড়ি ফিরল, দেরি হবে না। এসব বললে তো এখন ক্যালানি খাবে।চোখ না তুলেই বললো, “এক্সটা ক্লাস ছিল আম্মু।তাই দেরি হয়েছে।”
“খেয়ে একটু ঘুমিয়ে নিবি।এতো পরিশ্রম শরীর কুলোচ্ছে না।”
রাফসা খেতে খেতে মাথা নাড়ল। খাওয়ার মাঝে চোখ তুলে সরাসরি উদ্যানের পানে তাকালো। মুহূর্তেই ভরকে যায় রাফসা।এমন জল্লাদের মতো তাকিয়ে আছে কেন এই লোক। চোখজোড়া কেমন লাল লাগছে।রাফসা খাবার চিবোতে চিবোতে আশে পাশে দেখল। তারপর উদ্যানের দিক তাকিয়ে মুখ বাঁকালো। উদ্যান শক্ত চোখে তা দেখল।
“উদ্যান ভাই তুমি ফ্রি আছো?”
খাওয়া থামিয়ে প্রশ্ন করে রিশান। উদ্যান ভ্রু কুঁচকে তাকালো, “কেন?”
“রাফসার বায়োলজিতে একটু প্রবলেম আছে। ওকে সময় করে সন্ধ্যায় পরিয়ে দিও।”
উদ্যান তাকালো রাফসার দিকে। কেমন চোখ জোড়া বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। ঠোঁট বাঁকিয়ে সূক্ষ্ম হাসে উদ্যান।তর্জনী আঙ্গুল দিয়ে কপাল চুলকিয়ে বলে “আচ্ছা সমস্যা নেই।”
রাফসার অবস্থা ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি। উদ্যান রাজি হলো কেন।

উদ্যানের রুমের ভেতরেই একটা স্টাডি রুম আছে। বইপ্রেমী মানুষ সে।সব একাডেমী বই দিয়ে ভর্তি। কিছু ইংলিশ বই একপাশে তাকে রাখা। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রুমে কেউ ঢুকলে বেরতে চাইবে না। জানালার পাশে পড়ার টেবিল রাখা। দক্ষিণা হাওয়া বয়ে যায় রুমে।রাফসা মাথা নিচু করে বসে আছে। উদ্যান বায়োলজি বইটা একটা একটা করে উল্টেপাল্টে দেখছে। যা দাগানো বই চান্স না পেয়ে যাবে কোথায়। উদ্যান বই দেখতে দেখতে গম্ভীর কন্ঠে শুধায়,
“বাড়ি ফিরতে দেরি হলো কেন?”

“এক্সটা ক্লা,,,
“চুপ মেরে গাল ফাটিয়ে দিব।কার সাথে মিথ্যে বলছিস?” চেঁচিয়ে উঠলো উদ্যান।
রাফসা জড়সড় হয়ে বসে।জিভ দিয়ে ঠোঁটের অগ্রভাগে ভিজিয়ে নিল।এ লোক কি করে জানলো‌ মিথ্যা বলছে। গোয়েন্দা লাগিয়ে রেখেছে নাকি।
রাফসা জোড়ালো কন্ঠে বলল, “কে বলেছে মিথ্যে বলছি? আমি সত্যি কথাই বলছি।”
“বেশি উড়ছিস বলে মনে হয় না!”
রাফসা বিরক্ত হলো উদ্যানের জেরায়।
“কৈফিয়ত দেওয়ার প্রয়োজন মনে করছি না।”
উদ্যান চোখ বন্ধ করে নিজেকে শান্ত করে।হাত নিশপিশ করছে।কখন যেন হাত উঠে যায়। শাণিত গলায় বলল,

“সাথে কে ছিল?”
“কেউ না।”
“সত্যি?”
“হুঁ।”
ব্যাস ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে গেল উদ্যানের।রাগ সামলাতে না পেরে রাফসার গাল চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বলল, “ কন্টিনিউসলি একটার একটা মিথ্যে বলেই যাচ্ছিস। সমস্যা কি তোর? খবর রাখি না কিছু? যেদিকেই পা ফেলিস তা আমার দখলে।খবর আসতে একমি মিনিট লাগে না।”
রাফসাও কম যায় না।বা হাতের লম্বা নখ গুলো দিয়ে উদ্যানের হাত চেপে ধরে।হাত সরিয়ে নিল উদ্যান।রাগে গজগজ করতে করতে রাফসা বইটা তুলে উদ্যানের দিকে ছুড়ে মারে।বইটা গিয়ে ঠেকে উদ্যানের বুকে।
রাগে শরীর থরথর করে কাঁপছে রাফসার।আরেকটা বই নিয়ে ছুঁড়ে মারে,

প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২১ (৩)

“অধিকার আছে বলে যা খুশি তাই করবেন? অসভ্য লোক একটা। সেই শুরু থেকে জ্বালিয়ে মারছে।না ছাড়ছে,না ধরছে।”
উদ্যান উঠে রাগে টেবিলে একটা লাথি মারে। কেঁপে উঠলো রাফসা।
“যেদিন ধরব সেদিন আর ছাড় পাবি না।যত উড়ার উড়ে নে।”

প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২২ (২)