Home মির্জা সায়ান মুগ্ধ মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ২৫

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ২৫

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ২৫
jannatul firdaus mithila

বজ্রপাতের তীব্র শব্দে কাপঁন ধরছে গায়ে! বিদ্যুৎ ঝলকানির মৃদু আলোতে ঝাপসা দেখাচ্ছে সবকিছু। সপ্তদশীর কাজলদিঘী চোখদুটোতে ভর জমিয়েছে একরাশ হতবাকতা। সম্পূর্ণ বদন জুড়ে বয়ে যাচ্ছে মৃদু ঝংকার! পাদু’টো নীল হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। বরফের পুরুত্বে দেবে যাচ্ছে সপ্তদশীর অর্ধেকটা কোমর। সম্মুখে মাথা নুইয়ে বসে থাকা যুবক বোধহয় নজর লুকচ্ছে। বারেবারে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে বসে আছে মেকি ভাব নিয়ে। সপ্তদশীর মসৃণ ললাটে ভাঁজ পড়েছে স্পষ্ট! একদৃষ্টে যুবকের পানে তাকিয়ে থেকে সন্দিহান গলায় শুধালো,
“ আপনি কি সত্যি-ই সিদ্ধার্থ?”
তড়াক নজর উঠায় যুবক। চোখাচোখি হলো সপ্তদশীর কাজলদিঘী চোখদুটোর সাথে। আশ্চর্য! সুনয়না দৃষ্টি ঝুঁকালো না মোটেও। কপালে বক্ররেখার ছাপ ফুটিয়ে সন্দিগ্ধ গলায় ফের আওড়াল,
“ উত্তর দিন!”
যুবক ঢোক গিললো সামান্য। তড়িঘড়ি করে ওপর-নিচ মাথা নাড়িয়ে বলল,
“ হ্যাঁ!”

কপালের ভাঁজ গাঢ় হলো সপ্তদশীর। দৃষ্টি হলো তীক্ষ্ণ! বিদ্যুৎ চমকানোর মৃদু আলোয় যুবকের মুখাবয়ব পরোখ করতে লাগল কেমন। যুবকের মুখটা বড্ড লম্বা, আগের তুলনায় হুট করে ওতো কালচে হলো কিভাবে? তার ডানগাল হতে ঠোঁটের ভাঁজ অব্দি বেশ গভীর একখানা ক্ষত। ক্ষতের গায়ে সেলাই গুলো বড্ড স্পষ্ট! বোধহয় কদিন আগেই সেলাই করিয়েছে ক্ষত জায়গাটা। মাহির চোখেমুখে স্পষ্ট হতভম্বতার ছাপ। সিডের মুখে তো এমন কোনো দাগ ছিলোনা। তার স্পষ্ট মনে আছে — প্রথম যেদিন সিডের সাথে দেখা হয়েছিল, তখন সিডকে দেখতে এতোটাও কালো মনে হয়নি। তারওপর ওমন বিদঘুটে আকারে ঠোঁটকাঁটা? মাহির ভয় লাগছে এবার। সপ্তদশী নিজ পাদু’টো ক্রমান্বয়ে গুটিয়ে নিচ্ছে। যুবক কিছু আচঁ পেলো কি-না কে জানে! সে তৎক্ষনাৎ হাত উঁচিয়ে মাথার ওপর হুডিটা ফেলে দিয়ে ঢেকে নিলো নিজের মুখ। ভয়ার্ত মাহি’র পানে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে ধীমী স্বরে আশ্বস্ত করল,
“ ভয় পেয়ো না সানবার্ড! আমি তোমার কোনো ক্ষতি করব না। তুমি তারাতাড়ি ওঠো। এতক্ষণে ওরা নিশ্চয়ই তোমার পালানোর খবর পেয়ে গেছে। ওরা যেকোনো মুহূর্তে এখানে চলে আসতে পারে, তাই বলছি প্লিজ ওঠো! আরেকটু,আরেকটু এগোলেই রোড সানবার্ড। একবার যেকোনো একটা ট্রাকে উঠে পড়তে পারলেই তুমি এই নরক থেকে মুক্ত।”

বোকা মাহির মুখখানা বড্ড দ্বিধাগ্রস্ত। কপালে চিন্তার ভাঁজ, অথচ চোখে পালানোর অসহায়ত্ব। যুবকের নিখাঁদ দৃষ্টি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরোখ করে যাচ্ছে সব। মাহি নিজ দোলাচালে মগ্ন থেকে আচমকা বলে ওঠে,
“ আপনি তো ঐ রাক্ষসের লোক! তাহলে আমায় কেন সাহায্য করছেন? আপনিও যে দিনশেষে মেইডেনের মতো বিশ্বাস ঘাতকতা করবেন না তার নিশ্চয়তা কী?”
সপ্তদশীর ছোট্ট মস্তিষ্কের তীক্ষ্ণ প্রশ্নে আলতো হাসল যুবক। রয়েসয়ে হাঁটুতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালো কোনরকমে। একহাত ফের মাহি’র পানে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“ একটাবার সাহস করে হাতটা ধরে দেখো সানবার্ড! কথা দিচ্ছি, এ দেহে প্রাণ থাকতে তোমার বাড়িয়ে দেওয়া হাতখানা মাঝপথে ছেড়ে দেবার মতো দুঃসাহস দেখাব না।”

মাহি আশ্চর্য বনে তাকিয়ে আছে কেমন! লোকটার এতো ভারী কেনো? তিনি তো আগে এভাবে কথা বলতেন না। সবসময় হাসি-ঠাট্টায় মেতে থাকতেন, কন্ঠও ছিলো বেশ ফুরফুরে। তবে আজ? আজ এমন অদ্ভুত লাগছে কেন তাকে? মাহি দ্বিধাদ্বন্দে জর্জরিত! সাহস করে যুবকের বাড়িয়ে রাখা হাতের দিকে নিজের কোমল হাতখানা একটু একটু করে বাড়ায় সে। যুবকের শক্তপোক্ত হাতের তালুতে হাত ঠেকাতে যাবে ওমনি সপ্তদশীর চোখের সামনে ভেসে উঠল — মুগ্ধ নামক রাগী পুরুষের হিংস্র মুখখানা। যেন সে আগুন চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। তৎক্ষনাৎ ভড়কায় মাহি! বুকটা কেমন কেঁপে উঠল আচমকা। বেচারী মনের মধ্যে একরাশ ভয় নিয়ে নিজের বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা কেমন তড়িঘড়ি করে গুটিয়ে নিলো ভয়ে। বুকের কাছে দু’হাত চেপে আনমনে বিড়বিড় করল,
“ কাকে দেখছি আমি? ঐ রাক্ষসের মুখটা এভাবে যখন-তখন চোখের সামনে ভেসে উঠছে কেন? আমিতো পালিয়ে এসেছি তার প্যালেস থেকে, তারপরও কেন দেখছি তাকে?”
যুবক ভ্রু গুটিয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে সপ্তদশীর পানে। মেয়েটার আনমনে বিড়বিড় করে বলা কথাগুলো মোটেও কানে যাচ্ছে না তার। সে কেমন কপাল গুটিয়ে শঙ্কিত কন্ঠে প্রশ্ন ছুড়ঁল,

“ কি বলছো সানবার্ড?”
তক্ষুনি হকচকিয়ে ওঠে মাহি! সম্বিত ফিরে পেয়ে এদিক-ওদিক তাকায় এলোমেলো দৃষ্টিতে। প্রসঙ্গ এড়াতে খানিক ঢোক গিলে বলে ওঠে,
“ আর কতটুকু দৌড়াতে হবে?”
অলক্ষ্যে স্মিত হাসলো যুবক। তড়িঘড়ি করে সপ্তদশীর পথ হতে দু-কদম সরে দাঁড়িয়ে বলে,
“ আর একটু! দৌড়াতে পারবে তো?”
ওপর নিচ মাথা নাড়ায় মাহি। অতঃপর নতুন উদ্যোমে অজ্ঞাত যুবকের সাথে পায়ে পা মিলিয়ে ছুট লাগায় অজানা পথে।

দৌড়াতে দৌড়াতে ক্লান্ত মাহি! পাদু’টো বোধহয় আর চলছেই না। সপ্তদশী হাঁপাচ্ছে ভীষণ। গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে রীতিমতো। পায়ের গতিরোধ হচ্ছে বারংবার। পাশ থেকে যুবক বড্ড বিচলিত হলো বুঝি। তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এসে একরাশ অস্থিরতায় সপ্তদশীর হাতের কনুই আগলে ধরতে চাইলেই, তৎক্ষনাৎ হাত ঝাকিয়ে সরিয়ে নেয় মাহি। হাঁপাতে হাঁপাতে শুকনো ঢোক গিলে আধো স্বরে বলল,
“ ছোঁবেন না আমায়!”
যুবক থামল! অসহায় চোখে তাকিয়ে রইল মেয়েটার পানে। মাহি’র কষ্ট হচ্ছে খুব তা স্পষ্ট। মেয়েটা কেমন দু-হাতে পেট চেপে ধরে কুন্ঠা যাচ্ছে রীতিমতো। যুবক তক্ষুনি ঘাড় উঁচিয়ে তাকাল সম্মুখে। অদূর থেকে ভেসে আসছে নিয়ন আলোর ঝলকানি। তারমানে রাস্তা আর বেশি দূরে নেই। যুবক সঙ্গে সঙ্গে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকায়। মাহি’র উদ্দেশ্যে যেইনা কিছু বলবে ওমনি তার দৃষ্টি গিয়ে থমকালো অদূরের ঘন-জঙ্গলের দিকে। বেশকিছু টর্চ-লাইটের আলো ধেয়ে আসছে এদিকেই। যুবক অস্থির এপর্যায়ে। তড়িঘড়ি করে মাহি’র নিকট এগিয়ে এসে চাপা স্বরে বলল,
“ ওরা এসে পরেছে। তারাতাড়ি চলো।”

হকচকায় মাহি! ত্বরিত ঘাড় বাকিয়ে তাকালো পেছনে। জঙ্গল থেকে টর্চ লাইটের আলো ধেয়ে আসতে দেখে মুহুর্তেই নিশ্বাস আঁটকে গেল সপ্তদশীর। মেয়েটা কেমন হড়বড়িয়ে পা বাড়ালো সম্মুখে। পেছন পেছন যুবকও ছুটলো। ওতোবড় পথটা দু’জনে অতিক্রম করল মাত্র মিনিট পাঁচেকে। অবশেষে দু’জন দেখা পেল কনক্রিটের দূর্গম রাস্তাখানার। প্রায় বেশ কিছুটা দুরত্বে দাঁড়িয়ে আছে ছয়টি ট্রাক। বাদবাকি পাঁচটা ট্রাকের হেডলাইট বন্ধ থাকলেও একটার হেডলাইট এখনো জ্বলছে। আশেপাশে ড্রাইভারদের উপস্থিতি টের পাওয়া যাচ্ছে না। যুবক সুযোগ বুঝে তক্ষুনি মাহি’কে টেনে নিয়ে গেল রাস্তার ধারের বড় পাইন গাছের আড়ালে। মাহি ভড়কায়! কপাল কুঁচকে যুবকের তামাটে মুখপানে তাকায় শক্ত চোখে। যুবক সেসবে তোয়াক্কা করল না মোটেও। ভীষণ অস্থিরতায় ট্রাউজারের পকেট হাতড়ে বেশকিছু রুবল (রাশিয়ান মুদ্রা) বের করে এনে জোরপূর্বক ধরিয়ে দিলো মাহি’র হাতে। মাহি হতবুদ্ধির ন্যায় তাকিয়ে রইল শুধু! মনের মধ্যে কত প্রশ্ন তার। অথচ বলবার জো নেই। যুবক তখন আরেক পকেট থেকে একখানা সেলফোন বের করে এনে মাহিকে দিয়ে বলল,

“ এখানে বেশকিছু রুবল আছে। এগুলো তোমার কাছে রাখো। তোমার কাজে লাগবে! আর এই যে ফোনটা দিলাম, এটাতে ট্র্যাকিং সিস্টেম অন করা আছে। তুমি যেখানেই থাকবে — আমি ঠিক চলে আসব তোমার কাছে। তুমি একদম ঘাবড়াবে না সানবার্ড।”
হতবাক মাহি! চোখেমুখে স্পষ্ট অবাকের ছায়া। সে কেমন ধরে আসা কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“ আপনি আসবেন না আমার সাথে? আমি একা কোথায় যাব?”
চোখদুটো চিকচিক করছে যুবকের। ঘাড় বারবার এদিক-সেদিক ঘুরে ঘুরে দেখছে শত্রুদের আগমন। সপ্তদশীর এহেন কথায় মনটা তার চিৎকার দিয়ে বলছে — আমিও যেতে চাই তোমার সাথে সানবার্ড! তবে আমি অসহায়। এখনো অনেক কাজ বাকি। মনে মনে এরূপ বাক্য আওড়ালেও যুবকের ঠোঁটের আগায় ফুটল বিপরীত বাক্য। মোটা কন্ঠে আওড়াল,

“ ইউ নিড টু বি স্ট্রং সানবার্ড। আমি তোমায় ট্রাকে তুলে দিব। এই ট্রাক গিয়ে থামবে মস্কোর সাদোভোদ মার্কেটে। তুমি ট্রাক থেকে নেমেই আমায় কল করবে ওকে? ডায়াল লিস্টের প্রথম নম্বরটাই আমার। আর হ্যাঁ! মোটেও অপরিচিত কারোর সাথে কথা বলবে না কেমন? আমি অতিশীঘ্রই তোমার পাসপোর্ট নিয়ে ফিরব।”
থামল যুবক! একমুহূর্ত সপ্তদশীর পানে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে ফের আওড়াল,
“ আমি জানি তুমি পারবে সানবার্ড।”
মাহি প্রতিক্রিয়া শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কেবল। হাতদুটোতে মুঠোবন্দী সেলফোন এবং রাশিয়ান মুদ্রা। দুরুদুরু করে কাঁপছে বুক। যুবক এবারেও নিজ উদ্যোগে টেনে ধরে মাহির বাহাতের কব্জি। চারিদিকে সর্তক দৃষ্টি আওড়ে গুটি গুটি পায়ে এগোয় রাস্তার পাশে দাড়িঁয়ে থাকা শেষ ট্রাকের দিকে। যুবক সময় নিয়ে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো ট্রাক ড্রাইভারের দরজার কাছে। হাত উঁচিয়ে ট্রাকের গায়ে দু’বার টোকা বসাতেই পেছন থেকে খুলে গেল ট্রাকের দরজা। যুবক তৎক্ষনাৎ মাহি’কে নিয়ে ছুটল সেদিকে। আশপাশ একবার ভালোমতো পরোখ করে, মাহির হাত ধরে তাকে উঠিয়ে দিলো ট্রাকে। অতঃপর ফিসফিসিয়ে বলল,

“ চুপ করে বসে থাকবে সানবার্ড। কোনো শব্দ নয় ওকে?”
মাহি মাথা নাড়ায় নিরবে। মেয়েটা কেমন জড়সড় ভাব নিয়ে বসে আছে এককোণে। বোধহয় ভয় পাচ্ছে সপ্তদশী। যুবক ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলল খানিকটা। কাতর চোখে মাহি’র ছোট্ট মুখের আদলে তাকিয়ে থেকে বলল,
“ নিজের খেয়াল রেখো সানবার্ড।”
মাহি শুনল নিরবে। চুপচাপ গা গুটিয়ে বসে রইল কেমন। যুবক আর একমুহূর্তও দেরি না করে ট্রাকের দরজাটা লাগিয়ে দিলো আলগোছে। তারপর ফের ড্রাইভারের দরজার কাছে গিয়ে দুটো টোকা বসাতেই ট্রাকের ইঞ্জিনে স্টার্ট বসায় ড্রাইভার মহোদয়। বন্ধ হেডলাইটের বাতি জ্বলে উঠল মুহুর্তেই। ট্রাকের বিশাল চারটে চাকা ঘুরতে লাগল রয়েসয়ে। যুবক সরে দাঁড়ায় পথ ছেড়ে। চাতক পাখির দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখল ট্রাকের চলে যাওয়া। আশ্চর্য! যুবকের ডানহাত আচমকা উঠে এসেছে তার হৃৎপিণ্ড বরাবর। আলতো করে ডলছে সেথায়! তার ভাব এমন — কেউ বুঝি তার হৃৎপিণ্ডটা খুলে নিয়ে যাচ্ছে। তারচেয়েও বড় ব্যাপারখানা হচ্ছে — তার চোখদুটো কেমন চিকচিক করছে! সে-কি আদৌ কাঁদছে কি-না কে জানে! যুবক ভীষণ ক্লান্ততার সাথে হাঁটু গেঁড়ে বসলো কনক্রিটের রাস্তায়। চোখদুটো নিরবে ঝরাচ্ছে অশ্রু, বদনখানি কাঁপছে রীতিমতো। সে কেমন ভাঙা ভাঙা কন্ঠে আওড়াল,
“ আমি সিদ্ধার্থ নই সানবার্ড, আমি সিদ্বার্থ নই।”

ঝড়ের বেগে ছুটছে রোলস রয়েজ। ড্রাইভিং সিটে বসে থাকায় ড্রাইভার মহাশয় বড্ড আতঙ্কিত। ব্যাকসিট হতে বরাবরের ন্যায় তাড়া দেখাচ্ছেন হিশাম। বেচারা ড্রাইভারকে ব্যপক গাল-মন্দ করে বলে যাচ্ছেন,
“ গো ফাস্টার এসহোল!”
ড্রাইভার তিতিবিরক্ত! মনটা তার চিৎকার দিয়ে মনিবের মুখের ওপর বলে দিতে চাইছে — এ ব্যাটা! পারলে নিজে এসে চালান। তবে মনের কোণে উত্থাপিত হওয়া এহেন বিকট দুঃসাহসিক কথাটুকু ঠোঁটের আগায় আসার আগেই গিলে নিলেন কোনমতে। স্রেফ মাথা কাত করে বললেন,
“ জ্বি! চালাচ্ছি।”

ব্যাকসিটে গা এলিয়ে বসলেন না হিশাম। আধবুড়ো দূর্বল বদনখানি বড্ড অস্থির তার। ফর্সা গায়ে কাপড়ের ছিটেফোঁটাও নেই। কোমরে পেঁচিয়ে রাখা একখানা মখমলের তোয়ালে মাত্র। লোমশ বুকটাতে ঘামের তীব্র উপস্থিতি জানান দিচ্ছে — মহাশয় বুঝি বড্ড আতঙ্কিত। ঝড়ো বেগে গাড়িটি ছুটছে ইস্তাম্বুলের ব্যস্ত মহাসড়কে। কিছুক্ষণ পরেই তা ঢুকবে মহন্তি টানেলে। হিশাম খানিক স্থির হয়েছে এপর্যায়ে। অস্থির দেহটা সিটের গায়ে আলতো করে ঠেকিয়েছেন কোনমতে। এরইমধ্যে গাড়ি প্রবেশ করল মহন্তি টানেলে। গোলাকার বড়সড় টানেলের ভেতর আজও বরাবরের ন্যায় রাতের উপস্থিতি। সিলিংয়ে জ্বলজ্বল করছে হলদেটে আলোর লাইট। হিশাম স্বস্তিতে খানিক চোখ বুজঁতেই ড্রাইভার হঠাৎ ব্রেক কষল গাড়িতে। এহেন হুটহাট ঘটনার আকস্মিকতায় হকচকায় হিশাম। আধবুড়ো মহাশয় নিজের ভারী শরীরটার তাল সামলাতে না পেরে তক্ষুনি ঝুঁকে পড়লেন বেশ কিছুটা। ড্রাইভার তটস্থ! গোলগােল চোখে তাকিয়ে আছে সম্মুখে। এদিকে হিশাম ততক্ষণে নিজেকে সামলালেন কোনমতে। কটমট করতে করতে ড্রাইভারের উদ্দেশ্যে কঠিন গলায় বললেন,

“ মাদারফা*কার! ঠিকমতো গাড়ি চালাতে পারিস না? মাঝরাস্তায় গাড়ি থামালি কেনো?”
ড্রাইভার জবাব দিলেন না। তা ফিরলেন পেছনে। হিশাম বড্ড চটলেন এপর্যায়ে। দাঁতে দাঁত চেপে ড্রাইভারের সিটের পেছন থেকে সরে আসতেই চুপসে গেলেন তিনি। গাড়ির কাছ থেকে মাত্র কয়েক হাত দুরত্বে, পথ আটকে দাঁড় করিয়ে রাখা একখানা বাইক। একজন বলিষ্ঠ পুরুষ বসে আছেন বাইকে। মাথায় কালো হেলমেট! একহাতে ভর দিয়ে গা এলিয়ে রেখেছে কেমন, একপা বাইকের কোলে উঁচিয়ে রাখলেও আরেকপা জমিনে গড়াগড়ি খাচ্ছে। হিশাম থমকায়! হতবিহ্বলের ন্যায় আওড়ায়,
“ হু ইজ দিস বা’স্টার্ড?”
কথাটুকু জিভের আগা দিয়ে বেরিয়েছে মাত্র, আর ওমনি হিশামের হৃদয় থমকালো সম্মুখে চেয়ে থেকে। একসঙ্গে বেশকিছু ব্ল্যাক মার্সিডিজ বেঞ্জ ধেয়ে এসে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ালো বাইকারের একদম পেছনে। যেন তারা আনুগত্য করছে সামনের মানুষটার। হিশাম ভয়ে ভয়ে শুকনো ঢোক গিললো বারকয়েক। কাঁপা কাঁপা হাতে ড্রাইভারের কাঁধ ছুঁয়ে চাপাস্বরে বলল,
“ গাড়ি পেছনে নে!”

ড্রাইভার ফাঁপা ঢোক গিলছেন। কাঁপা কাঁপা বদনে তক্ষুনি পাশের দরজা খুলে বেরিয়ে গেলেন গাড়ি থেকে। এদিকে হিশাম পড়লেন মহা দোটানায়। ড্রাইভার বিশ্বাস ঘাতক যে সুযোগ পেয়ে ছুটে পালালো তাকে ছেড়ে। হিশাম কোনরূপ কালবিলম্ব না করে তক্ষুনি হড়বড়িয়ে ব্যাকসিট থেকে চলে এলেন ফ্রন্ট সিটে। কোমরের তোয়ালেটা কোনরকম খুলতে খুলতে বাঁচল তার! বেচারা একহাতে গাড়ির সবগুলো দরজা লক করলেন ভালোমতো। অতঃপর স্টিয়ারিংয়ের হাতলে টান বসিয়ে যে-ই না গাড়িকে পেছনে নিবেন ওমনি পেছন থেকে কর্কশ শব্দে বেজে উঠল অগণিত গাড়ির হর্ণ। হিশাম ভড়কালেন। তড়িঘড়ি করে ব্রেক কষে ঘাড় বাকিয়ে পেছনে তাকাতেই দেখলেন — পেছনেও পথ আটকে দাঁড়িয়ে আছে বেশকিছু গাড়ি। ভয়ে প্রাণ বেরুনোর যোগাড় বেচারা হিশামের। কোনরূপ উপায়ন্তর না পেয়ে চুপটি করে বসে রইলো নিজ গাড়িতে। গাড়িটা বুলেট প্রুফ, বাইরে থেকে হাজারটা বুলেট ছুঁড়লেও গায়ে একটুখানি আঁচড়ও লাগবেনা তার। এ নিয়ে প্রশান্তির হাসি টানলেন হিশাম। ইচ্ছে করে ডানহাতের মিডল ফিঙ্গার উঁচিয়ে দেখালেন সবাইকে। ওদিকে বাইকার মহোদয় এতক্ষণে নড়েচড়ে উঠলেন। বাইকের ওপর থেকে নেমে এসে, দুহাত পকেটে গুঁজে দাম্ভিক কদম বাড়াতে লাগলেন হিশামের গাড়ির দিকে। হাঁটার মাঝপথে একবার ঘাড় বাকিয়ে তাকালেন তিনি, আর ওমনি কোত্থেকে দু’জন গার্ডস কেমন তড়িৎ বেগে ছুটে এলেন হিশামের গাড়ির সামনে। বুলেট প্রুফ গাড়িটির উইল্ডশিল্ড বড় শক্তিশালি। অল্প আঘাতে থোড়াই ভাঙবে? গার্ড দু’জন হাতে করে দু’টো ব্যাগ নিয়ে এলেন। অতঃপর ব্যাগ থেকে চারটে সাকশন ডিভাইস এনে বসিয়ে দিলেন উইল্ডশিল্ডের চারপাশে। ভেতরে বসে থাকা হিশাম হা হয়ে দেখছে সব! কি করছে তারা তাই হয়তো বোঝার চেষ্টায় মত্ত তিনি।

উইল্ডশিল্ডের গায়ে বসেছে চারটে শক্তিশালী সাকশন ডিভাইস। গার্ড দু’জন আধুনিক রিমোটের সাহায্যে মাত্র দু’টো চাপে ঘটালেন কন্ট্রোলড ব্লাস্ট। মুহুর্তেই উইল্ডশিল্ডের আস্তরণে মৃদু ফাটল ধরল। এহেন কান্ডে তটস্থ হিশাম! চক্ষু ছানাবড়া করে তাকিয়ে আছে বাইরে। অদূর থেকে বলিষ্ঠ পুরুষ এগিয়ে আসছেন ক্রমাগত। তার দাম্ভিক কদম আচমকা থামল গাড়ির সম্মুখে এসে। কিয়তক্ষন ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে যুবক বাহাত বাড়ায় পাশে, ঠিক তখনি কেউ একজন বিনম্র শ্রদ্ধায় মাথা নুইয়ে যুবকের হাতে তুলে দেয় একখানা মোটা লৌহদন্ড। যুবক বেশ আরামসে লৌহদন্ডটা হাতে নিয়ে খানিকক্ষণ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আচমকা তা দিয়ে আঘাত বসালো উইল্ডশিল্ডের গায়ে। মুহুর্তেই চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল উইল্ডশিল্ডের কাঁচ! চূর্ণবিচূর্ণের ছিটেফোঁটা গিয়ে আঘাত হানলো হিশামের উদোম গায়ে। চামড়া ভেদ করে কাচেঁর টুকরো দেবে গেল বহু জায়গায়! হিশাম আর্তনাদ করে ওঠে! ডান চোখে ঢুকেছে একটুকরো কাঁচ, র*ক্ত গলগলিয়ে পড়ছে গাল বেয়ে। ওদিকে যবক এবার একলাফে উঠে এসেছে বনেটের ওপর। একহাঁটুতে ঝুঁকে বসে, আচমকা ডানহাত বাড়িয়ে দিল হিশামের দিকে। গম্ভীর অথচ ক্রুর কন্ঠে বলল,

“ মাই মানি!”
হিশাম বাকরূদ্ধ! নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে আছে কেমন। মস্তিষ্ক বড্ড ফাঁকা লাগছে এখন। সে খানিক সময় নিয়ে অস্ফুটে আওড়াল,
“ আপনি?”
হেলমেটের আড়ালে থাকা পিয়ার্সিং করা ঠোঁটদুটো দাঁতের সঙ্গে পিষে হাসল যুবক। ডানহাতে আলতো করে হেলমেটের গ্লাস তুলে নিজের বাদামী চোখদুটো উম্মুক্ত করে, শান্ত কন্ঠে আওড়াল,
“ দ্য শ্যাডো মনস্টার!”
থমকায় হিশাম! হৃদয়ের দু’টো স্পন্দন বুঝি মিস হয়ে গেল ইতোমধ্যে। চোখদুটো বেরিয়ে আসার যোগাড় তার, ওষ্ঠপুটের ফাঁক বেড়েছে বহুগুণ। যুবকের ঈগল দৃষ্টির পানে কিয়তক্ষন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেই হঠাৎ মনে পড়ে গেল — মনস্টারের দিকে চোখ তুলে তাকাতে নেই। তাকালে মৃ*ত্যু নিশ্চিত! তৎক্ষনাৎ নজর ঝুঁকায় হিশাম। কাঁপতে কাঁপতে আতঙ্কিত কন্ঠে বলে ওঠে,
“ ক্ষমা করুন, ক্ষমা করুন আমায় মনস্তার! আমি জানতাম না এটা আপনি। আমি…”
“ আই ওয়ান্ট মাই মানি!”
গম্ভীর কন্ঠটা কানে যেতেই শীরঁদাড়া সোজা হয়ে গেল হিশামের। বেচারা তড়িঘড়ি করে গাড়ির ড্যাশবোর্ডের পাশে থাকা গ্লাভ বক্স হাতড়ে একখানা চাবির গোছা বের করে এনে আলগোছে তুলে দেয় মনস্টারের হাতে। প্রানভিক্ষা চেয়ে ফের কাতর কন্ঠে শুধায়,

“ সব নিয়ে যান মনস্টার! বাট প্লিজ ডোন্ট কি’ল মি।”
এহেন কথাটা মনস্টার ওরফে মুগ্ধ আদৌও কানে তুলল কি-না কে জানে! সে উল্টো ডানহাত বাড়িয়ে দিল পাশে। পরমুহূর্তে পাশ থেকে গার্ড এগিয়ে এসে একখানা বিশাল শটগান তুলে দিলেন মনস্টারের হাতে। উরুর ওপর শটগানের বেস ঠেকিয়েছে মনস্টার, গানের নল ঠেকিয়েছে হিশামের দিকে। হিশাম ভয়ার্ত কন্ঠে বারবার অনুনয় করছে ভীষণ। হাতজোড় করে ক্ষমা চাইছে কতবার! অথচ সেদিকে থোড়াই পাত্তা দিচ্ছে মনস্টার? সে কেমন ক্রুর হেসে ঠান্ডা কন্ঠে শুধালো,
“ হেপি জার্নি!”

তারপর? তারপর ট্রিগার চাপতেই শটগানের নল দিয়ে অসংখ্য ছোট ছোট ধাতব দানা বেরিয়ে গেল ঝড়ের বেগে। মুহুর্তেই ঝাঁ-ঝরা হয়ে গেল হিশামের বুক,দেহ! লহুতে ভিজে গেল চারপাশ! শটগানের তীব্র আওয়াজে কান ধরে যাবার যোগাড় যেন! বাদবাকি গার্ডরা সব মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রত্যেকের চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট!
স্লাগের সবগুলো ধাতব দানা বেরুনোর পর থামল মুগ্ধ। আলগোছে উরুর ওপর থেকে শটগানটা নামিয়ে রাখল বনেটের ওপর। তারপর আরেকলাফে বনেট থেকে নেমে দাঁড়াল রাস্তায়। দু’হাত ওপরে তুলে ভীষণ আলসেমিতে আড়মোড়া ভাঙল যুবক! ঘাড়টা চারিদিকে ঘুরিয়ে ফোটালো শব্দ করে। একহাতে মাথা থেকে হেলমেট খুলে ছুঁড়ে ফেলল রাস্তার একপাশে। অতঃপর পকেট হাতড়ে একখানা মোটা সিগার বের করে এনে, জ্বলন্ত শটগানের নলের সাথে একটা ঘর্ষণ বসাতেই জ্বলে উঠল তা। যুবক রয়েসয়ে ঠোঁটে ফাকে গুঁজল সিগার। নাটকীয় ভঙ্গিতে গা দুলিয়ে পা বাড়ায় সামনে। ঠিক তখনি পেছন থেকে ছুটে এলেন গার্ড মহোদয়। মাথা নুইয়ে মনস্টারের দিকে ফোন বাড়িয়ে দিয়ে নিচু কন্ঠে বললেন,

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ২৪

“ মনস্তার! আপনার কল!”
থামল মুগ্ধের পা। ঘাড় বাকিয়ে একদৃষ্টে তাকালো ফোনের দিকে। কিছুক্ষণ সময় নিয়ে হাতে নিলো ফোনটা। কানে ঠেকাতেই ওপাশ থেকে ভেসে আসে এডউইনের ভয়াতুর কন্ঠ!
“ মনস্তার! শি ইজ মিসিং!”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ২৬

3 COMMENTS

  1. আপু পরের পর্ব দেন 😫💗👌🥰 তাড়াতাড়ি

Comments are closed.