Home ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ২৩+২৪

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ২৩+২৪

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ২৩+২৪
তানিশা ভট্টাচার্য্য

একটি নির্জন পাহাড়ের উপর একটা বিলাসবহুল বাড়ির সবচেয়ে অন্ধকার রুমের একটা ভারী চামড়ার সোফায় বসে আছে অন্ধকারের রাজা। ধোঁয়াটে আলোয় তার অবয়বটা অস্পষ্ট হলেও তার উপস্থিতি পুরো ঘরের বাতাসকে ভারী করে রেখেছে। সবাই তাকে A.V Roy নামে চেনে। তার গার্ডস‌্ আর স্টাফরা ছাড়া, কেউ না জানে তার আসল নাম আর না দেখেছে তার মুখ। সে সবসময় নিজের মুখ ঢেকে রাখে।
তার পরনে ছিল একটা কালো শার্ট, তার উপর কালো কোট। কালো ফর্মাল প্যান্ট। কালো ঘড়ি ও বুট। হাতে কালো সানগ্লাস ধরে আছে। এক কথায় মাথা থেকে পা পর্যন্ত পুরোটাই কালোয় মোড়ানো। তার ইস্ত্রি করা শার্টের কলারটা নিঁখুত।

তার চোখের দিকে তাকালে মেরুদন্ড দিয়ে হিমস্রোত বয়ে যায়। তার চোখের মণি দুটো পাথরের মতো স্থির; সেখানে দয়া বা ক্রোধের কোনো ঝিলিক নেই, আছে শুধু এক গভীর শূন্যতা। সে কথা কম বলে কিন্তু যখন বলে, গলার স্বর খুবই কম থাকে—প্রায় ফিসফিসানি। তার কথা শুনে ভয়ে থরথর করে কাঁপে শহরের বড় বড় রাঘববোয়ালরা। শহরের পুলিশ কমিশনার থেকে শুরু করে আন্ডারওয়ার্ল্ডের কিলার, সবাই তার হাতের পুতুল।
তার চারপাশে সবসময় দেহরক্ষী থাকে, যারা সবসময় ছায়ার মতো তাকে অনুসরণ করে। তার একটা ফোন কলেই যেমন কারো ভাগ্য খুলে যায়, তেমনি একটা ছোট্ট ইশারায় আস্ত একটা সাম্রাজ্য ধুলোয় মিশে যেতে পারে।
এমন সময় একজন গার্ড এসে তাকে সেলুট জানিয়ে বলল

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

-“sir, সব কিছু রেডি আছে। সামনের সপ্তাহে মধ্যরাতে জ্যাকশনের লোকরা আট ভ্যান ড্রাকস এদেশ থেকে ইন্ডিয়ায় পাচার করবে। আর আমাদের কাছে খবর আছে ওই জ্যাকশন সেখানে উপস্থিত থাকবে”
গার্ডের কথার প্রতি উওরে তিনি বাঁকা হেসে হাতের ইশারায় তাকে চলে যেতে বললেন।

রিসেস হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে ক্লাস করছে সবাই। তানভী শারীরিক ভাবে ক্লাসে উপস্থিত থাকলেও মানসিকভাবে যেন অন্য জগতে ডুবে আছে। এর মাঝেই রিসেসের বেল বাজল। তার আওয়াজেই ধ্যান ফিরল তানভীর। সে রিকির দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় কিছু একটা বলল। এরপর রিকি সেখান থেকে চলে গেল। তানভী মেঘাদ্রিকে ডেকে বলল
-“ওই একটু লাইব্রেরি যাবি আমার সঙ্গে। একটু দরকার আছে। একটা বই জমা দেবো।”
মেঘাদ্রি রাজি হয়ে যায়। এরপর দুজন মিলে লাইব্রেরির দিকে হাঁটা শুরু করে। লাইব্রেরিটা সেকেন্ড ফ্লোরের একদম শেষে রয়েছে। সেকেন্ড ফ্লোরে উঠে কিছুটা যেতেই তানভী থমকে দাঁড়ায় তাকে দেখে মেঘাদ্রিও দাঁড়িয়ে পড়ে। তানভী একটু বিরক্তি নিয়ে একটু জোরেই বলল

-“আরে যা! আমি তো আর একটা বই আনতেই ভুলে গেছি।”
তারপর তানভী মেঘাদ্রির দিকে তাকিয়ে বলল
-“মেঘাদ্রি তুই এগো আমি বইটা নিয়ে আসছি। বেশিক্ষণ সময় লাগবে না ২ মিনিটে যাব আর ৫ মিনিটে আসব।”
মেঘাদ্রি কিছু বলতে যাবে এর আগে তানভী দৌড় দিল। মেঘাদ্রি তানভীর যাওয়ার পানে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল, তারপর লাইব্রেরির দিকে যেতে লাগল। লাইব্রেরির কাছাকাছি আসতেই কেউ একজন মেঘাদ্রির হাত ধরে টেনে একটা ফাঁকা ক্লাসরুমে নিয়ে গেল। মেঘাদ্রি ভয়ে দ্রুত চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিল।

-“মেঘাদ্রি!”
পরিচিত কন্ঠস্বর কানে যেতেই মেঘাদ্রি চোখ মেলে তাকাল। সামনের ব্যাক্তিটা আর কেউ নয় স্বয়ং রিকি। মেঘাদ্রি অগ্নিদৃষ্টিতে তাকাল রিকির দিকে। মেঘাদ্রি একটানে রিকির থেকে হাত ছাড়িয়ে বেরিয়ে যেতে নিলে রিকি আবারও তার হাত চেপে ধরে করুন দৃষ্টিতে তাকাল মেঘাদ্রির পানে। তারপর অতি শান্ত কন্ঠে বলল
-“মেঘাদ্রি একটাবার আমার কথাটা শোন প্লিজ।”
মেঘাদ্রি কোনোরকম প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না। চুপচাপ অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রিকি এবার মেঘাদ্রির সামনে দুই হাঁটু মুড়ে বসে হাত জোড় করে করুন কন্ঠে বলে

-“তুই আমার ওপর হাজার বার রাগ করবি… হাজার বার রিজেক্ট করবি তবুও আমি আরো একবার তোকে মানানোর চেষ্টা করব । It’s not because I don’t respect myself … It’s because … আমি নিজের আত্মসম্মানের থেকে তোকে বেশি ভালোবাসি… তোকে হারানোর ভয় আমাকে ভিতর থেকে শেষ করে দেয়….!! হতে পারে তুই কখনও আমার অনুভূতি গুলোকে বুঝবি না🫠… But it’s ok 🙂… আমি তোকে জোর করে বোঝাতেও চাই না…!! Because it’s not about convincing you… it’s about being true… it’s about trying one more time…আর আমি তোতো দিন ট্রাই করব যত দিন না আমি পুরোপুরি শেষ না হয়ে যাই…”
রিকি একটু থামল তারপর আবার বলা শুরু করল

“এমন টা নয় যে আমার খারাপ লাগে না…যখন কেউ থাকে না আমি একা থাকি তখন ভিতরের কষ্ট গুলোর বহিঃপ্রকাশ ঘটে…কারণ I’m the only one who is only none….!! এটা জানার পরেও যে… I’m not your choice … যখন আমি পুরোপুরি ভেঙে চুড়ে শেষ হয়ে যাব তখনও আমার মুখে তোর নাম থাকবে…। প্লিজ আমার ভুলটা কে ক্ষমা করে দে… আর কখন ও এমন করব না…। তুই প্লিজ বন্ধুত্বটা শেষ করিস না প্লিজ। আমি কথা দিচ্ছি আর কখনও বলব না যে তোকে ভালোবাসি। নিজের অনুভূতি গুলোকে সব মাটি চাপা দিয়ে দেবো। প্লিজ মেঘাদ্রি আমাকে ক্ষমা করে দে।”

রিকির কথা গুলো শুনে মেঘাদ্রি অবাক নয়নে তাকাল তার দিকে। সে কি বলবে কি করবে বুঝতে পারছে না।মেঘাদ্রিকে নিশ্চুপ হয়ে থাকতে দেখে রিকি ভাঙা গলায় আবার বলল
“সব কী আবার আগের মত করে নেওয়া যায় না…!?”
মেঘাদ্রি গলা ঝেড়ে শক্ত কন্ঠে রিকি কে বলল
-“রিকি ওঠ! কেউ দেখে ফেললে ব্যাপারটা অন্য দিকে যাবে।”
এই বলে মেঘাদ্রি সেখান থেকে বের হয়ে গেল। রিকি হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল তারপর দৌড়ে মেঘাদ্রির পথ আটকে দাঁড়াল। মেঘাদ্রি মাথা নিচু করে হাঁটছিল হঠাৎ সামনে কাউকে দাঁড়াতে দেখে চোখ তুলে তাকাল। সামনে রিকি দুইহাত জোড় করে করুন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। রিকিকে ওই দেখে কপাল কুঁচকায় মেঘাদ্রি। রিকি কান্না মিশ্রিত কন্ঠে বলল

-“প্লিজ মেঘাদ্রি একটা সুযোগ দে। দেখ এত বছরের বন্ধুত্ব, এই ভাবে শেষ করিস না।”
মেঘাদ্রি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শীতল কন্ঠে জবাব দিল
-“ঠিক আছে। দ্বিতীয়বার যেন এই ভুলটা না হয়।”
মেঘাদ্রির কথাটা শুনেই রিকি আনন্দে মেঘাদ্রির হাত ধরতে এলে তার শীতল চাহনি দেখেই ভয়ে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। এতক্ষণ ধরে সবকিছুই আড়াল থেকে দেখছিল তানভী, এরপর একগাল হেসে সেখান থেকে দৌড় দিল।
মেঘাদ্রি ক্লাসে এসে দেখে তানভী তার পা দুটো হাত দিয়ে চেপে ডেস্কে বসে আছে। মেঘাদ্রি তার কাছে গিয়ে বলল
-“পায়ে হাত দিয়ে বসে কি করছিস তুই? ৫ মিনিট আমাকে দাঁড়াতে বলে আর তোর তো কোনো পাত্তা নেই।”
তানভী সহসা জবাব দিল

-“দৌড়ে আসতে গিয়ে পায়ে লেগেছে। তাই যেতে পারিনি”
মেঘাদ্রি তানভীর পায়ের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল
-“দেখি কোথায় লেগেছে!”
তানভী তৎক্ষণাৎ মেঘাদ্রির হাত ধরে বলল
-“পায়ে হাত দিচ্ছিস কেন ? পায়ে হাত দিবি না।”
মেঘাদ্রি তানভীর কথার পাত্তা না দিয়ে তানভীর পায়ে হাত দেয় এবং কোথায় লেগেছে সেটা দেখে। তারপর একটু বিরক্তিভাব নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে বলল

-“পায়ে কি চাকা লাগানো..!? সব সময় দৌড়াতে হয় কেন?”
তানভী কিউট মুখ বানিয়ে হাসল। রিসেসের পরে তানভীদের পরীক্ষার ফলাফল জানানো হল। মেঘাদ্রি ক্লাসে সবার থেকে সবচেয়ে বেশি নম্বর পেয়েছে। রিকি আর তানভী একই নম্বর পেয়েছে। রিকি বেজায় খুশি সে যে এত নম্বর পাবে সেটা কল্পনাও করেনি। অন্য দিকে তানভীর মন খারাপ সে আর একটু বেশি আশা করেছিল। মেঘাদ্রি তানভীকে শান্তনা দিচ্ছে। অন্য দিকে রিকিকে ধরে কে সে সমানে হেসে যাচ্ছে লাফালাফি করছে। মেঘাদ্রি রিকি কে ধমক দিয়ে বলল
-“এই অসভ্য ছেলে বাঁদরের মতো লাফানো বন্ধ কর।”
মেঘাদ্রির ধমক খেয়ে রিকি লাফালাফি বন্ধ করে চুপচাপ বসে পড়ল নিজের ডেস্কে।

স্কুল থেকে মাত্র ফিরেছে তানভী। আজকে অভিক সাহেব অফিসে গিয়েছেন। ঋষি কলেজ থেকে ফেরেনি এখনো। আর্ভিকের মা তানভীর জন্য খাবার বেড়ে ডাক দেন। তানভী ফ্রেশ হয়ে এসে চুপচাপ খাবার খেতে লাগল। আর্ভিকের মা তানভীর মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বললেন
-“পরের বার ভালো করে পরীক্ষা দিস গুল্লু। এখন আর মনখারাপ করিস না।”
তানভী চুপচাপ খাবার খেয়ে নিল এরপর একটু রেস্ট করে সঙ্গে সঙ্গে পড়তে বসে গেল তানভী। কারণ আজকে সোহাগ একটু আগে পড়াতে আসবে।
সোহাগ পড়িয়ে চলে গেছে আধঘন্টা হয়েছে। তানভী পড়ার টেবিলে বসে হোমওয়ার্ক করছে। এমন সময় তানভীর ফোনে রিকির কল এল। তানভী কলটা রিসিভ করল, ওপাশ থেকে রিকি প্রফুল্ল মেজাজে বলল

-“প্ল্যান A সাকসেসফুল। প্ল্যান B টা কবে এপ্লাই করব?”
তানভী সহসা জবাব দিল
-“কিছু দিন ওয়েট কর।”
রিকি ‘ঠিক আছে’ বলে কলটা কেটে দিল। এরপর তানভী নিজের পড়ায় মনোযোগ দিল। কিছুক্ষণ পর তানভীর ফোনে একটা মেসেজ এল। মেসেজের আওয়াজে তানভী ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাল। সে দেখল আর্ভিকের নম্বর থেকে মেসেজটা এসেছে। তানভী অজান্তেই হেসে ফেলল। তারপর ফোনটা নিয়ে মেসেজটা পড়ল
“কম নম্বর পেয়েছিস বলে মনখারাপ করিস না। পরের বারে এর থেকে ভালো করার চেষ্টা করবি।”
মেসেজটা পড়ে তানভীর সব মনখারাপ যেন মুহূর্তেই হারিয়ে গেল। তানভী কিছু একটা টেক্সট করতে যাবে তার আগেই রাখী রায়চৌধুরী তানভী কে খেতে ডাকলেন। তানভী ফোন রেখে দ্রুত চলে যায়।

কলকাতার একটি বিলাসবহুল বাড়ির কারুকাজ করা শ্বেতপাথরের বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে তানভী। আজ তার মন এক অজানা বিষন্নতায় ভরা। সে নিজেও জানে না এর কারণ কি। শরতের আকাশ সাধারণত নীল আর সাদা মেঘের ভেলায় মাখামাখি থাকে, কিন্তু আজকের বিকেলটা একটু অন্যরকম। দিগন্তে সূর্য যখন বিদায় নিচ্ছে, মেঘের গায়ে লেগে আছে রক্তের মতো লাল আর বেগুনী রঙের আভা।

গঙ্গার দিক থেকে ধেয়ে আসা হালকা ঠান্ডা হাওয়া তানভীর কোমোর পর্যন্ত এলোমেলো চুলগুলোকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। এই বাতাসে শিউলি ফুলের একটা ক্ষীণ গন্ধ মিশে আছে, যা তাকে হয়তো ফেলে আসা কোনো পুরোনো স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে। বেলকনিতে রাখা দামী আরামকেদারা আর বিদেশি লতানো গাছগুলো সুন্দর হলেও এই মুহূর্তে তানভীর একাকীত্বকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। তার হাতের কফির কাপটা অনেকক্ষণ আগেই জুড়িয়ে গেছে, কিন্তু সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। দূরে গগনচুম্বী অট্টালিকাগুলোর পাশ দিয়ে একঝাঁক পাখি তাদের বাসায় ফিরছে। তাদের কলকাকলি এই নিস্তব্ধ বিকেলটাকে যেন আরও বেশি একা করে দিয়েছে তানভীর কাছে।

সে চুপচাপ রেলিংয়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার উদাস দৃষ্টি আকাশের ওই দিগন্তে আটকে আছে। যেখানে দিন আর রাত এক হয়ে যায়। চোখের পাতায় জমাট বাঁধা বিষণ্ণতা আর ম্লান মুখশ্রী বুঝিয়ে দিচ্ছে, এই বিলাসবহুল প্রাসাদের চাকচিক্য তার মনের ভেতরের শূন্যতা ঢাকতে পারছে না। শরতের এই শান্ত বিকেল তার মনের বিষাদকে যেন এক সুরম্য কাব্যে রূপান্তর করেছে। এমন সময় তানভীর রুমে থাকা ফোনটা বেজে উঠল। তানভী রুমে এসে কফির কাপটা বেডসাইড টেবিলে রেখে কলটা রিসিভ করে আহ্লাদী কন্ঠে বলল

-“হ্যালো বাবা!..”
-“কেমন আছো মামনি ?”
রুদ্র বাবু স্বাভাবিক কন্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন। তানভী একটু হেসে জবাব দিল
-“ভালো আছি। তোমারা সবাই কেমন আছো বাবা?”
-“সবাই ভালো আছি। আচ্ছা মামনি তোমার আঙ্কেল কোথায়? ফোন তাকে দাও তো।”
তানভী রুম থেকে বেরিয়ে এসে অভিক সাহেবের রুমে গেল। সে দেখল রুমের দরজা বাইরে থেকে লক করা। তারপর সে নিচে গেল। অভিক সাহেব সোফায় বসে টিভি দেখছেন এবং চা আর পকোড়া খাচ্ছেন। তানভী গিয়ে ওনার দিকে ফোনটা এগিয়ে দিয়ে বলল

-“আঙ্কেল, বাবা কথা বলবে।”
তানভীর কথাটা মনোযোগ কাড়লো অভিক সাহেবের। তিনি তানভীর থেকে ফোনটা নিয়ে খুশ মেজাজে বললেন
-“হ্যালো! বল!!”
রুদ্র বাবু সহসা জবাব দিলেন
-“তোর ফোনটা কোথায়?
-“রুমে আছে।”
রুদ্র বাবু বললেন
“আচ্ছা ছাড়…বৃন্দাবন যাবি ?”
রুদ্র বাবুর কথায় অভিক সাহেব একটু কপাল কুঁচকালেন। তারপর জিজ্ঞাসু কন্ঠে বললেন

-“হঠাৎ বৃন্দাবন কেন?”
-“আরে এই অক্টোবর মাসের ১৫ তারিখে তানভী মামনির জন্মদিন। তাই ভাবলাম ওর সতেরো বছরের জন্মদিনটা ওখানে কাটাবো।”
-“ওও আচ্ছা।”
-“তোরা সবাই যাবি তো??”
অভিব সাহেব একটু সময় নিয়ে ভাবলেন, তারপর বললেন
-“না রে আমার যাওয়া হবে না। আর্ভিক নেই অফিসে একটু কাজের চাপ আছে। আর আমি না গেলে গিন্নিও যাবে না। তুই বরং ঋষিকে নিয়ে যা।”
রুদ্র বাবু বললেন

-“ঠিক আছে। তাহলে মামনি আর ঋষি কে ১০ তারিখে পাঠিয়ে দিস। আমারা ১১ তারিখ ভোরবেলা রওনা দেবো।”
অভিক সাহেব সম্মতি জানিয়ে ফোনটা কেটে দিলেন।
রাতের বেলা খাবার পর অভিব সাহেব ঋষি আর তানভীকে রুমে ডাকলেন। কিছুক্ষণ পর ঋষি রুমে এল। তার কিছুক্ষণ পর তানভী অভিক সাহেবের রুমের চাপানো দরজায় নক করে বলল
-“আঙ্কেল আসব !?”
অভিক সাহেব সহসা জবাব দিলেন

-“এসো মামনি।”
তানভী এসে ঋষির পাশে দাঁড়ায়। অভিক সাহেব দুজনের উদ্দেশ্যে বললেন
-“ঋষি, মামনি তোমারা নিজেদের জিনিসপত্র সব কিছু প্যাকিং করে নাও।”
অভিক সাহেবের কথায় ঋষি ওনাকে জিজ্ঞাসা করল
-“বাবা আমরা কোথায় যাচ্ছি ?”
ছেলের কথার প্রতি উত্তরের অভির সাহেব বললেন
-“আমরা কোথাও যাচ্ছি না। রুদ্র আঙ্কেলরা মামনির জন্মদিন পালন করার জন্য বৃন্দাবন হয়ে যাচ্ছে। আমাদেরকে যেতে বলেছিল কিন্তু তোমার ভাইয়া নেই তাই অফিসের সব কাজ ফেলে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই তুমি যাবে তাদের সাথে।”
-“আচ্ছা বাবা ঠিক আছে।”

কতগুলো একঘেয়ে সূর্যোদয় আর যান্ত্রিক সূর্যাস্ত পেরিয়ে আজ সেই মুক্তির দিন। যেদিন তানভীরা সপরিবারে সবাই মিলে বৃন্দাবনের উদ্দেশ্যে রওনা দেবে। ঋষি আর রুদ্র বাবু মিলে গাড়িতে লাগেজ গুলো তুলছে। সব কাজ শেষে উনারা সবাই গাড়িতে উঠে পড়েন। তারপর সবাই হাতজোড়ো করে একটি মন্ত্র উচ্চারণ করলেন
“বক্রতুণ্ড মহাকায় সূর্যকোটি সমপ্রভ।
নির্বিঘ্ন কুরু মে দেব সর্বকার্য়েষু সর্বদা।।”
কোনো যাত্রা বা শুভ কিছু শুরু করার আগে এই মন্ত্র জপ করলে,যাত্রা শুভ হয় এবং কাজটি সফল হয়। তারপর ভগবানকে স্মরণ করে প্রনাম করল প্রত্যেকে। এরপর এয়ারপোর্টের জন্য রওনা দেয়।

শহরের বুক চিরে যখন অশুভের অট্টহাসি আকাশ ছোঁয়, তখন সেই অন্ধকারের গভীরে আর এক আঁধার ডানা মেলে। তিনি কোনো সাধারণ রক্ষক নন; তিনি সেই দণ্ডনায়ক, যাঁর হাতে অপরাধের রক্ত মাখা থাকে ঠিকই, কিন্তু যাঁর হৃদয়ে স্পন্দিত হয় আর্তের হাহাকার।
তার ভারি বুটের শব্দ মার্বেলের মেঝেতে প্রতিধ্বনিত হয় না, বরং এক অমোঘ পরিণতির ঘোষণা দেয়। তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা ছায়াময় বাহিনী জানে, আজ তারা কোনো লুটের নেশায় বেরোচ্ছে না; আজ তারা বেরোচ্ছে এক কালবৈশাখী হয়ে, যা ধুয়ে মুছে দেবে সমাজের আবর্জনা গুলো কে।
বাইরে ঝোড়ো হাওয়া বইছে। তিনি কোটের কলারটা তুলে নিলেন। শহরের গলিতে আজ পাপিষ্ঠদের আর্তনাদ শোনা যাবে, আর কাল ভোরের সূর্য দেখবে এক নতুন পৃথিবীর রেখা। মাফিয়া হলেও তিনি আজ ঈশ্বরপ্রদত্ত এক ‘প্রয়োজনীয় শয়তান’।

কিছুক্ষণের মধ্যেই A.V Roy নিজের গার্ডসদের নিয়ে উপস্থিত হয় জ্যাকশনের ডেরায়। এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে থাকে তারা। হঠাৎ আক্রমণে জ্যাকশনের লোকরা হতভম্ব হয়ে যায়। তারপর তারাও গুলি চালাতে থাকে। শুরু হয় এক মহাযুদ্ধের। অবশেষে পরাজিত হয় শত্রু পক্ষ। A.V Roy এরপর তার গার্ডসদের আদেশ দেন মুহূর্তে সমস্ত ড্রাগসের গাড়ি ভেঙে ধুলোয় মিশিয়ে দেয় গার্ডসরা। একটা বন্ধ কক্ষ থেকে গোঁগানির আওয়াজ শুনতে পেয়ে A.V Roy ওই কক্ষের দরজাটা ভাঙার আদেশ দেন। দরজা ভাঙার সাথে সাথে দেখা গেল ২০ জন নারী বাঁধা অবস্থায় মেঝেতে পড়ে আছে। প্রত্যেকের অবস্থা খুবই শোচনীয়। এই নারীদের কে পাচারের উদ্দেশ্যে আনা হয়েছিল। তিনি গার্ডসদের কে বললেন

-“এনাদের কে সুরক্ষিত স্থানে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করো।”
গার্ডরা ওনার কথা মতো কাজ শুরু করে। তখনই একজন গার্ড এসে বলল
-“স্যার জ্যাকশন দেশের বাইরে পালিয়েছে। আমারা তাকে ধরতে ব্যর্থ হয়েছি। ওকে কেউ আগে থেকে সাবধান করেদিয়েছিল।”
গার্ডের কথা শুনে A.V Roy রাগে চোখ বন্ধ করে বন্ধুক তাক করে নিজের এক গার্ডকে কাউন্টার করে দেন। তারপর ভয়ানক অট্টহাসি হেসে বলেন
“এই A.V Roy এর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা।”
এরপর তিনি কিছুক্ষণ নীরব থেকে আবারো বললেন
-“অন্ধকার অন্ধকারকে দূর করতে পারে না, কিন্তু আমি সেই অন্ধকার, যা আলোর পথ আটকে রাখা কাঁটাগুলোকে উপড়ে ফেলে।”

কিছুক্ষণ হল তানভীরা আগ্রা বিমানবন্দরে (Kheria Airport – AGR) নেমে প্রাইভেট গাড়িতে উঠে মথুরার উদ্দেশ্যে রওনা দিল। অনেকক্ষণ ধরে যাত্রা করার দরুন সকলেই ক্লান্ত ছিল। কিছুটা দূর যেতেই তৃষাণ একটু বিরক্ত হয়ে বলল
-“আর কতদূর!.. আমার আর ভালো লাগছে না। আমাকে বাড়ি দিয়ে আসো।”
তৃষাণের কথা শুনে রুদ্র বাবু বললেন
-“ধৈর্য্য ধরতে শেখো। এই বয়সে এত অধৈর্য্য হলে কি করে হবে।”
তৃষাণ বিরক্তি মাখা মুখ নিয়ে ঋষি কে বলল
-“ঋষি ভাইয়া একটা গল্প বলবে।”
ঋষি এতক্ষণ ঝিমাচ্ছিল। তৃষাণের কথা শুনে সে কিছু বলতে যাবে তার আগেই দোয়েল ব্যানার্জী তৃষাণকে ধমক দিয়ে বললেন

-“তোজো চুপচাপ বসো, সবাই ক্লান্ত। তাই অযথা কাউকে বিরক্ত করো না।”
মায়ের কাছে ধমক খেয়ে তৃষাণ মন খারাপ করে বসে থাকে। ভাই কে মন খারাপ করে বসে থাকতে দেখে তানভী তৃষাণ কে বলল
-“ভাই মন খারাপ করিস না। আয় আমি তোকে একটা গান শোনাচ্ছি।”
তানভীর কথায় তৃষাণের মুখে আনন্দের হাসি ফুটে উঠল। তাই সে উৎফুল্ল কন্ঠে বলল
-“ঠিক আছে দিভাই।”
-“আচ্ছা বেশ! কি গান শুনবি বল ?”
তৃষাণ কিছুক্ষণ ভাবে, তারপর বলল
-“বৃন্দাবন যাচ্ছি… তাহলে কৃষ্ণ ঠাকুরের গান করো।”
-“ঠিক আছে।”
এই বলে তানভী গলা ছেড়ে গান শুরু করল।

“অধরং মধুরং বদনং মধুরং
নয়নং মধুরং হসিতং মধুরম্ ।
হৃদয়ং মধুরং গমনং মধুরং
মধুরাধিপতেরখিলং মধুরম্ ॥
বচনং মধুরং চরিতং মধুরং
বসনং মধুরং বলিতং মধুরম্ ।
চলিতং মধুরং ভ্রমিতং মধুরং
মধুরাধিপতেরখিলং মধুরম্ ॥”

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ২১+২২

তানভীর গানের গলা আছে। সে গিটার নিয়ে গানের প্র্যাকটিস করে। তানভীর গান গাড়িতে থাকা সবাই খুব ভক্তির সাথে শুনছিল। এরমধ্যেই তারা মথুরায় পৌঁছে গেল। তানভীরা আজ রাতে ও কালকে মথুরাতে থেকে পরশু দিন বৃন্দাবনের জন্য যাত্রা শুরু করবে।

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ২৫+২৬