ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৮৮
প্রিয়স্মিতা তেহজীব রাই
প্রিয়তা দরজার সামনে গিয়ে সহসা দাঁড়িয়ে পড়ল, তার পা এগোচ্ছে না, ভয় লাগছে ভীষণ। হৃৎপিণ্ডের লাপডুপ হয়তো বাহির থেকেও শোনা যাচ্ছে। সামান্য একটা মশা কামড়ালে ও যে প্রিয়তা সারা বাড়ি চিল্লিয়ে মাথায় তুলে ফেলত। প্রণয় কখনো যার দিকে কখনো কাউকে চোখ রাঙিয়ে কথা বলার অধিকার দেয়নি। এক তীব্র সুরক্ষা বলয়ে আবদ্ধ করে রেখেছিল আজীবন। যেন মাথার ওপর আস্ত একটা বটগাছ তার শীতল ছায়ায় মুড়িয়ে রেখেছে কোনো ছোট্ট হরিণ শাবককে।
যেনো একটু ও বাস্তবতার ধুলো তার পায়ের তলায় না লাগে।
মানসিকভাবে এতোই নির্ভরশীল করে রেখেছিল যে প্রিয়তা বড় তো হয়েছে, কিন্তু নিজেকে কোনোদিন আলাদা মানুষ হিসেবে ভাবতেই পারেনি। সে কখনো ভাবেইনি প্রণয়ের বাইরে তার নিজেরও একটা আলাদা অস্তিত্ব থাকা দরকার। ভিন্ন দুজন মানুষ কখনো এক হতে পারে নাহ।
সে কখনো এগুলো ভেবেই দেখেনি। ভাবেনি বললে হয়তো ভুল হবে—প্রণয় কখনো ভাবতেই দেয়নি। এমন কোনো পরিস্থিতি জীবনে আসতেই দেখেনি।
হাঁটা শিখার জন্য প্রথমে হোঁচট খাওয়া প্রয়োজন, কিন্তু প্রণয় তাকে কোনোদিন কোল থেকেই নামতে দেয়নি। তাই আজ যখন প্রণয় নেই, তার ছায়া মাথার উপর নেই, অথচ এতোটা বিপাকে পড়েছে প্রিয়তা, এখন প্রিয়তার অবস্থা এমন—যেমন একটা ছোট্ট বাচ্চা সামান্য কিছু হলে দৌড়ে গিয়ে লুকাতে চায় তার বাবা-মার পিছনে, কিন্তু সদ্য এতিম হওয়া বাচ্চাটা কী করবে। তেমন প্রিয়তার ও মন চাচ্ছে এই নোংরা জায়গা থেকে পালিয়ে গিয়ে প্রণয় ভাইয়ের নিরাপদ বুকে লুকিয়ে পড়তে। ওই একটা জায়গা ছাড়া পৃথিবীর সবটা নোংরা, ভয়াবহ, অপবিত্র।
কিন্তু উপায় নেই।
প্রিয়তার শরীর কাঁপে মৃদু ছন্দে। ধুরু ধুরু বুকে পরিমিত সাহস নিয়ে বাহিরে বের হয় প্রিয়তা। দরজাটা লোহার, ঠেলতে কষ্ট হয় ভীষণ, তবুও বেরিয়ে যায়।
মেয়েগুলো কথা বলতে পারে না, কিন্তু তাদের অসহায় চোখগুলো যেন আর্তনাদ করে বলতে চায়—
“বাহিরে যেয়ো না, মেয়ে। এই নরকের নিকৃষ্টতা সহ্য করতে পারবে না।”
কৃত্রিম তাপমাত্রা নিরোধক ঘরের বাহিরে পা রাখতেই পায়ের পাতা ফ্রিজ হয়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি হলো প্রিয়তার। শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল ঠান্ডায়। প্রিয়তা সামান্য কাঁপল।
চোখের সামনে বিস্তৃত করিডোর। প্রিয়তা আসে-পাশে তাকাল। এদিকেই হয়তো কেউ আসছে—সাথে সাথেই পাশে থাকা পিলারের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল প্রিয়তা। দুজন বেশ বৃদ্ধ লোক চলে গেল সামনে দিয়ে।
আতঙ্কে ছোট্ট শরীরটা বারবার কম্পিত হচ্ছে প্রিয়তার। সে চেষ্টা করে নিজের এই অসহ্য কাঁপাকাঁপি দমন করতে পারছে না। প্রিয়তা চোখ বন্ধ করে লম্বা শ্বাস টানল, নিজেকে সামলে গায়ে থাকা জর্জেট ওড়না মাথায় দিয়ে ভালো মতো শরীরে পেঁচিয়ে নিল।
পিলারের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল প্রিয়তা। বড় করে লম্বা শ্বাস টানল। আশেপাশে তাকিয়ে দেখল—না, কোথাও কেউ নেই। খানিকটা নিশ্চিন্ত হলো প্রিয়তা। মাথার ওপর জ্বলতে থাকা হাই পাওয়ারের LED লাইট মস্তকে ব্যথা ধরিয়ে দিচ্ছে।
দুর্বল শরীরে বল জোগাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে প্রিয়তাকে। সেই যে সকালে একটুখানি দুধ কর্নফ্লেক্স খেয়েছিল, এরপর আর কিচ্ছুটি পেটে পড়েনি। মাথা ঘুরায় প্রিয়তার, কিন্তু এসবে মোটেই পাত্তা দেয় না প্রিয়তা। সে কনফিউজড হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কারণ সে ভাবনায় পড়ে গেছে—সে কোন দিকে যাবে।
ডান দিকের থেকেও চিৎকারের আওয়াজ ভেসে আসছে, বাঁ দিক থেকেও চিৎকারের আওয়াজ ভেসে আসছে। প্রিয়তা ভাবল, একবার ডান দিকে উঁকি দেবে। যেমন ভাবা, তেমন কাজ।
বিস্তৃত করিডোরের ডান দিক ধরে এগোতে থাকে প্রিয়তা। কিছুদূর এগোতেই লক্ষ্য করল—হোটেল রুমের মতো একটার পর একটা রুম, আবার দরজায় নম্বরও লেখা। ভেতরের ঘরগুলো থেকে কান্না আর চিৎকারের শব্দগুলো ভীষণ কানে লাগছে, তবে কথাগুলো পরিষ্কার নয়।
প্রিয়তা ধুরু ধুরু বুকে দরজায় কান পাতল। এবার ভেতরের সবকিছু স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। উল্টো দিকের শব্দগুলো শুনে গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেল প্রিয়তার। ছিটকে দূরে সরে গেল কিছুটা। কেউ দেখে ফেলার পূর্বে এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে চলে এল সেদিক থেকে।
বুকটা এখনো ধুকধুক করছে প্রিয়তার। মনে মনে ভাবল—তার মানে ওই প্রতিটা ঘরেই… প্রিয়তা আর ভাবতে পারল না। তার শরীর বারবার কাঁটা দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সে কোনোদিন পড়বে—এমন কল্পনা কোনোদিন দুঃস্বপ্নেও আসেনি।
তার ভালোবাসার মানুষটা ব্যতীত অন্য কারো স্পর্শ গায়ে লাগলে নিজেই নিজের শরীরটা কেটে কুচি কুচি করে ফেলবে প্রিয়তা। সে এদের মতো নাহ, তার আবার জীবনের এতো মায়া নেই।
প্রিয়তা এবার বাঁ দিকে পা বাড়াল। জায়গাটা কেমন জানি লাগছে প্রিয়তার—কেমন অদ্ভুত এক দমবন্ধ করা পরিবেশ। এমনকি এর অভ্যন্তরীণ চাপও অনেক। যেমন চাপ অনুভূত হয় মাটির অনেক গভীরে থাকলে। প্রিয়তা ভাবল—জায়গাটা কি মাটির নিচে, নাকি অন্য কোথাও? যেখানেই হোক, মাটির ওপর তো একদমই নয়।
এসব আকাশ-পাতাল ভাবতে ভাবতে হঠাৎ পা থমকে গেল প্রিয়তার। পায়ের রক্ত ছলকে মাথায় উঠে গেল। শরীরের সকল স্নায়ু অবশ হয়ে এল মুহূর্তেই। শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে গেল প্রিয়তার। দম আটকে তাকিয়ে রইল ট্রান্সপারেন্ট গ্লাস ডোরের ওপারে।
সার্জিক্যাল পোশাক পরিহিত কয়েকজন লোক, হাতে গ্লাভস আর মুখে মাস্ক পরে অপারেশন করছে। অপারেশন করছে বললে ভুল হবে—স্টিলের স্ট্রেচারে শুইয়ে অমানবিকভাবে লোকগুলোর পেট থেকে বুক পর্যন্ত খেচখেচ করে কাঁচি দিয়ে কাটছে। যতবার রক্ত ফিনকি দিয়ে উঠছে, ততবার সাদা ব্যান্ডেজের কাপড় দিয়ে মুছে ফেলছে ডাক্তারগুলো।
কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে প্রিয়তার চোখের সামনেই লোকটার বুক আর পেটের ভেতর থেকে কলিজা, লিভার, ফুসফুস, কিডনি সহ সমস্ত অর্গান বের করে নিল ডাক্তারগুলো। অর্গানগুলো জমিয়ে রাখল একটা স্টিলের প্লেটে। শুধু তাই নয়—পুরো ঘর জুড়ে সারিবদ্ধভাবে ২০-২৫ জনকে একসাথে কেটে অর্গান বের করা হচ্ছে।
বিশাল কক্ষের উত্তর-পূর্ব দিকে বড় বড় গ্লাস ফ্রিজার কোল্ড স্টোরেজ, যেখানে সেকশন ওয়াইজ অগণিত অর্গান স্টোর করা। আবার নতুন অর্গানগুলো নিয়ে তুলে রাখছে। তারা নিজেদের কর্মে এতোটাই মগ্ন যে কেউ তাদের দেখছে—সেদিকে তাদের কোনো হুঁশই নেই।
রক্ত, মাংস আর এমন মানুষ কাটা দেখে ট্রিগার হয়ে যাচ্ছে প্রিয়তা। তার হিমোফোবিয়া একটিভ হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। প্রিয়তা আর সহ্য করতে পারছে না। পা গুলো টলছে। চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে আসছে সবকিছু। প্রিয়তা অজ্ঞান হতে চায় না, কিন্তু সে না চাইতেও ব্রেইন কাজ করা অফ করে দিচ্ছে।
প্রিয়তা চোখ খিঁচে বন্ধ করে দৌড় দিল। কিছুদূর এগিয়ে এসে পিলারের আড়ালে ধুপ করে বসে পড়ল প্রিয়তা। শরীরের কাঁপন যেন কিছুতেই থামাতে পারছে না সে। মনে হচ্ছে—লোকগুলো বোধহয় এখনই তাকে ও ধরে নিয়ে গিয়ে ওখানে শুইয়ে দেবে। কী অমানবিক চিত্র!
কয়েক মুহূর্ত চোখ বুজে পড়ে থাকে প্রিয়তা। নিঃশ্বাসের গতি স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষা করে। আবারও নিজের অজান্তে প্রণয়কে খুঁজে প্রিয়তা, তার সেই চিরচেনা গন্ধ খুঁজে সেই আশ্রয়স্থল খুঁজে—যে গন্ধ তাকে সুরক্ষা দেয়, যে বুকটা তাকে নিরাপত্তা দেয়।
কয়েক মুহূর্ত পর কিছুটা শান্ত হয় প্রিয়তা। আবারও উঠে দাঁড়ায়। এখন রাত নাকি দিন—সেটা বোঝার উপায় নেই, কিন্তু এই নীরব পরিবেশ বলছে—রাতই হবে।
প্রিয়তা বাঁ দিকের করিডোর ধরে হাঁটতে হাঁটতে হল রুমে পৌঁছে যায়। করিডোরের শুরুতে ওপরে বড় বড় করে লেখা—ট্রাফিকিং হাব। প্রিয়তা বুঝল—এই দিকটা পুরোটাই নারী পাচার আর অর্গান ট্রাফিকিংয়ের জন্য।
প্রিয়তা খুব সাবধানে সামনে কয়েক পা ফেলতেই সামনের দৃশ্য দেখতেই যেন প্রিয়তার মাথার ওপর যেন মস্ত আকাশ ভেঙে পড়ে। নিজের চোখকে যেন সে বিশ্বাস করতে পারে না। মুখ থেকে আপনা-আপনি বেরিয়ে আসে—
“বড় আপু।”
বিশাল হল রুমের কাউচে পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছে প্রহেলিকা। মাদক-আচ্ছন্ন চোখ দুটো রক্তিম, চিকচিক করছে পানিতে। সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছেন মিস্টার পিউরুসন।
তিনি স্বভাবসুলভ ধীর কণ্ঠে বললেন—
“ম্যাডাম, আপনি দুপুর থেকে এখানে বসে আছেন। আপনার বাসার মানুষ তো খুঁজবে। কী জবাব দেবেন?”
মিস্টার পিউরুসনের দিকে লাল লাল চোখ তুলে তাকাল প্রহেলিকা। ঠোঁট এলিয়ে মলিন হেসে বলল—
“আমাদের মতো মানুষদের কেউ খোঁজে না, মিস্টার পিউরুসন। আমরা অন্ধকারের মানুষ। অন্ধকারেই স্বস্তি পাই। ভালো মানুষদের ভিড়ে দম বন্ধ লাগে।”
“ম্যাডাম, আপনি বললে গার্ডরা আপনাকে বাসায় পৌঁছে দেবে।”
সাথে সাথেই তীব্র অসম্মতি জানালো প্রহেলিকা—
“নাহহহহহ! আমি ওই বাসায় কিছুতেই ফিরব না। ওখানে—ওখানে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে, জীবিত অবস্থায় মৃত্যু হয় আমার। আমি এতো তাড়াতাড়ি মরতে চাই না।”
মিস্টার পিউরুসন একটু অবাক হলেন। তবে তিনি এ বিষয়ে বিশেষ কথা না বাড়িয়ে বললেন—
“ওকে, ম্যাডাম, আপনার যা ইচ্ছা। তবে স্যারকে একটু বলবেন প্লিজ, তিনি যেন অন্তত একবার এখানে আসেন। গত এক মাস হয়ে গেছে, তিনি একবারের জন্যেও এখানে আসেননি। অথচ উনাকে এখন খুব দরকার। সব ডিল আটকে আছে। প্রতিদিন না হোক, ১৫ দিনে একবার যেন আসেন, নাহলে কিভাবে হবে? স্যারের এই উদাসীনতার জন্য অনেক লস হয়ে যাচ্ছে।”
প্রণয়ের উদাসীনতার কথা শুনে শব্দ করে হেসে ফেলল প্রহেলিকা। যেনো মানসিক কোনো রোগী, প্রহেলিকা হাসতে হাসতে তাচ্ছিল্য করে বলল—
“আপনার মনে হয় আমি বললেই সে চলে আসবে? কখনো আসবে না, মিস্টার পিউরুসন। সে এসব থেকে এখন পালিয়ে বাঁচতে চায়। নিজের গড়া সাম্রাজ্যকে এখন তার কাছে বিষাক্ত লাগে। আপনারা আর এই সব কিছু তার গলার কাঁটা। যদি পারত, তবে এসব সে কবেই জীবন থেকে উপড়ে ফেলত। পারছে তাই বিষ খেয়ে বিষ হজম করছে। আর আমি? আমি তো তার চোখের বালি। সে সুখের সন্ধান পেয়ে গেছে, মিস্টার পিউরুসন। আর সুখী মানুষরা কখনো অন্ধকারে শান্তি পায় না। তারা উজ্জ্বল আলোর বাসিন্দা, অন্ধকারে তাদের বড্ড ঘৃণা।”
“শালার সুখ শুধু আমার তকদিরে জুটল না। আমি সারাজীবন শুধু সুখের পিছনে ছুটেই গেলাম। ভালোবাসার লোভে ধুঁকে ধুঁকে মরলাম, কিন্তু সুখের সন্ধান পেলাম না। ভালোবাসা আমার কপালে জুটল না। দিন শেষে সবাই ভালোবাসার মানুষকে আপন করে পেল, শুধু আমি পেলাম না।”
বলতে বলতে চোখের কোণ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে প্রহেলিকার। মিস্টার পিউরুসন কথার আগামাথা কিছুই বুঝলেন না। তিনি আবার বললেন—
“ম্যাডাম, আপনি বললে নিশ্চিত আসবেন। আপনি তো উনার পার্টনার।”
ফের তাচ্ছিল্য হাসল প্রহেলিকা, ব্যঙ্গ করে বলল—
“হ্যাঁ, পার্টনার, তবে ক্রাইম পার্টনার। সোল পার্টনার নই। সে আমাকে তার অপরাধের সঙ্গী বানালো ঠিকই, কিন্তু জীবনসঙ্গী বানালো না। সে আমাকে নিয়ে পাপের খেলায় লিপ্ত হলো ঠিকই, কিন্তু ভালোবাসার খেলায় আমি নাকি অযোগ্য।”
“আমাকে যত্ন করে ছুড়ে মারল নোংরা অন্ধকার জগতের দুর্গন্ধযুক্ত গলিতে, অথচ অন্য একজনকে নোংরা লাগার ভয়ে মাটিতে পা ফেলতে দিত না, ভরে রাখল বুকের ভেতর। আমার ভালোবাসায় কোন দিকটা কম ছিল, তবুও আমি তাকে পেলাম না।”
“আমি তার জন্য কী করিনি! আমাকেও তো একটু ভালোবাসতে পারত, বলো। কিন্তু নির্দয় পুরুষ ভালোবাসল না।”
বলতে বলতে টেবিলে মাথা এলিয়ে দিল প্রহেলিকা।
মিস্টার পিউরুসন বুঝলেন, প্রহেলিকার অনেক নেশা হয়ে গেছে। নেশার ঘোরে ভুলভাল বকছে।
“ওর সুখ দেখলে আমার ভীষণ হিংসা হয়, জানো? অপরাধী তো আমি একা নই, সেও। তবে শাস্তিটা কেন একা আমার হলো?”
“সে তো দিব্যি আছে, এত সুখে আছে যে সুখের কোনো বর্ণনা হয় না। এতো অন্যায় করে যদি সে সুখ পায়, তবে আমি কেন পাব না? তার এতো সুখ আমি কিছুতেই সহ্য করতে পারছি না। প্রতিনিয়ত পাগল হয়ে যাচ্ছি।”
“আমার চোখের সামনে সে অন্য নারীকে সোহাগ করে, আমার চোখের সামনে তাকে জড়িয়ে ধরে আদর করে, চুমু খায়। কত তৃপ্তি তার চোখে-মুখে! এত নিষ্ঠুর!”
মিস্টার অবাক চোখে তাকিয়ে সব শুনছেন, কেবল চুপ করে।
প্রহেলিকা বলতে বলতে হুট করে আবার হেসে উঠল। তার ঠোঁটে ফুটে উঠল পৈশাচিক তৃপ্তি। সে হাসতে হাসতে বলল—
“তবে এক জায়গায় আমি জিতে গেছি, মিস্টার পিউরুসন। এই জিতটা অনেক বড়।”
“কিভাবে?”
“আমি আমার ভালোবাসাকে দুনিয়াতে পাচ্ছি না—এই যন্ত্রণা কিছুদিনের। একবার জীবন শেষ হয়ে গেলেই—”
“শেষ হয়ে গেলে?”
“জন্মজন্মান্তরের জন্য সে কেবল আমার হবে… আমার ভালোবাসা আমার হবে তখন, আর সে চাইলেও আমাকে ছেড়ে অন্য কারো কাছে যেতে পারবে না। কারণ মৃত্যুর পর আমাদের দুজনের নিশ্চিত গন্তব্য জাহান্নাম। সেখানে সে চিরন্তন আমার হবে। সবাই জান্নাতে এক হতে চায়, কিন্তু আমি চাই জাহান্নামে গিয়ে এক হতে।”
“আমার ভালোবাসার পূর্ণতা দুনিয়াতে নেই। আর জান্নাত তো আমাদের দুজনের কপালে নেই।”
“তাই জাহান্নামই বেস্ট। ওখানে অন্য কেউ এসে আমার ভালোবাসায় ভাগ বসাতে পারবে না।”
বলতে বলতে পৈশাচিক তৃপ্তিতে চোখ বুজে ফেলল প্রহেলিকা।
প্রহেলিকার অবস্থা দেখে অবাক না হয়ে পারলেন না মিস্টার পিউরুসন। ভালোবাসায় কতটা উন্মাদ হলে মানুষ এমন বিকৃত চিন্তা-ভাবনা করে মনকে শান্ত দেয়! উনার বেশ মায়া হলো।
মৃত্যুর পর সত্যি যদি কোনো দুনিয়া থাকে, তাহলে সেখানে যেন এই মেয়েটার ভালোবাসা পূর্ণতা পায়—সৃষ্টি কর্তার নিকট এই চাওয়া রাখলেন মিস্টার পিউরুসন। কারণ তিনি দেখেছেন—বছরের পর বছর এই মেয়েটা তাদের বসকে পাওয়ার জন্য কত কী না করেছে, কত পাগলামি করেছে, কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে তাদের বস মেয়েটার সাথে প্রয়োজন ব্যতীত কথা বলেন না।
প্রহেলিকার কথাগুলো শুনে প্রিয়তার মাথার ভেতরের সবটা আউলিয়ে খিচুড়ি হতে গেল। সে কিছুতেই বাস্তবতার সাথে মিলাতে পারল না প্রহেলিকার কথাগুলো। মনে মনে কনফিউজড হয়ে বলল—
“বড় আপু এই চক্রের সাথে জড়িত, মানে এদের বস এএসআর (ASR)-এর ক্রাইম পার্টনার। কত ভয়ংকর একজন মানুষের পার্টনার! ভাবতেই ভয়ে শরীর কাঁটা দেয় প্রিয়তার।”
তবে প্রহেলিকা কথাগুলোর অর্থ সে বুঝতে পারে না। সে ফের মনে মনে ভাবে—
“বড় আপু কি বললেন? ওদের বসকে ভালোবাসে? তার মানে সেই কুখ্যাত অপরাধীকে?”
ভাবনাটা মাথায় আসতেই বিস্ময়ে চোখ বড় বড় হয়ে যায় প্রিয়তার। অটোমেটিকলি মুখে হাত চলে যায়। মুখ থেকে আপনাআপনি বেরিয়ে আসে—
“এমন মানুষকে ভালোবাসা যায়?”
তবে একটা ভাবনা প্রিয়তার মস্তিষ্কে কাটার মতো বিঁধে—
“ভালো, যেহেতু আরেক ব্যাটাকে, তাহলে সব সময় আমার প্রণয় ভাইকে নিয়ে টানা-হেঁচড়া করে কেন? কেন আমার প্রণয় ভাইয়ের আশেপাশে চিপকে থাকে সুপার গ্লুর মতো? কেন সব সময় আমাদের মধ্যে ঢুকে পড়তে চায়?”
এসব প্রশ্ন মাথায় উঁকি দিতেই মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে প্রিয়তার। তবে এসবের যথাযথ কোনো উত্তর পায় না প্রিয়তা। তবে প্রহেলিকার সাহস দেখে অবাক হয়। যাকে-তাকে না—সোজা এএসআর-কে ভালোবাসার কলিজা করেছে, মানতেই হবে! মাগো, ভাবতেই জ্ঞান হারাতে মন চায় প্রিয়তার।
সে প্রহেলিকাকে দেখে ভেবেছিল, এখানে হয়তো তাকে প্রহেলিকাই এনেছে প্রতিশোধ নিতে। কিন্তু প্রহেলিকার কথা শুনে মনে হচ্ছে না এটা প্রহেলিকার কাজ, বরং সে হয়তো এসবের কিছু জানেই না। যদি জানত, তাহলে নিশ্চিত এক না একবার দেখতে যেত।
তবে একটা জিনিস পরিষ্কার। প্রিয়তা মনে মনে আফসোস করে বলল—
“বড় আপু যাকে ভালোবাসে, সেই লোকটা, মানে এএসআর, ভালোবাসে না বড় আপুকে। আহারে, কী কষ্ট!”
প্রিয়তার দুঃখে হালকা করে মরে যেতে মন চায়। তবে প্রিয়তার বেশ কৌতূহল হলো সেই লোকটাকে দেখার। সেই মহান ব্যক্তিকে দেখার, যার কর্ম এমন—না জানি সে কেমন!
প্রিয়তা আর এসব শুনল না। পা টিপে টিপে, লুকিয়ে লুকিয়ে চলে গেল অন্য দিকে। সে যেন এক বিশাল গোলকধাঁধায় ফেঁসে গেছে। চারদিক কেমন জানি একই রকম লাগে। যেদিকেই যাচ্ছে, ভয়াবহ কিছু না কিছুর সম্মুখীন হচ্ছে, কিন্তু এক্সিট আর খুঁজে পাচ্ছে না।
প্রিয়তা ঘুরতে ঘুরতে একটা অন্ধকার করিডোরে এসে পৌঁছাল—চিকন, সরু করিডোর। আবছা আলো-আঁধারিতে ঢেকে আছে পরিবেশ। কিছুটা দূর থেকে ক্ষীণ আলোকরশ্মি দেখা যাচ্ছে। প্রিয়তা চপল পায়ে এগিয়ে গেল সেদিকে।
দুরু দুরু বুকে কয়েকটা পা এগোতেই দেখতে পারল আরেকটা বিশাল ট্রান্সপারেন্ট গ্লাস ডোর। উপরে বড় বড় করে লেখা—”The Dark Web Note”।
প্রিয়তা মনে মনে ভাবল—
“এটা আবার কেমন বিকট নাম?”
ভেতরটা কেমন ধক ধক করছে প্রিয়তার।
প্রিয়তা সেই অন্ধকারে লুকিয়ে উঁকি দিল। ভেতরে সারিবদ্ধভাবে শতাধিক কম্পিউটার সিস্টেম। কম্পিউটারগুলো থেকে কেমন শব্দ হচ্ছে, এক নাগাড়ে লাল-সবুজ লেখা উঠছে। প্রত্যেকটা কম্পিউটারের সামনে একজন করে লোক দ্রুত হাতে কিবোর্ডে চাপছে।
প্রত্যেকবার কম্পিউটারে যখন “Successfully Completed” লেখাটা উঠছে, লোকগুলো কেমন করে উঠছে।
পুরো কক্ষ অন্ধকারে ডুবানো, কেবল স্ক্রিন থেকে বিচ্ছুরিত আলোতে আশেপাশে যতটুকু দেখা যায়।
প্রিয়তা বুঝল না, এখানে কী হচ্ছে। সে আরেকটু মনোযোগ দিয়ে দেখল—লোকগুলো প্রত্যেকে একই ধরনের কালো জ্যাকেট পরে আছে। আবার সেগুলোর উপর তাদের নামও লেখা।
প্রিয়তা অন্ধকারে একদম জান লাগিয়ে দিল লেখাগুলো পড়তে। অনেকক্ষণ একনাগাড়ে দেখার পর উদ্ধার করতে পারল। নামগুলো বুঝা মাত্রই প্রিয়তার পিলে চমকে উঠল। মুখ থেকে বেরিয়ে এলো—
“OMG, এরা তো হ্যাকার!”
“হ্যাঁ, এই তো সেই জ্যাকসন, যে ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার হ্যাক করে বিলিয়ন ডলারের রিসার্চ পেপার চুরি করেছিল!”
প্রিয়তা পাশের জনের নাম দেখে আরও চমকালো। অবাক কণ্ঠে বলল—
“হ্যাঁ, আর এটাই তো ২০২৪ সালে গুগলের মাইক্রোসফট সার্ভার হ্যাক করেছিল, কিন্তু পরে একদম নিখোঁজ হয়ে গেছে!”
প্রিয়তা বুঝল, এখানে সবাই বড় বড় হ্যাকার, আর এখানে হ্যাকিং-ই হয়। মনে মনে বলল—
“না জানি আবার কার সর্বনাশ করার তাল করছে।”
প্রিয়তা সেখানে আর দাঁড়াল না। ইউ-টার্ন নিতেই দেখল, পাশাপাশি আরও দুটো গ্লাস ডোর।
এদিকের করিডোরগুলো অন্ধকার হওয়াতে বেশ সুবিধা হয়েছে, প্রিয়তাকে কেউ আসলে ও সহজে দেখতে পাবে না।
প্রিয়তা পা টিপে টিপে প্রথম দরজাটায় উঁকি দিল।
এই দরজার উপরে বড় বড় করে লেখা—”দ্য এনাটিক্যাল ল্যাব (the analytical lab)”।
প্রিয়তা উঁকি দিয়ে দেখল ভেতরে বিশাল বড় সায়েন্স ল্যাবরেটরি রুম। ২০-২৫ জনের মতো সায়েন্টিস্ট খুব মনোযোগ দিয়ে কিছু রিসার্চ করছে। সারি সারি গ্লাস টিউবে ফুটছে বিভিন্ন রঙের তরল। এছাড়া অত্যাধুনিক ট্যাংক মেশিন, আরও কত কী।
প্রিয়তা সেখানে ও দাঁড়াল না, পাশের দরজায় এসে দাঁড়াল।
এটার বাহিরে লেখা—”দ্য সিনথেটিক হেল”।
প্রিয়তা উঁকি দিতেই আচমকা একটা ঘ্রাণ এসে হুরমুর করে নাসারন্ধ্রে ঢুকে গেল। তবে গন্ধটা বেশ অন্যরকম, মন্দ লাগল না প্রিয়তার।
সে উঁকি দিতেই দেখল, বাঁ দিক ঘেঁষে সারি সারি কাঁচের টিউব, যেখানে নীল-বেগুনি বর্ণের তরল ফুটছে টগবগ করে।
প্রিয়তা ভাবল—
“এটা আবার কী?”
সে খুব মনোযোগ দিয়ে দেখল। রুমটা কোনো সুপার শপ থেকে কম না, বরং আরও বড়। কিন্তু অন্যান্যগুলোর মতো এটাতে কোনো মানুষ নেই, পুরোটাই ফাঁকা।
ইতি-উতি দেখতে দেখতে টুপ করে ভেতরে ঢুকে পড়ল প্রিয়তা। কাঁচের টিউবগুলোর কাছে গিয়ে দেখল, উপরে লেখা—”মেথ ডি”।
প্রিয়তা একটু ঝুঁকে ভালো মতো দেখে বুঝল, এগুলো দিয়ে ড্রাগ বানানো হচ্ছে।
প্রিয়তা সরে গেল। চারদিকে নজর ঘুরিয়ে দেখল, শপের মতো বিশাল শেলফ, যার ওপর অগণিত ছোট-বড় মাপের জিপ লক ট্রান্সপারেন্ট প্লাস্টিক পাউচ। ভেতরে সাদা পাউডারের মতো গুঁড়ো দেখা যাচ্ছে।
ঘরের এঙ্গে জুড়ে বিশাল বিশাল সিল করা কার্টন বক্স, যার ওপর নামি-দামি অনেক উচ্চমানের মাদকের নাম লেখা।
প্রিয়তা ঘুরে পুরো রুমটা দেখল। এই কক্ষেই, আর না হলেও, কয়েকশো বিলিয়ন ডলারের কেবল মাদকই আছে।
রুমটার স্মেল ইনহেল করতে ভীষণ ভালো লাগছে প্রিয়তার। প্রিয়তা বুঝল, সে বাতাসে ভেসে বেড়ানো ড্রাগ সেবন করছে।
এখানে বেশিক্ষণ দাঁড়ালে এমনি এমনি নেশা হয়ে যাবে।
প্রিয়তা বেরিয়ে যেতে নিয়েও থেমে গেল। হঠাৎ চোখ আটকালো—রুমের একদম শেষ প্রান্তে আরেকটা দরজা দেখা যাচ্ছে।
কৌতূহল চাপতে পারল না প্রিয়তা। যাবে না, যাবে না করেও এগিয়ে গেল।
এই দরজাটা কাঁচের নয়, স্টিলের। তাই ভেতর দেখা যাচ্ছে না।
প্রিয়তা দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করতেই অবাক হয়ে গেল। মুখ থেকে আপনাআপনি বেরিয়ে এলো—
“এটা ঘর!”
এই ঘরটা ও ভেতর থেকে সুপার শপের মতো। ঘর ভর্তি অসংখ্য র্যাকের ওপর থরে থরে সাজানো সকল আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র—মেশিনগান, রাইফেল, রিভলভার সহ আরও অনেক অনেক অস্ত্র।
অস্ত্রগুলো দেখে প্রিয়তা শুষ্ক ঢোক গিলল। মনে মনে বলল—
“এরা কি বোম ও বানায়?”
তবে বেশি ভাবল না প্রিয়তা। চলে যেতে নিয়েও আবার থেমে গেল। হাত বাড়িয়ে পাশের র্যাক থেকে একটা রিভলভার তুলে লুকিয়ে নিল ওড়নার নিচে।
অতঃপর বেরিয়ে গেল।
প্রিয়তা গলিগুলো থেকে বেরোতেই একটা রুম চোখে পড়ল। বাহিরে লেখা—”কন্ট্রোল রুম”।
প্রিয়তা বাহির থেকেই দেখতে পাচ্ছে, কম্পিউটার স্ক্রিনে তাকে দেখা যাচ্ছে।
প্রিয়তা ঝটপট রুমে ঢুকে পড়ল। নিজের হাতে সব ফুটেজ ডিলিট করে দিল।
কিন্তু একটা জিনিস ভেবে আশ্চর্য হলো—এখানের মানুষগুলো কি মরা?
কিন্তু আবার ভাবল, এখান থেকে কেউ চাইলেও পালাতে পারবে না, কিচ্ছু করতে ও পারবে না। তাই তারা কে কী করল, জানল—কেয়ার করে না।
বেরোনোর রাস্তা খুঁজে না পেয়ে ধীরে ধীরে মনের সূক্ষ্ম আশাটাও মরে যাচ্ছে প্রিয়তার।
মেয়েটার কথাগুলো মনে পড়ছে—
“তুমি চাইলেও এখান থেকে কোনোদিন বের হতে পারবে না। ওদের ইচ্ছা ব্যতীত একটা মশাও বেরোতে পারে না।”
তবে এই নরকের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত ঘৃণা জন্মেছে প্রিয়তার।
সে ওই কক্ষ থেকে বের হতেই মানুষের গলা ফাটানো আর্তনাদ শুনতে পেল।
নিস্তব্ধ পরিবেশে আচমকা এমন চিৎকার শুনে হকচকিয়ে গেল প্রিয়তা। চকিতে ফিরে তাকাল পাশের করিডোরের দিকে। অনেকটা ভেতর থেকে চিৎকার ভেসে আসছে।
প্রিয়তার এতক্ষণ খুব একটা ভয় না লাগলেও, এখন হাঁটু কাঁপছে।
সে চাইলো না ওদিকে যেতে। আর নতুন কিছু দেখার শক্তি তার নেই।
কিন্তু মানুষের মন!
প্রিয়তা না চাইলেও তার কৌতূহল তাকে টেনে নিয়ে গেল।
এই গলিটাও অন্ধকার। প্রিয়তা যত সামনে পা বাড়াচ্ছে, তত তত একটা উৎকট গন্ধ এসে নাকে লাগছে।
গা গুলিয়ে আসছে প্রিয়তার। তার প্রতিটা পদক্ষেপে মানুষের প্রাণভিক্ষার আর্তনাদ আরও স্পষ্ট হচ্ছে।
জানার কৌতূহল আরও বেশি বাড়ছে প্রিয়তার।
প্রিয়তা একটা লোহার দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। বুকটা অস্বাভাবিক কাঁপছে। আঙুলগুলো অবশ হয়ে আসছে দরজার হাতল ধরতে।
তবুও দরজা ঠেলে ভেতরে চাইলো প্রিয়তা।
সাথে সাথে যে দৃশ্য—সব কিছু সহ্য করতে পারলেও, ওটা কিছুতেই সহ্য করতে পারল না।
প্রিয়তার মস্তিষ্ক সাথে সাথেই জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ল।
কারণ প্রিয়তার চোখের সামনেই কসাইরা কাউকে জবাই দিয়ে দিয়েছে।
মূলত কসাইখানার দৃশ্যটা সহ্য করতে পারেনি প্রিয়তা।
এটা যেন সব নিষ্ঠুরতার ঊর্ধ্বে—যা প্রিয়তার মতো নরম মনের মেয়ের পক্ষে সয়ে নেওয়া শুধু কঠিনই নয়, অসম্ভব।
ট্রলি স্ট্রেচারের কেঁচ কেঁচ শব্দ ঝংকার তুলছে হাসপাতাল করিডোরের আনাচে কানাচে। ওয়ার্ড বয়রা দ্রুত স্ট্রেচার নিয়ে দৌড়ে যাচ্ছে ওটি রুমের দিকে।
স্ট্রেচারের উপর নিথর হয়ে পড়ে আছে করো ভালোবাসার পুরুষ।
সারাটা শরীর রক্তে ডুবানো।
প্রণয়ের প্রস্থানের পরপরই শিকদার পরিবার চলে গিয়েছিল, কিন্তু এখন আবারো মাত্রই ইনফর্ম করা হয়েছে তাদের।
জরুরি ভিত্তিতে জানানো হয়, তাদের ছেলে রোড এক্সিডেন্ট করে মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে। ইনজিউর্ড হয়েছে তার ফুল বডি।
অসাবধানতায় গাড়ি চালানোর জন্য অপর দিক থেকে ছুটে আসা অন্য একটি প্রাইভেট কারের সাথে মারাত্মক সংঘর্ষ হয়েছে। সাধারণ জনগণ তাকে ঘটনা স্থল থেকে হসপিটালে নিয়ে এসেছে করেছে।
খবরটা পাওয়া মাত্রই আবারো উদভ্রান্তের মতো এসে হাজির হয়েছে প্রেম রাজ সহ বাড়ির সিনিয়র পুরুষরা, কেবল সাদমান শিকদার ব্যতীত; তিনি খবর পেয়েছেন, আসছেন।
আনুশ্রী বেগমকে কিছুই জানানো হয়নি এ ব্যাপারে, কারণ তিনি অলরেডি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।
এখন ছেলে এক্সিডেন্ট করেছে শুনলে ওনাকে আর সামলানো যাবে না।
প্রেম রাজ, সাজিদ শিকদার আর সহেব সিকদার ব্যস্ত পায়চারি করছেন হসপিটাল করিডোরে। প্রায় ৩০ মিনিট পর ওটি থেকে বেরিয়ে আসেন সিনিয়র ডাক্তার হাবিব। তিনি হাতের গ্লাভস খুলতে খুলতে বলেন,
“ঠিক আছে, আপনাদের ছেলে, বেশি কিছু হয়নি। মাথায়, হাতে, পায়ে আর সারা শরীরে কিছু কিছু জায়গায় চোট পেয়েছে। মাথায় আঘাত লাগার দরুন জ্ঞান ফিরতে কিছুক্ষণ টাইম লাগবে, আর তাকে সেডেটিভ দিয়েছি যাতে আরো কিছুটা পরে জ্ঞান ফিরে।”
ডক্টর রিপোর্ট গুলো দেখে বললেন, দুটো দিন অবজারভেশনে রাখার পর আপনারা বাড়ি নিয়ে যেতে পারবেন। যদিও আপনাদের যা ছেলে, জ্ঞান ফিরলে আবার কাকে না জানি ধরে মারধর করে!”
ডাক্তারের আশ্বাসবাণী শুনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সকলে। এক্সিডেন্টের খবর কানে পৌঁছানো মাত্রই তাদের মনে হচ্ছিল, আবার বুঝি সব শেষ হয়ে গেল।
তারা ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে লজ্জিতও হলেন কিছুটা।
ডাক্তারের মাথা ফুলে এখনো আলু হয়ে আছে।
তিনি যে ভেতর ভেতর খুব চটে আছেন, সেটা উনার মুখ দেখেই বুঝা যাচ্ছে।
ডাক্তার আবার কণ্ঠে কিছুটা বিরক্তি ঢেলে বললেন,
“আর হ্যাঁ, আপনাদের ছেলের ভাগ্য সহায় ছিল, তাই এত বড় এক্সিডেন্ট করে ও সে অক্ষত আছে, আল্লাহর রহমতে বিশেষ ক্ষতি হয়নি। কিন্তু হতে পারত, হয়তো আল্লাহ সহায় ছিলেন। তবে আপনারা কেমন অভিভাবক, নিজের ছেলের মেন্টাল হেলথের দিকে নজর রাখেন নাহ্।
এখান থেকে নিয়ে গিয়ে আপনাদের ছেলেকে অবশ্যই একজন ভালো সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাবেন; হি ইজ এ ডেঞ্জারাস এন্ড মেন্টালি আনস্টেবল।
তার আশেপাশে থাকা ও নিরাপদ নয়।
আপনাদের ছেলে অজ্ঞেন অবস্থায় কার জানি নাম নিচ্ছে, দেখেই বুঝা যাচ্ছে he is obsessed।
এসকল মানুষ অপর কোনো এক ব্যক্তি বা বস্তুর উপর নিজের সবকিছু দিয়ে দেয়, চোখ বন্ধ করে আকড়ে ধরে, যেনো নিজের আলাদা কোনো জগৎ নেই, আলাদা কোনো অস্তিত্ব নেই।
অথচ প্রতিটা মানুষের আলাদা জগত থাকা উচিত।
এটা খুব ভয়ংকর হতে পারে।
যেনো সেই মানুষটা ডোপামিন বাঁধা পড়ে ওই ব্যক্তিতে কিংবা বস্তুতে, সে তাকে ব্যতীত দুনিয়া কল্পনা করতে পারে নাহ্। এক সর্বগ্রাসী আচ্ছন্নতা। আর এটা মেডিকেলের ভাষায় trauma bond বা co-dependency বলে।
সেই তীব্র আসক্তিময় বস্তু বা ব্যক্তি কাছে থাকলে তারা তার জন্য সব কিছু করতে রাজি থাকে। এটা তাদের জন্য লাইফ সেভিং প্রোগ্রাম।
মরতে কেউ চায় না, তাই তাদের বডি বেঁচে থাকার জন্য ওই স্পেসিফিক জিনিসটা আঁকড়ে ধরে।
আর ওই তীব্র আসক্তিময় মানুষটা যখন হারিয়ে যায়, তখনই শুরু হয় ভাঙন।
প্রথমেই মানসিক ভাঙন, তারপর শারীরিক ভাঙন। তৎক্ষণাৎ মস্তিষ্ক অচল হয়।
হৃৎপিণ্ড অথচ হয়।
ধীরে ধীরে পুরো শরীর অচল হয়ে যায়। শেষ পরিণতিতে হয় মৃত্যু, না হয় সারা জীবনের জন্য মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা।
আর তখন ওইসব মানুষের আশেপাশে যাওয়া যে কতটা ভয়ংকর…”
ডাক্তারের কথা শুনে চিন্তিত হয়ে পড়লেন সকলে।
এর মধ্যেই ছুটে এলেন সাদমান শিকদার। তীব্র অস্থিরতায় তিনি নিঃশ্বাস ফেলছেন জোরে জোরে। এই বয়সে এত মানসিক চাপ, উত্তেজনা আর সহ্য হয় না উনার। তিনি তীব্র উৎকণ্ঠা নিয়ে জানতে চাইলেন,
“আমার ছেলে কেমন আছে, ডাক্তার? ও ভালো আছে তো? আমার ছেলেটা বেঁচে আছে তো?”
সাদমান শিকদারকে দেখে ডাক্তারের মেজাজ আরো খারাপ হলো। তিনি ভ্রু কুঁচকে ভাবলেন, তাহলে ওই বদ্ধ উন্মাদ প্রোডাক্টটা এই ফ্যাক্টরি থেকে বেরিয়েছে! সাদমান শিকদারকে দেখে তখনকার মাথায় বাড়ি মারার কথা মনে পড়ে গেলো ডাক্তারের। রাগে খিটমিট করে উঠলেন তিনি। দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,
“কী জানোয়ার ছেলের জন্ম দিয়েছেন!”
প্রত্যুত্তরে এমন জবাব শুনে কিছুটা থতমত খেলেন সাদমান শিকদার। ডাক্তার নিজের মাথার ব্যান্ডেজটা দেখিয়ে বললেন,
“আপনার গুণধর ছেলের কর্ম।”
সাদমান শিকদার বেকুব বনে তাকালেন সবার দিকে। প্রেম সব খুলে বলল সাদমান শিকদারকে।
নিজের ছেলের এমন কর্মকাণ্ডের কথা শুনে লজ্জিত হলেন সাদমান শিকদার। তিনি নত মস্তকে বললেন,
“দুঃখিত ডাক্তার, আসলে আমার ছেলের মনের অবস্থা ভালো নেই।”
“সে যাই হোক, এত উগ্র আচরণ কোনো সুস্থ মানুষের হতে পারে না। যেমনটা বললাম, আপনারা এখনো ভালো সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাবেন। আর হ্যাঁ, চেষ্টা করবেন আপনাদের ছেলে যাতে উত্তেজিত না হয়; এই সময় উত্তেজনা ব্রেনের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে।”
“টেক কেয়ার,” বলে চলে গেলেন ডাক্তার।
সাদমান শিকদার মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন করিডোরে পাতা স্টিলের বেঞ্চের ওপর।
দৃষ্টি স্থির হলো মেঝের সাদা টাইলসে। কষ্টে উনার বুক ভারি হয়, চোখ দুটো জ্বলতে জ্বলতে ঝাপসা হয়ে আসছে পানিতে।
নিজের সামান্য কিছু লোভের জন্য আজ নিজের সন্তানটাকে, নিজের বাচ্চাটাকে মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছে দিয়েছেন তিনি।
কী ছেলে ছিলো আর কী হয়েছে।
বাচ্চাটার চোখে চোখ মেলাতে পারেন না সাদমান শিকদার। ছেলে কে নিয়ে বেশি ভাবতে গেলে বুকে ভীষণ যন্ত্রণা হয়। সত্যিটা কিছুতেই সহ্য করতে পারেন নাহ্ সাদমান শিকদার।
উনি যখন সবকিছুর নেপথ্যে নিজেকে খুঁজে পান, তখন মরে যেতে মন চায়। সত্যি তো, আজ নিজ সন্তানের এই করুন অবস্থার জন্য কেবল তিনিই দায়ী। জীবন নষ্টের খাতে উনার অবদান অনস্বীকার্য।
নিজের সামান্য কিছু লোভ চরিতার্থ করতে তিনি নিষ্ঠুরভাবে নিজের সন্তানকেই বলি দিয়েছেন। ছেলেটার কান্না, আহাজারি, কাকুতি-মিনতি—কোন কিছুই কানে পৌঁছায় নি সেদিন। তিনি শুধু দেখেছিলেন মুনাফা।
আচ্ছা, কোনো বাবা কি এমনটা করতে পারে? নিজের হাতে নিজের সন্তানের জীবনটা নষ্ট করতে পারে?
কোনো বাবা কি পারে নিজ স্বার্থে নিজ সন্তানের কলিজাটা টেনে ছিড়ে নিতে?
সে আবার কেমন বাবা, যে নিজ সন্তানের ভালো দেখতে পারে না, তার সব সুখ কেড়ে নেয়, ভবিতব্যে লিখে দেয় এক করুন মৃত্যু?
কুঁচকে যাওয়া দুচোখের কোণ বেয়ে ব্যর্থতার অশ্রু ঝরতে থাকে সাদমান শিকদারের। অনুতাপ আর অনুশোচনার ভারে বৃদ্ধ বয়সে একেবারে নুইয়ে পড়েছেন তিনি।
নানা হিসেবে উনার জীবনের সব থেকে বড় সফলতা—
বাবা হয়ে নিজে ছেলের জীবনটা একেবারে ধ্বংস করে দিয়েছেন। ভেতর থেকে নিঃশেষ করে দিয়েছেন নিজ সন্তানকে। চিরহাসিখুশি ছেলের মুখের সেই হাসি কেড়ে নিয়েছেন।
এখন শুধু ছেলেটার মরা বাকি। নিজে তো কোনদিন ছেলেটাকে সুখ দিতে পারেননি, কিন্তু যে দিয়েছিল, যাকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছিল ছেলেটা, যাকে নিয়ে নিজের জীবনটা গুছাতে চেয়েছিল, তাকেও কেড়ে নিয়েছেন।
এতটা খারাপ বাবা যেন পৃথিবীতে কারো না হয়।
দরজা খুলে যাওয়ার শব্দে ভাবনায় ছেদ পড়ে সাদমান শিকদারের। তিনি বসা থেকে উঠে দাঁড়ান। ভেতর থেকে স্ট্রেচার টেনে আনার কেঁচ কেঁচ শব্দ কানে লাগছে। ওয়ার্ড বয়রা স্টিলের স্ট্রেচারে শুইয়ে বাইরে নিয়ে আসে প্রণয়কে।
ছেলের জ্ঞানশূন্য নিথর ফ্যাকাশে মুখটা দেখে বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে গেল সাদমান শিকদারের। হাতে ব্যান্ডেজ, কপালে ব্যান্ডেজ। কতটা শান্ত হয়ে শুয়ে আছে, কতটা নিষ্পাপ দেখাচ্ছে! অথচ এই ছেলেটাই সজ্ঞানে থাকলে হয়তো এতক্ষণে এই জায়গাটাই জ্বালিয়ে দিতো।
বাড়ির সবাই করুন চোখে তাকিয়ে রয় প্রণয়ের শুভ্র মুখে। পাহাড়ের মতো শরীরটা অসাড় হয়ে পড়ে আছে।
সকলের দৃষ্টি ঝাপসা, চোখগুলো থৈ থৈ করছে নোনা পানিতে। প্রণয়ের ভেতরের সেই তীব্র যন্ত্রণার হলাহল হয়তো সবার হৃদয়কেই স্পর্শ করছে।
প্রণয়কে স্ট্রেচারে করে কেবিনে নিয়ে যায় ওয়ার্ড বয়রা। প্রেম আর সহ্য হলো না, বাবার পাশে বসে হু হু করে কেঁদে উঠে ভাইয়ের জন্য। বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যায়।
ভাইকে সে কোনোদিন বলতে পারেনি যে, “ভাই, তোমাকে কতটা ভালোবাসি।” কিন্তু মন তো জানে, প্রেম এই পৃথিবীতে কাকে সব থেকে বেশি ভালোবাসে।
এত বড় ছেলেকে পাবলিক প্লেসে এভাবে কাঁদতে দেখে মানুষজন যেতে আসতে ঘুরে ঘুরে তাকাচ্ছে, কিন্তু এতে যেন কিছুই যায় আসে না প্রেমের। প্রেমের দেখাদেখি রাজও কান্না করে দিল। অরণ্য, সমুদ্রও নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সাদমান শিকদার বড় অসহায় অনুভব করলেন। জীবনের ছোট্ট একটা ভুল যে ভবিষ্যৎকে এভাবে জ্বালিয়ে দিবে, তা তিনি দুঃস্বপ্নেও কোনদিন কল্পনা করতে পারেননি।
এতগুলো বছর পর সেই মানুষটাকে আবারো চোখের সামনে দেখে পা দুটো ফ্রিজ হয়ে গেছে চিত্রা। সেই চোখ, সেই মুখ, সেই অবয়ব।
মায়াবী চোখ দুটো পানিতে টলমল করছে চিত্রার। বেহায়া হৃদয়টা আগের থেকেও দ্বিগুণ আকুলতা মিশিয়ে তাকিয়ে আছে নিষিদ্ধ মানুষটার দিকে।
মাঝে পেরিয়ে এ কতগুলো বছর, সব কিছু বদলে গেছে, কেবল বদলায়নি চিত্রা। চেষ্টা তো কম করেনি! কিন্তু দিন শেষে ক্লান্ত হয়ে হৃদয়টাও হার মেনে নিয়েছে। তাকে চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে— তুই এই মানুষটাকে ভুলে যেতে পারবি নাহ্। এটা তোর সাধ্যের মধ্যে নেই।
এই মনুষটাকে হারানোর পর এতো যন্ত্রণা পেয়েছে চিত্রা। তার ধৈর্যের সীমা ভেঙে পড়ছিল। মন অন্যায়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে। তাই নীরবে সরে এসেছে চিত্রা, নিজের একতরফা ভালোবাসা আর একাকিত্বকে আপন করে নিয়েছে। বরণ করে নিয়েছে তার নিয়তি। ভালোবাসে বলে বোনের সংসার ভাঙার দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করতে পারে না চিত্রা।
কিন্তু মানুষের মন তো মাঝে মাঝে বড্ড বেহায়া হয়ে যায়। মোটামুটি পাঁচ বছর আগে রায়পুর ছেড়ে চলে এসেছে চিত্রা। এক বছর হয়েছে, সে এই হাসপাতালে নার্স হিসেবে যোগদান করেছে। যে মানুষটাকে ভোলা সম্ভব নয়, তাকেও আর ভোলার চেষ্টা করেনি। মনের মানুষকে রেখে দিয়েছে মনের ভেতর।
চিত্রা দূরে দাঁড়িয়ে প্রাণ ভরে দুচোখ ভরে নয়ন জুড়িয়ে দেখছে প্রেমকে। মানুষটা কী সুন্দর, আগের থেকেও বেশি পরিণত হয়েছে। কিন্তু তার পুরা কপালে জুটল না।
চিত্রা দেখল, শিকদার বাড়ির সকলেই আছে। সকলের এমন কান্নাকাটি দেখে ভ্রু কুঁচকে গেল চিত্রার। সে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল তাদের দিকে। প্রেমের নিকটে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করার পূর্বেই হন্তদন্ত পায়ে ছুটে এল জাভেদ। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“স্যার কোথায়? কেমন আছেন?”
জাভেদকে দেখে উঠে দাঁড়াল প্রেম।
“ডাক্তার বললো তেমন কিছু হয়নি।”
“আমি স্যারের কাছে যাব, প্লিজ।”
জাভেদের কণ্ঠ ধরে আসছে।
প্রেম মাথা নাড়ল। জাভেদকে নিয়ে চলে গেল প্রণয়ের কেবিনে। একবারের জন্যও তাকালো না চিত্রার দিকে, বলা বাহুল্য সে লক্ষ্যই করল না।
চোখ দুটো আবারো পানিতে টলমল করে উঠল চিত্রার। এত কাছ থেকে দেখেও একটু কথা বলতে না পারার গ্লানি মনে চেপে বসল। পুরনো ব্যথায় বুকের ভেতরটা আবার হুহু করে উঠলো।
সে চোখ মুছে অরণ্যের উদ্দেশ্যে বলল,
“ভাইয়া, কী হয়েছে?”
অরণ্য চোখ তুলে চাইলো। হাসপাতাল এপ্রন পরিহিত একটা ২২-২৩ বছর বয়সী মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
প্রথমে চিনতে সামান্য অসুবিধা হলো অরণ্যের, তবে ভালো মতো দেখাতেই পরক্ষণেই চিনে নিল। চিত্রার চোখ-মুখে কৌতূহল।
অরণ্য প্রায় সবটাই গোপন করে শুধু বলল,
“বড় দাদান এক্সিডেন্ট করেছেন।”
চিত্রার মনটা ব্যথিত হলো, ছোট করে বললো—
“ওহ্।”
আর কিছু বলল না চিত্রা। কেবল নিষ্প্রাণ চোখে চেয়ে রইল সেই শূন্য রাস্তাটার পানে, যেখান দিয়ে কিছুক্ষণ আগেই তার অতিপ্রিয় অথচ নিষিদ্ধ পুরুষটা হেঁটে গেছে।
এতো বছর কতো কষ্টে সে নিজেকে সামলে রেখেছিল, বিষ খেয়ে বিষ হজম করেছে।
প্রেমকে একটি বার দেখার জন্য যে মনটা কতো ছটফট করেছে, কিন্তু যায়নি চিত্রা। তবে আজ কেনো মানুষটার সাথে আবার দেখা হয়ে গেলো।
প্রণয়ের বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আছে প্রেম ও জাভেদ। তাদের দু চোখের দৃষ্টিতে দুনিয়ার অসহায়ত্ব। চিন্তায় চিন্তায় পাগল হয়ে যাচ্ছে প্রেম।
“আমার বোনের কোনো কোনো খবর পেয়েছেন, জাভেদ? আমার ভাই যখন জেগে উঠে জানতে চাইবে তার জান কোথায়, কী উত্তর দেবেন?”
জাভেদের কণ্ঠ কাঁপলো স্পষ্ট। সত্যি, আজ সেও ব্যর্থ। সত্যি প্রণয়কে দেওয়ার মতো কোনো উত্তর তার ঝুলিতে নেই। কী বলে সান্ত্বনা দেবে।
“আমি সব জায়গায় খুঁজেছি, যেখানে যেখানে খুঁজে সম্ভব সব জায়গায়, কিন্তু কোথাও খুঁজে পাইনি। জলজ্যান্ত একটা মানুষ যেন কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কর্পূরের মত উবে গেছে।
আমার কাছে দেওয়ার মতো কোনো জবাব নেই। জানি না এই অপরাধে আমার মৃত্যুদণ্ড হবে কি না, কিন্তু আমি সত্যি নিরুপায়।”
প্রেম উদগ্রীব হলো না। তার চোখ-মুখে হতাশাও দেখা গেলো নাহ্, কারণ সে ভালো মতোই জানে— আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।
অন্য কেউ গুম করলে হয়তোবা খুঁজে পাওয়া যেত, কিন্তু যে জায়গায় আপনজনরা বিশ্বাসঘাতকতা করে, সেখানে রুখে দাঁড়ানো প্রায় অসম্ভব।
প্রেম ১০০ ভাগ নিশ্চিত— যে এই কাজটা বাইরের কেউ করেনি। যে বিশাল বৃক্ষটা বাইরের সকল ঝড়-তুফান, সকল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিঃশব্দে সয়ে নিয়ে মুখ বুঝে দাঁড়িয়ে থাকে, সেই গাছটাও অতি সামান্য ঘুণপোকা ভেতর থেকে কুড়ে কুড়ে খেয়ে নিঃশেষ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
আর তাদের বাড়িতে এমন মানুষের সংখ্যা নেহাতি কম নয়।
প্রণয়ের হুঁশ নেই। কড়া সেডেটিভের পাওয়ারে প্রায় অচেতন। তবুও পাগল ছেলেটা বিড়বিড় করে কেবল একটা নামই জপে চলেছে—
“জান”।
যেনো জান ব্যতীত তার গোটা দুনিয়াটা ঝাপসা। দৃশ্যমান পৃথিবীর সবকিছু অদৃশ্য।
দেহ ছাপিয়ে এখন আত্মাও হাহাকার করছে। ওরা দুজন মুখের কাছে কান নিয়ে শোনার চেষ্টা করলো। নামটা অস্পষ্ট, কিন্তু বুঝতে অসুবিধা হয় না দুজনের মধ্যে কারো। আহ্, এতো ভালোবাসা কী সত্যি দুনিয়ায় আছে।
শিকদার বাড়িতে তুলকালাম ঝগড়ায় লিপ্ত শুদ্ধ আর প্রিয়স্মিতা। বাড়ির আনাচে-কানাচে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে তাদের উচ্চ শব্দের বাক্যালাপ। তাদের বাক্যের উগ্রতা যেনো সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
প্রিয়স্মিতা শুদ্ধকে ধাক্কা দিয়ে চিৎকার করে বলছে,
“শুধু শুধু আমার ওপর চ্যাঁচাবেন না, শুদ্ধ। আমি এমনটা করার কথা ভাবতেও পারি না।”
“হ্যাঁ, আমি মানছি এটা সত্যি যে আমি প্রণয়কে সুখে দেখতে চাইনি। ওর সুখের জীবনটা নষ্ট করতে চেয়েছি, ওকে ভেতর থেকে গুঁড়িয়ে দিতে চেয়েছি, ওকে উপলব্ধি করাতে চেয়েছি যে আপনজন হারানোর যন্ত্রণা কতটা।
ভালোবাসার মানুষটা যখন হারিয়ে যায়, তখন কেমন লাগে।
আমি শুধু তাকে বুঝাতে চেয়েছি, সে দিনের পর দিন বছরের পর বছর যে কাজগুলো করছে, সেগুলো ঠিক করছে না।
আর সব থেকে বড়ো কথা, ওর মতো অমানুষরা সুখ ডিজার্ভ করে না। ওরা ভালোবাসার নয়, ওরা শাস্তির উপযুক্ত।
কিন্তু প্রণয় এতো বড় অপরাধী হওয়া সত্ত্বেও, এত অন্যায় করা সত্ত্বেও, সে শাস্তির বদলে পুরস্কার পাচ্ছে। সবাইকে জাহান্নামে রেখে নিজে বেহেস্তের সুখ উপভোগ করছে।
তাই আমি চেয়েছি ও জাহান্নামে থাকুক।
ওর কৃতকর্মের উচিত শিক্ষা পাক।
ও যাকে সব থেকে বেশি ভালোবেসে, তার চোখেই ঘৃণার পাত্র হয়ে থাকুক।
এটাই তার জন্য উপযুক্ত শাস্তি।
তার মানে এই নয় যে আমি আমার বোনকে গুম করে দেব। আমি এগুলো করবো ভেবেছিলাম, কিন্তু এর একটা ও করিনি। আমি জানি না প্রিয়তা কোথায় আছে। শুধু শুধু আমার সাথে না লেগে আমাকে আমার বোনকে খুঁজতে দাও। প্রণয় বাঁচল কি মরল, এটা নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই, কারণ আমার কনসার্ন শুধু আমার বোন।”
পিছিয়ে গেলো শুদ্ধ। তার আর কারো কোনো কথা শুনতে ইচ্ছে করছে না। কিচ্ছু সহ্য হচ্ছে না। সবকিছু জ্বালিয়ে দিতে মন চাচ্ছে।
সীমাহীন রাগ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে পুরুষালি শরীরের শিরায় শিরায়। মাথা চেপে ধরে নিজেই নিজের চুল টানছে শুদ্ধ। এবার তারও ইচ্ছা করছে প্রণয়ের মতো সব কিছু ভেঙেচুরে গুঁড়িয়ে দিতে। অসহায়ত্বের পাগলের মতো হাউমাউ করে কাঁদতে মন চাচ্ছে ছেলেটার।
সহ্য করতে না পেরে একসময় দুই হাতে মুখ গুজে ডুকরে কেঁদে উঠল শুদ্ধ। অসহায়ত্বে পাগলের মতো করতে শুরু করল ছেলেটা। বিড়বিড় করে বলল,
“আমি কি এতটাই পাপিষ্ঠ মাবুদ, যে সবাইকে সব কিছু দিলেন, অথচ আমার ভাগে কিছুই রাখলে না? আমি বুক ভরা যন্ত্রণা ছাড়া আর কিছুই পেলাম না।
আমার কপালে ভালোবাসাও নেই, সুখও নেই, শান্তিও নেই। এখন স্বস্তিটুকুও চলে গেল। আমার কপালে কি পাগল হয়ে মরা লেখা আছে, মাবুদ?”
“আমিও তো মানুষ, আমিও তো তোমার বান্দা। আর কত ধৈর্যের পরীক্ষা নিবেন আমার? আর কত সইব আমি? একটা মানুষ আর কত সইতে পারে? আমাকে ভালোবাসা দিলে না, আমার চোখের সামনে আমার ভালোবাসার মানুষটা অন্য কারো হয়ে গেল—
লোকে বলে অপেক্ষার ফল নাকি মিষ্টি হয়, কিন্তু বেলায় টক হলো।
মেনে তো নিয়েছিলাম। বিনিময়ে শুধু চেয়েছি, আমার ভালোবাসার মানুষটা সুখে থাকুক,
হাসিতে থাকুক। তার সুখটা যেন আমি দুচোখ ভরে দেখতে পাই।
আমার সেই শান্তিটুকুও কেড়ে নিলে, মাবুদ? ওই মেয়েটা, আমার ভালোবাসা, আমার প্রিয়তা—কোথায়? কোথায় গেলে তাকে পাব আমি?”
“আহ্হ্হ্হ্হ্হ্হ্হ্হ্হ্হ্হ্হ্!!”
শুদ্ধর বিলাপ শুনে হকচকিয়ে গেল বাড়ির সবাই। আজ যেনো তাদের অবাক হওয়ার দিন! একের ওপর এক বোমা পড়ছে। একের পর এক চমক তাদের হজম হচ্ছে না। তারা জানত প্রিয়তাকে প্রণয় পাগলের মতো ভালোবাসে, বা পাগল হয়ে গেছে। কিন্তু শুদ্ধরও যে একই অবস্থা—কৈ, কোনোদিন তো বুঝতে পারেনি!
শুদ্ধর বিলাপ করা দেখে প্রিয়স্মিতার চোখে পানি চলে এসেছে। সে নির্বাক চোখে শুদ্ধের আহাজারিগুলো চেয়ে চেয়ে দেখছে। নির্ভান যতটা বর্ণনা দিয়েছিল, তার হাজার গুণ তীব্র এই বুকফাটা আর্তনাদগুলো।
প্রিয়স্মিতা শুদ্ধের লালচে চোখে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে ভালোবাসা না পাওয়ার যন্ত্রণা, ভালোবাসা হারানোর আক্ষেপ—আরও কত কী। প্রিয়স্মিতা শুদ্ধর অনুভূতির সাথে নিজের অনুভূতিগুলোর তুলনা করলো, মিলিয়ে দেখল—সে ও ভালোবাসে, কিন্তু শুদ্ধ কিংবা প্রণয়ের মতো এতটা ডেসপারেট কিংবা প্রাণঘাতী নয়। সে নিজের অস্তিত্বকে ভালোবাসে, কিন্তু এই দুজন নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে অন্য একজনের অস্তিত্ব আঁকড়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা করছে।
প্রিয়স্মিতা প্রিয়তাকে হিংসে করে না, কিন্তু প্রিয়তার ভাগ্যটা দেখে বড়ো আফসোস হয়। মেয়েটা নিজের ভালোবাসা তো পেলই, সাথে প্রিয়স্মিতার ভাগের ভালোবাসাটাও পেল।
ছোটবেলার পরিবারের বড় বেলায় মনের মানুষ—কোনো ভালোবাসাই প্রিয়স্মিতার কপালে জুটলো নাহ্। নিজের ভাগের সাথে সাথে প্রিয়স্মিতার ভাগের সবটুকুও প্রিয়তার কপালে ছিলো।
শুদ্ধ ছটফট করতে করতে অস্থির হয়ে যাচ্ছে। সে কিছুই ভাবতে পারছে না। মস্তিষ্কে তীব্র রক্তক্ষরণ হচ্ছে।
দুই-তিনটা চেহারা চোখে ভেসছে শুধু, যারা এগুলো করতে পারে। তার মধ্যে প্রথমেই প্রিয়স্মিতা, কিন্তু প্রিয়স্মিতার চোখ-মুখ এক সেকেন্ডের জন্যও বলছে না—সে মিথ্যে বলছে।
তাহলে প্রহেলিকা? হতে পারে।
শুদ্ধ বসা থেকে তড়াক করে উঠে দাঁড়াল। ধপাধপ পা ফেলে চলে গেল উপরে।
বাড়িতে একপ্রকার আগুন জ্বলছে, কিন্তু কোনো হেলদোল নেই খালিদ শিকদারের। তার মধ্যে কোনো ভাবান্তর দেখা যাচ্ছে না। বাড়িতে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এত কিছু ঘটে গেল, কিন্তু ঘর থেকে একবারের জন্যও বের হননি খালিদ শিকদার।
শুদ্ধ প্রহেলিকার ঘরে তন্নতন্ন করে খুঁজল, কিন্তু কোথাও নেই প্রহেলিকা। প্রহেলিকাকে দেখতে না পেয়ে শুদ্ধর শরীরে আগুন ধরে গেল। রাগে তার দেহের রক্তগুলো ফুটছে রীতিমতো।
শুদ্ধ তীব্র ক্রোধে সজোরে লাথি বসাল কাঁচের সেন্টার টেবিলে। সাথে সাথেই মাকড়সার জালের মতো কাঁচে ফাটল ধরল। চোখের পলকে গুঁড়িয়ে গেল টেবিলটা। ওপরের কাঁচ ভাঙার ঝনঝন শব্দে নিচে পড়ে গেলো।
ড্রয়িং রুমে দাঁড়িয়ে কেঁপে উঠল সবাই।
শুদ্ধ দুই মিনিট ভেবে গটগট পায়ে নিচে নেমে সোজা খালিদ শিকদারের ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। বজ্রকণ্ঠে নাম ধরে ডাকল,
“খালিদ শিকদার, আমি জাস্ট 2 কাউন্ট করব। এর মধ্যেই দরজা খুলবেন, নচেৎ—”
শুদ্ধর চেঁচামেচিতে সবাই দরজার সামনে এসে দাঁড়াল।
শুদ্ধর চোখের মনিতে যেন রক্ত জমেছে।
“১”
“২”
ডাকার পরেও খালিদ শিকদারকে দরজা না খুলতে দেখে দাঁতে দাঁত পিষলো শুদ্ধ। লোকটার সাহস দেখে চড়চড় করে পায়ের রক্ত লাফিয়ে উঠল মাথায়। তার মুখাবয়ব দেখে থরথর করে কাঁপছে সবাই।
শুদ্ধ শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে সজোরে লাথি দিল কাঠের দরজায়। সাথে সাথেই মজবুত দরজার পাল্লাটা খুলে ভেতরের দিকে আছড়ে পড়ল।
সাথে সাথেই আঁতকে উঠলেন খালিদ শিকদার। বিছানার চাদর টেনে গায়ে জড়িয়ে নিলেন। চোখের পলকে ভেতরে ঢুকে গিয়ে ব্যঘ্র থাবা বসালো শুদ্ধ। খালিদ শিকদারের অবস্থার দিকে লক্ষ করল না। দাঁতে দাঁত পিষে চোখ লাল করে বলল,
“আমার প্রিয়তা কোথায়, বল জানোয়ারের বাচ্চা! আমার প্রিয়তা কোথায়? আমি জানি তুই সব জানিস। এই কাজটা তোর আর তোর মেয়ে ছাড়া আর কারো হতে পারে না।”
খালিদ শিকদার তটস্থ হয়ে ভয়ে শিটিয়ে গেলেন। ভয়ার্ত চোখে তাকালেন শুদ্ধর দিকে। শুদ্ধর দিশেহারা চোখের মণি দিয়ে যেন আগুন ঠিকরাচ্ছে। খালিদ শিকদার বারবার চাদর টেনে গায়ে জড়াচ্ছেন।
উনার নিরবতা দেখে নিজেকে ধরে রাখতে পারল নাহ্ শুদ্ধ। একটা অভাবনীয় কাজ করে ফেলল তৎক্ষণাৎ। ধৈর্য হারিয়ে হাত তুলে ফেলল খালিদ শিকদারের গায়ে।
প্রণয় হলে একটা কথা ছিল, কিন্তু নিজের আদরের ভাগ্নে যে এমন করবে, তা কখনো কল্পনায়ও ভাবতে পারেননি খালিদ শিকদার।
জবাব না পেয়ে একের পর এক ঘুষি মারতে লাগল শুদ্ধ। রাগে, ক্ষোভে যেন পাগল হয়ে গেছে ছেলেটা। শুদ্ধর বলিষ্ঠ হাতের আঘাতে খালিদের নাক-মুখ ছিড়ে রক্ত উঠে আসছে। তিনি কুঁকড়ে যাচ্ছেন বারবার।
শুদ্ধ পাগলের মতো গালাগাল দিতে দিতে বলছে,
“আমার প্রিয়তা কোথায় বল, নাহলে এক্ষুনি এখানেই জ্যান্ত মাটি চাপা দেবো।”
খালিদ শিকদার নিজেকে বাঁচাতে কাঁপা গলায় বললেন,
“আমি… আমি… আমি কিছু করিনি, শুদ্ধ। সত্যি আমি কিছু জানি না।”
কিন্তু প্রিয়স্মিতার মতো খালিদ শিকদারের চোখে স্বচ্ছতা দেখতে পেল না শুদ্ধ। তার সন্দেহ গভীর বিশ্বাসে পরিণত হলো। খালিদ শিকদারের আর্তনাদ শুনে বাড়ির শুদ্ধ মানুষ এসে হাজির হলো। প্রিয়স্মিতা আর সমুদ্র শুদ্ধকে ধরতে গেলেই আগ্রাসী হয়ে আচমকা বেডশিট টেনে সরিয়ে দিল শুদ্ধ।
উক্ত কাণ্ডে হতবম্ব হয়ে গেলেন খালিদ শিকদার। নিজেকে ঢাকার প্রয়াসটুকুও করতে পারলেন নাহ্। থমকে গেল সবাই।
সামনের দৃশ্য দেখে আচানক চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেলো সবার। থেমে গেল শুদ্ধও।
খালিদ শিকদারের উলঙ্গ অবস্থা দেখে ঘৃণায় মুখ শক্ত করে ঘুরিয়ে নিল অন্যদিকে।
অন্যরা ও চোখ বন্ধ করে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন।
লজ্জায় অপমানে মরে যেতে মন চাইল খালিদ শিকদারের। শুদ্ধ মুখ ঘুরাতেই পর্দার আড়ালে কাউকে নড়তে দেখল।
সাথে সাথেই ঘটনার গভীরতা ধরে ফেললো শুদ্ধ। রুদ্ধ কদমে এগিয়ে গিয়ে এক টানে বেলকনির পর্দা সরিয়ে দিলো।
ভূত দেখার মতো চমকে কেঁপে উঠলো মেয়েটা।
বাড়ির সকলে আশ্চর্যান্বিত নয়নে তাকিয়ে দেখলেন।
তাদের বাড়িতে নতুন আসা কাজের মেয়েটা উলঙ্গ অবস্থায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
তনুশ্রী বেগম বাড়িতে নেই, কিন্তু খালিদ শিকদারের এমন অধঃপতন দেখে লজ্জায় মাথা নিচু করে নিল সমুদ্র।
তার আদর্শবান বাবা এতটা নিচ—এটা ভাবতেও লজ্জায় তার মাথা কাটা যাচ্ছে।
তবে এতে কিছুই যায় আসে না শুদ্ধর। সে বেডশিট তুলে ছুড়ে মারে খালিদ শিকদারের মুখে। চাদরটা গায়ে পেয়ে টেনে এলোমেলোভাবে শরীরের সাথে জড়িয়ে নিলেন খালিদ শিকদার।
শুদ্ধ আবার চড়াও হলো। মারতে উদ্যত হতেই ধরে ফেলল রাজ।
সবাই খালিদ শিকদারের ঘরে অবস্থান করছে। চিৎকার করে করে বাড়ি মাথায় তুলে ফেলেছে শুদ্ধ।
এমন সময় বাড়িতে প্রবেশ করল প্রণয়। তার কদম টলছে—একদম নির্বিকার, শান্ত, ভঙ্গুর। চোখ দুটো রক্তবর্ণ আগুনের কুন্ড, চুলগুলো এলোমেলো। সুন্দর মুখটা ঢাকা পড়েছে মলিনতার কালো আঁধারে।
একদম ভেঙে চুরে গেছে, গুড়িয়ে গেছে ছেলেটা। তার পা যেন চলছে না—প্রাণহীন মৃত মানুষের মতো নির্জীব। প্রণয় ধীর পায়ে এক পা, দু পা করে সিঁড়ি বেয়ে চলে গেল নিজের ঘরে।
এত চিৎকার-চেঁচামেচি আর কোলাহল যেন তার কান অবধি পৌঁছালই না—শুনেও শুনল না সে।
তার পেছন পেছন দৌড়ে বাড়িতে প্রবেশ করল প্রেম, রাজ আর জাভেদ। প্রেম ছুটে প্রণয়ের কাছে যেতে নিলে হাত চেপে ধরল রাজ। ধমকে বলল—
“সন্ধ্যার সময় এতগুলো মার খেয়ে ও পেট ভরেনি, আবার যাচ্ছিস?”
আকুল হলো প্রেম, ভাইয়ের পানে অশ্রুসিক্ত চোখে তাকিয়ে ভেজা কণ্ঠে বলল—
“কী করব বল ভাই? ভাই তো মেরে ফেললেও দূরে সরিয়ে দিতে পারব না।
ভালো হলে ও আমার ভাই, পাগল হলে ও আমার ভাই, খুনি হলে ও আমার ভাই, সন্ত্রাসী হলে ও আমার ভাই। রক্তকে অস্বীকার করা যায়?
তাছাড়া এখন আমার ভাইয়ের মনের অবস্থা ভালো নেই।”
“বুঝি সবই, তবুও যাস না। একা থাকতে দে।”
“কিন্তু—”
প্রেম কিছু বলতে নিলে জাভেদ বলে উঠল—
“উনি ঠিকই বলছেন। স্যারকে এখন একদম ঘাটানো উচিত না। উনি সম্পূর্ণ পাগল হয়ে আছেন। আমার তো তাকাতেও ভয় করছে। আমি উনাকে রগে রগে চিনি। এখন কিছু বলতে গেলে বা বুঝাতে গেলে বুঝবে তো নাই, কিন্তু নিজের অজান্তেই মেরে টেরে দেবে—তাই না যাওয়াই ভালো। তবে ভাবী আগে ও একবার কানাডায় কিডন্যাপ হয়ে গেছিলো, তখন কিন্তু স্যার অনেক ভেঙে পড়লেও এরকম করেনি। নিজেকে শক্ত রেখেছে, ঠান্ডা মাথায় খুঁজে বের করেছে। কিন্তু এবার—”
প্রেম আর কিছু বলতে পারল না, কেবল অসহায় চোখে তাকিয়ে রইল ভাইয়ের যাওয়ার পানে।
হঠাৎ আবার চেঁচামেচির শব্দ কানে লাগতেই দুই ভাই তড়াক করে ভ্রম ছেড়ে বেরিয়ে এলো। ছুটল খালিদ শিকদারের ঘরের দিকে। চিৎকারটা ওদিক থেকেই আসছে। আবার না জানি কী হলো।
প্রণয় ঘরে এসে ওয়ার্ডরোব খুলে প্রিয়তার ব্যবহৃত টি-শার্ট বের করে বুকে চেপে ধরল। ধপ করে বসে পড়ল মেঝেতে। কাপড়টা নাক-মুখে ডুবিয়ে হঠাৎ বাচ্চাদের মতো শব্দ করে কেঁদে উঠল—
লালাভ দুই চোখের কোণা বেয়ে অঝোরে তপ্ত অশ্রুর বর্ষণ হচ্ছে।
প্রণয় লুটিয়ে পড়ে চিৎকার দিয়ে কেঁদে বলল—
“আমার বুক থেকে তোকে ছিনিয়ে নিয়ে এত যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু আমায় কেন দিচ্ছে, জান?
আমি তো আমাকে মারতে কাউকে বাধা দিইনি। মেরে ফেলুক, কিন্তু এভাবে কেন ওরা আমাকে ফাঁসিতে ঝুলাক, গুলি করে ঝাঝরা করে দিক, কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলুক—পৃথিবীর সব থেকে নিষ্ঠুর তো মৃত্যুটা দিক, শুধু তোকে আমার মৃত্যু অবধি বুকে রেখে দিক। আমি শরীরের সব ব্যথা হাসিমুখে সহ্য করে নেবো, শুধু মনের ব্যথা না দিক।
ওই জান, আমার খুব কষ্ট হচ্ছে তোকে ছাড়া। তোর প্রণয় ভাইয়ের কষ্ট হচ্ছে, পাখি। শুনতে পাচ্ছিস? আাহহহহহহ!”
গলা ফাটিয়ে কাঁদছে প্রণয়। বলতে বলতে কাপড়টায় আরও নিবিড়ভাবে নাক-মুখ ডুবিয়ে দিচ্ছে। কাপড়টার চেনা ঘ্রাণ তাকে আরো পাগল করে দিচ্ছে, বানিয়ে দিচ্ছে বদ্ধ উন্মাদ।
সে আরো পাগলের মতো খুঁজতে লাগল তার প্রিয়তমাকে। প্রিয়তার অস্তিত্বের অমোঘ আসক্তি আর তৃষ্ণায় গলা কাটা মুরগির মতো ছটফট করতে লাগল প্রণয়।
প্রেমানলে পুড়তে পুড়তে প্রণয়ের মস্তিষ্ক যেন কাজ করাই বন্ধ করে দিয়েছে। তবে বিলাপ করতে করতে হুট করেই একটা কথা বজ্রপাতের মতো মনে পড়ে থমকে গেল প্রণয়ের। কথাটা মাথায় আসতেই চমকে উঠে বসলো সাথে সাথেই।
বুকের ভেতর নিভে যাওয়া আশার আলোটা ধপ করে জ্বলে উঠল। হঠাৎ সব কান্নাকাটি বন্ধ হয়ে গেল প্রণয়ের। তড়িৎ বেগে উঠে দাঁড়াল।
উদ্ভ্রান্তের মতো ল্যাপটপ নিয়ে বসল বিছানায়।
তার নিজের মাথা নিজেরই ঠুকে মারতে ইচ্ছে করতে—শিট! এত বড় কথাটা সে কীভাবে ভুলে যেতে পারল! ল্যাপটপ স্ক্রিন ওপেন করতে হাত দুটো এত কাঁপছে যে প্রণয়ের মন চাচ্ছে ওই হাত দুটোকে কেটে শরীর থেকে আলাদা করে দিতে।
এমনিতেও যে হাত দুটো তার জানকে রক্ষা করতে অক্ষম হয়েছে, সেই হাত আর তার শরীরের সাথে লেগে থাকার কোনো অধিকার রাখে না।
ল্যাপটপে হাত চালাতে আতঙ্কে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায় প্রণয়ের। কম্পিত দৃষ্টি রাখে স্ক্রিনে। বুকের বাঁ পাশটা অদ্ভুত ব্যথায় ছেয়ে যায় মুহূর্তেই।
বুকের কাঁপন বলছে—এক্ষুনি হার্ট অ্যাটাক আসবে।
প্রণয় অ্যাপটা ওপেন করে। সাথেই সাথেই প্রিয়তার অনামিকায় থাকা পিঙ্ক ডায়মন্ড রিংয়ে থাকা মাইক্রোচিপের সাথে ল্যাপটপ কানেক্ট হয়ে যায়।
ল্যাপটপ স্ক্রিনে ভেসে থাকা লোকেশনটা দেখে প্রণয়ের পায়ের নিচের জমিন সরে যায় মুহূর্তেই। মাথার উপর দুনিয়া দুলে উঠে, দুই হাঁটুর সন্ধিস্থলে কাঁপন ধরে সহসা।
ব্যালেন্স রাখতে পারে না প্রণয়। ল্যাপটপটা উরু থেকে ছিটকে পড়ে যায় মেঝেতে। বিকট শব্দে আওয়াজ হয়।
কিন্তু প্রণয় যেন পাথর বনে গেছে। বুকের থাকা নরম মাংসপিণ্ডটা মনে হচ্ছে কেউ জ্বলন্ত আগুনে ঝলসে খাচ্ছে।
প্রণয় সহসা চিৎকার দিয়ে ওঠে—
“নননন না! এ হতে পারে না, এটা হতে পারে নাহ্! ও আমার রক্তজবা, আমার জান—ওই নরকে কিছুতেই যেতে পারে না! ওখানে কোনো মানুষের বাস নেই—ওরা একেকটা আমারই পালিত হিংস্র পশু!”
“ননাআআআআআআ!”
তৎক্ষণাৎ দরজা ঠেলে ঘরে প্রবেশ করে শুদ্ধ। প্রণয় কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রণয়ের নাক বরাবর ঘুষি মারে, এমনকি একের পর এক মারতেই থাকে। তীব্র ক্রোধে পাগল হয়ে গেছে সে। চেঁচিয়ে বলে—
“নিজে ভোগ করতে করতে নিজের পোষা কুকুরগুলোকে দিয়েও ভোগ করাবি বলে কি আমার ভালোবাসা তোকে দিয়েছিলাম? কাপুরুষ!”
প্রণয় দুর্বল ছিল। সে একটা আঘাতের প্রতিবাদ করতে পারেনি। হয়তো চায়ওনি। হয়তো চেয়েছে ওই ভয়ানক দৃশ্যগুলো দেখার আগে শুদ্ধ তাকে মেরে ফেলুক।
তাদের ধস্তাধস্তির শব্দ শুনে ছুটে এল রাজ, প্রেম, অরণ্য, সমুদ্র। তারা কক্ষে প্রবেশ করে এমন অবস্থা দেখে তাজ্জব বনে গেল। সবাই মিলে দ্রুত ধরে আটকায় শুদ্ধকে। খালিদ শিকদারকে সে মারতে মারতে অর্ধমৃত করে ফেলেছে প্রায়।
প্রেম ছাড়াতে ছাড়াতে আর্তনাদ করে বলে—
“ছাড়ুন শুদ্ধ ভাইয়া! আমার ভাই অসুস্থ!”
শুদ্ধর কানে যেন কোনো কথাই যাচ্ছে না। তার শক্তির সাথে পেরে উঠছে না তারা কেউ। শুদ্ধ গর্জন দিয়ে বলে—
“আমার ভালোবাসার যদি এতটুকুও কোনো ক্ষতি হয়, খুদার কসম—প্রণয়, আজ তুই আমার হাতেই মরবি! পরপর দুটো লাশ এই বাড়ি থেকে বের হবে—একটা তোর, আর একটা আমার!”
প্রণয় হঠাৎ স্তম্ভিত হয়ে ফিরল। সে সবাইকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটল।
জাভেদ চিৎকার দিয়ে পিছু নিল—
ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৮৭
“স্যার, দাঁড়ান স্যার! আপনি ড্রাইভিং করলে আবার এক্সিডেন্ট করবেন!”
কিন্তু প্রণয়ের কানে কোনো কথাই গেল না। শুদ্ধও ছুটল পেছন পেছন।
নাজানি আবার কোন তাণ্ডবলীলা অপেক্ষা করছে।

Please apu porer part ta Tara tari din please 🥺🥺😞
Next part daw apo plz….
Apu golpo ta ki diben 🤬🤬🤬🤬
Apu apni eto obohela kn kortechen ei serious moment ta te plz apu eta ekdom sesh porjonto den na plz apuuu🙏🥺
Apu apni ki amdr doirjer porrikha nitesen?? Nxt prt ta den plzzzz
Apugooo….next dennn plzzz 🫠