Home মির্জা সায়ান মুগ্ধ মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৩৭

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৩৭

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৩৭
jannatul firdaus mithila

রাতের ওমন বিদঘুটে অন্ধকার খুব একটা কাবু করতে পারেনি কক্ষের বর্তমান আবহকে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কামরাটির চারপাশে ঝুলছে উজ্জ্বল জোনাকির ন্যায় স্ট্রিং লাইট! ছড়াচ্ছে মৃদুমন্দ আলো। সে আলোর নরম পরশ বুঝি বেশ নিপুণতার সঙ্গে ছুঁয়ে যাচ্ছে ঘুমন্ত সপ্তদশীর সর্বাঙ্গ। মখমলি বিছানার একদম গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়সম মানুষটার নিশ্বাসের গতি বাড়ছে ক্রমশ। শক্তপোক্ত পাদু’টোর হাঁটু বোধহয় বড়ো ক্লান্ত আজ। যুবকের অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তারা কেমন নিজেদেরকে ভেঙে বসল জমিনে। রূঢ় মানবের চোখদুটো আগে থেকেই অবাধ্য। আজ বুঝি নিজেদের অবাধ্যতার সকল সীমানা অতিক্রম করবার পায়তারায় মত্ত তারা, কেমন গভীর দৃষ্টে তাকিয়ে আছে ঘুমন্ত মাহি’র নরম পেল্লব মুখপানে। মুগ্ধ স্থির হতে চেয়েও পারছেনা কেন যেন। মস্তিষ্ক তাকে বড্ড শাসাচ্ছে! ধিক্কার জানাচ্ছে তার এহেন উদ্ভট কর্মের জন্য। ডানহাতের মুঠোয় অবহেলায় আঁটকে থাকা রিভলবারটা যেন গুনগুনিয়ে তাকে বলছে —

“ মালিক! ট্রিগার চাপুন।”
তবে কান্ড দেখো! মুগ্ধ কেমন দিনদুনিয়া ভুলে তাকিয়ে আছে মাহি’র পানে। সপ্তদশীর ঘুমের আবরণে ঢেকে থাকা পেল্লব মুখখানা যেন চোখ জুড়িয়ে দেবার মতো এক টুকরো শান্ত বিকেল। কি এক মায়া সেথায়! যে মায়ার বিধ্বংসী ডাক ধীরে ধীরে গলিয়ে দিতে চাচ্ছে নির্দয় মানবের ইস্পাত-দৃঢ় কঠোরতাকে। সপ্তদশীর ছোট্ট তুলতুলে নাকের ডগাটা আজও লাল টুকটুকে রঙ ধরেছে। মুগ্ধের কুঁচকান দৃষ্টি নিরবে পরোখ করছে তা। বান্দীর মেয়ের নাকের ডগাটা কি সবসময় এমন লাল থাকে? নাকি তার উপস্থিতিতে রঙ পাল্টালো? আপন চিন্তায় কপাল গোছালো মুগ্ধ। নিরব দৃষ্টি ধীরে ধীরে গড়িয়ে আনলো মাহি’র নরম আধখোলা গোলাপি ঠোঁটজোড়ার পানে। মুহূর্তেই এক অদ্ভুত তৃষ্ণায় ধুঁকে উঠল নির্দয় মানবের বুক। কন্ঠনালীর লম্বাটে অংশে দেখা দিলো গ্রীষ্মের বিদঘুটে খরা। তামাকে পোড়া বাদামী ঠোঁটদুটোর সঙ্গে গভীর বাদামী চোখদুটোও কেমন তৃষ্ণার্ত হলো যুবকের। সে তৎক্ষনাৎ মুখগহ্বর থেকে সিক্ত জিভখানা বের করে এনে কোনমতে ভিজিয়ে নিলো নিজ শুষ্ক অধরজোড়া। তবে বালাইষাট! অধরের তৃষ্ণা মিটলেও তার চোখদুটোর তৃষ্ণা যেন আজ মিটবেই না। তারা কেমন তৃষ্ণার্ত চাতকের ন্যায় তাকিয়ে আছে ঘুমন্ত মেয়েটার নিষ্পাপ মুখশ্রীর পানে।

যুবক বড্ড দুঃসাহসী! নিজ দুঃসাহসের কবলে পড়ে, ফ্লোরের ওপর দু-হাটুঁ ভর দিয়ে এগিয়ে এলো খানিকটা। তার দৃষ্টি নিষ্পলক। আপাতত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে মাহি’র নরম তুলতুলে কপোলদ্বয়। কি সুন্দর পটকা মাছের মত ফুলে আছে তারা! যেন গালভর্তি খাবার নিয়ে ঘুমচ্ছে মেয়েটা। ঠোঁটদুটোও কেমন বাচ্চাদের ন্যায় উল্টে রেখেছে দেখো। মুগ্ধ হাসল! এক অদ্ভুত মুগ্ধতায় গালের একপাশে ছড়িয়ে গেল তার নিখুঁত ঠোঁটের রেখা। পিয়ার্সিং করা ঠোঁটের অল্প অংশটুকু আলগোছে চলে গেল ধারালো ক্যানাইন দাঁতের নিচে। সেথায় মনমতো পিষ্ট হলো বেচারা! মুগ্ধ এখন নিজেতে নেই। রূঢ়, নির্দয় মানবের মাথায় এমুহূর্তে ভর করেছে মাহি নামক সপ্তদশীর বিধ্বংসী মোহ। সে মোহের স্থায়ীত্ব কতক্ষণ তা বোধহয় যুবক নিজেও জানেনা। মুগ্ধ শান্ত! এক অদ্ভুত শান্ত ভাব নিয়ে সন্তর্পণে নিজ হাতদুটো উঠিয়ে রাখল বিছানার পাশে। মেয়েটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে আলগোছে মাথা রাখল হাতদুটোর ওপর। অতঃপর নিজ বাদামী চোখদুটোর পরম বিশুদ্ধতায় মোড়ানো দৃষ্টি দিয়ে মেয়েটাকে আলতো করে ছুঁয়ে দিতে লাগল মুগ্ধ। কি আশ্চর্য সৌন্দর্য সে ছোঁয়ায়! হাত দিয়ে নয় বরং চোখ দিয়ে ছুঁয়ে দিচ্ছে গভীরভাবে। ঘুমন্ত সপ্তদশী বোধহয় অনুভব করল সে ছোঁয়া। নিদ্রামগ্ন তনু তার মুহুর্তেই নড়ে উঠল খানিক।

ক্ষুদ্র মুখখানা ঘুরিয়ে নিলো বালিশের অন্তরালে। মুহুর্তেই মোহময় ঘোরের পর্দায় ছেদ ঘটল মুগ্ধের। কপাল গুটিয়ে গেল বিরক্তিতে! সে গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখছিলো মেয়েটাকে। অথচ তার মনোযোগে তারই অনুমতি ছাড়া ব্যাঘাত ঘটানোর দুঃসাহস কিভাবে দেখালো বান্দীর মেয়ে? দাঁতে দাঁত চাপে মুগ্ধ। রাগ-ক্ষোভে তার এমুহূর্তে ইচ্ছে করছে মেয়েটার নরম তুলতুলে গালে চটাশ করে এক-দুটো চড় বসিয়ে দিতে। কিন্তু এতো সুন্দর ইচ্ছে থাকা স্বত্বেও মেয়েটার গালে হাত উঠছেনা মুগ্ধের। কেন যেন তার অবচেতন মনটা বারবার বিরোধ করছে মেয়েটার ওমন সুন্দর ঘুমখানা ভাঙতে। নিজ মনের এহেন অবাধ্য চিন্তাভাবনায় বড্ড বিরক্ত মুগ্ধ। তক্ষুনি চোয়াল শক্ত করে উঠে গেল বসা ছেড়ে। মসৃণ ললাটে গোটাকতক ভাঁজ ফেলে চিড়বিড়াচ্ছে মুগ্ধ। মেরুদণ্ড বাঁকিয়ে ত্বরিত গতিতে ফ্লোরের এককোণে অযত্নে হেলে থাকা রা-মের বোতলখানা তুলে নিলো হাতে। অতঃপর অস্থির ভঙ্গিতে শক্ত দাঁতের ফাঁকে বোতলের ক্যাপ চেপে ধরে এক ঝটকায় খুলে নেয় বেপরোয়া যুবক। এক থুকে ক্যাপটা যে কোথায় ফেলল কে জানে! পরক্ষণেই গপগপিয়ে গিলতে লাগল তিক্ত স্বাদের অভিজাত পানীয় মাদক। এক নিমিষে অর্ধেকটা পানীয় গিলে তবেই থামল মুগ্ধ।

বড়ো বড়ো নিশ্বাস ফেলে নিজের উপচে পড়া রাগ সামলাতে ব্যস্ত সে। কটমট দৃষ্টিযুগল পুরো ঘরময় ঘুরে আচমকা গিয়ে ঠেকল মাহি’র মুখপানে। তক্ষুনি থমকায় মুগ্ধ। সপ্তদশীর পেল্লব মুখখানার ওপর বিক্ষিপ্ত আকারে আছড়ে পড়ছে কিছু বেয়াদব কেশগুচ্ছ। সপ্তদশীর গৌরবর্ণা সুশ্রী মুখমণ্ডলে নিজেদের অধিকার বসিয়ে উড়ছে তারা। মুহুর্তেই যুবকের বাদামী চোখদুটো অটল হলো! হুট করেই বুকের বাঁপাশটা বড্ড জ্বলছে তার। এক অজানা কারণেই মাথার তালু গরম হচ্ছে রাগে। অবাধ্য চুলগুলোর কতবড় স্পর্ধা! তার সামনেই তার প্রপার্টির মুখের ওপর আছড়ে পড়ছে। তার কাছ থেকে অনুমতি নিয়েছে তারা? যুবক দাঁতে দাঁত চাপল পরক্ষণে। এক আকাশসম রাগ নিয়ে আলগোছে নিজ ডানহাতের রুক্ষ তর্জনী এগোলো সপ্তদশীর মোলায়েম মুখপানে। নিজ চিরায়ত স্বভাবের বিলকুল ধার না ধরে রূঢ় মানব কেমন আলতো করে ছুঁয়ে দিলো মাহি’র র ক্তি ম কপোল। ঘুমন্ত সপ্তদশীর তুলতুলে গালে নিজ রুক্ষ আঙুলের আলতো ছোঁয়া লাগতেই সর্বাঙ্গ জুড়ে এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল মুগ্ধের। এ যেন এক নাম না জানা শিহরণ, যা ফের খরা নামিয়েছে যুবকের কন্ঠনালীতে। ক্ষনে ক্ষনে ঢোক গিলে কন্ঠনালী ভেজানোর ব্যর্থ প্রয়াসে মত্ত সে, তবুও কাজের কাজ যেন হলোই না! তার বেহায়া আঙুল গুলো বুঝি আরেকটু ছুঁয়ে দিতে চাচ্ছে মেয়েটার তুলতুলে গাল। মুগ্ধ অস্থির! আরেকবার চুমুক বসালো বোতলের মুখে। মুখভর্তি পানীয় নিয়ে রয়েসয়ে ঢোক গিলে, কেমন বাঁকা হাসলো দেখো! পায়ের কাছে পশমি পোষ্যের স্পর্শ পেয়েই,যুবক তক্ষুনি নিজ পিয়ার্সিং করা ঠোঁটের একাংশ চেপে ধরে আনমনেই বলল,

“ মা’ই প্রপার্টি ইজ ঠু কিউট নাহ?”
প্রাডার জিভ থাকলেও মানুষের মতো বাক নেই! বেচারা বোধহয় বিরক্ত হলো মালিকের এরূপ বাক্যে। ক্ষমতা থাকলে হয়তো এক্ষুণি বলতো —
“ মালিক! খাবারের সামনে এনে খেতে না দিয়ে, কিউট কিউট করে কেন মাথা খারাপ করছেন? আপনার প্রপার্টি, আপনিই নাহয় বেশি করে দেখুন! শুধু শুধু আমাকে লোভ দেখান কেনো? হুহ্!”
ভাগ্যিস প্রাডা মহাশয়ের জিভে ক্ষমতা নেই। থাকলে বোধহয় এক্ষুণি গর্দান যেত বেচারার। ওদিকে মুগ্ধ জনাব ক্ষনে ক্ষনে মাদকের বোতলে চুমুক বসাচ্ছেন আর একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন মেয়েটার পানে। মুখগহব্বরে থাকা শেষ পানীয়টুকু গিলে নিয়ে, মুগ্ধ কেমন আলগোছে ঝুঁকে দাঁড়াল মাহির মুখের ওপর। চোখদুটো অটল রেখে সে খানিক রহস্যময় কন্ঠে বিড়বিড়িয়ে শুধালো,
“ এ নিয়ে ৪বার তোকে মা’রতে এসেও শেষমেশ ব্যর্থ হয়ে ফিরে যাচ্ছি বান্দীর মেয়ে। আ’ম ড্যাম শিওর, তুই নিশ্চয়ই কালো জাদু করিস। নয়তো তোকে প্রাণে মা’রতে এলে হাত কাঁপবে কেনো আমার? বান্দীর মেয়ে, এখনো সময় আছে — আমার ওপর জাদু করা বন্ধ কর। নাহলে কোনো একদিন দেখবি — তোর জাদু তোর ওপরেই বড্ড ভারী পড়ছে। কালকেও আমার রাতের ঘুম হারাম করেছিস তুই, আর আজকেও তাই করছিস। নিজে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছিস আর আমাকে জ্বালাচ্ছিস। উফফ! সত্যি ভীষণ ইচ্ছে করছে তোকে মে’রে ফেলি কিন্তু হাত উঠছে না কেনো? এই বান্দীর মেয়ে! আমি কি পাগল হচ্ছি?”

রাত গভীর! ঝড়ো হাওয়া বইছে চারপাশে! এই বুঝি উড়িয়ে নিয়ে যাবে গোটা আস্ত মানুষ। বিদঘুটে অন্ধকারে নিমজ্জিত গহীন জঙ্গল ছাড়িয়ে কয়েক গজ এগুলেই আধপাকা সড়ক। চারিদিকে ল্যাম্পপোস্ট থাকলেও তাতে লাইটের উপস্থিতি নেই! কেউ বা কারা বুঝি সন্তপর্ণে খুলে রেখেছে সেসব লাইট, যেন আধপাকা সড়কটা সর্বদা ডুবে থাকে অন্ধকারে।
অদূরের জঙ্গল থেকে ধেয়ে আসছে নেকড়েবাঘেদের ক্রন্দন ধ্বনি। একজোড়া ব্যুট পরিহিত ব্যস্ত কদম বৃষ্টি ভেঙেই এগুচ্ছে নির্বিকার ভঙ্গিতে। কদমজোড়ার মালিক বড়ো উঁচু গড়নের! কালো রঙা হুডির আড়ালেই বোঝা যাচ্ছে প্রশস্ত কাঁধদুটো। হুড তুলে ঢেকে আছে মাথা। মুখে সে-ই চিরচেনা ভুতুড়ে মাস্ক। যুবক সর্তকতার সঙ্গে এগুচ্ছে। বারেবারে এদিক-ওদিক কাঁধ বাঁকিয়ে দেখছে পরিস্থিতি। আশেপাশে মানুষ দূর কি বাত, একটা কুকুর বেড়ালেরও উপস্থিতি নেই। যুবকের হাতে একখানা লেজার লাইট। লাল রঙের তীক্ষ্ণ আলো ছুড়ছে লাইটটা।অন্ধকার পথটা চেনা হওয়ায় এটুকু লেজার রশ্মির অবলম্বনে বড়ো দক্ষতার সঙ্গে হাঁটছে মানব। আর কিছুদূর এগুলেই মূল সড়ক। সেইন্ট পিটার্সবার্গের এই সড়কে খুব একটা যান চলাচল নাহলেও পথটা ওতোটা দূর্গম নয়। যুবকের পায়ের জোর বাড়াল। মূল সড়কে উঠেই সে এগুলো পথের বা-দিকে। দূর্গম এ রাস্তার একমাত্র স্বস্তিই হচ্ছে অদূরের জরাজীর্ণ টেলিফোন বুথটা। বুথের চারপাশের কাঁচের দেয়ালগুলো ভেঙে চৌচির হয়ে আছে, দেখতেও লাগে বড্ড পুরনো। তবুও ভালো বিষয় হচ্ছে — বুথে থাকা ফোনটা কানেক্ট হয়।যেখানে আশেপাশের সকল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন, সেখানে এই একমাত্র টেলিফোন বুথ যেথায় নেটওয়ার্ক সংযোগ এখনো রয়েছে। যুবক সন্তর্পণে ঢুকল বুথের ভেতর। চটজলদি টেলিফোনখানা হাতে নিয়ে দক্ষ কায়দায় আঙুল চালালো নাম্বার প্লেটে। অতঃপর অতিপরিচিত এক নম্বর কল দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল রিসিভ হবার অপেক্ষায়!

বাহাতের তর্জনী এবং মধ্যমার ভাঁজে জ্বলছে ব্যানসন সিগারেট। ডেস্কের ওপর অ্যাশট্রে থাকলেও আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সিগারেটের ছাই। ব্যস্ত ডানহাত বারেবারে উল্টেপাল্টে যাচ্ছে সম্মুখের গুরুত্বপূর্ণ ফাইল। এ যেন ফাইল ঘাটার নামে এক যুদ্ধ। যে যুদ্ধে মত্ত এক উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ সুদর্শন যুবক! যার বেড়াল চোখদুটো কেমন অস্থির হয়ে ডুবে আছে ফাইলের মসৃণ পৃষ্ঠের ভাঁজে। জীবনে কোনদিন মদ-সিগারেটে হাত না লাগানো এহসান বাড়ির আদর্শ বড়পুত্র ডক্টর ইফতেখার এহসান রৌদ্র, সে কি-না গত ২০ দিন ধরে নিজ অজান্তেই নাম লিখিয়েছে — চেইন স্মোকরের দলে। সুদর্শন মুখখানায় জমিয়েছে রাজ্যের সব ক্লান্তির ছাপ। সারাদিন পরিবার পরিজনদের ঢাল হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা কঠিন মানব, রাত হলেই ডুবে বসে নিজ ক্লান্তিতে। হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকে আদরের ছোট চাচাতো বোন — মাহিরা এহসান অব্ধি পৌঁছুনোর রাস্তা। আজও যুবক একই কাজে মত্ত। এলোমেলো ভঙ্গিতে একের পর এক সিগারেট ফুঁকে উল্টেপাল্টে দেখছে পুলিশী কিছু ফাইল। রৌদ্র যখন নিজ কাজে মত্ত ঠিক তখনি ডেস্কের ওপর অবহেলায় পড়ে থাকা ফোনটা কেমন কর্কশ শব্দে বেজে উঠল তার। প্রয়োজনীয় কাজের মাঝে ব্যাঘাত ঘটায় সুদর্শনের গোটানো ললাটের চামড়া গুটিয়ে গেল আরও। চোয়াল শক্ত হলো পরমুহূর্তেই! ঠোঁটের ফাঁকে সিগারেট আঁটকে সে তৎক্ষনাৎ বিরক্তি নিয়ে ফোন তুলল কানের কাছে। কর্কশ কন্ঠে বলল,

“ হেলো! ডঃ ইফতেখার এহসান রৌদ্র হিয়ার। হু’জ দ্যাট?”
ফোনের ওপাশে থাকা মুখোশধারী ধুরন্ধর যুবক হাসলো ঠোঁট পিষে। ঘাড় বাকিয়ে একপলক এদিক-ওদিক সর্তক দৃষ্টি বুলিয়ে আলগোছে মাথার ওপর থেকে হুডটা নামিয়ে দিয়ে, রাশভারি কন্ঠে প্রতিত্তোরে বলল —
“ ইট’স মি! কমান্ডার মায়াঙ্ক পাঠান। নাম তো সুনা হি হোগা!”
সহসা থমকায় বেড়াল চোখো রৌদ্র। অজান্তেই বেড়ে গেল তার হৃৎস্পন্দনের গতি। চোখেমুখে স্পষ্ট ফুটে উঠল একরাশ হতবাকতার ছাপ। বাদামী ঠোঁটযুগলের মধ্যকার ফাঁক গলিয়ে অস্ফুটে বেরুলো,
“ মায়াঙ্ক? তুই!”
চোয়াল শক্ত হলো মায়াঙ্কের। চোখদুটোয় লেপ্টে গেল একদফা রাগান্বিত ছাপ। যুবক কেমন কটমটিয়ে আওড়ায়,
“ কেনো? অবাক হলি বুঝি? তুই কি ভেবেছিলি? তুই না বললে আমি জানবো না আমার সানবার্ড কথায়? সবাইকে কি নিজের মতো সেলফিশ মনে করিস স্কাউন্ড্রেল?”
রৌদ্র নিরবে শুনলো সব! এক অদ্ভুত অপরাধীত্ববোধে পরক্ষণেই নিচু হলো তার কাঁধ। গলার কাছে বেশকিছু কথা এসেও আঁটকে গেল কেমন। সুদর্শনের ঠোঁট কাঁপছে। ক্ষনে ক্ষনে গিলছে শুকনো ঢোক। ঠোঁট নাড়িয়ে কিছু আওড়াতেই যাবে ওমনি ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এলো মায়াঙ্কের কটমট ধ্বনি!

“ এতোটা স্বার্থপর কবে থেকে হলি রোদ? হ্যাঁ আমি মানলাম, আমি রেহানের মতো তোর বেস্টফ্রেন্ড নই কিন্তু কলেজ লাইফে তোকে টক্কর দেওয়া কম্পিটিটরটা তো আমি-ই ছিলাম তাই না? তোর কাছে আমি আমার সানবার্ডকে আমানত হিসেবে রেখেছিলাম রোদ। আর তুই সেই আমানতের এতোটাই সুন্দর খেয়াল রাখলি যে তাকে এক হিং স্র মনস্টার এসে সবার সামনে থেকে তুলে নিয়ে গেল! তুই তখন কি করছিলি রোদ? তুই থাকতেও শ্যাডো মনস্টার আমার সানবার্ডকে কিভাবে নিয়ে গেল? তুই তো ঠিকই নিজের বউ, পরিবার সবাইকে আগলে রাখলি, তাহলে মাঝ থেকে আমার হৃদয়টাকে আগলে রাখতে পারলিনা কেনো রোদ? কেন পারলিনা?”
বাকরুদ্ধ রৌদ্র! গলার কাছে দলা বেঁধেছে এক আকাশসম কথা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ছেলেটার মুখ দিয়ে বেরুচ্ছে না একটি কথাও। সে কেমন ঠোঁট ফাঁক করে দৃষ্টি তুলেছে সিলিংয়ের দিকে। বড়ো বড়ো নিশ্বাস টেনে নিজেকে কোনমতে সামলে কেবল আওড়াল,

“ আমি জানতাম না মায়াঙ্ক, যার গায়ে আমি হাত তুলেছি সে যে রাশিয়ার শ্যাডো মনস্টার! এমনকি আমি এটাও জানতাম না, ঐ ছেলের অতীতের সঙ্গে আমার পরিবার, আমার সেজো আব্বু অর্থাৎ সাসপেন্ডেড অফিসার তায়েফ এহসান সংযুক্ত। মায়াঙ্ক! ঐ ছেলে মাহি’কে তুলে নিয়ে গিয়েছে সেজো আব্বুর দূর্বলতা হিসেবে। মাহি’র প্রতি ওর কোনো টান নেই, মোহ নেই! ও শুধু প্রতিশোধের অনলে জ্বলে তুলে নিয়ে গিয়েছে আমার বোনকে। আমি.. আমি শেষ অব্ধি চেষ্টা করেছিলাম মায়াঙ্ক। কিন্তু…”
ফোনের ওপাশে থাকা মায়াঙ্কের ভ্রু কুঁচকেছে বেশ। মাস্কের আড়ালে চাপা রঙা মুখখানায় ফুটে উঠেছে একরাশ সন্দিগ্ধতা। মস্তিষ্ক জানল নতুন কিছু। সে তৎক্ষনাৎ সন্দিহান গলায় বলে ওঠে,
“ তোর সেজো আব্বু আই মিন তায়েফ এহসানের সাথে ঐ শ্যাডো মনস্টারের কি সম্পর্ক? আর সানবার্ড, দূর্বলতা এসব কি বলছিস তুই?”
রৌদ্র অস্থির! চটজলদি পা ঘুরিয়ে চলে গেল স্টাডি রুমের দরজার কাছে। কোনোদিক অবলোকন না করে তক্ষুনি দু’হাতে ভেতর দিয়ে আঁটকে দিলো দরজাটা। অতঃপর ফের পা চালিয়ে ব্যস্ত ভঙ্গিতে এগিয়ে গেল ডেস্কের কাছে। লম্বা এক নিশ্বাস টেনে এক নাগারে শুধালো,

“ অনেক লম্বা কাহিনী মায়াঙ্ক। তোকে এতকিছু ফোনে বলা সম্ভব নয়। তুই শুধু এতটুকু শুনে রাখ, সেজো আব্বুর সাথে মনস্টারের অতীত জড়িত। মনস্টার মাহি’কে তুলে নিয়ে গিয়েছে যেন সে সেজো আব্বুকে তিলে তিলে মা’রতে পারে। এন্ড গেস হোয়াট? সে তার কাজে সফল। সেজো আব্বু গত ২০ দিন ধরে নিজেকে ঘরবন্দী করেছে। কারো সাথে কথা বলেনা, খাবার দিলে খায় না, সারাক্ষণ ঘরবন্দী হয়ে বসে থাকে। আর সেজো আম্মু! উনি চলে গিয়েছে বাড়ি থেকে। উনার ভাষ্যমতে — সেজো আব্বুর আশেপাশে থাকলে তিনি আত্ম হ ত্যা করবেন। আমাদের যৌথ এহসান পরিবার আজ ভাঙনের পথে মায়াঙ্ক! আমি ভীষণ চেষ্টা করছি সেজো আব্বুর কাছ থেকে কথা নেওয়ার। কিন্তু মানুষটা এতো দূর্বল হলো কবে থেকে কে জানে! মাহির প্রসঙ্গ উঠলেই বাচ্চাদের মতো কাঁদা শুরু করে। এ নিয়ে ২বার হার্ট অ্যাটাক করেছে। এজ আ ডক্টর, আই কান্ট ফোর্স হিম। ইউ নো রাইট? পরে হিতে বিপরীত হতে পারে।”
নিরব ভূমিকায় শুনল মায়াঙ্ক। কিয়তক্ষন চুপ করে থাকতেই ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এলো রৌদ্রের সন্দিহান কন্ঠ!

“ বাট টেল মি ওয়ান থিংক! তুই তো আন্ডারকভার মিশনে ছিলি। তাহলে তুই এখন সাউথ কোরিয়ায় কি করছিস?”
আচমকাই বাঁকা হাসল মায়াঙ্ক! আঙুল দিয়ে ভ্রু কুঁচকে রাশভারি কন্ঠে প্রতিত্তোর করল,
“ ফর ইউ্যর কাইন্ড ইনফরমেশন, ফোন চেক কর। আমি কোরিয়ায় নয়, বরং রাশিয়া থেকে বলছি। এন্ড আ’ম স্টিল অন মা’ই মিশন।”
কপাল গোটায় রৌদ্র! গম্ভীর মুখে তৎক্ষনাৎ কান থেকে ফোন নামিয়ে সামনে এনে পরোখ করল নম্বরখানা। হ্যাঁ, দশ ডিজিটের নাম্বার সম্মুখে +৭, অর্থাৎ রাশিয়ান কোড মিশ্রিত নম্বর। ব্যস্ততায় তখন এসবের প্রতি খেয়াল ছিল না সুদর্শনের। যেইনা পরোখ করা শেষ হলো ওমনি বিচক্ষণ যুবক কেমন গম্ভীর মুখে প্রশ্ন ছুড়ঁল,
“ ওয়েট! তুই তাহলে মাহি’কে কোথায় পেলি? সামহাউ মাহি কি এখন রাশিয়ায়?”
চাপা রঙা মুখখানায় আচানক ফুটে উঠল বিষাদের ছাপ। মায়াঙ্ক দৃষ্টি নোয়ালো। আলগোছে চোখদুটো বন্ধ করে লম্বা এক নিশ্বাস টেনে আওড়াতে লাগল,

“ হুম! রাশিয়ার সেইন্ট পিটার্সবার্গের গহীন জঙ্গলে নির্মিত দ্য মনস্টার প্যারাডাইস নামক কারাগারের বন্দিনী আমার সানবার্ড! যাকে রোজ নতুন নতুন নিয়মে টর্চার করে যাচ্ছে দ্য রুশদী কিং খ্যাত নির্দয় রাক্ষসটা। যার কালো সাম্রাজ্যের সকল গোপন ইনফরমেশন কালেক্ট করে তাকে ধ্বংস করার মিশনে এসেছে সিভিস্ক টিম। ভাগ্যবশত সে টিমের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছে — মায়াঙ্ক পাঠান। একদিন সে প্যারাডাইসের বিদ্যুৎ বন্ধ করে, দেয়াল টপকে দোতলার কোনো এক ঘরে পৌঁছে দেখি — এক আহত যুবক অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে বিছানায়। যুবকের বুকের ওপর মোটা ব্যান্ডেজ! আমি চোখ ঘুরাতেই দেখি, সেই ঘরের দরজার কাছে অদ্ভুত পোশাক পরে দাঁড়িয়ে আছে এক সুকন্যা। অন্ধকার ঘরটা সেদিন মোমবাতির নরম আলোয় আলোকিত, আমি দৃষ্টি ক্ষীণ করতেই যা দেখলাম তাতে একমুহূর্তের জন্য নিশ্বাস আঁটকে যাবার যোগাড় হয়েছিল আমার। আমি দেখলাম সেই মেয়েটা আর কেউ না, সে আমার সানবার্ড! আমার সানবার্ড!

যাকে বিগত ৬টা বছর ধরে নিজের মনিকোঠার সাম্রাজ্ঞী বানিয়ে রেখেছি, সে সেদিন অন্য এক পুরুষের ঘরে দাঁড়িয়ে আছে তাও কিনা মোহময় ভঙ্গিতে। বিশ্বাস কর রোদ! সেদিন আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারিনি। আমি ভেবেছিলাম আমি ভুল দেখছি। তাই সাথে সাথে ঘরে ঢুকে এক মোমবাতির ওপর হাতের তালু রেখে বোঝার চেষ্টা করেছিলাম — আমি আদৌও ভুল কি-না! কিন্তু ভাগ্য আমার! সে মেয়ে সত্যিই আমি সানবার্ড ছিলো। আমি ওকে বহুবার বলেছি চলে যেতে, ভয় দেখিয়েছি মনসৃটারের তারপরও মেয়েটা কেমন নাছোড়বান্দার ন্যায় দাঁড়িয়ে ছিল। আমি সেদিনই ওকে নিয়ে আসতাম নিজের সাথে করে কিন্তু মনস্টারের প্যারাডাইস থেকে কাউকে সশরীরে তুলে আনা অসম্ভব। আমি অপেক্ষা করেছি, একদিন অপেক্ষার ফল হিসেবে সানবার্ডকে পেয়েছিলাম বড্ড কাছে। সব ঠিকঠাক ছিলো রোদ, আমার সানবার্ড প্যালেস থেকে পালিয়েছিল কিন্তু!”
ফোনের ওপাশে থাকা কঠিন মানবের বেড়াল চোখদুটো কেমন ছলছল হয়েছে দেখো! বুকটা জ্বলছে ভীষণ অস্থিরতায়। পাগল প্রেমিকের আর্তনাদ তারচেয়ে ভালো কে বুঝবে শুনি? মায়াঙ্কের কন্ঠ মাঝপথে থামতেই রৌদ্রের অস্থিরতা বাড়ল। তৎক্ষনাৎ বলে উঠল,

“ কিন্তু? কিন্তু কি মায়াঙ্ক? তারপর কি হলো মাহির? কোথায় আছে আমার বোন?”
ইস্পাত-দৃঢ় মানব কমান্ডার ওতো সহজে দূর্বল হয়না। তবুও মায়াঙ্ক আজ হলো। বিষাদী কণ্ঠে পাল্টা উত্তর দিলো,
“ ঐ শ্যাডো মনস্টার আবারও আমার বোকা সানবার্ডকে আঁটকে ফেলল নিজ খাঁচায়। তুলে নিয়ে গেল আমারই চোখের সামনে। আর আমি? মিশন নামক দায়িত্বের বেড়াজালে আঁটকে নির্বিকার ভঙ্গিতে দেখলাম শুধু। পারলাম না ওকে আটকাতে।”
শেষটুকু শুনে বড়ো আশাহত হলো রৌদ্র। সুদর্শন মুখখানায় এক পশলা মেঘ জমিয়ে যুবক কেমন হেঁটে গেল বিশাল থাই গ্লাসের জানালার কাছে। সরু দৃষ্টি তাক করল জানালার বাইরের ব্যস্ত ঢাকা শহরের পানে। অতঃপর খানিকক্ষণ সময় নিয়ে আওড়াল,

“ তোর নেক্সট মুভ কী মায়াঙ্ক? কাকে বাঁচাবি? ডিপার্টমেন্ট নাকি মাহিকে?”
ওপাশের গম্ভীর কন্ঠ নিরুত্তেজ! মাথার ওপর ঝুম বৃষ্টির পানে মুখ করে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। চোখ বুজঁতেই তার মানসপটে ভেসে উঠল মাহি’র নরম তুলতুলে মুখখানা। মায়াঙ্ক হাসলো! শান্ত ভঙ্গিতে জবাব দিলো —
“ দু’টোকেই। আগে হিমাংশু রায়ের কর্ণধার অধীর রায়ের….. টুট টুট টুট!”
কথার মাঝেই টুট টুট শব্দে নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন হলো। রৌদ্র কেমন গম্ভীর মুখে কান থেকে ফোন নামিয়ে এনে পরোখ করল একবার। সময় নিয়ে আবারও বলল,
“ হেলো? মায়াঙ্ক? আর ইউ্য হিয়ারিং মি?”
ওপাশের কল কেটেছে বেশ আগে। মায়াঙ্কও কেমন শঙ্কিত চিত্তে উল্টেপাল্টে দেখছে ফোন। আঙুল চালিয়ে ফের নম্বর টুকে কল দিয়েও নেটওয়ার্কের বিচ্ছিন্নতার কারণে কল ঢুকল না আর। মায়াঙ্ক থামল! হাত থেকে ফোনটা আলতো করে রাখল প্লেটের ওপর। পরক্ষণে ঝুমবৃষ্টির মাঝেই বেরিয়ে গেল বুথ থেকে। দু’হাত হুডির পকেটে গুঁজে যুবক কেমন গুনে গুনে পা ফেলছে সম্মুখে। কনক্রিটের প্রশস্ত রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আনমনে বিড়বিড় করে বলে,

“ আমার ৬ বছরের নিরলস সাধনা তুমি সানবার্ড! যাকে অন্তরে লুকিয়ে রেখে এখনো বেঁচে আছি আমি। তোমাকে এতো সহজে হারাই কি করে? আমার দেহে প্রাণ থাকতে আমি তোমায় অন্য কারো হতে দেবো না। আকাশের ঐ চাঁদের গায়ে হাজারো কলঙ্ক থাকলেও মানুষ যেমন চাঁদের মোহে তার দাগের কথা ভুলে যায়, ঠিক তেমনি আমার মন আকাশের ব্যাক্তিগত চাঁদ — আমার সানবার্ড, তোমার গায়ে শত কলঙ্ক থাকলেও আমার ভালোবাসায় তার দাগ মিটে যাবে নিমিষেই। তুমি দেখে নিও সানবার্ড! এ মরণ খেলা আমি জিতবই।”
ফোন হাতে নিয়ে পুরো ঘরময় পায়চারি চালাচ্ছে রৌদ্র! মুখটা গম্ভীর তার! মস্তিষ্কে বাজছে মায়াঙ্কের বলা শেষ কথাটা। হিমাংশু রায়! এটা আবার কে? অধীরের সাথে কি সম্পর্ক উনার?

❝ তার ভুরুর ধনুক বেঁকে ওঠে তনুর তলোয়ার,
সে যেতে যেতে ছড়ায় পথে পাথর-কুচির হার।
তার ডালিম ফুলের ডালি গোলাপ-গালের লালি
ঈদের-চাঁদ ও চায়।।❞
উত্তর কলকাতার শোভাবাজারের বিখ্যাত — রায় জমিদার বাড়ি! দাঁড়িয়ে আছে প্রায় দেড়শো বছর ধরে। প্রাচীন এ জমিদার বাড়ি আজও মুখরিত রায় জমিদার পরিবারের গৌরবময় উপস্থিতিতে। জমিদার বাড়ির বাড়ির অন্দরমহল! সে-কি লম্বা বারান্দা! এদিক-ওদিক ভারী কারুকার্যে খোদাই করা কাঠের দরজা, উঁচু ছাদ থেকে ঝুলে আছে ঝাড়বাতি। চারিদিকে মৃদু চন্দন আর পুরনো কাঠের গন্ধ যেন মিলেমিশে একাকার! অন্দরমহলের নৃত্য কক্ষে তালিমে মত্ত রায় জমিদার পুত্রী — নিরুপমা রায়। সপ্তদশী কন্যার দীঘল কালো কেশ, লম্বা বিনুনি যার ছুঁয়ে দিচ্ছে হাঁটুর কাছ। মোটা কাজলে সেজেছে সপ্তদশীর টানা টানা বড় চোখ। সিঁথি ভর্তি লাল রঙা সিঁদুর! গায়ে লাল- সাদা মিশেলের গোলাকার চুরিদার কুর্তি, পায়ে বাজছে ঘুঙুর! সপ্তদশীর হলদেটে গৌরবর্ণা গায়ের রঙ যেন এক কথায় কাঞ্চা সোনা। রোদের আলো পড়তেই ত্বক করে চকচক! বিলাসিনী তালিম নিচ্ছে! একা একা ঘুঙুর পায়ে ঘুরছে শাস্ত্রীয় নৃত্যে। এরইমধ্যে অন্দরমহলের নিচতলা থেকে ধেয়ে এলো এক পৌঢ়ার ঝাঁঝাল কন্ঠ!

“ নিরুউউউউ! বলি হায় হায়! অঞ্জলি না দিয়ে কিসের নৃত্য করছিস লা? মা ঠাকুরণরে বলব?”
তক্ষুনি নৃত্যরত পদযুগল থেমে গেল সপ্তদশী নিরুর। বুকের ওঠানামার গতি বড্ড জোরালো তার। নিজ ভুলে জিভ চলে গেল দাঁতের নিচে। সপ্তদশী ছুটল তৎক্ষনাৎ। ঘুঙুরের রুমঝুম শব্দ তুলে ত্বরিত গতিতে বেরিয়ে এলো নৃত্যকক্ষ থেকে। অন্দরমহলের দোতলার কাঠের তৈরী রেলিঙের দ্বার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে হালকা উঁকি দিলো নিচ তলায়। পৌঢ়াকে দেখেই কানে হাত রাখল নিরু। অপরাধী ভাবস্রোতে চাপা স্বরে বলল,
“ ঠাকুমা! এবারের জন্য ক্ষমা করুন। কথা দিচ্ছি, আর কখনো অঞ্জলি না দিয়ে আসব না।”
পৌঢ়া নিজ লালচে দাঁতগুলো বের করে হাসলেন কেমন। নিরুর ওমন সুশ্রী মুখখানা দেখলেই গলে যান তিনি। আজও হলো তাই। মাথা নাড়িয়ে হাত উঁচিয়ে কেবল বলল,
“ মনে থাকে যাতে!”
সপ্তদশী আলতো হাসল। ওপর নিচ মাথা ঝাঁকিয়ে বোঝালো — মনে থাকবে।

কাঠের তৈরি সুবিশাল ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে আছেন রায় বাড়ির বড় কর্তাগিন্নি — সুদীপা রায়। তার পেছনেই দাঁড়িয়ে আছে দাসী শর্মিষ্ঠা। সুন্দর করে আঁচড়ে দিচ্ছে গিন্নীর কোমর সমান দীঘল কালো কেশগুচ্ছ। তিনি নিজ কাজে বহাল থেকেই কেমন দোনোমোনো করছেন। আয়নার প্রতিবিম্বে তা নজর এড়ায়নি সুদীপার। তিনি রয়েসয়ে হাত বাড়িয়ে ড্রেসিং টেবিলের ওপর থেকে একখানা পান তুলে গালের ভাঁজে দিয়ে বললেন,
“ কি বলবি বলে ফেল!”
সাহস পেলেন শর্মিষ্ঠা। তৎক্ষনাৎ হড়বড়িয়ে বলতে লাগলেন,
“ বাজারে গিয়েছিলুম কর্তাগিন্নি। সেখানে কয়েকজনকে বলতে শুনলাম আমাদের নিরুর কথা। সবাই বলছিল —
অবিবাহিতা হওয়া স্বত্বেও বিগত ৮বছর ধরে রায় জমিদার পুত্রী যে বেখেয়ালি পুরুষের অপেক্ষায় রোজ সিঁথি রাঙিয়ে যাচ্ছে, সে পুরুষ কি আদৌও ফিরবে কোনদিন?”
কথাটা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে আগুন চোখে ঘুরে তাকালেন সুদীপা। রাগে গজগজ করতে করতে তক্ষুনি দাসীর গালে বসালেন পাঁচ আঙুলের ছাপ। বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে সাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করতে করতে বলে ওঠেন,
“ রায় পরিবারের রক্ত যার গায়ে বইছে, সে নিজের জান দিয়ে দিবে তবুও কোনদিন নিজের দেওয়া জবানের কথা ভুলবেনা। কোনদিন না! অধীর আসবেই।”

ডিভানের সম্মুখে থাকা টেবিলের ওপর সাজিয়ে রাখা নানান বাহারি খাবার। মাহি একটু একটু করে খেয়েছে কিছু কিছু। মুখে রুচীমন্দা দেখা দিয়েছে তার, কিছুই ভালো লাগছেনা খেতে। সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মিলা কেমন ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে মেয়েটার পানে। মাহি’র ওমন খাবার দেখে নাক সিটকানো দেখে সে কেমন সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করল,
“ কি হয়েছে মুনলাইট? খাচ্ছো না কেন? ঔষধ খেতে হবে তো।”
সঙ্গে সঙ্গে বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় মাহি। দু’হাত বুকের কাছে বেঁধে উল্টো পথে এগোয় হাঁট খোলা জানালার কাছে। বিষাদী কণ্ঠে অন্য প্রসঙ্গ টেনে বলে,
“ ভালো লাগছেনা খেতে।”

মিলা ব্যস্ত হলো এরূপ কথায়। তক্ষুনি পা বাড়িয়ে মাহি’র পানে এগোতে গেলেই তার দৃষ্টি গিয়ে আটকায় ঘরের দরজার কাছে। ওমনি তৎক্ষনাৎ মাথা নুইয়ে নেয় বেচারি! মনস্টার দাঁড়িয়ে আছে দরজার কাছে। কতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছে তা কে জানে! মিলা ভয়ার্ত! মনস্টারের সামনে কুটকাচালি চলে না তার। ভয়ার্ত মেয়ে কদম পেছাতেই নিঃশব্দে ঘরে ঢুকল মুগ্ধ। একহাত তার পকেটে গুঁজে রাখা থাকলেও অন্যহাতের আঙুলে ইশারায় মিলাকে বেরুতে বলল ঘর থেকে। হুকুম তামিলে মত্ত তরুণী! তক্ষুনি কেমন ব্যগ্র পায়ে হাঁটা ধরল দরজার নিকট। এদিকে সে চলে যেতেই মুগ্ধ কেমন সটান হয়ে এগোয় মাহি’র নিকট। সপ্তদশী ঘুরে দাঁড়িয়ে আছে, দেখছেনা পিছু! কেউ একজন যে তার অতি নিকটে এসে দাঁড়িয়েছে তা থোড়াই টের পেল সে। মাহি কেমন বিষাদ নিয়ে তাকিয়ে আছে বাইরে। বিষাদ ভরা কন্ঠে তক্ষুনি আনমনে বলে ওঠে,
“ মিলা! তোমার কাছে বই হবে? আমি আবার বইপোকা মানুষ। আগেও বই না পড়লে ঘুম আসতো না। এখনো ভালো ঘুম হয়না তেমন। তোমার কাছে বই থাকলে আমাকে…. ”

বলতে বলতেই পিছু ফিরল সপ্তদশী। আর ওমনি তার সরু নাকের ডগাটা আলতো করে লেগে গেল এক পাহাড়সম প্রশস্ত বুকের সঙ্গে। এহেন ঘটনার আকস্মিকতায় হকচকায় মাহি! চশমাপরা চোখদুটো তৎক্ষনাৎ উঁচিয়ে তাকাল মানুষটার পানে। সম্মুখে নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা মুগ্ধ কেমন কপাল গুটিয়ে তাকিয়ে আছে। চোয়াল বরাবরের ন্যায় তীক্ষ্ণ তার! দৃষ্টি বড্ড সরু। মাহি সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি নোয়ালো। বিরক্ত হয়ে মুগ্ধকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে গেলেই যুবক আচানক ভারী কন্ঠে বলে ওঠে,
“ কোন জনরার বই পছন্দ তোর?”
থামল মাহি! তিতিবিরক্ত কন্ঠে প্রতিত্তোর করল,
“ তা জেনে আপনি কি করবেন?”
ঠোঁট বাঁকায় মুগ্ধ! গালের ভাঁজে জিভ ঠেলে ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে আওড়াল,
“ তাও ঠিক!”

মাহি আর দাঁড়াল না। পায়ের গতি টানল ফের। তবে এবারে ঘটল আরেক কান্ড। পেছন থেকে হুট করেই তার কব্জিসন্ধি টেনে ধরল রূঢ় মানব। অতঃপর এক হেঁচকা টানে মেয়েটাকে ছুঁড়ে ফেলল জানালার কাছে বিছিয়ে রাখা কাউচের নরম গদিতে। এহেন আকস্মিক কান্ডে পলক ফেলতে ভুলে গেল সপ্তদশী! হা করে তাকিয়ে রইলো কেবল। ওদিকে মুগ্ধ মহাশয় পকেট হাতড়ে দুটো ট্যাবলেট বের করল। টেবিলের ওপর থেকে গ্লাসভর্তি গরম দুধ মাহি’র মুখের দিকে এগিয়ে ধরে কাঠকাঠ কন্ঠে বলল,

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৩৬ (২)

“ মুখ খোল বান্দীর মেয়ে!”
নাছোড়বান্দা মাহি! গতকাল লোকটার হাতে একদলা র ক্ত দেখে আজ কি করে ঐ একই হাতে খাবার খাবে সে? মেয়েটার পেট গুলিয়ে উঠল গতকালের ঘটনা মনে করে। সে তৎক্ষনাৎ নাকমুখ কুঁচকে বলল,
“ না আমি খাব না এসব!”
দাঁত খিঁচল মুগ্ধ! সহসা শক্ত হাতের থাবায় সপ্তদশীর নরম তুলতুলে চোয়ালখানা আঁকড়ে ধরে হিসহিসিয়ে বলল,
“ তুই খাবি এমনকি তোর বাপসহ খাবে বান্দীর মেয়ে! মুখ খোল বলছি!”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৩৮

5 COMMENTS

  1. আপু আমি খুব এক্সাইটেড , পরের পর্ব দেন তাড়াতাড়ি প্লিজ 🫶❤️ আর হ্যাঁ আপনি রৌদ্র কে দেখালেন কিন্তু ওর বউ কোথায় মানে সঙ্গীত হৃদয়নুভূতির নায়কা কে তো দেখালেন না 🙃, আমি পরের পর্বে ওকে দেখতে চাই, আর ওদের কি বাচ্চা হয়েছে??? 😃😃😃😌🫠🤌❤️❤️🫶🫶

  2. Apu porer part ….?🥹 Golpota etw sundor hocche je bolar bahire ….apni o tw amdr ke 2 ta porer part diye chomkai dite paren…🥹…

Comments are closed.