ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৮১
প্রিয়স্মিতা তেহজীব রাই
গাড়িটা যতক্ষণ অবধি চোখের আড়াল না হয়, ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো প্রিয়তা। নিঃসঙ্গ পথটার পানে চাইতে চাইতে এক সময় ডুকরে কেঁদে উঠলো। ভালোবাসার মানুষটা কে দূরে পাঠাতে তার মন মানছে নাহ্ ছোট্ট হৃদয়টা বার বার কুঁকড়ে যাচ্ছে অজানা আশঙ্কা, সে জানে না কেন এত ভয় লাগছে; কিন্তু চোখের আড়ালে কিছু তো নিশ্চই হচ্ছে, যা কিনা হওয়া উচিত নয়।
এই লম্বা মতো বেপরোয়া লোকটার জন্য থাকা ভালোবাসার পরিদি হুট করেই অসহ্য রকম বেড়ে গেছে আগেই নিজেকে সংবরণ করতে পারেনি প্রিয়তা তবে এখন কী করে করবে। এই ভালোবাসা যে আগের থেকে ও বেশি জুড়ালো —আগের থেকে ও বেশি তীক্ষ্ণ, তীব্র।
আগে তো যাও না দেখে থাকা যেত, এখন তো অতটুকু ও দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে প্রিয়তার জন্য। এক মুহূর্ত দুচোর আড়াল হলে প্রাণ কাঁদে।
দুচোখের পাতা বুজলো প্রিয়তা কী যে অস্থির লাগেছে, আচ্ছা তার এই অস্থিরতা কী বুঝতে পারে মানুষটা আদে ও কী জানে তার জন্য ছোট্ট বুকে কতখানি মায়া আর ভালোবাসা জমিয়েছে প্রিয়তা। বুঝে না বোধয় বুঝলে হয়তো বলতো গোল্লায় যাক দুনিয়া আমি শুধু তোমার চোখের সামনে বসে থাকবো।
একদিকে প্রিয়তা যখন নিজের ভালোবাসার সাময়িক দূরত্বের যন্ত্রণা সইতে অক্ষম ফিরে আসবে জেনে ও বিলাপ করতে ব্যস্ত,
ঠিক সেই সময় তার থেকে কিছুটা দূরে তারই বোন তার এই সাময়িক কান্নাকে চিরস্থায়ী করার সংকল্পে অনড়। তার সব টুকু সুখ তার ভালোবাসার প্রণয় কে নিঃশেষ করে দেওয়ার চিরতরে কেড়ে নেওয়ার পরিকল্পনা বদ্ধপরিকর।
গাড়িটা বেরিয়ে যেতেই পিলারের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো প্রিয়স্মিতা। সে সকল দৃশ্যই মনোযোগ সহকারে অবলোকন করেছে, তবে এখন আর এতে বিশেষ কিছু যায় আসে না প্রিয়স্মিতার মায়া দেখানো তার কাজ নয় অন্যান্য দিনের মতো আজ আর ব্যাথিত নয় সে প্রিয়তার নীলাভ অক্ষিযুগলে এক সমুদ্র অনুভূতি থাকলে ও প্রিয়স্মিতার চোখে কেবল প্রতিজ্ঞা আর দেশের প্রতি নিজের কর্তব্য ; সে তার মনকে বুঝিয়ে নিয়েছে।
দুই নৌকায় পা দিয়ে কখনোই চলা যায় না। ভবসমুদ্র পাড়ি দিতে দিতে হলে একটা না একটা নৌকা তাকে ছাড়তেই। প্রিয়স্মিতাও ছেড়ে দিয়েছে বেছে নিয়েছে—নিজের সস্তা অনুভূতির থেকে মূল্যবান রাষ্ট্রীয় মূল্যবোধকে প্রাধান্য দিয়েছে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
দাঁড়িয়ে থেকে নির্দিষ্ট নাম্বারটিতে ডায়াল করলো প্রিয়স্মিতা। যান্ত্রিক কণ্ঠে বললো,
“Note the car number DH 23 AK 5678.”
প্রিয়তা নিজের উগ্র বেশামাল অনুভূতি গিলে নিয়ে পেছন ফিরতেই ভেতর থেকে তীব্র চিৎকারের আওয়াজ ভেসে এলো। আর্তনাদ জড়িত চিৎকার শ্রবণ করতেই যুগে কেঁপে উঠলো প্রিয়তা আর প্রিয়স্মিতা।
“আহ্! প্রীতম!”
ইনায়ার চিৎকার শুনে ভাবনা-চিন্তার ক্ষমতা লোপ পেল প্রিয়তার। প্রাণপণে ছুটে গেল বাড়ির ভেতর, পিছু নিলো প্রিয়স্মিতাও।
ছুটে সদর দরজা ডিঙিয়ে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করতেই আঁতকে উঠলো দুইবোন। ছিটকে দুই কদম পেছনে সরে প্রিয়তা ভয়ার্ত চোখে চাইলো ইনায়ার দিকে। মার্বেল বসানো পুরো মেঝেতে তাজা রক্তের মাখামাখি। মেঝেতে পড়ে গলা কাটা মুরগির মতো ছটফট করছে ইনায়া।
হয়তো সিঁড়ি বেয়ে উঠতে গিয়ে স্লিপ করেছে। বাসায় জমজ দুই বোন ব্যতীত আর কোনো মানুষ নেই। ইনায়ার ডেলিভারি ডেট আরও ১৫ দিন পর। বাড়ির সবাই একসাথে গেছেন প্রিয়তাদের বড় মামার মেয়ের বিয়েতে। সাদমান শিকদার ও খালিদ শিকদার বিজনেসের জন্য ইউকে, সাজিদ শিকদার সিলেট।
রক্ত দেখে প্রিয়তার মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো। চোখের সামনে সকল দৃশ্য ঝাপসা হয়ে এলো এক নিমিষে সকল বস্তুই তার নিকট দুটো লাগছে । অজস্র রক্ত দেখা মাত্রই হিমোফোবিয়া অ্যাক্টিভ হয়ে গেল প্রিয়তার । নিজের নার্ভ সিস্টেমের ওপর কন্ট্রোল হারাতে শুরু করলো প্রিয়তা। তবুও দৌড়ে গিয়ে জাপটে ধরলো ইনায়াকে। চিৎকার দিয়ে ড্রাইভারকে ডাকলো—
“রহিম চাচা!”
প্রিয়স্মিতা তিথু হলো উৎকণ্ঠা নিয়ে বললো,
“রহিম চাচাও বাড়িতে নেই, আম্মুদের নিয়ে চট্টগ্রাম। তুই দাঁড়া, আমি গাড়ি বের করছি।”
বলতে দেরি, ছুটে বের হতে দেরি হলো না প্রিয়স্মিতার।
প্রিয়তা নিজের ওপর আপ্রাণ কন্ট্রোল রাখার চেষ্টা করছে। সে ভুলেও তাকাচ্ছে না রক্তের দিকে। ইনায়া ছটফট করতে করতে জড়িয়ে ধরছে প্রিয়তা কে হৃদয় বিদারক সব আর্তনাদ করছে—বারবার শুধু প্রীতমের খোঁজ করছে। অথচ প্রীতম এই মুহূর্তে দেশেই নেই।
দুই মিনিটের মধ্যে গাড়ি বের করলো প্রিয়স্মিতা। দৌড়ে এসে বললো,
“বোনু, গাড়ি এনেছি।”
প্রিয়তা ইতিউতি না তাকিয়ে সোজা তাকালো প্রিয়স্মিতার দিকে। কাঁপা গলায় বললো,
“আপু, আমি একা ওকে তুলতে পারবো না। দ্রুত এক পাশে ধরো তুমি।”
প্রিয়স্মিতাও তাই করলো। ছুটে এসে বাহু চেপে ধরলো ইনায়ার। ওরা দুই বোন ইনায়াকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। স্বাভাবিক সময়েরই হেলদি মেয়েটা সন্তানসম্ভবা হওয়ার দরুন আরও বেশি ভারী লাগছে। বহু কষ্টে ইনায়াকে গাড়িতে তুললো প্রিয়তা আর প্রিয়স্মিতা। বুকে হাত দিয়ে জোরে জোরে হাঁপাচ্ছে দুই বোন।
প্রিয়তা ঘনঘন নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে বললো,
“আপু, তুমি ওর কাছে বসো। আমি ড্রাইভ করছি। আমি ওর কাছে বসলে এখুনি সেন্স হারাবো।”
রাজি হলো প্রিয়স্মিতা।
ওরা দুই বোন ঝড়ের বেগে ইনায়াকে এনে অ্যাডমিট করলো রায়পুর সদর হাসপাতালে। অতিরিক্ত ব্লিডিং হচ্ছে ইনায়ার। বেশি রক্তক্ষরণ হলে কোনো মানুষকেই বাঁচানো যায় না।
ইনায়াকে ওটি রুমে নিতেই তৎক্ষণাৎ সেন্স হারালো প্রিয়তা। এতক্ষণের চেপে রাখলে ও এখন গলগল করে রক্ত যেতে দেখে আর ধরে রাখতে পারলো না নিজেকে।
প্রিয়স্মিতা জাপটে ধরলো বোনকে। প্রাথমিক চিকিৎসা দিতেই সেন্স ফিরে এলো প্রিয়তার।
প্রিথমসহ বাড়ির সবাইকে পরিস্থিতি সম্পর্কে ইনফর্ম করলো দুই বোন। ঘণ্টা পেরোনোর পূর্বেই পুরো শিকদার বাড়ি এসে হাজির হলো হাসপাতাল চত্বরে—কেবল প্রণয় শুদ্ধ প্রিথম আর বড় দুই কর্তা ব্যতীত।
ইনায়ার বর্তমান পরিস্থিতির কথা জানাতেই উন্মাদ হয়ে যায় প্রীতম। সকল বিজনেস ডিল ক্যানসেল করে রওনা দেয় তৎক্ষণাৎ।
প্রায় ঘণ্টা পাঁচেক অতিবাহিত হয়, কিন্তু এখনো ইনায়ার কোনো খবর আসেনি। অস্থিরতায় ঘামতে শুরু করেছে প্রিয়তা। পুরো করিডোর জুড়ে চলছে শিকদার বাড়ির সকলের ব্যস্ত পায়চারি।
প্রায় আট ঘণ্টা পর হন্তদন্ত পায়ে বেরিয়ে এলেন ডাক্তার অভিক। তাগদা দিয়ে বললেন,
“দ্রুত চার ব্যাগ O নেগেটিভ ব্লাডের ব্যবস্থা করুন। অনেক রক্তক্ষরণ হয়ে গেছে। আমরা বহু কষ্টে পরিস্থিতি হাতের মুঠোয় এনেছি। ভাগ্য ভালো যে আর বেশি দেরি করা হয়নি। আরও কিছুক্ষণ দেরি হলেই বেবি মারাত্মকভাবে অ্যাফেক্টেড হতো, মায়েরও রিস্ক হতো।”
কিছুক্ষণ থেমে আবার বললেন,
“আজ রাত বারোটায় সি-সেকশন হবে। তার আগে চার ব্যাগ রক্ত দেওয়া অনিবার্য। আমাদের এই ছোট্ট হাসপাতালে ব্লাড ব্যাংক নেই, তাই ব্লাডের কোনো মজুদ নেই। আপনারা দ্রুত ডোনার খুঁজুন—as soon as possible।”
বলে চলে গেলেন ডাক্তার অভিক।
বুকের ওপর থেকে একটা বিশাল পাথর নেমে গেল সবার। হাফ ছেড়ে বাঁচলো প্রিয়তা। মনে হচ্ছিল এতক্ষণ বুঝি হিমালয় চেপে ছিলো বুকের ওপর।
যতই সম্পর্ক ভালো না থাকুক, যতই রেষারেষি থাকুক, প্রিয়তা কখনোই চায় না তার একমাত্র ভাই মরে যাক কিংবা নিঃস্ব হয়ে যাক। এই মেয়েটা যে তার ভাইয়ের বুকের ভেতরের ধকধক করতে থাকা জীবন্ত হৃদপিণ্ডটা—তা তো বোঝাতে বাকি নেই প্রিয়তার। সে নিশ্চয়ই এসব বর্ণনা শুনে উন্মাদ হয়ে গেছে।
রাত একটার মধ্যে তড়িঘড়ি করে এসে হাজির হলো প্রীতম। এসেই বিশৃঙ্খলা আর পাগলামি শুরু করে দিল। করিডোর চত্বরে উথালপাথাল হয়ে উঠলো তার পাগলামিতে। চিৎকারে মানুষ জড়ো হয়ে যাচ্ছে—সে সবে খেয়াল নেই প্রীতমের। এক পলক প্রিয়তমাকে দেখার নেশায়, বুকে জড়ানোর তাড়নায় ছটফট করছে ছেলেটা। তাকে চারদিক থেকে চেপে ধরেও সামলাতে ব্যর্থ হচ্ছে অরণ্য, সমুদ্র, প্রেম। শরীরে যেন হাজার হাতির জোর তার।
সকলে পইপই করে বলছেন ডাক্তার বলেছে সব ঠিক আছে, রক্ত দেওয়া হয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই খুশির খবর আসবে। কিন্তু সেসব কথা যেন তার কান দিয়েই ঢুকছে না। কর্ণে শুধু বাজছে প্রিয়স্মিতার সেই নির্মম বর্ণনাগুলো। চোখের সামনে ভাসছে কাল্পনিক সেই রক্তাক্ত দেহখানা।
সকলে তাকে সান্ত্বনা দিলেও প্রিয়তার কিছু বলার নেই। আজকাল আর ঘৃণাও আসে না এই মানুষটার প্রতি। কী হবে ঘৃণা করে? ওই চার বছর তো আর সে ফিরে পাবে না।
আজ সে তুলকালাম করছে নিজের ভালোবাসার মানুষকে হারানোর আশঙ্কায়। অথচ চার বছর আগে প্রিয়তা যখন একইভাবে পা ধরে কাকুতি-মিনতি করেছিল, তখন এই মানবের মন গলেনি।
বিতৃষ্ণায় মুখ তেতো হয়ে উঠলো প্রিয়তার। যতই আজ সব ঠিক হয়ে যাক, এই মানুষটাকে সে মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ক্ষমা করবে না।
আরও মিনিট ত্রিশ এক যেতেই ভেতর থেকে বাচ্চার বিকট কান্নার আওয়াজ ভেসে এলো। আপনাআপনি সব পাগলামি স্থির হয়ে গেল প্রীতমের।
নার্স সাদা তোয়ালে পেঁচিয়ে একটা ছোট্ট বাবুকে কোলে নিয়ে বেরিয়ে এলেন। প্রীতমের সামনে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে বললেন,
“অভিনন্দন, মিস্টার শিকদার। আপনি কন্যাসন্তানের বাবা হয়েছেন। দেখুন, আপনার মেয়েকে—কত সুন্দর হয়েছে।”
প্রীতম নির্জীব চোখে এক পলক তাকালো বাচ্চাটার দিকে। লাল টুকটুকে একখানা মুখ। দৃষ্টি সরিয়ে নিল প্রীতম। অস্থির কণ্ঠে শুধালো,
“আমার স্ত্রী কেমন আছেন?”
ডাক্তার অভিক বেরিয়ে এলেন। লম্বা হাসি দিয়ে বললেন,
“আলহামদুলিল্লাহ, মিস্টার শিকদার। আপনার স্ত্রী একদম সুস্থ আছেন। তবে এখন অ্যানাস্থেশিয়ার প্রভাবে সেন্সে নেই। সেন্স ফিরলেই কেবিনে দেওয়া হবে, তখন দেখা করতে পারবেন। আপাতত আইসিইউতে থাকুক।”
ডাক্তারের কথা শুনে বুকের ওপর থেকে পাহাড় নেমে গেল প্রীতমের। পুনরায় তাকালো ক্রন্দনরত বাচ্চাটার দিকে। এই তো তার অংশ, তার সাত রাজার ধন। এটা তো প্রথমবার নয়, তবুও বুকের ভেতর কেমন একটা অনুভূতি হলো প্রীতমের—বুঝতে পারলো না প্রীতম। বাবা হওয়ার অনুভূতিটা বুঝি এতটাই মধুর।
দুই হাত বাড়িয়ে নিজের রক্তকে বুকে টেনে নিল প্রীতম। মেয়ের কপালে আস্তে করে ঠোঁট ছুঁয়ে দিল। চোখ বেয়ে নিভৃতে এক ফোঁটা পানি গড়ালো প্রীতমের। মেয়ের কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে আস্তে করে আজান দিল।
দূরে দাঁড়িয়ে হেসে ফেললো প্রিয়তা। বাচ্চাটাকে দেখার লোভ হলো, কিন্তু বাচ্চাটা তার বাবার কোলে আছে—সেখান থেকে সে কখনোই নিতে যাবে না।
বর্ষণের রাত শেষে যেমন ঝলমলে রোদ উঠে, শিকদারদের অবস্থাও ঠিক তেমন। দুশ্চিন্তা আর উৎকণ্ঠার এক রাত শেষে তাদের জীবনেও সুখের সূর্য উঠেছে।
ইনায়াকে বেডে দেওয়া হয়েছে।
অভিরাজ মায়ের বুকে মুখ গুঁজে চুপটি করে পড়ে আছে। ছোট্ট ছেলেটা কী বুঝেছে কে জানে, তবে প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে। মা মা করে খুব কেঁদেছে—ও ভাগ্যিস তখন ফুপি ছিলো।
ইনায়া চোখ বন্ধ করে মরার মতো পড়ে আছে। হঠাৎ কপালে কারো তপ্ত ঠোঁটের স্পর্শ পেতেই চমকে উঠলো ইনায়া। বন্ধ দু’চোখের পাপড়ি মেলতেই আকস্মিক চোখাচোখি হয়ে গেল।
চোখ আটকে গেল গভীর এক জোড়া নীলাভ চোখে। মুখের ওপর ঝুঁকে থাকা মানুষটার চোখমুখ কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেছে একদিনেই। নীল নীল চোখ দুটো রক্তিম—পানিতে টলমল করছে। দেখতে দেখতেই টপ করে এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়লো ইনায়ার ফুলকো গালে।
সম্বিৎ ফিরলো ইনায়ার। প্রাণপ্রিয় পুরুষটার চোখ-মুখের এমন বিধ্বস্ত বেহাল অবস্থা দেখে বুকের ভেতর মুচড়ে দিয়ে উঠলো। ব্যথাতুর চোখ দুটো ভিজে এলো বিন্দু বিন্দু অশ্রুতে।
হাত তুলে প্রীতমের গাল ছোঁয়ার চেষ্টা করলো।
ইনায়ার হাত টেনে নিজের গালে রাখলো প্রীতম। ভেতর ভেতর ফুপিয়ে উঠলো। ইনায়ার ফুলো ফুলো মুখে অজস্রবার চুমু দিয়ে অভিমানী কণ্ঠে বললো,
“আর একটুর জন্য তো আমাকে পাকাপাকি কবরে শোয়ানোর ব্যবস্থা করে দিচ্ছিলে, রসগোল্লা। তুমি এতো স্বার্থপর কেনো গো? কাল যদি তোমার কিছু হয়ে যেত, তখন কী করতাম আমরা? কী হতো আমাদের বাবা-ছেলের? আমরা তো পাগল হয়ে যেতাম।”
বলতে বলতে প্রীতম ইনায়ার বুকের এক পাশে মাথা রাখলো। তার ঝরঝর করে গড়িয়ে পড়া নোনা অশ্রুর স্রোত বলছে—হারানোর ভয়ে ঠিক কতটা কুঁকড়ে গিয়েছিল সে।
হঠাৎ করেই যেন সব শারীরিক-মানসিক যন্ত্রণা উবে গেল ইনায়ার। নিজের বুকের দিকে তাকিয়ে দেখলো তার পৃথিবী।
ইনায়া নিজের কাঁপা হাত দুটো রাখলো প্রীতম ও অভিরাজের মাথায়। ঘাড় ঘুরিয়ে পাশের দোলনায় দেখলো তার ছোট্ট মেয়েটা নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। বুকটা ভরে উঠলো ইনায়ার।
বুকে মাথা রেখে ফুপিয়ে উঠলো প্রীতম। ব্যথাতুর কণ্ঠে বললো,
“তুমি শুধু একবার পুরো ভালো হয়ে যাও, রসগোল্লা। আমি প্রমিজ করছি—আমি আর কখনো বাবা হতে চাইবো না। আমার বাচ্চা লাগবেই না। আমার শেষ অবধি শুধু তুমি সাথে থেকো। তুমি থাকবে—এতোটুকুই যথেষ্ট। আমার আর কাউকে চাই না।”
ঠোঁট টিপে হাসলো ইনায়া। তার সুদর্শন স্বামী যে সাংঘাতিক ভয় পেয়েছে, তা তো আর বলার অবকাশ রাখে না। দুষ্টু বুদ্ধি উঁকি দিল মাথায়। রয়ে সয়ে ধীরে বললো,
“এতটাও পাগলামি করার কিন্তু কিছু ছিল না। আমি না থাকলে কী এমন হতো? আমি মরে গেলেই বা কী এমন হতো? নতুন আরেকটা বিয়ে করে নিতে।”
এখনো ভয়ে বুক ধড়ফড় করছে। তার ওপর বউয়ের পেট্রোল ঢালা কথা শুনে ক্ষেপে গেল প্রীতম। চোখ লাল করে তাকালো ইনায়ার দিকে।
চোখ দেখে ভড়কে গেল ইনায়া। মনে মনে শুষ্ক ঢোক গিললো।
আচমকা বুক থেকে উঠে পড়লো অভিরাজ। বাবার গলা জড়িয়ে ধরে বললো,
“আমার বোনুকে কোলে নেবো, পাপ্পা।”
ইনায়া বাধা দিতে নিলে থামিয়ে দিল প্রীতম।
দোলনা থেকে সদ্য জন্মানো শিশু কন্যাকে নিয়ে অভিরাজের কোলে দিল, যদিও হাত দিয়ে ধরে রেখেছে প্রীতম। বোনের মুখটা দেখা মাত্রই আনন্দে উৎসাহে লাফিয়ে উঠলো অভিরাজ। টুকটুক করে বোনের সারা মুখে চুমু খেল।
প্রীতমের দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বললো,
“আমার বোনু অনেক অনেক সুন্দর হয়েছে, পাপ্পা। আমার থেকেও সুন্দর। আমরা কবে বাড়ি যাবো, পাপা? আমি খেলবো বোনুর সাথে।”
হেসে ফেললো প্রীতম। ছেলে-মেয়েকে বুকে আগলে নিয়ে ইনায়ার কপালে চুমু দিল। অতঃপর ছেলে ও মেয়ের কপালে চুমু দিয়ে বললো,
“মাম্মা আর একটু ভালো হলেই আমরা বাড়ি চলে যাবো, পাপা। তারপর তুমি তোমার বোনকে নিয়ে সারাদিন খেলবে, কেমন?”
বাবার কথা শুনে খুশি হয়ে গেল অভিরাজ।
প্রাণটা জুড়িয়ে গেল ইনায়ার। চোখ বন্ধ করতেই পরম এক সুখের নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো বুক চিরে।
কারা-ইয়ুত দেরিন তুরস্কের এমন এক অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে মনুষ্য প্রজাতি বা কোন জীবিত প্রাণীর পক্ষে জীবন ধারণ করা সম্ভবই নয়। তার প্রধান কারণ মূলত এই জায়গাটি তার দুর্গম অবস্থানের কারণে বেশ পরিচিত, তবে এখন আর এই জায়গাটার তেমন চর্চা নেই।
দুর্গম পাহাড়ি রাস্তায় উঁচু-নিচু, পাথুরে ঢাল বেয়ে নামতে নামতে হঠাৎ দেখা মিলে এই উপত্যকার। উপত্যকার মুখ খুব সংকীর্ণ—দুই পাশের খাড়া পাহাড় এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে যেন তারা ইচ্ছা করেই এই জায়গাটাকে দুর্গম থেকে দুর্গমতম বানিয়ে রেখেছে, বা এই জায়গাটার নকশা দেখলে বুঝা যায় হাজার বছর আগে কেউবা কারা এই জায়গাকে ইচ্ছাকৃতভাবে এমন দুর্গম করে তুলেছে।
চারপাশে কোনো গ্রাম নেই, নেই কোনো বসতি। নিকটতম লোকারণ্য বা মানুষের বাস কয়েক দিনের হাঁটা পথ, তাও সেই পথে এখন আর কেউ হাঁটে না। দিনের বেলা জায়গাটা নিষ্প্রাণ মনে হয়, কিন্তু রাত নামলেই উপত্যকাটা নিজের আসল রূপ দেখাতে শুরু করে।
যেমন আজকের রাতটা—তেমনই এক বিভীষিকাময় অন্ধকার রাত। টানা ছয় মাস পর সম্রাট আজ তার সিংহাসনে বসেছেন। রাতে আকাশটা পরিষ্কার। উপরে বড়, স্পষ্ট থালার মতো চাঁদ। জ্যোৎস্নার আলো সরাসরি পড়ছে পাহাড়ের চূড়ায়। চারদিক মশালের আলোয় আলোকিত। জায়গাটা নিশ্চুপ একা দাঁড়িয়ে থাকলেও অদ্ভুত এক সৌন্দর্যের মায়াজালে আবিষ্ট। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো—এত আলো, এত সৌন্দর্য উপত্যকার ভেতরে ঠিকমতো পৌঁছায় না। আলো ছিল, সবটা কেমন ভাঙা ভাঙা। পাথর, মাটি, পথ—সবই দেখা যাচ্ছিল, অথচ কোথাও কোনো ছায়া পড়ছিল না।
মানুষ দাঁড়িয়ে থাকলেও তার পায়ের কাছে ছায়া তৈরি হচ্ছিল না। হাঁটলেও পেছনে কোনো ছায়া টানছিল না। মাটিটা আলো গ্রহণ করছিল, কিন্তু ছায়া গ্রহণ করছিল না—এই বিষয়টা উপত্যকার ভেতরে ঢুকলেই কেবল নজরে আসে।
উপত্যকার ভেতরে গাছপালা নেই খুব একটা। কেবল কিছু শুকনো ঝোপ, সেগুলোও মরে যাওয়ার আগের অবস্থায় আটকে আছে বলে মনে হয়। পাখির ডাক নেই, পোকামাকড়ের শব্দও শোনা যায় না। বাতাস বইলে শুধু পাহাড়ের গায়ে ঘষা লাগার মতো একটা ভারী শব্দ, তারপর আবার নিস্তব্ধতা।
উপত্যকার দক্ষিণ-পূর্ব পাশে একটি ছোট লেক আছে। খুব বেশি বড় নয়, কিন্তু অস্বাভাবিক তার গভীরতা—যেন হাজার বছরের রহস্য নিজের মধ্যে সমাধি দিয়ে বসে আছে। চাঁদের আলো লেকের জলে পড়ে প্রতিফলিত হয় না, বরং আলোটা জলের ভেতর ঢুকে অদৃশ্য হয়ে যায়। পানি একদম স্থির, তবে রংটা নীল বা কালো নয়—একদম টকটকে লাল। যেন লেকটা পানির নয়, রক্তের। কোনো ঢেউ নেই, কোনো শব্দ নেই—কেবল বড় বড় মাংস খেকো হাঙরের লাফ-ডুবের শব্দ। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলে গা শিউরে উঠে মনে হয়—ওই বড় বড় দাঁতওয়ালা নর মাংস খেকো হাঙরগুলো যেন গিলতে আসে।
লেকটির সামনে বিস্তৃত একটা বিশাল দুর্গ। দুর্গটি উপত্যকার একেবারে গভীরে অবস্থিত। দূর থেকে দেখলে দুর্গটাকে আলাদা করে বোঝা যায় না। পাহাড়ের গায়ে কালচে পাথরের স্তূপ বলে মনে হয়। কাছে গেলে বোঝা যায়—এই পাথরগুলো হয়তো পরিকল্পনা করেই বসানো। দুর্গের কোনো উঁচু মিনার নেই, কোনো পতাকা নেই। সবকিছু নিচু, চাপা এবং পাহাড়ের সঙ্গে মিশে থাকা।
দুর্গের সামনে দাঁড়ালেও চাঁদের আলো গায়ে পড়ে, কিন্তু দেওয়ালে কোনো মানুষের ছায়া পড়ে না। চারপাশের পরিবেশ এমন যে মনে হয়—এই জায়গাটা মানুষ থাকার জন্য তৈরি না, বরং মানুষকে অদৃশ্য করে দেওয়ার জন্য তৈরি।
এই উপত্যকাটা জনমানবহীন, কারণ এখানে কেউ থাকে না—এমন না। বরং এটা মানুষ থাকার জন্যই নয়। এখানে এমন সব হিংস্র নর পিশাচরা থাকে, যাদের দেখতে তো মানুষের মতোই লাগে, তবে আফসোসের কথা—তাদের মধ্যে মনুষ্যত্বের কোন বৈশিষ্ট্য এখন আর পরিলক্ষিত হয় না। এই দুর্গার মধ্যে কি চলে, তা তো কেবল ভেতরে গেলেই বোঝা যাবে।
তবে আশ্চর্যজনকভাবে ভেতরে যাওয়ার কোনো নির্দিষ্ট পথই চোখে পড়ে না। চারদিকে কেবল দৈত্যাকৃতির বড় পাথর, কিন্তু তার মধ্যে একটা সূক্ষ্ম সেটিংস আছে, যে সলভ করতে কেবল কেবল সেই ভেতরে প্রবেশের অধিকার লাভ করবে। বাহির থেকে যেটাকে মধ্যযুগীয় কালচে পরিত্যক্ত গুহা মনে হয়, ভেতর দৃশ্যের সাথে তার পার্থক্য আকাশ আর জমিনের।
বাইরের সেই কালচে ভারী পাথরের দরজাটা যখন সশব্দে খুলে গেল, তখন মনে হলো—এক ধাক্কায় মধ্যযুগ থেকে ২০২৯ সালে এসে আছাড় খেল। দরজার ওপাশে কোনো আগুনের মশাল নেই, আছে দেওয়ালের খাঁজে খাঁজে লুকানো ইনভিবল এলইডি প্যানেল, যার থেকে প্রতিনিয়ত ঠিকরে আসা তীব্র সাদা আলো পুরো করিডোরকে এক হিমশীতল রূপ দিয়েছে।
ঝা চকচকে বিশাল বড়ো এক আধুনিক অট্টালিকা, ডিজিটাল প্রোটোকল ও বায়োমেট্রিক সিকিউরিটিতে ভরপুর। ভেতরের প্রতিটি ইঞ্চিতে প্রযুক্তির কড়া পাহারা। করিডোরের দেয়ালগুলো মসৃণ কাঁচ আর স্টিলের মিশ্রণে অদ্ভুত প্রতিকৃতি। প্রতি দশ কদম অন্তর অন্তর বসানো “রেটিনা স্ক্যানার” এবং “ডিজিটাল ব্লক পাসওয়ার্ড কি”। এই বিশাল অন্ধকার সাম্রাজ্যের সম্রাটের আঙুলের ছাপ বা বিশেষ এনক্রিপ্টেড কোড ব্যতীত এই দুর্গের একটি ড্রয়ারও আনলক করার ক্ষমতা কারও নেই। প্রতিটি চেম্বারের দরজায় জ্বলছে লাল ও সবুজ লেজার সেন্সর, যা অনধিকার প্রবেশকারীর মুহূর্তেই অস্তিত্ব মিটিয়ে দিতে সক্ষম। চারদিকে লাগানো হাইটেক এলিভেটর।
দুর্গটি বেশকয়েকটি আধুনিক ব্লকে বিভক্ত, যা কোনো কর্পোরেট অফিসের মতো ছিমছাম, কিন্তু উদ্দেশ্য ভয়ংকর।
টার্মিনাল-এ “অস্ত্র ও ড্রাগস”: এখানে সারি সারি গ্লাস ক্যাবিনেটে সাজানো আছে বিশ্বের সর্বাধুনিক সব মারণাস্ত্র। তার পাশেই সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ল্যাবরেটরি, যেখানে রোবোটিক হাতের মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে কোটি কোটি ডলারের হাই-গ্রেড ড্রাগস। এখানকার আসবাবপত্র সবই মিনিমালিস্টিক এবং স্মার্ট ফিচারের, যেখানে একটি বাটনেই দেওয়াল থেকে বেরিয়ে আসে গোপন ভল্ট।
টার্মিনাল-বি “টর্চার সেল ও ডিসেকশন রুম”: এটি এই দুর্গের সবচেয়ে অন্ধকার জায়গা। রুমগুলো সাউন্ড-প্রুফ। এখানে রয়েছে স্টেইনলেস স্টিলের অত্যাধুনিক সব অটোমেটিক টেবিল। মানুষকে টর্চার করার জন্য এখানে কোনো পুরনো চাবুক নেই, আছে ইলেকট্রিক পালস জেনারেটর এবং নিউরো-টক্সিন ইনজেকশন সিস্টেম। “কাটাকাটির ঘর” বা ডিসেকশন রুমটি দেখতে কোনো উন্নত হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের মতো—যেখানে লেজার স্কার্পেল দিয়ে নিখুঁতভাবে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আলাদা করা হয়।
টার্মিনাল-সি “ট্র্যাফিকিং জোন”: এখানে নারী ও শিশুদের রাখা হয়। আধুনিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কাঁচের কেবিনগুলোতে তারা বন্দি। প্রত্যেকের হাতে পরানো আছে জিপিএস ট্র্যাকার সংবলিত ইলেকট্রিক ব্যান্ড। এখান থেকেই ডিজিটাল অকশনের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তাদের পাচার করে দেওয়া হয়।
বসের স্পেশাল স্টাফদের জন্য রয়েছে আলাদা লাক্সারি লাউঞ্জ। সেখানে সব আসবাবপত্র ইতালিয়ান চামড়া আর কার্বন ফাইবারের তৈরি। বিশাল সব হলোগ্রাফিক স্ক্রিনে ভেসে উঠছে সারা বিশ্বের শেয়ার বাজার আর আন্ডারওয়ার্ল্ডের খবরাখবর। প্রতিটি স্টাফের গতিবিধি কেন্দ্রীয় সার্ভার থেকে তদারকি করা হয়।
দুর্গটির সবচেয়ে ওপরের তলায় ২০ নম্বর ফ্লোরে সম্রাটের ব্যক্তিগত কক্ষ। ঘরের মাঝখানে একটি বিশাল স্মার্ট গ্লাস উইন্ডো, যেখান থেকে বাইরের সেই রক্তবর্ণ লেকটি দেখা যায়। এটা বলাই বাহুল্য যে—লেকটি সম্রাটের বিশেষ পছন্দের।
সম্রাটের সিংহাসনটি কোনো কাঠ বা পাথরের নয়, সেটি তৈরি করা হয়েছে বিশেষ এক ধরনের কালো টাইটানিয়াম দিয়ে। হাতের আর্মরেস্টে রয়েছে টাচ-স্ক্রিন প্যানেল, যেখান থেকে এক ক্লিকেই তিনি পুরো দুর্গের অক্সিজেন বন্ধ করে দিতে পারেন, অথবা লেকের হাঙ্গরদের “ডিনার টাইম” ঘোষণা করতে পারেন।
ভেতরের এই অত্যাধুনিক আয়োজনই বলে দেয় যে—এই অন্ধকার দুনিয়ার সম্রাট কেবল একজন অপরাধী নয়, তিনি একজন সুকৌশলী, বুদ্ধিদীপ্ত, চতুর প্রাণী। তার এই সাম্রাজ্যে প্রবেশের পথ সহজ, কিন্তু প্রস্থান কেবল ওই রক্তবর্ণ লেকের হাঙ্গরদের পেটে—এই তিক্ত সত্যটা এখানকার কর্মরত প্রতিটা স্টাফই জানে। তারা জানে—বাঁচতে গেলে এখানে মুখ বন্ধ করে নির্দেশ পালন করতে হবে, নাহলে শেষ ঠিকানা হবে ওই হাঙ্গরগুলোর পেটে।
রাতের উজ্জ্বল চাঁদটা আজ ঢাকা পড়েছে বিষণ্ন মেঘের আড়ালে, ভয় পেয়েছে কিনা কে জানে। লেকের লালিত-পালিত বিশাল আকৃতির হাঙ্গর দুটো উত্তরদিকে পাড় ঘেঁষে ঘুরাঘুরি করছে, পারে না ডাঙায় উঠে আসতে। তাদের প্রভুভক্তি দেখে বাঁকা হাসলো প্রণয়। হাঙ্গর দুটো সামনের পানিতে শান্ত হয়ে লেজ নাড়ছে। প্রণয়ের মতো তার পোষা নরখাদক দুটোও হয়েছে বড়ো হারামী—নিজের মালিক ব্যতীত বাকি সবাইকে খাবারের চোখে দেখে।
হেসে ফেললো প্রণয়। পাশের বিশাল কৃতি ঝুড়ি থেকে একটা কাটা মাথা তুলে ছুড়ে মারলো হাঙ্গর দুটোর দিকে। সাথে সাথেই মাথাটা ক্যাচ ধরে ফেললো বড়ো হাঙ্গরটা। আরেকটার দিকে হিউম্যান থাই ছুড়ে দিলো প্রণয়। অন্য হাঙ্গরটা ও যথারীতি ক্যাচ ধরে ফেললো—ওয়েল ট্রেন্ড, দেখেই বোঝা যাচ্ছে। হাঙ্গর দুটোকে মাথা আর উরু থেকে মাংস খুবলে খেতে দেখে পৈশাচিক তৃপ্তি পাচ্ছে প্রণয়। তার ঠোঁটের কোণের বীভৎস হাসিটা দেখে অবাক না হয়ে পারলো না শুদ্ধ। বোধ করলো, এই শিকদারদের রক্তে না জন্মানোই বোধয় তার জীবনের সব থেকে বড় আশীর্বাদ।
জাভেদের গাল-কপাল বেয়ে দর দর করে ঘাম বেরোচ্ছে। সে বারবার ভয় ভয় তাকাচ্ছে হিংস্র নরখাদকগুলোর দিকে। এগুলোর ভয়ে সে এখানে আসতে চায় না। এদের দেখলেই কেন জানি মনে হয়, এরা এক্ষুনি তাকে গিলতে আসবে। জাভেদ চোখ ঘুরিয়ে ভয় ভয় তাকালো প্রণয়ের দিকে। কালো ঘড়ি, কালো সুট-বুট আর কালো ব্লেজারে পুরো সাইকো ক্রিমিনাল লাগছে, তবে ম্যানলি চার্ম বেরোচ্ছে ঠিকরে।
প্রণয়ের একের পর এক হিউম্যান বডি পার্টস খাওয়ালো তার আদরের মাছ দুটোকে। এখানকার একমাত্র আবর্জনা ডেড বডি, যা নিয়ে কখনোই দুশ্চিন্তা করতে হয় না। এখানে যত বডিই বের হোক, তার ১০০ ভাগ এই দুটোর পেটেই যায়। বসের খুব বিশ্বস্ত আর প্রিয় পাত্র এরা। তাদের আবার চাহিদা বিস্তর, অন্য কোনো মাংস তাদের মুখে রুচে নাহ্।
হাঙরদের ডিনার দিয়ে বেসমেন্টের একটা স্পেশাল কক্ষে চলে এলো প্রণয় ও শুদ্ধ। ঘরটা সম্পূর্ণ খালি, শুধু মাত্র ঘরের এক কোণে ধুলোবালিতে পড়ে আছে কেউ। শুদ্ধ অবাক নেত্রে চাইলো—মেয়েটা বিদেশি। ধীর কদমে মেয়েটার দিকে এগিয়ে গেলো প্রণয়। সামনে ঝুঁকে বসলো। হিম শীতল কণ্ঠে নাম ধরে ডাকলো,
“এলিনা।”
মেয়েটা নিজের ঘোলাটে চোখ দুটো উঠিয়ে তাকালো প্রণয়ের দিকে। চোখ দুটো অনুভূতি শূন্য। সে চিনতে পারলো কিনা প্রণয়কে বুঝা গেল না। এলিনার মুখটা দেখতেই দুই কদম পিছিয়ে শুদ্ধ আশ্চর্য হতভম্ব হয়ে তাকালো প্রণয়ের দিকে। চেঁচিয়ে বললো,
“ডিকে বসের মেয়ে বেঁচে আছে!”
প্রণয় শান্ত। সোজা তাকালো এলিনার চোখের দিকে। রহস্যময় হেসে শান্ত কণ্ঠে বললো,
“এই বন্দী জীবন থেকে আজ থেকে তুমি মুক্ত, এলিনা। তুমি ফিরে যাবে তোমার বাবার কাছে।”
এলিনা অনুভূতি শূন্য, নিষ্প্রাণ চোখে তাকালো। যেনো চিনতেই পারছে না প্রণয়কে, বুঝতে ও পারছে না তার কথা। আর বুঝবেই বা কিভাবে—মেয়েটা যে মানসিক প্রতিবন্ধী, আজ নয়টা বছর এক টানা এভাবেই পড়ে আছে এই ঘরে।
শুদ্ধ নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারলো না। প্রণয়কে ঝাঁকিয়ে বলল,
“এসব কী হচ্ছে প্রণয়? ও না মরে গেছিলো? ওকে না তুই মেরে ফেলেছিলি!”
বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো প্রণয়। নির্লিপ্ত কণ্ঠে জবাব দিলো,
“মারিনি। দেখতেই তো পাচ্ছিস।”
“তাহলে সবাই যে জানে ও মারা গেছে?”
“ও বেঁচে থাকলে স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে ঘুরে বেড়ালে আমার জানের ক্ষতি হতো, তাই ওকে বন্দী বানিয়েছি। মেরে ফেলার প্রয়োজন বোধ করিনি, তাই বাঁচিয়ে রেখেছি। নাহলে মেরেই দিতাম।”
“তুই কী পারবি ওকে এভাবে রক্ষা করতে?”
“করছি তো। এই হৃদপিণ্ডটা যতক্ষণ স্পন্দিত হবে, আমার জান ততক্ষণ সম্পূর্ণ নিরাপদ। যতদিন বেঁচে আছি, বুকের সব থেকে গোপন কোঠারিটাতে লুকিয়ে রাখবো। কাউকে চোখ তুলে তাকাতে দেবো না। যেই আমার কলিজায় হাত বাড়ানোর দুঃসাহস দেখাবে, তার শুধু হাতটা নয়—ধর থেকে মাথাটা কেটে ওদের খাইয়ে দেবো।”
“মে আই কাম ইন বস?”
প্রণয় ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। শান্ত চোখের চাহুনি সম্মতিমূলক আভাস পেলেন মিস্টার পিউরুসন। মিস্টার পিউরুসন প্রণয়ের নয় এএসআর-এর পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট। পিউরুসনকে দেখে ভেতর ভেতর হিংসায় জ্বলে গেল জাভেদ। গোপনে মুখ বাঁকিয়ে মনে মনে বললো, যতই লেজ নাড়ো না কেন, কাজের কাজটা তো আমাকে দিয়েই হবে।
মিস্টার পিউরুসন প্রণয়ের সামনে দাঁড়িয়ে মাথা ঝুঁকালেন। উদ্বেগ প্রকাশ না করে বললেন,
“বস, চার বছর আগের একটা কেস সিবিআই টিম সলভ করে ফেলেছে।”
ভ্রু দ্বয়ের মধ্যে আড়াআড়ি ভাঁজ পড়লো প্রণয়ের।
“কোন কেস?”
“বস, চার বছর আগে আপনার নির্দেশে ডিসিএমসি হাসপাতাল থেকে প্রায় ৪০০ ওমেন কিডন্যাপ করা হয়েছিল, আর যথারীতি বিভিন্ন কান্ট্রিতে পাচার করে দেওয়া হয়েছিল।”
পিউরুসনের কথায় মনে পড়ে গেল চার বছর পূর্বের সেই ঝড়-বৃষ্টির রাতের কথা। ওই রাতে হাসপাতাল ডিসিএমসিতে টেরোরিস্ট অ্যাটাক হয়। সবাই জানত মেয়েগুলোকে টেরোরিস্টরা তুলে নিয়ে গেছে। কিন্তু আসল সত্যটা… এখন এএসআর যতটা বেপরোয়া, তখন মুঠোও এমন ছিল না। এএসআর-এর নির্দেশে যে টেরোরিস্টদের দল ডিসিএমসি হাসপাতালে হামলা করে, তারা কখনো এএসআরকে দেখেনি, চেনে না, জানে না। তাই নিজের জান বাঁচাতে ওই রাতে পিঠ দেখিয়ে পালাতে হয়েছিল প্রণয়কে।
“বস?”
মিস্টার পিউরুসনের ডাকে ঘোর কাটলো প্রণয়ের।
মিস্টার পিউরুসন আবার বললেন,
“ওই মেয়েদের সবাইকে ডিটেক্ট করা না গেলেও এখন একজনকে করা গেছে, যে আপনার ফার্মহাউসের বর্ণনা দিয়েছে, এমনকি কিছু গার্ডসের বর্ণনাও দিয়েছে। সে এখন সিবিআই টিমের তদারকিতে।”
এসব শুনেও হেলদোল দেখা গেল না প্রণয়ের মাঝে। এমনকি এটার কোনো বিহিত করতে ও বললো না। আশ্চর্য হলো—নিজে থেকেই বললো,
“স্যার, মেয়েটাকে মেরে ফেলব?”
“দরকার নেই।”
“বস, আমাদের ১০০ বিলিয়ন ডলারের কন্টেইনার সিজ হয়ে গেছে।”
“কোন কান্ট্রিতে?”
“রাশিয়া।”
“চিফ মিনিস্টারকে জানিয়ে দাও, রাতে তার বাসায় ডিনারে যাচ্ছি।”
“ওকে। আরেকটা প্রবলেম বস।”
“হারি আপ।”
“বস, নেশন গ্রুপের ওনার আমাদেরকে তার ৮০% শেয়ার লিখে দিতে রাজি হচ্ছে না।”
বাকা হাসলো প্রণয়। ডেভিল স্মাইল দিয়ে বললো,
“ভেরি সিম্পল। প্রথমে হাত কাটো, তারপর পা কাটো, তারপর চোখ তুলে নাও।”
“বুঝে গেছি বস।”
“গুড বয়। আর কিছু?”
“নো বস।”
“ওকে।”
বলেই হন হনিয়ে চলে গেল প্রণয়।
মিস্টার পিউরুসনও আর কিছু না বলে চলে গেলেন। এখানে যারা থাকে তারা হুকুমের গোলাম। তাদের কাজ শুধু আদেশ পালন করা, মতামত দেওয়া নয়।
মেয়েটাকে এভাবে ছেড়ে রাখলে আরও কিছু দেখেছে, সব বলে দেবে—তখন বিরাট বিপদ হতে পারে। ভয়ে ঘামতে শুরু করলো জাভেদ। অসহায় চোখে তাকালো শুদ্ধর দিকে। চোখের ভাষা এমন যে, কী করব স্যার, কিছু তো বলুন।
শুদ্ধ হাসলো। জাভেদের পকেট থেকে গানটা বের করে আঙুলের মাথায় ঘুরালো। কিছুক্ষণ কালো পিস্তলটা নিরীক্ষণ করে চেপে ধরল জাভেদের বুকে। ঠোঁটের কোণে ধূর্ত হাসি ফুটে উঠল জাভেদের। অর্ডার সে পেয়ে গেছে। শুদ্ধ কিছু বললো না। বন্দুকটা জাভেদের হাতে দিয়ে কাঁধ চাপড়ে নিঃসব্দ পায়ে প্রস্থান করলো।
“মিস্টার ইরফান, এতটা ইরেসপন্সিবল আপনি কিভাবে হতে পারেন!”
রাগে থরথর করে কাঁপছেন ডিটেকটিভ সিনিয়র অফিসার আলিস।
তাদের বর্তমান লোকেশন এমআইটি, তুরস্কের সব থেকে বড় ডিটেকটিভ ব্যুরো। অন্যায় নেই যেখানে সেখানে অন্যায় স্বীকার করার মানেই হয় না। ইরফানও এসব অযথা রাগের ধার ধারলো না। এতক্ষণ চোখে চোখে রাখা শিকার হঠাৎ করেই ভ্যানিশ হয়ে গেল। রাগে শরীরের রক্ত তখন করে ফুটছে ইরফানের।
“আনসার মি, মিস্টার ইরফান!”
ইরফান নিজের উগ্রতা কন্ট্রোল করলো। সিনিয়রের রাগ করাটা স্বাভাবিক। এখন নিজেদের মধ্যে ঝামেলা করলে শিকার আবার ফসকে যাবে। ইরফান মাথা ঠাণ্ডা করলো। কণ্ঠের স্বাভাবিক মাত্রা বজায় রেখে বললো,
“বিজনেস ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট মিস্টার আবরার শিকদার প্রণয়কে পুরোটা সময় আমি নজরে নজরে রেখেছিলাম। বাট কার্স হারাকানি এয়ারপোর্টে এসে হঠাৎ করেই সেখানে একটা গণ্ডগোল লেগে যায়। এর পর মানুষের ভিড়ে আর তার পিছু নিতে পারিনি। তবে আমি নিশ্চিত, সে আশেপাশেই আছে।”
“তাকে স্টক করা তো আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। তাকে পার্মানেন্টলি ফিনিশ করা আমাদের উদ্দেশ্য।”
“আই নো।”
সামনে লাগানো বিশাল হ্যালো ইন প্রজেক্টরে তাদের কনভারসেশন দেখে পৈশাচিক হাসলো প্রণয়। ইমপোর্টেড কফি মগের চারপাশে আঙুল ঘুরাতে ঘুরাতে বললো,
“তোমাদের দৌড় ততটুকুই, যতটুকু আমি চাইবো। ইউ গাইজ আর সাচএ বেবি!”
আজ পুরো চারদিন হয়ে গেলো প্রণয় দেশে নেই।
তার কণ্ঠ নেই, তার গন্ধ নাই, তার উপস্থিতি নেই।
অস্থিরতায় দম ফেলতে পারছে না প্রিয়তা। এই চারদিনের এক এক সেকেন্ড প্রিয়তার কাছে এক একটা যোগের সমান দীর্ঘ মনে হচ্ছে।
অপেক্ষায়, অস্থিরতায় কান্না পায় প্রিয়তার।
একা নিঃসঙ্গ বিছানায় শুয়ে শুয়ে ছটফট করে। প্রণয়ের বুকে ঘুমানোর যে মধুর অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়েছে সে এখন আর ওই স্পর্শ ছাড়া তার ঘুম আসে না।
বিছানা বালিশ খামছে ধরে অবুঝের মতো কাঁদতে থাকে প্রিয়তা। অন্ধকার ঘরে হাতড়ায় ভালোবাসা।
নিঝুম অধারি কক্ষের একপাশে টিমটিম করে এক চিলতে হলুদ আলো।
রাত কতই বা হবে—একটা কি দুটো, ঠিক খেয়াল নেই প্রিয়তার। তবে পরিবেশের ভারী নিস্তব্ধতা বলে দিচ্ছে গভীর রাত।
কিছুক্ষণ পর পর দূর থেকে ভেসে আসে নিশাচর প্রাণীদের কাতর আর্তনাদ।
বিছানার এপাশ থেকে ওপাশে গড়াগড়ি খাচ্ছে প্রিয়তা। ক্লান্ত চোখ দুটোতে ঘুমের লেশ মাত্র নেই। সারাদিন অনেক ছুটাছুটি করেও রাতে প্যাঁচার মতো জেগে থাকতে হচ্ছে।
অজানা কারণে দম বন্ধ লাগে, প্রিয়তার বুক ধড়ফড় করে।
জবরদস্তি চোখ পূর্ণ বন্ধ করলে চোখের মনি লাফিয়ে উঠে এপাশ থেকে ওপাশে দৌড় দেয়। স্থির এক জায়গায় বসে না। প্রচণ্ড বিরক্ত হয় প্রিয়তা।
আরো বেশ কিছুক্ষণ এপাশ–ওপাশ করতে করতে উঠে বসে। গত রাতগুলোর মতো আজ রাতের ঘুমটাও হারাম হয়ে গেছে—এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই প্রিয়তার।
আর ঘুম আসবেই বা কী করে! এই যে কয়টাদিন এত আদর করে বুকে নিয়ে ঘুমপাড়ালো, এখন ওই বুকটা ছাড়া কী ঘুম আসবে প্রিয়তার!
যে মানুষটার বুকের ওমে লেপ্টে থাকা অভ্যাস হয়ে গেছে, তাকে ব্যথিত ঘুম—
পুরনো অভ্যাসটা আবারও ধীরে ধীরে ফিরে আসছে প্রিয়তার।
আবারও পরনির্ভরশীলতা তৈরি হচ্ছে, আগের থেকেও বেশি, আগের থেকেও তীব্রভাবে। মানুষটার গলায় তাবিজের মতো ঝুলে থাকতে মন চায় প্রিয়তার। একটুকুর জন্যও তাকে কাছ ছাড়া করতে ইচ্ছা করে না। তার অনুপস্থিতি বড্ড পোড়ায়।
উঠে বসে শরীর টানালো প্রিয়তা। প্রণয়–অভাব শুধু মনে নয়, শরীরের প্রতিটি অণুতে অনুভূত হচ্ছে।
মুরগির বাচ্চার মতো বারবার ঝিমিয়ে পড়ছে সে। ঘাড়, হাত, পা মটমট করছে অকারণেই।
গায়ে লাগা অল্প বাতাসেও শরীর শিরশির করছে। স্কিনের সেনসিটিভিটি বেড়েছে বহুগুণ।
এমন অঙ্গ ঝলসানো অস্থিরতা নিয়ে মটকা মেরে পড়ে থাকতে পারল না প্রিয়তা। তার একটু ও সহ্য হচ্ছে না এই যাতনা।
আবারও কান্না পেলো প্রিয়তার। ঠোঁট উল্টে কেঁদে উঠলো—ফ্যাচ ফ্যাচ করে।
সে হয়তো নিজেও বুঝতে পারছে না, তার ভেতরের হাহাকার—তার শরীর ও মন ওই সামর্থ্যবান দুই হাতের আলিঙ্গন পেতে কতটা ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। সে সম্পর্কে কী ধারণা আছে, ওই বোকা তরুণীর?
নিজের এসব অদ্ভুত পরিবর্তনে নিজেই বিভ্রান্ত প্রিয়তা।
আগেও তো কত রাত সে একা থেকেছে, একা ঘুমিয়েছে। কই, এমন তো লাগেনি কখনো! ঘুম আসছে না—ইটস ওকে। কিন্তু এগুলো কী!
এসব উল্টোপাল্টা চিন্তাভাবনা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেললো প্রিয়তা। অযথা ব্রেনের অপচয় থামিয়ে বালিশের পাশ থেকে নিজের ফোনটা তুলে নিল।
বিরাট একটা হাই তুলে চোখ কচলে লক খুলতেই লজ্জায় পড়ে গেল প্রিয়তা। ওষ্ঠ কোণে ফোটে উঠল এক চিলতে লাজুক হাসি। ড্যাব ড্যাব চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো সেদিকে।
ফোনের হোম স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে হাজারো আঁচড়–কামড়ে রক্তাক্ত, জর্জরিত, একখানা জখম পিঠ। শুধু কি তাই—
প্রত্যেকটা ক্ষতের উপর ডিপ কিসের চাপ।
সারা পিঠ জুড়ে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে অসংখ্য লাল ঠোঁট।
ফর্সা পিঠে আঁকা এই সৃজনশীল শিল্পকর্ম থেকে সহজেই অনুমান করা যায়—এগুলো সাধারণ কোনো শিল্পীর শিল্পকর্ম নয়। এই শিল্পী অনন্য।
ফোনটা উপরের দিকে সোয়াইপ করতেই সেম আরেকটা ছবি দৃষ্টি কাড়লো, তবে কিঞ্চিৎ ভিন্নতা।
বালিশে মুখ গুঁজে উল্টো হয়ে ঘুমিয়ে আছে প্রণয়। কোমর অব্দি সফেদ কমফোর্টারে ঢাকা। উন্মুক্ত নগ্ন পিঠে লেপ্টে আছে প্রিয়তা। তার প্রবাল কেশরাশি বিছানা ছাড়িয়ে গড়িয়ে পড়েছে মেঝেতে।
কেন যেন গলা শুকিয়ে এলো প্রিয়তার। বেশি গভীরে গেলো না—
নাহলে লুকিয়ে চাপিয়ে এমন অনেক ছবি তুলেছে, যেগুলো দেখে নিজেই লজ্জায় লাল–নীল হয়ে যায় প্রিয়তা।
বেশ কিছুক্ষণ থম মেরে থেকে নিজেকে সামলে নিলো প্রিয়তা। ফেসবুক ওপেন করে নিজের ফেক আইডিতে লগইন করলো।
সার্চ বারে লিখলো—আবরার সিকদার প্রণয়।
সাথে সাথেই লিস্টের টপে শো করলো একটা বিজনেস অ্যাকাউন্ট।
আইডিটাতে ক্লিক করতেই প্রোফাইল পিকচার, কভার ফটো সহ সমস্ত অ্যাকাউন্ট ডিটেইলস ভেসে উঠলো চোখের সামনে।
সাদা ফরমাল শার্ট আর কালো ফরমাল প্যান্ট পরিহিত একজন সুদর্শন যুবকের ছবি প্রোফাইলে। হাতে স্টারবাক্সের কফি, কনুই গুটানো, মুখে গাম্ভীর্য, চোখে শীতল আত্মবিশ্বাস।
ছবিটা জুম করে করে বেশ কয়েকবার দেখলো প্রিয়তা। সব থেকে বেশি নজর কাড়ল তার অনুসারী সংখ্যা—প্রায় ৩০ মিলিয়ন।
কই তার আইডিতে ১–২ হাজার ফলোয়ার্স, আর কই তার জামাইর আইডিতে ৩০ মিলিয়ন!
মনে মনে নিজের পপুলারিটির উপর থু দিল প্রিয়তা। বড়ই লজ্জাজনক বিষয়।
আইডিতে স্ক্রল করে করে সব পোস্ট দেখছে প্রিয়তা। এক্সে বারকার এক পোস্ট, তবে তাদের মতো হিজিবিজি কোনো পোস্ট নাই।
ভিন্ন ভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে নেওয়া ফরমাল ছবি—কোনোটাতে কালো শার্ট কালো প্যান্ট, আবার কোনোটাতে সাদা শার্ট কালো ব্লেজার।
বসার আর দাঁড়ানোর স্টাইলগুলোও মারাত্মক আকর্ষণীয়। নেশা ধরানো হাবভাবে চরম ডমিনেটিং ম্যানলি একটা ব্যাপার।
পুনরায় উষ্টা খেয়ে প্রেমে পড়লো প্রিয়তা। উঠতে–বসতে ক্রাশ খাইতে খাইতে তার জীবনটা যাবে।
নিজের উপর গর্বে গর্বে গর্ভবতী হলো প্রিয়তা।
অদৃশ্য হাতে নিজেই নিজের পিঠ চাপড়ে বলল—
“সাবাশ বেটা, এমন ঝিংকু মাল পটাতে না পারলে জীবনটাই বৃথা।”
“একটা মাত্র জীবনে যদি এমন কড়া একখানা জামাই না পাইলা, তাহলে আর পাইলা কি!”
প্রত্যেকটা পোস্টের নিচে মিলিয়নসের উপর লাইক, কমেন্ট, শেয়ার। তবে একটা ছবিরও কমেন্ট বক্স ওপেন করছে না প্রিয়তা।
এই রাতবিরেতে বেহুদা মুডটা সে নষ্ট করতে চায় না।
এসব ন্যাকুপুষু মেয়েদের ঢলাঢলি কমেন্ট দেখলেই গায়ে আগুন জ্বলে যাবে প্রিয়তার। ঝগড়া করার জন্য শরীর জ্বালা করবে। তাই থাক—ওসব দেখে মাঝরাতে নিজের মেজাজ খারাপ করার মানেই হয় না।
আইডিতে ঘুরুঘুরু থামিয়ে দিল প্রিয়তা। মেসেজ দেবে কি দেবে না—ভাবতে ভাবতে ঘণ্টা পার করে দিল।
যেই ভাব—ওয়ালা ব্যাটা মানুষ মেসেজ সিন করবে কিনা, কিংবা রিপ্লাই দেবে কিনা—তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দিহান হলো। তবু সাত–পাঁচ ভেবে মেসেজ দিয়েই বসলো।
ইনবক্সে ছোট্ট করে লিখলো—
“হায়ইইইই হ্যান্ডসাম”
মেসেজটা সেন্ড করে টনক নড়লো প্রিয়তার। প্রথমে সালাম দেওয়ার বদলে কী লিখলো এটা!
দ্রুত মেসেজটা ডিলিট করতে নিয়ে থেমে গেল প্রিয়তা। ভ্রু কুঁচকে গেল আপনা–আপনি।
মাঝরাতে হঠাৎ মাথায় কিলবিল করে উঠলো শয়তানি বুদ্ধি।
ল্যাপটপ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসলো প্রণয়। টুং করে আসা ফোন নোটিফিকেশনটার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। মোবাইল স্ক্রিনে এখনো আলো জ্বলজ্বল করছে।
ল্যাপটপ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ফোনটা হাতে নিল প্রণয়। মেসেঞ্জার স্প্যাম চেক করতেই দেখলো—অবুঝ বালিকা নামক একটা আইডি থেকে মেসেজ এসেছে। ডিপিতে একটা কালো বিড়ালের ছবি।
ঠোঁটের কোণে অদৃশ্য মৃদু হাসি খেলে গেল প্রণয়ের। তুরস্কে এখন রাত প্রায় ১২টা, তাহলে বাংলাদেশে ৩টা নিশ্চয়ই।
প্রণয় রিপ্লাই করলো—
“হ্যালো সুইটি”
রিপ্লাইয়ের আশায় চোখ বড় বড় করে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল প্রিয়তা। তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল—প্রণয় কোনো উত্তর করবে না।
কিন্তু পরক্ষণেই তার ভুল ধারণা ভেঙে গেল। কাঙ্ক্ষিত আইডি থেকে রিপ্লাই আসতে দেখে মুখটা কালো হয়ে গেল প্রিয়তার।
তার অত সুন্দর জামাই একটা চেনা–জানা নেই অচেনা মেয়েকে রিপ্লাই দিয়ে দিল—ভাবতেই বুকটা কষ্টে ঠাস ঠাস করছে প্রিয়তার।
মুখটা কাঁদোকাঁদো হলো।
ওর এক্সপ্রেশন দেখে শরীর দুলিয়ে শব্দ করে হাসলো প্রণয়। তার বোকা পাখিটা এত অবুঝ কেন, তার মাথায় বুদ্ধির এত অভাব কেন!
প্রিয়তা মনের দুঃখ মনে চেপে মেসেজ লিখলো—
“এতো রাতে অনলাইন কেনো”
ওপাশ থেকে রিপ্লাই এলো—
“নিঃসঙ্গতাই আমাকে একা করে দিয়েছে সুইটি”
আরেক বেটিকে সুইটি বলে! কী লুচু রে বাবা! চোখ বড় বড় করে ফেললো প্রিয়তা। নিজের বিস্ময় সামলে বললো—
“মধ্য রাতে একা কেনো”
“তাহলে দুঃখ পাবো কোথায়”
কথা না পেঁচিয়ে শর্টকাটে প্রশ্ন করলো প্রিয়তা—
“আর ইউ সিঙ্গেল”
সাথে সাথে রিপ্লাই এলো—
“অফকোর্স আই অ্যাম পিওর সিঙ্গেল বাট”
ফোন স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ে কাশি উঠে গেল প্রিয়তার। চোখ বড় বড় করে তাকালো মেসেজটার দিকে। গাল হাঁ করে বলল—
“এই বিয়াইত্যা ব্যাটা সিঙ্গেল!”
প্রচণ্ড রাগে গজগজ করে উঠলো প্রিয়তা। দাঁত কটমট করে চিবিয়ে চিবিয়ে রিপ্লাই দিল—
“ইউ আর সিঙ্গেল দ্যাটস এ গ্রেট নিউজ বাট হোয়াই”
প্রণয় ঠোঁট চাপলো হাসি নিয়ন্ত্রণ করে, লেখলো—
“এমনি আমি পুরো সিঙ্গেল। তবে বেশি কিছু না—হালকা করে একবার বিয়ে হয়েছিল, বাড়িতে কচি করে বাচ্চা মতো একটা বউ আছে। এছাড়া বিশেষ কিছু নেই।”
প্রিয়তা বেক্কেল বনে গেল। ব্যাটা কী তার সাথে মশকরা করে!
“এ্য্যহ্ এটা কোনো কথা হলো! আপনার যদি হালকা করে বিয়ে হয়, কচি করে বউ থাকে, তাহলে আপনি সিঙ্গেল কিভাবে হলেন? আপনি তো বিবাহিত!”
“আহা, বউ থাকলেই বিবাহিত বিবাহিত ফিল আসে? বিবাহিত ফিল নেওয়ার জন্য বউ কাছে থাকতে হয়, বউয়ের আদর–সোহাগ পেতে হয়। নিয়মিত বিবাহিত জীবন আদর–সোহাগ ছাড়া মাছ ছাড়া মাছের ঝোল।
তো বউটা মোর বুকে নাই—হলাম না বিবাহিত, সিঙ্গেল।”
এইসব জগা খিচুড়ি মার্কা পেঁচানো লজিক দেখে প্রিয়তার মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো। বিড়বিড় করে বলল—লজিকের মায়রে বাপ পাকিস্তান।
তবে রিপ্লাই লিখলো—
“আচ্ছা বউয়ের থেকে দূরে গেলে সব ব্যাটা মানুষ কী সিঙ্গেল হয়ে যায়?”
“অফকোর্স… বউয়ের গা ঘেঁষে যতক্ষণ থাকবো ততক্ষণ ডাবল, নাহলে সিঙ্গেল।”
“আচ্ছা, আপনার বউ কেমন?”
“সিম্পল, ছোটখাটো একটা হাঁসের বাচ্চার মতন।”
“আচ্ছা, শুধু আমার বিষয়ে জিজ্ঞেস করবেন? নিজের বিষয়ে একটু বলুন। আপনি সিঙ্গেল?”
দাঁত খিটমিট করলো প্রিয়তা। আরেক বেটির ভাতার আছে কিনা জানতে চায়—ফোনের সাথে যুদ্ধ চালাচ্ছে প্রিয়তা।
“অফকোর্স আমি পিওর সিঙ্গেল, শুধু—”
“শুধু কি?”
দায়সারা জবাব প্রিয়তার—
“শুধু এক সময় যারে ভাই ডাকতাম, সময়ের ব্যবধানে তারে জামাই ডাকি। এছাড়া আমিও পুরো সিঙ্গেল।”
“ও সো স্যাড। তো আপনার ভাই থুড়ি জামাইটা কোথায়?”
“উফফ আর নিভানো মনে আগুন জ্বালাবেন না তো মিয়া। আমার স্বামী বিদেশ।”
“আপনার দুঃখের কথা শুনে দুঃখিত হলাম। আপনার নিশ্চয়ই অনেক কষ্ট।”
“উফফ সে আর বলতে! আমার মতো জুয়ান একটা মাইয়া রেখে সে কেমনে পারে বিদেশ পড়ে থাকতে! সে দুঃখে আমি শুধু একটাই গান গাই!”
“কি?”
“ভাতার আমার কাতার গেছে চাকরি করিতে, একা বিছানায় ঘুম আসে না, ছটফটাই রাইতে।
কোল বালিশ মুরামুরি আর কত করুম!”
“আহ্, আপনার স্বামী এত জালিম! এমন কচি বউ ফেলে কেউ কিভাবে কাতার পড়ে থাকে! আমি হান্ডেট পার্সেন্ট নিশ্চিত—আপনার স্বামীর নিশ্চয়ই সার্ভারে সমস্যা।”
পুরোটা বুঝলেও লাস্টের লাইনটা বুঝলো না প্রিয়তা। পুরো দুই মিনিট লাগিয়ে কথার মর্মার্থ উদ্ধার করতে ব্যর্থ হলো। তাই পুনরায় জিজ্ঞেস করলো—
“সার্ভার এ প্রবলেম মানে”
“ও কিছু না, আপনার হকের সম্পত্তি লুঙ্গির তলায় নিয়ে যে দূরে দূরে ঘুরছে—তার লুঙ্গির তলায় ঠান্ডা পড়ুক। আমিন।”
অভিশাপ দেখে আঁতকে উঠল প্রিয়তা। দ্রুত ও সম্মতি প্রকাশ করে বলল—
“না না, এমন করে বলবেন না। যদি সত্যি সত্যি আমার জামাইয়ের অভিশাপ লেগে যায়!”
হেসে ফেললো প্রণয়—
“আচ্ছা, বললাম না।”
প্রিয়তা নিজের মনের উদ্দেশ্যটা পেশ করার উদ্দেশ্যে বলল—
“উহু উহু, আপনাকে একটা কথা বলতাম।”
“জ্বী, বলুন।”
প্রিয়তা আরেকটু গুছিয়ে বসলো। ঘুরিয়ে–পেঁচিয়ে বললো—
“আপনার যেহেতু বউ নেই আর আমারও যেহেতু স্বামী বিদেশ, তাহলে আমরা তো চাইলেই একে অপরের পাশে থাকতে পারি।”
“পাশে থাকা মানে? আপনি কি আমাকে পরকীয়ার অফার করছেন?”
“আরে পরকীয়া বলছেন কেন? বলুন বন্ধুত্ব, ভালো বন্ধুত্ব।”
“আচ্ছা, পরকীয়ার আপডেট ভার্সন আজকাল বন্ধুত্ব—ওকে। আমি রাজি। বাট আই হ্যাভ আ ওয়ান কন্ডিশন।”
“কি?”
“আর ইউ ভার্জিন? বুঝতেই তো পারছেন—আমার একটা স্ট্যান্ডার্ড আছে। আমি আবার ভার্জিন ছাড়া পরকীয়া করি না।”
প্রিয়তা দ্রুত রিপ্লাই করল—
“ইয়েস, আই এম পিওর ভার্জিন।”
ঠোঁট কামড়ে ধরলো প্রণয়। টেক্সট ছেড়ে ভয়েস নোটে বলল—
“ওহ রিয়েলি, ম্যাডাম! আপনি ভার্জিন, বাট আমি কিন্তু আপনার সমস্ত বডি সিক্রেট জানি এমনকি”—
এতটুকু বলতেই আঙ্গুল ফসকে ভয়েজটা সেন্ট হয়ে গেলো।
আবারও ভয়েস রেকর্ড করলো প্রণয়। উগ্র, নেশলো কণ্ঠে বললো—
“ও ম্যাডাম, আপনি ফার্স্ট সিডিউস করা বন্ধ করুন। একটু ঢেকেঢুকে অন্য দিকে ঘুরে বসুন।
আমি বাসায় না থাকলে রাতে ইনার পরবেন। আপনার এরা নির্লজ্জের মতো আমার দিকে উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছে।
এই অধমের উপর একটু তো মায়া করুন। দেখুন কেমন নির্দয়ভাবে ল্যাপটপ দিয়ে চেপে ধরতে হয়েছে,ওতো আপনার বলুন? ও কী এত চাপ সহ্য করতে পারে? ব্যথা পাচ্ছে তো। টনটন করছে।
I can’t control the sensation।
এবার আসি আপনার ভার্জিনিটি তে, ম্যাডাম। আপনি যে বেবি পিঙ্ক টি-শার্টটা পরে আছেন, ওটা একটু উপরে তুলুন। ডান দিকেরটা একদম স্মুথ বাটারি, বাট বাঁ দিকেরটায় একদম শুরুর দিক থেকে একটু নিচে তাকিয়ে দেখুন—থকথকে সাদা চামড়ার ওপর একটা টকটকে লাল তিল আছে। মাইন্ড ইট, ওটা কিন্তু আমার দুর্বলতা, আমার প্রিয় নেশা। ওটাকে প্রতিবার আলাদা করে আদর করতে হয়। ওটাকে ‘suck’ করা আপনার স্বামীর প্রিয় সাবজেক্ট। দেখুন, রেড ডটটার আশেপাশে দুই-একটা বাইটও হয়তো খুঁজে পাবেন।
তবে ভুলেও উত্তর দিকে মুখ করে আবার তুলতে যাবেন না যেন। বউ কাছে নাই, বুঝতেই তো পারছেন। এমন লোভনীয় খাবার দেখলে ক্ষুদা লেগে যাবে, প্রিয় খাবারের লোভ দেখবেন তো ঠিকই অথচ খেতে দেবেন না।
আরও শুনবেন? আচ্ছা, শুনুন। আপনার লেফট থাইসের ঠিক মাঝ বরাবর একটা ছোট্ট কালো তিল আছে। আপনার কাঁধের ঠিক পিছন দিকে একটু নিচে একটা বার্থ মার্ক আছে, যেটার সম্পর্কে আপনি নিজেও জানেন না। আপনার পিঠে গুনে গুনে তিনটে তিল আছে—ওগুলো সম্পর্কেও আপনি জানেন না।
ছাড়াও আপনার বডিটা একদম— “buttery, smooth’ extreme soft ‘like vanilla ice cream”।
ম্যাডাম, স্টিল আর ইউ ভার্জিন? দ্যান কাম হেয়ার, আই জাস্ট ডেসপারেটলি ওয়ান্ট ইয়োর মেন্টাল অর ফিজিক্যাল লাভ।”
ভয়েস নোট দুটো শোনা মাত্রই বুকের ভেতর ছ্যাঁত করে উঠলো প্রিয়তা। হার্ট লাফিয়ে বাইরে চলে আসতে চাইলো।
ভয় ভয় তাকালো উত্তর দিকে, কিন্তু কিছুই নজরে আসল না। শুষ্ক ঢোক গিলল প্রিয়তা। নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে দেখল—সত্যি, একটা বেবি পিঙ্ক কালার টি-শার্ট।
ভাবনা বেশি দূর এগিয়ে নিতে পারল না প্রিয়তা।
অন্ধকার রুমে সশব্দে কলার টিউন বেজে উঠতেই কেঁপে উঠল। সাদা আলো বিচ্ছুরিত স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করে উঠল একটা নাম—প্রণয় ভাই।
ভয়ে, লাজে কুণ্ঠিত হলো প্রিয়তা। দুচোখের দৃষ্টি নত হলো আপনাআপনি। লজ্জা পাওয়ার মাত্রাটা এতটা তীব্র, যেন প্রণয় তার সামনেই আছে।
লজ্জাবতীর নরম গালে লজ্জার প্রলেপ পড়তে দেখে চোখ বন্ধ করে নিল প্রণয়। উরুতে থাকা ল্যাপটপ চেপে ধরল শক্ত হাতে।
মানুষটা হাজার মাইল দূরে, তবু নিজের লজ্জা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে প্রিয়তা। নিজের বেগতিক অবস্থা কিছুটা স্বাভাবিক করে ফোনটা ধরতে নিতে নিলেই কলটা কেটে গেল।
সাথে সাথেই লজ্জা মিলিয়ে গেলো। প্রিয়তার মনটা বিষণ্ণ হলো। লজ্জা-রাঙানো মুখশ্রীতে ভর করল একটুকরো শরতের কালো মেঘ। নিজে কল ব্যাক করতে গেলেই ওপাশ থেকে যান্ত্রিক কণ্ঠে ভেসে এলো—
“সরি, ইউ ডু নট হ্যাভ সাফিসিয়েন্ট ব্যালেন্স টু মেক দিস কল।”
চোখ টলটল করে উঠল প্রিয়তার। ছোট্ট মনটা উতলা হলো প্রিয় মানুষটার সাথে কথা বলার ব্যাকুলতায়। আবারও মেসেজ করল—
“প্লিজ আরেকটা ফোন করুন, প্রণয় ভাই। আমার ইউএসডি রিচার্জ নাই।”
কিন্তু মেসেজটা কেবল সেন্ট হলো, আগের ন্যায় এখন আর ডেলিভারড হলো না। অর্থাৎ প্রণয় অফলাইনে চলে গেছে।
মেসেঞ্জারে কল দিল—সেটাও গেল না। কুট কুট শব্দে ডিসকানেক্ট হয়ে গেল।
রাগে, অভিমানে ফর্সা নাকের ডগায় জমা হলো গোলাপি আভা। না চাইতেও চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল নোনা পানি।
প্রিয়তমার চোখের পানি দেখে আকস্মিক ব্যথায় বুকটা টনটন করে উঠল প্রণয়ের। দৃষ্টি সরাতে মন চাইল না নিষ্পাপ মুখটার দিক থেকে।
এই মেয়েটাকে সে যেভাবেই পাওয়ার চেষ্টা করে, দিন শেষে আর পাওয়া হয় না। পেয়েছি বলে পরিপূর্ণ তৃপ্তি আসে না। সময়ের সাথে আরো আরো বেশি করে পাওয়ার তাড়না জাগে মনে।
এ বুকের তৃষ্ণার যেন কোনো অন্ত নেই। যতবারই তাকে নিংড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে, ততবারই আরো তীব্রভাবে পুনরায় আহরণের পিপাসা বাড়ে।
তাকে কীভাবে পেলে, কত গভীরে ভালোবাসলে আর পুনরায় পাওয়ার ইচ্ছা জাগবে—মন স্বীকৃতি দেবে পরিপূর্ণ তৃপ্তি পেয়েছে বলিয়া—
এমন গভীরতা দুনিয়াতে আছে বলে জানা নেই প্রণয়ের।
সব উল্টো হয়। যত কাছে যায়, তত আরো কাছে যাওয়ার তৃষ্ণা বাড়ে। এক মিলিমিটারের দূরত্বও হৃদয় সহ্য করতে পারে না।
পাকাপাকি বুকের ভেতর ভরে ফেলার এমন কোনো উন্নত প্রযুক্তি এখনো আবিষ্কার হয়নি—নাহলে কত টাকা লাগুক, প্রণয় কিনত।
প্রণয় মনে মনে বললো—
“দূরে থেকে আমাকে জ্বালিয়ে দিচ্ছো, রক্তজবা।
ভেতরে চলছে এক অসহ্য দহন, জ্বলছে এই নিকৃষ্ট বুকটা।
এই যন্ত্রণা সহ্য হচ্ছে না। মিঠবে ও না যতক্ষণ না পর্যন্ত তোমাকে কাছে পাবো, আবারো আমার করে পাবো।”
প্রিয়তা জানে না উত্তর দিকের কোথায় ক্যামেরা। তবুও উত্তর দিকে ছলছলে চোখে তাকিয়ে ক্রন্দনরত কণ্ঠে বলল—
“আমি জানি আপনি সব দেখতে পাচ্ছেন, প্রণয় ভাই। আমি আপনার সাথে কথা বলবো?”
এই গুনগুনিয়ে কান্না আর সহ্য করতে পারল না প্রণয়। ফুঁপিয়ে উঠতেই পুনরায় সশব্দে ফোন বেজে উঠল। এবার আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না—ঝাঁপিয়ে পড়ে রিসিভ করল।
সে কিছু বলার আগেই অপর প্রান্ত থেকে ধমক ভেসে এলো—
“ইশ! বুকে ব্যথা ধরিয়ে দিলি আমার। আবার হার্টের রোগী বানাবি। সব কথায় এমন ফেঁচফেঁচ করে কাঁদতে হবে কেন তোর? জানিস না—তোর কান্না আমার সহ্য হয় না। বুকে অসহ্য যন্ত্রণা হয়, মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণ হয়। নেক্সট টাইম কাঁদবি না—সোজা বুক বরাবর শুট করে দিবি। ইটস বেটার দেন টু ইয়োর কেয়ারিং।”
কান্না থামিয়ে নাক টানল প্রিয়তা। অভিমানী কণ্ঠে বলল—
“আবার বকছেন? কেনো বুঝেন না—আপনাকে ছাড়া আমি থাকতে পারি না। সব সহ্য হয়, কিন্তু আপনার বিয়োগ-বেদনা সহ্য হয় না। নেক্সট টাইম ছেড়ে যাবে না, জান। মেরে যাবে। ইটস বেটার দেন টু ইয়োর ডিসটেন্স।”
ফোন কানে চেপে ঠোঁট চেপে হাসল প্রণয়। চোখ বন্ধ করে বুকে হাত রেখে বলল—
“কে বলতে পারে, রক্তজবা—হয়তো গোটা একটা জীবন তোমাকে আমায় ছাড়া পাড়ি দিতে হবে। খুব যত্ন করে তোমায় ফাঁকি দেবো, রক্তজবা। হারিয়ে যাব অনেক দূরে। কাঁদবে তুমি, চিৎকার করবে—কিন্তু চোখের পানি মুছিয়ে দেওয়ার জন্য এই আমিটাকে আর কোনোদিন ও পাবে না।
তুমি বুঝতে পারবে—হারানোর যন্ত্রণা ইহজন্মের, আর পেয়ে হারানোর যন্ত্রণা জন্মান্তরের।
তুমি আমাকে পেয়ে হারাবে, রক্তজবা।”
প্রথম দুই লাইন শুনেই পরের কথাগুলো শুনতে পেল না প্রিয়তা। তবে তার বিশ্বাস আটকে দেওয়ার জন্য এ কথাগুলোই যথেষ্ট ছিল। চোখ দুটো পুনরায় জ্বালা করল। মায়াবী দুই চোখ বেয়ে টপটপ করে গড়াতে লাগল নিঃশব্দ অশ্রু।
অবুঝ অভিমানে বুক ভারী হয়ে এলো প্রিয়তার। ফোন কেটে দিতে নিলেই ধীর, স্থির, নরম পুরুষালি একখানা কণ্ঠ ভেসে এলো—ভীষণ আদুরে গলায় ডাকে—
“রক্তজবা।”
সম্বোধনটা শুনে ফোন কাটার সামর্থ হারালো প্রিয়তা। জবাবও দিল না। কানে ফোন চেপে চুপচাপ বসে রইল।
প্রণয় আরো নরম গলায় ডাকল—
“আমার জান, আমার অস্তিত্ব, আমার নিঃশ্বাস, আমার আদুরে বাচ্চা, আমার রক্তজবা।”
এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। মুখ চেপে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল।
বুকে হাত চেপে মৃদু ধ্বনিতে ধমকালো প্রণয়। কাতর গলায় বললো—
“ধুর বোকা মেয়ে! শুধু শুধু কেন আমার বুকে ব্যথা বাড়াস? তোর সাথে কি মজা ও করতে পারবো না? তোরে ছেড়ে আমি যাবো কোথায় বল? আত্মা ছাড়া কী শরীরের মূল্য আছে?
ঠিক তেমন—তুই তো আমার জান, সোনা, আমার লক্ষ্মী, আমার ময়না, আমার নিঃশ্বাস। তুই ব্যথিত—তোর প্রণয় ভাই লাশ মাত্র।
যেদিন সাদা কাফনে মুড়িয়ে সাড়ে তিন হাত মাটির নিচে রেখে আসা হবে, সেদিন বুঝে নিবি—আজ থেকে তোর প্রণয় ভাই সত্যিই তোকে ভুলে গেল। আজ থেকে তোকে নিজেরটা নিজেই বুঝতে হবে।”
আরো জোরে কান্না করে দিলো প্রিয়তা। চোখের জ্বলে বুক ভাসিয়ে বললো—
“প্লিজ প্রণয় ভাই, এসব অলক্ষণে কথা একটু ও বলবেন না। তাড়াতাড়ি ফিরে আসুন আমার কাছে। আপনাকে ছাড়া আমার একটু ও ভালো লাগছে না। খুব খুব খুব কষ্ট হচ্ছে। আপনি ব্যতীত মুক্ত বাতাসও বিষাক্ত লাগে, প্রণয় ভাই। প্লিজ ফিরে এসো, জান। লাগবে না এত কাজ।”
“সত্যি ফিরে আসব?”
“হুম।”
“ফিরে আসলে কী দিবি?”
“যা আপনি চাইবেন।”
“ঠিক আছে—আর মাত্র চার দিন, তারপর ফিরে আসব।”
“না না, প্লিজ। এত সময় আপনাকে ছাড়া থাকতে পারব না। কালকেই ফিরে আসুন।”
ঠোঁট ঠেলে হাসল প্রণয়। গভীর কণ্ঠে বলল—
“এখুনি ফিরে আসি?”
“সত্যি?”
“আমার জান, আমার কাছে জান চাইলে শরীরকে ও রুহের মায়া ত্যাগ করতে বাধ্য করব। আর এ তো সামান্য।”
খুশিতে মুখ ঝিলিক দিয়ে উঠল প্রিয়তার। উত্তর দিকে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে ফ্লাইং কিস ছুড়ে দিল।
ঠোঁট কামড়ে ধরল প্রণয়। নেশা জড়ানো অসহায় কণ্ঠে বলল—
“ওটা ওভাবে বাতাসে উড়িয়ে দিস না, জান। আমার জন্য বাটি চাপা দিয়ে রাখ। আমি এসে খাব।”
“অসভ্য লোক!”
“আমি আপনাকে ছাড়া ভালো নেই।”
“তো আমি ও কী ভালো আছি? অরিজিনাল প্রোটিন ওভাবে শুকিয়ে মরছি।”
কান দুটো ঝাঁ ঝাঁ করে উঠলো প্রিয়তার।
“জান, শুন।”
“হুম।”
“ভালোবাসি, পাখি। আমার পাখিটাকে অনেক ভালোবাসি।”
লজ্জায় মাথা নিচু করল প্রিয়তা। মিনমিনে গলায় বলল—
“আমি ও অনেক ভালোবাসি।”
“তাহলে রাখি, জান?”
“উহু, শুনুন।”
“বলো, পাখি।”
“ভাত খেয়েছেন?”
“নাহ।”
“কেন?”
“নিজের হাতে খেতে ভুলে গেছি।”
“এটা কোনো কথা?”
“এটাই কথা। জোর করবি না। আমি এসে খাবো—আমার জানের হাতে।”
“কিন্তু—”
“কোনো কিন্তু নয়।”
“আচ্ছা, আরেকটা কথা।”
“বলো, জান।”
“আমার জন্য ওখানকার স্পেশাল পেস্তা বাদামের চকলেট নিয়ে আসবেন।”
“আচ্ছা, জান।”
“জি, সাবধানে আসবেন। আল্লাহ আপনার হেফাজত করুন। আমিন।”
প্রণয় আর কিছু বলল না। ফোন কেটে দিল।
বুকটা অসম্ভব রকম ব্যথা করছে। এটা কী কোনো অশনি সংকেত? কথা তো দিলো—কিন্তু সত্যিই কি সে তার ছোট্ট বাবুই পাখির বাসায় আবার ফিরতে পারবে? সত্যিই কি ফিরতে পারবে তার বাবুইয়ের বুকে, তার ছোট্ট ওই ওমের ডানায় কী মুখ লোকাতে পারবে?
বুকের ব্যথা সমান তালে বাড়ছে প্রণয়ের। আবারো হার্টের সমস্যা দেখা দিচ্ছে কিনা কে জানে।
এপাশ-ওপাশ করে প্রিয়তার একটা ছবি বের করল প্রণয়। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে ছবিটা বুকে চেপে ধরল। লম্বা নিঃশ্বাস নিয়ে বিড়বিড় করে বলল—
“মৃত্যুর পূর্বে আমার শেষ ইচ্ছা—তোকে আরেকটাবার সশরীরে বুকে ঝাপটে ধরা। তার মানে এটা নয় যে আমি মৃত্যুকে ভয় পাই—”
“Hame maut se bhi ishq hai, tumse bhi pyar hai.
Maut par bhi yaqeen hai, tum par bhi aitbaar hai.
Dekhte hain pehle kaun aata hai—
Humein dono ka intezar hai.”
শুদ্ধ, শুদ্ধ।
দ্বিতীয় ডাকের সাথে সাথে খট করে দরজা খুলে দিল শুদ্ধ। কপাল কুঁচকে গেল প্রণয়ের।
তেতে উঠল শুদ্ধ। উগ্র মেজাজে চেচিয়ে বলল—
“কী এত রাতে জ্বালাচ্ছিস কেন, তোর জন্য কি শান্তিতে—”
কথা সম্পন্ন হওয়ার অপেক্ষা করলো না প্রণয়। পূর্বেই গমগমে আওয়াজে প্রশ্ন ছুড়েলো—
“তুই ড্রাগস নিয়েছিস?”
“হ্যাঁ, নিয়েছি তো।”
প্রণয় জবাব দিলো না। শুদ্ধকে ঠেলে রুমের ভেতর প্রবেশ করল। ইতি উতি তাকাতে তাকাতে চোখ গেল সেন্টার টেবিলের উপর, পরপর চারটা খালি সিরিঞ্জ পড়ে আছে।
বুক চিন চিন করল প্রণয়ের। অন্তরের খুব গভীরে সূক্ষ্ম একটা ব্যথা অনুভব হলো।
ফিরে তাকিয়ে বলল—
“ওয়ার্ল্ড ফেমাস কার্ডিও সার্জন ডক্টর আবদ্ধ চৌধুরী শুদ্ধ’র ব্লাডে যদি ড্রাগ পাওয়া যায়, তাহলে পুরো বিশ্বে সাড়া পড়ে যাবে, ইন্টারন্যাশনাল নিউজ চ্যানেলে হেডলাইন হবে।”
“আই ডোন্ট কেয়ার।”
“ডাক্তারি লাইসেন্স বাতিল হয়ে যাবে, ক্যারিয়ার নষ্ট হয়ে যাবে।”
“যেখানে জীবনের কোনো মূল্য নাই, সেখানে ক্যারিয়ার দিয়ে কী আমি বাল ছিড়বো? বাঁচবই বা কতক্ষণ! ওসব শাওয়ার কথা ছাড়, এখানে কেন এসেছিস?”
শুদ্ধর মানসিক পরিস্থিতি বুঝে প্রণয় নেশার ঘোরে ভুলভাল বকছে। বেঁচে থাকাটা যখন অভিশাপ হয়ে যায়, জীবনটা তখন জাহান্নামের থেকে কোন অংশে কম নয়। মিছে সমবেদনা দেখানোতে বিশ্বাসী নয় তারা কেউই, তাই এই বিষয় নিয়ে কথা বাড়ালো না প্রণয়। গম গমে গলায় বলল—
“আমরা এখুনি বিডি ব্যাক করব।”
ভ্রু কুচকালো শুদ্ধ—
“এখন? এখন রাত কটা বাজে জানিস?”
“জানি।”
“তাহলে?”
“তাহলে আমাকে একখুনি যেতে হবে। তুই যাবি তো চল, নাহলে থাক।”
শুদ্ধ বিরোধ করল না। দুজন এই মধ্যরাতে হোটেল ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
অন্ধকার নির্জন হাইওয়ে ধরে ৩০০ কিমি পার আওয়ার গতিতে ছুটে চলেছে কালো রঙের টেসলা গাড়িটা। ভেতরের পরিবেশ নিস্তব্ধ।
সামনে তাকিয়ে ড্রাইভ করছে প্রণয়। চোখ দুটো স্থির, মুখে শীতল গাম্ভীর্য। অনেকটা রাস্তা পেরিয়ে এসেছে তারা। আর মাত্র দুটো মোড় ঘুরলেই এয়ারপোর্ট।
কানে ব্লুটুথ গুঁজে নেটফ্লিক্সে সিরিজ দেখছে শুদ্ধ। চোখ দুটো নিভু নিভু। সারা শরীর প্রায় অবশ। অবস্থা দেখে বোঝাই যায়— ড্রাগসের ৯০% রক্তে মিশে গেছে।
শুদ্ধ‘র অবস্থা দেখে স্বস্তি পেল প্রণয়। মনে মনে খুশিই হলো।
নিজের খেয়ালে ডুবে ছিল শুদ্ধ। আচমকা প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে সামনের দিকে খুলে গেল। নেশাটা একটু চটকে গেলো।
শুদ্ধ রক্তিম চোখে তাকাল প্রণয়ের দিকে। মেজাজ হারিয়ে খেকিয়ে উঠে বলল—
“এমনে ব্রেক কষার মানে কী? তোর জন্য অর্ধেক তো মরেই গেছি, এখন পুরোটা মেরে ফেলতে চাস?”
প্রণয় ওর মাতলামোতে সঙ্গ দিল না। সিট বেল্ট খুলে গাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।
সোডিয়ামের হলুদ আলোয় রাস্তার দুই পাশটা ঝকঝকে পরিষ্কার।
প্রণয় এগিয়ে গিয়ে দেখল— রোডের ঠিক মাঝখানে বিশাল একটা সেড্রাস লিদানি গাছ জড় সমেত উপড়ে পড়ে আছে। বিশাল গাছটার জন্য হেঁটে পার হওয়া ও মুশকিল।
ঝড় নেই, তুফান নেই। এমনকি স্বচ্ছ আকাশে কালো মেঘের একটা ছোট্ট দানা পর্যন্ত নেই। তাহলে—
আপনাআপনি টানানো ভ্রূদ্বয়ে সূক্ষ্ম তিন–চারটা ভাঁজ পড়ল প্রণয়ের। তার চতুর মস্তিষ্ক চট করেই সবটাই আন্দাজ করে নিলো। এমনকি এটাও বুঝে গেলো যে তারা এখানে একা নয়। এমনটা তো পূর্ব থেকে হওয়ার কথা ছিলো, বিশেষ অবাক হলো না প্রণয়।
ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল শুদ্ধর দিকে। শুদ্ধ গাড়িতে বসে ঝিমোচ্ছে।
প্রতিক্রিয়া দেখানোর সময় নেই। এগিয়ে এসে গাড়ির ডোর চাবি দিয়ে লক করে দিল প্রণয়, যাতে কোনো মতেই বের হতে না পারে শুদ্ধ।
সে যতই পূর্ব থেকে প্রস্তুত থাকুক না কেনো, মন তো আর মানে না। চোখের পাতা ভিজে উঠলো প্রণয়ের। বুকের গভীরে হল হল করে ছড়িয়ে পড়লো অসহ্য যন্ত্রণা। অন্তরটা বিষিয়ে উঠলো। দৃশ্যপটে কেবল ভাসছে একটা মুখ, একটা কোমল অবয়ব। আকাশ পানে চেয়ে বিড়বিড় করলো—
“আর হবে না দেখা সখি, আর হবে নাহ্ দেখা।”
কোমরে গুঁজে রাখা রিভলবারটা সন্তর্পনে বের করলো প্রণয়। সতর্ক দৃষ্টি বুলালো আশেপাশে।
ভেতরে জমানো উত্তাপ উগরে দেওয়ার পূর্বেই হেলিকপ্টারের উড়তে থাকা ব্লেডের শব্দ এসে কানে বাজলো প্রণয়ের। চোখের নিমিষে পাঁচটা কালো রঙের জিপ এসে থামল পায়ের কাছে।
দড়দড় করে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এল অজস্র প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেনা। এরা যে এনকাউন্টার স্পেশাল ফোর্স, তা বুঝতে একটুকুও সময় লাগলো না প্রণয়ের।
এরা এতজন, আর প্রণয় একা। তবে সিংহ তো সিংহই, সে কখনোই নেকড়েদের হাতে পরাজয় স্বীকার করে না। আবরার শিকদার প্রণয় ও করল।
ওরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই জন কুড়ি থেকে ২৫ জনকে চোখের নিমিষে শুইয়ে দিল। যতই এনকাউন্টার স্পেশাল ফোর্স হোক, শুটিং-এ আবরার সিকদারের প্রণয়ের ধরে কাছে ও কেউ নেই।
চট করে গাড়ির পেছনে লুকিয়ে পড়ল প্রণয়। মুহূর্তেই শুরু হয়ে গেল রক্তারক্তি কারবার।
একসময় চারপাশ থেকে ঘিরে তারা ধরে ফেলল প্রণয়কে। বলিষ্ঠ সবল হাত দুটো দুই দিক থেকে চারজন চারজন করে ধরল শক্ত করে। আর বুঝি রক্ষে নেই।
এদের হিংস্র চোখ-মুখ দেখে কলিজাটা মুচড় দিয়ে উঠল প্রণয়ের। চোখ দুটো নির্ভীক। মৃত্যু ভয় হলো নাহ্ সামান্য তম ও। তবে কলিজায় গরম সিশা ঢেলে দেওয়ার মতো অনুভূতি হল। চোখের সামনে ভেসে উঠল প্রিয়তমার হাস্যোজ্জ্বল মুখ, তার আদুরে চপলতা। আর বুঝি সেই প্রিয় চোখ দুটি দেখা হবে না। মিষ্টি মিষ্টি সব আলাপ শোনা হবে না। সে বুঝি আর কোমর জড়িয়ে ধরে আবদার করবে নাহ্। ভালোবাসার দাবি জানাবে না।
“তোর কাছে আর ফিরে আসব না, রক্তজবা।”
তোকে দেওয়া এই কথাটা রাখতে পারলো নাহ্ তোর প্রণয় ভাই। আদুরে ছানা আমার, কষ্ট পাস না জান, ভালোবাসি তোকে। আজো ভালোবাসি। রুহের সাথে শরীরের বিচ্ছেদ হলেও ভালোবাসবো।
এসব ভাবতে ভাবতে সশব্দে বুক বরাবর গুলি ছুটে এল।
আচমকা টান মেরে সরে গেল প্রণয়। বিপরীতে সামনে পড়ে গুলি খেল তাদেরই একজন।
তবে দ্বিতীয় বুলেটটা আর মিস হলো না। চোখের পলকে ছুটে এসে বিধলো বুকের বা পাশে। ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে এলো তাজা রক্ত। চোখের সামনে ক্রমশ ঝাপসা হয়ে এলো পৃথিবী।
ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৮০ (২)
বলিষ্ঠ দেহখানা সজোরে আঁচড়ে, পড়লো মাটির বুকে। মাটিতে লুটিয়ে পড়ার সময় বুক পকেট থেকে ছিটকে পড়ল ফোনটা। সামান্য স্পর্শ লাগাতে ভাঙা স্ক্রিনে শেষবারের মতো জ্বলে উঠল একটা ছবি।
নিভুনিভু চোখে ছবিটার দিকে তাকালো প্রণয়। মুখ থেকে খুব আস্তে, অস্ফুটে বেরিয়ে এলো—
“রক্তজবা”

PRONOY vai apni kutha o jete paren na .na kunovabei na .na mane na . oi beta shuddho matal houar ar time peli na .oi prio dekh tor pronoy vai ki korse .toke faki dewar cheshta korse . pronoy vai 😭😭😭😭😭😭😭😭😭😭😭😭😭😭😭😭😭😭😭😭😭😭😭