Home মন পিঞ্জিরা মন পিঞ্জিরা পর্ব ১১+১২

মন পিঞ্জিরা পর্ব ১১+১২

মন পিঞ্জিরা পর্ব ১১+১২
শ্যামলী রহমান

ট্রেন চলছে দূরন্তপথে। ঝকঝক শব্দে মুখরিত করছে পরিবেশ।বাতাস হীন গুমোট পরিস্থিতি।ট্রেনের দোলায় দুলছে কামরা।কেউ প্রিয়জনের কাঁধে মাথা রেখে ঘুমচ্ছে,কেউবা বই পড়ছে,আবার কেউ স্থির চোখে চেয়ে আছে।
ট্রেনের গতির প্রতিক্রিয়ার রেললাইনের মতো অনেক মানুষের জীবন। পিষে চলে যায় তবে সহ্য করে থাকতে হয়।জানালা দিয়ে বসন্তের সৌন্দর্য বহনকারী ফুল লাল কৃষ্ণচূড়ার দেখা মিলছে।মনে পড়লো একজনের কৃষ্ণচূড়া অনেক পছন্দ। তার কি পছন্দের শেষ আছে?শরৎতের শিউলি,বসন্তের কৃষ্ণচূড়া,বর্ষার কঁদম সবই তার প্রিয়।আর সে গোটা মানুষ টা আমার প্রিয়।

আসলে ঋতুর সঙ্গে সঙ্গে তার পছন্দের তালিকাও বদলায়,অথচ বদলায় না আমার অনুভূতি।
ঋতু বদলায়, ফুল ফোটে-ঝরে, ট্রেন ছুটে যায়…
কিন্তু আমার ভালোবাসা থেমে থাকে এক জায়গা,একজনে প্রতিই।যাকে হারিয়ে ফেলা অনিবার্য বিষয়। মন বলে সব কিছুর পিছনে ফেলে,তোয়াক্কা না করে লড়াই করি পরমুহূর্তেই মনে পড়ে আমি কি সত্যি স্বার্থপর হতে রাজি?
প্রহর জানালা থেকে চোখ ফেরালো। একটু পর তার স্টেশন আসবে। গন্তব্য শেষ হবে নেমে যাবে।পথের গন্তব্য শেষ হলেও কি তখনই এক আধ বুড়ো লোক সামনের সিটে বসা ছিলো জিজ্ঞেস করলো,

“কোন জায়গায় নামবে?
প্রহর মাথা উড়ালো।প্রথমে খেয়াল করেনি তাই আরেকবার জিজ্ঞেস করে উত্তর দিলো,
“জ্বী আমি বিরামপুর স্টেশনে নামবো।
“ওহ আচ্ছা। আমি নামবো একবারে দিনাজপুরে।
বিরানপুরের কোথাই তোমার বাসা?ওখানে আমার ভাইয়ের বাড়ি।
“বিরামপুর উপজেলা হলেও অনেকটা দূরের গ্রামে আমার বাড়…..
বলতে গিয়েও থামলো। তার কি আছে বাড়ি?
কোথাই তার বাড়ি? নিজ বাড়ি বলতে কি বুঝায়?তা কি আছে?

লোকটা অন্য মনস্ক হলো।আরেকজন কে জিজ্ঞেস করলো সে কোথাই নামবে? পার্বতীপুর স্টেশনে বললো। প্রহর শুনছে তাদের কথা।লোকটা তাকে আর কিছু জিজ্ঞেস করলো না। ট্রেন চললো নিজ গতিতে। প্রায় দশ মিনিট পর বিরামপুর স্টেশনে ট্রেন থামলো। সকাল আটটার ট্রেনে চড়েছিলো এখন চারটায় এসে নামিয়ে দিলো।প্রহর নিজের ব্যাগ নিয়ে নেমে পড়লো। নেমেই আশেপাশে তাকালো স্টেশনের একপাশে সান বাঁধানো সাইনবোর্ডে লেখা বিরামপুর স্টেশন। ময়লা জমে গেছে সাইনবোর্ডে। সেটা একটা ছেলে পরিষ্কার করছে।তখনই ফোন বেজে উঠলো। মনস্থির ভাঙলো। পকেট থেকে ফোন বাহির করে দেখলো পাভেল ফোন করেছে।

রিসিভ করতেই জানতে চাইলো পৌঁছালাম কিনা! আর বাড়ি গেলে যেন ফোন করে জানাই।পাভেল ছেলেটা বেশ ভালো, দায়িত্বশীল এবং কিছুটা তারই মতো। তবে তার বাবা মা আছে নেই শুধু সম্পদ আর টাকা পয়সার ছড়াছড়ি। মিল একদিক দিয়ে ভালোবাসার মানুষ কে না পাওয়ার অনিশ্চয়তা। তার বাবা মা ও অনেক ভালো। একবার গেছিলাম। পাভেলের বাড়ি টাঙ্গাইলের মধুপুরে। সেই গ্রামের সৌন্দর্য বর্ণনা করেও শেষ হবে না।আসিফ বড়লোক বাবার ছেলে তবে তার ব্যবহার নম্র,ভদ্র হাসিখুশি ও বটে তবে সে বাস্তবতা কম বুঝে কারণ সে বাস্তবতার পরিস্থিতিতে কখনো পড়েনি।তার বাড়ি কিশোরগঞ্জ সদরে।তার বাবা সেখানকার মেয়র।তাদের তিনজনের বন্ধুত্ব বেশ জমজমাট।সেই পাঁচ বছর থেকে একসাথে থাকছে তিনজনে।
ও বাড়ি থেকে কিছু সময় আগে পিয়াস ফোন করেছিলো। সে নিতে আসতে চাইলেও প্রহর মানা করে দেয়। নিজ গন্তব্যে একা চলাই ভালো।

কংক্রিটের রাস্তা অনেকেই পার করিয়ে দিতে পারে,জীবনের রাস্তা তো নিজেকেই পার করতে হবে।
প্রহর স্টেশন থেকে রিকশা করে আটো স্টানে এসে আটোতে উঠলো বাড়ির উদ্দেশ্যে। এখন খুব একটা গরম লাগছে না।গ্রামের দিকে যেতেই মন ফুরফুরে হলো,বাতাসে স্নিগ্ধতা খুঁজে পেলো।শহরের বিষাক্ত বাতাসে দম বন্ধ লাগে,গ্রামের আবহাওয়া মনকে বিকশিত করে তোলে। প্রায় সাত মাস পর আসলো গ্রামে। যদিও আসতো না মূলত এখন আসা পরশু তার মায়ের মৃত্যুবার্ষিকী।বাড়ি থেকে ফোন দিয়ে আসতে বসেছে সেদিন মিলাদের আয়োজন করা হবে।
আটো থেকে নামতেই বাজারে সোলায়মান দেওয়ানের সঙ্গে দেখা। তিনি প্রহর কে দেখেই হেঁসে ফেললো। প্রহর জিজ্ঞেস করলো,

“কেমন আছেন মামা?
“ভালো আছি বাবা। তুই কেমন আছিস?তোর মামিমা তোর অপেক্ষায় আছে।দেখ আমারো বাজারে পাঠিয়েছে তোর পছন্দের সব জিনিস নিতে।
প্রহর জবাব দিয়ে হাঁসলো।মানুষটা তাকে কত ভালোবাসে। নানীর পরে ভালোবাসা মামি মার থেকে পেয়েছি। মা কি তার বুঝার আগেই তো হারিয়ে ফেলেছি। আর বাবা?এই শব্দটি তার কাছে সবচেয়ে বেশি ঘৃণিত।সব মিলিয়ে আমার জীবনটা রাতের আকাশের মতো,চারদিকে শুধু আঁধার আর আঁধার।জোছনার দেখা কভু নেই,চাঁদ তার আলোয় নাহি কুলায়।শুকতারা জ্বলে অন্য আকাশে,আমার আকাশে শুধু অন্ধকার রাজত্ব করে।

“আয় বাইকে উঠ বাড়ি যাই।
প্রহর ভাবনা থেকে বেরোলো।সোলায়মান দেওয়ানের বাইকে চড়ে বসলো। জমিতে ধান বোনা আছে।দুইপাশে সবুজ ধানক্ষেত, গ্রামের সরু কাঁচা রাস্তার পথ। কি যে অনুভূতি। যে গ্রামে বসবাস করে সেই বুঝে।শহরে গেলে কাঁচা মাটির গন্ধ, ঝি ঝি পোকার ডাক,রাত্রি হলে তাড়াতাড়ি ঘুমানোর হাক সবই মিস করে।
অবশেষে বাড়ি পৌঁছালো। বাইক থেকে নামতেই প্রিয় মুখখানা নজরে পড়লো। কি মায়াবী সে চোখের মনি।যাকে মনে পড়লেই উতলা হয়ে যায় হৃদয়ের মধ্যখানি।তীব্র অনুভূতিরা বাঁধ ভাঙতে চায় দেখলে তার মুখখানা। কিন্তু….
“তোমাকে ভালোবাসি বলতে ভয় হয়,কারণ,
হারিয়ে ফেলা অনিবার্য বিষয়।”

মিথি, রিতি,শার্লিন আরো একজন মিলে বসে কড়ি খেলছিলো।মিথি পথের মুখে হয়ে বসে ছিলো বিধায় তার হাঁসি মাখা মুখটা আগে নজরে পড়লো।সেদিকে চেয়েই কথাটা বলে উঠলো।শার্লিন খেলার মাঝে হঠাৎ প্রহর কে দেখতে পেলো। আজ আসার কথা শুনেছিলো। সে মিথিকে সামনে দেখতে বলল,
“দেখ মিথি প্রহর ভাই এসেছে।
মিথি সঙ্গে সঙ্গে তাকালো।মানুষটা তার দিকে চেয়ে ছিলো বোধ-হয়। কিন্তু সে তাকাতেই চোখ ফিরিয়ে নিলো। প্রহর ভাই কে তার কিছু প্রশ্ন করার আছে।
যদিও সেসব স্বাভাবিক চুড়ি হয়তো পছন্দ শুনেছিলো তাই দিয়েছে, আর চিরকুট তো প্রেমের নয় সাধারণই ছিলো কিন্তু ডাইরির পাতায় লেখা লাইন গুলো কার জন্য ছিলো?কেন জানি লাইনগুলো পড়লে নিজস্ব মনে হয়। তাকে জানতে হবে।এতো দুঃখ কার জন্য?সম্ভব হলে সেই মেয়েকে এনে দিবো। কিন্তু বলতে তো হবে। প্রহর ভাই কি আমাকে বলবে?

“মিথি আপা তোমার দান এসেছে খেলো।
রিতির কথায় ভাবনা থেকে বেরোলো। হাতের পিঠে কড়ি নিয়ে খেলা শুরু করলো। প্রহর ততক্ষণে বাড়ির ভেতরে চলে গেলো।বাড়িতে প্রবেশ করতেই অরুণা আর সানিয়ার সাথে দেখা।যাদের কাছে অপছন্দের তাদের সামনে পড়তে হলো?এখনে নানি কিংবা মামি মাও থাকতে পারতো।
তার মনের কথা হয়তো শুনলো। তখনই লাঠি হাতে হাজির হলো সায়েদা বানু।প্রহর কে দেখে আনন্দিত হলো।প্রহর গিয়ে জড়িয়ে ধরলো নানী’কে। পিয়াস তখন উপর থেকে নিচে নামলো। তাদের ভালোবাসা দেখে কেউ হাঁসলো কেউবা মুখ বাঁকালো।
সায়েদা বানু নাতীকে ছেড়ে দিলো।
অভিমান করে বলল,
“মুই যে কল পাড়ে পইড়া গেছিনু পায়ে ব্যথা পানু একবারো দেখবার আইলি না।
প্রহর কিছু বুঝলো না। লাঠিটা কেবল খেয়াল করলো। তাকে তো কেউ বলেনি এই ব্যাপারে।সামনে পিয়াসের দিকে তাকিয়ে বলল,

“কই কেউ তো আমায় বলেনি।
“দাদু বলতে মানা করেছিলো তাই বলিনি। কারণ তখন তোর পরীক্ষা চলছিলো। দাদির অসুস্থতার কথা শুনলে পরীক্ষার প্রভাব পড়তো এজন্য দাদু মানা করেছিলো।
প্রহর থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে রইলো। সায়েদা বানু এই বিষয়ে জানতো না। এখন মনে মনে বলছে ইসস বলে ভুল করনু। তাই হাঁসি মুখে এবার প্রহর কে টেনে নিয়ে যেতে যেতে বলল,
“এখন আইছোস এতেই খুশি। মাঝে মধ্যে আসবি বুড়িটারে দেখতে। আর বাঁচমু বা কয়দিন?, মই*রা গেলে তখন আর আসিস না।

প্রথম থমকে দাঁড়ালো। নিজেকে প্রশ্ন করলো।
আসলেই আমি কেন আসিনা?সে আমার না পাওয়া প্রিয়জন, তাকে দেখলে কষ্ট বাড়বে বলে।
অথচ তারা আমার প্রিয়জন,ভালোবেসে আগলে রেখে মানুষ করেছে। এই যে আসিনা তাদের অপেক্ষা করাই এ কি অন্যায় নয়?
মায়ের দায়িত্ব পালন করা মানুষটার আমার কাছে এতটুকু অবদার অবান্তর কিছু নয়। মনে মনে স্থির করলো ভালোবাসা দায়িত্ব পালন করবে। তার আগে নিজেকে মানাবে ‘ চাঁদ বলো আর শুকতারা কোনোটাই পায় না দূর্ভাগারা।

মিথির রোজকার অভ্যাস হলো তার প্রিয় পুকুর পাড়ে গিয়ে সূর্যাস্ত দেখা। সূর্য অস্ত যাওয়ার আগের মুহূর্তটা যে কি সুন্দর তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। পুরো আকাশ লালচে কমলা রঙের মতো ধারন করে আকাশকের সৌন্দর্য বাড়ায়। পুকুরটা অনেকটাই বড়।চারপাশে দূরত্বে গাছ লাগানো আছে।মিথি অন্যদিন রিতিকে সঙ্গে নিয়ে আসে কিন্তু আজ একা আসলো। তখন সবে পশ্চিম আকাশের রঙ লালচে-সোনালি বর্ণ ধারণ করতে শুরু করেছে। সূর্য হেলে যাচ্ছে পশ্চিম আকাশে।
মিথি গিয়ে বসলো। চোখ পড়লো পুকুরের অপর পাড়ে মানে পশ্চিম দিকে প্রহর আর রুহেল দাঁড়িয়ে।দুজনে কি যেন কথা বলছে। রুহেল মিথি কে দেখেই বলে উঠলো,
“এই যে এসেছে গোধূলি পাগলী।প্রতিদিন যে কি পায় সূর্যাস্ত দেখে কে জানে। প্রহর রুহেলের কথা শুনে তাকালো।মিথি রাগি চোখে রুহেলের দিকে তাকিয়ে আছে। রুহেল মিথির রাগ দেখে হেঁসে গড়াগড়ি খেতে খেতে প্রহর কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“প্রহর ভাই আমরা বরং মিথিকে কাফেলা পাগলার সঙ্গে বিয়ে দেই। ভালো হবে না বলো? সে কিন্তু মিথির মতো গান গায় তবে সে গান শোনার মতো নয়।দুই পাগল আর পাগলির সংসার কিন্তু সেই হবে। এবার কাফেলা পাগলা আসলেই বড় আব্বা কে বলবো।
“তোমারে বিয়ে ওই যে ছমিরণ পাগলী আছে তার সাথে। তার বাড়ি আবার অনিমার বাড়ির কাছেই জানো তো?
মিথির দাঁত চেপে বলা উত্তরে রুহেল চুপ করে গেলো। ধীরে বলল,
“বুঝলেন প্রহর ভাই সবাই শুধু ভালোবাসার মানুষ কে সরিয়ে দেওয়ার ভয় দেখায়। কেন মানুষ ভালোবাসার মানুষের নাম নিতেই নরম হয়ে যায়?
প্রহর পুকুর পাড় থেকে আসতে আসতে উত্তর দিলো,

“হারানোর ভয় পাই বলেই মানুষ ভয় দেখায়।
প্রিয় মানুষের নামের মাঝেও এক ধরনের মায়া থাকে,নাম শুনলেই হৃদয় থমকে যায়,শীতল অনুভূতি হয়।
মানুষ জানে ভালোবাসা কিংবা ভালোলাগার মানুষের কাছে সবাই দূর্বল তাই তো মানুষ দূর্বল জায়গায় আঘাত করে।
তবে তুই কার নামে দূর্বল হলি?
প্রহর এগিয়ে যাচ্ছে। রুহেল ও যাচ্ছিলো তবে প্রহরের কথায় থেমে গেলো।ভাবলো বলবে কিনা।তখনই প্রহর হেসে বলল,

“দূর্বলাকে বেশিদিন বাহিরে রাখলে হারানোর ভয় থাকে।যদি দূর্বলতাকে সঙ্গী করে ভালোবাসায় রূপান্তর করতে চাও,তবে সময় না নিয়ে তাকে নিজের করে নাও।
“কিন্তু প্রহর ভাই অনিমার মনে হয় পছন্দ করে কিন্তু ওই মিথির বাচ্চার জন্য রাজি হতে চায় না। শয়তান টা সারাক্ষণ আমার নামে বদনাম করে।
রুহেলের ছেলেমানুষী কথায় প্রহরের ঠোঁটে আলতো হাঁসি দেখা গেলো। রুহের তাকিয়ে দেখছে আর ভাবছে হাঁসছে কেন?
“সে তোর ছোট।তুই তার বড় হয়েও মজা করিস। সম্পর্কটা ওর সাথে ওমন তাই ও ওসব মজা করে বলে। বাস্তবে সেও তোর ভালো চায়। সামনে যা বলে তা সত্যি নাও হতে পারে। এসব প্রেম নাকি খনিকের মোহ তা আগে জানতে হবে। প্রেমে পড়া খারাপ না কিন্তু প্রেম বেশিদিন টিকে না। ভালো লাগলে কিংবা ভালোবাসলে ঘরো তুলতে হবে সময় থাকবে। তোর তো তেমন পরিস্থিতি আছে। হতভাগা তো কেবল আমি।
শেষের কথাটুকু শুনে রুহেল না বুঝতে পেরে জিজ্ঞেস করলো,

“তুমি হতভাগা কেন প্রহর ভাই?কাউকে ভালোবাসো?
প্রহর চলতে থাকলো।গ্রামের মধ্যে দিয়ে আসছে শমসের দেওয়ান। তার দিকে চেয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে উত্তর দিলো,
“ভালোবাসা মরণব্যাধির মতো,
না চাইতেও মনে বাসা বাঁধে।
এতটুকু বলেই প্রহর গমগমিয়ে চলে গেলো। রুহেল স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।ভাবছে প্রহরের মনে কে আছে?খোলসা করেও তো বললো না। ধূর এতো ভেবে কাজ কি?নিজের পিরিত নিয়ে বাঁচিনা অন্যের কথা নিয়ে মাথা ব্যথা করে ব্রেন কমাতে চাইনা।
প্রহর শমসের দেওয়ানের কাছে গেলো। তিনি এক লোকের সাথে কথা বলছিলেন। প্রহর কে দেখে সেই লোক জিজ্ঞেস করলো,

“কখন আসলি?কাশেম বাড়িত আইছে দেখা করে আসিস।
“কবে এসেছে?থাকবে নাকি চলে যাবে?
“অফিসে নাকি ছুটি দেয় না। বুঝো তো বেসরকারি অফিস। কাল পরশু চলে যাবে।
“ঠিক আছে কাল সকালে যাবো একবার। লোকটা চলে গেলো। কাশেম প্রহরের স্কুল জীবনের বন্ধু মামে একসাথে পড়তো। স্কুল শেষ করে আর পড়েনি। অভাবে গেলো শহরে চাকরি করতে।
অভাব বড় যন্ত্রণার। এই অভাব কত কিছু কেড়ে নেয়। কারো বাড়ি ফেরা,কারো প্রিয় মানুষ, কারো বা হাসিখুশি জীবন।

“সব আয়োজন শেষ। আর যা বাকি আছে সব কাল করতে হবে।তোর কিছু করার ইচ্ছে থাকলে বলিস।
নানার কথায় প্রহর বলল,
“আমার টিউশনির টাকা জমা আছে কিছু তার মধ্যে থেকে সব খচর করবো।যতটুকু পারি করবো।
বেশি কিছু করার প্রয়োজন নেই।
শমসের দেওয়ান দ্বিমত করলো না।প্রহর মানিব্যাগ থেকে কয়েকটা হাজার টাকার নোট শমসের দেওয়ানের হাতে দিলো।বলল,
“তোমার দেওয়া জমি থেকে যে অর্থ আসে আর টিউশনি করে যা পাই সব মিলিয়ে কিছু করে টাকা থেকে যেত তার মধ্যে এখানে কিছু আছে। এগুলো দিয়ে যা হবে তাই। সামর্থ্য অনুযায়ী করা উচিত। মায়ের ছেলের এর চেয়ে বেশি কিছু নেই।
শমসের দেওয়ান হঠাৎ জিজ্ঞেস করলো,

“মিথি কে নিয়ে তোর কোনো আশা আকাঙ্ক্ষা আছে?
প্রহর থমকে দাঁড়ালো।হঠাৎ এমন প্রশ্নে সে ভাবান্তরিত হলো।এমন প্রশ্ন করার কথা তো নয় তবে হঠাৎ কেন?
“এমন প্রশ্ন কেন?
“মিথিকে নিয়ে মানিক আর সোলাইমান কিছু ভেবেছে।যদিও আগে থেকে ভেবে রাখা।
ছোটবেলায় তোর সাথে নিয়ে মজা করতো সবাই তাই জিজ্ঞেস করলাম।জানি তুই সেসব ধরিসনা।
প্রহর পুকুর পাড়ে মিথির দিকে এক পলক তাকালো। ঠোঁটের কোনো শুষ্ক হাঁসির রেখা টেনে মনে মনে বলল,
“যে অনুভূতি মুখে বলার কারণে সে জানতে পারেনি,

সেখানে আর কেউ অনুভূতি বুঝতে পারবে এ আশাও করিনি।
প্রহর কে মোহনিয়া বেগম ডেকে এনেছে।রাতে রান্না করেছে শীদল। প্রহরের পছন্দের তাই খেতে নিয়ে এসেছে। প্রহর আসতে চায়নি তার পর একটা কথা শুনে সে আসলো। মিথি ঘরে বসে ছিলো মোহনিয়া বেগমের ডাকে ঘর থেকে বাহির হলো।বারান্দায় তার মা আর প্রহর দাঁড়িয়ে আছে।মিথি প্রহরের মুখের দিকে তাকালে।প্রহরের দৃষ্টি মেঝেতে নিবন্ধ।
মানিক সাহেব আজ শশুড় বাড়ি গেছে দাওয়াত খেতে।মিথিকে যেতে বললেও সে যায়নি।

“মিথি বিছানা পাত তো। আমি পানি নিয়ে আসছি তুই খেতে দে।
এতটুকু বলেই মোহনিয়া বেগম জগ নিয়ে কলপাড়ে গেলো।মিথি বিছানা বিছিয়ে দিতেই প্রহর বসে পড়লো।মোহনিয়া বেগম ও ততক্ষণে পানি নিয়ে এসে পড়লো। খাওয়ার মাঝে মোহনিয়া বেগম আর প্রহর অনেক কথাই বলছে।মিথি চুপচাপ আছে।
প্রহর একবার ও তাকালে না। মিথি যখন পানি খেতে ব্যস্ত তখন সে তাকালো। যা মিথির দৃষ্টিগোচর হলো না।খাওয়া শেষে রান্নার প্রশংসা করলো।মোহনিয়া বেগম শাশুড়ী কে ভাত দিয়েছেন ওই বাড়িতে। সেখানে প্লেট আনতে গেলো। রয়ে গেলো কেবল মিথি আর প্রহর। নিস্তব্ধ নিরবতা চলছে।
প্রহর বুঝলো এখানে থাকা যাবে না। সে না তাকিয়ে চলে যেতে নিলো।তবে সে কি আর যেতে পারলো?

“প্রহর ভাই সেদিন জানালায় চুরি আর চিরকুট আপনি রেখেছিলেন?
প্রহরের পা জোড়া থেমে গেলো। হৃদয়ে দোলা দিলো অথৈ প্রেমের গল্প। সে তাকিয়ে আর থাকতে পারলো না। আঙ্গিনা থেকে সোজা হয়ে ঘুরে চোখ রাখলো বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা মিথির উপর। যে উত্তরের আশায় চাতক পাখির ন্যায় তাকিয়ে আছে।এতো আকুলতা যদি তার জন্য হতো তবে কি মন্দ হতো?
“হ্যাঁ দিয়েছিলাম।
“কেন দিয়েছিলেন?মন খারাপ দেখে?
প্রহর হেঁসে জবাব দিলো,
“হ্যাঁ তাই। মন খারাপে তোকে মানায় না তাই।
মিথি দৌঁড়ে ঘর থেকে সে ডাইরিটা আনলো। প্রহরের কাছে এসে সেই শেষ পৃষ্ঠাটা বাহির করে সামনে ধরলো। জিজ্ঞেস করলো,

“এটা কার জন্য লিখেছেন প্রহর ভাই?
মিথির প্রবল আগ্রহে এবার ও জল ঢেলে দিলো। বলল,
“কিছু প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যায় না মিথি।কিছু উত্তর খুঁজে নিতে হয়। তবে এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যাস না।উত্তর মিললেও সে উত্তর ভালো নয় বরং খারাপ কিছু বয়ে আনবে।
“জীবনে কে আছে একবার বলে দেখুন।আপনার এমন জীবন মোটেও পাপ্য নয়। আমি চেষ্টা করতে পারি তাকে এনে দেওয়ার।
প্রহর এগিয়ে গেলো।এবার আর থামলো না। দরজার কাছে গিয়ে কেবল একটা কথাই বলল,

মন পিঞ্জিরা পর্ব ১০

“ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন ‘মানুষ যা চায় তা পায় না। তার কথাটা মিথ্যে নয় তাই তো আমিও তাকে পাবো না।
মিথির ভাবনা নড়ে গেলো। মনে অন্য কিছু আসলেও তা প্রহরের উত্তরে মিথ্যে প্রমানিত হলো।
প্রহর বাড়ি থেকে বেরিয়ে আকাশের দিকে তাকালো।জোছনা রাতে আকাশে আধখানা চাঁদ দেখা দিচ্ছে। তখনই একটা জোনাক পোকা কোথা থেকে যেন উড়ে এলো। প্রহর সেদিকে তাকিয়ে হাঁসলো।আজকাল গ্রামেও জোনাকি আর দেখা যায়।অথচ আগে কত দেখতে পেতাম। না বুঝে পা দিয়ে মাড়িয়ে দিলাম। মাটিতে মিশেও জ্বলতো বলে।সবশেষে বাড়ির পথে যেতে যেতে একবার মিথিদের বাড়ির দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
“জীবনে দুঃখ পেলাম,কষ্ট পেলাম,আনন্দ ও পেলাম সামান্য,কেবল পাইলাম না তোমার ভালোবাসার অধিপত্য।”

মন পিঞ্জিরা পর্ব ১৩+১৪