Home মহামায়া মহামায়া পর্ব ৪৬

মহামায়া পর্ব ৪৬

মহামায়া পর্ব ৪৬
তুশকন্যা

​রাত তখন গভীর। নিস্তব্ধ, জনমানবহীন হাইওয়ের বুক চিরে কেনীথের কালো গাড়িটা তীব্র গতিতে ছুটে চলছে। দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ল্যাম্পপোস্টের আবছা হলুদ আলো আর হালকা তুষারপাতের চাদর মিলে চারপাশটায় এক মায়াবী, অথচ গা ছমছমে আবহের সৃষ্টি করেছে। কেনীথের হাত দুটো স্টিয়ারিং হুইলে থাকলেও, তার মস্তিষ্কে তখনো ঘুরপাক খাচ্ছিল আজ সারাদিনের কাজের চাপ আর হেডকোয়ার্টারের কিছু অমীমাংসিত হিসেব-নিকেশ।
​হঠাৎ করেই সেই নিস্তব্ধতা খানখান হয়ে গেল। আচমকা রাস্তার একপাশের অন্ধকার ঝোপঝাড় গলিয়ে একটা অবয়ব তীব্র বেগে ছুটে এলো চলন্ত গাড়ির সামনে। আকস্মিক এই ঘটনায় কেনীথ সজোরে ব্রেক চাপল। টায়ারের তীব্র ঘর্ষণের শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠল, আর গাড়িটা ঠিক লোকটার ইঞ্চিখানেক দূরত্বে এসে স্থবির হয়ে থামল।
কেনীথ ভ্রু কুঁচকে উইন্ডশিল্ডের ওপারে তাকাল। হেডলাইটের তীব্র আলোয় দেখা গেল, একটা লোক অত্যন্ত ভীত, সন্ত্রস্ত ও অস্থির হয়ে তার গাড়ির বনেটের ওপর আছড়ে পড়েছে। লোকটার চোখদুটো যেন আতঙ্কে কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
​সে গাড়ির কাচ লক্ষ্য করে দুই হাত আছড়াতে আছড়াতে খাঁটি জার্মান ভাষায় চিৎকার করে উঠল,

​—“বাঁচান! ঈশ্বর, কেউ আমায় বাঁচান! ওই মনস্টারটা আমাকে মেরে ফেলবে… বাঁচান!”
​কথাটা বলতে বলতেই লোকটা আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। তীব্র আতঙ্কে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে রাস্তার অন্য পাড়ের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। কেনীথ স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে বেশ কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। তার ধারালো মুখাবয়বে বিস্ময়ের ছাপ। সে বিড়বিড় করে অস্ফুটে আওড়াল,
​—“মনস্টার?”
এই মাঝরাতে লোকটা আদতে কি আবোলতাবোল বকছে? এখানে মনস্টার আসবে কোথা থেকে?
মনের ভেতর এক সুক্ষ্ম খটকা আর সন্দেহ জাগলেও কেনীথ বিষয়টাকে খুব একটা গুরুত্ব দিতে চাইল না। পাগল-ছাগলের কাণ্ড ভেবে সে যখনই আবারও গাড়ি স্টার্ট দিতে যাবে, ঠিক তখনই দূর থেকে এক অদ্ভুত গোঙানি আর ধস্তাধস্তির আওয়াজ তার কানে এলো। কেনীথ থেমে গেল। কৌতূহল আর এক অদ্ভুত অস্বস্তি তাকে গ্রাস করল। সে জানালার গ্লাসটা নামিয়ে বাইরে মুখ ফিরিয়ে বোঝার চেষ্টা করল শব্দটা ঠিক কোথা থেকে আসছে।

​দূরে রাস্তার পাশে, ল্যাম্পপোস্টের ঝাপসা আলোর ঠিক শেষ সীমানায় কিছু ঘন ঝোপঝাড়ের আড়াল হতে ক্রমশই অদ্ভুত সব আওয়াজ আসছে। আশেপাশে কিছু বন্ধ দোকানপাট থাকলেও এই নিঝুম মাঝরাতে সেখানে কোনো জীবিত প্রাণীর অস্তিত্ব থাকার কথা নয়।
​যদিও কেনীথের এসবে জড়ানোর বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ছিল না, তবুও এক অদ্ভুতপূর্বক তাড়নায় সে গাড়ি থেকে নেমে এলো। হাতে ফোনটা নিয়ে তার ফ্ল্যাশলাইট অন করল সে। বুটের নিচে জমে থাকা বরফ গুঁড়িয়ে ধীর, সতর্ক পায়ে সে এগিয়ে গেল সেই জঙ্গলের ন্যায় নিকষিত অংশটার দিকে। একে তো তুষারপাতের প্রকোপ বাড়ছে, তার ওপর কনকনে ঠান্ডা বাতাস আর অন্ধকারের তীব্রতা যেন চারপাশটাকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।

​কেনীথ ধীর পায়ে ঝোপঝাড়ের একদম কাছাকাছি পৌঁছাল। কৌতুহলবশত সে যেই না হাতের ফোনের আলোটা সেই নির্দিষ্ট ঝোপের আড়ালে ফেলল—মুহূর্তের মধ্যে সে একপ্রকার স্তব্ধ হয়ে গেল।
​একটা কমবয়সী ছেলে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে নিজের কান চেপে ধরে ব্যথায় গোঙাচ্ছে। ল্যাম্পলাইটের আলোয় স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে তার পায়েও বেশ ভালো চোট লেগেছে। পোশাক-আশাকের ধরন আর চুলের অদ্ভুত ছাঁদ দেখে স্পষ্টই বোঝা যায়, ছেলেটা এ অঞ্চলের কোনো বখাটে, ছ্যাঁচড়া অপরাধী বা বদমাশ স্বরূপ কেউ। কিন্তু… এই বখাটের এমন করুণ অবস্থা করলটা কে?
​কেনীথ আহত লোকটার উদ্দেশ্যে মুখ ফুটে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই, ছেলেটা তীব্র আতঙ্কে তুষারের ওপর গড়াগড়ি খেতে খেতে কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে উঠল,
​—“শী ইজ আ মনস্টার! শী ইজ ট্রুলি আ মনস্টার!”
​কেনীথ এবারও বুঝতে পারল না লোকটা কার কথা বলছে। সে ভ্রুযুগল কুঁচকে গম্ভীর স্বরে কর্কশ জার্মান ভাষায় জিজ্ঞেস করল,

​—“ফন ভেম শ্প্রেশেন জি? ভের হাট ইনেন ডাস আনগেটান?”
(কার কথা বলছেন আপনি? কে করেছে আপনার এই অবস্থা?)
​লোকটা প্রত্যুত্তর করতে গিয়েও থমকে গেল। লোকটার চোখদুটো আতঙ্কে আরও বড় বড় হয়ে হলো; যেন সে সাক্ষাৎ যমদূতকে দেখে ফেলেছে। সে কাঁপতে কাঁপতে হঠাৎ কেনীথের পেছনের অন্ধকার দিকটায় আঙুল উঁচিয়ে ইশারা করে বলল,
​—“দ্যাটস ওয়ান… দ্যাটস গার্ল…”
​লোকটি তার কথা সম্পূর্ণ করতে পারল না। তীব্র বেগে কেনীথ যেই না মুখ ফিরিয়ে পেছনে তাকাতে যাবে, অমনি আচমকা অন্ধকারের বুক চিরে একটা ভারী পাথর এসে তার কপালের একপাশে লাগল। কিছুটা চোট পেয়ে কেনীথ দু-পা পিছিয়ে গেল। কপাল বেয়ে এক ফোঁটা উষ্ণ রক্ত গড়িয়ে পড়ার উপক্রম হতেই সে তীব্র ক্ষিপ্ত কর্কশ স্বরে গর্জে উঠল,

​—“হোয়াট দ্য হেল ইজ—”
​কিন্তু কেনীথের কণ্ঠস্বর পরমুহূর্তেই স্তব্ধ হলো। তার হাতের ফোনের ফ্ল্যাশলাইটের তীব্র আলো তখন সরাসরি গিয়ে পড়েছে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক সুশ্রী রমণীর ওপর। খানিকটা ধুলোমাখা, গাঢ় রক্তলাল বর্ণের সেই গাউন পরা রমণীর স্পষ্টত এক রুদ্রমূর্তি সেখানে দৃশ্যমান! তার এক হাতে একখান শক্ত-পোক্ত লাঠি; আর সে রাগে, ক্ষিপ্ততায় একপ্রকার অনবরত হাঁপাচ্ছে। এলোমেলো রেশমি চুলগুলো মুখের ওপর এসে পড়েছে, আর চোখদুটো দিয়ে যেন আক্ষরিক অর্থেই আগুন ঝরছে। যাকে এই মাঝরাতে, নির্জন রাস্তায়, এই রূপে কেনীথ তার দূরতম কল্পনাতেও হয়তো প্রত্যাশা করেনি। ঘোর অবিশ্বাসের মাঝে তার অস্ফুটে কেবল একটি নামই নির্গত হলো,
​—“তারা!”
​আনায়া তার সেই সম্বোধন শুনল কি শুনল না, তার কোনো তোয়াক্কাই সে করল না। বরং কেনীথকে সামনে দেখে তার ভেতরের সুপ্ত সিংহী যেন আরও ক্ষিপ্ত হয়ে হিসহিসিয়ে উঠল,

​—“আপনি এখানে কি করছেন?”
​কেনীথ কোনো প্রত্যুত্তর করার সুযোগ পেল না। কারণ এই মোক্ষম সুযোগে ঝোপের আড়ালে থাকা ওই আহত বখাটে লোকটা কোনোমতে খুঁড়িয়ে উঠে দাঁড়িয়ে, নিজের কান চেপে অন্ধকারের দিকে প্রাণভয়ে পালিয়ে গেল।
​আনায়া তাকে পালাতে দেখে আরও রেগে গেল। সে হাতের লাঠিটা শক্ত করে ধরে বখাটেটার পেছনে তেড়ে যেতে নিলে, কেনীথ তৎক্ষণাৎ ক্ষিপ্র গতিতে এগিয়ে এসে তার পথ আগলে দাঁড়াল। কিছুটা বিস্ময় ও কঠোরতা মিশ্রিত স্বরে জিজ্ঞেস করল,
​—“তারা! এসব কি হচ্ছে?”
​আনায়া থামল। কেনীথের দিকে মুখ তুলে তাকাল সে। ল্যাম্পপোস্টের ঘোলাটে আলোয় দু-দণ্ড কেনীথের চোখের দিকে চেয়ে থাকার পর, হঠাৎ তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। সে নিজের ভেতরের সুক্ষ্ম রাগ ঝেড়ে অত্যন্ত বিদ্রূপাত্মক গলায় বলল,

​—“একা পেয়ে মূর্খ দুটো আমার সাথে লাগতে এসেছিল। ভেবেছিল যা খুশি তাই করবে,হাহ!…শালাহ্ একটার সিস্টেমে লাথি মেরে ওটার সিস্টেম ফাটিয়ে দিয়েছি! আরেকটার ঠ্যাং ভেঙে, কান কামড়ে ছিঁড়ে ফেলেছি।”
​বলেই সে রাগে আর ক্লান্তিতে হাঁপাতে হাঁপাতে নিজের হাত থেকে ভারী লাঠিটা মাটিতে ফেলে দিল। হাতের কব্জি উল্টে কপালে জমে থাকা ঘাম আর মুখের ওপর লেগে থাকা ধুলো মুছে নিয়ে ফাঁকা রাস্তার দিকে তাকাল। কিছুটা হতাশাজনক ভঙ্গিতে তেজি গলায় বলল,
​—“আপনি আরেকটু পর এলে, এটারও অবস্থা খারাপ করে দিতাম। ব্যাড লাক, জানো-য়ারটা পালিয়ে গেল…”
​কথাটা আওড়ানোর পর সে কেনীথকে একপ্রকার সম্পূর্ণ অবজ্ঞা-উপেক্ষা করে, হনহনিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইল। কিন্তু কেনীথ তাকে এভাবে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। সে পেছন হতে গম্ভীর কণ্ঠে ডাকল,
​—“তারা!”
​আনায়া থমকে দাঁড়াল। পেছনে মুখ ফিরিয়ে, নিজের একদিকের ভ্রু উঁচিয়ে অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
​—“হুম?”
​কেনীথ তার বিধস্ত, ক্ষিপ্ত অবয়ব একঝলকে পরখ করে নিল। নিজের কালো মার্সিডিজটার দিকে ইশারা করে আদেশসূচক গলায় সংক্ষিপ্তে বলল,

​—“গাড়িতে ওঠ!”
​ল্যাম্পপোস্টের ঘোলাটে, আবছা আলোয় কেনীথের নির্লিপ্ত, ভাবলেশহীন অবয়ব সম্পূর্ণরূপে অবলোকন করল আনায়া। মানুষটার এই হুকুম জারির ভঙ্গি যেন তার ভেতরের জ্বলতে থাকা আগুনে আরও খানিকটা ঘি ঢেলে দিল। সে বিদ্রূপাত্মক ভঙ্গিতে সামান্য তির্যক হাসল। পরক্ষণেই এক ঝাঁঝালো, কর্কশ গলায় উত্তর দিল,
​—“অসম্ভব!”
​বলেই সে যখনই দ্রুত পায়ে পা বাড়াতে উদ্যত হলো—কেনীথ আর কালক্ষেপণ না করে তৎক্ষণাৎ এক ঝটকায় তার কনুইয়ের উপরিউক্ত নরম অংশটা শক্ত মুঠোয় চেপে ধরল।
​মুহূর্তের মাঝেই যেন আনায়ার ভেতরে চেপে রাখা সমস্ত তেজস্বী রূপটা আগ্নেয়গিরির মতো বিস্ফোরিত হলো। সে তীব্র আক্রোশে নিজের হাতটা ঝাঁকুনি দিয়ে ছাড়িয়ে নেওয়ার ব্যর্থ প্রয়াস করে হুংকার দিয়ে বলল,
​—“খবরদার আমায় ছোঁবেন না! একদম না!”

​আনায়া নিজেকে ছাড়ানোর জন্য সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করলেও, কেনীথের ইস্পাতের ন্যায় শক্ত হাতের মুঠো আলগা হলো না। উল্টো কেনীথ আচমকা রমণীর বাহু চেপে এক হেঁচকা টানে তাকে নিজের আরও কাছে, একেবারে নিজের প্রশস্ত বুকের মুখোমুখি এনে দাঁড় করাল।
​আনায়া সাথে সাথে আরও বেশি উগ্র ও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। নিজেকে কেনীথের এই তীব্র সান্নিধ্য থেকে মুক্ত করার জন্য ছটফট করতে করতে চেঁচিয়ে উঠল,
​—“ছুঁতে নিষেধ করেছি না আমি আপনাকে? সাহস কি করে হয় আপনার আমাকে ছোঁয়ার? কোন অধিকারে ছুঁয়েছেন আমায়? ছাড়ুন বলছি, ছাড়ুন!”
​কেনীথের কাছে আনায়ার এই আকস্মিক রাগের পেছনের আসল কারণটা বোধহয় খুব ভালো করেই স্পষ্ট ছিল। ঘন্টা দুয়েক আগে অধিকারহীনতার চড়া জবাবই এই মেয়ের ভেতরে বিষাদ থেকে তীব্র ক্ষোভে রূপ নিয়েছে। যা ভেবে কেনীথ আড়ালে সামান্য ভারী দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করল। তার সহজাত গুরুগম্ভীর, যান্ত্রিক মনোভাব বজায় রেখে সে হঠাৎ রমণীর বাহুটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে অকস্মাৎ ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে নিজের মুখোমুখি স্থির করাল।
​সরাসরি আনায়ার জ্বলন্ত, অশ্রুসিক্ত চোখের দিকে নিজের তীক্ষ্ণ চোখজোড়া নিবদ্ধ করে, অতিমাত্রায় নীচু গম্ভীর গলায়, ভগ্ন স্বরে সে ডাকল,

​—“তারাআআহ্…!”
​কেনীথের কণ্ঠস্বরের চেনা তীব্রতায় আনায়া দু-দণ্ডের জন্য থমকে গেল। এক অজানা শিহরণ তার শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেলেও সে দমে গেল না। বরং কেনীথের চোখে চোখ রেখেই চাপা গলায় নিজের সমস্ত রুক্ষতা আর অভিমান মিশিয়ে বলল,
​—“ছাড়ুন আমায়!”
​—“জেদ করিস না, গাড়িতে ওঠ। আমি তোকে বাড়িতে পৌঁছে দিচ্ছি।”
আনায়া তৎক্ষনাৎ তাচ্ছিল্যের সাথে প্রত্যুত্তর করল,
​—“কেন? আমার নিজের কি হাত-পা নেই? আপনাকে কি আমি কোনো সাহায্য করতে বলেছি? তবে কেন এসেছেন? আর আমি কেনই বা আপনার কথা শুনব, হ্যাঁ? কোন দুঃখে?”

​—“তারা! অবাধ্য হোস না।” কেনীথের গলায় এবার স্পষ্টত সতর্কবার্তা। আনায়া আবারও তাচ্ছিল্য করে বলল,
​—“হাহ! অবাধ্য হওয়ার কি আছে? আমি তো কারো বাধ্য নই। আপনিই তো বলেছিলেন আপনার ওপর আমার কোনো অধিকার নেই! তেমনি আমার উপরও কারো কোনো অধিকার নেই।”
​বলেই সে উন্মাদের মতো আবারও হাত-পা ছুড়ে মোচড়ামুচড়ি শুরু করল। কেনীথ তার বাহুর ওপর নিজের আঙুলগুলোর চাপ আরও বাড়িয়ে দিল, যেন সে কোনোভাবেই পালাতে না পারে। বাহুতে তীব্র ব্যথা অনুভূত হলেও আনায়া এবার যেন নিজের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল।
​সে লাগাতার নিজের হাত দুটো দিয়ে কেনীথের প্রশস্ত, শক্তপোক্ত বুকে একের পর এক কিল, ঘুষি কিংবা ধাক্কা দিতে লাগল। মারতে মারতে একপর্যায়ে সেই ক্ষিপ্ত রমণীর কণ্ঠস্বর তীব্র চিৎকারে রূপ নিল। তার তেজস্বী চোখদুটো আর অভিমানী কণ্ঠস্বর মুহূর্তেই নোনা জলে ভিজে উঠল। গলা দিয়ে যেন কম্পিত, আর্দ্র অগ্নি ঝরতে লাগল,

​—“জানোয়ার! অসভ্য লোক একটা! সবকিছুকে তামাশা পেয়েছেন, হ্যাঁ? কেন শুনব আমি আপনার কথা? কেন হবো আপনার বাধ্য? আপনি আমার কেউ না, কেউ না! আপনার কোনো অধিকার নেই আমার ওপর হুকুম চালানোর… বুঝেছেন আপনি? বুঝেছেন?”
​আনায়ার প্রতিটা কিল-ঘুষি কেনীথের বুকে এসে আছড়ে পড়ছিল, অথচ কেনীথ এক ইঞ্চিও নড়ল না। সে জ্যান্ত মূর্তির মতো স্থির দাঁড়িয়ে রইল; শুধু তার চোখ দুটো গভীর এক চাদরে ঢেকে গেল, যেখানে রাগ নাকি এক চাপা অপরাধবোধ লুকিয়ে ছিল—তা এই অন্ধকার রাতে বোঝা বড় দায়।

​এদিকে আনায়ার তীব্র-ক্ষিপ্ত আর্তনাদ তুষারপাত ভেজা রাতের নিস্তব্ধ বাতাসকে যেন এক লহমায় চিরে দিচ্ছে। কেনীথ তার চোখদুটোর দিকে চাইল—যেথায় জল আর আগুনের এক অদ্ভুত সহাবস্থান তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে কেনীথ নিজের কণ্ঠস্বর যতটা সম্ভব সংযত ও দৃঢ় করে বলল,
— “তারা, শান্ত হ!”
​—“না, আমি শান্ত হব না! কোনো কথা শুনব না আপনার।”
আনায়া বুক ভরে এক রাশ তপ্ত শ্বাস নিয়ে অবাধ্যের মতো মাথা দোলাল,
“আর আপনিও পারলে নিজের এই হুকুম জারি করা বন্ধ করুন। এটা আপনার হেডকোয়ার্টার নয় যে আমার ওপর ইচ্ছেমতো হুকুম-হাকুম চালাবেন আর আমি তা মুখ বুজে মানতে বাধ্য থাকব!”
থামতে না থামতেই আনায়া আবারও কটাক্ষ করে বলল,

“গিরগিটিও বোধহয় এতোটা রঙ বদলায় না যতটা আপনি বদলান!”
কেনীথ এতেও কোনো প্রত্যুত্তর করল না। তার গম্ভীর চোয়াল আরও শক্ত হয়ে উঠল, চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে রইল ক্ষিপ্ত আনায়ার রক্তিম মুখের ওপর। কেনীথের এই নীরবতা যেন আনায়ার ভেতরের ক্ষোভকে আরও উসকে দিল। সে নিজের হাতটা ছাড়ানোর জন্য আবারও মোচড়ামুচড়ি করতে করতে বলল,
—“আমার কিন্তু ভীষণ মেজাজ খারাপ হচ্ছে। ভালোয় ভালোয় আমাকে ছেড়ে দিন, নয়তো…”
এবার কেনীথ মুখ খুলল।কেনীথ তার হুমকির তোয়াক্কা না করেই সংক্ষিপ্ত বাক্যে উচ্চারণ করল,
​—”অনেক হয়েছে, চল এবার।”

বলেই সে তার হাত ধরে টেনে নিতে চাইলে, আনায়া শিউরে উঠে চেঁচিয়ে উঠল,
“অ্যাই! আপনি আমায় কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? ছাড়ুন আমায়! এই ড্রামা বন্ধ করুন। আপনার যেতে হয় আপনি যান না! যাদের অধিকার দিয়েছেন তাদের কাছে যান, জাহান্নামে যান, যেখানে ইচ্ছে সেখানে যান—একা একা যান! কিন্তু আমায় কেন সাথে টানছেন? আমি আপনার সাথে কোথাও যাব না। শুনেছেন আপনি? কোথাও যাব না আমি আপনার সাথে!”
​কিন্তু কে শোনে কার কথা! আনায়া একের পর এক বুলি আওড়িয়ে, চরম ত্যক্ত ও বিরক্ত হয়ে কেনীথের সাথে একপ্রকার ধস্তাধস্তি শুরু করে দিল। কিন্তু কেনীথও তাকে এই মাঝরাতে এভাবে ছেড়ে দেবার পাত্র নয়। অতিরিক্ত কোনো বাক্যব্যয় না করেই, সে হাত ফস্কে পালাতে চাওয়া আনায়ার কচি কোমরখানা পেছন থেকে বলিষ্ঠ হাতে শক্ত করে পেঁচিয়ে আঁকড়ে ধরল।

অতঃপর অসামান্য দৃঢ়তার সাথে হেঁচকা টান দিয়ে, আনায়াকে নিজের চওড়া বুকের সাথে মিশিয়ে, একপ্রকার শূন্যে উঁচিয়ে তুলল। আনায়া বাতাসে হাত-পা ছুড়ল, চিৎকার-চেঁচামেচি করল—দুর্ধর্ষ পুরুষের বজ্রমুষ্টি থেকে নিজেকে মুক্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করেও সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলো।
​ততক্ষণে কেনীথ তাকে প্রায় টেনেটুনে নিজের গাড়ির দরজাটা খুলে সোজা ভেতরের সিটে বসিয়ে দিল। এরপর গাড়ির দরজাটা সশব্দে বন্ধ করে, নিজে ঘুরে ড্রাইভিং সিটের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। ঠিক এই সুযোগে আনায়া ত্বরিত ছটফট করতে করতে হুড়মুড়িয়ে ড্রাইভিং সিটের ওপর দিয়ে বেয়ে গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য মরিয়া হয়ে উঠল।

​কিন্তু তার চেষ্টা সফল হওয়ার আগেই কেনীথ নিজে ড্রাইভিং সিটে ঝড়ের বেগে বসে পড়ল। আচমকা মুখোমুখি হওয়া আনায়ার কোমরে কেনীথ হঠাৎ হেঁচকা টান দিল। আনায়া নিজের ভারসাম্য স্থির রাখতে পারল না; সে সোজা কেনীথের উরুর মাঝবরাবর, তার কোলের ওপর আছড়ে এসে বসে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যে চরম বিস্ময়ে ও লজ্জায় তার মুখখানি শুঁকিয়ে, চোখদুটো ছানাবড়া হয়ে গেল।
​অথচ ততক্ষণে কেনীথ অত্যন্ত নির্বিকার ভঙ্গিতে দরজাটা লক করে দিয়েছে। এমনকি কোলের ওপর বসে থাকা আনায়ার ওপর দিয়েই নিজের সিটবেল্টটা টেনে নিয়ে গায়ে জড়িয়েছে। আনায়া স্তব্ধ, বিমূঢ় হয়ে থমকে বসে রইল। তার কণ্ঠনালী শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। মাথায় বারবার কেবল একটাই ভাবনা আছড়ে পড়ছে—এমনটা হওয়ার কথা ছিল না, একদমই না!

​আনায়া যখন হতবিহ্বল ও কিংকর্তব্যবিমূঢ়, কেনীথ তখন এক মুহূর্তও কালক্ষেপণ না করে দ্রুত গাড়ি স্টার্ট দিল। সে বাম হাত দিয়ে আনায়ার কোমর শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরে নিজের দিকে আরেকটু কষিয়ে টেনে নিল। আনায়ার পিঠখানা সটান গিয়ে ঠেকল দুর্ধর্ষ পুরুষের প্রশস্ত-তপ্ত বুকে। কোমরে বলিষ্ঠ হাতের অধিকারপ্রদ চাপ স্পষ্ট টের পেয়ে আনায়া যেন শ্বাস আটকে বসে রইল। কেনীথ ততক্ষণে ডান হাতে গাড়ির স্টিয়ারিং শক্ত করে চেপে দক্ষতার সাথে ড্রাইভ করতে শুরু করেছে।
​আনায়ার বুকে যেন এবার তীব্র শ্বাসকষ্ট চড়ে বসল। ঠিকমতো শ্বাস নিতেও কষ্ট হওয়ায় সে নিজের মাথাটা নুইয়ে শরীরটা সামান্য ঝুঁকিয়ে ফেলল। বেশ কিছুটা কষ্টসাধ্য প্রয়াসে সে হঠাৎ কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
—“গাড়ি থামান… আমার প্রবলেম হচ্ছে!”
​আনায়ার এই ক্ষীণ কণ্ঠস্বরের প্রত্যুত্তরে কেনীথ অত্যন্ত ঠান্ডা গলায়, কিছুটা না বোঝার ভঙ্গি করে জিজ্ঞেস করল,

“কেন?”
​আনায়া যেন নিজের কথা বলার বাদবাকি শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলল। সে শুষ্ক ঢোক গিলে আনমনে বিড়বিড় করল,
“জানি না।”
​বলেই সে মাথাটা আবারও নুইয়ে ফেলল। তার একগোছা রেশমি চুলের আড়ালে শুকিয়ে যাওয়া ছোট্ট মুখটা যেন লুকিয়ে রইল। কেনীথ দৃষ্টি উঁচিয়ে ফ্রন্ট মিররের দিকে তাকিয়ে ঠিকই রমণীর প্রতিটা সূক্ষ্ম নড়াচড়া লক্ষ করছিল। পরমুহূর্তেই ঠোঁটের কোণে অতিমাত্রায় ক্ষীণ এক চিলতে তির্যক হাসি ফুটিয়ে তুলল।
কিন্তু খানিকক্ষণ বাদে কেনীথ হঠাৎ এক অদ্ভুত আচরণ করে বসল। আনায়ার পরিহিত গাউনের ডিজাইনের কারণবশত উদরের দুপাশের যে অংশটুকু উন্মুক্ত ছিল, সেখানে আচমকা কেনীথের বৃদ্ধাঙ্গুলির রুক্ষ স্পর্শ এসে ঠেকল।
​মুহূর্তে আনায়ার সমগ্র অস্তিত্ব যেন শিউরে উঠল। সে চমকে চোখ-মুখ খিঁচে পুরোপুরি কুঁকড়ে গেল। কিন্তু কেনীথ থামল না; সে অনবরত আঙুলের ডগা দিয়ে সেই উন্মুক্ত ত্বকে এক অদ্ভুত, সংবেদনশীল ও অযাচিত স্পর্শ ছুঁয়ে দিতে লাগল।
​আনায়া আর নিজেকে কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। পেটের ভেতর যেন কিসব উড়াউড়ি করছে। যা প্রতিমুহূর্তে তাকে অস্থির করে তুলছে।
আনায়া চট করে পাশে মুখ ফিরিয়ে কাঁপা কাঁপা স্বরে আওড়াল,

“এটা কী করছেন?”
​কেনীথ তার দিকে নিজের মুখটা সামান্য নামিয়ে আনল। আনায়ার স্তম্ভিত ও শুকিয়ে যাওয়া মুখখানি সে বেশ আমোদ নিয়ে অবলোকন করল। প্রত্যুত্তর দিতেও খুব একটা দেরি করল না সে। আনায়ার নাকের ডগার সাথে নিজের নাসারন্ধ্রের দূরত্বটুকু প্রায় ঘুচিয়ে দিয়ে, সে ভ্রু উঁচিয়ে রাশভারী হাস্কি কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে উঠল,
“কী করছি?”
​আনায়ার চোখ-মুখ এবার পুরোপুরি শুকিয়ে গেল। ঠিকমতো অক্সিজেন ফুসফুসে না পৌঁছানোয় চোখের কোণে বিন্দু বিন্দু জল জমে উঠেছে। মাথাটা কেমন শূন্য ঠেকছে তার। দুজনের তপ্ত নিঃশ্বাস একে-অপরের মুখে আছড়ে পড়ছে। আনায়া আর পারল না এই দুর্ধর্ষ পুরুষের রক্তিম চোখদুটোর দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে; তৎক্ষণাৎ মুখটা ফিরিয়ে চোখ নামিয়ে নিল সে।
​কেনীথও আর কথা বাড়াল না। গাড়ির গতি ঠিকঠাক রেখে, সে রমণীর উদরের উন্মুক্ত অংশে অনবরত একইভাবে আঙুলের চঞ্চল অবাধ্য স্পর্শ দিয়ে চলল। বিষয়টা কেনীথের কাছে আমোদিত কিংবা উপভোগ্য মনে হলেও, সে এ-ও স্পষ্ট টের পাচ্ছিল—তার কোলের ওপর গুটিয়ে বসে থাকা রমণী এক মৃদু কম্পনে অনবরত কাঁপছে। মাথাটা নুইয়ে ফেলতে ফেলতে আনায়া এমন এক পর্যায়ে চলে গিয়েছে, যেন একটু পর সে নিজের পায়ের ওপরই লুটিয়ে পড়বে।
​কিছুক্ষণ এই রুদ্ধশ্বাস মুহূর্ত চলার পর, আনায়া মাথা না তুলেই কাঁপা কাঁপা তবে জেদি কন্ঠে বলল,

“গাড়ি থামান, আমি বাড়ি যাব।”
​—“আমি নিয়ে যাচ্ছি তো!” কেনীথের কণ্ঠস্বর নির্লিপ্ত।
আনায়া স্থির থাকতে পারল না। ছটফট করে আমতাআমতা সুরে বলল,
​—“আ…আপনি প্লিজ গাড়ি থামান। আমি একাই চলে যেতে পারব।”
​কেনীথ এবার কিঞ্চিৎ বিরক্ত হলো। তার রাশভারী, চাপা-গম্ভীর কর্কশ কণ্ঠস্বর বদ্ধ গাড়ির ভেতর গমগম করে উঠল,
“চুপচাপ বসে থাক!”

​কথাটা খানিকটা ধমকের মতোই শোনাল। আনায়ার সাধ্য ছিল না আর কিছু বলার। সে একেবারে স্থির হয়ে বসে রইল; যদিও তার মনের অন্তরালে ঝড়ের প্রকোপ তখন বেড়েই চলেছে। কিছুক্ষণ পর সে এক নতুন যন্ত্রণায় ফাঁসল। বারবার সিল্কি চুলগুলো নুইয়ে এসে তার মুখ ঢেকে দিচ্ছিল, যা এই দমবন্ধ পরিস্থিতিতে তাকে ভীষণ অতিষ্ঠ করে তুলল। হাফসাফ করতে করতে সে নিজের আঙুলের সাহায্যে চুলগুলো দুবার আলতো হাতে পেছনের দিকে ছুঁড়ে মারল।
​রমণীর খেয়াল না থাকলেও, রেশমি চুলের সেই গোছা বারবার গিয়ে আছড়ে পড়ল কেনীথের মুখের ওপর। চুলের এই আকস্মিক ঝাপটায় কেনীথ শুরুতে চোখ-মুখ কিঞ্চিৎ কুঁচকে নিলেও, পরমুহূর্তেই সে নিজেই এক অভাবনীয় কাজ করে বসল।
​গাড়িটা অটো-ক্রুজ মোডে রেখে দিয়ে, কেনীথ নিজেই আনায়ার চুলগুলো ডান হাত দিয়ে অত্যন্ত আলতোভাবে সামনে থেকে সরিয়ে রমণীর ঘাড়ের একপাশে মেলে দিল। অথচ, এত কিছুর মাঝেও সে একটি বারের জন্যও তার বাম হাতখানা আনায়ার কোমর থেকে সরাল না।
​হঠাৎ ঘাড় ও গলার মতো সংবেদনশীল অংশে এরূপ তপ্ত স্পর্শ পেয়ে আনায়ার সর্বস্ব জমে হিম হয়ে গেল। সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই, কেনীথ তার উদরে আরেকটু চাপ প্রয়োগ করে তাকে নিজের বুকের সাথে আরও নিবিড়ভাবে টেনে নিল। আনায়াকে নিজের মাঝে একপ্রকার আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে সে হঠাৎ তার ঘাড়ের কাছে মুখ নামিয়ে দিল। এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে রেখে, অন্য হাতে ক্রমশই রমণীর কোমরে দিয়ে চলল অদ্ভুত সব শিহরণ জাগানো স্পর্শ।

​আনায়া নিজেকে সামলাতে না পেরে জোরে জোরে হাঁপাতে লাগল। এই মূহুর্তে একবার শ্বাসকষ্ট চড়ে গেলে মরার দশা হবে তার! রমণীর সেই ভারী ভারী শ্বাসের শব্দে কেনীথের নজর আবারও চলে গেল ফ্রন্ট মিররে। সে আবারও আনায়ার বেহাল দশা অবলোকন করল। মুহূর্তের জন্য তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে তির্যক হাসি—যা পরক্ষণেই মিলিয়ে গিয়ে আবার গম্ভীর্যের ছাপে ঢেকে গেল। যদিও তার তীক্ষ্ণ নজর ঠিকই সম্মূখের বিস্তৃত পথের দিকে নিবদ্ধ।
​আনায়ার কাঁধে অত্যন্ত সন্তর্পণে নিজের মুখটা ডুবিয়ে, সে রমণীর কানের কাছে মুখ নিয়ে গুরুগম্ভীর ভগ্ন-নির্লিপ্ত স্বরে প্রশ্ন করল,

“রাতে খেয়েছিস কিছু?”
​আনায়া স্তম্ভিত হয়ে যেন এতক্ষণ কোনো এক মায়াবী মহাকাশে বিচরণ করছিল। চেনা কণ্ঠস্বর কানে আসতেই সে নিজেকে সামান্য তটস্থ করল। এত সহজ একটা প্রশ্নও এই মুহূর্তে বুঝে উঠতে তার বেশ দেরি হয়ে গেল। আচমকা নজর ফ্রন্টমিররে যেতেই, সে নিজেদের অবস্থান দেখে কেঁপে উঠল। কেনীথের দৃষ্টি রাস্তায় নিবদ্ধ রইলেও, এতো ঘনিষ্ঠতা তাকে দমবন্ধ করে তুলল। কিছুটা হাফসাফ করে নড়েচড়ে উঠতেই, কেনীথের তপ্ত ঠোঁট আর মুখ সহসাই তার কাঁধ ও গালের নরম ত্বক স্পর্শ করল। আনায়া আবারও শিউরে উঠল। দুহাতে নিজের গাউনের কাপড়টা শক্ত করে চেপে ধরে, চোখ-মুখ খিঁচে আমতাআমতা করে বলল,
“হ্যাঁ… না, মানে না, বাড়ি গিয়ে খাব!”

​কেনীথ আর কোনো কথা বলল না। বাকিটা পথ দুজনে একইভাবে একে-অপরের সাথে মিশে আচ্ছন্ন হয়ে বসে রইল। আনায়া বারবার জ্ঞানশূন্য হওয়ার উপক্রম হলেও তার যেন কিছুই করার ছিল না। ওদিকে দক্ষ হাতে স্টিয়ারিং ঘোরানোর পাশাপাশি, কেনীথ প্রতিনিয়ত তার গায়ের মাতাল করা ঘ্রাণ নিতে নিঃশব্দে এক অদ্ভুত পাগলামি চালিয়ে গেল। সে নিজেও খুব ভালো করে জানত এই মুহূর্তে আনায়ার ভেতরের পরিস্থিতি কতটা ওলোটপালোট হয়ে গেছে। অথচ তারপরও সে বারংবার আনায়ার কাঁধে, গলায় কিংবা খোলা চুলে নিজের নাক-মুখ ডুবিয়ে রমণীকে এক তীব্র আবেশে অনবরত কাঁপিয়ে তুলছিল। এসব রমণীর প্রতি কেনীথের আকস্মিক সম্মোহন ছিল নাকি তার পরিকল্পিত ভাবনায় আনায়াকে একপ্রকার শায়েস্তা করতে চাওয়া—এটা আন্দাজ করা ভারী মুশকিল।
​শেষমেশ আনায়া নিজের সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, অজান্তেই পেটের ওপর জড়ানো কেনীথের পেশিবহুল হাতখানার সুক্ষ্ম চামড়া নিজের হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে খামচে ধরল। কেনীথ তবুও থামল না। তার বাইরের ভাবমূর্তি একদম স্বাভাবিক ও শান্ত দেখালেও, তার হাত কিংবা স্পর্শের চঞ্চল বিচরণ ঠিকই আনায়াকে বারংবার রুদ্ধশ্বাস করে তুলছিল। বাইরের কনকনে ঠান্ডার মাঝেও আনায়া ভেতরে ভেতরে ঘেমে অস্থির হয়ে উঠল।

​অতঃপর দীর্ঘ এক রুদ্ধশ্বাস মুহূর্তের পর হঠাৎ এক ঝটকায় গাড়িটা এসে থামল। কেনীথ নিজেদের ওপর থেকে সিটবেল্টটা খুলে, আনায়ার কোমর থেকে তার বলিষ্ঠ হাতটা সরিয়ে নিল। এতক্ষণে যেন নিজের হুঁশ ফিরে পেল আনায়া; সে জোরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাসফাস করে উঠল। কেনীথ লক খুলে দরজাটা সামান্য বাড়িয়ে দিতেই, সে একপ্রকার লাফ দিয়ে গাড়ি থেকে ছুটে বেরিয়ে গেল। তড়িঘড়ি করে পালাতে চাওয়ার প্রয়াসে, পেছনের দিকে না তাকিয়েই কেনীথের উদ্দেশ্যে বলল,
“আপনাকে ধন্যবাদ, আমি এখন যাই…”

​হঠাৎ তার এমন উদ্ভট ও পলায়নপর আচরণে কেনীথ খুব একটা অবাক হলো না। বরং সে এক বুক ভারী শ্বাস ত্যাগ করে নিজেও গাড়ি থেকে নেমে এলো। অত্যন্ত শান্ত ও ধীর ভঙ্গিতে সে নিজের কালো ট্রেঞ্চ কোটটা একটু ঝেড়ে ঠিকঠাক করে সোজা আনায়ার পাশে এসে দাঁড়াল। কারণ ততক্ষণে আনায়া স্তব্ধ হয়ে সামনের এক ঝকমকে, আলোয় উদ্ভাসিত রেস্টুরেন্টের দিকে তাকিয়ে আছে।
​পার্শ্বে কেনীথের উপস্থিতি টের পেতেই সে তীব্র বিস্ময় ও দ্বিধা নিয়ে মুখ ফিরিয়ে বলল,
“এটা কোন জায়গা? আমায় বাড়ি না নিয়ে গিয়ে, এটা কোথায় নিয়ে এলেন?”
আনায়ার চোখেমুখে বিচলিত হওয়া কিংবা বোকা বনে যাওয়ার ছাপ স্পষ্ট। কেনীথ কোনো মৌখিক উত্তর দিল না; সে আচমকা পাশ থেকে আনায়ার নরম হাতটা নিজের শক্ত মুঠোয় পুরে নিল। আনায়া বেহুঁশের মতো ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে দেখল তাদের জোড়া হাতটার দিকে। সব কেমন যেন স্বপ্ন স্বপ্ন ঠেকছে। এটা আবার তার কোনো কল্পনা না হলেই হলো!

মহামায়া পর্ব ৪৫

কেনীথ কোনো কথা না বলে নিঃশব্দে রেস্টুরেন্টের দিকে পা বাড়াতেই, আনায়া আর স্থির থাকতে পারল না। এক বুক শুষ্ক ঢোক গিলে, কোনোমতে কেনীথের দীর্ঘ পায়ের ছন্দের সাথে নিজের পা মেলালো সে। চলতে চলতে মনে মনে একইসাথে অসহায়ত্বের সুরে বিড়বিড় করল,
“সিস্টেম হিলা ডালা হামারা!”

মহামায়া পর্ব ৪৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here