Home বিষাদ ও বসন্ত বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ১১

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ১১

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ১১
অলকানন্দা ঐন্দ্রি

মিথি একটা সময় মুহিবের প্রতি দুর্বল ছিল এটা যেমন ঠিক, তেমনই এই মুহুর্তে দাঁড়িয়ে মুহিবের প্রতি তার পাগলামো গুলো ভাবলে মিথির লজ্জ্বা হয়। এই মুহুর্তে দাঁড়িয়ে ও কেবল এবং কেবল নিজেকেই ভালোবাসে।এই মুহুর্তে দাঁড়িয়ে মিথি বুঝতে পারে জীবনের নানাবিধ সমস্যার কাছে এসব আবেগ কিছুই না। একটা সময় মানুষ এমন আবেগকেই আঁকড়ে ধরে রাত দিন চব্বিশ ঘন্টা ব্যয় করে, কারণ ঐ যে জীবনে এতোটা সমস্যার সম্মুখীন তখনও হয়নি সে। হলে হয়তো বা এসব পাগলামো কখনোই করত না। মিথি তপ্তশ্বাস ফেলে। এই যে ভাবী এখন মুহিবকে এই কথাগুলো বলল? এতে মিথির ইচ্ছে লজ্জায়, অপমানে মাটির নিচে চলে যেতে। এভাবে অন্য এক পুরুষের কাছে কথাটা জিজ্ঞেস না করলেই কি হতো না?মুহিব ও বোধহয় আশা করেনি তাকে এমন একটা কথা শুনতে হবে সকাল সকাল। কিছুটা সময় চুপ থাকল ও। বোধহয় বুঝার চেষ্টা করল আসলে বলছে টা কি? এপাশ থেকে মিথির ভাবী আবারও বলল,

“ চুপ করে আছো কেন? সত্যিটা বলো। মিথির সাথে তোমার কি চলছে হ্যাঁ? ”
মিথি এই পর্যায়ে কপাল কুঁচকে বলে ফেলল,
“ কিসব যাতা বলে যাচ্ছো ভাবী। ছিঃ! মুহিব ভাই কি ভাবছে? আশ্চর্য। তুমি ফোন রাখো ভাবী। আমি তোমায় বলছি। ফোন রাখো। ”
মিথির ভাবী ফোন রাখল না। উল্টো মিথিকেই বিরক্ত হয়ে চুপ থাকতে বললেন। ওপাশ থেকে মুহিব এবারে শুধাল,
“ আপনি কে? কে বলছেন..”
“ মিথির ভাবী বলছি। বলো এবার, মিথির সাথে কি সম্পর্ক? ”
মুহিব বোধ হয় এই প্রশ্নও বুঝে না। বলল,
“মিথির সাথে আমার কি সম্পর্ক মানে? ”
“ সম্পর্ক নেই বলছো?তাহলে ওর বাচ্চার বাবা তুমি নও বলছো? ”
মুহিব মুহুর্তেই বলে উঠল,

“ কিসব যা তা বলছেন। ওর সাথে আমার কথাই হয়নি বহুদিন। আমি তো গ্রামেও যাইনি অনেকদিন। তাহলে? সম্পর্ক কি করে হবে ? বাচ্চার বাবা তো দূর…”
মিথির ভাবী তাহিয়া তবুও নিশ্চিত হতে পারলেন না যেন। সন্দেহ নিয়ে শুধালেন,
“ তুমি মিথ্যে বলছো না তো? মিথি শুধু মাত্র তোমার প্রতিই দুর্বল ছিল বিয়ের আগে। তোমার জন্যই পাগলামি করত। ও যদি অন্য কোন পুরুষের সাথে সম্পর্কে জড়ায়ই তাহলে তোমার সাথে সম্পর্কে জড়ানোর সম্ভাবনাই ৯৯%।”
মুহিবের গলায় এবার কিছুটা বিরক্তি প্রকাশ পেল যেন। সকাল সকাল এসব কথাবার্তা ওর ঝামেলাই মনে হচ্ছে। বিস্তর ঝামেলা। মিথি কি বলেছে ওর বাচ্চার বাবা মুহিব? নয়তো এই কথাটা কেন উঠল?যদি বলেও, কেন বলবে? এটা কেমন ফাজলামো? মিথি কি এখনো ছোট? সংসার আছে। তবুও এই হেয়ালিপনা কি কারণে? মুহিবের এই যে মিথির প্রতি একটা অনুভূতি তৈরি হয়েছে এটক যেটুকু ঠিক, ঠিক তেমনই এটুকুও ঠিক যে ও ওর সম্মানকে ভালোবাসে খুব। গ্রামে ওর যে মূল্য এটাকে ও ভালোবাসে। মিথির সন্তান ওর নিজের এটা স্বগর্বে বলে বা বলার মতো সাহসিকতা ও কখনোই দেখাবে না। এমনকি খুব প্রয়োজনীয় মনে হলেও না। মুহিব কিছুটা বিরক্তি গলায় ঝেড়েই বলল,

“ এই কারণে ওর বাচ্চার বাবা আমি হবো কেন? ওর বিয়ে হয়েছে বললেন। ওর বাচ্চার বাবা ওর হাজব্যান্ড হবে এটাই তো স্বাভাবিক। আমি কেন হবো?”
এটুকু বলেই ফের আবার ভ্রু বাঁকিয়ে মুহিব জিজ্ঞেস করল,
“ এক সেকেন্ড, ওর বাচ্চার বাবা ওর হাজব্যান্ড নয়? অন্য কেউ? ”
মিথির ভাবী উত্তর করলেন না। এবারে উনি নিজেই বিরক্ত হলেন যেন। ফোন রেখে দিলেন মুহিবের মুখের উপরেই। মিথির দিকে চেয়ে ভ্রু বাঁকিয়ে শুধালেন,
“ মুহিব না হলে আর কোন ছেলের জন্য তো তোমার এই অবনতি হওয়ার কথা নয় মিথি। সত্যি বলো, সত্যি সত্যিই কি এই বাচ্চা আদ্রর নয়? ”
“ তুমি তো ইতোমধ্যে বিশ্বাস করে নিয়েছো কিছু একটা। তাই না? ”
মিথির ভাবী তাহিয়ার মুখে আপসোস যেন। বললেন,

“ যদি উত্তরটা মুহিব হতো তবুও কিছুটা বিশ্বাস করতাম। কিন্তু এখন বিশ্বাস হচ্ছে না। এতোটাও খারাপ ভাবিনি তো তোমায়। তো, এতোটা খারাপ কাজ কি করলে মিথি? ”
মিথি উত্তর করে না এবারে। বিশ্বাস হচ্ছে না, অথচ সে একই কথাই জিজ্ঞেস করছে! ও কিছুটা সময় স্থির থেকেই এই বিষয়টা এড়িয়ে গিয়ে বলল,
“ মুহিব ভাইকে আবার কল করো ভাবী। তাকে এমন অসম্মানজনক কথা শোনানোর জন্য ক্ষমা চাইতে হবে আমার। কি না কি ভাবছেন উনি কে জানে। ”
মিথির ভাবী কপাল কুঁচকে নিলেন। বললেন,

“ এতে তো ক্ষমা চাওয়ার কিছু নাই। অসম্মানজনক কি জানতে চাইছি? কিচ্ছুই তো বললাম না। ”
এইটুকু বলেই মিথির সামনে দিয়ে মুখ বাঁকিয়ে চলে গেল ওর ভাবী। মিথি ছোটশ্বাস ফেলে। ওর কাছে আগে বাটন ফোন ছিল। যা দিয়ে যোগাযোগ করা যেত অন্তত। অথচ এখন নেই। বিয়ের পর ফোনটা দেয়নি উনারা। ও বাড়ি গিয়েও কল করার জন্য তাকে ফুফির উপরই নির্ভর করতে হতো। মিথির ইচ্ছে হলো মুহিবের সাথে এই বিষয়ে কথা বলে আসলেই স্যরি বলা প্রয়োজন। অথচ পারল না। মন খচ খচ করল কেবল এই ভেবেই যে মুহিব ভাই এই বিষয়ে কি না কি ভেবে ফেলেছেন তাকে নিয়ে!

দুপুরের আগে আগেই মিথি গোসল সেরে কাপড় নিয়ে পুকুরে গেল। নিজের জামা কাপড়ের সাথে সাথে ভাবীর কাপড় ও ভাই এর মেয়ের কাপড়ও রাখা ছিল বালতিতে। বোধহয় ও বালতিতে কাপড় রেখেছে দেখেই তার উপরে নিজেদের কাপড়গুলো রেখে গিয়েছে ওর ভাবী। এমনটা বিয়ের আগেও হয়েছে। মিথি সেসব মনে করে পুকুরপাড়ে গিয়ে সব কাপড়ই ধুঁয়ে নিল। অতঃপর ধোঁয়া শেষে পুকুর পাড়ের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে নিতেই দেখা গেল হিমেল ভাইকে। হাত ধরে আছে পাঁচ বছর বয়সী সিমরানের। সিমরান স্নিগ্ধার মেয়ে, অর্থ্যাৎ হিমেলের ভাই এর মেয়ে। দেখতে মিষ্টি। হাত ধরে যখন পুকুরপাড়েই আসল ঠিক তখনই সিমরান মিথিকে দেখে বলল,
“ মিথি ফুফি, তুমি সাঁতার পারো? ”

মিথির সাথে সিমরানের সাক্ষাৎকারটা এবং ভাবটা বিয়ের আগে থেকেই। বলা চলে সিমরানের ছোটকাল থেকেই। ছুটির সময়ে যখনই হিমেলদের পরিবার বাড়িতে আসত তখনই সিমরানের সাথে মোটামুটি ভালো সময় কাঁটত তার। কোলে করে বাড়ি ঘুরানো হতে শুরু করে পুকুর পাড়ে এসে বসে থাকা সব। মিথির যদিও এই মুহুর্তে কথা বলার ইচ্ছে কিংবা আকাঙ্ক্ষা কিছুই নেই তবুও ও হাসল। শরীর ক্লান্ত। যত তাড়াতাড়ি কাজ করে বিছানায় গা এলিয়ে একটা ঘুম দিতে পারলেই যেন শান্তি। তবুও সিমরানের দিকে চেয়ে বলল,
“ একদম পারি। ”

সিমরান উচ্ছাস নিয়ে বলল এবার হিমেলের দিকে চেয়ে,
“ চাচ্চুও পারে। চাচ্চু সাঁতার কাঁটবে। আমি তা দেখব ফুফু। ”
মিথি সিমরানের উচ্ছাস দেখে বলল,
“ তাই নাকি? খুব ভালো তো। আসি তাহলে এখন ফুফি? ”
সিমরান নাকোচ করল। সিঁড়িতে বসে মিথিকেও বলল,
” চাচ্চু পুকুরে নামলে আমি তো একা। তুমিও বসবে সিঁড়িতে আমার সাথে? দুজনে একসাথে দেখি? ”
মিথি বুঝে উঠল না বসা উচিত কিনা। হিমেল ভাই সাঁতার কাঁটবে এটা সে বসে কি দেখবে? তাছাড়া হিমেল ভাই নিজেও বা এটা পছন্দ করবেন কিনা? মিথি হিমেলের দিকে চাইল। মুখচোখ গম্ভীর। বুঝে না উঠে ও জিজ্ঞেস করল,
“ বসব হিমেল ভাই? ”
হিমেল উত্তর করল,

“ আমার সিঁড়ি যে আমার থেকে অনুমতি নিতে হবে? ”
মিথি উত্তর করল না। চুপচাপ হাতের বালতিটা একপাশে রেখে সিমরানের পাশে বসল। হিমেল তখন এক সিঁড়ি নেমে দাঁড়িয়েছে। টাউজারের পকেট থেকে মোবাইল এবং মানি ব্যাগটা বের করে মিথির দিকে এগিয়ে ধরে বলল হিমেল,
“ ফোনটা আর মানিব্যাগটা রাখ মিথি। ও হয়তো ফেলে দিতে পারে। ”
মিথি এগিয়ে নিল। ফোন দেখে ইচ্ছে হলো হিমেল ভাইকে একবার বলতে যেন মুহিব ভাইয়ের নাম্বারে একবার কল করতে দেয়। সকালের ভাবীর ব্যবহারটার জন্য একবার নমনীয় ভাবে বুঝিয়ে বলত নাহয়। অথচ হিমেলের মুখভঙ্গি দেখে ওভাবে বলে ফেলতে পারল না। মিনিট দুয়েক পরে হিমেল যখন পুকুরের পানিতে পা রাখল ঠিক তখনই বলল,
“ হিমেল ভাই?”
“ হু।”
“ আপনার ফোনটা একটু কথা বলতে দিবেন? মুহিব ভাই এর নাম্বার আছে না আপনার কাছে? আমার একটু কথা বলা দরকার ছিল। ”
মিথি নিশ্চিত ছিল যে মুহিব ভাই এর নাম্বার অবশ্যই থাকবে হিমেল ভাই এর কাছে। কারণ মুহিব ভাই হিমেল ভাই এর চাচাতো ভাই। অথচ তার আশায় পানি ঢেলে হিমেল জানাল,

“ না নেই। ”
“ আপনার চাচাতো ভাই। তবুও নেই? ”
“ না। ”
মিথির মুখটা কালো হলো। শুধাল,
“ আপনি মুহিব ভাইকে অপছন্দ করেন তাই না হিমেল ভাই? মুহিব ভাই এর সাথে আপনার শত্রুতা ছিল কি কোন কারণে? ”
হিমেল চাইল। উত্তর করল,
“ ছিল। ”
“ কি নিয়ে? ”
“ তোকে বলতে ইচ্ছুক নই। ”
মিথি আবারও কেন জানি কৌতুহলি হয়ে বলে ফেলল,
“ সিক্রেট কিছু নিয়ে? ”
হিমেল এবার আকাশের দিকে তাকাল। পায়ের পাতাটা পানিতে রেখে আকাশের দিকে চেয়ে বলল,

“ যা ও পেয়েও অবহেলা করেছে, তা আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে চেয়েও পাইনি। এইটুকুই। ”
মিথি শুনল। ইশ, হিমেল ভাই এর জীবনেও অপ্রাপ্তি আছে? পৃথিবীতে সবার জীবনেই বোধহয় কোন না কোন অপ্রাপ্তি থাকে। যা তারা চায় তা বোধহয় সৃষ্টিকর্তা তাদের দেয় না। কিংবা দেয়! মিথি এবারে বিড়বিড় করেই শুধাল,
“ যা ভাগ্যে থাকে না, তা তো আমরা শত প্রার্থনা করেও পাই না হিমেল ভাই। যদি সৃষ্টিকর্তার কাছে চেয়ে সবাই সব পেয়ে যেত তাহলে দুনিয়াতে কষ্টে কেউ থাকত না। দুনিয়াতে কোন মানুষই বা দুঃখী হতে চায় বলুন তো? তবুও সৃষ্টিকর্তা বেঁছে বেছে কাউকে সুখে ভাসিয়ে দেন, আর কাউকে দুঃখের সাগরে ডুবিয়ে রাখেন। এটা অনেকটাই ভাগ্যের উপর নির্ভরশীল। ”
এটুকু আনমনেই বিড়বিড় করে বলল মিথি। ওপাশ থেকে ভাবীর ডাকের গলা শুনে ও তড়িঘড়ি করে উঠে পড়ল।সিমরানের দিকে ফোন আর মানিব্যাগটা দিয়ে মিষ্টি করে বলল ওকে,
“ আমায় বোধহয় ভাবী ডাকছে। সিমরান সোনা, যাচ্ছি হুহ? তুমি একা চুপ করে বসে দেখো। এদিক সেদিক যেও না হুহ? ”
সিমরানও বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়াল।

মিথি চলে যাওয়ার পর সেদিন রাতে আদ্র আর বাড়িতেই ফিরেনি। এসেছে মুহুর কাছে। এমনকি এখনও ও মুহুর কাছেই।পুরোটা রাত দুইজনে লং ড্রাইভে গিয়েছে, ঘুরেছে, শীতের রাতে কুয়াশায় জমেছে অতঃপর কুয়াশায় ঘেরা একটা সকালে ওরা বাসায় ফিরেছে। মুহুর গলা ধরেছে ইতোমধ্যেই। নিঃশ্বাস নিতেও সমস্যা হচ্ছে ঠান্ডার সমস্যা আছে বলে। আদ্র অনেকটা সময় চেয়ে থেকে এবারে বলল,
“ এসব লং ড্রাইভ লং ড্রাইভ করে নিজের শরীরেন বারোটা বাঁজানো। যা তোমার শরীর নিতেই পারে তাতে এত ইন্টারেস্ট কেন হুহ? নেক্সট টাইম লং ড্রাইভের কথা বললে সোজা ছাদ থেকে ফিক্কা মারব নিচে। ”
মুহুর মুখটা বাচ্চাদের মতো হয়ে গেল যেন। মুহু একদম বাচ্চা বাচ্চা, আদুরে। একদম পুতুলের ন্যায়। যে পুতুলটাকে একমাত্র আদ্রই আগলে রাখে। যে পুতুলটার একটা আদ্রই আছে পৃথিবীতে। মুহু যখন আদ্রর শক্ত ধমক শুনে ঠোঁট উল্টে ঠিক তখনই আদ্র এগিয়ে এল। এক আঙ্গুলে মুহুর থুতনিটা তুলে ধরে বলল,

“ খারাপ কিছু বলেছি আমি? অসুস্থ হওয়ার এত শখ কেন তোমার মিস মুহু? ”
” তুমি আছো না সুস্থ করার জন্য? ”
আদ্র এবার মাথা নোয়াল। মুহুর কপালে কপাল ঠেকিয়ে চোখে হেসে বলল,
“ মিসেস হয়ে যান আমার। আজীবন থেকে যান আমার হয়ে মুহুরানী। ”
মুহু হাসে। বলল,
” এমনিতে কি তোমার মিসেস অন্য কেউ হুহ? তুমি কি তোমার ওয়াইফকে তোমার মিসেস ভাবো আদ্র? ”
“ আপনাকেই ভাবি। কিন্তু আপনি এখনো কাগজে কলমে আমার হননি মুহুরানী। আপসোস। কত অপেক্ষা করব আর? ”
আদ্র বরাবরই চায় মুহুকে। বরাবরই চায় মুহু ওর জীবনে থাকুক। ওর জীবনে সবসময় জড়িয়ে থাকুক। কোনভাবেই যাতে মুহু ওর লাইফ থেকে না যায় এর জন্য ওর বহুচেষ্টা। আদ্র ভালোবাসে, পাগলের মতো ভালোবাসে এই মেয়েটাকে। অথচ ও জানে না ও অলরেডি ভালোবাসার সংজ্ঞায় হেরে গিয়েছে। ওর গুণাগুণ, বৈশিষ্ট্য ভালোবাসার বৈশিষ্ট্যের সাখে মিল নয় এটুকু কে বুঝাবে?আদ্র অবশ্য বুঝবেও না বোধহয়। ও মুহু বলতে অন্ধ। তাই মুহুর গালটা দুই হাতে আঁকড়ে নিয়ে বলল,

“ মুহু, মুহু, মুহু? আই লাভ ইয়্যু মুহু।এতোটা সুখ কেন মুহু তোমার মধ্যে? আমি সত্যিই তোমাকে চাই। আমার হও তুমি এটা খুব করে চাই সহ ”
মুহু এতোটা আহ্লাদে নরম গলায় বলল,
“ মুহু তোমারই আদ্র। মুহুর তো এই পৃথিবীতে তুমি ব্যাতীত কেউ নেই। যারা আছে তাদের মুহুর আপন আপন লাগে না। মুহুর কেবল এই আদ্রকেই আপন আপন লাগে। অনেকটা! ”
এইটুকু বলেই পরমুহুর্তে অনেকটা সময় পর আবার বলল,
“ গলা ব্যাথা করছে আদ্র। জ্বলছে খুব গলা।বোধহয় খুব করে ঠান্ডা লেগেছে। ”
আদ্র কথা শুনে ছোটশ্বাস টানে। মুহুকে বসিয়ে দিয়ে যেতে যেতে বলল,
“মুহু? আম্মু আগে আমায় মসলা আর লেবু দিয়ে চা বানিয়ে দিত। গলা ব্যাথা সেরে যেত তাতে। বানিয়ে আনছি, বসো। ”

অথচ বানাতে গিয়ে দেখল লেবু নেই। আদ্র এই সময়ে বের হলো। বাজার থেকে লেবু আর রেস্টুরেন্ট থেকে সকালের নাস্তাটা নিয়ে এল। অতঃপর লেবু চা বানিয়ে মুহুকে দিতেই মুহু নাক সিঁটকাল। ও নাকি খাবে না, নাস্তাও করবে না। অগত্যা আদ্রকেই জোরজবরদস্তি করতে হলো। নাস্তার প্লেট থেকে খাবার তুলে খাইয়ে দিতে দিতে বলল,
“ গলা ব্যাথা এমনিতেই। এর উপর উনি খাবেন না। পরে অসুস্থ হয়ে থাকলে আমি দেখব তোমায়? সোজা রাস্তায় ফেলে আসব মুহু। চুপচাপ খাও। ”

“ না খেলে?”
আদ্র মুখ ফুলিয়ে বলল,
” উহ মুহু, ভালোবাসি বলে মাথায় উঠছো।”
“ একদম নয়। কোলে উঠেছি সর্বোচ্চ, মাথায় উঠিনি আদ্র। ”
আদ্র হাসল। উত্তর করল,
“ মাথায় ও উঠো, না করেছে কেউ? ”

তখন বিকাল। আশপাশে ফুরফুরে হাওয়া। মিথি নিজের সেলাই মেশিনটা পরিষ্কার করছিল। ঠিকঠাক আছে কিনা যাচাই করছিল। তখনই তার চাচাতো বোন তুশি আর স্নিগ্ধা ভাবীর বোন সাবিহা এল। মিথি সৌজন্যতার স্বরূপই বসতে বলল। তুশি হেসে বসে গেলেও সাবিহা কিছুটা সময় মিথিকে পরখ করল। চুপচাপ মিথিকে দেখে পর্যবেক্ষন করে অতঃপর হেসে বলল,
“ তুমিই মিথি তাই না? আমার অনেকদিনের ইচ্ছে ছিল তোমার সাথে দেখা করার। ”
মিথি সেদিন এই মেয়েটাকে সি এনজিতে দেখেছে। স্নিগ্ধা ভাবীর কথা অনুযায়ী এই মেয়েটা উনার বোন। মিথি ও হেসে বলল,
“ আপনি তো ভাবীর বোন তাই না? ”
“ হ্যাঁ, সেদিন সি এনজিতে ছিলাম।তখন তো বুঝেই উঠিনি তুমিই সেই মিথি। ভালোভাবে দেখতে ও পারিনি তোমায়। তাই চলে এসেছি এখন দেখতে। ”
মিথি শুনল। ভ্রু কুঁচকে বলল,

“ আমায় দেখতে? ”
“হ্যাঁ, তোমায় দেখার ইচ্ছা কিংবা কৌতুহল আমার বহুদিনের। ”
মিথি এবারও ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ কেন? ”
“ আমার অনেক কৌতুহল ছিল তোমায় নিয়ে মিথি। বোধহয় কৌতুহল থেকেই। ”
মিথি আবারও বোধহয় প্রশ্ন ছুড়ত। কিন্তু তার আগেই তুশি বলে উঠল,
“দূররর আপনি মিথি আপুকে দেখে এতোটা পাগল হচ্ছেন কেন আমি বুঝে উঠছি না সাবিহা আপু। আপনি, আপনি জানেন মিথি আপুর বর কতোটা সুন্দর? আপনি দেখলে জাস্ট তাকিয়ে থাকবেন। একদম নায়কের মতো দেখতে। ”
সাবিহাও বলল,

“ তাই নাকি? অনেক সুন্দর? ”
“ হ্যাঁ, হ্যাঁ। অনেক সুন্দর আমাদের আদ্র ভাই। ”
কথাটা বলেই পরমুহুর্তে আবার মিথির দিকে ফিরে বলল,
“ আদ্র ভাই কি সুন্দর গো মিথি আপু।তোমার
লাইফের বেস্ট অর্জন হলে এটা বুঝলে?একদম সুন্দর, বড়লোক একটা বর পেয়ে গেলে। জিতে গেলে তুমি বুঝেছো? ”
মিথির মুখে তাচ্ছিল্য স্পষ্ট! ও জিতেছে সুন্দর আর বড়লোক বলেই জিতেছে? তুশির ভাবনা গুলো কি হাস্যকর। মিথি উত্তর করল,

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ১০

“ কে বলল স্বামী দেখতে সুন্দর হলেই নারী জিতে যায়? পুরুষ মানুষের সৌন্দর্য্য দেখে প্রেমে পড়তে গেলে তুই ভুল তুশি। প্রেমে পড়তে হয় পুরুষ মানুষের যত্নে, ভালোবাসায় ও শ্রদ্ধা দেখে। প্রেমে পড়তে পুরুষ মানুষের ব্যাক্তিত্বের। একজন সুন্দর পুরুষকে বিয়ে
করা কোন অর্জন নয় তুশি। একজন সুন্দর চরিত্রের,সুুন্দর মনের এবং সুন্দর ব্যাক্তিত্বের মানুষকে বিয়ে করাটাই অর্জন। ”

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ১২