বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ২১
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
অনেকটা সকাল তখন। সম্ভবত মিথি অন্যদিনের তুলনায় আজ একটু তাড়াতাড়িই বের হয়েছে। হিমেল তখন ছাদে ছিল। আজকাল মিথির আসা যাওয়া প্রায়সময়ই আড়াল হতে পর্যবেক্ষন করে সে। প্রথম প্রথম ইচ্ছাকৃত না হলেও প্রায়সই চোখে পড়ত, দেখত। এভাবে করে করে এখন আড়াল হতে মিথির এই আসা যাওয়া দেখা খারাপ লাগছে না ওর। কখনো কখনো অপ্রত্যাশিত দেখা, অতঃপর অল্প কয়েক কথা এমনটাই হয়। কিন্তু আড়াল হতে মিথিকে কেন দেখে তা বোধহয় নিজেও জানে না সে।হিমেল দাঁত ব্রাশ করতে করতেই খেয়াল করছিল মিথিকে।প্রায় মিনিট দশ দাঁড়িয়েও যখন মিথি রিক্সা পেল না, কি বুঝে ও ছাদের দিকে তাকাতে নিতেই হিমেল দ্রুত ফিরে অন্য পাশে এল। ছোটশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করল,
“ দেখে নি! নয়তো কি ভাবতো। ”
অতঃপর কিছুটা সময় পর ঐ একই জায়গাতে এসেই আবার ভ্রু কুঁচকে তাকাল হিমেল। মিথি তখনও দাঁড়িয়ে। হিমেল আর দাঁড়াল না৷ সোজা নিচে বাসায় এল। মুখ ধুঁয়ে আবার ও সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামল।মিথি তখনও দাঁড়িয়ে আছে। হিমেল এবারে এমনভাবে মিথির পাশ দিয়ে হেঁটে গেল যেন সে চেনে না মিথিকে। দেখেনি। দুইজনের মধ্যে কথা হবে না এটা শতভাগ নিশ্চিত হলেও কথা হতে হলো। হিমেল বাসা থেকে বের হওয়ার সময় তাড়াহুড়োতে মানি ব্যাগটা অবহেলাতেই পকেটে গুঁজেছিল। যার দরুণ ভালো ভাবে হয়তো মানিব্যাগটা নিজের অবস্থান দখল করে উঠতে পারল না। মিথির দিক দিয়ে ক্রস করে কয়েক পা এগোনোর পরই সেটা খসে পড়ল রাস্তায়৷ হিমেল বোধহয় তাও খেয়াল করেনি। অথচ মিথি খেয়াল করেছে। মানিব্যাগ! প্রয়োজনীয় জিনিস। হিমেলকে না ফিরতে দেখে মিথিই এবারে বলল,
“ হিমেল ভাই, শুনুন? ”
হিমেল চলতে থাকা পা থামাল। মিথির গলা? ঘাড় বাঁকিয়ে পিঁছু ফিরতেই দেখল মিথি ডেকেছে। হিমেল ভ্রু বাঁকিয়ে শুধাল,
“ কি? ”
মিথি ছোটশ্বাস ফেলে। হিমেল ভাই একটু ভাব দেখায়? নাকি অতিরিক্ত? নাকি তার সাথেই এমন রাগ, বিরক্তি দেখায়? মিথি পা এগিয়ে ঝুঁকে হিমেলের মানি ব্যাগটা নিল। হাতে এগিয়ে ধরে বলল,
“ আপনার পকেট থেকে পড়ল। ”
হিমেল তখনও ভ্রু কুঁচকে রেখে নিজের দম্ভ ধরে রেখে শুধাল,
“ তো আপনার কি মিথি? ”
একজন পথচারী হিসেবেও মিথি এমনটা দেখলে বলত। সে জায়গায় হিমেল ভাই তার পরিচিত। বলা উচিত নয় নাকি? বলল,
“ প্রয়োজনীয় জিনিস, তাই বললাম। ”
হিমেল এগিয়ে এল। ভাব,দম্ভ সব বজায় রেখে ও মানি ব্যাগটা হাত দিয়ে এগিয়ে নিল। মিথি তা দেখল। অযথায় কেউ রাগ করবে কেন তার উপর? বিষয়টা ভেবেই ধীর কন্ঠে বলল,
“ হিমেল ভাই, দুনিয়ায় কেউ আমার উপর রাগ পুষে রাখুক এটা আমার কখনোই চাওয়া নয়। তবুও অবশ্য অনেক জায়গায়তেই অনেক জনের কাছেই আমি রাগের কারণ। যায় হোক, আপনি সেদিনকার রিক্সায় না উঠার বিষয়টা ওভাবে না দেখলেও হয়। আপনাকে অপমান করিনি আমি সেদিন সে সাহায্যটা না নিয়ে।”
হিমেল তাকাল। গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“ সম্মানও করিসনি। ”
“ আমি আপনাকে সম্মান করি সবসময় হিমেল ভাই। গ্রামের বড়ভাই হোন আপনি।সে হিসেবে সেই ছোট থেকেই আমি আপনাকে সম্মান করেছি কিন্তু আপনিই দেখতাম সবসময় একটা বিদ্ঘুটে ব্যবহার করতেন আমার সাথে। ”
হিমেল ভ্রু নাঁচিয়ে শুধাল,
“ বিদ্ঘুটে ? ”
“ কেমন যেন সবসময় রাগ দেখিয়ে আসতেন।গম্ভীর গম্ভীর একটা ভাব। বোধহয় সবার সাথেই করেন, নাকি আমার সাথেই করতেন জানি না। তবে আমার সাথে এমন করার আজও কারণটা আমি খুঁজে পাইনি। ”
“ না পেলেই ভালো। ”
এইটুকু বলেই হিমেল একদম আবারও পা বাড়াল। মিথি শুধু ছোটছোট চোখে তাকিয়ে রইল। হিমেল ভাই আসলেই হিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী অদ্ভুত। মিথির কাছেও অদ্ভুত লাগে।
হিমেল হাঁটছে। রাস্তায় অন্যান্য যানবাহন থাকলেও রিক্সার খুব একটা দেখা মিলছে।তবে বেশি দূর যেতে হলো না। দুই মিনিটের পথ হাঁটতেই একটা খালি রিক্সার দেখা পাওয়া গেল। রিক্সাওয়ালা মামা রিক্সার সিটগুলো কাপড় দিয়ে ঝেড়ে দিচ্ছেন। হিমেল ওখানে গিয়ে শুধাল,
“ মামা যাবেন?”
ভদ্রলোক তাকালেন। ব্যস্ত ভঙ্গিতে প্রশ্ন ছুড়লেন,
“ যাইবেন কই? ”
“ আমি না,সামনে একজন দাঁড়িয়ে আছে মামা। উনারে নিয়ে যেতে পারেন।”
ভদ্রলোক তাকালেন। কাউকে না দেখতে পেয়ে শুধালেন,
“ কই? ”
“আরেকটু সামনে। চলেন দেখিয়ে দেই। ”
এটুকু বলেই হিমেল উঠে বসল। ভদ্রলোকও রিক্সা চালিয়ে সামনে এগোতে লাগল। হিমেল মিথি যেখানে দাঁড়িয়ে আছে তার একটু আগেই থামাল। নেমে পড়ে ইশারা দিয়ে বলল,
“ ঐ যে। নীল বিল্ডিংটার সামনে কালো জামা পরা মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে? ওকে নিয়ে যান। ”
অতঃপর পকেট থেকে বিশ টাকার নোট বের করে শুধাল,
“ ওর ভাড়া ওর থেকেই নিবেন। আর হ্যাঁ, কোন ছেলেফেলে ওর জন্য রিক্সা পাঠিয়েছে এটা ওকে বলার প্রয়োজন নেই। আপনি যেমন যাত্রী নেন ওভাবেই নিবেন। বুঝলেন? আর, এটা আমারে এইটুকু আনার জন্য। ”
ভদ্রলোক হাসলেন। বললেন,
“ এইটা একটু পথ। লাইগব না। রাইখা দেন। ”
বিনিময়ে হিমেল হাসল। জানাল,
“ রাখেন মামা। ”
এহসানের সাথে মুহুর সম্পর্কটা আগের থেকে অনেক এগিয়ে এসেছে। বলা চলে আগের থেকে অনেকটা ফ্রেন্ডলি। মুহুও একটু একটু করে এই ছেলেটার প্রতি নিজের সবটুকু অনুভূতি দিয়ে হারাচ্ছে। আজ এহসানের জম্মদিন।মুহু খুব প্ল্যান করেই এহসানের জম্মদিনের আয়োজন করেছে।একটা রেস্টুরেন্টের দোতালাটা ভাড়া করা হয়েছিল৷ সুন্দর ডেকোরেশন হতে সুন্দর কেক!ওখানে কেবল এহসান এবং মুহুই। অতঃপর এত আয়োজনের মাঝখানে সুদর্শনকে এহসানকে মুহু মারাত্নক লাগে। নিজের সবটুকু সাহস জুগিয়ে এহসানকে বার্থডে উইশ করার পরপরই ও এহসানের একদম কাছ ঘেষে দাঁড়াল। আচমকায় এহসানের গলা জড়িয়ে ও চোখে হাসল। লাজুক বালিকার মতো চোখমুখে উজ্জ্বল প্রভা ভাসল যেন। চোখে আত্মবিশ্বাসের পুলক নিয়ে বলল,
“ এহসান, আঁই থিংক আই লাভ ইয়্যু। উইল ইউ লাভ মি? ”
এহসান লোকটা ধূর্ত! এই দেশের সংস্কৃতিতে বেড়ে উঠেনি সে। একজন পার্ফেক্ট এবং সফল বিজন্যাসম্যানের পাশাপাশি সে একজন ভালো মেইন্ডগেমারও। সে জানে মেয়েরা কেমন পার্সোনালিটির পেছনে ছুটে বেড়ায় বেহায়ার মতো। সে জানে কিভাবে ধীরে ধীরে একটা মেয়েকে নিজ থেকেই নিজের কাছে আনা যায়।এই যে মুহু ওর গলা জড়িয়ে ধরেছে এতে সে অবাক হলো না। মুহুর সাথে সে লং ড্রাইভে গিয়েছে, কোন একবার মুহুকে কোলেও তুলেছে, এমনকি মুহুর সাথে তার আলিঙ্গনও হয়েছে বারকয়েক। অথচ মুহু মনকেও হারিয়ে নিয়েছে? এহসানের ঠোঁটে বাঁকা হাসি। মুহুর চোখে চোখ রেখে ও শুধাল,
“ এই অল্প কয়েকদিনে ভালো টালোও বেসে ফেলেছেন মিস মুহু? ”
মুহু হাসল বোধহয়। শুধাল,
“ কিছু তো একটা আছে আপনার মধ্যে যা আমায় ভালোবাসতে বাধ্য করেছে মিঃ এহসান। ”
এহসান হাসল। মাথাটা ঝুকে নিয়ে মুহুর কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“ কিন্তু আমি তো ভালোবাসায় বিশ্বাসী না মিস মুহু। আমি মনে করি ভালোবাসা প্রয়োজনেই সীমাবদ্ধ। ”
“ মানে? ”
“ নাথিং, তো এত কষ্ট করে এত আয়োজন কেন করেছেন? ”
মুহু উচ্ছ্বাস নিয়ে বলল,
“ আপনাকে স্পেশাল ফিল করানোর জন্য মিস্টার এহসান। ”
ফের আবারও ও শুধাল,
“ আঁই থিংক আমরা এগোতে পারি এহসান রাইট? আমাদের মাঝে সম্পর্কটা অনেকটাই তো ফ্রেন্ডলি তাই না? ”
এহসান হাসে। মুহু ঠোঁটে গাঢ় লাল রং এর লিপস্টিক দিয়েছে। আকর্ষনীয় দেখাচ্ছে অনেকটা ঠোঁটজোড়া।এহসান এক আঙ্গুল রাখে ওর ঠোঁটে। অতঃপর আঙ্গুল দিয়ে ঠোঁটে বুলিয়ে বলল,
“ মিস মুহু? আপনার ঠোঁটজোড়ার প্রতি আমার নজর ছিল বহুদিনের। ক্যান আঁই টেস্ট দিজ?”
অতঃপর এহসান সময় নিল না। মুহুর প্রেম গ্রহণ করেছে এমন এক বার্তা মুহুর মস্তিষ্কে পৌঁছে দিয়ে মুহুর ঠোঁটজোড়া দখলে নিল। মুহু চোখমুখে তীব্র উচ্ছাস নিয়ে পরমুহুর্তে শুধাল,
“ এহসান, ইউ লাভ মি? ”
এহসান উত্তর করল না। তার ঠোঁটে হাসি ফুটে। বোকা নারী! ভালোবাসা যদি থেকেই থাকে তবে কি পুরুষ দৈহিক চাহিদাই পোষণ করত সর্বপ্রথম? মুহু আবারও শুধাল,
“এহসান! ”
এহসান হেসে ফিসফিস করে শুধাল কেবল,
“ আপনি বুঝে নিতে পারবেন মিস মুহু। আমার উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন নেই।”
এহসানের সাথে সত্যিই সুন্দর একটা সময় কাঁটল মুহুর। আজকাল এহসানের সবকিছুই মুহুর ভালো লাগছে। সুন্দর লাগছে। বলা চলে এহসান বলতেই ও উম্মাদ হয়ে যাচ্ছে দিনের পর দিন। এহসান যখন মুহুকে পোঁছে দেওয়ার জন্য গাড়িতে উঠল তখন মাঝপথেই আদ্র মুহুকে কল করল। বার দুয়েক কল বাজার পরও মুহু যখন কল রিসিভড করল না এহসান ভ্রু বাঁকিয়ে শুধাল,
“ ফোন তুলছেন না কেন মিস মুহু? ”
মুহু পরেরবার কল তুলল ইতস্থত করে। ওপাশ থেকে আদ্র শুধাল,
“ তুমি কোথায় মুহু? ”
মুহুর গলা কাঁপল। শুকনো ঢোক গিলে ও একবার এহসানের দিকে তাকাল। কাঁপা গলায় শুধাল,
“ বা বাসায়। ”
ওপাশ থেকে আদ্রর রাগীর স্বর ভেসে এল,
“ মিথ্যে বলবে না মুহু। বাসায় নেয় তুমি।”
মুহু অপ্রস্তুত হলো। শুধাল,
“ মানে এইতো বাসায় চলে এসেছি প্রায়। রাস্তায় আছি।কল রাখো। ”
“ রাখবে না কল তুমি, কার সাথে আছো? ”
মুহু উত্তর দিল না। চুপ করে আছে। কি উত্তর দিবে ভাবে ও৷ আদ্র বোধহয় ধৈর্য্য ধরতে পারল না। চেঁচিয়ে বলল,
“ মুহু, কার সাথে আছো? ”
মুহু এবারে কল রেখে দিল। সোজা ফোন অফ করে দিল। এহসান সূক্ষম চাহনিতে খেয়াল করে গেল কেবল সব।
মিথি ঘুমিয়ে ছিল। হুট করেই মাঝ-রাত্রিতে ওর অনুভব হলো ব্যাতিক্রম কোন অনুভূতি। মিথির ঘুম ছুটে যায়। চোখজোড়া মিনমিন করে তাকিয়েই ও সর্বপ্রথম হাত রাখল পেটের উপরে। না, অনুভূতিটা মিথ্যে নয়। সত্যি! তার পেটের চামড়ার উপর হাত রেখেই সে স্পষ্ট টের পেল ভেতর থেকে একটা প্রাণের নড়চড়। একটা প্রাণের অস্তিত্বের স্পষ্ট প্রমাণ! মিথি সঙ্গে সঙ্গেই উঠে বসল। অবিশ্বাস্য নজর নিয়ে ও একই ভাবেই পেটে হাত চেপে রাখল। প্রথমবার! এটা প্রথমবার ওর প্রাণের মুভমেন্ট উপলব্ধি করার অনুভূতি। মিথি প্রথমে শীতল এক অনুভূতি নিয়ে বসে থাকলেও এবারে চোখ টলমল করে ওর। নিরব বসে থেকে ও ফিসফিস করে শুধাল,
“ এটা তুমিই? আমি, আমি বিশ্বাস করতে পারছি না… ”
হিয়া ও পাশাপাশি উঠে বসল। মিথিকে ওভাবে মাঝরাতে উঠে বসে বিড়বিড় করতে দেখে ও ভ্রু কুঁচকাল। শুধাল,
বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ২০
“ কি হলো?এভাবে বসে আছিস কেন হুহ? ”
মিথির গলা কাঁপে। স্বর বের হতে চায় না যেন। ও অল্প আলোতেই হিয়ার দিকে তাকায়। শুধাল,
“ হিয়া…
“ কি? কি হয়েছে মিথি? কিছু স্বপ্নে দেখেছিস? খারাপ কিছু? ”
মিথি রোধ হয়ে আসা স্বর নিয়েই শুধাল,
“ হিয়া, ও.. ও নড়ল একটু আগের।আমি টের পেলাম হিয়া ওকে..”
