Home ফিরে এসো অনুরাগে ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪
নওরিন কবির তিশা

হামিদা বেগম বরাবরই ভীষণ অভিজ্ঞ ধাঁচের রমণী। ব্যবহার অতি মিষ্ট হলেও তার তীক্ষ্ণ চাউনি এড়িয়ে মিথ্যাচার করাটা বড্ড দুষ্কর। এক একটা সূক্ষ্ম কথার তীক্ষ্ণ শুলে মানুষকে অতি সহজে বিদ্ধ করেন তিনি। আর প্রতিপক্ষ যদি হয় তৃষার মতো এমন আনাড়ি তাহলে তো কথাই নেই।সুখনীড়ের ড্রয়িংরুমের স্নিগ্ধ পরিবেশে আজ এক অদ্ভুত থমথমে ভাব বিরাজ করছে। দুপুরের কড়া রোদ্দুর জানলার ভারী পর্দা ভেদ করে কার্পেটের ওপর এসে আছড়ে পড়েছে।
সোফায় আসীন উপস্থিত সকলে, মাঝখানে উপবিষ্ট হামিদা বেগম। যদিও আগে এ বাড়িতে তাঁর যাতায়াত ছিল কালেভদ্রে, কিন্তু তৃষার বিয়ের পর থেকে যেন তাঁর আগমনের জোয়ার এসেছে। তিনি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তৃষার কপালে লেপ্টে থাকা ব্যান্ডেজটার দিকে তাকিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো আবারো শুধালেন,,

—‘কি হলো তৃষা? বলছো না কেন? কি হয়েছে কপালে?
তৃষা বরাবরই একটা জিনিসে খুব কাঁচা। তাহলো এই মিথ্যা বলা। যেখানে একবার মিথ্যা বলতেই দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে সে সেখানে পরপর দুইবার মিথ্যা বলেও হামিদা বেগমের প্রশ্নের শূল থেকে নিজেকে কিছুতেই ছাড়তে পারছে না সে। সকলের অলক্ষ্যে সে একবার টেডি বিয়ার হাতে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা টুইংকেলের দিকে তাকালো।জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটি।ওর ডাগর চোখের কোণে ভয়ের ছায়া স্পষ্ট।
ঝুমার মুখেই সে শুনেছে মেয়েটি বড্ড ভীত। কেননা মায়ের মৃত্যুর পর টুইংকেলের সার্বক্ষণিক দেখার দায়িত্ব যার উপর বর্তেছিল সেই পরিচারিকাটির শারীরিক নি’গ্র’হের ক্ষ’ত আজও টাটকা টুইংকেল এর ছোট্ট দেহে। তাই হয়তো অযাচিত কারণেই ভয় পাচ্ছে মেয়েটি।তৃষা অগোচরে মুচকি হেসে আশ্বস্ত করল তাকে অতঃপর হামিদা বেগমের দিকে তাকিয়ে একদম ‌অকুণ্ঠচিত্তে সে বলল,,

—-‘বিশেষ কিছু না চাচীমা, আসলে ওই যে ড্রয়িংরুমের বড় ফুলদানিটা সরাতে গিয়েই বিপত্তি। অসাবধানতাবশত কোণটা লেগে গেছে। এই আর কী!
তৃষার কথাগুলো বিশ্বাসযোগ্য হলো না হামিদা বেগমের কাছে,তাঁর অনুসন্ধিৎসু চোখ দুটো একবার তৃষার দিকে আর একবার ত্রস্ত টুইঙ্কেলের দিকে ঘুরে এল,,
—‘ সত্যি তো?
—‘জ্বী।
হামিদা বেগম আরো কিছু প্রশ্নের ফের পুনরাবৃত্তি করতে উদ্যত হতেই পাশ থেকে সাবরিনা সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললো,

—‘উফ আম্মু ইদানিং তোমার ওকালতির স্বভাবটা বড্ড বেড়েছে। তুমি কি এখানে ভাবির খোঁজখবর নিতে এসেছ না নাকি তাকে প্রশ্ন করে ভরিয়ে দিতে?
হামিদা বেগম মেয়ের কথায় বাধা দিতে যেতেই পাশ থেকে মৃত্তিকা ফের বলল,,—‘হ্যাঁ আম্মু রাখোতো।
অতঃপর সে তৃষার দিকে তাকিয়ে বলল,,—‘চলো তো ভাবি, শুনেছি তুমি অনেক ভালো পাস্তা বানাও। আমার ফেভরিট,চলো একটু বানিয়ে খাওয়াবে।
তৃষা মৃদু হেসে বলল,,—‘একটু একটু পারি,আচ্ছা চলো।
তারপর দুজন মিলেই চটজলদি পা বাড়ালো কিচেনের দিকে। হামিদা বেগমের হাজারটা কথার হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পেরেই হাপ ছেড়ে বাঁচল তৃষা। মনে মনে হাজারবার ধন্যবাদ জানালো সাবরিনা আর মৃত্তিকাকে।

দুপুরের তীব্র রৌদ্র দহন তখন স্তিমিত হয়ে এসেছে। কিছুটা ম্লান রৌদ্ররকিরণ তপ্ততা ছড়াচ্ছে ধরণী জুড়ে। দুপুরের রান্নাবাড়া সেরে একদম ফ্রেশ হয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়েছে তৃষা। অতঃপর ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়ালো সে, বাইরের ম্লান রোদটা জানলার কাঁচ ছুঁয়ে ওর ঘরে এসে পড়েছে। আয়নায় একঝলক নিজের প্রতিচ্ছবিটা দেখে একবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। কপালে ব্যান্ডেজটা এখনো একটু টনটন করছে।ভেজা চুলগুলো তৎক্ষণাৎ হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে দ্রুত শুকিয়ে সে পা বাড়ালো নিচের দিকে।

ত্রিশ বছরের চৌকষ নেভি ক্যাপ্টেন আর্য এহসান। সুঠামদেহের অধিকারী আর্যর তীক্ষ্ণ চোয়ালে ‌সর্বদাই পেশাদারী গাম্ভীর্য বিদ্যমান।কাল ‌নিজের অজান্তেই সে একটু বেশি কঠোর হয়ে পড়েছিল তার ছোট্ট মেয়েটির ওপর। যে শাসন স্নেহের আবরণে ঢাকা থাকার কথা ছিল, তা আচমকাই রূঢ় কর্তব্যের আঘাতে বড় বেশি কড়া হয়ে বিঁধেছে।
তাই নিজের অনুশোচনা থেকেই সে ঠিক করলো এই ফাঁকা সময়টাতে একবার মেয়েটার সাথে কথা বলবে সে উদ্দেশ্যেই তৎক্ষণাৎ পাশ থেকে ফোনটা তুলে ডায়াল করলো পরিচিত নম্বরে।

দুপুরের খাবারের তোড়জোড়। এমনিতেই বেলা চড়ে গিয়েছে বিলম্ব রান্নার দরুণ। তাই ব্যস্ত হাতে তৃষা তড়িঘড়ি খাবার সাজাচ্ছে টেবিল জুড়ে। হঠাৎ কিছুটা দূরত্বে অবস্থিত ল্যান্ডফোনটা বেজে উঠলো। একটানা কর্কশ শব্দে চারপাশটা যেন কেঁপে উঠছে। ঝুমাকে একবার ডাকলো তৃষা তবে আশেপাশে ঝুমাসহ সবাই অনুপস্থিত দেখে তৃষাই দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল।
ভেজা হাতটা দ্রুত টিস্যু দিয়ে মুছে ‌রিসিভারটা কানে তুলে নিয়ে অতি মৃদু স্বরে বলল,
—‘হ্যালো আসসালামু আলাইকুম।
ভেসে আসা মেয়েলী সুরেলা কন্ঠটায় এক মিনিটের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল গম্ভীর ক্যাপ্টেন আর্য এহসান। পরক্ষণেই ভ্রুকুটিপূর্বক চোয়াল শক্ত করে প্রশ্ন ছুঁড়ল,,

—-‘ঝুমা?
একগুচ্ছ কেশরাজ অবাধ্য হয়ে ললাটে লুটিয়ে পড়েছে তৃষার। বাতাসের ছন্দে সেগুলো নৃত্য করছে অবাধ্য প্রেমিকের ন্যায়, আর তাতেই কিছুটা বিরক্ত তৃষা। ব্যস্ত হাতে সেগুলো কানের পিছে গুঁজতে গুঁজতে সে বলল,
—‘না আমি তৃষা।
তৃষা নামটা কর্ণকুহরে পৌঁছাবামাত্র থামলো আর্য। স্তব্ধ নির্বাক সে দৃষ্টিতে অতিবাহিত হলেও বেশ কিছুটা সময়। অপর পাশ থেকে তখনো ভেসে আসছে কিছু প্রশ্নাত্নক শব্দ,,—‘কে বলছেন? আরে ফাইজলামি করেন নাকি? ধুর রাখুন তো!
একা একা কথাগুলো বলেই ফোন কেটে দিল তৃষা। তৃষা ফোন কেটে দিতেই আর্যর মুখাবয়াবে ফের গাম্ভীর্য ফুটে উঠলো, সেও কিছুটা বিরক্ত হয়ে ফোনটা ছুড়ে মারল বিছানায়, আনমনে উচ্চারণ করলো,,
—‘ড্যাম ইট!

মধ্যাহ্নভোজন সেরেই এই বিদায় নিয়েছেন হামিদা বেগমরা। পুরো বাড়ি জুড়ে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা তৃষা তখন মাত্রই ডাইনিং টেবিলের কাজ শেষ করে গুছিয়ে উঠতে যাচ্ছিল। হঠাৎ ওর মনে হলো, কেউ একজন ওর পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। খুব সন্তর্পণে, যেন নিশ্বাসের শব্দটুকুও কেউ শুনতে না পায়।
তৃষা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, দরজার আড়ালে অর্ধেক শরীর লুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট টুইংকেল। ওর সেই নীলাভ চোখ দুইটির ডাগর ডাগর দৃষ্টিতে এখনও রেশমি কুয়াশার মতো একরাশ বিস্ময় আর জড়তা। হাতে সেই প্রিয় টেডি বিয়ারটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আছে সে।
তৃষা আলতো হেসে ডাকল,,
—‘কী হয়েছে সুইটি?ওখানে দাঁড়িয়ে কেন? এসো আমার কাছে।
টুইংকেল ধীর পায়ে এগিয়ে এল। ওর ছোট্ট পা ফেলার শব্দও যেন কার্পেটে হারিয়ে যাচ্ছে। তৃষার একদম কাছে এসে দাঁড়াল সে। কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে থাকার পর হঠাৎ মুখ তুলে চাইল। ওর সেই মায়াবী কন্ঠে ভাঙা ভাঙা স্বরে প্রশ্ন করল,,

—-‘তুমি আমায় বাঁচালে কেন?
তৃষা অবাক হওয়ার ভান করে;কপালে লেপ্টে থাকা ব্যান্ডেজটাতে আঙুল ছুঁইয়ে স্মিত হেসে বলল,,,
—‘কই বাঁচালাম? আমি তো সত্যিটাই বললাম।
টুইংকেল মাথা নাড়ল। ওর চোখের মণি দুটো চিকচিক করছে,,
—‘না, তুমি মিথ্যা আবার বলেছ। ফুলদানি তা তো আমি তোমার মাথায় মেরে ছিলাম, তাহলে তুমি কেন আমায় বাঁচালে? তোমার তো অনেক লেগেছে, তাই না?
তৃষা এবার ডাইনিং চেয়ার ছেড়ে হাঁটু মুড়ে বসল মেঝেতে। ঠিক টুইংকেলের উচ্চতায়। ওর তুলতুলে গাল দুটো যেন লাল আপেলের মতো হয়ে আছে। তৃষা আলতো করে টুইংকেলের কচি হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিল। একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে ওর নিষ্পাপ চেহারার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। পৃথিবীর সব পবিত্রতা যেন এই ছোট মেয়েটার চোখে মুখে মাখানো।
অতঃপর খুব নরম সুরে বলল,,

—-‘উঁহু, একটুও লাগেনি। জানো তো টুইংকেল, পৃথিবীতে কিছু কিছু চোট থাকে যা অন্যকে বাঁচানোর আনন্দে নিমেষেই সেরে যায়। আমি না হয় একটু বকা খেতাম, কিন্তু তোমার ওই ছোট্ট মনে ভয় দানা বাঁধলে আমার খুব কষ্ট হতো।
টুইংকেল স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। এই বাড়িতে ওর জন্য শাসন আছে, নিয়ম আছে, এমনকি একাকীত্বের পাহাড়ও আছে। কিন্তু এমন নিঃস্বার্থ আগলে রাখার মানুষ বোধহয় খুব একটা দেখেনি সে। ও অস্ফুট স্বরে বলল,,
—‘কিন্তু কেন? তুমি তো আমায় চেনো না ঠিক করে। আর আমি তোমাকে ব্যথাও দিয়েছি।
তৃষা টুইংকেলের নাকের ডগায় আলতো করে একটা টোকা দিল। তারপর মিষ্টি হেসে বলল,
—–‘আরে! ফ্রেন্ড তো ফ্রেন্ডের জন্য এটুকু করেই। তাই না?
টুইংকেলের চোখ দুটো বিস্ময়ে ছানাবড়া হয়ে গেল। টেডি বিয়ারটা বুকের সাথে আরও জোরে চেপে ধরে সে শুধাল,,
—‘তুমি… তুমি আমার ফ্রেন্ড? সত্যি?
তৃষা ওর দুই কান টেনে দিয়ে বলল,,

——‘অবশ্যই! এখন যদি তুমি রাজি হও, তবে আমরা আজ থেকেই বেস্ট ফ্রেন্ড। কী বলো, হবে নাকি ফ্রেন্ডশিপ?
টুইংকেলের মুখে এতক্ষণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। মেঘলা আকাশে এক চিলতে রোদ্দুর উঠলে যেমন দেখায়, ওর হাসিটা ঠিক তেমনই স্নিগ্ধ। ও লাজুক ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলল,
—-‘আচ্ছা, তাহলে আমরা ফ্রেন্ড। পাক্কা ফ্রেন্ড!
তৃষা হাসল। ওর মনে হলো, কপালে ওই সামান্য আঘাতটার বিনিময়ে ও এক টুকরো জান্নাত খুঁজে পেয়েছে এই বাড়িতে। টুইংকেল হঠাৎ ওর ছোট ছোট হাত দুটো দিয়ে তৃষার গাল ছুঁয়ে দিল। পরম মমতায় তৃষা ওকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরল। বাইরে তখন সন্ধ্যা নামছে, আর সুখনীড়ের চার দেয়ালে এক নতুন সম্পর্কের বীজ অঙ্কুরিত হচ্ছে।

সন্ধ্যাটা আজ সুখনীড়ের দেয়ালগুলোতে এক নতুন রঙের প্রলেপ বুলিয়ে দিয়ে গেল। যে মেয়েটি সারাদিন নিজের ভেতরে এক দুর্ভেদ্য দেয়াল তুলে বসে থাকত, সেই ছোট্ট টুইংকেল আজ তৃষার আঁচল ছাড়তেই চাইছে না। আগন্তুক তৃষা যে কখন তার একাকীত্বের মরুভূমিতে এক পশলা বৃষ্টির মতো নেমে এসেছে, তা সে নিজেও হয়তো বুঝতে পারেনি।
টুইংকেলের সেই অবিশ্বাসের মেঘগুলো তৃষার স্নেহের পরশে যেন শরতের শুভ্র কাশবনের মতো হালকা হয়ে মিলিয়ে গেল। যে শিশুটি কাউকে বিশ্বাস করতে ভয় পেত, যার কাছে বড়দের শাসন মানেই ছিল এক আতঙ্কের নাম, আজ সে তৃষার কোলের ওমে খুঁজে পেয়েছে পরম নির্ভরতা।এই অল্প ক’ঘণ্টার আলাপেই তাদের মধ্যে এক অদৃশ্য বন্ধুত্বের সেতু তৈরি হয়ে গেল, যা বছরের পর বছর পাশে থেকেও অনেকে গড়তে পারে না।

রাত তখন অনেকটা গভীরে। চারদিকের নিস্তব্ধতা চিরে কেবল ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। টুইংকেলকে ঘুম পাড়িয়ে তৃষা নিজের রুমে ফিরেছে কিছুক্ষণ আগে।এ অজানা নিস্তব্ধতা সুখনীড়কে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। এমন সময় আবারো ফোন দিলো আর্য। তবে এবার আর ল্যান্ডফোনে নয়, ঝুমার মোবাইল ফোন মারফত সে কল করল তার কলিজার টুকরো টুইংকেলের কাছে।
ঝুমা ঘুমন্ত টুইংকেলের মাথার কাছে বসে সস্নেহে হাত বুলিয়ে ওর ঘুম ভাঙালো, টুইংকেল চোখ কোচলে ঘুমঘুমভাবে ঝুমার দিকে তাকাতেই ঝুমা ওর হাতে তুলে ফোন খানা সঙ্গে সঙ্গে ওপাশ থেকে আর্যর সেই গম্ভীর অথচ স্নেহার্দ্র কণ্ঠস্বর ভেসে এল,,

—-‘মাম্মাম? ঘুমিয়ে পড়েছিলে?
বাবার কণ্ঠস্বর কানে পৌঁছাতেই টুইংকেলের দুচোখের ঘুম এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল। ফোনের ওপাশে বাবার গলা পেয়ে সে ধড়ফড় করে উঠে বসল। ঝুমা ওর পিঠে আলতো করে বালিশ দিয়ে হেলান দিয়ে বসিয়ে দিল।টুইংকেল ফোনের স্পিকার অন করে উত্তেজনায় আধো-আধো স্বরে বলতে শুরু করল,,
—‘পাপা! তুমি জানো আজকে কী হয়েছে? আমি না একজন নতুন বেস্ট ফ্রেন্ড পেয়েছি!
আর্য ওপাশে মৃদু হাসল। মেয়ের কন্ঠে এত আনন্দ এতটা উচ্ছ্বাসিত হয়ে মেয়েকে কথা বলতে অনেকদিন পর শুনছে সে। সে কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,,

—‘তাই নাকি মাম্মাম? কে তোমার সেই নতুন বন্ধু?নাম কী ‌তার?
টুইংকেল খিলখিল করে হেসে উঠল। তারপর রহস্য করে বলল,,
—‘তার নাম হলো বানি! জানো পাপা? সে না একদম ম্যাজিকের মতো।সে খুব সুন্দর করে হাসে, আর আমাকে অনেক আদর করে। এমনকি বড়রা যখন আমাকে বকা দিচ্ছিল, তখন বানি-ই আমাকে বাঁচিয়েছে।
আর্যর কপালে কিছুটা ভাঁজ পড়ল। সে কিছুটা অবাক হলেও কিছুটা শান্ত স্বরে শুধাল,,
—‘বানি? এটা কেমন নাম মাম্মাম?
টুইংকেল উৎসাহ নিয়ে বলতে লাগল,,

—‘সে দেখতে খুব সুন্দর পাপা! একদম আমার ফেভারিট র‍্যাবিট টেডিটার মত।আর তুমি জানো?সে আমাকে বলেছে যে সে আমার ফ্রেন্ড হবে। আর আমি ওর কপালে ব্যথা দিয়েছিলাম যে কারণে তুমি আমাকে বকছিলে, যেন ও কিন্তু একটুও কাঁদেনি। শুধু আমার জন্য সে মিথ্যা বলেছে যাতে কেউ আমাকে বকা না দেয়। আমি ওকে খুব ভালোবাসি পাপা। ও না থাকলে আজ আমি খুব ভয় পেতাম।
আর্য ওপাশে নিশ্চুপ হয়ে সব শুনছিল। তার মনে পড়ে গেল দুপুরে ফোনে শোনা সেই কোকিল কণ্ঠা ‌অপরিচিত‌ রমণীটির কথা। টুইংকেল থামল না, সে অনর্গল তৃষার গুণগান গাইতে লাগল,,
—‘আচ্ছা পাপা, তুমি কবে আসবে? তুমি আসলে আমি তোমাকে আমার বানি-র সাথে পরিচয় করিয়ে দেব। সে কিন্তু অনেক ভালো পাস্তাও বানাতে পারে!
আর্যর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল, কিন্তু পরক্ষণেই সেই পেশাদারী গাম্ভীর্য ফিরে এল। সে নরম গলায় বলল,,
—‘আচ্ছা মাম্মাম, খুব জলদি আসব। তোমার বানি-কে আমার পক্ষ থেকে থ্যাংক ইউ বলে দিও। এখন অনেক রাত হয়েছে, ঘুমিয়ে পড়ো।

—‘আচ্ছা পাপা!
ফোনটা বিছানায় রেখে আর্য একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কেবিন জানালার বাইরে অসীম অন্ধকার সমুদ্র, শুধু ইঞ্জিনের একটানা গুরুগম্ভীর শব্দ আর ঢেউয়ের আছড়ে পড়ার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে।​এই মুহূর্তে আর্য এহসান আটলান্টিক মহাসাগরের গভীরে একটি অত্যন্ত জটিল সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ মিশনের নেতৃত্বে আছে।
প্রবল নিম্নচাপের কবলে পড়ে একটি বাণিজ্যিক জাহাজের ইঞ্জিন বিকল হয়ে গেছে, আর সেই জাহাজে থাকা পনেরোজন ক্রু-মেম্বারকে উদ্ধার করাই এখন আর্যর মূল লক্ষ্য। মাঝসমুদ্রে বাতাসের গতিবেগ বাড়ছে, উত্তাল ঢেউগুলো যেন একেকটা পাহাড়ের মতো ফণা তুলছে। কিন্তু ক্যাপ্টেন আর্যর চোখেমুখে কোনো ক্লান্তি নেই, বরং এক ধরনের ইস্পাতকঠিন সংকল্প।
​কেবিনের দরজা নক করে ভেতরে প্রবেশ করল আর্যর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড।

—‘স্যার, বাতাসের গতিবেগ আরও বাড়ছে। লাইফবোটগুলো নিয়ে এগোতে সমস্যা হতে পারে।
​আর্য উঠে দাঁড়াল। তার নেভি ইউনিফর্মের গাম্ভীর্য অন্ধকারেও স্পষ্ট। সে শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় বলল,
— ‘যেকোনো মূল্যে আমাদের ক্রু-মেম্বারদের কাছে পৌঁছাতে হবে। লাইফ লাইন সেট করো এবং হেলিকপ্টার স্কোয়াড্রনকে স্ট্যান্ডবাই থাকতে বলো। আমরা কাউকে মাঝসমুদ্রে ফেলে যাব না।
​ডেকের ওপর এসে দাঁড়াল আর্য। নোনা বাতাস আর বৃষ্টির ঝাপটা এসে লাগছে তার তীক্ষ্ণ চোয়ালে। চারপাশে সার্চলাইটের আলো আঁধারি ফুঁড়ে পথ খুঁজছে। তবে প্রতিকূলে পরিবেশের মাঝেও মস্তিষ্কের বারংবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে মেয়ের উচ্ছ্বাসিত কণ্ঠস্বর। হৃদয়ের নিভৃত কোনে বারংবার প্রশ্ন জাগাচ্ছে তৃষা নামক মেয়েটি যে তার মেয়েকে নতুন করে বাঁচতে শেখাচ্ছে।

পরদিন সকালে সুখনীড়ের ড্রয়িংরুমে ভোরের আলো ফুটতেই এক নতুন প্রাণচঞ্চলতা দেখা গেল। সাধারণত যে সকালে টুইংকেলকে বিছানা থেকে তোলাটাই একটা যুদ্ধ ছিল, আজ সেখানে চিত্রটা একদম ভিন্ন।তৃষা আজ একটু সকাল সকালই তৈরি হয়ে নিয়েছে। হালকা নীল রঙের একটা সুতি সালোয়ার কামিজ, হাতে কয়েকটা রুপোলি চুড়ি। ডাইনিং টেবিলে বসে টুইংকেলকে নিজের হাতে ওটমিল খাওয়াচ্ছে সে। টুইংকেল আজ বেশ শান্ত, তৃষার প্রতিটা কথা সে মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছে।
তৃষা চামচ দিয়ে শেষ লোকমাটা খাইয়ে দিয়ে হাসিমুখে বলল,,
—‘গুড গার্ল! আমার কিউটি পাই তো দেখি আজ সবটুকু শেষ করে ফেলেছে। এখন চলো, চটপট ফ্রেশ হয়ে তোমার সেই কিউট ড্রেসটা পরে নাও।
টুইংকেল আবদারের সুরে বলল,,

—‘বানি, তুমি কি এখনই কলেজে চলে যাবে? আর একটু থাকো না।
তৃষা ওর নাকে আলতো করে একটা টোকা দিয়ে বলল,,
—–‘বেস্ট ফ্রেন্ডরা কি কখনও একে অপরকে ফাঁকি দেয়? আমি ক্লাস শেষ করেই তোমার জন্য চকলেট নিয়ে আসব, প্রমিজ! এখন জলদি রেডি হও সোনা নইলে তোমার বানির লেট হয়ে যাচ্ছে না?
—‘তোমার লেট হয়ে যাচ্ছে বানি?
—‘হুম সোনা।
টুইংকেল দ্রুত মুখে থাকা খাবারটা গিলে বলল,,—‘ওক্কে বানি তুমি যাও।আমি খেয়ে নিয়েছি।
তৃষা তাকে পরম মমতায় গুছিয়ে দিয়ে নিজের ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিল। বের হওয়ার আগে টুইংকেলের কপালে একটা চুমু খেয়ে বলল,,
—-‘টা-টা, লিটল র‍্যাবিট!

ঢাকা সিটি কলেজের ক্যাম্পাস তখন সরগরম। শরতের হালকা রোদ আর মেহগনি গাছের ছায়ায় ঘেরা রাস্তা দিয়ে তৃষা আপন মনে হাঁটছিল। হঠাৎ তার চলনে বিঘ্ন ঘটালো একজনের উপস্থিতিতে। করিডোরের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল সায়েম। সায়েম আবরার তাদের ডিপার্টমেন্টের দুই ইয়ার সিনিয়র। মেধাবী ছাত্র হিসেবে সুনাম থাকলেও তার ব্যক্তিত্বে একটা চাপা অহংকার আর জেদ আছে। ক্যাম্পাসের অনেক মেয়েই সায়েমের প্রতি দুর্বল, কিন্তু সায়েমের নজর কেন জানি এই জেদি মেয়েটার উপর এসেই থেমেছে।
সায়েম ধীর পায়ে তৃষার সামনে এসে দাঁড়াল। ঠোঁটে তার পরিচিত সেই বাঁকা হাসি।
—‘কী ব্যাপার তৃষা? আজ তোমাকে বেশ ফ্রেশ লাগছে। বাট….কপালে ওটা কীসের ব্যান্ডেজ?
তৃষা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে একটু পিছিয়ে দাঁড়াল। সায়েমের এই অতি-উৎসাহ তার ভালো লাগে না। সে মৃদু স্বরে বলল,,

—‘তেমন কিছু না।ওই ছোটখাটো একটা অ্যাক্সিডেন্ট।
সায়েম তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তৃষার চোখের দিকে তাকাল। যেন সে সত্যটা পড়ে নিতে চায়। সে পকেট থেকে একটা চকলেট বের করে তৃষার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,,
—‘ব্যথাটা কি খুব বেশি? একটু সাবধান হবে না তুমি? তোমার কিছু হলে আমার… আচ্ছা থাক আর সাবধানে থেকো।
তৃষা অস্বস্তিতে চকলেটটা নিলো না। সে কাষ্ঠ হাসি হেসে বলল,,
—‘ধন্যবাদ, কিন্তু আমার এখন ক্লাস আছে। আসি।
তৃষা দ্রুতপায়ে ভিড়ের মাঝে মিশে গেল। সায়েম তৃষার যাওয়ার পথের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আনমনে মুচকি হেসে মনে মনে বিড়বিড় করল,,

—-‘এতটা অবহেলা ভালো নয় ডিয়ার তৃষা। যাকে সায়েম পছন্দ করে, তাকে সে নিজের করেই ছাড়ে।
তৃষা ক্লাসরুমে ঢুকে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। সায়েমের এই আচরণ তাকে দিন দিন ভাবিয়ে তুলছে। তার প্রতি সায়েমের এমন অনাকাঙ্ক্ষিত আকর্ষণ প্রথম দিন থেকেই টের পেয়েছে সে। তাই সায়েমের উপস্থিতিতেও অস্বস্তি কাজ করে তার। ভাবতে ভাবতেই তৃষা বসলো মেহেসানার পাশে। মেয়েটা বরাবরের ন্যায় আজও জায়গা ধরে রেখেছিল।

ক্লাস শেষ হয়েছে, সবুজাবৃত উদ্যানে বসেই গল্প করছিল মেহেসানা আর তৃষা।আপাদমস্তক স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড তৃষার জীবন বিভিন্ন বিচিত্র অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেলেও ছেলে সঙ্গ নামক জিনিসটির সংজ্ঞা সে জানেনা বললেই চলে। বড় ভাইয়ের কঠোর নিবিড়তা তাকে সে বিষয়ে তেমন উৎসাহী হয়ে ওঠার সুযোগ ও দেয়নি। তবে গুটিকয়েক বাল্য সখী ছিল তার চঞ্চল জীবনের সঙ্গী। তবে তাদের মাঝে এখনো অব্দি তার সঙ্গে মেহেসানাই বর্তমান।
দুটিতে মিলে মাঠের মাঝেই বাদাম চিবতে চিবতে খোশ গল্পে মেতেছে। মেহেসানা তৃষার মুখের টুইংকেল এর জীবন কাহিনীর বর্ণনা শুনেই বাদাম চিবোতে চিবোতে বলল,,
—-‘আসলো মেয়েটা এটুকু বয়সেই এত বিচিত্র অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গেছে। শি হ্যাজ অ্যা ডিফারেন্ট টাইপ অফ এক্সপিরিয়েন্স তৃষ।

—‘হু, তবে তুই মেয়েটাকে না দেখলে বিশ্বাস করবি না ট্রাস্ট মি মেয়েটা একদম খরগোশের মত তুলতুলে। একটা মজার জিনিস কি জানিস ও আমাকে বানি বলে ডাকে।
—‘উম.. বানি কেন?
—-‘অ্যাকচুয়ালি ওর মতে আমি নাকি খরগোশ এর মত তাই।
মেহেসানা হেসে ফেলল,,—‘আচ্ছা একদিন আনিস তো টুইংকেল কে। তোর বর্ণনা শুনেই তো আমার দেখতে ইচ্ছা করছে ওকে।
—–‘আচ্ছা আনব না হয় দেখিস কি তুলতুলে আর আদুরে ও।
—‘আচ্ছা আনিস।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে মেহেসানা ফের বলল,,—‘টুইংকেলের কথা তো বুঝলাম কিন্তু তোর হাজবেন্ড।
তৃষা ভ্রু কুঁচকে বলল,,—‘হাজবেন্ড মানে?
—‘ক্যাপ্টেন?
—-‘দেখ মেহু, ফার্স্ট অফ অল এ সম্পর্ক নিয়ে নাতো আমার কোন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আছে না তো ওনার। আর সবচেয়ে বড় কথা আমি কোন দিন ওনাকে দেখি নি অব্দি। আর উনিও আমাকে দেখেননি। তো আমাকে ওনার ওয়াইফ বলবি না।

—-‘ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড তৃষ তোরা কেউ কাউকে কখনো দেখিস বা ভবিষ্যতের কোনো পরিকল্পনা করিস কিন্তু তোরা এখন ম্যারিড। তিন কবুলের পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ তোরা। সো এখন এই টাইপ কথা বলিস না প্লিজ।
তৃষা সেখান থেকে উঠতে উঠতে বলল,,—‘আ’ম নট ইন্টারেস্টটেড, স্পেশালি ইন দ্যিস টপিক।আর আমি টুইংকেলকে প্রমিস করে এসেছি দ্রুত ফিরতে হবে সো বাই।
তৃষা আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। কাঁধের ব্যাগটা ঠিক করে নিয়ে দ্রুত পায়ে গেটের দিকে এগিয়ে গেল। মেহেসানা বসে রইল সেই সবুজ মাঠেই। তার হাতে থাকা অর্ধেক চিবানো বাদামগুলো অবহেলায় ঘাসের ওপর পড়ে রইল। সে তৃষার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
মেহেসানা মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,,

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩

—‘তোর এই পালানোর স্বভাবটাই একদিন তোকে বিপদে ফেলবে তৃষ। তুই মানিস আর না মানিস, আই থিঙ্ক তোর অদেখা ক্যাপ্টেনই হয়তো তোর জীবনের বেস্ট চ্যাপ্টার হয়ে লেখা আছে।

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৫