মহামায়া পর্ব ১৫
তুশকন্যা
বেশ বেলা করেই কেনীথের ঘুম ভাঙ্গল। সে আড়মোড়া ভেঙে ঘুম থেকে উঠে দেখে,প্রায় সাড়ে এগারোটা বাজে। নিজের দিকে তাকিয়ে তার কপাল খানিক কুঁচকে যায়। কি একটা তোয়ালে পেঁচিয়ে শুয়েছিল। এখন তা প্রায় খুলতে বসেছে। কেনীথ খানিক বিরক্ত মনেই,নিজেকে কিছুটা ঠিকঠাক করে উঠে দাঁড়ায়। নিমিষেই মাথাটা কিছুক্ষণের জন্য ঝিম ধরে থাকে। স্বাভাবিক হতেই সে ওয়াশরুমে ফ্রেশ হতে চলে যায়।
কালো টিশার্ট-প্যান্ট পড়ে কেনীথ রুমের বাহিরে এলো। গতকালের বিষয়গুলো আপাতত মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলেছে। তবে তার এখনো একটা বিষয়ে জানা হয়নি। রাতে পাভেল ফোন করে বলল,তারেক এহসান নাকি শয়তানি করছে আর তাতে তার বাবাও পাগলামি করছে। অবশ্য বাড়িতে ফিরে,ভাহিদকে নানান কাগজপত্র নিয়ে কাজ করতে দেখেছে। কিন্তু আদতে ঘটনা কি, তাই তো শোনা হয়নি।
কেনীথ নিচে এসে দেখে সকলেই বাড়ির ড্রইং রুমে একত্রে বসে আছে। সবাই টিভিতে কিছু একটা দেখছে। কেনীথ তার বাবাকে খুঁজছিল। তাকে তার প্রয়োজনীয় কিছু বলার ছিল। যেহেতু সিন্ধান্ত নিয়েই ফেলেছে, কাল-পরশুর মধ্যেই ইউরোপে ফিরে যাবে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
কিন্তু আশেপাশে কোথাও ভাহিদের হদিশ না পেয়ে,কেনীথের কপাল খানিক কুঁচকে যায়। এরিমধ্য তার নজর পড়ে টিভিতে। সেখানে নিউজ প্রেজেন্টারের বলা কিছু কথাই যেন,তাকে থমকে দেয়।
‘দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিকভাবে নানা বিতর্কে জড়িত থাকার পর, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ভাহিদ এহসান আজ হঠাৎ পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, মেয়র তার পদত্যাগপত্র লিখিতভাবে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছেন।
রাজনৈতিক মহলের বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, পদত্যাগের পেছনে কিছু অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও পরিবার সংক্রান্ত খবরের প্রভাব থাকতে পারে।যেমনটা কিছুদিন পূর্বেই, বানিজ্য মন্ত্রী তারেক এহসানের মেয়ের বিয়েতে তাকে জোরপূর্বক কেউ বা কারা তুলে নিয়ে গেলে,তার সম্পূর্ণ দায় তারেক এহসান দিয়েছিলেন—চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ভাহিদ এহসানের ছেলে ভিভিয়ান এহসানকে। এবং এই ঘটনায় বেশ আলোড়নও সৃষ্টি হয়। যদিও এর পরবর্তী ঘটনা এখনো স্পষ্ট নয় কিংবা অফিসিয়াল সূত্র থেকে আর কোনো নিশ্চিত বিবৃতিও মেলেনি।
একইসাথে মেয়র ভাহির এহসানের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগের কোনো কারণও জানানো হয়নি।পদত্যাগ কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকার নির্বাচন কমিশনকে জানাবে, এবং নতুন মেয়র নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হবে…”
সবটা স্তব্ধ হয়ে শোনার পর, কেনীথ ভ্রুকুটি করে বিস্ময়ের সাথে বলে ওঠে,
“এসবের মানে কি?”
নিজের পাশে কেনীথকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে,কাশফিয়া তাকে একপলক দেখে নিয়ে ভারী শ্বাস ফেলে। পাপড়ির দিকে মুখ ফিরিয়ে বলে,
“পাপড়ি,যাও গিয়ে তোমার ভাইজানের জন্য খাবার বেড়ে দাও। যথেষ্ট বেলা হয়েছে।”
কাশফিয়ার এমন অভিব্যক্তিতে কেনীথের ভ্রু-জোড়া বেশ খানিক কুঁচকে যায়। সে পরখ করে দেখে মায়ের বিষন্ন মুখখানা। সম্পূর্ণ জ্যান্ত মূর্তির ন্যায় তার ভাবভঙ্গি। একইসাথে বাকিদেরও খেয়াল করতেই দেখে,নূরজাহান মুখে আঁচল টেনে নিঃশব্দে কাঁদছে। রোজ কিংবা পাপড়িও একদমই মনমরা হয়ে বসে আছে।
কেনীথ এবার খানিক জোর গলায় বলে ওঠে,
“এসব হচ্ছেটা কি? এই নিউজ প্রেজেন্টার এসব কি বলছে? বাবা আচমকা পদত্যাগ…”
—“যা শুনছো তাই সত্য। তারেক যা চেয়েছিলো, তুমি তারই ব্যবস্তা করে দিয়েছো।”
কেনীথ স্তব্ধ হয়ে কাশফিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। কাশফিয়াও জোর গলায়, নিরেট স্বরে বলতে লাগল,
“আমার আর কিচ্ছু বলার নেই। সত্যি বলছি। খুব অসহায় লাগে আমার, জানো তো! আমি তিক্ত এসব দেখে দেখে। এই জীবনে শান্তির দেখা হয়তো আর পাবো না।”
—“কিন্তু…হঠাৎ এমন কি হলো যে বাবা সোজা এই ডিসিশন নিয়েছে? ঐসব ঘটনার সাথে এসবের কি সম্পর্ক?”
—“তুমি তো বাড়ি ফিরেই ঘুমিয়ে গিয়েছিলে,তাই হয়তো জানো না। আবার ঘটনাস্থল থেকেও নাকি আগে আগেই চলে এসেছো। যাই হোক,সবশেষে তারেক তোমার বাবাকে একটা প্রস্তাব দিয়েছিলো। সে যেন রাজনীতি ছেড়ে দেয়। এবং সর্বপ্রথম পদত্যাগটাই করে নেয়।”
—“সিরিয়াসলি! উনি বললো আর বাবা তাই মেনে নিলো?”
কেনীথের বিস্ময়ের অভিব্যক্তিতে, কাশফিয়া আচমকা উঠে দাঁড়ায়। তার মুখোমুখি হয়ে, খানিক মলিন হেসে বলল,
“তোমার বাবা সম্মান-মর্যাদা…এসবের প্রচন্ড কদর করে। তার জীবনের সবকিছুর উর্ধ্বে যেন কেবল এসবই ছিলো। কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত, সে বারবারই এসব হতে বিচ্ছিন্ন হয়েছে। নিজের অর্জিত মান-মর্যাদা প্রতিবার এক নিমিষেই দুমড়েমুচড়ে গিয়েছে।
তারেক বলেছে, যদি পদত্যাগ না করে,রাজনীতি হতে চিরতরে না সরে,তবে এই সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো নিয়ে সে নানান তামাশা করবে। দেশজুড়ে তোমার বাবার বদনাম ছড়াবে। কারণ তার কাছে এখন যথেষ্ট প্রমাণ আছে। তার কথা না শুনলে,গতরাতে ঘটে যাওয়া রেকর্ডেড সবটাই সে মিডিয়াতে ছড়িয়ে দেবে। আর ওখানে তুমি কি করেছো না করেছো,তা তো আমার চেয়ে ভালো তুমিই জানো।”
কাশফিয়া নিজের কথার সমাপ্তি ঘটিয়ে,মলিন হাসে। পরক্ষণেই দৃঢ় পায়ে ভেতরের দিকে হেঁটে যেতে যেতে, পেছনে রয়ে যাওয়া পাপড়ির উদ্দেশ্যে আবারও বলে,
“পাপড়ি! তোমার ভাইজানকে খাবারটা দিয়ে দিও। সময়ের খাবার সময়মতো না খেলে,পেটে পীড়া পড়ে যায়।”
বিকেল হয়ে এসেছে। আনায়া বারান্দায় স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। তার সাথে সাথে যেন,ছোট্ট বানিটাও আজ স্তব্ধ। বিষন্ন আনায়ার কোলে,গুটিয়ে বসে আছে সে।
মিডিয়ায় কি ঘটছে তা আনায়া শুনেছে। এখন সে সম্পূর্ণই হতভম্ব। তার বিশ্বাস হয়ে গিয়েছে,তার মিথ্যে স্বীকারোক্তি ও তার বাবার ষড়যন্ত্রের কারণেই ঐ লোকটার বাবাকে পদত্যাগ করতে হচ্ছে। আর ঐদিকে তার বাবা এই খবরে খুশিতে যেন আত্মহারা। নিজের প্রতি অদ্ভুত এক ঘৃণা জন্মেছে তার। নাহ্,সে তাদের কাউকেই চেনে না।কিন্তু, তার বাবা যে সত্যিই এমন এক মন-মানসিকতার একজন মানুষ, তা কখনো কল্পনা করেনি সে।
আনায়ার একাকিত্বের মাঝেই,হঠাৎ রুমে কারো আগমন ঘটে। তবে আনায়া পায়ের আওয়াজ শুনতে পেয়েও, আর বারান্দা হতে বেরিয়ে এলো না। ইচ্ছে নেই তার। মনটা প্রচন্ড বিষিয়ে আছে।
এরিমধ্যে ইনায়া বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। আনায়ার পাশেই বেতের সিঙ্গেল সোফাটায় আলগোছে বসে পড়ে। আনমনে হারানো আনায়াকে পরখ করে আওড়ায়,
“তুই ঠিক আছিস, আপু?”
আনায়া সামান্য চমকে, ইনায়ার দিকে ফিরে তাকায়। তাকে একপলক দেখে নিয়ে,পুনরায় মুখ ফিরিয়ে নেয়।
—“কিছু বলার থাকলে বলতে পারিস। নয়তো চলে যা৷ আমি একা থাকতে চাই।”
হঠাৎ আনায়ার এমন রুক্ষ ব্যবহারে ইনায়া বেশ অবাক হলো। আনায়া তো এমন নয়!…নিমিষেই সে ভ্রুকুটি করে আওড়ায়,
“তোকে একটা বিষয়ে জানানোর ছিলো।”
—“ঐ ভাহিদ এহসানের বিষয়ে? শুনেছি আমি, উনি বাবার শত্রু কিনা জানিনা। কিন্তু বাবা যদি এসবের পেছনে থেকে থাকে,তবে আমি এতে মোটেও খুশি না।”
ইনায়ার ভ্রু-দ্বয় পুনরায় কুঁচকে যায়। সে চোখজোড়া খানিক ছোট ছোট করে আওড়ায়,
“তুই কেনো খুশি না? তুই তো জানিস, ঐ লোকটা বাবাকে কত ডিস্টার্ব করছে। বাবা তিক্ত ছিল ওনার উপর।”
—“দেখ আমি এই বিষয়ে কিছু বলতে চাচ্ছি না। অন্যকিছু বলার হলে বল,নয়তো এখান থেকে চলে যা।”
—“তোর কি হয়েছে বলতো?”
—“জানি না।”
ইনায়া ভারী শ্বাস ফেলে,ভ্রু উঁচিয়ে বলে,
“ঠিক আছে,এমনিতেও আমি অন্য বিষয়ে কথা বলতে এসেছি।…মামা ফোন করেছিল। তোর আর রেহান ভাইয়ার বিয়ের বিষয়ে বাবার সাথে কথা বলেছে।”
আনায়া চুপ করে বসে থাকে। আশেপাশে কোনোদিকে ফিরে তাকায় না৷ তার নজর বারান্দার বেলীফুলের গাছটার দিকে। তার প্রিয় ফুলের গাছটা সে ঐ বাড়িতেও দেখেছিল। ঐ গম্ভীরমুখো পেঁচা রেডের বারান্দায়।
এদিকে ইনায়া আবারও বলে ওঠে,
“মামী চাচ্ছে না, তোর আর রেহান ভাইয়ার বিয়েটা হোক। জানি না, হঠাৎ নিজেদের মাঝে কি হলো। তবে মামী অদ্ভুত সব মন্তব্য রাখছে। তার মতে যে মেয়েকে বিয়ের আসর থেকে কেউ তুলে নিয়ে যায়, সেই মেয়ের সাথে তারা তাদের ছেলের বিয়ে দেবে না। এইসব নিয়ে বাবার সাথে মামা-মামীর বেশ রাগারাগিও হয়েছে। বাবা এখন মায়ের সাথে রাগারাগি করছে।”
সবটা শুনে আনায়া বেশ অবাক হলো। সে মুখ ফিরিয়ে ভ্রুকুটি করে আওড়ায়,
“মামা-মামী নিজেরাই এসব বলেছে?”
ইনায়া নির্বিকার ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকায়। আনায়া পুনরায় নজর সম্মূখে নিয়ে কিছু একটা ভাবতে লাগল। পরক্ষণেই সে বেশ রুক্ষ স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“রেহান ভাই কি বলেছে? সে-ও কি… ”
—“না,যতদূর শুনেছি ভাইয়া এই নিয়ে মামা-মামীর সাথে বেশ ঝামেলা করেছে। তার মতে, সে তোকে এখনও বিয়ে করতে একপায়ে রাজি। কিন্তু মামা-মামী কোনোমতেই মানছে না। তারা নাকি ভাইয়াকে হুমকি দিয়েছে,যদি সে তাদের কথার বিরুদ্ধে গিয়ে কিছু করে—তবে তাকে ছেলে হিসেবে তেজ্য করে দিবে। আর এই দেশে কখনোই আর থাকতে দিবে না।”
আনায়া ভারী শ্বাস ফেলে,মাথা নুইয়ে বানিকে একপলক দেখে নিয়ে কোনো এক গভীর ভাবনায় ডুবে যায়। প্রায় বেশ কিছুক্ষণ পর, সে আচমকা উঠে দাঁড়ায়। বানিকে বারান্দায় রেখেই,সে বেরিয়ে যেতে পা বাড়ায়। তৎক্ষনাৎ পেছন থেকে ইনায়া বলে ওঠে,
“কোথায় যাচ্ছিস।”
আনায়া নির্লিপ্ত স্বরে জবাব দেয়,
“বাবার সাথে কথা বলতে।”
—“দেখ, তুই প্যানিক করিস না। বাবা তোর জন্য, একটা না একটা বেস্ট ডিসিশন নিয়েই নেবে।”
এই পর্যায়ে ইনায়াকে একপ্রকার চমকে দিয়ে,আমায়া পেছন ফিরে তীক্ষ্ণ স্বরে বলে ওঠে,
“অনেক হয়েছে,বাচ্চা নই আমি। আমার লাইফের ডিসিশন, একমাত্র আমিই নেব।”
আচমকা আনায়ার এমন বিহেভিয়ারে ইনায়া প্রচন্ড অবাক। এ কোন আনায়াকে দেখছে। এর হঠাৎ হলোটা কি? সবকিছু সুবিধার ঠেকছে না বিধায়,আনায়ার পেছন পেছন সেও বেরিয়ে যায়।
—“ওদের সাহস কি করে হয় আমার মেয়েকে নিয়ে ওমন বাজে মন্তব্য করার? কোন সাহসে ওসব কথা বলে? আমি পাপ করেছিলাম যে—ওদের সাথে সম্মন্ধ করতে গিয়েছি। ওরা আমার মেয়েকে কি নেবে না, আমিই আমার মেয়েকে ওই বাড়িতে বিয়ে দেবো না। কোনোদিনও না। অনিমা! একটা কথা স্পষ্ট করে বলে দিচ্ছি,আজকের পর যদি দেখেছি তুমি তোমার ভাইয়ের বাড়ির সাথে আর কোনো যোগাযোগ রেখেছো—তবে দেখে নিও,সেদিনই তোমার আমার সম্পর্কের শেষ দিন।”
তারেকের ক্ষিপ্ততায় অনিমা দিশেহারা। কি বলবে সে? তবে হ্যাঁ,আনায়ার সম্পর্কে উল্টোপাল্টা মন্তব্য সে নিজেও কখনো সহ্য করতে পারবে না। তাই নিজের ভাই-ভাবীর প্রতি তারও প্রচন্ড অভিমান জমেছে। কেননা রেগে যাওয়ার মতো স্বভাব হয়তো অনিমার মাঝে নেই।
এদিকে তারেক পুনরায় বলে উঠল,
“আমার মেয়ের সাথে সম্মন্ধ ভেঙ্গেছে না! ঠিক আছে,দিলাম না ওই বাড়ির ছেলের সাথে আমার মেয়ের বিয়ে। আমিও দেখিয়ে দেবো…আগামী এক সপ্তাহের মাঝে, আমি যদি আমার মেয়ের বিয়ে, ওর চেয়েও ভালো ঘরে দিতে না পেরেছি—তবে আমিও তারেক এহসান নই!”
—“নাহ্,এসবের আর কোনো প্রয়োজন নেই।”
তারেকের কথা শেষ হতে না হতেই, হঠাৎ ড্রইং রুমে আনায়ার আগমন ঘটে। তারেক আর অনিমা সোফাতেই বসে ছিলো।তবে আচমকা আনায়ার কথা শুনে,তারেকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তার দিকে নিক্ষিপ্ত হলো। সে বেশ ক্ষিপ্ত স্বরে বলে ওঠে,
“তুমি এখানে কি করছো? দেখছো না গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা হচ্ছে। যাও নিজের ঘরে যাও।”
আনায়া এক পা-ও নড়ে না। বরং তাদের দুজনকে বেশ চমকে দিয়ে, অকস্মাৎ আনায়া খানিক বিদ্রুপ সরূপ রুক্ষ হেসে বলল,
“বিষয়টা তো আমাকে ঘিরেই! তাহলে অবশ্যই আমার এখানে থাকার অধিকার আছে,তাই নয় কি?”
তারেকের ভ্রূদ্বয় কুঁচকে যায়। আনায়ার এমন স্পষ্ট অভিব্যক্তিতে,সে আশ্চর্য! এরিমধ্যে তার নজর পড়ে,তার পেছন হতে এগিয়ে আসা ইনায়ার দিকে। ইনায়াকে দেখে সে ভেবে নেয়,হয়তো আনায়া এই বিষয়ে জেনে গিয়েছে। তাই সে নিজেকে খানিক শান্ত করে, গম্ভীর স্বরে বলল,
“হাহ্…চিন্তা করো না।এক সপ্তাহের মধ্যে, ওর চেয়ে ভালো ঘরে তোমার বিয়ে দেবো।”
আনায়া তারেকের কথায় বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না। বরং দৃঢ় পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা আনায়া, পুনরায় জোর গলায়, স্পষ্ট স্বরে বলে ওঠে,
“আমি বিয়ে করতে চাই না বাবা।”
—“হঠাৎ এমন কথা কেনো…” তারেক অবাক স্বরে আওড়ায়। আনায়া আবারও স্পষ্টভাবে বলে,
“আমি পড়াশোনা করতে চাই বাবা। এইসব বিয়ে-টিয়ে আর আমি করতে চাই না।”
—“আনায়া! আমি জানি, গত কয়েকদিনে তোমার উপর দিয়ে যে ঝড় গিয়েছে,তা সামলাতে হয়তো তোমার সময় লাগবে। তাই বলে সোজা বিয়েই করবে না,এটা কেমন কথা? আর কিসের পড়াশোনার কথা বলছো? সেদিনই না বলে দিয়েছি,যথেষ্ট পড়েছো আর পড়ার প্রয়োজন নেই। তাহলে আবার কেনো এই প্রসঙ্গে কথা বাড়াচ্ছো?”
—“কেনো বাবা? কেনো পড়বো না আমি? সমস্যাটা কোথায়? আমায় একটা প্রশ্নের উত্তর দাও তো! আমি তো তোমার মেয়ে, তাই নয় কি? তবে তুমি কেনো আমার এই ইচ্ছেটুকুতেও বাঁধা হতে চাও? কেনো? আমাকে কি তুমি তোমার বোঝা মনে করে করো? এমনটা হলে বলে দাও প্লিজ। আমি চলে যাবো এই বাড়ি থেকে। এতো বছর আমার দেখাশোনা করে আমার উপর যে কৃপা করেছো,সেটাই যথেষ্ট আমার জন্য। বাকি রাস্তাটুকু আমি নিজেই খুঁজে নেবো।”
অনিমা কিংবা তারেকের পাশাপাশি ইনায়া ভীষণ আশ্চর্য আনায়ার এই ব্যবহারে। এটা আদৌও তাদের আনায়া? বিশ্বাসই হচ্ছে না। অন্যদিকের তারেকের বিস্ময়ের সাথে সাথে রাগটাও চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে। সে দাঁতে দাঁত পিষে গর্জে ওঠে,
“আনায়া! সাহস কি করে হয়,আমার সামনে দাঁড়িয়ে, আমার সাথেই এইভাবে কথা বলার? এই শিক্ষা দিয়েছি তোমায়?”
এই পর্যায়ে আনায়া খানিকটা নড়েচড়ে বসে। নিজেকে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য লাগছে। কিছুটা নিস্তেজ মনে হলেও,সে পুনরায় দৃঢ়তার সহিত বলে ওঠে,
“সরি, বাবা। কিন্তু আজ আর না বলে পারছি না। আমি একজন মানুষ,একইসাথে প্রাপ্তবয়স্ক। কিন্তু একজন মানুষের যে মৌলিক অধিকার গুলো থাকার কথা, আমি সেগুলো কখনোই পাইনি। তোমরা যখন যা বলেছো,আমার জন্য যখন যেই সিন্ধান্তটা নিয়েছো,আমি নির্দ্বিধায় কোনোপ্রকার প্রশ্ন না তুলে তা মেনে নিয়েছি। নিজের সবরকমের চাওয়া-পাওয়া, ইচ্ছে-স্বপ্ন-শখ বিসর্জন দিয়েছি। কিন্তু আফসোস, আজ অব্দি তোমরা কেউই আমার ভেতরটাকে বোঝার চেষ্টা করোনি। এবং তার চেয়েও বেশি হতভাগ্যের ব্যাপার—আমি আজ নিজেই নিজের অনুভূতি সম্পর্কে অবগত নই।
কিন্তু আর না, এবার আমি আমার লাইফের সিন্ধান্ত একাই নেবো। আমার সকল শখ-ইচ্ছে আমি নিজেই পূরণ করব। আমি আরো পড়াশোনা করতে চাই বাবা। এবং এবার আমি অবশ্যই তা করব। আর যেদিন আমার মনে হবে,আমার বিয়ের প্রয়োজন আছে, সেদিন নাহয় তোমাদের জানাব—পরবর্তীতে তোমরা যা সিন্ধান্ত নেবে, আমি তাই মাথা পেতে গ্রহণ করব।
কিন্তু এবার আমার মুক্তি চাই। আমাকে স্বস্তিতে বাঁচতে দাও। আর যদি তোমরা আমার উপর কোনো রকমের জোর করো, তবে আজ এটাও স্পষ্ট করে বলে দিচ্ছি—তোমরা তোমাদের মেয়ের ম’রা-মুখ দেখবে।”
আনায়া এই বলে সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে, ড্রইং রুম ত্যাগ করে ভেতরে চলে যায়। অন্যদিকে সবাই তখন বিস্ময়ের ঘোরে হারিয়েছে। অনিমা সবমিলিয়ে পুনরায় দিশেহারা। তারেক রাগে-বিস্ময়ে চোয়াল শক্ত করে—হিসহিসিয়ে আওড়ায়,
“ওর এতো বড় আস্পর্ধা হয় কি করে?”
ভাহিদ সন্ধ্যার প্রহরে বাড়িতে ফেরে। তবে বেশ ক্লা’ন্ত নিস্তেজ শরীরে। তাকে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করতে দেখেই,কাশফিয়ার টনক নড়ে ওঠে। ভাহিদকে ঠিকঠাক দেখাচ্ছে না। কেমন নিস্তেজ হয়ে ঢলছে। কাশফিয়া দ্রুত তার কাছে এগিয়ে যায়। উদ্বিগ্ন স্বরে বলে,
“কি হয়েছে তোমার? এমন করছো কেনো?”
ভাহিদ মলিন হেসে আওড়ায়,
“আমি ঠিক আমি। একটু শরবতের ব্যবস্তা করো তো। শরীরটায় ভালো লাগছে না।”
ভাহিদের কথা শুনে, কাশফিয়া তড়িঘড়ি শুরু করে দেয়। তার কোনোকিছুই ঠিক লাগছে না। অন্যদিকে ভাহিদ বেশ কষ্ট করেই,সোফা অব্দি এগিয়ে গিয়ে বসে পড়ে। কাশফিয়া লেবুর শরবত করে, ভাহিদের কাছে নিয়ে আসে। তার এমন অস্থিরতা দেখে,পাপড়িও ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে।
এদিকে ভাহিদ গ্লাসটা হাতে তুলে নেয়। কিন্তু তা মুখে তুলে খাওয়ার সৌভাগ্য আর তার হয়না। বরং তার পূর্বেই আচমকা বুকের প্রচন্ড ব্যাথায় সে কুঁকড়ে যায়। বেশ অনেকক্ষণ ধরেই বুকে ব্যাথা অনুভব করছিল। কিন্তু তাতে তেমন গুরুত্ব না দিলেও,এখন অবস্থা খানিক গুরুতরই মনে হচ্ছে। ব্যাথায় যেন সম্পূর্ণ দেহটা অবশ হয়ে আসছে। তার চোখ-মুখ খিঁচে ওঠে অনায়াসে।
এরিমধ্যে হাত থেকে গ্লাসটা পড়ে যেতেই, কাশফিয়া আঁতকে ওঠে। ভাহিদ এমন কেন করছে?
কাশফিয়া তীব্র উদ্বিগ্নতার স্বরে শুধায়,
“ওগো কি হয়েছে তোমার? এমন করছো কেনো? কোথায় কষ্ট হচ্ছে বলো? বুকে ব্যাথা করছে?”
কাশফিয়ার চেঁচামেচির আওয়াজে,পাপড়ি সহ রোজ এগিয়ে আসে।একইসাথে সবাই প্রচন্ড অস্থির হয়ে ওঠে চোখের সামনে ঘটে যাওয়া দৃশ্য দেখে। এদিকে সোফায় বসে থাকা ভাহিদ ক্রমশই নিস্তেজ হয়ে যায়। সে সোফা হতে একপ্রকার হেলে পড়ে যেতে নেয়। সকলের চেচামেচির মাঝেই,আচমকা দোতলা হতে কেনীথ নেমে আসে৷ এতোক্ষণ নিজের বারান্দাতেই আনমনে বসে বসে নানান হিসেব-নিকেশ কষছিল। তবে হঠাৎ নিচ থেকে আসা শোরগোলের আওয়াজে, তারও ধ্যান ভাঙে।
চোখের সামনে অকস্মাৎ এসকল দৃশ্য দেখে,কেনীথ পুনরায় স্তব্ধ হয়ে যায়।সে বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই,হঠাৎ এমন ঘটনার সম্মুখীন হবে—তা হয়তো কল্পনাও করেনি। একের পর এক এসব হচ্ছেটা কি? তবে কি এই সবকিছুর জন্য শুধু সে-ই দায়ী? তার বাবার হঠাৎ জেদ করে পদত্যাগের সিন্ধান্ত , কিংবা এখন নিজের চোখের সামনে বাবাকে মৃত্যুশয্যায় দেখা—সবটার পেছনেই কি কেবল সেই দায়ী?
ক্ষনিকের জন্য তার সম্পূর্ণ জ্ঞান-ধ্যান থমকে যায়।পরক্ষণেই এগিয়ে গিয়ে, ভ্রুকুটি করে বিস্ময়ের কন্ঠে বলে,
“কি… কি হয়েছে বাবার?…”
কেউ কোনো কথা বলার হুঁশে নেই। কাশফিয়া একপ্রকার কান্না করে দিয়েছে। অন্যদিকে নূর-জাহান ড্রইং রুম অব্দি এসে,এসব দেখেই হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে। এবং নিমিষেই কাঁপা-কাঁপাস্বরে, ‘ও ভাহিদ…!’ বলেই জ্ঞান হারিয়ে নিচে ঢলে পড়ে। তার দিকে ধ্যান যেতেই,রোজ আর পাপড়ি ছুটে যায়। অন্যদিকে কেনীথ যেন মূহুর্তেই দিশেহারা হয়ে পড়েছে।
কেনীথ তৎক্ষনাৎ নিজেকে তটস্থ করে। এখন এসব ভেবে সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই। ভাহিদের কাছে এগিয়ে তাকে ঠিকমতো বসানোর চেষ্টায় খেয়াল করে দেখে,ভাহিদের ভাবগাম্ভীর্য একদমই ঠিক নেই।ভাহিদ তখন সোফায় আধশোয়া অবস্থায়, চোখ দুটো আধখোলা। বুকটা ওঠানামা করছে কঠিনভাবে। যেন প্রতিটি শ্বাসই তাকে ছিঁড়ে ফেলছে ভেতর থেকে। তার মুখ ফ্যাকাশে, ঘাম ঝরছে কপাল বেয়ে।এক মুহূর্তেই কেনীথ বুঝে যায়,এটা স্রেফ দুর্বলতা নয়, এটা হার্ট অ্যাটাকের ক্লাসিক লক্ষণ।
সে পুনরায় স্তব্ধ হলেও,তৎক্ষনাৎ নিজের ফোনটা বের করে কাউকে ফোন করে। দ্রুত এম্বুলেন্স ডাকার ব্যবস্তা করে। ভাহিদের হাতদুটো শক্তকরে আঁকড়ে ধরে আওড়ায়,
“বাবা,একদমই চিন্তা করো না। প্লিজ,বি স্ট্রং!”
এদিকে ভাহিদ চোখের সামনে কেনীথকে দেখে অদ্ভুত এক প্রতিক্রিয়া জানায়। সে যেন চাইছে না কেনীথ তার সামনে থাকুক। যথারীতি শুরুতে কিছু বলার চেষ্টা করে বলতে না পারলেও,সে কেনীথের হাতের মুঠোর হতে নিজের হাত সরানোর চেষ্টা করে। এবং কেনীথের দিকে হতে মুখ ফিরিয়ে,কাশফিয়ার দিকে তাকিয়ে তীব্র চেষ্টায়, বেশ কষ্ট করে অস্ফুটে আওড়ায়,
“কা…কাশফি! ওকে যেতে বলো। আমার চোখের সামনে থেকে সরে যেতে বলো।… এই মরার আগে অন্তত আমি ওর মুখ দেখে মরতে চাই না।”
ভাহিদের এহেন কথায় কেনীথ কিংবা কাশফিয়া দুজনেই স্তব্ধ হয়ে যায়। কাশফিয়া মুখ তুলে কেনীথের কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের ন্যায় মুখখানির দিকে তাকায়। সে বিহ্বলিত হয়ে ভাহিদের দিকে তাকিয়ে আছে। এদিকে ভাহিদ আবারও একইভাবে শুধায়,
“যেতে বলো কাশফি…আমি দেখতে চাই না ওর মুখ…”
বহুকষ্টে শেষপর্যন্ত এইটুকু বলামাত্রই, আচমকা ভাহিদ চোখ-মুখ খিঁচে নেয়। এবং মূহুর্তেই তার চোখের দৃষ্টি স্থির হয়। অতঃপর অনায়াসে সে নিজের সমস্ত ভর ছেড়ে দিয়ে,কাশফিয়ার কোলেই মাথা রেখে ঢলে পড়ে। যা দেখে কাশফিয়া ক্ষণিকের জন্য থমকে গেলেও,মূহুর্তেই কাঁপা-কাঁপা কন্ঠে গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে ওঠে। অন্যদিকে কেনীথের বিস্ময়কর কন্ঠস্বর হতে অস্ফুটে আওড়ায়,‘বাবা!’
সারাদিনের কর্মব্যস্ততা শেষে,সবমাত্র ব্লাডেন হেলে নায়রার পদচারণা হলো। ইদানীং তার তেমন ভালো লাগছে না। অদ্ভুত এক দুশ্চিন্তা এসে মাথায় চেপেছে। সেদিন পাভেলের সাথে যোগাযোগ হলেও, কেনীথের সাথে আর কথা হয়নি। কেনীথের কথা জিজ্ঞেস করলে বলল,সে নাকি অন্যকোথাও ব্যস্ত আছে। এরপর পাভেলরও খোঁজখবর নেই। কিন্তু তার মনে প্রাণে বিশ্বাস,এরা ওখানে নিশ্চিত কোনো অঘটন ঘটাচ্ছে।সেটা কি, তা তো তারা জার্মানিতে ফিরলেই জানা যাবে। তবে তার দুশ্চিন্তার কারণ আপাতত ভিন্ন কিছু।
তাদের কর্মক্ষেত্রের বিভিন্ন শাখা রয়েছে। অনেকেই ভাবে সবাই একসাথে এতোকিছু কি করে করতে পারে। কিন্তু বিষয়টা খানিক ভিন্ন। নায়রার মূল দায়িত্ব ব্লাডেন কোম্পানি হতে ইন্ডাস্ট্রির সবটাই নিজ তত্ত্বাবধানে রেখে কাজ করা। যা সে শুরু হতেই বেশ ভালো মতোই করে আসছে। কারণ সে-ও জানে,ঐ দুটোকে দিয়ে ঠিকমতো এই কাজ করানো সম্ভব নয়৷ এদের প্রথম দিন কাজে পেলেও,দ্বিতীয় দিনে দেখবে সবকিছু ফেলে-ছুড়ে কোথায় গায়েব হয়েছে।
আর সর্বক্ষণ ইন্ডাস্ট্রির এইসকল ভাবনা-চিন্তা আর কাজের জীবনে,প্রায়ই কিছু অদ্ভুত লোকজনের সাথে তার পরিচয় হয়ে যায়। এদের মাঝে বেশিরভাগের ব্যকগ্রাউন্ডেই থাকে এক অন্ধকার সত্ত্বার বসবাস। অবশ্য নায়রায় অতীত হতে আজ এই অব্দি উঠে আসার গল্পের পেছনেও রয়েছে,এমনই কিছু অন্ধকার সত্তার অস্থিত্ব।
নায়রা নানান সব ভাবনাচিন্তা শেষে ফ্রেস হয়ে ড্রইং রুমে আসে। সাধারণত বছরের এই সময় কেনীথের ভার্সিটি সেশন চালু হয়। তখন সে সেইদিকটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। পাভেল চলে যায় তার রাইডিং ক্লাব সহ আরো নানান সেক্টরের দিকে। যার যেটা ইচ্ছে হচ্ছে করে যাচ্ছে। কারো কাজে কোনো বিরতি নেই। তবে এবার দুজন বিরতিতে রইলেও,তার আর এসব থেকে মুক্ত হওয়ার সুযোগ হলো না। তার উপর আবার কিছু অজ্ঞাত মানুষজনের খোঁজ মিলছে। এরা কি চায়, না চায় এখনোও সে নিশ্চিত করে জানতে পারেনি।
নায়রা ভারী শ্বাস ফেলে সোফায় গা এলিয়ে দেয়। পরক্ষণেই তার নজর পড়ে দূরের ডাইনিং টেবিলটার উপর। আসার সময় শখ করে একটা ওয়াইন এর বোতল নিয়ে এসেছে। বিখ্যাত রোমানে কন্টির ওয়াইন হওয়ায়,নিঃসন্দেহে এটি যথেষ্ট এক্সপেন্সিভ।কিন্তু সে বেশ দ্বিধাদ্বন্দে রয়েছে,আদৌও এটা তার খাওয়া উচিত কিনা। নায়রা অনেকটা সময় নিয়ে, চকচকে কাঁচের বোতলটার দিকে তাকিয়ে থাকে। একইসাথে মনে মনে পুরোনো এক ঘটনার পুনরাবৃত্তিও করে।
প্রায় বেশ কয়েকমাস আগের কথা। এভাবেই শখ করে ইয়াবেলা’স ইসলে নামক পৃথিবীর সবচেয়ে দামী মদের একটি বোতল লুকিয়ে বাড়িতে এনেছে। কিন্তু দূর্ভাগ্যবশতঃ সেবারও তার ওটা খাওয়ার সুযোগ হয়নি। কিভাবে যেনো কেনীথ জেনে গিয়েছিল।অতঃপর তাই হয়,যা প্রতিবার হতে হয়ে আসছে৷ চোখের সামনে কেনীথ তা আছাড় মেরে চূর্ণবিচূর্ণ করে ফেলে।
এখনও সে ঘটনা মনে পড়লে নায়রায় বুক কেঁপে ওঠে। কম করে হলেও একটা পিসের জন্য সে ছয় মিলিয়ন ডলারের উপরে খরচা করেছিল। অথচ কপালে একফোঁটাও জোটেনি। পরে অবশ্য বেশ আফসোস হয়েছে। ওমন জিনিস না খেলে সে ম’রে যেতো না। কিন্তু যে টাকাটুকু বরবাদ করেছে,সে হিসেব মাথায় এলে—সে এখনোও পারলে মূর্ছা যায়।
অনেক ভাবনাচিন্তার পর সবশেষে নায়রা উঠে দাঁড়ায়।মনে মনে আওড়ায়,’একটু খেলে কিছুই হবে না।’
এই ভাবনায় সে বোতল সহ একটা চকচকে ওয়াইন গ্লাস নিয়ে আসে। কাউচে আয়েশ করে বসে,গ্লাসে ওয়াইন ঢালে। ডার্ক রেড ওয়াইনের তরলটুকু দেখেই যেন,তার চোখ-মুখ উচ্ছ্বাসে মুখরিত হয়। তবে গ্লাসটা হাতে নিয়ে মুখে দেবে—ঠিক তখন-তখনই তার নজর পড়ে সামনের টি-টেবিলের কোণায়—ডার্ক রেড এন্ড ব্লাক শেড মিশ্রিত বড়সড় এক প্রিমিয়াম গিফটবক্সে। নিমিষেই নায়রার চোখ-মুখ খানিক কুঁচকে যায়। গ্লাসটা রেখে, সে উঠে দাড়ায়।
বক্সটার কাছে এগিয়ে গিয়ে দেখে,তাতে কোনো লোগো কিংবা নাম-ঠিকানা নেই। নায়রা বেশ আশ্চর্য হয় এতে। এটা কোথায় থেকে এলো? আবার এতক্ষণ তার নজরেও পড়েনি। সে ভ্রুকুটি করে, জোরস্বরে বলে ওঠে,
“ন্যান্সি! এই গিফট বক্স কখন এসেছে? আর কে পাঠিয়েছে এটা?”
নায়রার জিজ্ঞাসায়, ভেতর হতে স্রেফ ন্যান্সির কন্ঠস্বর ভেসে এলো,
“আমি তো ঠিক বলতে পারছি না,এটা কে পাঠিয়েছে।… সকালে কুরিয়ার বক্স চেক্ করে দেখি,এটা ওখানে পড়ে আছে। তাই আমি গিয়ে নিয়ে এসেছি।”
তার এমন নির্লিপ্ত অভিব্যক্তিতে,নায়রার চোখ-মুখ খানিক কুঁচকে যায়। এই ব্লাডেন হেলের ঠিকানায় এমন অজ্ঞাত জিনিস? নিজেদের চেনা-পরিচিত লোকজন ব্যতীত, এখানকার ঠিকানা সচারচর সবার কাছে তো নেই। কিন্তু বিষয়টা যদি তাই হয়,তবে নাম-পরিচয়হীন এভাবে কেউ গিফটই বা কেনো পাঠাবে।
এই পর্যায়ে নায়রার খানিক সন্দেহ হলো। গত কয়েকদিন হতে খুব করে মনে হচ্ছে, কিছু একটা ঝামেলা চলছে। সে বক্সটার দিকে কিছুক্ষণ সন্দিহান চোখে তাকিয়ে থাকার পর—ভাবনা-চিন্তায় পড়ে যায় এটাও আদৌও খুলবে কিনা। সে মাথা ঝুকিয়ে বক্সের কাছে কান পাতে। আশ্চর্যজনক ভাবে সে ভেতর হতে,খুব সুক্ষ্ম আওয়াজে টিকটিক শব্দ শুনতে পায়। সে তৎক্ষনাৎ মাথা তুলে,বক্সটার দিকে বিস্ময়ের নজরে তাকায়।
সে যা ভাবছে ঘটনা তেমন কিছুই, নাকি খানিক ভিন্ন। এতে আশ্বস্ত হওয়ার জন্য সে অন্য কিছু করতে চেয়েও,করল না। বরং আচমকা টান দিয়ে বক্সটা খুলে ফেলল। নিমিষেই বক্সের ঢাকনাটা ছিটকে নিচে পড়ে যায়। একইসাথে নায়রার ভাবগাম্ভীর্যও স্থির হয়।
সে অবাক হয়ে বক্সের ভেতরের জিনিসগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। ডার্ক রেড সিল্কের কাপড়ের উপর,দুটো চকচকে ওয়াইনের বোতল। চারপাশে গোলাপের পাপড়ি নয় বরং কফির বীজ ছড়ানো। এছাড়া বোতলের পাশে ছোট্ট কালো রঙের একটি বক্স, তবুও যা খুলে রাখা। যাতে দৃশ্যমান হয়ে রয়েছে একটি ডার্ক রেড-ব্লাক ব্লাডেনের ফিমেল ওয়াচ। যেটা কিনা তারই নিজস্ব সিগনেচার ডিজাইনের মাস্টারপিস। একইসাথে রয়েছে কিছু বিখ্যাত ব্র্যান্ড সহ ব্লাডেনেরই বেশ কয়েকটি লিপস্টিক। এবং সবগুলোর শেডই ডার্ক রেড নয়তো ডার্ক রেড ওয়াইন।
নায়রা সবকিছু দেখে,তার সামনেই সোফায় বসে পড়ে। খানিক বিরক্তির সাথে বিড়বিড়িয়ে আওড়ায়,
“এসব আবার কি!”
এরিমধ্যে তার নজর পড়ে, ঘড়ির পাশেই ভাজ করে রাখা একখান কালো কাগজের চিঠির দিকে। পুনরায় সে ভ্রুকুটি করে চিঠিটা হাতে তুলে নেয়। যেন সে এমন কিছুই খুঁজছিল—কিছু একটা গড়বড় ব্যতীত এই বক্সটা পরিপূর্ণ হওয়ার কথা নয়!
নায়রা তৎক্ষনাৎ চিঠির ভাজটা খুলে পড়তে শুরু করে। যদিও পুরোটা লেখাটাই সম্পূর্ণ হয়েছে, ইতালিয়ান ভাষায়। তবে নায়রায় অনেকগুলো ভাষাই আয়ত্ত রয়েছে বিধায়,এটাও পড়তে খুব বেশি অসুবিধা হলো না। কিন্তু প্রতিটা লাইন শেষেই, তার কপালে ভাজ পড়ে যায় অনায়াসে।
‘সুইটি,মাই স্পাইসি লেডি, মাই রেড ওয়াইন! আই ডোন’ট নো হাউ আই শুড বিগিন। বাট আই ওয়ান্ট টু সে সামথিং।
নিজের মস্তিষ্কে এতোটাও প্রেশার দিও না। তুমি আমায় চিনবে না।আর না তুমি আমায় কখনো দেখেছো। কিন্তু আমি তোমায় জানি। তোমার প্রতিটি সুক্ষ্ম অভিব্যক্তি,অচেতন দৃষ্টি কিংবা অন্তর্মুখী দ্বন্দ্ব—সবকিছুতেই আমি আবগত।
তোমাকে আমার বিশেষ কিছু তো বলার নেই,কিন্তু এই সামান্য উপহারটুকু দেওয়ার ছিল। এবং একটা অনুরোধও করতে চাই। লুকিয়ে-চুরিয়ে নেশাদ্রব্য খেতে চাওয়ার প্রতি—তোমার যে আসক্তি, তা পারলে এখনই চিরতরে শেষ করে দাও। কারণ আমি চাই,দিনশেষে তোমার সকল আসক্তি, কেবলমাত্র এই এক আমিতেই হোক।
এখন হয়তো বেশ আশ্চর্য হচ্ছো—তাহলে তোমায় ওয়াইন কেনো পাঠিয়েছি। তুমি বিচক্ষণ মানুষ;ওয়াইনের বোতল খুললেই বুঝে যাবে, সেগুলো কি। ওখানে কেবল মাত্র কিছু প্রাণীর মিশ্রিত তরতাজা র’ক্ত ব্যতীত আর কিছুই নেই। তাই ওটা তুমি চাইলেও খেতে পারবে না, মাই লেডি ভ্যাম্পায়ার।
লোকে বলে আমি অনুভূতিহীন মানুষ। আমি জানি না, তারা ঠিক বলে নাকি ভুল। কিন্তু এটা ঠিক যে,তোমায় এই সামান্য উপহার দিতে গিয়েও আমি নানান দ্বিধাদ্বন্দে ভুগেছি। কি দেওয়া যায়,তাই ঠিক করতে পারছিলাম না। পরবর্তীতে তোমার পছন্দ-অপছন্দ সববিষয় মাথায় রেখেই,যা যা চোখের সামনে পেয়েছি, তাই পাঠিয়ে দিয়েছি।লিপস্টিকগুলোও তেমন। ওসব নিয়ে আমার তেমন ধারণা নেই। তবে এইটুকু জানি,তোমার ডার্ক রেড কিংবা ডার্ক ওয়াইন শেডের লিপস্টিক সর্বাধিক প্রিয়। এছাড়া এসব কতগুলো পাঠানো উচিত ছিল তা-ও জানি না। তবে আশা রাখছি,অন্তত এইগুলো তোমার কাজে লাগবে।
আর বাকি রইলো ঘরিটা! তোমার চিন্তা-শক্তি, ক্রিয়েটিভিটি সবটাই আমাকে আকৃষ্ট করেছে। তেমনি ঘরিটাও। তোমার বানানো সবগুলো ডিজাইনের মাঝে এটাই আমার বেস্ট মনে হয়েছে। জানি, নিজের বানানো জিনিস বিধায়, এটা তোমার কাছে কিছুটা তুচ্ছ হতে পারে। কিন্তু এখানেও আমি আমার সামান্য কিছু বিশেষত্ব মিশিয়েছি। খেয়াল করে দেখো,ঘরির কাঁটগুলো উল্টো দিকে ঘুরছে। এটা আমার ব্যক্তিত্বের সাথে যায়। সহজ-স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে আমার তেমন ভালো লাগে না। এই যেমন,নিজের ইচ্ছে বিরূদ্ধে গিয়ে এতোক্ষণ সময় নিয়ে—এতোকিছু লিখতে বসেছি। এটা নিত্যন্তই বিরক্তিকর। বিরক্তিতে আমার ভ্রু-জোড়াও কুঁচকে যাচ্ছে বারংবার। যাই হোক,যেহেতু তোমার জন্য সময় নষ্ট করছি, তাই এই সময়টুকু ভবিষ্যতে আমি আবার তোমার কাছ থেকেই ফিরিয়ে নেবো।
গাঢ় লাল রঙের লিপস্টিকের প্রলেপে আবিষ্ট তোমার ঐ ঠোঁটজোড়া, আমাকে তীব্রভাবে আকৃষ্ট করেছে। আমি হারিয়েছি তোমার ঐ গভীর অরণ্য সদৃশ হ্যাজেল রঙের চোখজোড়ায়। তুমি নিত্যন্তই চমৎকার সুন্দরী। তা অস্বীকার করার সাধ্য কারো নেই। তবে তোমার স্পষ্ট-রুক্ষ ব্যক্তিত্বই যেন আমাকে বেশি উন্মাদনায় ডুবিয়েছে। সবশেষে এটাই বলবো,তোমাকে আমার চাই।তি আমো ইমানি!(আমি তোমায় ভালোবাসি, ইমানি) আমার তোমাকে ভীষণ ভালো লেগেছে। আর আমি যা চাই, তা আমি একটা না একটা সময় ঠিকই হাসিল করেই নেই।
—ইল তুও আমান্তে অস্কুরা(তোমার অন্ধকার/রহস্যময় ভালোবাসা)’
সবটা পড়ে নায়রা হতভম্ব হয়ে বসে রইল। শুরুতে সুইটি শব্দটাতেই সে আঁটকে যায়। প্রথমে একটা মূহুর্তের জন্য ভেবেছিল,এটা কেনীথ কিনা। কিন্তু পরবর্তীতে বিশ্বাস হয়ে যায়—এমন আহাম্মকের মতো কথাবার্তা কেনীথ কখনো বলবে না৷ আর সে তাকে ‘সুইঠি’ বলে,সুইটি নয়।
নায়রা তীব্র বিরক্তিতে, চোখ-মুখ খিঁচে ন্যান্সিকে ডাকে। ন্যান্সি এসে তার ভাবগতিকে বেশ অবাক হয়ে শুধায়,
“কি হয়েছে?”
মহামায়া পর্ব ১৪
—“এসব পাগল-ছাগল কোথায় থেকে আসে? এসব কোনো জিনিস হলো? কোন ইডিয়ট, মাথামোটা, হুরেনজোন পাঠিয়েছে এটা? নাম ঠিকানা কিচ্ছু নেই। আর তুমি এসব নিয়েই বাড়িতে চলে আসো।”
এই বলতে না বলতেই নায়রা একটা ওয়াইনের বোতল হাতে তুলে নেয়। এবং তার রাগান্বিত কার্যক্রমে অকস্মাৎ তা হাত থেকে নিচে পড়ে যায়। নিমিষেই কাঁচের বোতলটা চূর্ণবিচূর্ণ হয়। একইসাথে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে এক অদ্ভুত বিদঘুটে গন্ধযুক্ত তরল র’ক্ত। যা দেখে ন্যান্সি প্রচন্ড ঘাবড়ে গেলেও,নায়রার নজর আঁটকে যায় র’ক্তের মাঝে ডুবে থাকা চকচক ধাবত কোনো বস্তুতে।
সে কৌতুহল বশত ভ্রুকুটি করে,র’ক্তের মাঝ থেকে জিনিসটাকে হাতে তুলে নেয়। ঝিনুকের খোলস আকৃতির সোনালী পেনডেন্টটা দেখে নায়রার চোখ-মুখ বিস্ময়ে হা হয়ে যায়। সে অস্ফুটস্বরে কাঁপা-কাঁপা কন্ঠে আওড়ায়, “ড্যাড!”
