Home ফিরে এসো অনুরাগে ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ২৫

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ২৫

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ২৫
নওরিন কবির তিশা

জৈষ্ঠ্যের শেষ প্রহর;আষাঢ় আসন্ন। তপ্ত ধরণির বুকে আজ মেঘেদের ঘনঘটা। আকাশজুড়ে নীলাভ-কালো মেঘের মায়াবী বিস্তার। নব প্রভাতের সূচনালগ্ন থেকেই আজ বায়ুপ্রবাহ কিঞ্চিৎ ঝড়ো।
জমিদার বাড়ি সংলগ্ন আর একটি ছোট্ট কুটিরের ন্যায় দালান বিদ্যমান উঠানের ঠিক পূর্ব পাশে। মূল জমিদার বাড়ির ছাদ থেকে তাকালে দালানটির শ্যাওলা ধরা আলসেগুলো স্পষ্ট দৃষ্টিগোচর হয়।
তৃষা টুইংকেলের সাথে লুকোচুরি খেলতে খেলতেএখানে এসে লুকিয়ে আছে। ও সন্তপর্ণে দালানটির ছাদে পা রাখল। ও জানত না আর্য আগে থেকেই সেখানে উপস্থিত। আর্য ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে দূর পাহাড়ের গায়ে মেঘেদের লুকোচুরি দেখছিল; ওর ঋজু দেহাবয়বে আজ এক অস্থির প্রশান্তি। তৃষা ওকে দেখে সামান্য ভড়কায়,ও অগোচরে ওখান থেকে প্রস্থান করতে যাবে ঠিক সেই মুহূর্তে প্রকৃতির রুদ্ধ দুয়ার যেন আচমকা খুলে গেল।
তপ্ত ধরিত্রীর হাহাকার মিটিয়ে ঝমঝমিয়ে নামল কাঙ্ক্ষিত বর্ষণ। অবিরল জলধারায় মুহূর্তেই ভিজে একাকার হলো চারপাশ। তৃষা অপ্রস্তুত হয়ে এদিক-ওদিক আশ্রয়ের খোঁজ করতে গিয়ে পিছলে যেতে নিলে, আর্য পিছন ঘুরে ক্ষিপ্রতায় ওর হাত টেনে ধরল। বৃষ্টির অঝোর ধারায় দুজনের দৃষ্টি আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেল। ঝোড়ো বাতাসে তৃষার ওড়নার আঁচল উড়ছে, আর আর্যর শার্ট ভিজে লেপ্টে আছে শরীরের সাথে। এক নিবিড় স্তব্ধতায় বৃষ্টির শব্দের মাঝে কেবল দুজনের হৃদস্পন্দনের দ্রিমিকি ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
আর্য বেশ ধমকের স্বরে বলল,

-‘ হ্যোয়াট ননসেন্স! এ ঝড়ো হাওয়ার ভেতরে এই ছাদে আসার মানে কি?
তৃষা ভেবেছিল ও পরে যাবে, সেই ভয়ের রেশ ধরেই চোখ খিঁচে রেখেছিল হঠাৎ আর্য স্পর্শে নিশ্চিন্ত হলো ও। তবে পরক্ষণেই আর্যর ধমকে ঢোক গিলে ভয়ার্ত কণ্ঠে বললো,
-‘ ইয়ে মানে… আসলে আমি আর টুইংকেল..!
ওকে কথা শেষ করতে দিল না আর্য। মাঝপথে থামিয়ে বলল,
-‘ স্টপ তৃষা! এখন আবার বলেন না আপনারা বৃষ্টির মাঝে হাইড অ্যান্ড সেক খেলছিলেন।
তৃষা এবার নিশ্চুপ রইল।কি বলবে ও? সত্যিই তো ওরা লুকোচুরিই খেলছিল। ওকে এমন শান্ত থাকতে দেখে আর্য আর কথা বাড়ালো না। এক ঝলক বর্ষা সিক্ত ওকে নিরক্ষন করে বলল,
-‘ বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছি। সে খেয়াল আছে?
তৃষা এবার তাকালো নিজের দিকে। সত্যিই তো বৃষ্টিতে ভিজে একাকার হয়ে গিয়েছে ও। তবে সেদিকে লেশমাত্র খেয়াল নেই ওর। আর্য যখন ওকে ভেতরে যাওয়ার তাগাদা দিচ্ছে ঠিক সেই মুহূর্তে ও প্রশ্নাত্নক দৃষ্টি মেলে বলল,
-‘ আপনি বুঝলেন কি করে এখানে আমি?

বৃষ্টির উন্মত্ততা তখন চরমে, আকাশভাঙা সেই বারিধারায় অরণ্য আর পাহাড়ের রেখাগুলো ঝাপসা হয়ে এসেছে। আর্যর বলিষ্ঠ হাতের মুঠোয় তৃষার কবজিটা তখনও বন্দি। তৃষার ওই কৌতূহলী প্রশ্নের পিঠে আর্য মুহূর্তকাল স্তব্ধ হয়ে রইল। ওর নিজের মস্তিষ্কের কোষেও তখন একই প্রশ্নের তোলপাড়—কীভাবে?
ও তো বৃষ্টির শব্দের তোড়ে অন্য কোনো শব্দ শোনেনি, তবে তৃষা পা পিছলে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তেই কেন ওর হাতটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওদিকেই প্রসারিত হলো? এক অদ্ভুত, অতিন্দ্রীয় টান যেন বাতাসের স্পন্দনে তৃষার উপস্থিতি আগেভাগেই ওর স্নায়ুতে পৌঁছে দিয়েছিল।
আর্যর চোখের মণি দুটো এক লহমায় সংকুচিত হলো, পরক্ষণেই সেই বিষ্ময় ঝেড়ে ফেলে ও ওর চিরাচরিত বর্মটা পরে নিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,,

-‘ বোঝার জন্য কি খুব রকেট সায়েন্স লাগে? এই পুরো তালুকদার মঞ্জিলে আপনার মতো ক্ল্যামজি আর আনপ্রেডিক্টেবল সেকেন্ড কোনো ক্যারেক্টার নেই। আপনার চলার শব্দে একটা অদ্ভুত ছন্দ আছে, এমনকি আপনার ওই অবাধ্য নিঃশ্বাসের ছন্দেও ক্ল্যামজিনেস মিশে থাকে। আই থিঙ্ক ওটাই এনাফ আপনার উপস্থিতি বোঝার জন্য।
তৃষা ঠোঁট উল্টে বিড়বিড়িয়ে বলল,,
-‘ সারাক্ষণ জিপিএস ট্র্যাকারের মতো আমায় নজরে রাখে নাকি এ লোক!
আর্যর কর্ণগোচর হলো না তৃষার বিড়বিড় করে বলা কথাগুলো। ও বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে তৎক্ষণাৎ তৃষা কে নিয়ে পার্শ্ববর্তী চিলেকোঠায় নামতে যায়। ঠিক তখনই তৃষার নজর কাড়ল মূল জমিদার বাড়ির জানালার সেই নিভৃত কোণটা। সেখানে পর্দার আড়ালে মায়া দাঁড়িয়ে আছে। ওর দৃষ্টিতে বি’ষা’ক্ত ঈর্ষার এক লেলিহান শিখা, যেন দূর থেকে এক জোড়া শকুনের দৃষ্টি বিঁধছে তাদের দুজনের ওপর।
তৃষার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি খেলে গেল। ও মায়াকে বুঝিয়ে দিতে চায়, এই বৃষ্টিস্নাত মুহূর্তের দখলদারিত্ব আদতে কার। আর্য যেই না এক কদম বাড়াল, তৃষা হুট করে ওর ভেজা শার্টের হাতাটা খামচে ধরে নিজের আরও কাছে টেনে নিল। আর্য অপ্রস্তুত হয়ে থমকে দাঁড়াল, ওর কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়লো সহসা।

-‘ কী হলো? ভেতরে চলুন, ঠান্ডা লেগে যাবে তো!
তৃষা এবার ওর কাজলমাখা চোখের পাতাগুলো বৃষ্টির জলে সিক্ত করে এক মায়াবী আকুতি ফুটিয়ে একদম বাচ্চার মতো মুখ করে, বড্ড আদুরে স্বরে বলল,,
-‘ আরেকটু থাকি না?
-‘ নো, আপনার কোল্ড প্রবলেম আছে।
-‘ প্লিইইইজ! দেখুন না, আকাশটা আজ কেমন পাগলামি করছে। এই বৃষ্টির ঘ্রাণটা বড্ড নেশা ধরায়। জাস্ট ফাইভ মিনিটস!

আর্যর সেই গম্ভীর সত্তাটা তৃষার আকস্মিক আবদারে যেন এক লহমায় বিলুপ্ত হলো। ও কিছু একটা বলতে গিয়েও তৃষার সেই নিষ্পাপ চাউনির সামনে শব্দ খুঁজে পেল না। ও অপলক চেয়ে রইল তৃষার দিকে। এদিকে তৃষা আড়চোখে দেখল, মায়া রাগে ফেটে পড়ছে। তৃষা ইচ্ছে করেই আর্যর কাঁধে সামান্য মাথা ঠেকিয়ে বৃষ্টির অঝোর ধারা উপভোগ করতে লাগল। মায়া এক পর্যায়ে অসহ্য বোধ করে জানালার পর্দাটা সজোরে টেনে দিয়ে সেখান থেকে প্রস্থান করল।
বিজয়ীর হাসি হাসল তৃষা। আর্য কিছুই বুঝতে পারল না, শুধু বিস্মিত দৃষ্টিতে চেয়ে রইল এক হুট করে পরিবর্তিত তৃষার দিকে।মায়ার প্রস্থানের সাথে সাথেই তৃষার রোমান্টিক ড্রামার ওপর যেন যবনিকা পড়ল। ও চট করে আর্যর থেকে কিছুটা দূরত্ব বজিয়ে বেশ স্বাভাবিক গলায় বলল,
-‘ ওকে, ডান! ফাইভ মিনিটস ওভার। এবার চলুন নিচে যাই, আপনার তো আবার ঠান্ডার সমস্যা আছে।
আর্য নিজের হাতের ওয়াটারপ্রুফ ঘড়িটার দিকে একবার তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
-‘এক মিনিট বিশ সেকেন্ড হয়েছে মাত্র। আপনার পাঁচ মিনিট কি ঘড়ির কাঁটা উল্টো দিকে ঘোরে নাকি?
তৃষা একটু অপ্রস্তুত হয়ে হাসল,

-‘ আরে ওটা রাউন্ড ফিগার ধরে নিয়েছি। চলুন তো এখন!
তৃষা পা বাড়াতেই সিঁড়ি দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ওপরে উঠে এল টুইংকেল। বৃষ্টির পানিতে ভিজে ওর লাল ফ্রকটা গায়ের সাথে লেপ্টে আছে, কপালে লেপটে থাকা ভেজা চুলগুলো নিয়ে ও চিৎকার করে উঠল,
-‘ আই গট ইউ বানি! তুমি এখানে পাপার সাথে লুকিয়ে ছিলে? দিস ইজ চিটিং! তোমরা আমাকে ছাড়াই রেইন-পার্টি করছ?
টুইংকেল কোমরে হাত দিয়ে মুখ ফুলিয়ে দাদুনদের মতো গম্ভীর হয়ে দাঁড়াল। আর্য নিচু হয়ে ওকে কোলে তুলে নিতে চাইলেও ও সরে গিয়ে বলল,,
-‘ নো পাপা! আমি তোমার ওপর খুব রাগ করেছি। তুমি বানিকে একাই ভিজিয়ে দিচ্ছ, আর আমাকে ডাকোনি কেন?
তৃষা খিলখিল করে হেসে উঠে পেছন থেকে টুইংকেলকে জাপ্টে ধরল। ওর নরম গালে একটা শব্দ করে চুমু খেয়ে আদুরে গলায় বলল,

-‘ অরে আমার কিউটি পাই! রাগ করে না তো সোনা। আমরা তো জাস্ট তোমাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য ওয়েট করছিলাম। এই দেখো, এবার আমরা তিনজন মিলে একসাথে ভিজব। ডিল?
টুইংকেলের রাগ এক নিমেষেই গলে পানি হলো। ও হাততালি দিয়ে লাফিয়ে উঠে আর্যর হাত টেনে ধরে বলল,,
-‘ পাপা! জলদি এসো। আমরা এই দুষ্টু রেইনওয়াটারের সাথে ফাইট করব। বানি, চলো আমরা গোল হয়ে ঘুরি!
তৃষা আর টুইংকেল বৃষ্টির ধারায় গোল হয়ে ঘুরতে শুরু করল। আর্য একপাশে দাঁড়িয়ে পকেটে হাত দিয়ে অপলক চেয়ে রইল ওদের দিকে। তৃষার হাসির শব্দ আর টুইংকেলের মিষ্টি কথার কলকাকলি মিলেমিশে এই বৃষ্টিস্নাত প্রভাতটায় এক জান্নাতি পরশ বুলিয়ে দিল যেন।

মিনিট দশেকের মত এভাবেই ভিঁজলো ওরা। ‌তৃষা কালক্ষেপণ না করে টুইংকেলকে বাথরুমে নিয়ে শাওয়ারের ‌কুসুম গরম পানিতে ভালো করে গোসল করিয়ে দিল, যাতে পাহাড়ি হিমেল হাওয়ায় ওর সর্দি না বসে। ফ্রেশ হয়ে লাল উলের তোয়ালেতে মাথা মুছতে মুছতে টুইংকেল যখন বিছানায় লুটোপুটি খাচ্ছে, তৃষাও দ্রুত নিজের ভিজে কাপড় বদলে একটি আরামদায়ক সালোয়ার কামিজ পড়ার উদ্দেশ্যে কমন বাথরুমের দিকে পা বাড়ালো ।
ওদিকে আর্যও নিজের ভেজা শার্ট ত্যাগ করে দ্রুত শাওয়ার সেরে বেরিয়ে এল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করতে করতে আর্য আড়চোখে দেখল, ঘরজুড়ে এখন বৃষ্টির সোঁদা গন্ধ আর একরাশ পারিবারিক প্রশান্তি চাদর বিছিয়ে দিয়েছে।
ওকে বের হতে দেখেই টুইংকেল গুটিগুটি পায়ে ওর দিকে এগিয়ে এসে বলল,

-‘ পাপা?
আর্য ঘুরে দাঁড়িয়ে এক চিলতে হাসল। ও হাঁটু গেড়ে টুইংকেলের সম উচ্চতায় বসে ওর ভেঁজা নাকটা আলতো করে টিপে দিয়ে বলল,
-‘ ইয়েস প্রিন্সেস?
-‘ আমরা পাহাড় দেখতে যাব না?
-‘ যাবো তো মাম্মা।
-‘ কবে?
-‘ তুমি কবে যেতে চাও প্রিন্সেস?
আর্যর এহেন প্রশ্নের জবাবে খানিকক্ষণ চুপ থাকে টুইংকেল তাদেরকে আর্য ফের শুধায়,
-‘ টেল মি মাম্মাম। তুমি কবে যেতে চাও?
টুইংকেল এবার ঘুরেফিরে তৃষাকে খুঁজে না পেয়ে ওর নীলাভ মায়াবী দৃষ্টি আর্যর দিকে মেলে আদুরে কন্ঠে বলল,
-‘ কবে যেতে চাই? আমি জানিনা কবে যেতে চাই।
মেয়েরা এমন কথায় ফিক করে হেসে দিলো আর্য।

-‘ তবে?
-‘ বানি যখন বলবে তখন যেতে চাই। তুমি নিয়ে যাবে তো পাপা?
-‘ অফকোর্স মাম্মা।
টুইংকেল আর্যর থেকে মন মত জবাব পেয়েই গলা জড়িয়ে ওর মুখে ছোট্ট একটা চুমু দিয়ে বলল,,
-‘ ইউ্য আর দ্য বেস্ট পাপা। লাভ ইউ্য।
আর্যও মুচকি হেসে মেয়ের নরম চোয়ালে চুমু দিয়ে বলল,
-‘ লাভ ইউ্য টু মাম্মাম।
বাবা মেয়ের খুনসুটে যখন চরম এ ঠিক সেই সময়ে কক্ষে প্রবেশ করল তৃষা। ও কিঞ্চিৎ সরু নেত্রে ওদের নিরক্ষন করছে কিছু বলার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে কক্ষে কড়া নাড়ল সালমা।
-‘ ভাইজান, ভাবিকে আর আপনাকে দাদিমা নিচে খেতে ডাকছেন।
আর্য একঝলক দরজার দিকে তাকিয়ে দেখল তৃষাও দাঁড়িয়ে আছে ওখানে, ও কিছু বলার আগেই তৃষা সালমা কে বলল,
-‘ তুমি যাও আমরা আসছি।
সালমার সম্মতিসূচক মাথা নাড়িয়ে প্রস্থান করতেই তৃষা আর্য-টুইংকেলের উদ্দেশ্যে বলল,
-‘ চলুন। খেতে ডাকছে তো।
আর্য টুইংকেলকে কোলে তুলে, বাইরের উদ্দেশ্যে পা বাড়াতে বাড়াতে বলল,,
-‘ হুম,চলুন।

ডাইনিংয়ের ‌পরিবেশ জমজমাট । সেগুন কাঠের বিশাল টেবিলের ওপর ধোঁয়া ওঠা ভুনা খিচুড়ি, ইলিশ মাছ ভাজা আর বেগুনির সুবাসে অন্দরমহল ম ম করছে। বৃষ্টির দিনে এমন ভোজের ঘ্রাণে সবার ক্ষুধাই যেন দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
তৃষা আর আর্য যখন টুইংকেলকে নিয়ে ডাইনিংয়ে প্রবেশ করল, তখন সবার দৃষ্টি একযোগে তাদের ওপর নিবদ্ধ হলো। মায়া আগে থেকেই এক কোণে বসে প্লেটে চামচ দিয়ে শব্দ করছিল, ওর দৃষ্টি তৃষার ভেজা চুলের ওপর গিয়ে স্থির হলো। আঞ্জুমান বেগম চশমার ওপর দিয়ে একবার আর্য আর একবার তৃষাকে পরখ করে নিয়ে কৌতুকভরা স্বরে বললেন,

-‘ বলি জামাই আমার দেখছি ভালোই রোম্যান্টিক হয়েছে। বউকে নিয়ে সকাল সকাল বৃষ্টিতে ভিজছে, আবার একসাথে খেতে আসা হচ্ছে বাবা।
নানীর কথায় আর্য হেলদোল না দেখালেও খানিক লাজুক হাসলো তৃষা। টুইংকেল পাশ থেকে ফোড়ন কেটে বলল,
-‘ জানো বড় মাম্মাই পাপা আর বানি তো আমাকে ছাড়াই ভিজছিল। পরে আমি গিয়ে ওদের ধরছি।
আঞ্জুমান বেগম টুইংকেলকে পাশে এনে নিজের কোলের উপর বসিয়ে বললেন,
-‘ দেখেছ কান্ড! তোমাকেও নেয়নি?
টুইংকেল নিষ্পাপ চেহারায় মাথা দুপাশে নাড়িয়ে বলল -‘ না তো!
ওনাদেরা এমন কাণ্ডে উপস্থিত সকলে কিছুটা শব্দ করে হেসে উঠলো। আর এতেই লাজুক তৃষা কুণ্ঠিত লাজুক লতার ন্যায় গুটিয়ে পড়ল। এদিকে সবকিছু বড্ড ন্যাকামি ঠেকছে মায়ার কাছে। ইচ্ছা করছে সামনে থেকে প্লেট টা তৃষার মাথায় ছুঁড়ে মারতে। তবুও দাঁতে দাঁত চেপে সমস্ত রাগ নিবারণের ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালালো মায়া।

ভুনা খিচুড়ি আর ইলিশ ভাজার স্বাদে সবাই যখন মগ্ন, ডাইনিং টেবিলের আমেজ তখন বেশ তুঙ্গে। তৃষা এক মনে খিচুড়ির সাথে মরিচের মেখে নিচ্ছিল, ঝাল আর লেবুর সুবাসে ওর জিভে রীতিমতো পানি চলে এসেছে। কিন্তু হুট করেই এক লোকমা মুখে দিতেই বিপত্তি ঘটল। অতিরিক্ত ঝাল আর শুকনো মরিচের একটা টুকরো গলায় আটকে গিয়ে তৃষার দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো।
তৃষা আচমকা কাশতে শুরু করল, ওর ফর্সা মুখটা মুহূর্তেই রক্তিম বর্ণ ধারণ করে নেত্রকার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল এক ফোঁটা নোনা পানি। টেবিলের সবাই থমকে গেল। আর্য সবকিছু এক পাশে সরিয়ে বিদ্যুদ্বেগে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ও এক মুহূর্ত দেরি না করে পাশের জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে তৃষার ওষ্ঠাধরে ধরল।

-‘ তৃষা! শান্ত হোন, এই তো… পানিটা খান কুইক!
আর্যর কণ্ঠে তখন এক অদ্ভুত ‌উদ্বেগ মিশ্রিত অস্থিরতা । ও এক হাতে গ্লাস ধরে অন্য হাতে তৃষার পিঠে পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। তৃষা কাশতে কাশতে আর্যর শার্টের হাতাটা খামচে ধরল। আর্য নিচু স্বরে, অনেকটা ফিসফিস করে ওর কানের কাছে বলল,,
-‘ ঠিক আছেন? আর ইউ ওকে? একটু বড় করে শ্বাস নিন।
তৃষা পানি খেয়ে কিছুটা ধাতস্থ হতেই আর্য ওর চোখের জল নিজের আঙুল দিয়ে মুছে দিল। ডাইনিংয়ের সবাই অবাক হয়ে দেখল আর্যর এই কেয়ারিং সত্তাটাকে।
মায়ার কাছে মনে হলো এই দৃশ্যটা ওর কলিজায় ফুটন্ত তেল ঢেলে দিচ্ছে। আর্যর ওই স্পর্শ, ওর চোখের সেই গভীর চিন্তা সবই যেন তৃষার জন্য বরাদ্দ! মায়া সজোরে চামচটা প্লেটে ফেলে দিয়ে চেয়ার টেনে উঠে দাঁড়াল। ওর চোখ দুটো তখন রাগে রি রি করছে। কারো দিকে না তাকিয়েই ও কর্কশ স্বরে বলল,

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ২৪

-‘ আমার খিদে নেই, আমি আসছি!
মায়া হনহনিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই আঞ্জুমান বিবি মুচকি হাসলেন। আর্য তখনো তৃষার দিকে ঝুঁকে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করছে,
-‘ এখন কেমন লাগছে? বেশি ঝাল খাওয়ার কী দরকার ছিল আপনার?
তৃষা আর্যর দিকে তাকিয়ে জোরপূর্বক হেসে ওকে নিশ্চিন্ত করে বলল,
-‘ আ’ম ফাইন।
আর্য যেন এক মুহূর্তের জন্য দুশ্চিন্তার রাজ্য থেকে বেরিয়ে আসলো। কোঁচকানো ভ্রু যুগল শিথিল হলো সহসা।

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ২৬