Home ফিরে এসো অনুরাগে ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ২৪ (২)

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ২৪ (২)

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ২৪ (২)
নওরিন কবির তিশা

-‘ তৃষা ভাবি? আপনাকে আর্য ভাই ডাকছে।
সালমার কথাটা কর্ণগোচর হতেই রান্নাঘরে উপস্থিত সকলের কৌতূহলী দৃষ্টি তৃষার উপর নিবদ্ধ হলো। অপ্রস্তুত তৃষা লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে এলো খানিক। আর্যর খালা আর ওনার মেয়েরা একটু আগে এসেছেন। আর্যর খালাতো বোন তিথি এসেই হেঁসেলে ঢুকেছে। ও সবে আলু ভাজায় মনোনিবেশ করেছিল। তবে সালমার কথা শুনে ও হাতের হাতাটা রেখে একগাল হেসে তৃষার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বেশ রসিকতার সুরে বলল,

​-‘ কী ব্যাপার তৃষা! আমাদের ক্যাপ্টেন সাহেবের কি এক মুহূর্তও তোমাকে ছাড়া চলে না? এই তো মাত্র কিছুক্ষণ হলো, এর মধ্যেই আবার তলব?
​তিথির কথায় রান্নাঘরের অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে তিথির বোন তামান্না আর অহনা ঠোঁট চেপে হেসে উঠল। অহনা ওর ওড়নাটা ঠিক করতে করতে টিপ্পনী কাটল,
​-‘ আরে তিথি আপু, তুমি বুঝছো না কেন? আর্য ডিক্টেটর মানুষ, ও চাচ্ছে ওর পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট যেন চব্বিশ ঘণ্টা ওনার চোখের সামনে থাকে। আর তৃষা, যাও যাও! দেরি করলে আবার হয়তো ক্যাপ্টেনস অর্ডার অমান্য করার অপরাধে তোমার জেল হয়ে যাবে!
​মিতি পাশ থেকে ফোড়ন কাটল,,
-‘ জেল তো হবেই, তবে ওটা তো আর হাজত নয়, আর্য ভাইয়ার হৃদয়ের কারাবাস! তৃষা জলদি যাও, নাহলে আর্য হয়তো নিজেই নিচে নেমে আসবে তোমাকে কোলে করে তুলে নিতে!
​তৃষার অবস্থা তখন শোচনীয়। লজ্জায় ওর গাল দুটো জবা ফুলের মতো লাল হয়ে উঠেছে। ও আমতা আমতা করে বলল,,

-‘ আরে না না, তোমরা শুধু শুধু বানিয়ে বলছো। হয়তো কোনো দরকারি ফাইল বা ফোন নিয়ে কোনো কথা আছে। লোকটা যে কী পরিমাণ খিটখিটে, তোমরা তো জানোই!
​রান্নাঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট চাচি আর মেজো মামি পর্যন্ত তৃষার এই অপ্রস্তুত ভঙ্গি দেখে মুখ চেপে হাসছিলেন। ছোট মামি হাতা নেড়ে বললেন,,
-‘ যাও মা তৃষা, আর্যর ডাক উপেক্ষা করো না। দেখে এসো কী বলছে।
​তৃষা আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়ানোর সাহস পেল না। ননদদের সেই অন্তহীন রসিকতা আর বিদ্রুপের বাণ থেকে বাঁচতে ও দ্রুত পা বাড়াল সিঁড়ির দিকে। ওর বুকের ভেতরটা তখন দুরুদুরু কাঁপছে। কি কারণে এমন আকস্মিক জরুরি তলব টা বোঝার ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে মস্তিষ্ক।

কক্ষের রুদ্ধ দ্বারের সম্মুখে এসে তষা ক্ষণকাল থমকাল; ললাটে জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘামটুকু ওড়নার আঁচলে মুছে নিয়ে ধীরহস্তে কপালে টোকা দিল। ভেতর থেকে কোনো প্রত্যুত্তর না পেয়ে ও অত্যন্ত সন্তর্পণে অর্গলমুক্ত করে ভেতরে প্রবেশ করল।
​কক্ষটি এক মায়াবী নিস্তব্ধতায় আচ্ছন্ন। জানালার ঝরোকা চুইয়ে আসা বিকেলের ম্লান রোদ শ্বেতপাথরের মেঝেতে দীর্ঘ ছায়া ফেলেছে। তৃষা প্রথম দৃষ্টিতে আর্যকে কোথাও দেখতে পেল না। ও কিঞ্চিৎ বিভ্রান্ত হয়ে পা বাড়াতেই নজর কাড়ল ড্রেসিং টেবিলের আয়নার পাশের সেই নিভৃত কোণটায়। সেখানে রৌদ্র-ছায়ার আলপনা মেখে দাঁড়িয়ে আছে এক দীর্ঘ ঋজু দেহাবয়ব। আর্যর সেই প্রশস্ত কাঁধ আর পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গিটুকু দেখেই তৃষা মুহূর্তেই চিনে নিল তাকে।
​তৃষা কিঞ্চিৎ ভ্রুকুঞ্জনপূর্বক ভাবল,,
-‘ এই লোক কি শোপিস হওয়ার প্র্যাকটিস করছে নাকি?
অতঃপর ও বেশ সতর্ক পায়ে আর্যর পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে স্পষ্ট স্বরে ডাকল,

-‘ আমাকে ডাকছিলেন?
​আর্য মন্থর গতিতে ঘুরে দাঁড়াল। ওর তীক্ষ্ণ ও ভরাট দৃষ্টি তৃষার ওপর নিবদ্ধ হলো সহসা। আর্য কোনো কথা না বলে অত্যন্ত ধীরলয়ে তৃষাকে আপাদমস্তক নিরক্ষণ করতে শুরু করল ওর পায়ের নখ থেকে শুরু করে অবিন্যস্ত কেশগুচ্ছ পর্যন্ত। আর্যর এই নির্বাক ও অতলস্পর্শী চাহনিতে তৃষা বড্ড অস্বস্তি বোধ করছে ও ভ্রু কুঁচকে কিঞ্চিৎ ঝাঁঝালো কন্ঠে বলল,
​-‘ ওভাবে মিউজিয়ামের স্ট্যাচু দেখার মতো কী দেখছেন? আমি কি চিড়িয়াখানার কোনো অদ্ভুত প্রাণী? কেন ডেকেছেন সেটা বলবেন তো!
​আর্যর নির্বাক ভঙ্গিমায় তৃষার একদম পাশ কাটিয়ে কক্ষে প্রবেশ করতে করতে নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল,

​-‘ নাথিং।
​তৃষা বিরক্তি-বিস্ময়ের মিশ্রণে দৃষ্টি প্রসারিত করে দ্রুত ঘুরে আর্যর পিছু ডাকল,
​-‘ কী বললেন? নাথিং মানে? সালমা যে নিচে গিয়ে ঢোল পিটিয়ে এল যে আপনি আমাকে জরুরি তলব করেছেন, আর এখন বলছেন নাথিং? আপনি কি আমার সাথে ইয়ার্কি করছেন?
​আর্য দরজার কাছে গিয়ে থেমে গেল। সে পেছনে না ফিরেই অত্যন্ত শান্ত স্বরে বলল,,
-‘ সালমা কেন ওটা বলল, সেটা সালমাকেই জিজ্ঞেস করুন।
তৃষা দমলো না বরং দ্বিগুণ বিরক্তিতে বলল,-‘ মানে কি? ও বলে আপনি ডাকেন আপনি বলেন ডাকেননি, আসলে হচ্ছেটা কি!
-‘ হাউ ক্যান আই নো?
তৃষা এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আর্যর এই নির্বিকার ভঙ্গি আর রহস্যময় উত্তরের কোনো কূলকিনারা ও খুঁজে পেল না। পরক্ষণেই ভাবলো হয়তো বোঝার ভ্রান্তি হয়েছে কোথাও। তাই ও আর কথা না বাড়িয়ে পক্ষ থেকে প্রস্থান করতে গেল। ঠিক তখনই পেছন থেকে আর্যর সেই গম্ভীর-ধারালো কণ্ঠস্বর বর্শার মতো ওকে বিঁদ্ধ করলো। আর্য ল্যাপটপটা বিছানায় সজোরে রেখে দিয়ে বসে বলল,

-‘ লিসেন ম্যাম?
আর্যর বলা ম্যাম সম্বোধনে সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে তাকালো তৃষা। কি এক অদ্ভুত আবেশ হৃদয়ে দোলা দিলো ওর। আর্য ওর দিকে না তাকিয়ে ল্যাপটপে মনোনিবেশ করতে করতে বলল,,
-‘ আপনি ক্লামজি ইটস ওকে। বাট আনকেয়ারফুল হওয়াটা আমার মোটেও পছন্দ নয়। কিছু মানুষ থেকে তাই আপনার সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং মেইনটেইন করা প্রয়োজন। নাহলে আপনার মতো সহজ-সরল ইউজার ইন্টারফেস কিন্তু ক্র্যাশ করতে বেশিক্ষণ সময় নেবে না।
তৃষা আর্যর কথার মাথা মুণ্ডু না বুঝে বলল,,

-‘ মানে? আই মিন আপনি কার কথা বলছেন?
আর্য এবার ল্যাপটপ থেকে মুখ তুলে সরাসরি তৃষার চোখের দিকে তাকাল, তীক্ষ্ণ কন্ঠে বলল,,
-‘ আমি কার কথা বলছি সেটা বোঝার মতো ক্যাপাসিটি যদি আপনার ভেতরে না থাকে, তাহলে জাস্ট মনে রাখবেন কোনো থার্ড পার্টির ইন্টারফেয়ারেন্স আমি মোটেও পছন্দ করি না। সেটা যে-ই হোক না কেন। সো, বি কেয়ারফুল।
তৃষা কিঞ্চিৎ ভ্রু কুঞ্জনপূর্বক মুখ গোটালো। অতঃপর একঝলক আর্যর কর্মনিমগ্ন মুখটার পানে চেয়ে বেরিয়ে এলো।

-‘ কি ব্যাপার মিস? লাইন মারার প্ল্যান আছে নাকি?
হুট করে পেছন থেকে ভেসে আসা পৌরুষ কণ্ঠটায় কিঞ্চিৎ ভড়কায় ‌মেহেসানা । তড়িৎ বেগে পেছনে ঘুরতেই দৃশ্যমান হয় বিজ্ঞের ন্যায় চেয়ে থাকা আদ্রিয়ানকে। ও তৎক্ষণাৎ নিজেকে সামলে বলে,
-‘ মানে?
আদ্রিয়ান ওর দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলে,
-‘ এইযে ইদানিং আমার হসপিটালে‌ আসা যাওয়া বেড়েছে।এখন দেখছি আমার কেভিনেও উঁকি ঝুঁকি দেওয়া হয়। গুড গুড,ভেরি গুড।
মেহেসানা ভেতরে ভেতরে ভীতসন্ত্রস্ত হলেও বাহিরে তার লেশ মাত্র প্রকাশ না করে বরং বরাবরের ন্যায় বলে,

-‘ মানে কি? এখন কি অসুস্থ হলে হসপিটালে‌ও আসা যাবে না নাকি? আর আপনার হসপিটাল মানে? কোথাও নাম লেখা আছে আপনার? কই আমি তো দেখছি না।
মেহেসানার এমন অকাট্য যুক্তিতে একটুও দমলোনা আদ্রিয়ান। ঈষৎ বাকা হেসে বলল,,
-‘ বুঝলাম হসপিটাল টা আমার নয়। আমার নামও লেখা নেই বাট কেবিনে তো আমার নাম লেখা আছে ওই যে নেমপ্লেটে বড় বড় অক্ষরে দেখাই যাচ্ছে সার্জেন্ট আদ্রিয়ান এহসানের নাম। নাকি আপনার চোখেও প্রবলেম আছে মিস?
মেহেসানা এবার একটু অপ্রস্তুত হয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে ওড়নার খুঁটটা আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে বেশ বিরক্তি মাখা সুরে বলল,

-‘ উফ! এত ফাও ক্যাচাল করেন কেন আপনি? আমি আপনার কেবিনে উঁকি দিচ্ছিলাম না, জাস্ট দেখছিলাম ভেতরে পেশেন্ট আছে কি না। হুট করে ঢুকে পড়লে যদি আপনার ওই বিশাল ইগোতে চোট লাগে, তাই একটু সাবধান হচ্ছিলাম আর কি!
আদ্রিয়ান এবার কেবিনের দরজায় হেলান দিয়ে দুহাত বুকের ওপর ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে এক ভ্রু সামান্য নাচিয়ে মুচকি হেসে বলল,
-‘ হ! আমার ইগোর কথা ভেবে এত কনসার্ন? আই অ্যাম ইমপ্রেসড মিস মিমি। তা এই যে রোজ রোজ কোনো না কোনো অছিলায় আমার রেডারে ধরা দিচ্ছেন, এটাকে কি আমি সফট কর্নার হিসেবে ধরে নেব? নাকি…!
মেহেসানা ওকে কথা শেষ করতে দিল না। তড়িৎ গতিতে ওর দিকে তাকিয়ে চোখ বড় বড় করে বলল,
-‘ সফট কর্নার মাই ফুট! আপনার মতো এক ফালি করোলার জন্য কার সফট কর্নার হবে শুনি? আমি তো এসেছি স্রেফ তৃষার প্রেসক্রিপশনটা রি-চেক করাতে। আপনি অহেতুক নিজেকে সেলিব্রিটি ভাবা বন্ধ করুন তো মিস্টার সার্জেন্ট!
আদ্রিয়ান এবার এক কদম এগিয়ে এল। মেহেসানার চোখের খুব কাছে নিজের মুখটা নিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল,

-‘ করোলা? ইন্টারেস্টিং! তেতো হলেও কিন্তু স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। আর শুনুন, প্রেসক্রিপশন চেক করার জন্য রিসেপশন আছে, জুনিয়র ডাক্তাররা আছে। সরাসরি এই অধমের কেবিনে হানা দেওয়াটা কিন্তু অন্য কিছুরই সিগন্যাল দিচ্ছে। মানুন আর না মানুন, আপনার এই ঝগড়ুটে স্বভাবের আড়ালে একটা কিউট কিউরিওসিটি আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।
মেহেসানা এবার সত্যিই থতমত খেয়ে গেল। আদ্রিয়ানের এই হঠাৎ ফ্লার্ট করার ভঙ্গিটা ওর হার্টবিটকে যেন অলিম্পিকের দৌড়ে নামিয়ে দিয়েছে। ও দ্রুত এক পা পিছিয়ে গিয়ে আমতা আমতা করে বলল,,

-‘ আপনি… আপনি জাস্ট একটা..! আপনার সাথে কথা বলা মানেই নিজের মাথা খারাপ করা। আমি যাচ্ছি!
আদ্রিয়ান সশব্দে হেসে উঠল। ও পেছন থেকে ডাক দিয়ে বলল,
-‘ আরে শুনুন! পালিয়ে যাচ্ছেন কেন? কফিটা তো খেয়ে যান। নাকি কফিতেও বিষ মেশানোর ভয় পাচ্ছেন? প্রমিজ করছি, ওটা একদম আপনার মতোই কড়া বাট সুইট হবে!
মেহেসানা পেছন না ফিরেই হাত নেড়ে না সূচক ইশারা করে করিডোর দিয়ে প্রায় দৌড়ে পালাল। যাওয়ার সময় ওর মনের কোণে একটা অদ্ভুত শিহরণ খেলে গেল। আদ্রিয়ান করিডোরের দিকে তাকিয়ে একা একাই বিড়বিড়িয়ে বলল,
-‘ মেডিক্যাল সায়েন্সে এই রোগের নাম যাই হোক, আমার কাছে কিন্তু এর নাম কিউট অ্যাটাক। দেখা হবে মিস ঝগড়ুটে!

আর্যর ঘর থেকে বেরিয়ে করিডোর দিয়ে হাঁটছিল তৃষা। উদ্দেশ্য নিয়ে গিয়ে সকলের কাছে আরেকটু সহায়তা করা. ঠিক তখনই উল্টোদিক থেকে ঝড়ের বেগে আসছিল মায়া। বাঁকের মুখে দুজনের প্রায় মুখোমুখি সংঘর্ষ হওয়ার উপক্রম হতেই তৃষা নিজেকে সামলে নিয়ে একপাশে সরে দাঁড়িয়ে মৃদু হেসে বেশ অমায়িক স্বরে বলল,
​-‘ আরে তুমি তো মায়া! তাই না? ইয়ে… সাবধানে, একদম ধাক্কা লেগে যাচ্ছিল তো।
​মায়া থমকে দাঁড়াল। তৃষার সেই সহজ সরল হাসিটা যেন ওর চোখে আগ্নিস-হলকা হয়ে বিঁধল। ও ওর দামি ওড়নাটা কাঁধে ঝটকানি দিয়ে সরিয়ে অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
​-‘ লিসেন? এসব ঢং আমার পছন্দ নয়।এই যে বড় বড় করে চোখ মেলে মায়াবী সাজার চেষ্টা করছো, এসব ন্যাকামি আমার সামনে না দেখালেও চলবে।
​মায়ার হঠাৎ এমন আক্রমণাত্মক কথায় তৃষা অবাক হয়ে বলল,,

-‘ ন্যাকামি? আমি তো জাস্ট নরমালি কথা বললাম । একদিন তোমার ভুল মনে হচ্ছে।
​-‘ ওহ স্টপ ইট! ভুল আমার নয়, ভুল আর্য ভাইয়ের। জানি না কোন মন্ত্র পড়ে ওনার ঘাড়ে চেপে বসেছো যে লোকটা নিজের স্ট্যান্ডার্ড ভুলে তোমার মতো এমন স্ট্যার্ন্ডার মেয়েকে কোলে করে বাড়িতে এন্ট্রি দিচ্ছে!
​তৃষার ভেতরের শান্ত সমুদ্রটা মুহূর্তেই উত্তাল হয়ে উঠল। মায়ার মুখে ক্লাসলেস আর ঘাড়ে চাপ’র মতো কদর্য অপবাদ শুনে ওর সহ্যের বাঁধ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। ও এক কদম এগিয়ে গিয়ে অগ্নি দৃষ্টি হেনে মায়ার চোখের দিকে সরাসরি তাকালো,ধারালো কন্ঠে বলল,
​-‘ লিসেন মিস ন্যাকামির ভান্ডার, তোমার ড্রামাগুলো ড্রয়িং রুমের জন্য তুলে রাখলে ভালো করতে। আর শোনো, তুমি বললে না আমি ওনার ঘাড়ে চেপে আছি? আই থিঙ্ক তোমার চোখটা চেক করা দরকার। কারণ আর্য আমাকে কোলে করে আনবে না কি মাথায় করে, সেটা সম্পূর্ণ ওনার চয়েস। আর আমাকে স্ট্যান্ডার্ডের কথা বলছ? যার নিজের ব্যবহারের কোনো স্ট্যান্ডার্ড নেই, তার মুখে বড় বড় কথা বড্ড বেমানান লাগে।
​মায়া রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল,,

-‘ কী বললি তুই? তোর এত সাহস!
​-‘ সাহস আরও আছে দেখবি?
বলেই ও সাটিয়ে চড় বসিয়ে দিল মায়ার নরম চোয়ালে, অতঃপর ওর চুলগুলো মুষ্টিবদ্ধ হাতে ধরে পিছন থেকে টান দিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বাঁকা হেসে বলল,,
-‘ এখন থেকে অন্তত আমার সাথে কথা বলার সময় নিজের লিমিটের মধ্যে থাকবি। আই থিঙ্ক তোর ওই শকুনের দৃষ্টি আমার আর্যর উপর পড়েছে। তাই দৃষ্টি সংযত কর নাহলে…! থাক পরে বলব বাট আপাতত ডিক্টেশনটা ক্লিয়ার?
কথাগুলো এক নাগাড়ে বলেই ওর চুল তাচ্ছিল্যের সাথে ছেড়ে দিয়েই তৃষা আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে ওকে পাশ কাটিয়ে গটগট করে নিচে নেমে গেল। এদিকে তৃষার আকস্মিক চপেটাঘাত আর রণংদেহী মূর্তির সম্মুখে মায়া যেন এক নিমিষেই বিমূঢ় হয়ে পড়ল। অপমানে-বিস্ময়ে ওর বাক্‌শক্তি রুদ্ধ হয়ে এল; দুই নয়ন বিস্ফোরিত করে সে কেবল তৃষার প্রস্থানপথের পানে চেয়ে রইল। দর্পিতা মায়ার অহংবোধ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে ধূলিসাৎ হলো এক পলকে। ওর গণ্ডদেশ রক্তিম হয়ে উঠেছে অপমানে, আর অন্তরে দাউদাউ করে জ্বলছে প্রতিহিংসার অনল। সেই নির্জন করিডোরে ও একাকী মূর্তিবৎ দাঁড়িয়ে কাঁপতে লাগল।
হাতজোড়া মষ্টিবদ্ধ করে বলল,-‘ আমি তোকে ছাড়বো না কিছুতেই ছাড়বো না তৃষা!

মায়ার সাথে সেই অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষের পর তৃষার মেজাজটা বেশ তিরিক্ষি হয়ে ছিল। তবে ডাইনিং টেবিলে সবার সাথে হাসাহাসি আর রাতের খাবারের ব্যস্ততায় সেই তিক্ততা কিছুটা প্রশমিত হয়েছে। রাত তখন এগারোটা ছুঁইছুঁই। তৃষা কক্ষের দর্পণের সম্মূখে দাঁড়িয়ে চুলে চিরুনি চালনা করছিল। আর্য বিছানায় হেলান দিয়ে ল্যাপটপে কী যেন গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখছে। ঘরটা একদম শান্ত, নিস্তব্ধ শুধুমাত্র এসির মৃদু গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে।
​হঠাৎ তৃষার ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে বেস্টু নামটা দেখে তৃষা দ্রুত কলটা রিসিভ করল।

-‘ কিরে এত রাতে?
​ওপাশ থেকে মেহেসানার কণ্ঠস্বর বেশ চিন্তিত শোনাল,,
-‘ দোস্ত শোন, একটা দরকারী কথা আছে। সায়েম ভাই তোকে অনেকক্ষণ ধরে ট্রাই করছে, কিন্তু পাচ্ছিল না। পরে আমাকে ফোন করে জানাল যে তুই নাকি ওনাকে ব্লক করে দিয়েছিস! কী ব্যাপার বল তো? হুট করে সায়েম ভাইকে ব্লক মারলি কেন?বুঝলাম ওনাকে তোর অপছন্দ তা বলে সরাসরি ব্লক। কলেজের সিনিয়র ভাই, একটু তো বোঝ।
​তৃষার হাতের চিরুনিটা থমকে গেল। ও অবাক হয়ে বলল,,
-‘ মানে? আমি সায়েম ভাইকে ব্লক করব কেন? আমি তো ফোন হাতেই নিইনি ঠিকমতো। হয়তো নেটওয়ার্কের প্রবলেম ছিল।

​-‘ নেটওয়ার্কের প্রবলেম না রে পাগলী! সায়েম ভাই স্ক্রিনশট পাঠিয়েছে, ক্লিয়ারলি দেখাচ্ছে ইউ আর ব্লকড। আচ্ছা তুই একটু চেক কর তো।
মেহেসানা তাগাদা দিতেই ​তৃষা কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে কলটা স্পিকারে দিয়ে ফোনের ব্লক লিস্ট অপশনে ঢুকল। আর সেখানে তাকাতেই ওর চোখ চড়কগাছ! সত্যি তো, সায়েম ভাইয়ের নম্বরটা সেখানে জলজ্যান্ত শোভা পাচ্ছে। কিন্তু আরও অবাক করা বিষয় হলো ব্লকের সময়টা আজকের।
​তৃষার মস্তিষ্কে বিদ্যুৎ খেলে গেল। ঠিক সেই সময়, যখন ও আর্যর ডাকে নিচে থেকে ওপরে এসেছিল এবং আর্য ওকে সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং আর থার্ড পার্টি ইন্টারফেয়ারেন্স নিয়ে জ্ঞান দিচ্ছিল!
​তৃষা ধীরলয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে আর্যর দিকে তাকাল। আর্য এখনো একইভাবে ল্যাপটপে মগ্ন, যেন পৃথিবীর কোনো খবরই তার কাছে নেই। ​তৃষা মেহেসানাকে বলল,,
-‘ মেহু, রাখ তো।আমি পরে কথা বলছি তোর সাথে।
​ফোনটা রেখে তৃষা ধীরপায়ে বিছানার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। আর্যর নিস্পৃহ ভঙ্গি দেখে ওর পিত্তি জ্বলে গেল। ও কিঞ্চিৎ রাগত স্বরে বলল,,

​-‘ আপনি আজ আমার ফোন ধরেছিলেন?
​আর্য ল্যাপটপ থেকে চোখ না সরিয়েই শান্ত গলায় বলল,,
-‘ হয়তো। ইম্পর্ট্যান্ট কোনো কল আসতে পারতো, তাই রিসিভ করতে গিয়েছিলাম।
​-‘ রিসিভ করতে গিয়ে কি ভুল করে ব্লক বাটনে চাপ পড়ে গিয়েছিল? সায়েম ভাইকে কেন ব্লক করেছেন?
​আর্য এবার ল্যাপটপটা বন্ধ করে সরাসরি তৃষার চোখের দিকে তাকাল। সেই চিরচেনা গম্ভীর আর আধিপত্য বিস্তারকারী দৃষ্টি। ও বিছানায় একটু সোজা হয়ে বসে বলল,,
​-‘ আমি আগেই বলেছিলাম, আপনার ইউজার ইন্টারফেস বড্ড সহজ-সরল। যে কেউ চাইলেই সেখানে অনুপ্রবেশ করতে পারে। আর সায়েম? হি ইজ এন আনওয়ান্টেড বাগ ইন ইওর সিস্টেম। আমার ডিভাইসে—আই মিন, আমার লাইফে কোনো ভাইরাসের এন্ট্রি আমি টলারেট করি না।
​তৃষা হাত পা গুটিয়ে দাঁড়িয়ে রইল,না চাইতেও বলে ফেলল,

-‘ আপনি… আপনি বড্ড ডিক্টেটর! আমার ব্যক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার অধিকার আপনাকে কে দিল?
​আর্য এক মুহূর্তের জন্য চুপ থাকল।অতঃপর গভীর কণ্ঠে বলল,
-‘ অধিকারটা আমার নিকনেমেই লেখা আছে তৃষা ‘ক্যাপ্টেন’। আর ক্যাপ্টেন তার টেরিটরিতে কোনো অনুপ্রবেশকারী পছন্দ করে না। ব্লক তো ছোট একটা ট্রেলার ছিল, এরপর যদি ও আবার আপনার আশেপাশে ঘোরার চেষ্টা করে, তবে সিস্টেম থেকে পার্মানেন্টলি ডিলিট করে দেব। আন্ডারস্ট্যান্ড?
​তৃষার আর কোনো কথা বলতে পারল না। ওর রাগটা যেনো কোথায় মিলিয়ে গেছে। আবারও আর্যর শান্ত কণ্ঠ ভেসে এল,,

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ২৪

-‘ এখন ফোনটা রেখে চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়ুন। কজ ইউ্য উইক। আর হ্যাঁ… সায়েমকে আনব্লক করার কথা ভুলেও ভাববেন না।
​তৃষা আর কথা না বাড়িয়ে গাল ফুলিয়ে বিছানার এক কোণে শুয়ে পড়ল। বলা বাহুল্য সারাদিনের ক্লান্ততা শেষে বেশ ঘুম ঘুম পাচ্ছিলো ওর। আর্য এক ঝলক তাকালো ওর দিকে। পরক্ষণেই ফের মনোনিবেশ করল ল্যাপটপে।

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ২৫