Home বিষাদ ও বসন্ত বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৩৩

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৩৩

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৩৩
অলকানন্দা ঐন্দ্রি

মিথিকে তালাকনামার নোটিশ পাঠানোর ঠিক এগারো দিন পর আদ্রর চোখের সামনেই তার বাবা তার মায়ের গায়ে হাত তুলেছে। আদ্র স্পষ্টই দেখল।বর্তমানে তার বয়স অনুযায়ী সে একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ। ছোটবেলা থেকে বাবা মায়ের সুন্দর সংসার, ভালোবাসা দেখে আসা আদ্রর জীবনের এতগুলো বছর কাটার পর নিজেরই আম্মুকে এভাবে দেখবে সে ভাবেনি। সত্যিই ভাবেনি। আদ্র এগিয়ে এল। মায়ের অবস্থা দেখে ওর সর্বপ্রথম রাগ জম্মাল বাবার উপর। বাবার প্রতি যে ভালোবাসাটা থাকার কথা তা এক মুহুর্তের জন্য ভুলে গিয়ে আঙ্গুল উঁচিয়ে বাবাকে জোরালো স্বরে বলল,

“ তুমি মা’রলে কেন আম্মুকে? মারলে কেন আব্বু? তোমার সাহস কি করে হলো? তুমি আমার আম্মুর গায়ে হাত তোলো কিভাবে?”
আদ্রর মা তখনও স্তব্ধ। স্বামীর সাথে যাবতীয় ঝামেলা, ঝগড়া সব সে ছেলের আড়ালেই করেছে। অথচ আজ? ছেলের সম্মুখেই তাকে চড় মারা হলো? ছেলের সামনেই? লজ্জা হলো যেন কথাটা ভাবতে তার। এই বয়সে স্বামীর হাতে চড় খেয়েছে, তাও ছেলেরই সামনে। উনি একবার স্বামীর দিকে চাইলেন। যেন একজন বাবা হয়ে ছেলেকে কি উত্তর দিবে তারই অপেক্ষায় করছিলেন। অতঃপর তার অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আদ্রর বাবা বলে উঠলেন,
“ তুমি আমাদের মাঝে ডুকবে না আদ্র। তোমার আম্মু আর আমার মাঝে কথা হচ্ছে, বিষয়টা আমাদের মাঝে সীমাবদ্ধ বুঝেছো? তুমি নাক গলাবে না এতে। ”

আদ্রর রাগে নাক লাল হয়ে এল। চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। একবার নিজের মায়ের দিকে চাইল। এই এতগুলো বছরের সংসারে এই প্রথম বোধহয় আদ্র তার আম্মুকে এতোটা লজ্জিত, এতোটা ভঙ্গুর দেখল। চোখজোড়া লাল টকটকে যেন। সে এতগুলো দিন আন্দাজ করেছিল যে, মায়ের সাথে বাবার ঝগড়া চলছে। কোন একটা বিষয়ে হয়তো মনোমালিন্য চলছে। অথচ তাই বলে তার মায়ের গায়ে হাত উঠাবে? আদ্র মানতে পারল না। বরাবরের মতো রাগে নাক মুখ লাল হয়ে এলো। আদ্র মায়ের দিকে তাকিয়েই বাবার দিকে চাইল। সকল সন্তানের সাথেই তার মায়ের বোধহয় সত্যিই কোন না কোন কষ্ট অনুভব করার সম্পর্ক আছে। ঠিক যেমন সন্তানের কষ্টগুলো মায়েরা বুঝে যায়, সন্তানদের দুঃখে মায়েরা দুঃখ পায়? ঠিক তেমনই মায়েদের দুঃখেও সর্বপ্রথম সন্তানদের হৃদয় কাঁদে। মায়ের কষ্টও মায়েদের মতো করে তার সন্তানরা বুঝে। আদ্র বাবার দিকে চাইল। রাগে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

“ তুমি আম্মুকে কি কারণে মারবে? কি কারণে মেরেছো তা বলো আব্বু। ”
আদ্রর বাবা এবারে ফুঁসে উঠলেন ছেলের উপরে। রেগে চিৎকার জুড়ে দিয়ে বলে উঠলেন,
“ কথা একবার বললে শোনো না তুমি আদ্র? বললাম না তোমার আমাদের মাঝে আসা উচিত হচ্ছে না? শোনো না তুমি? ছেলে ছেলের মতো থাকো। বাবা মায়ের মধ্যে আসবে না আদ্র। আমাদের ঝামেলা আমরা বুঝে নিব। ”
আদ্র রাগে কাঁপল এবার। মায়ের দিকে চেয়ে সর্বপ্রথম মায়ের লাল টকটকে টলমলর হয়ে আসা চোখজোড়া দেখে ও বুঝল একবার। পরমুহুর্তেই অনুভব করল ওর মায়ের কষ্টতে ওর নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে যেন। বুকের ভেতর কেমন একটা যন্ত্রনা হচ্ছে মায়ের চোখজোড়া দেখে। আদ্র যখন চোখজোড়া মেলে তাকাল তখন তারও চোখজোড়া লাল টকটকে। বাবার দিকে চেয়ে সেও চিৎকারে করে বলে উঠল,

“ আমার মায়ের গায়ে হাত তুলেছো কোন সাহসে তুমি? কোন সাহসে মেরেছো? তুমি এটার উত্তর দিতে পারছো না কেন? এড়িয়ে যাচ্ছো কেন? ”
আদ্রর মা থমকালেন। ছেলের হাত শক্ত করে টেনে শুধালেন এবারে,
“ আদ্র? রুমে যাও। ঝামেলাটা আমাদের, আমাদেরই মিটাতে দাও। তুমি রুমে যাও। ”
আদ্র ফের বলতে নিল,
“ আম্…”
আদ্রর মা ফের রেগে বললেন,
“ রুমে যাও আদ্র। আমি তোমার সাথে পরে কথা বলব। ”
আদ্র ফুঁসে উঠল। নাকের ডগায় রাগ নিয়ে হনহন করে রুমে গেল ও।

মিথি এই প্রথম নিজ ডিপার্টমেন্টের ছেলেমেয়েদের সাথে পরিচিত হয়েছে। আজই প্রথম এসেছে ও। আড়াই মাসের মেয়েকে রেখে আসতে ইচ্ছেও হয়নি ওর। ভেবেছির আসলেও মেয়েকে নিয়ে আসবে৷ আবার ফিজাই নিষেধ করল যে ও ছোট, না নিয়ে যাক। যেহেতু প্রতিদিন ক্লাস করার বাধ্যবাধকতা নেই তাই নিয়মিত আসার ঝামেলা ও নেই।এইজন্যই এতদিন আসেনি মিথি। আজ এসেও অল্প সময় থেকে, সাথে সাথেই চলে যাবে। বাসায় মেয়ে রেখে এসেছে বলে কথা। মিথি সত্যিই দুটো ক্লাস শেষ হওয়ার সাথে সাথে পা বাড়াল বাসায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে। পথের ঠিক মাঝপথেই দুটো ছেলে এসে দাঁড়াল। হেসে চুল ঠিক করতে করতে বলল,

“ তুমি তো আমাদের ডিপার্টমেন্টেই তাই না? নাম কি যেন? ”
মিথি ভ্রু কুঁচকাল। কপাল কুঁচকে বলল,
“ কেন? ”
“ নাম জানলে কি অসুবিধা? বলা যেতেই তো পারে। ”
মিথির কপাল কুঁচকানোই থাকল। শুধাল,
“ হ্যাঁ, পারে। কিন্তু আপনাদের আমি চিনি না। ”
“ আমি ইশান, আর ও নিলয়। তুমি?”
মিথি এবার ছোটশ্বাস ফেলল। উত্তরে বলল,
“ আমি মিথি। ”
“ সুন্দর নাম তো।”
মিথির ইচ্ছে হলো না ছেলে দুটোর সাথে সময় নিয়ে গল্পগুজব করতে। ভদ্রভাবে শুধাল,
“ ধন্যবাদ, আমায় যেতে হবে। যাচ্ছি। ”

অতঃডর বাসায় ফিরল মিথি। সে সকালেই নাস্তা করে বের হয়েছিল। ফিজার ও ক্লাস ছিল বলেছিল। তবুও মিথি অনুরোধ করাতে যায়নি। মিথির মাঝে মাঝে মনে হয় ও পারবে না। এভাবে অন্যকে জ্বালিয়ে, বিরক্ত করে কিভাবে পারবে? কিন্তু উপায় ও তো নেই ওর কাছে। একবার ভেবেছে কেউ একজনকে রাখবে মেয়ের দেখাশোনর জন্য। কিন্তু লোক পাওয়া আজকাল মুশকিল। তবুও মিথি খোঁজ করেছে। ফিজা যে মুখে না বললেও কিছুটা বিরক্ত হচ্ছে তা না বললেও মিথি বুঝতে পারছে। মিথি ভেবেছে শীঘ্রই খোঁজ নিয়ে কাউকে রাখবে।ও যতক্ষন থাকবে ততক্ষন তো ওই দেখবে। শুধু যেটুকু সময় থাকবে না সেটুকু সময় যাতে দেখে রাখে। একটা বাসাও দেখতে হবে মোটামুটি ভাড়ার মধ্যে। পাশাপাশি টিউশনির সাথে কাজও জোগাড় করতে হবে। অথবা আরো কয়েকটা টিউশনের খোঁজ করবে। টাকাটা বাস্তব জীবনে চলার জন্য খুবই জরুরী। ঐ যে, মানুষ বলে টাকা থাকলেই সব সম্ভব নয়৷ কিন্তু কিছু কিছুক্ষেত্রে টাকা থাকলেই সম্ভব। অনেককিছু সম্ভব। মিথি ছোটশ্বাস ফেলে।
মিথি বাসায় ফিরল। এসেই মেয়েকে কোলে নিল সর্বপ্রথম। তার মেয়েটা এই নিয়ে দুইবার কান্না করেছে ক্ষিধেতে শুনেই মিথির মুখ চুপসে এল। তিনঘন্টার মতোই বাইরে ছিল।এই অল্প সময়টাও যেন অনো বেশি সময় মনে হলো মিথির। মেয়েকে কোলে নিয়ে চুমু দিয়েই বলল,

“ আম্মুকে মনে পড়েছে তোমার? কেঁদেছো আম্মুর জন্য? আম্মুর তো তোমার কথা খুব মনে পড়ছিল মা৷ তোমায় না খাইয়ে কতোটা সময় রেখে দিয়েছি। ”
মিথির মেয়েটা ফ্যালফ্যাল করে তাকায়। এতোটা সময় না কাঁদলেও এখন বোধহয় ক্ষিধেতে কেঁদে ফেলল। ঠোঁট উল্টে আওয়াজ তুলে কেঁদে উঠল ও। এক হাত বাড়িয়ে মায়ের চুল খামচে ধরল শক্তপোক্ত ভাবে৷ মিথি ও ফ্যালফ্যাল করে তাকায় মেয়ের কান্ডে। কান্নার কারণ বুঝে উঠে শীঘ্রই মেয়েকে বলল,
“ কাঁদে না মা, আম্মু অনেক পঁচা তাই না? তোমায় অনেকটা সময় না খাইয়ে রেখেছি দেখেছো? ”
অতঃপর মেয়েকে খাওয়াতে নিল। ঘন্টাখানেক পর মেয়েকে গোসল করানোর জন্য সব তৈরি করে জানালার ধারে বসল।দুপুরের তীব্র রোদের এক ফালি জানালা দিয়ে ঘরে এসে পড়েছে।ফিজা ততক্ষনে বেরিয়েছে। মিথি মেয়েকে কোলে নিয়ে কিছুটা সময় সে রোদের মধ্যেই বসল। অতঃপর কিছুটা সময় রোদে থেকে একটা বড় বাটিতে মেয়ের শরীরের উপযোগী পানি নিয়ে তা দিয়ে গোসল করাল। তোয়াল দিয়ে শরীর মুঁছিয়ে দিল। চুলগুলো মুঁছতে মুঁছতে হুট করেই তোয়ালে পেঁচিয়ে দিয়ে মিথি তাকাল। মাথায় তোয়ালে পেচিয়ে তার মেয়েকে একদম পুতুল পুতুল লাগছে। মিথি মেয়েকে ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে দেখে। বলে,

“ তোমাকে তো একদম সাদা তোয়ালের ভূত লাগছে আম্মা। তুমি জানো ভূতটা কত মিষ্টি? ”
এইটুকু বলেই ও চুমু খেল মেয়েকে। দুই গালে চুমু দিয়েই আবারও ফ্যালফ্যাল করে চাইল যখন তার ছোট্ট মেয়ে তার চুলগুলো মুঠো করে নিল। মিথি তাকিয়ে বলল,
“ একি মা? চুল টানলে আবারও? আম্মু ব্যাথা পাই তো মা। ”
মিথির অতটুকু মেয়ে মায়ের কথা বুঝল না। বরং এবার দুইহাতেই ঝাপটে ধরল মায়ের চুলগুলো৷ একহাতে টেনে নিয়ে নিজের মুখে চুলগুলো নিতেই মিথি হাত টেনে ধরল। শুধাল,
” আম্মু,চুল মুখে নেয় না। ছেড়ে দাও। ”
তবুও ছাড়া হলো না। সে নিজমনে মায়ের চুলগুলো টেনে খেলছে। অথবা মজা পাচ্ছে এতে সে তাই হয়তো করছে।

মিথি মেয়েকে ঘুম নেওয়াল আরেকটু সময় পর। দুইপাশে দুটো বালিশ দিয়ে এরপর মেয়ের কাঁথাকাপড় ধুয়ে নিজেও পাঁচ মিনিটেই গোসল করে বের হলো। তারপর বারান্দায় ধোয়া কাপড়গুলো মেলে দিয়ে ফের মেয়ের কাছে এল। ঘুমন্ত মেয়েকে দেখে ও হাসল। তার মেয়েটা আসলেই মিষ্টি। দেখলেই তার সমস্ত ক্লান্তি ফুরিয়ে যায়৷ মিথি হাসে। বিড়বিড় করে শুধাল,

“ মিষ্টি? তুমি জানো তোমার জন্য আম্মু কত চিন্তায় থাকি? যদি তোমার আর তোমার আম্মুর জীবনটা বাকি মেয়েদের মতো স্বাভাবিক জীবন হতো তাহলে অবশ্যই আম্মু তোমায় সারাক্ষণ কোলে তুলে রাখতাম৷ একটুও কোলছাড়া করত না আম্মু তোমাকে। কিন্তু বাস্তবতা তো ভিন্ন। এই কারণেই তোমায় ছেড়ে এদিক ওদিক ছুটতে হয় আমাকে। ”
মেয়ের সাথে বিড়বিড় করে আরো কিয়ৎক্ষন কথা বলে অতঃপর আস্তে ধীরে পা বাড়িয়ে রান্না ঘরে গেল মিথি। ক্ষিধে তারও পেয়েছে। সারাদিনের ক্লান্তিতে চোখও বুঝে আসছে। তার আম্মু বা ভাবী কেউ এই সময়টায় তার পাশে থাকলে মিথি বোধহয় একটু হলেও স্বস্তি পেত। কিন্তু এই সময়টা ত্র আপন কেউই তেমন তার পাশে নেই। মিথি রান্নাঘরে এসে দেখল খাবার নেই। দেখে বুঝা যাচ্ছে খাবার রান্নাই করা হয়নি। ফিজাও বাইরে গিয়েছে। নিশ্চয় বাইরে খেয়ে নিবে। মিথি ছোটশ্বাস ফেলে। ওকে এখন রান্না করতে হবে। রান্না শেষ হলে তারপর খেতে পারবে। কত ঝামেলা।এমনিতেই ক্লান্ত লাগছে। অন্যসময় হলে হয়তো না খেয়ে কাটিয়ে দিত। কিন্তু এখন তার বাচ্চা মেয়েটার জন্য হলেও তাকে খেতে হবে।কারণ সেও ক্ষিধে মেটানোর জন্য তার মায়ের উপরই নির্ভরশীল। মিথি চাল ধুঁয়ে নিয়ে বসাল। অন্যদিকে একটা ডিম ভাজি করল। ভাত আর ডিম ভাজি দিয়েই হয়ে যাবে। তারপর একটু ঘুম দিবে নাহয়। আবার বিকালে টিউশনি আছে। টিউশনি করাতে ছুটতে হবে।

এর মাঝে কেটেছে প্রায় মাসখানেক। মিথি আরো দুটো টিউশনি নিয়েছে পাশাপাশি বিল্ডিং এই। একটা কোচিং সেন্টারেও জয়েন করেছে। মোটামুটি যে টাকাটা মাস শেষে পাওয়া যাবে তাতে তার আর তার মেয়ের এই শহরে চলতে অসুবিধা হবে না৷ মিথির মেয়ের জন্য একটা মধ্যবয়স্ক মহিলাকেও বলেছে।ভদ্রমহিলার নাম আয়েশা খালা। পাশাপাশি এলাকাতেই থাকে। দুইদিন হলো মিথি যে সময়টা বাসায় থাকে না ঐ সময়টায় উনিই তার মেয়েকে দেখেশুনে রাখে। শুধু দেখাশোনা করার জন্যই রেখেছেন উনাকে। তারপর আবার বাসায় ফিরলে উনি চলে যান। মিথি নতুন একটা বাসার খোঁজও করেছে। অথচ প্রত্যেকবারই তাকে নিরাশ হয়ে ফিরতে হচ্ছে। কারণ ঐ যে, তার স্বামী নেই। অপরিচিত,একা একটা মেয়েকে বাচ্চাসহ বাসা ভাড়া দিতে বাসার মালিকরা বোধহয় ভরসা পাচ্ছেন না।মিথিকে কারণটা স্পষ্ট করে না বললেও বুঝতে পারল। এইতো একটু আগেও একটা বাসার মালিকের সাথে কথা বলল। স্পষ্টই বলল একা এমন অপরিচিত কাউকে তারা ভাড়া দিবেন না। মিথি মেয়েকে আয়েশা খালার কাছে রেখেই টিউশনিতে এল। গায়ে কিছুটা জ্বর ও ওর। হিমেলদের বিল্ডিং এ ও একটা টিউশন আছে।সে টিউশনিটাও করিয়ে যখন নিচে নামতে নিল ঠিক তখনই শারিরীক দুর্বলতায়, জ্বর, অসুস্থতায় ওর মাথা ঘুরিয়ে উঠল যেন। পা হেচকে পড়ে যেতে নিতেই সিড়ি দিয়ে উঠতে থাকা পাশাপাশি দুইজন ভদ্র মহিলা দ্রুতই ধরল তাকে। অতঃপর একপাশে বসাল।

হিমেল নতুন জবে ডুকেছে কয়েকদিন হলো। ভার্সিটি লাইফ শেষ হওয়ার দুয়েক মাসেই জবটা হওয়াতে হিমেল নিজেও খুশি হলো।এই নিয়ে দুইদিন গেল ওর জয়েনের৷ অতঃপর সন্ধ্যার একটু পর যখন বাসায় ফিরতে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে নিল ঠিক তখনই দেখা গেল একপাশটায় তিনচারজনের ভীড়। হিমেল ভ্রু কুঁচকাল। পরিচিত একজনকে কাছাকাছি দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই উনি বললেন,
“ আরেহ ঐ যে, পাশের বিল্ডিং এর একটা মেয়ে মাথা ঘুরে পড়ে যেতে নিচ্ছিল। তাই। ”
হিমেল বুঝল। অতঃপর আর আগ্রহ দেখাল না। বলল,

“ ওহ। ”
এইটুকু বলেই পা বাড়িয়ে ফের উপরে উঠতে নিচ্ছিল। যেতে যেতে এক ভদ্রমহিলার গলা শুনল,
“ এখন ঠিক আছো? কেমন লাগছে এখন? সকাল থেকে কিছু খাওনি নাকি? তোমার শরীর কিন্তু গরম। জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে বুঝলে। ”
হিমেল তবুও আগ্রহ দেখাল না। ফের আরেক সিঁড়ি উঠতেই শুনতে পেল কেউ বলছে,
“ এখন ভালো লাগছে আন্টি। ”
হিমেল এবার আবারও ভ্রু কুঁচকাল। ডান ভ্রু উঠিয়ে পিছু ফিরে বিড়বিড় করল,
“ মিথি? ”
অতঃপর এগিয়ে এল। ছোটশ্বাস ফেলে মিথির কপালে হাত রাখল প্রথমেই৷ জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে শরীরটা। অথচ এই মেয়ে টিউশনি করাতে এসেছে। হিমেল চোয়াল শক্ত করে তাকাল। বলল,
“ মানুষ এতোটা কেয়ারল্যাস কিভাবে হয়? নিজের যত্নও নিজে নিতে পারে না তো মেয়ের যত্ন কি করে নিজে নিবে ? আশ্চর্য! ”
ঠিক পরমুহুর্তেই আবার মিথির দিকে চেয়ে ভ্রু নাচিয়ে বলল,

“ জ্বর নিয়ে বের হতে কে বলেছিল তোকে? বের হয়েছিলি কেন? ”
মিথি চাইল। অস্পষ্ট অধিকার বোধ যেন স্পষ্টই ফুটে উঠল। হিমেলের ওভাবে কপালে হাত দেওয়া, তারপর এসব রাগ দেখানো৷ শুধু অহেতুক এসব? প্রতিবেশি বলে? মিথি বুঝে উঠে না। উত্তরে বলল,
“ বের হওয়ার সময় জ্বর ছিল না হিমেল ভাই।”
“ খাওয়াদাওয়া নিশ্চয় কিছু করিসনি? আমি শিওর তুই একদিন হুট করে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেও আমি অবাক হবো না। বরং আমার তো মনে হচ্ছে তোর স্বপ্নই সেটা। ইচ্ছে করেই করছিস এসব। ”
হিমেলের কন্ঠে স্পষ্ট রাগ৷ মিথি আশপাশের দুই চার মানুষের সামনে এভাবে রাগ রাগ কথা শুনে বলল,
“ আপনি রেগে যাচ্ছেন কেন এভাবে হিমেল ভাই? ”
হিমেল নিজেও জানে না বোধহয় কেন রাগ করছে। তবে রাগ হচ্ছে ওর। এই মেয়ের নিজের প্রতি যত্নহীনতা দেখে রাগ হচ্ছে। যে নিজের প্রতি যত্নবান না, সে কিভাবে অন্যের যত্ন নেয়?হিমেল রাগ রাগ স্বরেই বলল,

“আমার শখ করছে তাই রাগ করছি। ”
“ আমি ঠিক আছি।”
হিমেল তবুও একইভাবেই তাকিয়ে থাকল। পাশ থেকে একজন বলল,
“ ও কে হয় তোমার হিমেল? তোমাদের পরিচিত? ”
হিমেল মুহুর্তেই জবাব দিল,
“ না, কেউ হয় না। ”
মিথি নিরব দৃষ্টি ফেলল। উঠে যেতে নিতেই হিমেল বলল,
“ উঠিস না। আমি ফিজাকে বলছি নিয়ে যেতে। ”
মিথি তাকাল। উত্তরে বলল,
“ যেতে পারব আমি হিমেল ভাই। ”
হিমেলের রাগ হলো। বলল,
“ হ্যাঁ, তুই সব পারিস। জানি আমরা। এইজন্যই পড়ে যেতি একটু হলে। ”
মিথি এবারে আর উত্তরই দিল না। ওখানে উপস্থিত মহিলাগুলো ধন্যবাদ জানিয়ে পা বাড়াল।অতঃপর সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামল।হিমেল ভ্রু বাকিয়ে তাকাল। মিথি তাকে ইগ্নোর করল? অথচ ও যে সত্যিই যেতে পারবো তার কি নিশ্চায়তা? যদি আবার পড়ে যায়? এইটুকু ভেবেই সেও পিছু পিছু নামল। মিথির সাথে সাথে সেও পা বাড়াল। মিথির সাথে সাথে সেও সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠল একদম নিঃশব্দে। যাতে মিথি টের না পায়। অথচ মিথি টের পেল। পিছু ফিরে হিমেলকে দেখে বলল,

“ যাচাই করতে এসেছেন হিমেল ভাই? আমি সত্যিই বাসায় ফিরতে পারি কিনা তা? ”
হিমেল উত্তর দিল না। উত্তর করল,
“ তোকে এগিয়ে দেওয়াটা দায়িত্ব বলে তাই এসেছি। তোর জায়গায় অন্য কেউ হলেও আসতাম। ”

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৩২

মিথি এতকাল এই কথাটা বললে বিশ্বাস করত হিমেল ভাই সত্যিই অন্য কেউ হলেও সাহায্য করত। সত্যিই এগিয়ে যেত। কিন্তু আজকাল তার কেন জানি মনে হয় না। কেন জানি মনে হয় হিমেল ভাই এর এই রাগ, অবহেলা, আবার এগিয়ে সাহায্য করা,এসবের পেছনে কিছু একটা আছে। এই যে একটু আগে কপাল ছুঁয়ে দিল তাতেও বোধহয় কিছু ছিল। এই যে রাগ দেখাল তার পেছনেও কিছু ছিল। অথবা হতে পারে কিছুই নেই। মিথির ভুল ধারণা।

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৩৪