ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ২১+২২
তানিশা ভট্টাচার্য্য
তানভীর পরীক্ষা শেষ হয়েছে একসপ্তাহ হল। আজ শুক্রবার, তানভী স্কুলে এসেছে। এসে দেখে রিকি স্কুলের বাইরে গেটের সামনে মুখ নিচু করে অন্যমনস্ক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তানভী রিকির কাছে গিয়ে বলল
-“কিরে এখানে এভাবে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?..আর মেঘাদ্রি কোথায়..আসে নি এখনো..??”
তানভীর কথায় রিকি মুখ তুলে করুন দৃষ্টিতে তাকাল তার দিকে। রিকির চোখ মুখ লাল হয়ে ফুলে আছে। দেখে মনে হচ্ছে যেন অনেক কান্না করছে। রিকির এইরকম অবস্থা দেখে তানভী কপাল কুঁচকে তাকে জিজ্ঞেস করে
-“রিকি! কি হয়েছে তোর…??”
তানভীর কথা যেন রিকির কান পর্যন্ত পৌঁছাল না। সে নির্বাক হয়ে চেয়ে আছে। তানভী দেখে রিকির দুই চোখ ছলছল করছে। তানভী কি করবে বুঝতে না পেরে রিকির দিকে একটু এগিয়ে যায়। এমন সময় স্কুল শুরুর ঘন্টা পড়ে। রিকি তাড়াতাড়ি করে নিজের হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ মুছে নিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় তানভীকে বলল
-“চল”
তারপর তারা সেখান থেকে স্কুলের ভিতরে চলে যায়।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
অফিসের কেবিনে বসে ফোনে নিজের প্রনয়িনীর ছবি দেখতে মত্ত আর্ভিক। এমন সময় তার ফোনে একটা কল আসে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই কলটা রিসিভ করে আর্ভিক। ফোনের ওপাশ থেকে কেউ কিছু একটা বলতেই আর্ভিক শীতল কন্ঠে জবাব দিল
-“Okay. আমি কয়েক দিনের মধ্যেই আসছি।”
এরপর উওরের আশা না করেই কলটা কেটে দিল।
রিসেসের সময় তানভী আর রিকি স্কুল গ্ৰাউন্ডে বসে আছে। আজ মেঘাদ্রি স্কুলে আসেনি। তানভী অনেকক্ষণ ধরে রিকির সাথে কথা বলার চেষ্টা করছে, কিন্তু রিকি কোনো উত্তর না দিয়ে চুপচাপ বসে আছে। তানভীর এবার প্রচন্ড বিরক্ত লাগছে, তাই সে একরাশ বিরক্তি মিশ্রিত কন্ঠে বলল
-“এই কি হয়েছে তোর… তখন থেকে জিজ্ঞাসা করে যাচ্ছি কিছু বলছিস না।”
রিকি এবার কান্না মিশ্রিত কন্ঠে জবাব দিল
-“আমার সব শেষ হয়ে গেল রে তানভী। আমি অনেক বড়ো ভুল করে ফেলেছি…”
শেষের কথাগুলো বলার সময় রিকি কান্নায় ভেঙে পড়ে। তানভী হতভম্ব হয়ে যায় রিকির এমন কান্ডে। তানভী শান্ত কন্ঠে রিকি কে জিজ্ঞেস করে
-“রিকি কি ভুল করেছিস তুই ??”
রিকি কোনো কিছু না বলে কান্না করতে থাকে। তানভী এবার একটু নরম কন্ঠে বলল
-“আমাকে বল দেখবি মনটা একটু হালকা লাগবে..”
তানভীর কথা শুনে রিকি কান্না থামিয়ে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে যা যা হয়েছে সব কিছু বলল। সবকিছু শুনে তানভী বলল
-“তুই ওর সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করিস নি..?? ”
রিকি তানভীর দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকাল তারপর দৃষ্টিতে নামিয়ে বলল
-“অনেক চেষ্টা করেছি”
তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল
-“কিন্তু কোনো লাভ হয়নি… প্রথমে ফোন বন্ধ করে রেখেছিল। তারপর আমি অনেকবার কল করেছিলাম কিন্তু একটাও কল রিসিভ করেনি।”
তানভী অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে রিকির পানে। যে ছেলের মুখে সর্বদা হাসি লেগে থাকত, সবসময় নিজের কর্মকাণ্ডের দ্বারা তাদের কে মাতিয়ে রাখত, আজ তাকে এইরকম অবস্থায় দেখতে হবে সেটা তানভী কখনো কল্পনাই করেনি। হয়তো ভালোবাসা এমনই হয়। নিজের ভালোবাসাকে পেয়ে গেলে মনে হয় যেন পৃথিবীর সর্ব সুখ তোমার কাছে আছে, আর না পেলে পৃথিবীর সবকিছু এনে দিলেও সব কিছু নেই নেই লাগে। তানভীর এসব কল্পনার অবসান ঘটে রিকি কান্না মিশ্রিত কন্ঠ শুনে। রিকি তানভীর সামনে দুই হাঁটু মুড়ে বসে দুই হাত জোড় করে কাকুতি জানোর মতো করে বলল
-“তানভী… ওকে বল না অন্তত আমার সাথে যেন বন্ধুত্বটা রাখে… প্লিজ।”
রিকির এমন কর্মকাণ্ড গুলো দেখে তানভীর রিকিকে শান্তনা দেওয়ার মতো ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। তানভী রিকি কে বলল
-“এই এসব কি করছিস…উঠ তুই…উঠ বলছি।”
রিকি এবার বসে পড়ে। তানভী ওর পাশে গিয়ে বসে বলল
-“আমি তোকে সাহায্য করব। তুই প্লিজ আর কান্না করিস না।”
রিকি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না করার দরুন ঠিক ভাবে কথা বলতে পারছিল না, তাই সে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল
-“কি ভাবে…?”
তানভী সহসা জবাব দেয়
-“তোকে অনেক কষ্ট করতে হবে। হাল ছাড়লে চলবে না।”
রিকি বোকার মত চেয়ে আছে তানভীর দিকে। তানভী আবারও বলে
-“শোন তোকে কি কি করতে হবে বলে দিচ্ছি”
সব কিছু বলা হয়ে গেলে তানভী রিকি কে বলল
-“কি রে পারবি তো?”
রিকি সহসা জবাব দিলো
-“অবশ্যই পারব।”
এরপর দুজনে একেঅপরের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে ক্লাসে চলে গেল।
কোচিং এর সামনে মুখ গোমড়া করে দাঁড়িয়ে আছে মেঘাদ্রি। একটু পর তানভী এসে পিছন থেকে তার চোখ ধরে। মেঘাদ্রি একটু গম্ভীর কন্ঠে বলল
-“তানভী!”
মেঘাদ্রির এই রকম কন্ঠস্বর শুনে তানভী তার সামনে এসে কপাল কুঁচকে দাঁড়াল। তারপর বলল
-“কি হয়েছে, তোর কন্ঠস্বর এইরকম শোনাচ্ছে কেন?”
মেঘাদ্রি তার অভিব্যক্তি বজায় রেখে সহসা জবাব দেয়
-“কিছু না চল”
তানভী বলল
-“আরেহ দাঁড়া রিকি আসুক। তারপর যাব”
রিকির নামটা কানে যেতেই মেঘাদ্রির মুখশ্রীতে রাগের ছাপ প্রকাশ পেল। সে কন্ঠস্বর আগের থেকে কয়েকগুণ বেশি গম্ভীর করে তানভী কে বলল
-“তুই অপেক্ষা করতে চাইলে করতে পারিস, আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে আমি গেলাম।”
এই বলে মেঘাদ্রি সেখান থেকে চলে যেতে নিলে তানভী পিছন থেকে কয়েকবার ডাকে কিন্তু মেঘাদ্রি দাঁড়ালো না সে চলে গেল। অগত্যা তানভীও তার পিছন পিছন হাঁটা শুরু করল।
কোচিং শেষে দুই বান্ধবী একে অপরকে বিদায় জানাল তারপর মেঘাদ্রি বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল। আজকে রিকি কোচিং-এ আসেনি। তানভী গাড়ির জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো। এমন সময় আর্ভিক বাইক নিয়ে এসে থামলো তানভী সামনে। তারপর বলল
-“ওঠ”
তানভী চুপচাপ উঠে গেল। এরপর আর্ভিক বাইক স্টার্ট দিল। আধঘন্টা পর আর্ভিক বাইক থামাল একটা নির্জন রাস্তায়। তারপর তানভীকে নামতে বলল। তানভী নেমে পড়ল, তানভীর পাশাপাশি আর্ভিকও নেমে পড়ল। একটা জনমানবহীন পিচের রাস্তা, চারিদিক সবুজে ঘেরা, আর রাস্তার চারপাশে হলুদ বাল্বের আলো জ্বলছে। তানভী চারিদিকে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলো। তার ভীষণ ভয় লাগছে। এর মধ্যে আর্ভিক তাকে বলল
-“চল হাঁটা শুরু কর”
আর্ভিকের কথা মতো তানভী হাঁটা শুরু করল। সে যেন কলের পুতুলে পরিনত হয়েছে। চারপাশের প্রকৃতিতে এক মায়াবী ও থমথমে স্তব্ধতা। মাঝে মধ্যে মৃদুমন্দ বাতাস বইছে। তানভীর প্রচন্ড ভয় লাগছে আর্ভিক সেটা বুঝতে পেরে তার হাত আলতো করে চেপে ধরে। আর্ভিকের হঠাৎ এমন কান্ডে সারা শরীরে শিহরন বয়ে যায় ছোট্ট কিশোরীর। সে এবার মনে কিছুটা সাহস পেল। এখন এই পরিবেশকে তার বেশ ভালো লাগছে।
কিছুটা দূর এগোতেই তানভী দেখল একটা চায়ের দোকান। দোকানটা খুব একটা বড়ো নয়, টিনের চাল একটা ছোট বাল্ব জ্বলছে আর দোকানের সামনে দুটো বেঞ্চ পাতা আছে। আর্ভিক তানভীকে নিয়ে ওই দোকানে গিয়ে দুটো চায়ের ওর্ডার করল। কিছুক্ষণ পর দোকানদার দু কাপ চা দিলেন তাদের কে।
চা শেষ করে আর্ভিক তানভীকে নিয়ে আরো একটু দূরে গেল। কিছুদূর যেতেই তানভী একটা কাগজ ফুলের গাছ দেখে বলল
-“আর্ভিক ভাই দেখুন ফুল গুলো কত সুন্দর”
আর্ভিক কোনো কিছু না ভেবে ফুল গুলো পারার জন্য এক লাফ দেয়। ফুল গুলো একটু উঁচু ডালে থাকলেও আর্ভিকের নাগালের বাইরে ছিল না। এরপর একগুচ্ছ ফুল এনে তানভীর সামনে ধরে। তানভী একগাল হেসে সেগুলো নিয়ে নিল। তারপর আর্ভিক কে বলল
-“Thank you আর্ভিক ভাই।”
আর্ভিক মুচকি হেসে তানভীকে নিয়ে আবারও হাঁটা শুরু করল। কিছুটা যেতেই দূরের আকাশটায় মেঘের গুরুগম্ভীর গর্জন আর বিদ্যুতের ঝিলিক আসন্ন বর্ষণের আগাম জানান দিল। আকাশের নীল রং পুরোপুরি মুছে গিয়ে সেখানে ঠাঁই নিল কালচে-বেগুনী আভা। বাতাসের গতি হঠাৎ বেড়ে গেল। আর্ভিক তানভীকে নিয়ে দ্রুত বাইকের কাছে ফিরে গিয়ে বাইক স্টার্ট দিল।
রাতের খাবার খেয়ে শুয়ে ফোন ঘাটছিল তানভী। তখনই হোয়াটসঅ্যাপে রিকির একটা মেসেজ এল। তানভী মুচকি হেসে মেসেজটার রিপ্লাই করল
“Okay এবার শুধু স্কুল যাওয়ার অপেক্ষা।”
তারপর সেখান থেকে বেরিয়ে এসে ফেসবুকে ঢুকলো। ফেসবুকে আসতেই তানভীর সামনে আর্ভিকের একটা অসম্ভব সুন্দর একটা ছবি এল। ব্ল্যাক কালারের শার্ট ইন করে পড়া তার হাতা গোটানো, ওপরের দিকে দুটো বোতাম খোলা, যার দরুন”𝐓” অক্ষরের লকেটটা দৃশ্যমান, ব্ল্যাক ফর্মাল প্যান্ট, লেদারের ঘড়ি, চুলগুলো সুন্দর করে স্টাইল করা।
আজ শনিবার, দুপুর ২ টোয় আর্ভিকের ফ্লাইট। আর্ভিক ১মাসের জন্য বিদেশ যাচ্ছে। সকাল থেকেই এক অজানা কারণে তানভীর মন খারাপ। আজ সকাল থেকে তানভী আর্ভিকের মুখোমুখি হয়নি। এমনকি সকালের খাবারটাও রুমে বসে খেয়েছে।
দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর আর্ভিক সবার থেকে বিদায় নিয়ে মেইন গেটের দিকে এগোল। তানভী তখনও নীচে আসেনি আর্ভিকও আর তাকে ডাকেনি। তানভী রুমের বেলকানি থেকে আর্ভিকের যাওয়ার পানে নিষ্পলক তাকিয়ে আছে। আর্ভিক যাওয়া থামিয়ে তানভীর রুমের বেলকানির দিকে তাকাল। কিন্তু ততক্ষণে তানভী সরে যায় সেখান থেকে। আর্ভিক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গাড়ির দিকে এগিয়ে চলল। হঠাৎ ই কারোর গানের শব্দে আর্ভিকের পা থমকে যায়। আর্ভিক পিছন ঘুরে দেখে তানভীর রুম থেকে গানের শব্দ আসছে। আর্ভিক সেদিকে একটু এগিয়ে গিয়ে কান পেতে ভালো করে শুনলো গানটা
“Tere bina zindagi se koi shikwa to nahin
Shikwa nahin, shikwa to nahin, shikwa to nahin
Tere bina zindagi bhi lekin zindagi to nahin
Zindagi nahin, zindagi nahin, zindagi nahin
Tere bina zindagi se koi shikwa to nahin”
আর্ভিকের চোখ জোড়া জলে ভোরে গেল। সে আর একমুহুর্ত সেখানে না দাঁড়িয়ে দ্রুত গিয়ে গাড়িতে উঠল। কিছুক্ষণ পর তানভী গান থামিয়ে বেলকানিতে গেল। সে দেখল আর্ভিক ভাই চলে গেছে। তখনই তানভীর ফোনে টুং করে একটা মেসেজ এল। তানভী ফোনটা হাতে নিয়ে দেখে আর্ভিকের নম্বর থেকে মেসেজটা এসেছে। সে মেসেজটা পড়ল, তাতে লেখা ছিল
ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ১৯+২০
“ডিয়ার Blue bird নিজের খেয়াল রাখবি।”
আর্ভিকের এই ছোট্ট মেসেজটা পড়ে তানভীর চোখের কোণ জলে চিকচিক করে উঠলো। তার অন্তরটা হুহু করে উঠল। বুকের ভেতরটা যেন মোচড় দিয়ে উঠলো।
