Home বিষাক্ত প্রেমের অনুভূতি বিষাক্ত প্রেমের অনুভূতি পর্ব ১৫ (২)

বিষাক্ত প্রেমের অনুভূতি পর্ব ১৫ (২)

বিষাক্ত প্রেমের অনুভূতি পর্ব ১৫ (২)
Muntaha jahan

“ভালোবাসা না পাওয়া মানুষ গুলো বরাবরই ভালোবাসার কাঙাল হয়। তাদের কাছে সবকিছুর উর্ধে ভালোবাসা হয়। কারো একটু ভালোবাসা পাওয়ার জন্য তারা সবকিছু করতে পারে। ছোট বেলা থেকেই নিজের মামার কাছে আমেরিকার বড় হয়েছে এ্যাশ। না কখনো মায়ের ভালোবাসা পেয়েছে আর না বাবার। মামা ও কখনো ভালোবাসে নি। উল্টো অত্যাচার করতো। ঠিক মতো খেতে দিতো না মারতো। ৫ বছরের এ্যাশ তখন গগন কাপিয়ে চিৎকার করে কাঁদতো। সেই কান্নায় কারো মন গলতো না। উল্টো ওর কান্না থামাতে আরো মারা হতো ওকে। এক সময় মার খেয়েই ঘুমিয়ে পড়তো। রাত হলে মা বাবার কথা মনে পড়তো। মনে পড়তো মায়ের সেই কান্না ভেজা মুখ আর বাবার বিরক্ত মুখর চেহারাটা। তাকে আমেরিকা না পাঠানোর জন্য তার মা তার বাবার পায়ে পড়েছে তবুও তিনি মানেন নি। তার মামাকে দিয়ে এ্যাশকে পাঠিয়ে দিয়েছেন আমেরিকা।

সেই থেকেই বাবার প্রতি এক আকাশ সমান ঘৃণা অভিমান এ্যাশের। আর আজকে সেটা দিগুণ হলো।
ফুল স্পিডে গাড়ি চালাচ্ছে এ্যাশ। পাশে ফাহাদ শান্ত দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলে ও তার মনে ঝড় চলছে। এ্যাশের হঠাৎই এয়ারপোর্ট থেকে আবার বাড়ির পথে গাড়ির গড়ানোর কারণটা কিছুতেই বুঝতে পারছে না। বারবার জিজ্ঞেস করছে তবুও এ্যাশ কিছু বলছে না। ফাহাদের মনে চিন্তার বাসা বাঁধছে বাড়িতে আরাবীর কিছু হয় নি তো? এ্যাশ আগের বার যখন দেশে এসেছিলো তখন তার পুরো বাড়ি গিড়ে বডিগার্ড রেখেছে লুকিয়ে। বাড়িতে কিছু হলে সেই খবর এ্যাশ ফাহাদ দুজনের কাছেই আসে। তারা যদি কিছু বলতো তাহলে তো ফাহাদের কাছেও খবর আসতো। তাহলে এ্যাশ কার কাছ থেকে কি খবর পেয়ে এমন করছে?

এ্যাশদের বাড়ি থেকে এয়ারপোর্টের দুরত্ব অনেক । ফ্লাইট ২ টায় এয়ারপোর্টে আসবে। এ্যাশ ফাহাদ তাড়াতাড়ি করেই এসেছিলো। ভেবেছিলো এয়ারপোর্টে বসে থাকবে। কিন্তু এয়ারপোর্টে ডুকার আগেই এ্যাশের ফোনে একটা কল আসে যার পরই থেকেই এ্যাশ চোয়াল শক্ত করে গাড়ি ঘুরিয়ে আবার বাড়ির পথ নেয়। ফরহাদ এতোবার ডাকে একবার ও সাড়া দেয় না। ফাহাদ একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে এ্যাশের থেকে চোখ সরিয়ে সামনে থাকায়। আর ১০ মিনিট তার পরই খান বাড়ি। ১ ঘন্টা রাস্তা আধা ঘন্টায় অতিক্রম করলো এ্যাশ। এতো জোরে গাড়ি চালিয়েছে যদি একটু এদিক থেকে অধিক হতো তাহলেই সবকিছু শেষ হতো। কিন্তু ফাঁকা রাস্তা থাকায় সুবিধা হলো।
আরাবী তাহার শাড়ি চেঞ্জ করিয়ে বিয়ের একটা শাড়ি পড়িয়ে রেডি করে নিচে নিয়ে আসলো। তখন আহান এসে তাহাকে এখনই বিয়ে করবে শুনেই নিজের ভাইকে ফোন দিয়ে সব জানিয়েছে আরাবী। আরাবী ভেবেছিলো শুধু দেখেই চলে যাবে তাই এ্যাশকে কিছু জানায় নি। কিন্তু এখন দেখলো বিষয় উল্টো তাই আর কিছু ভাবার অপেক্ষায় রইলো না ফোন করে সব বললো এ্যাশকে। এ্যাশ যাতে আসতে পারে তারজন্য ই তাহাকে আধা ঘন্টা লাগিয়ে শাড়ি পড়িয়ে আনলো। কিন্তু এখনো এ্যাশের খবর নেই তাতে বেশ চিন্তিত হচ্ছে সে।

ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে আছে আহান,আহানের মা,আহানের বাবা আর মিনাল খান। নিহান খান আর শিফা বেগমকে মিনাল খান পরিকল্পনা করে সকালে শিফা বেগমের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। তাই তারা এখানে উপস্থিত নেই। আরাবী তাহাকে সোফায় আহানের পাশাপাশি বসিয়ে সবাইকে পরক করে দরজার দিকে তাকালো এ্যাশের কোনো খবর নেই।
আহান তাহার রেজিস্টি হবে তাই উকিল কাগজ পএ সবকিছু ঠিকঠাক করছে।
আহান উকিলের থেকে চোখ সরিয়ে তাহার দিকে তাকালো। তাহার মাথায় ঘোমটা দেওয়া পড়নে লাল বেনারসি মুখে হালকা মেকাপ কাঁচের চুড়ি খুলে দুই জোড়া বালা পড়ানো হয়েছে তাহাকে। আহান সবকিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো। তাহার কানে কানে ফিসফিস করে বললো
–মাশাল্লাহ মাশাল্লাহ। আমার জানকে অনেক বেশিই সুন্দর দেখাচ্ছে। আচ্ছা তুমি এতো সেজেছো কেনো বলো জান?তুমি কি আমার জান নিতে চাইছো?
কথাটা বলেই ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো। তাহার কাঁপতে থাকা হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় পুড়লো। তাহা নিরু উওর। কিছু বললো না। নিচের দিকে তাকিয়ে চুপ করে বসে থাকলো।
উকিল কাগজ পএ ঠিক করে আহানের দিকে এগিয়ে দিয়ে সাইন করতে বললো। আহান তাহার হাত বা হাতে ধরে ডান হাতে কলম নিয়ে ফটাফট সাইন করে এগিয়ে দিলো তাহার দিকে। তাহার হাতটা এখন ছেড়ে সেখানে কলম ধরে দিলো। শান্ত কন্ঠে আস্তে করে বললো

–সাইন করো পাখি।
কাঁপা হাতে কলম ধরে কাগজ গুলোর দিকে তাকিয়ে রইলো তাহা। এরকম একটা কাগজেই তো সাইন করে নিজেকে এ্যাশের মালিকানায় বন্ধি করেছে। যেখান থেকে এখনো ছাড়া পায় নি। তাহলে আজকে কি করে আবার ও এসব কাগজে সই করছে ও? সে যে বিবাহিত এটা কি ভুলে যাচ্ছে?
আরাবী দূর থেকে তাহার হাতের দিকে তাকিয়ে রইলো। হাতটা অনবরত কাঁপছে। তাহার চোখে জল নেই অথচ মুখটা মলিন। মেয়েটা সবার সামনে কাঁদে না এটা জানে আরাবি। নিজেকে শক্ত রাখছে ও কিন্তু আসলেই কি শক্ত আছে ও?
আহান তাহার বাহুতে চাপ দিতেই চোখ বন্ধ করলো তাহা। চোখের সামনে ভাসলো এ্যাশের গম্ভীর সেই চাহনী। অনেক দূর থেকে গম্ভীর দৃষ্টিতে সে তাহার দিকেই তাকিয়ে আছে। ভ্রু দুটো কিঞ্চিৎ কুঁচকানো। সময় নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে এ্যাশ এগিয়ে আসছে তার দিকে একেবারে সামনে এসে দাঁড়াতেই তাহার হুস আসে। চোখ মেলে তাকায়। বাহুতে চাপ দিয়ে রাখা মালিকের দিকে তাকাতেই অগ্নি দৃষ্টির সাথে দেখা হয়। ভয়ে মৃদু কেঁপে উঠে তাহা। চোখ নামিয়ে আরাবীর দিকে তাকিয়ে লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে সাইন করতে এগুয়।

কাঁপা হাতে সাইন করতে নিতেই হঠাৎই বিকট শব্দে কেঁপে উঠে তাহা। সামনে থাকা কাগজটা রক্তে লাল হয়ে গেছে। তাহা সেটা দেখেই হাতের কলম ফেলে লাফিয়ে উঠে। আশেপাশে তাকাতেই দেখে সবাই সম্বিত হয়ে মেইন দরজার দিকে তাকিয়ে। তাদের দেখাদেখি তাহা ও তাকায়। তাতেই ভয় আরো দিগুণ হয় তাহার।
এ্যাশ বন্দুকটা তার দিকে ঘুরিয়েই দাঁড়িয়ে আছে। চোখ দুটো অসম্ভব লাল। কপালের রঙ গুলো রাগে ফুলে উঠেছে। অতিরিক্ত রাগে এ্যাশের হাতটা ও মৃদু কাঁপছে।
পাশ থেকে কারো গোঙানির শব্দে এ্যাশের থেকে চোখ সরিয়ে পাশে তাকায় তাহা। আহান বুকে হাত দিয়ে বসে হাতটা রক্তে লাল।। আহানের মা বাবা আহানকে ধরে আহাজারি করছে অথচ আহান এ্যাশের দিকে রক্ত চক্ষু নিয়ে তাকিয়ে আছে।
তাহা মাথা ঘুরিয়ে আবার এ্যাশের দিকে তাকানোর আগেই এ্যাশের থাবার শিখার হয়। এ্যাশ তাহার গলা চেপে ধরেছে। তাহাকে সোফায় ফেলে দুই হাতে চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বললো

–বান্দীর বাচ্চা ভয় নেই কলিজায়?জানোস না কে আমি? কি কি করতে পারি ধারনা নেই? রাগ দেখাই নি ভেবে ভেবেছিস ভালো হয়ে গেছি? মরার পাখা গজাইছে তোর? আমি থাকা সত্বেও আবার বিয়ে করতে বসেছিস? মরে গেছি আমি? চুপ করে আছিস কেনো বল? মরে গেছি?হি? মরে গেছি আমি?
এ্যাশের হাতটা ছুটানোর জন্য ছটফট করছে তাহা কিন্তু পারছে না। অনেক শক্ত করে চেপে ধরে আছে এ্যাশ।
আহান বুকে হাত রেখেই ছাড়া ছাড়া কন্ঠে বলে
–ও..ওকে ছাড় ছা..ছাড় বলছি। ও..ওকে ছুবি না কেউ।
তাহার থেকে চোখ সরিয়ে আহানের দিকে তাকায় এ্যাশ। ওকে এক পরখ করে আবার তাহার দিকে তাকায়। চোখ বন্ধ করে নিয়েছে তাহা। শান্ত হয়ে গেছে ছুটার জন্য ছটফট করছে না আর। এ্যাশ বাঁকা হেসে তাহার গলাটা আরো জোরে চেপে ধরলো। তবুও চোখ মেললো না তাহা। মুখটা সামান্য কুঁচকে নিলো। এ্যাশ আহানের দিকে তাকিয়ে বললো

–আমার বউকে আমি স্পর্শ করলে তোর কি? মরবি তুই? মরতে ইচ্ছে হচ্ছে? তারজন্যই আমার জিনিসের দিকে নজর দিয়েছিস? তোর চোখ না আমি উপড়ে ফেলবো।
কথাটা বলেই এ্যাশ তাহাকে ছেড়ে আহানকে চেপে ধরতেই দৌড়ে আসে ফাহাদ। এ্যাশের শক্তির সাথে পাড়া দায় তবুও কোনো রকমে ওকে ঠেলে সরিয়ে আনলো। আরাবী সেই সুযোগে তাহাকে বুকে জরিয়ে নিলো। টেনে তুলে নিয়ে আসলো ওখান থেকে।
এ্যাশ ফাহাদক ছাড়িয়ে আবার তাহার দিকে এগুতেই আরাবী কান্নারত কন্ঠে বলে উঠলো

–ভাইয়া প্লিজ ওকে মারিস না।ওর কি দোষ বল?ও তো পরিস্থিতির স্বীকার। প্লিজ থাম তুই ভাইয়া।
থেমে গেলো এ্যাশ। জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে তাহার দিকে তাকালো। রক্ত শূন্য চোখ নিয়ে তাহা আরাবীর বুকে পড়ে তার দিকেই তাকিয়ে। তাহার দিকে চোখ পড়তেই হঠাৎই বুক কেঁপে উঠলো এ্যাশের। মেয়েটার চেহারা এমন হয়ে আছে কেনো?দেখে মনে হচ্ছে দেহে প্রাণ নেই। কেমন নির্জীব হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। এ্যাশ খেয়াল করলো তাহা আস্তে আস্তে নিজের চোখটা বন্ধ করে আরাবীর উপর ঢলে পড়ছে। এ্যাশ ফাহাদের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে “আরু” বলে চিৎকার দিয়ে দৌড়ে গিয়ে ওকে ধরলো। মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে তাহা। এ্যাশ তাহার মাথা নিজের বুকে চেপে ধরে অস্হির হয়ে ডাকলো

বিষাক্ত প্রেমের অনুভূতি পর্ব ১৫

–আরু? কি হয়েছে? তাকাও তাকাও? কি হয়েছে তোমার? এই মেয়ে? তাকাতে বলছি না? শরীর খারাপ করছে? এমন করছো কেনো? তাকাও না? এই?

বিষাক্ত প্রেমের অনুভূতি পর্ব ১৬

1 COMMENT

Comments are closed.