ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ১৭+১৮
তানিশা ভট্টাচার্য্য
“কতবার বোঝাবো বল
কতবার জানাবো বল
নিঃস্ব এ জীবনে শুধু তুই আমার সম্বল
কতবার বোঝাবো বল
কতবার জানাবো বল”
সকাল সকাল কারোর গান শুনে ঘুম ভাঙ্গে আর্ভিকের, বিছানা থেকে উঠে সেই গানের শব্দ অনুসরণ করতে করতে সে দেখলো শব্দটা তানভীর রুম থেকে আসছে। দরজাটা অল্প ঠেলে সে দেখল তানভী তার দিকে পিঠ করে বসে গিটার নিয়ে গান করছে, গানের শেষ লাইন গাইতেই আর্ভিক রুমে প্রবেশ করতে করতে গাওয়া শুরু করল
“এক পা দু’ পা করে তুই এলি এই মনে
শেখালি আমাকে ভালবাসার মানে
স্বপ্নে দেখেছি তোকে দু’চোখ ভরে
তোর ছোঁয়া না পেলে হয় মন বড়ই চঞ্চল
কতবার বোঝাবো বল
কতবার জানাবো বল
নিঃস্ব এ জীবনে শুধু তুই আমার সম্বল”
হঠাৎ-ই কারোর গানের শব্দ পেয়ে তানভী পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখল গানটা আর্ভিক গাইছিল। তারপর আর্ভিক গান থামিয়ে ঠোঁটের কোণায় হাসি নিয়ে তানভীকে বলল
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
-“বাহহ! তোর গানের গলা তো দেখি খুব সুন্দর।”
আর্ভিকের কথায় তানভী লাজুক হেসে মাথা নিচু করে নিল। আর্ভিক এবার স্বভাব সুলভ গম্ভীর কন্ঠে জিজ্ঞাসা করল
-“পড়া আর Homework গুলো হয়েছে?”
তানভী হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো আর্ভিক মৃদু হেসে বলল
-“Good! তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নিচে আয়, না হলে স্কুলের জন্য দেরি হয়ে যাবে।”
এই বলে আর্ভিক রুম থেকে বেরিয়ে গেল, এরপর তানভী বিছানা থেকে উঠে ওয়াশরুমে চলে গেল। তারপর স্নান করে একেবারে স্কুলের জন্য রেডি হয়ে বের হয়ে এল।
সকালে সবাই একসাথে ব্রেকফাস্ট করছিল, আর্ভিক রেডি হয়ে এসে তানভীর সামনে থাকা চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসল। তাকে দেখে অভিক সাহেব বললেন
-“আর্ভিক শুনলাম তুমি নাকি মামনিদের স্কুলে পড়াতে যাচ্ছো।”
-“হ্যাঁ বাবা, তুমি ঠিক শুনেছ।”
আর্ভিক স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই উওর দিল। অভিক সাহেব বললেন
-“কিন্তু কেন?”
আর্ভিকের মা আর্ভিকের প্লেটে খাবার বেড়ে দিলেন, আর্ভিক খাবারটা একটু খানি মুখে দিয়ে বলল
-“জানি না,ইদানিং খুব টিচিং প্রফেশানটা টানছে আমাকে তাই আর কি।”
আর্ভিক সাবলীল ভাবে উত্তর দিল তারপর আবার এক লোকমা খাবার তুলে মুখে দিল। অভিক সাহেব একটু চিন্তিত ভঙ্গিতে বললেন
-“আর তাহলে অফিসের কী হবে?”
আর্ভিক এবার খাওয়া থামিয়ে তার বাবার দিকে তাকিয়ে কন্ঠস্বর খাদে নামিয়ে বলল
-“চিন্তা করো না বাবা, আমি এমন কিছু করব না যাতে অফিসের কাজে কোনোরকম ক্ষতি হয়। আমি সারাক্ষন অফিসে থাকি, শুধু ক্লাস নেওয়ার ৩০ মিনিট আগে স্কুলে যাই, পর পর একাদশ আর দ্বাদশ শ্রেণীর ক্লাস নিয়ে আবার অফিসে জন্য বেরিয়ে যাই।”
আর্ভিকের কথায় অভিক সাহেব একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। হঠাৎ আর্ভিকের চোখ গেল তানভীর বাম হাতের দিকে, সঙ্গে সঙ্গে ভ্রু কুঁচকে কিছুটা গম্ভীর কন্ঠে বলল
-“এই মেয়ে, এই ঘড়িটা কেন পড়েছিস, তোকে কাল যে ঘড়িটা দিয়েছিলাম সেটা কোথায়?”
-“রুমে”
-“ওটা কী তোকে আমি রুমে রাখার জন্য দিয়েছি!?”
আর্ভিক বেশ জোরে ধমকে উঠল। এরুপ ধমক শুনে তানভী ভয়ে জড়সড় হয়ে গেল। আর্ভিক দাঁতে দাঁত চেপে তানভীকে বলল
-“যা ওটা পড়ে আয়।”
তানভী খাবার খেতে খেতে উঠে দৌড়ে রুমে গেল ঘড়িটা পড়তে। তানভীর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আর্ভিক রাগে বিড়বিড় করতে করতে বলল
-“ইচ্ছা করছে তুলে এক আছাড় দি। বেয়াদব কোথাকার।”
আর্ভিকের মা, ঋষি, আর অভিক সাহেব আর্ভিককে কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারলেন না। কিছুক্ষণ পর তানভী নীচে নেমে এল ততক্ষণে সবাই খাওয়া শেষ করে যে যার কাজে চলে গেছেন। তানভীকে দেখে আর্ভিকের মা বললেন
-“গুল্লু, আয় খাবারটা খেয়ে নে।”
তানভী গিয়ে খেয়ে নিল তারপর স্কুলে চলে গেল। স্কুলে মন খারাপ করে বসে আছে তানভী, রিকি আর মেঘাদ্রি তার কাছে গেল মেঘাদ্রি বলল
-“কিরে কি হয়েছে?”
তানভী কোনো উত্তর দিল না,তাই রিকি হাসতে হাসতে বলে উঠল
-“আরে তানভী মৌনব্রত রেখেছে”
রিকির এইরকম কথা শুনে মেঘাদ্রি তার দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকাতেই মুহূর্তের মধ্যেই রিকির হাসি উধাও হয়ে যায়। মেঘাদ্রি তারপর তানভীর পাশে বসে তাকে জিজ্ঞাসা করল
-“কি হয়েছে বল, আর্ভিক দাদা কিছু বলেছে?”
তানভী হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল তারপর বলল
-“ওনার দেওয়া ঘড়িটা পড়িনি বলে ধমক দিয়েছে সকালে”
মেঘাদ্রি তানভীর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল
-“আচ্ছা বাদ দে এসব, চল আমরা একটু ক্লাসের বাইরে থেকে ঘুরে আসি।”
তারপর ওরা তিনজন মিলে ক্লাসের বাইরে চলে গেল। করিডোরে ওরা তিনজন একদম সাইড দিয়ে হাঁটছিল হঠাৎ একটা ছেলে দূর থেকে ছুটে আসতে গিয়ে তার সাথে ধাক্কা লাগে মেঘাদ্রির, হঠাৎ ধাক্কায় তাল সামলাতে না পেরে মেঘাদ্রি নীচে পড়ে যায়। ছেলেটা মেঘাদ্রির ওপর মেজাজ দেখিয়ে বলল
-“এই মেয়ে, চোখে দেখে হাঁটতে পারো না অন্ধ নাকি! বেয়াদব একটা।”
এই বলে ছেলেটা চলে যেতে নিলে মেঘাদ্রি উঠে দাঁড়িয়ে ছেলেটা কে ডাকল ছেলেটা আসতেই মেঘাদ্রি রাগী কন্ঠে তাকে বলল
-“বেয়াদব আপনার বাচ্ছার বাবা! আর কি বললেন আমি অন্ধ চোখে দেখে হাঁটি না? তো শুনুন মিস্টার আমরা সাইড দিয়েই হাঁটছিলাম আর আপনি রাস্তার মাঝখানে থেকে দৌড়ে কোন ম্যারাথনে যাচ্ছিলেন! যাব কি প্রিন্সিপাল স্যারের কাছে কমপ্লেন করতে? যত্তসব!”
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে মেঘাদ্রি রিকি আর তানভী কে নিয়ে সেখান থেকে চলে গেল,আর ছেলেটা বোকার মতো তাদের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল তারপর নিজের মনেই বলল
-“কি ডেঞ্জারেস মেয়ে রে বাবা! কথা তো নয় যেন ৪৪০ ভোল্টের বিদ্যুতের ঝটকা”
আর্ভিক ক্লাস নিচ্ছিল আর একটা মেয়ে কন্টিনিউ তার দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল, আর্ভিক সেটা অনেকক্ষণ ধরেই লক্ষ্য করছিল তাই সে মেয়েটা কে বলল
-“Hey you, stand up.”
-“স্যার আমি!?”
-“Yes you, Stand up. What’s your name?”
-“জিয়া”
আর্ভিক তার সামনে থাকা টেবিলে দুহাতে ভর দিয়ে একটু ঝুঁকে দাঁড়িয়ে জিয়াকে বলল
-“তো মিস জিয়া, বলুন কি পড়ালাম আমি এতক্ষন ধরে”
জিয়া উওর না দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে, কারণ সে এতক্ষণ ধরে কোনো পড়াই শোনে নি। আর্ভিক এবার একটু গম্ভীর কন্ঠে বলল
-“কি হল Answer me, না বলতে পারলে ক্লাস থেকে বেরিয়ে যাও। পড়াশোনায় অমনোযোগ আমার একদম পছন্দ নয়।”
আর্ভিক এবার তানভীর নাম ধরে ডাকে, তানভী উঠে দাঁড়াতেই আর্ভিক তাকেও একি প্রশ্ন করল। তানভী খুব সুন্দর করে গুছিয়ে উত্তর দিল যা আর্ভিক সহ ক্লাসের প্রত্যেককে ইমপ্রেস করল। আর্ভিক জিয়ার দিকে তাকিয়ে রাগী কন্ঠে বলল
-“জিয়া Get out from my class.”
জিয়া ক্লাস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় তানভীর দিকে প্রচন্ড রাগী চোখে তাকাল, কিন্তু সেটা আর্ভিকের চোখ কে এড়ালো না।
আজ তানভীর কোচিং নেই তাই স্কুল থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়ে ফোনে তার বাবা মায়ের সাথে কথা বলছিল, কথা শেষ করে ফোন রাখতেই আর্ভিক তানভীকে ডেকে বলল
-“তানভী, ১০ মিনিটের মধ্যে বই খাতা নিয়ে আমার রুমে আয়।”
ঠিক ১০ মিনিটের মাথায় তানভী আর্ভিকের রুমে গেল, তাকে দেখে আর্ভিক একটা অ্যাকাউন্টস-এর অঙ্কের বই এগিয়ে দিয়ে বলল
-“You have only 20 minutes! এর মধ্যে এই ৫ টা প্রবলেম সলভ করে দেখা”
আর্ভিকের কথা মতো তানভী অঙ্ক গুলো করে আর্ভিককে দেখাল। তারপর কিছু থিওরি পড়িয়ে আর্ভিক ছুটি দিল তানভীকে। তানভী বই খাতা নিয়ে চলে যেতে নিলে আর্ভিক তাকে ডেকে বলে
-“কোচিং সপ্তাহে তিন দিন হয়, বাকি তিন দিন দুটো প্রাইভেট টিউটরের কাছে পড়বি,আর প্রতি দিন আমার কাছে পড়বি। মনে থাকবে।”
তানভী হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়িয়ে চলে যেতে নিলে আর্ভিক আবার তাকে ডেকে বলল
-“আর শোন, কালকে স্কুলে আমার ক্লাসের পর আমার কেবিনে আসিস তো। এখন যা।”
তারপর তানভী নিজের রুমে চলে গেল। প্রায় সন্ধ্যে ৭ টার দিকে তানভীর ইংলিশ টিউটর এসেছেন, তানভী তার কাছে পড়ছিল মেয়েটির নাম সোহাগ। খুবই নম্র ভদ্র স্বভাবের মেয়ে, তানভীকে অনেক যত্নের সঙ্গে পড়ায়, তানভী তাকে ভালোবেসে দিদি বলে ডাকে। সোহাগ নীলাদ্রির পিসির মেয়ে আর্ভিকের সাথে তাই আগে থেকে পরিচয় ছিল কিন্তু তানভী সেটা জানত না। ৯ টার দিকে তানভীকে পড়িয়ে সোহাগ রুম থেকে বেরিয়ে এল আর্ভিক রুমের বাইরে দাঁড়িয়েছিল, সোহাগ তাকে দেখে মৃদু হাসল, আর্ভিক ও মৃদু হেসে জিজ্ঞাসা করল
-“একা যেতে পারবে?”
-“হুমম পারব।”
-“আচ্ছা সাবধানে যেও।”
সোহাগ সম্মতিসূচক মাথা নাড়িয়ে চলে গেল। সোহাগ চলে যেতেই আর্ভিকের ফোনটা বেজে উঠলো আর্ভিক কলটা রিসিভ করল তখন ফোনের ওপাশ থেকে কেউ একজন কিছু একটা বলতেই আর্ভিক শীতল কন্ঠে জবাব দিল
-“Okay সব কিছু রেডি করে রাখো আমি কিছু দিনের মধ্যেই আসছি”
তারপর কলটা কেটে একটা ডেভিল স্মাইল দিল।
আর্ভিক ক্লাস নিচ্ছিল,জিয়া আজও ক্লাসের বাইরে। ক্লাস শেষে সকলের উদ্দেশ্য আর্ভিক বলল
-“Everyone, listen carefully কালকে আমি তোমাদের একটা টেস্ট নেব, প্রত্যেকে সেই মতো ভালোভাবে প্রিপারেশন নিয়ে আসবে। আর মিস তানভী তুমি আমার সাথে আমার কেবিনে এসো কিছু মডেল পেপার দেব সেটা প্রত্যেককে দিয়ে দেবে।”
এটা বলে আর্ভিক ক্লাস থেকে বেরিয়ে যায় তার পিছন পিছন তানভীও বেরিয়ে গেল। জিয়া অগ্নিদৃষ্টি নিয়ে তানভীর যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইল। আর্ভিক তারপর কেবিনে এসে তানভীর হাতে মডেল পেপার গুলো দিয়ে দিল সেগুলো নিয়ে তানভী সেখান থেকে চলে গেল, তানভী বেরিয়ে যেতেই জিয়া আর্ভিকের কেবিনে সরাসরি ঢুকে টেবিলের ওপর জোরে হাত দিয়ে আঘাত করে রীতিমতো চিৎকার করে বলল
-“ও এখানে কেন এসেছিল?”
আর্ভিক এতক্ষণ পিছন ঘুরে দাঁড়িয়ে বই নিয়ে কিছু একটা দেখছিল, জিয়ার হঠাৎ এমন চিৎকারে সে ভ্রু কুঁচকে পিছন ঘুরে দাঁড়ায়, তারপর বইটা জায়গা মতো রেখে হাত দুটো পকেটে ঢুকিয়ে জিয়ার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায়। জিয়া আবারও জিজ্ঞাসা করল
-“উত্তর দিন কেন এসেছিল এখানে?”
-“কী মনে করো নিজেকে। তোমাকে উত্তর দিতে আমি বাধ্য নই”
আর্ভিক কিছুটা গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলো, আর্ভিকের এমন কথায় জিয়া যেন তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল, সে আবারো বলতে লাগলো
-“কেন আসবে এখানে ও। বুঝেছি ওর মত মেয়েরা এরকমই হয়, এক নম্বরের চরিত্র….”
কথা শেষ করার আগেই আর্ভিকের শক্ত হাতের একটা থাপ্পড় এসে পড়ে জিয়ার গালে, আর্ভিক রীতিমতো হুংকার দিয়ে বলে
-“I am warning you! Next time তানভীর নামে কোন খারাপ কথা বলার আগে এই থাপ্পরের কথা যেন মনে থাকে।”
এই বলে আর্ভিক সেখানে এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে বেরিয়ে গেল ক্লাস নেওয়ার উদ্দেশ্যে। জিয়া গালে হাত দিয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো, তারপর কিছুটা সময় নিয়ে রাগে বিড়বিড় করে বলল
-“তোর জন্য আমি আজ থাপ্পড় খেলাম তানভী! তোকে তো আমি ছাড়বো না। এর শেষ আমি দেখেই ছাড়বো।”
কোচিং সেন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে তানভী, রিকি আর মেঘাদ্রি এখনো আসেনি তাই তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। তখনই সমগ্র তানভীর সামনে এসে বলে
-“Hi তানভী!”
সমগ্র কথায় তানভী তার দিকে তাকিয়ে দেখলো সমগ্র তার দিকে একটা হাত বাড়িয়ে হাসছে। তানভী কোন উত্তর দিচ্ছে না দেখে সমগ্র আবার বলল
-“আমি সমগ্র। Friends!?”
তানভী কিছু বলতে যাবে সেই মুহূর্তেই মেঘাদ্রি সেখানে এসে সমগ্র কে বলল
-“কোন প্রশ্নই ওঠে না। তানভী চল এখান থেকে”
ততক্ষণে রিকি ও চলে এলো, মেঘাদ্রি তানভী আর রিকিকে নিয়ে সেখান থেকে চলে গেল। কোচিং শেষে তানভী যখন বাড়ি চলে গেল তখন মেঘাদ্রি রিকিকে ডেকে বলল
-“জানিস তো এই সমগ্রর হাবভাব আমার ঠিক লাগছে না।”
-“কেন ও আবার কি করলো?”
-“আরে দেখছিস না ও তানভীর সঙ্গে কথা বলতে চাইছে আর কন্টিনিউ তার দিকে তাকিয়ে থাকে।”
-“তুই একটু বেশি ভাবিস ছাড় তো। আর যদি তেমন কিছু হয় আর্ভিক দাদা তো আছেই সামলে নেওয়ার জন্য।”
তারপর তারা দুজনে যে যার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
ঘড়ির কাঁটায় রাত তখন প্রায় ৮.৩০ বাইরে হালকা ঝোড়ো হাওয়া বইছে। তানভী আর্ভিকের রুমে বসে অঙ্ক করছিল। আর্ভিক রুমে ছিলো না কিছুক্ষণ পর রুমে এসে বিছানায় হেলান দিয়ে বসে তানভী কে বলল
-“হয়েছে, খাতাটা দে।”
তানভী খাতাটা এগিয়ে দেওয়ার সময় তার নজর গেল আর্ভিকের গলার চেনের ইংরেজি “T” অক্ষরের লকেটটাতে। এটা সে আগে ও দেখেছিল কিন্তু তখন কিছু মনে হয়নি, কিন্তু আজ তার খুব জানতে ইচ্ছা করছে এই “T” অক্ষরের নামের ব্যাক্তিটা কে। আর্ভিক তানভীর থেকে খাতাটা নিয়ে বলল
-“অঙ্কটা পড়ে বল, কী আছে”
-“আপনার গলার লকেটে থাকা “T” অক্ষরের নামের ব্যাক্তিটা কে?”
তানভীর এইরকম কথায় আর্ভিক খাতা থেকে মুখ তুলে ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকাল, তারপর একরাশ বিরক্তি নিয়ে বলল
-“এই সব লেখা আছে অঙ্কটাতে?”
আর্ভিকের কথায় তানভীর হুঁশ ফিরল, তারপর তার মনে পড়ল যে সে কি বলে ফেলেছে। মুহূর্তেই ভয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগলো এটা ভেবেই যে আর্ভিক এবার তাকে নিশ্চয়ই তুলে আছাড় মারবে। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে আর্ভিক স্বাভাবিক গম্ভীর কন্ঠে বলল
-“অঙ্কটা বল”
তানভী আর সময় নষ্ট না করে অঙ্কটা বলে দিল। এরপর কয়েকটা অঙ্ক আর থিওরি করিয়ে আর্ভিক তাকে ছুটি দিল। কিন্তু তানভীর মনে কৌতুহল থেকেই গেল তাই সে রুমে না গিয়ে আর্ভিকের রুমে দাঁড়িয়ে ছিল। তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আর্ভিক বলল
-“কিছু বলবি?”
-“বলুন না..আপনার গলার লকেটে থাকা “T” অক্ষরের নামের ব্যাক্তিটা কে?”
আর্ভিক স্বভাব সুলভ গম্ভীর কন্ঠে বলল
-“আমার বউ এর নামের প্রথম অক্ষর এটা”
-“কী নাম আপনার বউ এর??”
-“তোর জেনে কাজ নেই রুমে যা।”
এরপর তানভী রুমে চলে গেল।
পরের দিন সকালে তানভী যখন গাড়ি থেকে নেমে স্কুলের ভিতরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায় তখন জিয়া আর তার বন্ধুরা এসে তানভীর পথ আটকায়। জিয়া তানভীকে একটা বাজে গালি দিয়ে বলল
-“নিজেকে খুব চালাক মনে করিস তাই না! সবার কাছে ভালো ভদ্র সেজে থাকবি আর আর্ভিক স্যারের সাথে ঢলাঢলি করবি।”
জিয়ার কথার কোনো কিছুই তানভী বুঝতে পারছিল না, তাই সে বলল
-“জিয়া কী বলছিস এগুলো, আমি কখন আর্ভিক স্যারের সাথে….”
-“চুপ! একদম চুপ, আমারা কিছু বুঝিনা তাই না”
এই বলে জিয়া একটা জোরে থাপ্পর মারে তানভীর গালে, এরপর জিয়ার একটা বন্ধু পিছন থেকে খুব জোরে তানভী কে ধাক্কা মারে, তাল সামলাতে না পেরে তানভী নীচে পড়ে যায়, যার দরুন তানভীর হাতে থাকা ফোনটা ওর হাতে থেকে ছিটকে পড়ে গিয়ে ডিসপ্লে পুরোপুরি ভাবে ভেঙে যায়। আর পড়ে যাওয়ার ফলে তানভীর পা অনেকটা কেটে গিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল, সে অনেক কষ্টে উঠে দাঁড়ালে জিয়া খুব জোরে ওর গাল চেপে ধরে বলে
-“Arvik sir is only mine. মনে থাকে যেন।”
এরপর জিয়ারা সবাই সেখানে থেকে চলে যায়। ওরা চলে যেতেই তানভী ব্যাথা যন্ত্রণা আর অপমানে কান্না করে দেয় তারপর অনেক কষ্টে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে গাড়িতে গিয়ে বসল তারপর ড্রাইভার আঙ্কেলকে বলল
-“আঙ্কেল বাড়ি চলুন আমার খুব শরীর খারাপ লাগছে”
ড্রাইভার ও আর কোনো প্রশ্ন না করে তাকে নিয়ে চলে গেল। এমন সময় রিকি আর মেঘাদ্রি স্কুলে আসছিল তানভীকে চলে যেতে দেখে রিকি বলল
-“এই মেঘাদ্রি… ব্যাপারটা কি হল তানভী চলে যাচ্ছে কেন।”
-“আমি কী করে জানব, চল স্কুলে গিয়ে কাউকে জিজ্ঞাসা করে দেখি কি হল ওর”
এরপর ওরা দুজনে স্কুলে গিয়ে পুরো ঘটনাটা জানল। জিয়ার ওইরকম ব্যবহার শুনে দুজনের খুব রাগ হল, কিন্তু কিছু করার উপায় নেই কারণ পুরো ক্লাসকে নিজের হাতের মুঠোয় রেখে দিয়েছে জিয়া।
তানভীকে বাড়ি আসতে দেখে আর্ভিকের মা বললেন
-“গুল্লু কি হল এত তাড়াতাড়ি চলে এলি? আর তোকে এইরকম লাগছে কেন…শরীর খারাপ লাগছে?”
তানভী হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়িয়ে উপরে চলে গেল। তারপর রুমে এসে বিছানায় বসে কান্না করতে থাকে।
আর্ভিক প্রশ্ন হাতে ক্লাসে এল, সে দেখল যে তানভী ক্লাসে নেই তখন তার মাথায় রাগ চড়ে গেল। কিন্তু তারপর সে ভাবল “তানভী তো সকালে স্কুলের জন্য রেডি হয়েই বের হয়েছিল, তাহলে কোথায় গেল” হঠাৎ করেই অজানা এক ভয় গ্ৰাস করল আর্ভিক কে। আর্ভিক সবাইকে প্রশ্নপত্র দিয়ে বলল
-“Only 10 minutes.”
১০ মিনিট পর আর্ভিক সবার থেকে খাতা জমা নিয়ে, রিকি আর মেঘাদ্রি কে বলল
-“রিকি, মেঘাদ্রি খাতা গুলো নিয়ে আমার কেবিনে আসো।”
আর্ভিকের কথা মতো তারা দুজনে খাতা গুলো সব নিয়ে আর্ভিকের কেবিনে গেল। তাদের দেখে আর্ভিক বেশ চিন্তিত হয়ে বলল
-“আমার তানভী কোথায়?”
আর্ভিকের কথায় রিকি আর মেঘাদ্রি একে অপরের দিকে তাকিয়ে বলল
-“আসলে আর্ভিক দাদা…”
আর্ভিক এবার অধৈর্য্য হয়ে ধমক দিয়ে বলল
-“আমি আসল নকল কিছু জানতে চাই নি, আমি শুধু জানতে চেয়েছি আমার তানভী কোথায়?”
আর্ভিকের ধমক খেয়ে রিকি আর মেঘাদ্রি সকালে তানভীর সাথে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা খুলে বলল। সবকিছু শুনে আর্ভিক রাগে কাঁপতে লাগলো। যার শরীরে একটা ফুলের টোকা পর্যন্ত যে লাগতে দেয় না তার গায়ে কেউ হাত তুলেছে শুনে আর্ভিক রাগ কন্ট্রোল করতে না পেরে টেবিলে থাকা ফুলদানিটা সজোরে ছুড়ে মারল ফ্লোরে, মুহূর্তের মধ্যে সেটা গুঁড়ো হয়ে গেল। রিকি আর মেঘাদ্রি আর্ভিকের এমন রুপ দেখে ভয়ে কেঁপে উঠল।
ক্লাসে বসে জিয়া তার বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলছিল, এমন সময় স্কুলের ঘন্টা দেওয়ার লোকটা এসে বলল
-“জিয়া তোমাকে প্রিন্সিপাল স্যার উনার অফিসে ডাকছেন”
এই বলে লোকটা চলে গেল। তারপর জিয়া প্রিন্সিপালের রুমে গেল। সেখানে গিয়ে দেখল আর্ভিক রিকি আর মেঘাদ্রি দাঁড়িয়ে আছে। আর্ভিক রীতিমতো রাগে ফুঁসছে তার দিকে তাকিয়ে। জিয়া গিয়ে প্রিন্সিপাল স্যার কে বলল
-“স্যার কেন ডেকেছেন?”
প্রিন্সিপাল স্যার একটা লেটার জিয়ার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন
-“জিয়া তোমাকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হল। এই নাও তোমার লেটার”
প্রিন্সিপালের কথা শুনে জিয়া যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে ভাবল যে রিকি আর মেঘাদ্রি সব কিছু বলে দিয়েছে তাই সে মেঘাদ্রির কাছে গিয়ে বলে
-“তুই সব বলেছিস তাই না! ঐ দুই দিনের মেয়ের জন্য এত দরদ!!!”
এই বলে জিয়া মেঘাদ্রিকে থাপ্পড় মারতে গেলে আর্ভিক আর রাগ কন্ট্রোল করতে না পেরে সজোরে থাপ্পড় মারল জিয়াকে। জিয়ার ঠোঁটের কোণ কেটে রক্ত বের হল। জিয়া এবার চিৎকার করে বলল
-“আপনি আমাকে থাপ্পড় মারলেন! নেহাৎই আপনাকে পছন্দ করতাম তাই সেদিন কিছু বলিনি, না হলে আপনার মতো সস্তার টিচার কে পথে বসাতে আমার ২ মিনিট ও সময় লাগবে না। আমার বাবা “Roy international industry” কোম্পানির ম্যানেজার,আমার বাবার ক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা আছে আপনার!?”
জিয়ার কথা শুনে আর্ভিক খুব জোরে শব্দ করে হেসে উঠল তারপর বলল
-“আচ্ছা! তাই নাকি আমার স্কুলে দাঁড়িয়ে আমাকেই হুমকি দিচ্ছো। তোমার কলিজায় তো অনেক জোর আছে দেখছি।”
জিয়া অবাক হয় সাথে একটু ভয় ও পায় তারপর বলে
-“আ..আপ.. আপনার স্কুল মানে?”
-“হ্যাঁ জিয়া এটা আর্ভিক স্যারের স্কুল।”
প্রিন্সিপালের কথায় জিয়া সেদিকে ফিরে তাকালো, তারপর আর্ভিকের দিকে তাকালো। আর্ভিক একটা ডেভিল স্মাইল দিয়ে কাউকে কল করলো, সেকেন্ডের মধ্যেই কলটা রিসিভ হলো। কল রিসিভ হতেই আর্ভিক বললো
-“ঋষি কোথায় আছিস এখন?”
-“এইতো ভাইয়া সবে কলেজ থেকে ফিরলাম”
-“ঋষি তোকে ১০ মিনিট সময় দিচ্ছি।অফিসে যা আর ম্যানেজার পদে থাকা মিস্টার সেন কে ম্যানেজারের পদ থেকে সরিয়ে সাধারণ কর্মচারীর পদে নিয়োগ কর।”
কোন উত্তরের অপেক্ষা না করেই আর্ভিক ফোনটা কেটে দিলো, তারপর জিয়াকে বলল
ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ১৫+১৬
-“তোমার ভাগ্য ভালো তুমি একজন মেয়ে, তুমি যদি কোন ছেলে হতে এতক্ষণে যে কি অবস্থা করতাম তোমার সেটা আমি নিজেও জানিনা। তোমাকে সাবধান করেছিলাম যে আমার তানভীর থেকে দূরে থাকতে। কিন্তু তুমি শুনলে না। সুতরাং এখন ফল ভোগ করো। Now get out from my school.”
