মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৩৪
jannatul firdaus mithila
“ ওহ আচ্ছা! এ বাত! আহারে বান্দীর মেয়ে, আগে বলবি তো। যাকগে, শোন বান্দীর মেয়ে! এক কাজ কর তবে, শুধু শুধু কষ্ট করে কেঁচি দিয়ে গোড়া থেকে চুল কাটতে হবে না। আমি তোকে ব্লেড দিচ্ছি, একেবারে ন্যা’ড়া হয়ে যা। এন্ড ওয়ান মোর থিংগ — চুলের সঙ্গে সঙ্গে নিজের অতিরিক্ত নড়তে থাকা জিভ’টাকেও কাটিস কিন্তু!”
হতভম্ব মাহি! মায়াভরা হরিণী চোখদুটো তার বিস্ময় আর ভয়ের চাপে কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসার যোগাড় যেন! লোকটা আবারও তাকে সুযোগ বুঝে ঠেস মে’রে যাচ্ছে? সপ্তদশীর ধবধবে মুখশ্রী লাল হয়ে গেল নিমিষেই। পাতলা টিকালো নাকের ডগাটা কেমন টুকটুকে লাল আভায় ছেয়ে গিয়েছে দেখো! নরম তুলতুলে চোয়ালখানা শক্ত করে ফুটিয়ে, সপ্তদশী নিজ কন্ঠে আওয়াজ তুলল কাঠকাঠ!
“ আপনার এসব উদ্ভট উপদেশ আপনি আপনার নিজের পকেটেই রাখুন! মুখটা খুললেই যখন-তখন ঠেস মে’রে কথা না বললে আপনার চলে না তাই না?”
যুবকের বাদামী রঙা চুলগুলোর আড়ালে ঢেকে থাকা প্রশস্ত কপালখানায় দেখা মিললো গোটাকতক ভাঁজের ছাপ! দৃষ্টি হয়েছে তীক্ষ্ণ। ছুরির ধারালো অংশের ন্যায় স্পষ্ট খাঁড়া নাকখানা তার ফুলে উঠেছে খানিক। চোয়ালের রেখা টানটান করে কর্কশ কন্ঠে শুধালো,
“ আমার মতো বিস্টের সাথে মুখে মুখে তর্ক করতে তোর ভয় লাগে না বান্দীর মেয়ে?”
সপ্তদশী মৌন! নাকের পাটা ফুলিয়ে মুখ ঘুরিয়েছে অন্যত্র। দু’হাত বুকের কাছে ভাঁজ করতেই কর্ণকুহরে ভেসে এলো মুগ্ধের কটমটে সন্দিগ্ধ কন্ঠ!
“ তোর কী ঘাড়ে সমস্যা বান্দীর মেয়ে?”
সহসা সপ্তদশীর মসৃণ ললাটে ভাঁজ পড়ল গোটাকয়েক। ভ্রু-দ্বয়ের মধ্যাংশ সামান্য গুটিয়ে ঘাড় ঘোরালো সম্মুখে। রয়েসয়ে মাথাটা খানিক উঁচিয়ে তাকালো যুবকের কঠিন মুখাবয়বে। অতঃপর সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করল,
“ মানে? ঘাড়ে সমস্যা হতে যাবে কেনো?”
এপর্যায়ে দাঁতের চাপায় দাঁত পড়ল যুবকের। কদম দু’খানা সামান্য এগিয়ে এনে, শক্ত চোয়ালে কটমট শব্দ তুলে খেঁকিয়ে শুধালো,
“ তাহলে কথায় কথায় ঘাড়ত্যাড়ামি করিস কেনো বান্দীর মেয়ে? না-কি আমার হাতের উত্তম মধ্যম না খেলে তোর পেটের ভাত হজম হয়না? কোনটা?”
সপ্তদশী চিবুক নামালো কন্ঠায়। মা’রের কথা শুনতেই তার আদুরে মুখখানায় নেমে এলো রাজ্যের আধার। চোখদুটোর কার্নিশ অলক্ষ্যে চিকচিক করে উঠল বুঝি। রূঢ় মানব সরু চোখে দেখল সব। ঘাড়টা সামান্য নুইয়ে এনে আলগোছে দু’হাত বাড়িয়ে রাখল মাহি’র দু’ধারের কাউন্টার টপের ওপর। ধীরে ধীরে মেয়েটার দিকে আলগোছে ঝুঁকে আসতেই চুপসে যায় সপ্তদশী! ভয়ার্ত ঢোক গিলে কাঁপা কাঁপা হাতে খামচে ধরে নিজ বুক। কোমর এক জায়গায় স্থির থাকলেও দোদুল্যমান ক্ষুদ্র দেহটা পেছাতে লাগল ভয়ে ভয়ে। যুবকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিরবে দেখল সব। পুরু বাদামি অক্ষিপুটে আচানক দেখা গেল এক চিলতে ক্রুর হাসির রেশ। পরক্ষণেই সে কেমন গমগমে গলায় আওড়াল,
“ পাদু’টো কি খুব বেশি লম্বা হয়ে গিয়েছে বান্দীর মেয়ে?”
ভয়ে তটস্থ সপ্তদশী। খিঁচে রেখেছে অক্ষিপুট। এরইমধ্যে মুগ্ধের ওমন মোটা কথা কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই ধীরে ধীরে চোখের পর্দা সরালো মাহি। বিভ্রান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“ মানে?”
যুবকের দৃষ্টিতে যেন আগুন ঝরছে। সে আগুনের উত্তাপে চোখে চোখ রাখা দায় সপ্তদশীর। তড়িঘড়ি করে দৃষ্টি ঝোঁকায় কোনমতে। তবে শেষ রক্ষাটুকু কি আর হলো তার? বোকা মেয়ে নজর ঝুঁকাতেই যুবকের শক্তপোক্ত হাতের থাবা আচমকা এসে চেপে ধরল তার কন্ঠা! মাহি ভড়কায়। হুটহাট আক্রমণের তাল সামলাতে না পেরে ভুলবশত হাতের ধারালো নখরের আঁচড় বসায় যুবকের উম্মুক্ত লোমহীন পেটানো বক্ষে। সেদিকে অবশ্য বিন্দুমাত্র উদ্বেগ নেই মুগ্ধের। সে কেমন কটমটিয়ে তাকিয়ে আছে মাহি’র পানে। চোয়াল শক্ত তার, নাকে-মুখে লেপ্টেছে লালাভ আবরণ। সে তৎক্ষনাৎ হাতের জোর বাড়িয়ে হিসহিসিয়ে আওড়ায়,
“ এটা তোর বাপের বাড়ি নয় যে তুই যখন-তখন এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করবি বান্দীর মেয়ে। তোকে কতবার বলেছি ঘর থেকে না বের হতে? সবসময় আমার কথার উল্টোটাই কেন তোর করতে হয় বান্দীর মেয়ে?”
কণ্ঠনালী ভেঙে পড়বার যোগাড় মাহি’র। চোখদুটো নিরবে ঝরাচ্ছে অশ্রু। তবুও তেজ কমেনি সপ্তদশীর। নাকের পাটা ফুলিয়ে জোরালো এক নিশ্বাস টেনে ঝাঁঝাল কন্ঠে থেমে থেমে আওড়াল —
“ কারণ… আমি আপনাকে মানতে বাধ্য নই!”
কথাটা বুঝি যুবকের মাথাভর্তি উত্তপ্ত আগুনে এক কৌটো ঘি ঢালল। সে কেমন তড়াক করে জ্বলে উঠল দেখো! এক ঝটকায় সপ্তদশীর নরম কন্ঠা ছেড়ে দিয়ে আচানক এক হিং স্র চপেটাঘাতে পিষ্ট করল মাহির নরম তুলতুলে কপোল। মুহুর্তেই গাল বাকিয়ে কাউন্টার টপের ওপর আছড়ে পড়ল সপ্তদশী। চোখদুটো তার সঙ্গে সঙ্গে ঝাপসা দেখতে লাগল সবকিছু। মাথাটা ঘুরছে ভনভন করে। কানে উড়ছে মাছি! গালটা বুঝি এক্ষুণি খসে পড়বে পড়বে অবস্থা বেচারির। সে কেমন আলতো করে হাত উঠিয়ে আনলো গালের ওপর। জ্বলতে থাকা অবশ গালটা হাতের একটুখানি শীতল স্পর্শ পেতেই আরাম পেল বেশ। তবে এ আরামের স্থায়িত্ব খুব বেশি সময় ধরে হলোনা। তার আগেই পাঁচটে শক্তপোক্ত রুক্ষ আঙুল আচানক মুঠোয় চেপে ধরল মাহি’র নরম ঘাড়। সপ্তদশী ককিয়ে ওঠে ব্যথায়। ঠোঁট কামড়ে নিজেকে সামলানোর ব্যর্থ প্রয়াসে মত্ত থাকা অবস্থাতেই সপ্তদশীর মাথাটা আলগোছে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নেয় রূঢ় মানব। চোখেমুখে স্পষ্ট আগুন লেপ্টে হুংকার ছুঁড়ে বলে ওঠে,
“ ইউ্য বি’চ! আমাকে মানবি না তো কাকে মানবি তুই? তোর ঐ দু’দিনের নাগরকে মানবি জানোয়ারের বাচ্চা? হাতের কাছে একবার পাই শুধু তোর দু’দিনের নাগরকে, দ্যান তোর চোখের সামনে ঐ বাস্টা’র্ডকে টু’করো টুকরো করে ছাড়বো। মাইন্ড ইট!”
ঘাড়ের রগ ছিড়ে যাবার যোগাড় বেচারির। হাত দিয়ে অনবরত ঠেলে দিচ্ছে যুবকের শক্তপোক্ত হাত। তবুও লাভের লাভ তো হচ্ছেই না! উল্টো ব্যথা বাড়ছে ঘাড়ের। মাহি এবার বড্ড অসহায়! ফুপিয়ে উঠল ঘাড়ের ব্যথায়। নাক টেনে টেনে শুধালো,
“ ব্যাথা পাচ্ছি আমি!”
যুবকের দৃষ্টি নিষ্প্রাণ! কপালের চামড়ায় দগদগে ক্ষত এখনো স্পষ্ট। ঘাড় সমান ওলফ কাট চুলগুলো আজ কপালের সামনে ছড়িয়ে আছে বড্ড এলোমেলো ভাবে। ওমন একটা দগদগে ক্ষততে ঔষধ কিংবা ব্যান্ডেজের ছিটেফোঁটাও নেই! যুবক নিজ ক্ষতের প্রতি বড্ড উদাসীন। চুলের আড়ালে কোনরকমে ঢেকে গিয়েছে ক্ষতের দাগ। মাত্রাতিরিক্ত রাগে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য মানব, ঘাড়ের রগ ফুটেছে বেশ। মুখাবয়বে কঠিনতা লেপ্টে সে আচমকা মাহি’র কথার প্রতিত্তোরে এক অদ্ভুত কন্ঠে শুধালো,
“ আমার চাইতেও বেশি পাচ্ছিস বান্দীর মেয়ে?”
থমকায় মাহি! যুবকের অদ্ভুত কন্ঠে কেঁপে উঠল তার বুক। চোখদুটোতে নেমে এলো এক অদ্ভুত স্থিতিশীলতা। ঘাড়ের ব্যাথা ভুলিয়ে সপ্তদশীর সন্ধানী চোখ খুঁজল যুবকের রূঢ় দৃষ্টির আড়ালে লুকিয়ে থাকা ভাষা। ছোট্ট মস্তিষ্ক তার মত্ত হয়েছে যুবকের হুটহাট কথার মানে খুঁজতে। কি উদ্দেশ্যে কথাটা বলল সে? তার চাইতেও বেশি মানে? মাহি দ্বিধাবোধে ভুগছে। বোকার ন্যায় হতবিহ্বল দৃষ্টে যুবকের পানে তাকিয়ে থাকতেই হঠাৎ করে তোর সন্ধানী চোখজোড়া গিয়ে আটকালো যুবকের কপাল বরাবর লুকিয়ে থাকা দগদগে ক্ষতটায়। নরম দিলের সপ্তদশী, পীড়িত হওয়া স্বত্বেও যুবকের তাজা ক্ষত দেখে চমকে উঠল বেশ। অজান্তেই ডানহাত উঁচিয়ে যুবকের কপাল স্পর্শ করার দুঃসাহস দেখানো মাত্রই তার হাতের নরম কব্জিসন্ধিকে চট করে আঁটকে নেয় মুগ্ধ। শক্ত চোয়ালে কটমট শব্দ তুলে গর্জে বলল,
“ ডোন্ট ইউ্য ডেয়ার টু টাচ মি বান্দীর মেয়ে!”
হতবুদ্ধিকর ভাব নিয়ে তাকিয়ে আছে মাহি। যুবকের দগদগে ক্ষতের পানে ঠায় দৃষ্টি বজায় রেখে শুধালো,
“ আপনার কপালটা এতো খারাপভাবে কাটলো কিভাবে?”
মাথার তালু জ্বলছে রূঢ় মানবের। এক ঝটকায় মাহি’র ঘাড়, কব্জিসন্ধি ছেড়ে দিয়ে সরে দাঁড়ায় এক কদম। কটমট করতে করতে হাত ঠেকালো নিজ কোমরে। অতঃপর তাচ্ছিল্য ভরা কন্ঠে শুধালো,
“ সে-ই কৈফিয়তও কি তোকে দিতে হবে বান্দীর মেয়ে?”
উজ্জ্বল মুখখানা নিমিষেই চুপসে গেল সপ্তদশীর। সেথায় ভর করল একরাশ বিরক্তি! লোকটা যে ওমন ত্যাড়া তাতো আগে থেকেই জানা তার, তারপরও যে কেন সে ওসব জিজ্ঞেস করতে গেল! মাহি শক্ত করল মুখাবয়ব। থাপ্পড় খাওয়া গালে হাত বুলিয়ে তড়াক কন্ঠে আওড়াল,
“ ঘাট হয়েছে আমার! ঘটে বুদ্ধি থাকলে আর কোনোদিন আপনাকে কিছু জিজ্ঞেস করব না।”
তক্ষুনি ঘাড় কাত করে তাকায় মুগ্ধ। দৃষ্টি সরু করে সন্দিহান গলায় সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“ এতো মা’র খেয়েও গলায় দেখি তেজ কমেনি বান্দীর মেয়ের!”
সরু নাকের পাটাটা মুহুর্তেই ফুললো মাহি’র। কাউন্টার টপ থেকে নেমে যেতে তৎপর সে। কাঠকাঠ কন্ঠে শুধালো,
“ কমবেও না ওতো সহজে!”
জিভ খসে কথাটা বের হয়েছে সেকেন্ড দশেক হবে বোধহয়, আর ওমনি নির্দয় মানব তৎক্ষনাৎ এগিয়ে এসে পথ আটকালো মাহি’র। এহেন অতর্কিত কান্ডে বিরক্ত মাহি! তার দু’পায়ের হাঁটু ঠেকেছে যুবকের নাভিকমল বরাবর। সপ্তদশী দাঁত কিড়মিড় করতে করতে হাঁটু দু’খানা সরাতে উদ্যোত হতেই বাঁধ সাধলো যুবক। একহাতে শক্ত করে চেপে ধরল সপ্তদশীর হাঁটু। মাহি বিরক্ত হলো! তিতিবিরক্ততায় মাথা উঁচিয়ে তাকালো পাহাড়সম মানুষটার দিকে। তেঁতো কন্ঠে খেকঁ খেকঁ করে আওড়াল,
“ কি সমস্যা আপনার? আমার হাঁটু ধরলেন কেনো?”
নিখাঁদ সৌন্দর্যের অধীকারী যুবকের বাদামী ঠোঁট দুটো আলগোছে দাঁতের তলায় পিষে গেল কেমন। পিয়ার্সিং করা ঠোঁটের বাঁদিকের অংশখানা এখনো আঁটকে আছে লম্বা ক্যানাইন দাঁতের নিচে। সে যেন এক রক্তচোষা! কি লম্বা তার দাতঁ কপাটির উপরিভাগের ক্যানাইন দাঁত দুটো। যুবক কিয়তক্ষন রহস্যময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সপ্তদশীর পানে। অতঃপর শান্ত অথচ রূঢ় কন্ঠে হিসহিসিয়ে বলল,
“ তোর তেজ কমাতে!”
কেঁপে ওঠে মাহি! বুকের খাঁচায় লুকায়িত অঙ্গটা আচমকা মুচড়ে ওঠল অজানা ভয়ে। যুবক বেশ দেখল মেয়েটার ভয়ার্ত মুখখানা। তা পরোখ করতেই সে-কি পৈ শা চিক আনন্দ তার! যুবক আলগোছে ঝুঁকে এলো মাহি’র পানে। সপ্তদশী তৎক্ষনাৎ দু’হাতে ঠেলতে লাগল বলিষ্ঠ মানবকে। তবে বালাইষাট! ওমন একটা পাহাড়সম মানবকে কি আর তার মতো মাছি দূরে ঠেলতে পারে? সপ্তদশী নিজের সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করেও এক চুল নাড়াতে পারেনি মুগ্ধকে। শেষমেশ আর সইতে না পেরে মাহি কেমন চেঁচিয়ে বলে ওঠে,
“ খবরদার আমার কাছে আসবেন না! নাহলে…..”
বাকিটা কন্ঠ অব্দি আসার আগেই আঁটকে গেল সপ্তদশীর। জিভের ডগা হয়ে গেল বাকশূন্য! তার ছলছল চোখজোড়ার ভীতু চাহনি একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে যুবকের মুখপানে। সপ্তদশীর ক্ষুদ্রকায় দেহটা কাঁপছে ভীষণ। শত হলেও, বুক বরাবর ঠেকেছে রিভলবারের ঠান্ডা নল, ভয় না পেয়ে থোড়াই উপায় আছে তার! মাহি ঢোক গিলছে ক্ষনে ক্ষনে। যুবকের ক্রুর হাসি মাতিয়ে রেখেছে তারই অধর রেখা। চোখেমুখে খেলছে একরাশ রহস্যময় ভাবস্রোত। যুবক ঘাড় নুইয়ে আনে সামান্য। মাহি’র বুক বরাবর বন্দুকের শীতল নলটা আরেকটু ঠেলে দিয়ে হিসহিসিয়ে বলল,
“ স্প্রেড ইউ্যর লেগস!”
আকাশ ভেঙে ধরনীতে টপকালো সপ্তদশী! চোখদুটো বিস্ময়ে কোটর ছাড়িয়ে বেরিয়ে আসবে আসবে ভাব। মুখাবয়বের অভিব্যক্তিকে সনাক্ত হচ্ছে একরাশ হতবাকতা। সপ্তদশী ভুলেই বসল যুবকের কথা। এদিকে মুগ্ধ নামক বেপরোয়া পুরুষ কথা পুনরাবৃত্তিতে অভস্ত্য নয়। এ যে তার শানের খেলাফ! যুবক চোয়াল ফোটালো ফের। তক্ষুনি মাহি’র বুক থেকে বন্দুকের নল উঠিয়ে এনে আচমকা ঠেকালো সপ্তদশীর ললাট বরাবর। ফের হুংকার ছুঁড়ে আওড়াল,
“ ইউ্য ফা’কিং বি’চ! জাস্ট ওপেন ইউ্যর লেগস।”
তৎক্ষনাৎ হাঁটু দ্বয়ের মাঝে দুরত্ব টানলো সপ্তদশী। বুক ভাঙা আর্তনাদে ভারী তার বুক! চোখদুটো আর মানছেনা বাঁধ, নিরবে ঝরাচ্ছে অশ্রু! যুবক আলগোছে পা বাড়ায় সম্মুখে। ধীরে ধীরে সপ্তদশীর কপাল থেকে রিভলবারের নল নামিয়ে তা রাখল কাউন্টারের ওপর। অতঃপর নিজ রুক্ষ আঙুলের শক্ত থাবায় আচানক আঁকড়ে ধরল মাহি’র নরম চোয়াল। সপ্তদশী চোখ খিচেঁ ককিয়ে ওঠে এবার। চোয়াল কটমট করছে তার, এই বুঝি চোয়ালটা ভেঙে গুড়িয়ে পড়বে মাটিতে। অথচ মুগ্ধ নামক গম্ভীর মানব শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে মাহি’র তিরতির করে কাঁপতে থাকা অধরযুগলের পানে। যুবকের নয়ন আটকাচ্ছে না আজ, নয়নে মেতেছে তেজওয়ান ভাব। সে কেমন ভ্রু উঁচিয়ে শ্লেষাত্মক ইঙ্গিত জুড়ে আওড়াল,
“ ক্যান আই টেস্ট ইউ্যর লিপস ফর ওয়ান্স বান্দীর মেয়ে?”
নাক কুঁচকায় মাহি। ত্বরিত বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকায় সম্মুখে। বেহায়া যুবক কেমন শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে হাসছে দেখো! সপ্তদশী তক্ষুনি চোখেমুখে একরাশ ঘৃণা লেপ্টে আগুন কন্ঠে আওড়াল,
“ এসব বেহায়াপনা করতে আপনার লজ্জা করছে না নোংরা লোক?”
ঠোঁট বাঁকায় রূঢ় মানব! শুষ্ক অধোরজোড়া জিভের ডগা দিয়ে আলতো করে ভিজিয়ে নিয়ে, ধীরে ধীরে মুখ এগোয় মাহির দিকে। তাচ্ছিল্যের ভান ধরে হিসহিসিয়ে বলে,
“ না করেনা!”
চোয়ালের ব্যথায় মুষড়ে যাচ্ছে সপ্তদশী। মুখটা অন্যত্র ঘোরানোর জো নেই তেমন। বেহায়া লোকের হাত থেকে নিজেকে বাঁচানোর শেষ প্রয়াসে কোনরকমে চোখ খিঁচে বলে ওঠে,
“ আমার এই ছোট্ট জীবনে আমি যদি কাউকে সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করে থাকি, তাহলে সেটা নিসন্দেহে আপনি মি: বিস্ট!”
চোয়ালের পেশি টানটান হলো মুগ্ধের। ঠোঁটে খেলল তাচ্ছিল্যের হাসি। সপ্তদশীর নরম-সরম ঠোঁটযুগল ছুঁই ছুঁই তার রুক্ষ অধরযুগল। সে কেমন নাটকীয় ভান ধরে তক্ষুনি মাহি’র বাহাতখানা চেপে ধরে জোর করে নামিয়ে আনলো নিজ ট্রাউজারের সম্মুখভাগে। বিপদসীমা প্রায় ছুঁই ছুঁই অবস্থা মাহি’র হাত! সপ্তদশী নাকমুখ কুঁচকে হাত গুটিয়ে নেবার প্রয়াসে মত্ত। অথচ বেয়াদব ছেলেটাকে দেখো! মেয়েটাকে ইচ্ছে করে জ্বালাতন করতে শ্লেষাত্মক কন্ঠে বলে ওঠে,
“ গুনে দেখতো বান্দীর মেয়ে! তাতে আমার কয়টা বা ল ছেঁড়া গেল!”
লজ্জায় কান গরম হয়ে গেল সপ্তদশীর। কানের ছিদ্র দিয়ে নির্ঘাৎ বের হচ্ছে ধোঁয়া। নিজ অসহায়ত্বে ভেঙে পড়েছে বোকা মেয়ে, সহসা কেঁদে উঠে ফুপিয়ে ফুপিয়ে। নির্দয় মানব বাঁকা হাসলো এপর্যায়ে। ধীরে ধীরে নিজের রুক্ষ অধরযুগল আলগোছে রাখল সপ্তদশীর তুলতুলে অধরের ওপর। মাহি’র ফোপাঁন বাড়ল বোধহয়! ছটফটাতে লাগল সদ্য জবাই হওয়া পশুর ন্যায়। রূঢ় মানব আগের ন্যায় ঠায় অবস্থানে থেকেই হিসহিসিয়ে শুধালো,
“ মেয়েদের তেজ কাঁচের চাইতেও বেশি ভঙ্গুর হয় বান্দীর মেয়ে! সামান্য একটা আঘাত আর ওমনি তোদের তেজ, অহংকার সবটা চূর্ণবিচূর্ণ! ভুলেও আমায় রাগাস না মেয়ে, একবার যদি আমি নিজের পশুত্বে নামি, তাহলে সবার আগে তোকে ছিড়েখুঁড়ে খেয়ে ফেলব! নেহাৎ তোর বয়স কম, আমার মতো বিস্টকে সামলাতে গেলে ম র ণ নিশ্চিত তোর। সো ডোন্ট ইউ্য ডেয়ার টু ক্রস ইউ্যর লিমিটস! সময়ের আগে অকাজ করতে চাচ্ছিনা!”
সবগুলো কথা সপ্তদশীর ঠোঁটে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলে গিয়েছে রূঢ় মানব। সপ্তদশী নিরবে শুনলো সব। চোখদুটো তার বুঁজে রাখা। মুগ্ধ আলগোছে ঠোঁট সরালো কথা শেষে। ঝটকা মে’রে সপ্তদশীর চোয়াল ছেড়ে দিয়ে পিছিয়ে দাঁড়াল দু-কদম। উম্মুক্ত পেটানো দেহখানা টানটান করে দুহাত গুঁজল পকেটে। পরক্ষণে কঠিন মুখে ধমকে বলল,
“ নাউ গো ব্যাক টু ইউ্যর রুম।”
এক বাক্যেই কাজ হলো এবার। সপ্তদশী ভীষণ বাধ্যভাব নিয়ে তড়িঘড়ি করে নেমে এলো কাউন্টার টপ থেকে। অতঃপর কিচেন ফ্লোরের এককোণে গা গুটিয়ে বসে থাকা ভয়ার্ত কিউটিকে কোলে তুলে দিলো এক ভো দৌড়! তবে যাওয়ার সময় আবার কি মনে করে হুট করেই পা থামালো সপ্তদশী। বোকার ন্যায় ঘাড় বাকিয়ে পেছনে ঘুরতেই চোখাচোখি হলো রূঢ় মানবের সাথে। রূঢ় মানব ঘাড় সামান্য কাতঁ করে ঠোঁট কামড়ে রেখে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে তার দিকে। মাহি ভড়কায়! শুকনো ফাঁকা ঢোক গিলতে গেলেই হুট করে দেখল যুবক বাহাত বের করেছে পকেট থেকে। রয়েসয়ে বাহাতের মিডল ফিঙ্গার উঁচিয়ে মেয়েটাকে দেখিয়ে দিয়ে হিসহিসিয়ে বলে ওঠে,
“ ফা’ক ইউ্য বান্দীর মেয়ে!”
বেয়াদব ছেলের বেয়াদবি দেখে গা গুলিয়ে ওঠে মাহি’র। নাকমুখ সিটকে তক্ষুনি চলে গেল কিচেন থেকে। সপ্তদশী দৃষ্টি সীমানার বাইরে যেতেই রঙ পাল্টালো যুবকের মুখ। সেথায় এবার ভর করল ক্রূরতা। দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে যাচ্ছে মুগ্ধ। শক্ত হাতে ঘাড় ডলতে ডলতে বিড়বিড়িয়ে আওড়াল,
“ ফা’ক অফ!”
থরথর করে কাঁপছে মেইডস! নতমস্তকে হাঁটু গেঁড়ে মার্বেলের মেঝেতে বসে আছে সবাই। অদূরের উঁচু গদিতে পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছে মনস্টার। ডানহাতে তার একখানা স্নাইপার, যার তল ঠেকেছে ফ্লোরে! যুবক বাহাতে সিগার চেপে ধরে টান বসাচ্ছে ক্ষনে ক্ষনে। মুখভর্তি সিগারের কলুষিত ধোঁয়া উড়ছে মুখমন্ডলের চারপাশে। গদি হতে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে এডউইন। গম্ভীর দৃষ্টি তার মেইডদের দিকে নিবদ্ধ! প্রায় বেশ কিছুক্ষণ পর কামরার নিরবতা ভেদ করে মনস্টার শব্দ তুললো কন্ঠায়। গমগমে গলায় আওড়াল,
“ মেয়েটার ঘরে খাবার দিয়ে আসিসনি কেনো?”
মেইডরা সব কাঁপছে! তাদের ভাষ্যমতে মেয়েটা মনস্টারের নিকট স্পেশাল। তার খাবার-দাবারে কোনরূপ কমতি হলে মনস্টার নিশ্চয়ই কাউকে ছাড় দেবে না। তাইতো ভয়ের চোটে কেউ আর সাহস করেনি মেয়েটার খাবার আনা-নেয়ায়। এদিকে মনস্টারের কথা শোনার পরও সকলের মৌনতা দেখে চোয়াল শক্ত হলো এডউইনের। কোমরের পিঠে দু’হাত বেঁধে যুবক কঠিন গলায় ধমকে বলল,
“ সবাই কি বোবা হয়ে গিয়েছিস? শুনতে পাচ্ছিস না মনস্টার কি বলছে?”
মেইডদের মধ্য থেকে এবার আগ বাড়িয়ে কথা বলল মধ্যবয়সী এক রমণী। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে কোনমতে বলতে লাগল,
“ আসলে মনস্তার! আমরা ভয় পেয়েছিলাম, ভেবেছিলাম আমাদের রান্না বা আমাদের দেয়া খাবার যদি মিসের পছন্দ নাহয়, তখন তো আপনি আমাদের মে’রে ফেলতেন। তাই…”
“ এখন কি না মে’রে থাকব?”
মেইডের কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে মনস্টারের গমগমে কন্ঠ শোনা গেল। তক্ষুনি কেঁপে ওঠে সবাই! মনস্টার নামক বলিষ্ঠ পুরুষ ঠোঁটের ফাঁকে সিগার গুঁজে রেখেই স্নাইপার তুলল কাঁধে। অতঃপর স্নাইপারের লম্বা নল মেইডদের দিকে ঘোরাতে ঘোরাতে ডানহাতে ট্রিগার চাপলেন নির্দয় মানব। পরমুহূর্তেই ঝনঝনানোর বিকট শব্দে কেঁপে উঠল কামরার প্রতিটি দেয়াল। বৃষ্টির ন্যায় গু লি বর্ষণে মুহুর্তেই নেতিয়ে গেল কয়েক জোড়া প্রাণ। সারা ঘরময় ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেল লহুর দাগ। মার্বেলের তকতকে ফ্লোর ভেসে গেল তাজা লোহুর বহরে।
প্রায় মিনিট দশেক গোলাবর্ষণ চালিয়ে অবশেষে থামল মনস্টার। স্নাইপারের চৌকস ডগাটা কেমন আগুনের ন্যায় লাল হয়ে গিয়েছে। মনস্টার আলগোছে তা কাঁধ থেকে নামিয়ে এক ঝটকায় ছুঁড়ে ফেলল মেঝেতে। ঠোঁটের কোণে গুঁজে রাখা সিগারটা ফের হাতে নিয়ে যুবক কেমন নির্লিপ্ত ভঙ্গিমায় ডাকল,
“ এডউইন!”
এক ডাকে সাড়া দেবার মানুষ এডউইন। তৎক্ষনাৎ এগিয়ে এসে দাঁড়ালো মনস্টারের গদির পাশে। মাথাটা নুইয়ে রেখে আনুগত্যপ্রবন কন্ঠে বলল,
“ জ্বি মনস্তার!”
সিগারে লম্বা টান বসালো মুগ্ধ। রয়েসয়ে সটান হয়ে দাঁড়াল বসা ছেড়ে। পরক্ষণে দু’হাত পকেটে গুঁজে যুবক পা বাড়ায় সম্মুখে। শূন্য পায়ে ফ্লোরে ভেসে থাকা উষ্ণ ল হুতে আলগোছে পায়ের তালু ডুবিয়ে রেখে দাঁড়ায় নির্দয় মানব। এহেন কান্ডে স্বস্তিতে শরীর থেকে সকল ক্লান্তি নেমে যাচ্ছে তার। যুবক সিগারে ফুকঁ বসিয়ে হুংকার ছুঁড়ে বলে ওঠে,
“ এখন থেকে ওর কোনকিছু চাওয়ার আগেই যেন ওর হাতের কাছে সব চলে যায়! হোক সেটা খাবার অথবা অন্যকিছু! গট ইট?”
গম্ভীর মুখে ওপর নিচ মাথা নাড়ায় এডউইন। পরক্ষনে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে রহস্যময় হাসির রেশ টেনে মনে মনে আওড়ায়,
“ তাতো দিবই মনস্তার!”
রাত প্রায় ১০টা! পেটপুরে খেয়েদেয়ে আজ আর নড়তে পারছেনা সপ্তদশী। একসঙ্গে পছন্দের হরেকরকম খাবার পেয়ে হাবাত্বের ন্যায় গপগপিয়ে গিলেছে দু-প্লেট ভাত। শুধু কি সে? তার কিউটিও যে খেয়েছে অনেককিছু। পেট ফুডের সাথে খেয়েছে ইস্টার্ন ফুড। এতদিনে পেটপুরে খেতে পেরে সে-কি আনন্দ মশাইয়ের। মাহি পুরো ঘরময় পায়চারি চালাচ্ছে। এক রাতেই যা খাবার খেয়েছে না! ওতো খাবার হজম হতেও তো সময় লাগছে বেশ। সপ্তদশী গুটিগুটি পায়ে হাঁটছে, সঙ্গে দৌড়চ্ছে তার কিউটি। দু’জনার মধ্যে দেওয়া-নেওয়া হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন কথা। ঠিক তখনি ঘরের দরজার কাছ থেকে ধেয়ে এলো এক তরুণীর সুমিষ্ট কন্ঠ,
“ আসব মুনলাইট?”
পায়ের গতি থামল মাহি’র। ঘাড় বাকিয়ে তাকায় পেছনে। দরজার কাছে মিলাকে ওমন অনুমতির আশায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভ্রু গোটায় সপ্তদশী। চোখদুটো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র করে নিয়ে সন্দিগ্ধ গলায় বলে ওঠে,
“ অনুমতি নেবার কি আছে মিলা? চলে এসো।”
অনুমতি পেয়ে তবেই ভেতরে ঢুকল মিলা। গায়ে তার এখনো সকালের মলিন শাল। গম্ভীর মুখে গুনে গুনে পদচারণায় মিনিট দুয়েকে চলে এলো মাহি’র নিকট। এসেই কোনরূপ বলাকওয়া ছাড়া আচমকা টেনে ধরল মাহি’র নরম কব্জিসন্ধি। এহেন হুটহাট কান্ডে অবাক মাহি! হতবাক চোখে মিলার পানে তাকাতেই মিলা তাকে একপ্রকার টেনেহিঁচড়ে নিয়ে বসালো বিছানায়। অতঃপর নিজেও বসল মেয়েটার পাশে। মাহি এখনো হতবাক নেত্রে তাকিয়ে আছে। ভ্রু গুটিয়ে গম্ভীর মুখে যেইনা কিছু বলতে যাবে ওমনি মিলা নিজ শালের ভেতর থেকে একখানা চিঠি বের করে এনে আলগোছে ধরিয়ে দেয় মাহির হাতে। মাহি হতভম্ব! পুরনো দিনের ভিন্টেজ পেপারে তৈরী একখানা খাম, সে খামে আদৌও কি আছে তা জানতে কৌতুহলী মাহি। তৎক্ষনাৎ আগ্রহী দৃষ্টে তাকালো মিলার পানে। চোখেমুখে একরাশ হতবাকতা লেপ্টে সন্দিষ্ট কন্ঠে আওড়াল,
“ কি এটা? কে দিয়েছে?”
মিলার গম্ভীর মুখে এতক্ষণে ফুটলো এক টুকরো মুচকি হাসি। সে আলগোছে ডানহাতে ছুঁইয়ে দিলো মাহি’র নরম গাল যেখানে এখনো মন্সটারের থাপ্পড়ের আঘাত স্পষ্ট। মিলা একদৃষ্টে কিয়তক্ষন চেয়ে রইল মেয়েটার গালের দিকে। পরমুহূর্তেই ছলছল হয়ে উঠল তার চোখ। মাহি তখন ফের জিজ্ঞেস করে ওঠে ,
“ বললে না যে! এটা কার চিঠি?”
ধ্যান ভাঙল মিলার। তড়িঘড়ি করে নিজের চকচকে দৃষ্টি লুকলো এদিকওদিক। ভেজা চোখে আলতো হেসে শুধালো,
“ তোমার পাগল প্রেমিক!”
কপালের ভাঁজ গাঢ় হলো সপ্তদশীর। চোয়াল ফুটিয়ে আচমকা হাতের খামটা ছুঁড়ে ফেলল মেঝেতে। পরক্ষণে গমগমে গলায় আওড়াল,
“ আমার কোনো প্রেমিক নেই মিলা! যখন-তখন এসব উদ্ভট কথা আমায় না বললে আমি খুশি হবো।”
মিলা ফের গম্ভীর হলো। সর্তক দৃষ্টিতে ঘরের দরজার কাছটা পরোখ করে ঘুরে তাকালো মাহির পানে। রয়েসয়ে চাপা স্বরে বলতে লাগল,
“ যে তোমায় নিজের প্রাণের চাইতেও বেশি ভালোবাসে, তাকে তোমার পাগল প্রেমিক বলব না তো কি বলব মুনলাইট? তুমি হয়তো জানোই না, সে ছেলে একমাত্র তোমাকে এই নরক থেকে বের করতে নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলেছে বারবার।”
এহেন কথায় যারপরনাই অবাক মাহি! সহসা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় মিলার পানে। হতবাক কন্ঠে বলে,
“ মানে?”
মিলা ফের দৃষ্টি ঘোরায় দরজার দিকে। রয়েসয়ে সর্তক হয়ে বসল নড়েচড়ে। নিজ উদ্যোগে মাহি’র ডানহাতটা টেনে এনে নিজ হাতের মুঠোয় চেপে ধরে, শুকনো অধরজোড়া জিভ দিয়ে খানিক ভিজিয়ে বলতে লাগল,
“ এখন এতোকিছুর মানে বলতে পারব না মুনলাইট। শুধু এটুকু মনে রাখো, এখানে আর বেশিদিন থাকা তোমার জন্য ঠিক না। যে কোনোদিন, যেকেউ এসে তোমায় মে’রে ফেলতে পারে। আর আমি বেঁচে থাকতে এমনটা কক্ষনো হতে দিব না মুনলাইট, কিন্তু তোমার আগে আমার যদি কিছু হয়ে যায় তখন? তখন আমি তোমায় কিভাবে সেভ করব বলো? তাই আমার এ দেহে প্রাণ থাকতেই আমি তোমাকে সহিসালামত এখান থেকে বের করে ছাড়ব।”
এহেন কথাগুলো যেন মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে সপ্তদশীর। তার চোখেমুখে অবোধের ছাপ স্পষ্ট! সে ভ্রু গুটিয়ে সন্দিহান গলায় আবারও জিজ্ঞেস করল,
“ কে মারবে আমায়? ঐ বিস্ট?”
মিলা আহত হাসি ফোটালো ঠোঁটের কোণে। আলতো করে মাহির গালে হাত বুলিয়ে ধরে আসা কন্ঠে বললো,
“ তুমি আপাতত যেখানে আছো, এটা একটা নরক! যেখান থেকে কেবলমাত্র সে-ই বেরুতে পারবে, যে কিনা শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকবে। ঠিক এই কারনে এখানকার প্রতিটি মানুষ একে-অপরের মরণ চায়। ইতোমধ্যেই অনেকে এই কাজ করেছে! অবশ্য এই আদেশ স্বয়ং রুশদী কিং দিয়েছে। শোনো মুনলাইট…”
থামল মিলা। শুকনো গলাটা খানিক ঢোক গিলে ভিজিয়ে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“ তোমার প্রাণ সংকটে আছে মুনলাইট! মনস্টার জেনে-বুঝে তোমায় এই প্যালেসে রেখে গিয়েছে। যদি কেউ তোমায় মে’রে ফেলে তাহলে ওকে, নাহলে সে নিজে মারবে তোমায়! অর্থাৎ তুমি মনস্টারের অধীনে থাকলে আজ নাহয় কাল তোমার মরণ নিশ্চিত! যেটা আমি এবং মায়াঙ্ক কেউ চাইনা। আমরা চাই, তুমি অন্তত বেঁচে থাকো।”
মস্তিষ্ক ফাঁকা হয়ে গিয়েছে সপ্তদশীর। তার মতো ক্ষুদ্র মানুষটার প্রাণও যে এতোটা সংকটে থাকতে পারে তা হয়তো কল্পনাতীত ছিল তার জন্য। মাহি থমকে বসে আছে। মিলার চোখ দিয়ে নিরবে গড়াচ্ছে অশ্রু।
একখানা বড়সড় টিভি পর্দার সামনে দাঁড়িয়ে আছে মাফিয়া মনস্টার। একহাত তার ট্রাউজারের পকেটে গুঁজে রাখা, আরেক হাতে হুইস্কির বোতল, আঙুলের ভাঁজে জ্বলন্ত সিগার। যুবক ক্ষনে ক্ষনে চুমুক বসাচ্ছে হুইস্কির বোতলে। তার বাদামী চোখদুটো কেমন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সম্মুখের টিভি পর্দায়। পর্দায় দেখা যাচ্ছে সপ্তদশীর ঘরের দৃশ্য! মিলা কাঁদছে, মাহি বসে আছে তার সম্মুখে। মেয়েটা বুঝি কেঁদে দিবে দিবে অবস্থা। তার হাতে একখানা চিঠি! মাত্রই মিলা উঠিয়ে দিয়েছে ফ্লোর থেকে। যুবক আগুন চোখে দেখছে সব। মাত্রাতিরিক্ত রাগে গজগজ করছে সে। মুখ ভরে ভরে গিলছে হুইস্কি! পেছন থেকে এডউইন তখন গম্ভীর মুখে বলে ওঠে,
“ মনস্তার! জাস্ট একবার আদেশ করুন। উনাকে না আটকালে উনি আবারও পালাবে। আপনি বললে আমি এক্ষুণি খুঁজে নিয়ে আসব ঐ ছদ্মবেশীকে।”
মনস্টার দাঁত কিড়মিড় করছে। পকেট থেকে হাত বের করে এনে ঘাড় ডলছে অনবরত। সাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করতে করতে পরক্ষণে বলল,
“ ওকে এখনি আঁটকে ফেললে, আমি ঐ বান্দীর মেয়েকে প্রাণে মা’রব কি করে?”
থামলেন রূঢ় মানব! টিভি পর্দা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে গটগটিয়ে হাঁটা ধরল উল্টোপথে। যাবার সময় কটমটিয়ে বলে গেল,
“ এডউইন! গার্ডেনে একটা কবর খুঁড়ে রাখ। আর প্যালেসের সিকিউরিটি কমিয়ে দে। ঐ বান্দীর মেয়ে যেদিন আবারও আমার প্যালেস থেকে পালানোর দুঃসাহস দেখাবে সেদিনই হবে ওর আর ওর নাগরের জীবনের শেষদিন। সো খেলতে দে ওকে!”
মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৩৩ (২)
এডউইন শুনল সব! মুহুর্তেই তার চোয়াল হলো শক্ত। সে ফের টিভির দিকে চোখ রাখতেই দেখল মিলা হেঁটে এসে দাঁড়িয়েছে ঝাড়বাতির নিচে। আচমকা সে মাথা উঁচিয়ে তাকায় ক্যামেরা বরাবর। পরক্ষণে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে রহস্যময় বাঁকা হাসির রেশ টেনে, আলগোছে নিজের চোখ থেকে অশ্রু মুছে নেয়। তারপর কেমন চোখ মে’রে সরে যায় সেখান থেকে। এডউইন তখন কটমট করে বিড়বিড় করল,
“ ফা’ক ইউ্য মিলা!”

Late kn korlen apu,,apnr lekha ei golpota anek Valo lagtese
আপু প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ 😭 মির্জা সায়ন মুগ্ধ এর ৩৫,৩৬,৩৭ নাম্বার পর্ব টা দাও প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ
Apu golpota apni 2 /3 din por por Dile tw valoi lagbe na …kintu na pore o je Santi pacchi na apni pls kosto Kore ranning golpo diben 😊