বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৩১
ইসরাত জাহান দ্যুতি
ওর জবাবের অপেক্ষা না করে সে বলল, “সময় মাত্র দশ সেকেন্ড। এর মধ্যেই উত্তর দিতে হবে। সময় পার হলেই কিন্তু শাস্তির পালা।”
কথাটা শেষ করেই সে বাঁকা এক দৃষ্টিতে তাকাল মারিশার দিকে।
এবার আর আগের মতো বিচলিত দেখাল না মারিশাকে। পাথরের মতো স্থির চোখে আশফির দিকে চেয়ে রইল সে। তারপর খেয়াল করল ফোনের টাইমারটা সেট করতে করতে হঠাৎ আশফির চোখের ভাষা বদলে গেল যেন। চাউনিতে আগের সেই চঞ্চলতা উধাও। কয়েক পল একে অপরের দিকে নিঃশব্দেই তাকিয়ে রইল ওরা। যেন মনে হলো, নীরবেই সকল প্রশ্নোত্তর বিনিময় চলছে দুজনের মাঝে।
এরপরই আশফির কণ্ঠে নেমে এল এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য। শীতল গলায় সে প্রথম প্রশ্নটা ছুড়ে দিল, “দিলিশাকে কেন মারতে চেষ্টা করেছিলে, মাহি?”
প্রশ্নটা শোনার পর ধীরলয়ে মাথাটা ডান দিকে সরাল মারিশা। ওর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল তীব্র এক তাচ্ছিল্যের হাসি। যেন এই প্রশ্নটা আসার অপেক্ষায় সে করছিল এতক্ষণ। ঠোঁট দুটো সামান্য ভিজিয়ে নিয়ে তাচ্ছিল্যমাখা সেই হাসিটা অমলিন রেখেই আশফির দিকে তাকাল। দৃষ্টিতে যেন মিশে আছে একরাশ হতাশা আর তিরস্কার। সরাসরি জবাব না দিয়ে সে পালটা কিছু প্রশ্ন ছুড়ল, “আমার আর তোমার মাঝে দিলিশা এখনো কী করে আসার সুযোগ পাচ্ছে, আশফি? কেন তুমি ওকে অ্যালাও করছ? ওর প্রতি স্ট্রিক্ট হচ্ছ না কেন?”
আশফির কণ্ঠস্বর এবার অস্বাভাবিক রকম স্থির হয়ে এল, “আমার প্রশ্নের উত্তর যদিও পেলাম না। তবে সমস্যা নেই, আগে তোমার কৌতূহলই মেটাই।”
কথাটা বলেই সে ফোনের টাইমারটা বন্ধ করে দিল। তারপর মারিশার চোখে স্থির দৃষ্টি রেখে ধীরস্থিরভাবে বলতে শুরু করল, “যখন তুমি ছিলে না, তখন শূন্যস্থান পূরণের জন্য অনেকেই আসতে চেয়েছিল। কিন্তু কাউকেই আমার মনটা আঁকড়ে ধরতে পারেনি। আর আজ যখন তুমি নিজে ফিরে এসেছ, তখন আমাদের মাঝখানে অন্য কেউ আসার প্রশ্নই ওঠে না। আমি ওকে বিন্দুমাত্র প্রশ্রয় দিচ্ছি না। বরং দুর্ঘটনার দিন সকাল থেকেই ওকে বারবার দেশে ফিরে যাওয়ার কথা বলেছি। খুব প্রয়োজন ছাড়া ওর সঙ্গে আমার স্বাভাবিক কথাবার্তাও সেই দিন থেকে বন্ধ। এরপরও সে যদি আমাদের আশেপাশে ঘুরঘুর করে, তবে ওকে স্রেফ ইগনোর করাই আমাদের জন্য যথেষ্ট। তাই নয় কি?”
এর জবাবে মারিশার ঠোঁটের ডগায় জমে ওঠা পালটা যুক্তি এসেও থমকে গেল। যখন আশফি এক পল বিরতি শেষে পাথরের মতো কঠিন স্বরে বলে উঠল, “প্রতিশোধের নেশায় তুমি এতটাই চড়াও হতে পারো না, যে কাউকে অনায়াসে মৃত্যুফাঁদে ফেলতে চাইবে। তোমার ছায়া হয়ে আমি সারাজীবন পাশে থাকব, মাহি৷ কিন্তু তোমার কোনো অন্যায়কে আমি অন্ধভাবে প্রশ্রয় দেব না। আমি ওসমান বারিশের এই প্রতাপশালী কন্যা মারিশা বারিশকে চাই না। আমি আমার সেই পুরনো গুরাসকে ফেরত চাই। যার মনটা অন্তত এমন নিষ্ঠুর ছিল না।”
“নিষ্ঠুর…?” শব্দটা প্রায় নিঃশব্দে উচ্চারণ করল মারিশা। মুহূর্তেই ওর চোখ দুটো গভীর বিষণ্ণতায় ডুবে গেল।
খুবই শান্ত কিন্তু অকপট স্বরে বলল সে, “হ্যাঁ, আমি খুব নিষ্ঠুর … হিংস্র … চাইলে আমায় সাইকোপ্যাথও বলতে পারো। কিন্তু আমার এই রূপটা কেবল সেই ব্যক্তির জন্যই, যে আমার চোখে শয়তান।”
ওর দৃষ্টি এবার উদাস হয়ে ব্যালকনির ওই টিমটিমে আলোর দিকে আটকে রইল। অবহেলার ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকিয়ে নির্বিকার গলায় বলল, “আমি এখন এমনই, আশফি। মানুষ কি সারাজীবন এক থাকে? যারা বদলে যায়, তারা পরিস্থিতির করাঘাতে চূর্ণ হতে হতে বদলায়। টিকে থাকার তাগিদে যারা আমার মতো পাষাণ হয়, সেই রুক্ষতা একসময় তাদের মজ্জায় মিশে যায়, অস্তিত্বের অংশ হয়ে দাঁড়ায়। আমার রক্তেও এখন সেই বিষ মিশে আছে।”
একটা প্রাণহীন, ক্লান্ত হাসি ঠোঁটে এনে সে আবার আশফির দিকে ফিরল, “তবুও তোমার জন্য আমি আজও সেই পুরনো গুরাসই আছি। সেটা তুমি তখনই অনুভব করতে পারবে, যখন কোনো দ্বিধা ছাড়াই আমায় কাছে টানতে পারবে। আর যদি তা না পারো, তবে মনকে অহেতুক জোরাজুরি কোরো না প্লিজ। বাকি জীবনটা আমি কোনো না কোনোভাবে একা কাটিয়ে দিতে পারব।”
আশফির চোয়ালটা মুহূর্তেই শক্ত হয়ে উঠল। শেষ কথাটাতেই ওর পুরনো ক্ষতে যেন নুনের ছিটে দিল মারিশা। তিক্ত গলায় ওকে বলে উঠল, “ছেড়ে যাওয়াটা যেন তোমার জন্য সব সময়ই খুব সহজ, তাই না? তবে যাওয়ার আগে আমাকেও একটু তোমার মতো নিষ্ঠুর হতে শিখিয়ে যেয়ো, প্লিজ! যাতে আমিও বাকিটা জীবন কোনো হাহাকার ছাড়াই সুখে কাটাতে পারি।”
“আমি… আমি বুঝি বড্ড সুখে ছিলাম?” মারিশার কণ্ঠটা কেঁপে উঠল, কান্নায় ভারী হয়ে এল।
তবু আশফির মুখের কাঠিন্য টলল না। ওর চোখের তারায় কেবল গত কয়েক বছরের জমাটবদ্ধ যন্ত্রণা আর শূন্যতার আর্তনাদ খেলা করতে লাগল। মারিশা হয়তো সেই অব্যক্ত ভাষা পড়তে পারল। সে এগিয়ে এসে আশফির হাতটা নিজের দু’হাতের মুঠোয় নিল—একটা হারিয়ে যাওয়া আশ্রয়কে ফিরে পাওয়ার মতো করে।
কান্নায় কেঁপে ওঠা গলায় বলল, “মনে আছে? পরিচয়ের শুরুতে তুমি আমাকে সহ্যই করতে পারতে না। বাঙালি পুরুষদের প্রতি আমার তুচ্ছতাচ্ছিল্য, বাঁকাচোরা মন্তব্য, আমার নাকউঁচু স্বভাব, আমার বডিকন মিনি ড্রেস, আমার বেপরোয়া জীবনযাপন — এসবই তোমার অপছন্দ ছিল। তোমাকে সুযোগ পেলেই অপমান করতাম বলে একদিন তুমি চ্যালেঞ্জ করলে নিজের কাছে, সেই আমাকেই তোমার প্রেমে ফেলবে। তারপর আমাকে বদলাবেও৷”
একটু থামতেই চোখের এক ফোঁটা নোনাজল টপ করে ওর হাতের পিঠে খসে পড়ল। হালকা শ্বাস নিয়ে বলল তারপর, “ঠিক তাই হলো৷ আমাকে ভালোবেসে, আহ্লাদে, আদরে তোমার নিজের মতো করে গড়ে নিলে। মাত্র চারটে মাসেই৷ কিন্তু আশফি, তুমি যতখানি মমতায় আমাকে গড়েছিলে, ওরা তার চেয়েও হাজার গুণ বেশি আঘাতে আমাকে আজকের এই অমানুষে পরিণত করেছে। তোমার চার মাসের সেই যত্ন ওদের তিন বছরের পৈশাচিক আঘাতের কাছে হেরে গেছে।”
প্রতিটি শব্দ যেন ধারালো তীরের মতো আশফির বুক চিরে দিচ্ছিল। কয়েক পল সে পাথরের মতো নিথর হয়ে রইল, যেন ভেতরকার আর্তনাদটা দমনের চেষ্টা করছে। তারপর হঠাৎ বাঁধ ভাঙা আবেগে মারিশার হাতদুটো ছেড়ে দিয়ে প্রবল এক টানে ওকে নিজের কোলের ওপর টেনে নিল। এমনভাবে দুহাতে পিষে জড়িয়ে ধরল, যেন বুকের পাঁজরের আড়ালে ওকে পৃথিবীর সবটুকু যন্ত্রণা থেকে আড়াল করে রাখতে চায়।
রুদ্ধ কান্নায় আশফির কণ্ঠস্বরও তখন কাঁপতে লাগল, “আমি যতবারই শুনি তোমাকে আঘাত করার কথা, যাদের কোনো অধিকারই ছিল না তোমাকে ছোঁয়ার, ততবারই আমার ভেতরে সব কিছু এলোমেলো হয়ে যায়৷ আমার নিজেকে প্রচণ্ড উন্মাদ লাগে কেবল তোমাকে রক্ষা করতে না পারার ব্যর্থতায়। আমার মাথায় খুন চেপে যায়, যখন মনে পড়ে আমার অধিকার থাকা সত্ত্বেও আমি তোমার কাছে পৌঁছাতে পারিনি, তুমি আমাকে ডাকোনি৷ আর সেই সুযোগে প্রতিনিয়ত একটা কুকুরের বাচ্চা তোমাকে মেরেছে, তোমাকে ভোগ করতে চেয়েছে৷ এগুলো সহ্য করা আমার পক্ষে কতটা যন্ত্রণার মাহি, তা তুমি কোনোদিন বুঝবে না।”
মারিশা মুখ তুলে কাঁপতে থাকা হাতের আঙুলগুলো আশফির দাড়িভরা গালে ছোঁয়াল। অশ্রুতে চোখ ভাসিয়ে ঝাপসা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “বিশ্বাস করো, আমিও ভুলতে পারি না৷ কিন্তু তবু সব ভুলতে চাই। আমি আবারও তোমার সেই মাহি হতে চাই। তুমি কি পারবে আমাকে আগের মতোই ভালোবাসতে?”
রাজ্যের ক্লান্তি মাখানো ভার গলায় আশফি বলল, “ভালোবাসা কোনো পোশাকের মতো না, যে পুরনো হয়ে গেলে বদলে ফেলা যায়। আমার ভালোবাসা আগেও স্রেফ তোমার জন্যই ছিল, সারাটাজীবনও তোমার জন্যই৷ কেবল তার পরিমাণ আগের চেয়েও বেশি। কিন্তু কতটা বেশি, তা কোনো মাপকাঠিতে মাপা সম্ভব নয়।”
তারপর হঠাৎ ওর কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে চোখদুটো বুজল সে। তার তপ্ত নিঃশ্বাস মারিশার সারা মুখে আছড়ে পড়তে লাগল তখন। কণ্ঠে আশ্চর্য এক কোমলতা মিশিয়ে গাঢ় স্বরে বলল ওকে, “ভালোবাসতে পারব কি না, এই প্রশ্নটাই আজ অর্থহীন। তুমি ছেড়ে যাওয়ার পরও এক বিন্দু ঘৃণা মনে লালন করতে পারিনি তোমার জন্য৷ নিজের ওপর নিজেই তখন হতাশ হয়েছি, যখন চেয়েও তোমার জায়গাটা অন্য কাউকে দিতে পারিনি৷ এক সময় হাপিয়ে উঠে সেই চেষ্টাই ছেড়ে দিয়েছি। তোমার এই বদলে যাওয়া অস্তিত্ব, এই ক্ষতবিক্ষত মন, সবটুকু নিয়েই আজ তোমায় চাই আমি। আমার সেই পুরনো গুরাস হোক বা আজকের মারিশা, দিনশেষে এই একটি নারীই আমার সুখে থাকার একমাত্র কারণ।”
প্রগাঢ় মমতায় মারিশার কপালে ঠোঁটদুটো চেপে ধরে রইল দীর্ঘক্ষণ৷ তারপর খুব মৃদুস্বরে বলল, “সেই চারটে মাস আমি তোমাকে গড়িনি, মাহি৷ আমি শুধু তোমার ভেতরের আসল মানুষটাকে চিনে নিয়েছিলাম। পরিচয়ের প্রথম দিন থেকেই তোমার দৃষ্টিভঙ্গি, তোমার ওই তাচ্ছিল্যভরা আচরণ অসহ্য লাগলেও তোমাকে এড়িয়ে যাওয়ার শক্তি আমার ছিল না। বসন্তের গুরাসে মাতোয়ারা এই পাহাড় আর অরণ্য যেভাবে আমায় টানে, তোমার মাঝে আমি ঠিক সেই আদিম টানটাই সব সময় অনুভব করে এসেছি।”
মারিশার দু চোখে তখন একরাশ সুখ আর মুগ্ধতা মিলেমিশে একাকার। এই পাহাড়ি বুনো ফুলের নামটার আড়ালে লুকিয়ে থাকা আশফির এই গভীর মায়াটা সে যেন আজ নতুন করে আরও একবার তীব্রভাবে অনুভব করল, “এজন্যই বুঝি গুরাস ডেকেছিলে আমায়?”
এক পল ওর দিকে স্থির চোখে চেয়ে তারপর বলল আশফি, “আমার অবচেতন মনই ওটা ডেকে ফেলেছিল। তবে এবার আমার গুরাসকে আমি এমনভাবেই আগলে রাখব, যাতে পৃথিবীর আর কোনো আঘাত ওকে স্পর্শ করতে না পারে। আর এবার আমাদের গল্পের শেষটা আমি নিজের হাতে লিখব, সেখানে হারানোর কোনো শব্দ থাকবে না।”
কথাটা শেষেই তার চওড়া বুকে মারিশা এবার মুখ লুকিয়ে দুহাতে তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। এরপর হঠাৎ ওর কণ্ঠে পাহাড়ের মতো অটল এক দৃঢ়তা ঝরে পড়ল, “আর অন্য কোনো তৃতীয় ব্যক্তিও আমাদের ধারেকাছে যেন ঘেঁষতে না পারে। আমি আর কাউকেই এক মুহূর্তের জন্যও আমাদের মাঝে সহ্য করব না, আশফি।”
কথাগুলো শেষ হতেই আশফি মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। ওর দৃষ্টিতে ফুটে উঠল একটুখানি বিস্ময়। এই নিবিড় মুহূর্তের মাঝেও হিংসুটে মেয়েটা যে তৃতীয় ব্যক্তি বলতে পরোক্ষভাবে দিলিশাকেই বিঁধছে, সেটা বুঝতে ওর এক পলকও সময় লাগল না। খানিকক্ষণ স্থির চাউনিতে তাকিয়ে রইল মারিশার দিকে। যেন ওর মনের গহীনে লুকিয়ে থাকা সব সময়ের জেদটার প্রতি হতাশা ব্যক্ত করছে সে। তারপর হঠাৎ একটা গভীর শ্বাস টেনে মৃদু হতাশ কণ্ঠেই বলল, “মানে তুমি এখনো দিলিশাকে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারছ না?”
মারিশা একটুও না দমে সরাসরি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে জবাব দিল, “না, পারছি না। কারণ ও কতটা শেইমলেস, সেটা আমি বুঝেছি। প্রেমের নেশায় কেউ চূড়ান্ত পর্যায়ের শেইমলেস হলে সে কতদূর যেতে পারে, সেটা তোমার ধারণার বাইরে। তাই আমার পরিষ্কার কথা, হয় ও এখানে থাকবে আর আমরা অন্য কোথাও চলে যাব। নয়তো ও বিদায় হবে আর আমরা এখানে থাকব।”
আশফি এবার একটু নড়েচড়ে বসল। কপালে হালকা ভাঁজ ফেলে বিমর্ষ গলায় বলল, “আহ্হা মাহি! মাঝে মাঝে তুমি এত অবুঝের মতো কথা বলো যে আমার সত্যি খারাপ লাগে। ও যতই বেপরোয়া হোক না কেন, আমি নিজে সুযোগ না দিলে ও কি কিছু করার ক্ষমতা রাখে? নাকি তুমি আমাকেই বিশ্বাস করতে পারছ না বলে ওকে নিয়ে এত হীনম্মন্যতায় ভুগছ?”
মুখটা গোমড়া করে বিরক্তিতে অন্যদিকে ফিরে তাকাল মারিশা। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “তোমাকে বিশ্বাস না করলে ফাঁসটা ওর গলাতে লাগাতাম না, তোমার গলাতেই লাগাতাম।”
“কীহ্! তুমি তো দেখি সত্যিই আস্ত এক সাইকোপ্যাথ বউ হয়ে গেছ!” অবাক হওয়ার ভান করে কৌতুক মেশানো সুরে বলে উঠল আশফি। ওর চোখেমুখে তখন খানিকটা দুষ্টুমির আভাও।
মারিশা তাতে অধৈর্য হয়ে উঠল। কঠোর গলায় বলল, “কথা না ঘুরিয়ে তুমি সোজাসুজি ওকে আমার সামনে বলবে, ও যেন কালকের ফ্লাইটেই দেশে ফিরে যায়। আর তা না হলে অন্য কোনো হোটেলে শিফট করে।”
গলার স্বরে এবার ভীষণ মমতা আর স্নেহ মিশিয়ে ওকে বোঝাল আশফি, “জানিম, তোমার এই জেদ আর রাগে ঠাসা ছোট্ট মাথাটাতে এই সাধারণ কথাটা কেন ঢুকছে না যে, সম্পর্কে ও তোমার ননদ হয়। আমার আপন চাচাতো বোন সে। আর আমার সেই চাচা আমাকে নিজের ছেলের মতো ভালোবাসেন। দিলিশা আমার পরিবারের অংশ, এই মুহূর্তে তাই ও আমার দায়িত্বও। ততক্ষণ পর্যন্ত আমি ওর সঙ্গে এতটা দুর্ব্যবহার করতে পারব না, যতক্ষণ না ও তোমার বা আমাদের সম্পর্কের আর কোনো ক্ষতির কারণ হয়। এভাবে ওকে তাড়িয়ে দিলে আমার চাচা ভীষণ কষ্ট পাবেন। বুঝতে পারছ আমি কী বলছি?”
এবার যেন মারিশার ভেতরের তপ্ত জেদটা আশফির যুক্তির কাছে কিছুটা স্তিমিত হয়ে এল। ও জানে, ওর এই মানুষটা আবেগের চেয়ে নিজের দায়িত্ব আর নৈতিকতাকে সবসময়ই ওপরে স্থান দেয়। এজন্য যতই সে রাগ বা জেদ দেখাক, আশফি তার স্বভাবজাত শিষ্টাচার বিসর্জন দিয়ে দিলিশাকে তাড়াতে পারবে না৷ কিন্তু সে যে দিলিশাকে হাড়েহাড়ে চিনে ফেলেছে৷ তাই তো ওর অস্থিরতা অন্য জায়গায়। যে মেয়েটা আশফির এত কাছে অন্য এক নারীকে দেখার পরও ভেঙে পড়েনি, বরং মুহূর্তেই স্বাভাবিক হয়ে যাওয়ার অভিনয় করতে পারে। সে সাধারণ কেউ নয়।
মারিশার বারবার মনে হতে লাগল, দিলিশার এই শান্ত থাকাটা আসলে ঝড়ের পূর্বাভাস। আশফিকে পাওয়ার জন্য হয়তো চুপিসারে কোনো বড়ো পরিকল্পনা করছে সে, এই আশঙ্কাটা ওর মনের মধ্যে খচখচ করতে লাগল।
এদিকে ওর ভাবুক চেহারার দিকে তাকিয়ে মেকি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল আশফি। কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে অত্যন্ত করুণ স্বরে অভিযোগ করল, “আচ্ছা, এবার বুঝলাম৷ তো এজন্যই তুমি আমাকে অনাহারে রাখছ? মানে ব্যাপারটা কী হচ্ছে! অপরাধ করেছে দিলিশা, আর তার ফল ভোগ করছি আমি। এত বড়ো বেইনসাফি আমার আল্লাহ, আল্লাহর ফেরেশতা কেউ সহ্য করবে না, বলে দিলাম।”
মারিশা কোনো উত্তরই দিল না, শুধু একবার আড়চোখে ওর দিকে বাঁকা চাউনিতে তাকাল। আর ওর সেই চাউনি দেখে আশফি হুট করেই শব্দ করে হেসে উঠল। ভীষণ আদরে ওর গালটা টেনে দিয়ে হালকা মেজাজে বলল, “একদম চিন্তা কোরো না। তোমার বজ্জাত দেওরটা আজ রাতেই এখানে ল্যান্ড করছে। এসেই দিলিশার মামলা সে হ্যান্ডেল করবে বলেছে।”
বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৩০
“সত্যি! দিশান আসছে”, কণ্ঠে মুহূর্তেই একই সাথে বিস্ময় আর আনন্দের এক পশলা জোয়ার বয়ে গেল মারিশার।
“হুঁ”, মুচকি হেসে মাথাটা ওপর-নিচ দুলাল আশফি।
ওর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে কোমল গলায় বলল তারপর, “দেন আ বিগ সারপ্রাইজ অ্যাওয়েটস ইউ।”
