মাটির পিঞ্জর পর্ব ২০
নূরায়েশা মাহনূর
ধীরে ধীরে চেতনার পর্দা খুলছে দৃষ্টির। কারো আঙুলের নরম ছোঁয়ায় তার হাতের তালুতে মালিশ চলছে। ঠান্ডা বাতাস লাগছে খোলা মুখে, মানে নিকাব নেই, চেহারাটা উন্মুক্ত।
আলতো করে পিটপিট করে চোখ খুললো দৃষ্টি। দৃষ্টি স্থির হতেই একটা মুখ ভেসে উঠলো তার চোখের সামনে।চেনা অথচ এই মুহূর্তে অচেনার মতো লাগছে। চোখের ঝাপসা ধীরে ধীরে কাটলো। গোলগাল, মায়ায় ভেজা এক মুখ। বিষণ্ন চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। দৃষ্টি হাত বাড়িয়ে দিলো। তার আঙুলের স্পর্শ গিয়ে পড়লো সেই গালে।
নীলিমা মুহূর্তেই দৃষ্টির হাত নিজের হাতে চেপে ধরলো।চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো দু’ফোঁটা অশ্রু। ফিসফিসে গলায় শুধু একটুকরো শব্দ,
– আপু…
দৃষ্টির চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো দু’ফোঁটা উষ্ণ অশ্রুবিন্দু। ধীরে ধীরে সোজা হয়ে বসল সে। শরীরে নেই বোরকা, ভেজা শাড়ির উপর সাইফের চাদরটা আলতো করে জড়িয়ে রাখা ।
দৃষ্টি বসতেই আচমকা নীলিমা ঝাঁপিয়ে পড়লো তার বুকে। বুক ফাটিয়ে কান্না, হু হু করে ডুকরে উঠলো সে।দৃষ্টির হাত দুটো জড়িয়ে ধরলো তাকে, বছরের পর বছর জমে থাকা অভিমান ভিজে গেলো এক আলিঙ্গনে।
– এত পাষাণ কবে হয়ে গেলি তুই, আপু? একবারও কি আমার কথা মনে পড়লো না তোর? কতবার, কতভাবে তোকে দেখার চেষ্টা করেছি তুই জানিস?
দৃষ্টি নিশ্চুপ। শুধু শুনে যাচ্ছে নীলিমার কান্নাভেজা অভিযোগ।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
– সবাই কেন জানি আমাকে ছেড়েই চলে যায়। কিসের এত রাগ সবার আমার উপর? মা তো অনেক আগেই চলে গেছিলো… ছোট মা-ও চলে গেলো… আর তুই? তুই-ও চলে গেলি! সবাই মিলে আমাকে একা ফেলে দেয়…
কথা শেষ হবার আগেই গলা বুজে এলো, আবারও হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো নীলিমা। দৃষ্টি ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে তার পিঠে সান্ত্বনার স্পর্শ রাখলো। ওপাশেই নিশ্চুপ বসে আছে সাইফ। এই দুই বোনের মাঝখানে কিছু না বলাটাই যে শ্রেয়, সে বুঝে নিয়েছে।কিছুক্ষণ পর হেঁপিয়ে ওঠা শ্বাস সামলে নীলিমা নিজেকে সরিয়ে নিলো দৃষ্টির বুক থেকে।
– তুই পুরো ভিজে আছিস, আপু। আগে এগুলা চেঞ্জ করে নে, নাহলে ঠান্ডা লেগে যাবে।
নীলিমার কথায় একবার নিজের দিকে তাকালো দৃষ্টি।
বোরকাটা নীলিমা খুলে দিয়েছে, সেটা বুঝলো। তবে কাপড় পাল্টানো হয়নি। হয়তো ভয়ে, যদি দৃষ্টি রেগে যায়।
– আমাকে যেতে হবে, নীলিমা। আমার বোরকাটা দে।
এর আগেই কঠিন ভাবে কেটে গেলো অন্য এক কণ্ঠস্বর,
– কোথাও যাবেন না আপনি। এখানেই থাকবেন।
নীরবতার বুক চিরে ওঠা সেই স্বর সাইফের। দৃষ্টি ধীরে ঘুরে তাকালো তার দিকে। সাইফ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। চোখে দৃঢ়তা গভীর গলায় বললো,
– নিজের বাড়ি ফেলে আরেকজনের বাড়িতে থাকা ভালো দেখায় না। এখানেই থাকবেন আপনি…আপনার নিজের বাড়িতে।
– আমি এখানে থাকবো না।
দাঁত চেপে, গলা শক্ত করে উচ্চারণ করলো দৃষ্টি। সঙ্গে সঙ্গেই উঠে দাঁড়ালো সে। তাদের দু’জনের মধ্যে জমে ওঠা উত্তাপ বুঝে নিলো নীলিমা। কিছু না বলে চুপচাপ সরে গেলো ঘর থেকে। রুমটা নিরব হয়ে গেলো।নীলিমার পায়ের শব্দ মিলিয়ে যেতেই সাইফ ধীরে ধীরে চোখ তুললো দৃষ্টির দিকে।
– আপনি এখানেই থাকবেন, বউ।
কথাগুলো শান্ত গলায় উচ্চারিত হলেও সাইফের চোখে রক্তিম ক্ষোভের দপদপে স্ফুলিঙ্গ।
– আমাকে জোর করবেন না, ইজতিহাদ ভাই। আমি বলেছি, আমি এখানে থাকবো না। আমার অনুমতি ছাড়া আমাকে এখানে কেনো এনেছেন?
– এটা আপনার নিজের বাড়ি। আপনি এখানেই থাকবেন।
– অসম্ভব! যে বাড়ি থেকে আমার মা-বাবাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হয়েছিল, সেই বাড়িতে আমি কিছুতেই থাকবো না। সরুন সামনে থেকে।
কথাটা ছুড়ে দিয়ে দৃষ্টি পা বাড়ালো দরজার দিকে। সাথে সাথেই সাইফ ঝটকা দিয়ে ধরে ফেললো তার হাত।
– পাগলামি করবেন না। আপনাকে আমি আর যেতে দিচ্ছি না। এখানেই থাকবেন। এই বাড়ি যেমন আপনার নিজের, তেমনি আপনার স্বামীরও। আর স্বামীর বাড়িই তো নারীর আসল ঠিকানা।
সাইফের ঠান্ডা অথচ দৃঢ় স্বর শোনার পর দৃষ্টি হঠাৎ খিলখিল করে হেসে উঠলো। এরপর আবার গম্ভীর ভাবে বলে উঠলো,
– বিয়েটা আপনি আমাকে জোর করে করেছিলেন, ভুলে গেলেন? সেদিন আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাইনি। এই বাড়ির সাথে আমার সম্পর্ক শেষ হয়েছিলো অনেক আগেই। নতুন করে কোনো সম্পর্কে আমি জড়াতে চাইনি আপনিই জোর করে জড়িয়েছেন।
– আমি আপনাকে ভালোবাসি। আর আপনিও আমাকে ভালোবাসেন। এটা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই আপনার।
– আমি এখানে থাকবো না।
দাঁত চেপে, গলা ভারী করে উচ্চারণ করলো দৃষ্টি। সাইফ তার হাত শক্ত করে টেনে নিলো নিজের দিকে।
হঠাৎ ভারসাম্য হারিয়ে দৃষ্টি সোজা গিয়ে পড়লো সাইফের বুকের উপর, দু’জনের নিঃশ্বাস মিশে গেলো একাকার হয়ে। দৃষ্টির চোখের গভীরে স্থির চোখ রেখে সাইফ শান্ত কঠোর স্বরে বললো,
– আপনি এখানেই থাকবেন। আর এটাই আমার শেষ সিদ্ধান্ত। পারলে এখান থেকে বেরিয়ে দেখান। আমার অমানবিক,পিশাচ রূপ আপনাকে দেখাতে বাধ্য করবেন না।
বাক্যটি বাতাসে ছুরি হয়ে কেটে গেলো। তারপর মুহূর্তের ভেতরেই কঠিন মুখোশ সরিয়ে নিজের স্বভাবসুলভ কোমলতা ফিরিয়ে আনলো সাইফ। দৃষ্টির এলোমেলো ভিজে চুলগুলো আলতো করে কানের পেছনে গুঁজে দিলো। দু’হাতের উষ্ণ মুঠোয় দৃষ্টির ঠান্ডা গালগুলো তুলে নিয়ে ধরা স্বরে ফিসফিস করলো,
– দেখুন, মুখটা একেবারে বরফ হয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি ভিজে জামাকাপড় পাল্টে নিন। আমি নীলিমাকে বলছি। আর আপনার ওদিকের জিনিসপত্র সব গুছিয়ে রাখতে ইশিতাকে বলেছি ইমন গিয়ে নিয়ে আসবে।
বলেই নীলিমাকে ডাকতে ডাকতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলো সাইফ। দৃষ্টি ধপ করে বসে পড়লো মেঝেতে।রাগে, ক্ষোভে তার বুক জ্বলে পুড়ছে। এই বাড়িতে সে কিছুতেই থাকতে পারবে না। এই দেয়ালগুলো, এই উঠোন, এই ঘর সবই পুরনো ক্ষতের শিকড়। যেখানে তাকাবে, সেখানেই উঠে আসবে সেই ভয়ংকর স্মৃতি
তার মা-বাবার সাথে করা অপমান, ঘাড় ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়ার দৃশ্য। সেদিন রাতে ঘটে যাওয়া নির্মম ভয়ংকর ঘটনা, সব সব মনে পড়ে যাবে।
বহু বছর পর যে কষ্টগুলো সেলাই করে রেখেছিলো, আজ আবার সেগুলো ছিঁড়ে রক্তাক্ত করে দিচ্ছে তাকে। শ্বাস নিতে কষ্ট হতে লাগলো দৃষ্টির। বুকের ভেতর হাহাকার জমে উঠছে। হঠাৎই মাহির কথা মনে পড়লো। সেই বিকৃত, নিথর দেহের কথা। গা শিউরে উঠলো। কেউ এত নিষ্ঠুর হতে পারে! কে করলো এটা? কে মারলো মাহিকে?
ভাবতে ভাবতেই দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললো। নিজের চুল মুঠো করে টেনে ধরলো সে। দুই হাত দিয়ে মাথা চেপে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে, শ্বাসপ্রশ্বাস অগোছালো হয়ে উঠছে। ঠিক তখনই দরজায় এসে দাঁড়ালো নীলিমা। হাতে প্রয়োজনীয় কাপড়চোপড়, মুখে অস্থিরতা। কী যেন টের পেয়ে দৌড়ে এগিয়ে এলো সে।
– আপু, কি হয়েছে?
নীলিমার ডাক শুনেও কোনো সাড়া দিলো না দৃষ্টি। শূন্য দৃষ্টিতে বসে রইলো, কোনো শব্দ তার কানে পৌঁছাচ্ছে না। উত্তর না পেয়ে, আতঙ্কিত হয়ে নীলিমা আবারও দৌড়ে সাইফকে ডেকে আনলো।
সাইফ ঘরে ঢুকে হাতের ইশারায় তাকে বাইরে পাঠিয়ে দিলো। নীলিমা বেরিয়ে যেতেই সাইফ ভিতর থেকে দরজাটা বন্ধ করে দিলো। ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো দৃষ্টির দিকে। মুখের গাম্ভীর্যে মেশানো উদ্বেগে নরম স্বরে বললো,
– শান্ত হন, আপনি… এমন করছেন কেনো?
কথা শেষ হওয়ার আগেই দৃষ্টি হঠাৎ সজোরে সাইফের কলার চেপে ধরলো। চোখে জল, কণ্ঠে বিষাদে জর্জরিত গর্জন,
– মাহি আপুর সাথে কি হয়েছে, বলুন? কে করেছে এমন? বলুন!
– আপনাকে সেসব নিয়ে ভাবতে হবে না। পুলিশ লাশ নিয়ে গেছে, তারাই খুঁজে বের করবে কারা করেছে।
– পারবে না! পারবে না তারা! আর যদি পারেও, কোনো শাস্তি হবে না। জানেন না আপনি? বলুন, জানেন না? ওরা কখনো ন্যায়বিচার দেয় না, জানেন না আপনি?
মেয়েটার প্রাণটা কেমন করে নিংড়ে নিলো! কত কষ্ট সহ্য করেছে ও!
ভেঙে পড়া কণ্ঠে বিলাপ করতে লাগলো দৃষ্টি। সাইফ এক টানে তাকে নিজের বুকে জড়িয়ে নিলো, তার এলোমেলো চুলে হাত বুলিয়ে ফিসফিস করে বললো,
– শান্ত হন। যারা করেছে, তারা ঠিক শাস্তি পাবে।
কিছুক্ষণ ধরে কাঁপতে কাঁপতে অবশেষে ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস স্বাভাবিক হলো দৃষ্টির। চোখ মুছতে মুছতে সরে এলো সাইফের কাছ থেকে। সাইফ নিচে রাখা কাপড়টা হাতে তুলে নিয়ে হঠাৎ স্বরটাকে হালকা করে বললো,
– আপনি মনে হয় নিজে থেকে কাপড় পাল্টাবেন না। মনে হচ্ছে, দায়িত্বটা আমার হাতেই নিতে হবে। আসুন, আপনার কাপড়টা আমি-ই পাল্টে দিই।
দৃষ্টি চোখ পাকিয়ে তাকালো সাইফের দিকে। তার হাত থেকে কাপড়টা থাবা মেরে নিয়ে সোজা ঢুকে গেলো ওয়াশরুমে।
গোসল সেরে, ভেজা শরীরের ক্লান্তি ধুয়ে নতুন কাপড়ে ফ্রেশ হয়ে ফিরে এলো দৃষ্টি। এখনও আজব মানুষটা হেলান দিয়ে বসে ফোনে কথা বলছে। দৃষ্টিকে দেখতে না দেখতেই কল কেটে রাখলো সাইফ। কোনো কথা না বলে উঠে এসে তার হাত ধরে টেনে দাঁড় করালো আয়নার সামনে। আলতো করে তোয়ালে টেনে নিয়ে তার ভেজা চুলে মুছতে লাগলো।
– আমি নিজেই করতে পারবো, সরুন।
– জানি।
শান্ত স্বরে উত্তর দিয়েই নিজের কাজে অটল রইলো সাইফ। তোয়ালের তন্তুগুলো দৃষ্টির চুলে ঘষে ঘষে জল মুছে দিচ্ছে। দৃষ্টি নিরবে দাঁড়িয়ে রইলো। এই মানুষটা আশ্চর্যরকম ত্যাড়া। যেটা না করতে বলা হয়, সেটাই করবে জেদ ধরে। তার ওপর অদ্ভুত এক রকম ভয়ও আছে। জোর করে না কিন্তু নিজের উপস্থিতি দিয়েই ভয় ধরিয়ে দেয়। ভালো হলে অত্যন্ত ভালো, খারাপ হলে অসহনীয়।ছোটবেলা থেকেই এভাবে দেখে এসেছে সাইফকে। তাই তো সবাই তার কথায় চলে।
– আমি কিন্তু সুযোগ পেলেই চলে যাবো। আর একবার চলে গেলে কিছুতেই আমাকে আবার আনতে পারবেন না।
শান্ত ভঙ্গিতে সতর্ক করলো দৃষ্টি। সাইফের ঠোঁটে হালকা এক চিলতে হাসি ফুটলো। তবু কোনো জবাব এলো না। সে অনায়াস ভঙ্গিতে নিজের কাজে ডুবে আছে।
– আপনি শুনেছেন, কি বলেছি আমি?
দৃষ্টির বিরক্ত স্বর ভেসে উঠলো ঘরে। সেই মুহূর্তেই সাইফ মৃদু গলায় বললো,
– রাতের বেলা আমার সাথেই ঘুমাতে হবে। ইমনকে বলছি, বাসরঘর সাজানোর ব্যবস্থা করুক। কী বলেন?
কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই দৃষ্টি ঝট করে ঘুরে তাকালো সাইফের দিকে। এই সময়, এই পরিস্থিতিতে এই অনাহূত সাহসী কথাটা শোনার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না সে।
– আপনার সাথে ঘুমাবো মানে? পাগল হয়ে গেছেন নাকি! আমি একাই ঘুমাবো।
– জামাই রেখে কোন বউ একা ঘুমায়? আর তারপর যদি রাতের বেলা পালিয়ে যান? তখন আমার অবস্থা কী হবে? না না, আমি কোনো রিস্ক নিচ্ছি না।
– আমি কোনো চোর নই যে রাতের বেলা পালিয়ে যাবো। আমি এডাল্ট একটা মেয়ে। নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পারি।
– হুম, বেশ পাকনা হয়েছেন মনে হচ্ছে। তাহলে একটা বাচ্চা নিয়ে ফেলি, কী বলেন?
অভিজ্ঞদের মত গম্ভীরভাবে মাথা নেড়ে কথাটা বলে উঠলো সাইফ। দৃষ্টি ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে তাকালো, চোখেমুখে আগুন।
– খুন করে ফেলতে ইচ্ছে করছে আপনাকে। বের হোন এখান থেকে!
দৃষ্টির চিৎকারে রুমের দেয়াল কেঁপে উঠলো। সাইফ নির্বিকার স্বরে উত্তর দিলো,
– আমিতো খুন হয়েই আছি। আপনার প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে বাঁচা-মরার পার্থক্যটাই ভুলে গেছি।
দৃষ্টি হাতে থাকা চিরুনি আঁকড়ে ধরে রক্তচক্ষু নিক্ষেপ করলো সাইফের দিকে।
– বের হবেন, নাকি এই চিরুনি দিয়েই আপনার কপাল ফাটিয়ে দেবো?
সাইফ ঠোঁটে ক্ষীণ এক হাসি টেনে নিলো।
– যাচ্ছি… তবে এই বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার চিন্তাটা এবার বাদ দিন।
কথা ফুরিয়েই দৃষ্টি অবধি তাকিয়ে একচোখ টিপে রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেলো সে। দৃষ্টি গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে আয়নার দিকে চেয়ে রইলো। মুখে, চোখে, ঠোঁটে এক অদৃশ্য ক্লান্তি। এই আবার কোন বেড়াজালে জড়িয়ে পড়লো সে! সাইফের এই অবিচল অদ্ভুত আচরণ, এটা কি ভালোবাসার বন্দিদশা, নাকি আরেক অচিন ফাঁদ?
দৃষ্টির ব্যাগপত্র গুছিয়ে দিচ্ছে ইশিতা। হাত চলে যাচ্ছে জিনিসের উপর, কিন্তু মনটা গহীন জলে ডুবে আছে। এক অদ্ভুত অস্বস্তি তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে।
ভাবতেই পারছে না, দৃষ্টি হুট করে সেই বাড়িতে ফিরে যাবে। যে বাড়ি থেকে এত কষ্টে দূরে সরে গিয়েছিলো সে। সবকিছু তো ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছিলো। উজান এসেছে, ঘরে আবারও প্রাণ ফিরে পেয়েছে, সবাই একসাথে এমন এক চেনা ছন্দের মাঝে হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত শীতল ছুরির মত বিঁধে গেলো ইশিতার মনে।
তবু অদ্ভুতভাবে অন্য এক কোণে, সাইফ আর দৃষ্টি একসাথে থাকবে ভেবে হালকা খুশির ঢেউও খেলে যায় তার ভিতরে। মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা সেই সহজ সরল ইচ্ছে, এই দুজন যেন একে অপরকে বুঝতে পারে, কাছে আসে, সুখী হয়।
অরুনা কিন্তু কিছুই বলেনি। তার ঠোঁটের কোণে এক অচেনা প্রশান্তির রেখা খেলা করছে। ভেতরে ভেতরে সে খুশি, নিরব প্রার্থনায় ডুবে গেছে। সাইফের কাছাকাছি থাকলেই হয়তো সময়ের সেতু পেরিয়ে দৃষ্টি আবারও জীবনের কাছে ফিরবে। তার সমস্ত সত্তা দিয়ে অরুনা চায়, দৃষ্টি যেন অবশেষে সুখের ঠিকানায় পৌঁছায়।
– ভাই, লাশ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। তবে মেয়েটাকে খুব খারাপ ভাবে মেরেছে। বাকিটা রিপোর্ট এলে বুঝা যাবে।
মখমলের নরম শীতল সোফায় দুহাত দীর্ঘ প্রসারিত করে হেলান দিয়ে আছে সাইফ। মাথাটা পিছনের দিকে সামান্য কাত হয়ে, সিলিংয়ের ফাঁকা সাদা দিকে অনন্ত চাহনিতে গেঁথে আছে তার চোখ। সিলিং নয়, অন্য এক অদৃশ্য গহ্বরে তাকিয়ে আছে সে। ইমন থেমে গেলো। বুঝতে পারছে না সাইফের ভেতরে কি অস্থিরতা দানা বাঁধছে।
ধীরে ধীরে সোজা হয়ে বসল সাইফ। দুহাত ঢেউয়ের মতো পিছনে নিয়ে গিয়ে এক ঝটকায় চুলগুলো ব্যাকব্রাশ করে নিলো। মাথার ভেতরে জমে থাকা তীব্র ঝড়টাকে সরাতে চাইলো। তারপর দুই কনুই ঠেকিয়ে রাখলো হাঁটুর উপর, মুঠোবদ্ধ দুই হাতের উপর ভর দিলো চোয়াল।
শান্ত ঘরে হঠাৎ তার চাহনি পড়লো টেবিলের উপর ছড়ানো ছবিগুলোর দিকে। মাহির বিকৃত দেহের নিষ্ঠুর চিত্রগুলো জ্বলন্ত শাপলার মতো ছিঁড়ে ছিঁড়ে ঢুকে যাচ্ছে সাইফের চোখের ভেতরে। আলো-ছায়ার ভিতর তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো, গলার শিরাগুলো তিরতির করে উঠলো। মুখের হাড়ে জমে গেলো এক স্থিরতা।
– তাদেরই কাজ, তাই তো?
নির্জন স্বরের গহ্বর থেকে ধীরে ধীরে ফুঁটে এলো সাইফের উচ্চারণ। কোনো ওঠানামা নেই, কোনো বিস্ময় নেই শুধু বরফে জমাট স্থিরতা। ইমন নীরব মাথা দুলিয়ে সায় দিলো,
– দেখে তাই-ই মনে হচ্ছে। শাপলা বিলে ফেলে দিয়েছে স্পষ্ট উদ্দেশ্য, আপনাকে ফাঁসানো। পুলিশ হয়তো জিজ্ঞেস করার জন্য যে কোনো সময় চলে আসবে।
সাইফ কোনো জবাব দিলো না। মখমলের সোফার নরম ঢেউয়ে দেহটা ডুবে আছে বটে, কিন্তু তার চোখে বিদ্ধ হয়ে আছে টেবিলে ছড়ানো মৃত ছবিগুলো। চোখ নামিয়ে আবার ইমন বললো,
– কিন্তু একটা কথা ভাই, এই মেয়েটাই কেন? কিসের জন্য এই মেয়েটাকে টার্গেট করা হলো? কোথায় গাঁথা হলো এই সূত্র?
সাইফের আঙুল ধীরে ধীরে একটা ছবির উপর স্থির হলো। তার কণ্ঠে এবার শোনা গেলো শুষ্ক ক্ষত-বিক্ষত সত্যের ভার।
– এই মেয়েটার সাথে দৃষ্টির সখ্যতা ছিলো।
বুকের গভীরে জমে থাকা কিছু অদৃশ্য আগুন শ্বাস ফেলে উঠলো।
– মেয়েটা ওদের জন্য কাজ করতো না তো?
ইমনের কণ্ঠে সন্দেহ,অজানা চোরাগলির হদিস। সাইফ একটু থেমে কাঁধ সজোরে টান দিলো, গলার নিচে জমে থাকা ঝাঁঝালো উত্তাপটা ঠান্ডা করতে চাইলো।
– হতে পারে, আবার নাও হতে পারে।
চোখ ছবির মধ্যে দিয়ে ফুঁড়ে যাচ্ছে সাইফের,
– তারা দৃষ্টিকে আবারো মানসিকভাবে ভেঙে দিতে চেয়েছে, এটাই নিশ্চিত। আর এই মেয়েটার মৃত্যু সেটা ঘটিয়েছে নিখুঁতভাবে।
ইমন তাড়াতাড়ি সায় দিলো,
– ভাই, ভাবিকে এখন একা রাখা একদমই ঠিক হবে না। ওনার মানসিক অবস্থাও খুব ভঙ্গুর আর একা থাকলে বিপদ ও হতে পারে। পারমানেন্ট এই বাড়িতেই নজরে নজরে রাখতে হবে। একটু অসতর্ক হলেই অঘটন ঘটে যাবে।
সাইফ এবার একরকম আদেশের সুরে বললো,
– বাড়ির বাইরে কিছু ছেলে বাড়িয়ে দে। আর কেউ যাতে বাড়ির ভেতরে আসতে না পারে। চেনা, অচেনা, আত্মীয়, অনাত্মীয় কেউ না।
ইমন মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো,
– ঠিক আছে ভাই, আমি দেখে নিচ্ছি। আজ থেকেই বাড়ির সামনে রাতদিন পাহারায় থাকবে আমার মানুষ।
সাইফ আবারো ফিরে তাকালো ছবির দিকে। মাহির মুখের নিস্পৃহতা ব্যথার চেয়ে বেশি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।
– ভাইয়া… ভাইয়া কই তুই?
ইমন আর সাইফের গভীর কথার ভেতর হঠাৎ হাঁপাতে হাঁপাতে ঢুকে পড়লো নীলিমা। নিঃশ্বাস ফেলারও ফুরসত নেই তার। ইমন তড়িঘড়ি করে টেবিলে ছড়িয়ে রাখা ফাইল আর ছবিগুলো গুটিয়ে লুকিয়ে ফেললো। সাইফ মুহূর্তে উঠে দাঁড়ালো।
মাটির পিঞ্জর পর্ব ১৯
– কি হয়েছে?
নীলিমা শব্দ খুঁজে পাচ্ছে না। কেবল বললো,
– ভাইয়া… আপু…
সাইফের কপালের ভাঁজ মুহূর্তে আরও গভীর হলো। তীব্র উৎকণ্ঠায় গলা ভারী হয়ে এলো তার,
– কি হয়েছে? দৃষ্টি কোথায়?
কাঁপা কাঁপা স্বরে নীলিমা বললো,
– আপুকে আমি কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না… রুম, বারান্দা, ছাদ, উঠোন সব জায়গায় দেখে এলাম, আপু নেই!
