মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪৯ (২)
jannatul firdaus mithila
“ তুই আমার! আমার আগে তোর মর’ণও পাপ।”
ক্রন্দনের উপচে পড়া ঢেউয়ে নাস্তানাবুদ সপ্তদশী! আর্তনাদে ফাটছে বুক। সটান শীরঁদাড়ায় বোধহয় জং ধরেছে তার, নতজানু হয়েছে ছোট্ট মাথাটা! মোলায়েম হাতদুটো তার বন্দী হয়েছে যুবকের রুক্ষ হাতের মুঠোয়। তা সরিয়ে ফেলার খুব একটা উদ্বেগ নেই সপ্তদশীর অন্তরালে। যুবক রূঢ়! ক্রুরতার নামে গভীর দৃষ্টে নিষ্পলক ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে অবুঝ রমণীর পেলব মুখপানে। কাঁদতে কাঁদতে লাল টুকটুকে ভাব ধরেছে সপ্তদশীর সরু নাকের ডগাটা। গালদুটোয় ভর করেছে লালিমা! ঠোঁট ফুলে কলাগাছ! রূঢ় মানব আগ বাড়িয়ে থামাল না মেয়েটাকে। আশ্চর্য! মেয়েটার এহেন রূপ খানা ওতো মনে ধরল কেনো তার? কেমন বেহায়ার ন্যায় তাকিয়ে আছে একদৃষ্টে। মানবী এবার নড়েচড়ে উঠল। ক্ষুদ্র বদনখানি তার কান্নার দরুন কেঁপে কেঁপে উঠছে। কন্ঠে একরাশ নিষ্পাপ পরশ লেপ্টে সে আওড়াল,
“ আমার আব্বুকে মা’রবেন না বিস্ট! লোকটাকে থামান।”
যুবকের বাদামী অধরযুগলে আচমকা টান বসল বাঁকা হাসির! চোখদুটোতে নামলো চিরচেনা ক্রুরতা। সে তৎক্ষনাৎ মাহি’র হাত থেকে ছো মে’রে কেড়ে নিলো ফোনটা। অতঃপর বৃদ্ধা আঙুলের দক্ষ স্পর্শে ফোনের লাইন করল ডিসকানেক্ট। এহেন কান্ডে আঁতকে উঠে মাহি। সহসা বিচলিত কন্ঠে বলে ওঠে,
“ একি করলেন? লোকটাকে থামালেন না কেনো বিস্ট? আমার আব্বু! আমার আব্বু…”
“ এতো সহজে মা’রব না তোর জানোয়ার বাপকে। তার যে এখনো অনেক পাওনা বাকি আছে। বাট এতটুকু জেনে রাখ, তোর বাপের মৃ ত্যু আমার হাতেই নির্ধারিত। তা হোক আজ অথবা কাল!”
মানবীর ছোট্ট হৃদয়ের নরম ত্বকে কথাগুলো যেন একেকটা তীরের ফলার ন্যায় বিঁধল! সে-কি অসহ্য অনুভূতি। দম আঁটকে আসার উপক্রম মাহি’র। সদ্য কর্তিত পাখির ন্যায় ছটফটাতে লাগল তার ক্ষুদ্র তনু। অশ্রুভারে খানিকটা নুইয়ে এসে, সপ্তদশী ভঙ্গুর কন্ঠে আওড়াল,
“ এতো বিষ? মনের কোণে এতোটা বিষ নিয়ে কেনো নিজের শত্রুর মেয়েকে এভাবে নিজের কাছে আঁটকে রাখার পায়তারা চালাচ্ছেন? এরচেয়ে ঢের শান্তির ছিলো — আপনি যদি আমায় একেবারেই প্রাণে মে’রে ফেলতেন!”
যুবক হাসল! তাচ্ছিল্যের সে হাসি। চোখদুটোতে শ্লেষাত্মক ভাবভঙ্গিমা ফুটিয়ে, সে কেমন গমগমে গলায় শুধালো,
“ তুই ম-রে গেলে আমি জ্বালাব কাকে বান্দীর মেয়ে?”
তেজ বাড়ল মাহি’র! অশ্রুসিক্ত লোচনে এক অদৃশ্য আগুন লেপ্টে তড়াক ঘাড় উঁচিয়ে তাকাল বেয়াদব নাম খ্যাত পুরুষের পানে। দাঁত কপাটি একে-অপরের সনে পিষ্ট করতে করতে বলে ওঠে,
“ আপনার কি একটুও খারাপ লাগে না? একটুও বুক কাঁপে না এসব করতে? আমার এমন কান্না বিজড়িত কন্ঠ শুনেও কিভাবে এতটা কোল্ড এক্সপ্রেশন দেন আপনি?”
কথাটা গায়ে লাগায়নি মুগ্ধ। উল্টো ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে হাত এগিয়ে এনে মুখের কাছে তুড়ি বাজিয়ে হামি টানল বড়সড়! যেন মেয়েটার কথাবার্তায় বিন্দুমাত্র পাত্তা দেবার ইচ্ছে নেই তার। সপ্তদশী নাক টানলো। এক অবোধ্য ঘৃণার দেয়াল তুললো মন-মস্তিষ্কে। ভগ্নহৃদয়ে জুড়িয়ে আসা কন্ঠে অস্ফুটে আওড়াল,
“ এখন নিজের বেঁচে থাকার ওপরেও বড্ড আফসোস হচ্ছে আমার। কেন যে এতকিছুর পরও আল্লাহ আমায় বাঁচিয়ে রাখলেন।”
সপ্তদশীর অস্ফুটে আওড়ানো বাক্যগুলো বেশ কানে গেল মুগ্ধের। পরপরই গালের ভাঁজে নিজ লকলকে জিভের ডগাটা ঠেলে দিলো নির্দয় মানব। কোনরূপ বাক্য ব্যয়ে আচমকা নিজ শক্ত হাতের অমসৃণ থাবায় আঁকড়ে ধরল রমণীর নরম চোয়াল। এক ঝটকায় জোর করে মেয়েটার মুখখানা ঘুরিয়ে আনলো নিজের দিকে। মাহি চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিয়েছে ততক্ষণে। যুবক নিরবে বাঁকা হাসল তা দেখে। বেহায়াপনার চরম সীমানায় নিজেকে আবির্ভূত করে, সে আচানক মুখ আগালো মাহি’র মসৃণ মুখপানে। যুবকের উষ্ণ নিশ্বাসের প্রতিটি ঝাপ্টা যেন তীব্রতায় দোল খাচ্ছে সপ্তদশীর সম্পূর্ণ মুখমণ্ডলে। মাহি হাসফাস করছে এবার! দু’হাতে আলতো করে ধাক্কা বসায় রূঢ় মানবের রুক্ষ বক্ষভাজে। অথচ বালাইষাট! পাহাড়সম বলিষ্ঠ পুরুষ কি-না নিজ জায়গা হতে টললোও না একটু। বেচারি সপ্তদশী চোখদুটো বুঁজে রেখেই ফের ডুকরে উঠল। এরইমধ্যে যুবক হুট করেই নিজ খোঁচা খোঁচা দাঁড়িতে আবৃত রুক্ষ চোয়ালখানা আলতো করে ছোঁয়াল সপ্তদশীর মসৃণ কপোলে। মুহুর্তেই কেঁপে ওঠে মাহি! আঁটকে নিলো নিশ্বাস। বুকটা ঢিপঢিপ করছে তার। গালে বোধহয় বিঁধছে হুল! রূঢ় মানব নিজ কাজে মত্ত। চোখদুটো আবেশে বুঁজে নিয়ে অনবরত নাক-গাল ঘষছে সপ্তদশীর মসৃণ গালে। দক্ষ সুগন্ধ-রসিকের ন্যায় আচমকা মেয়েটার গা থেকে নিশ্বাস টানলো জোরালো! পরমুহূর্তেই আচ্ছন্নতার ঘোরে ডুব দিলেন মাফিয়া বিস্ট! দিনদুনিয়া ভুলে তীব্র মাদকের সংস্পর্শে এসে সদ্য আসক্ত হবার ন্যায় হাস্কি স্বরে আওড়াল,
“ ওহ মা’ই মা’ই! ইউ্য স্মেল লাইক মাইন!”
বিরক্তিতে কপাল কুঁচকায় মাহি! তড়াক ঝাঁঝাল কন্ঠে বলে ওঠে,
“ ছাড়ুন আমায়! খবরদার কথায় কথায় আমায় ছোঁবেন না!”
যুবকের ঘোর তখনো অটুট! মেয়েটার গালে দাবিয়ে রেখেছে সরু নাকের ডগাটা। আগের ন্যায় চোখদুটো বুঁজে রেখে নিরেট কন্ঠে আওড়াল,
“ আমার যখন ইচ্ছে, যেভাবে ইচ্ছে, সেভাবেই তোকে ছুঁবো। তুই না বলার কে? এসব পরিনতির কথা আগে মনে ছিলো না? কি দরকার ছিল আগ বাড়িয়ে আমার কাছাকাছি আসার? কি দরকার ছিল যখন-তখন আমার গা ঘেঁষার? ইউ্য নো নাহ? আই ওয়ার্নড ইউ্য পিচ্চি! বাট তুই শুনিসনি তো। তাহলে এখন দূরে যেতে বলছিস কেনো? আর কেনোই বা করছিস এতো আফসোস? কি লাভ আফসোস করে?”
মাহি থমকায়! আনমনে মস্তিষ্কের গভীরে নাড়া দেয় পুরনো ঘটনাপ্রবাহগুলো! সে কখন ঘেঁষলো লোকটার কাছাকাছি? প্রতিবার তো লোকটাই মুখ তুলে চলে আসে তার নিকট! তাহলে এবার দোষের পাল্লাটা উল্টে গেলো কেনো? মাহি নাক ফোলায় বেশ! দৃঢ় চোয়ালে চিড়বিড়িয়ে বলে ওঠে,
“ আমার জানামতে, আমি কখনো স্বেচ্ছায় আপনার কাছ ঘেঁষিনি।”
অলক্ষ্যে দাঁতের রুষ্ট চাপায় অধর পিষে হাসল রূঢ় মানব। আলগোছে গাল সরিয়ে আনলো মেয়েটার গালের ওপর থেকে। পরক্ষণেই কুঞ্চিত দৃষ্টিতে তাকাল সম্মুখে। মাহি’র দৃঢ় দৃষ্টি, নড়বড়ে হয়নি এখনো। যুবক কেমন বাঁকা হেসে আচানক সপ্তদশীর চোয়াল চেপে, তার ক্ষুদ্র মুখখানা এগিয়ে আনলো নিজের কাছে। কন্ঠে অনড় পরিতুষ্টি বজায় রেখে হিসহিসিয়ে শুধালো,
“ ওহ মা’ই ফা’কিং সিগনোরা! ব্যাপার নাহ! এবার থেকে ঘেঁষবি। যখন-তখন ঘেঁষবি। যেভাবে চাইব সেভাবেই ঘেঁষবি, যত চাইব তত ঘেঁষবি! ট্রাস্ট মি সিগনোরা, তুই নিজে থেকেই এসব করবি।”
যুবকের এহেন আত্মবিশ্বাসে হুট করেই শ্লেষাত্মক হাসি ফুটলো মাহি’র ঠোঁটের কোণে। আওড়াল শ্লেষাত্মক বাণী,
“ ইন ইউ্যর ড্রিমস মেবি!”
তৎক্ষনাৎ দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো মুগ্ধের। চোয়াল হলো শক্ত! কন্ঠে তেজ ঢেলে যুবক পরপরই শুধালো,
“ জাস্ট ওয়েট এন্ড ওয়াচ! শুধু তোর রিয়েল লাইফে নয়, বরং তোর স্বপ্নেও কাবু করে বসব আমি। এন্ড গেস হোয়াট? আমার এই তিক্ত দহনে পুড়ে একাকার হতে, তুই নিজেই আমার কাছে ছুটে আসবি সিগনোরা!”
সপ্তদশীর মুখাবয়বে বিপরীত ছাপ স্পষ্ট! চোখদুটোয় চিকচিক করছে নোনাজল! দৃঢ়তা নামালো কন্ঠায়!
“ এত্তো কনফিডেন্স? যাকগে, আমি কেবল ভাবছি ঐ দিনটার কথা, যেদিন দ্য শ্যাডো মনস্টার ওরফে দ্য ব্লা’ডিবিস্ট নিজের ইগো স্যাটিসফাইড করতে না পেরে ভীষণ বাজেভাবে হেরে যাবে,সেদিন তার অবস্থাটা কেমন হবে? লাইক — এখন যেমন তেজ আছে, তখন তেমন তেজ থাকবে তো?”
সপ্তদশীর তীক্ষ্ণ বাক্যবাণে শক্ত হলেন রূঢ় মানব। ফোটালেন দৃঢ় চোয়াল! মেয়েটা যে তাকে অপ্রকাশ্য চ্যালেন্জ ছুঁড়েছে, তা আর বুঝতে বাকি নেই মাফিয়া বিস্টের। সে তৎক্ষনাৎ ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসির রেশ টেনে নিরবে বোঝাল — সম্মতি! কিয়তক্ষন একদৃষ্টিতে মেয়েটার পানে তাকিয়ে থেকে পরপরই গমগমে গলায় শুধালো,
“ তেজ এবং শক্তি, দুটোই আজন্ম আমার ব্যাক্তিত্বে থাকবে বান্দীর মেয়ে। আর রইল বাকি ইগো! তোকে আমার প্রতি দূর্বল করাটা যদি আমার ইগো হয়, তাহলে শুনে রাখ — আমার ইগো অনেক হাই! আজ পর্যন্ত হেরে যাওয়া নামক শব্দের সাথে আমার দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি কখনো! না পরবর্তীতে কোনদিন হবে। তুই বললি — তুই কোনোদিন আমার প্রতি দূর্বল হবি না তাই তো? দ্যান সিগনোরা…..!”
শেষ বাক্যটুকু আওড়ে মুখটা আচমকা এগিয়ে আনে মুগ্ধ। ঠেকাল মেয়েটার একদম মুখের কাছে! বাঁকা হেসে তীক্ষ্ণ কন্ঠে আওড়াল,
“ মে আই গো ফর আ ট্রায়াল?”
মানবী নিশ্চুপ! কেবল দৃষ্টি জোড়া অপলকভাবে তাকিয়ে আছে রূঢ় মানবের চোখের পানে। বোধহয় অজানা মায়ায় বোধ হারিয়েছে সে। বেভুলার ন্যায় অজান্তেই মাথা নাড়ালো ওপর নিচ! তা দেখে গাল ঠেলে নিরব হাসল মুগ্ধ। তক্ষুনি মেয়েটার অধরে টুপ করে অধর ছুঁইয়ে সেভাবেই হাস্কি স্বরে শুধালো,
“ কিসের অনুমতি দিয়ে দিলি বান্দীর মেয়ে? খেয়াল আছে, এবার আমি ঠিক কতোটা বেপরোয়া হবো? সহ্য করতে পারবি তো? কজ আমি জানি, আমার জয় নিশ্চিত!”
র*ক্তা*ক্ত চারপাশ! এলোমেলো কামরা। নরম ফোমের বিছানাটার দশা হয়েছে করুণ। বিছানার একপাশ দিয়ে ঝুলছে একখানা নিস্তেজ হাত! যার আঙুলগুলো থেকে চুইয়ে পরছে লহু। সফেদ রঙা ব্ল্যাঙ্কেটের আড়ালে বোধহয় লুকিয়ে রাখা নিস্তেজ দেহটা। একজোড়া ব্যুটপরিহিত কদমের মালিক নির্বিঘ্নে এগিয়ে এসে দাঁড়াল বিছানার পাশে। গম্ভীর মুখভঙ্গি তার, একহাতে ধরে রাখা টবেকো পাইপ। ঠোঁটের ফাঁকে মাউথপিস গুঁজে অনবরত টানছে তামাক। তার আশেপাশে গোটাকতক দেহরক্ষী! শত হলেও ওতো বড়ো মাপের গ্যাংস্টার বস সে। খানিকটা এটিটিউড তো থাকবেই! সুদর্শন কপাল গোছালেন এপর্যায়ে। ঠোঁটের কোণে মাউথপিস চেপে রেখে নিরবে বাহাত নাড়িয়ে আদেশ ছুঁড়লেন,
“ ব্ল্যাঙ্কেট সরা!”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বডিগার্ড তাই করল। তক্ষুনি সামান্য এগিয়ে এসে এক ঝটকায় তুলে দিলো ব্ল্যাঙ্কেটটা! ওমনি আশেপাশে থাকা সকলে কেমন মুখ কুঁচকে ঘুরে গেলেন অন্যত্র। কেউ কেউ অলক্ষ্যে কেঁপে উঠলের নিস্তেজ দামিয়ানের ওমন করুণ দশা দেখে। অথচ গ্যাংস্টার বস নিকোলাস নির্বিকার! ভ্রুক্ষেপহীন কায়দায় তামাক টানছে শব্দ করে। তন্মধ্যে পেছন থেকে এগিয়ে আসে গ্যাব্রিয়েল, নিকের শুভাকাঙ্ক্ষী ডানহাত! আফ্রিকান বলিষ্ঠ পুরুষ সে, মুখখানায় রাজ্যের অন্ধকার। গম্ভীর মুখো মানব তখন আলগোছে গলা খাঁকারি দিলেন। গমগমে গলায় বলে ওঠেন,
“ বস! দামিয়ানকে কে মা’রল এভাবে?”
সহসা নিকের সমুদ্রনীল আঁখি দ্বয়ের শক্ত দৃষ্টি একত্রে নিক্ষিপ্ত হলো গ্যাব্রিয়েলের মুখপানে। ওমনি থতমত খেল বেচারা! তড়িঘড়ি করে দৃষ্টি নামিয়ে কদম সরাতে চাইলেই সম্মুখ থেকে ধেয়ে আসে নিকের বজ্রকঠিন ধমক!
“ ইউ্য সান অফ আ বাস্টা’র্ড! মানুষ মা-রার স্টাইল দেখলেও বুঝিস না এটা কার কাজ? এমন একটা নামি-দামি হোটেলে এসে দিনে-দুপুরে মানুষ মে’রে যাওয়ার সাধ্যি কেবল একজনেরই আছে!”
ত্বরিত বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকায় গ্যাব্রিয়েল। বিভ্রমে ডুবে অস্ফুটে আওড়ায়,
“ ইউ্য মিন ইট’স মনস্তার?”
নিক বাঁকা হাসলো কেমন! তৎক্ষনাৎ শরীর ঘুরিয়ে কদম বাড়াল অদূরের কাউচের পানে। সেথায় রয়েসয়ে নিজ আকর্ষণীয় পুরুষালী দেহখানা এলিয়ে দিয়ে, পায়ের ওপর পা তুলল সে। ভীষণ ভাব নিয়ে তামাক টানতে টানতে আওড়াল,
“ যেহেতু মনস্তার নিজে এসে বাস্টা’র্ডটাকে মে’রে দিয়ে গেছে, তারমানে ঘটনা সত্যি! মনস্তার হেজ আ উইকনেস।”
গ্যাব্রিয়েল দৃষ্টি সরু করল এপর্যায়ে। মুখটায় গাম্ভীর্যের ছাপ নামিয়ে সন্দিহান গলায় বলল,
“ কিন্তু… এমনও তো হতে পারে, আমরা একটু বেশিই ভাবছি নিক। কারণ দামিয়ান তোমার কাছে ঐ মেয়েটার খোঁজ দিয়েছে, যাকে মনস্তার তার প্যালেসে আঁটকে রেখেছে। বাট এজ পার উই নো, মনস্তারের প্যালেসে অনেকেই আছে! আনডাউটেডলি সেখানে মেয়েও আছে। তাহলে তোমার কি সত্যিই মনে হয়? মনস্তার শুধুমাত্র ঐ একটামাত্র মেয়ের প্রতি উইক? আই ডোন্ট নো হোয়াই, বাট আমার এটা মোটেও বিশ্বাস হচ্ছে না।”
নিরুত্তাপ নিক! পায়ের ওপর পা তুলে নাচাচ্ছে সে। দু’হাত কাউচের গায়ে এলিয়ে দিয়ে গম্ভীর কন্ঠে আচমকা বিস্ফোরিত বাক্য ছুড়ঁল সুদর্শন!
“ স্বয়ং রুশদী কিং যে মেয়ের সুরক্ষায় তাকে তার প্যান্টহাউজে আড়াল করেছে, তার প্রতি মনস্তারের দূর্বলতা নেই বলছো?”
তক্ষুনি আকাশ ভেঙে পড়ল গ্যাব্রিয়েল। মুখাবয়বে তার মুহুর্তেই লেপ্টে গেল হতবিহ্বলতার ছাপ! বিস্ময়াবহে দুরত্ব বাড়ল দু-ঠোঁটের মাঝে। হতবিহ্বল কন্ঠে আওড়াল,
“ এ কথা তুমি কিভাবে জানলে নিক? ওয়েট, ওয়েট আ মিনিট!”
থামল গ্যাব্রিয়েল। একমুহূর্ত স্থবির হয়ে বিচক্ষণতার সঙ্গে হিসেব কষলো মনে মনে। একে-একে দুই মিলিয়ে হঠাৎ আন্দাজে ঢিল ছুঁড়ে ফের আওড়াল,
“ এমন নয় তো, মনস্টারের হিডেন প্যালেসে আমাদের কেউ….!”
“ থাকবে না বলছো?”
নিকের আগ বাড়িয়ে বলা বিস্ফোরিত বাক্যে আশ্চর্যের ছাপ ফুটলো গ্যাব্রিয়েলের মুখে। সেই সঙ্গে বাড়ল তার কৌতুহল। মানব তৎক্ষনাৎ ছুটে এলো নিকের পানে। অতি আগ্রহে জানতে চাইলো,
“ কে সে নিক? আর এমন হলে আমরা এখনো বসে আছি কেনো?”
এহেন কথার প্রতিত্তোর করলেন না সুদর্শন গ্যাংস্টার বস। নির্বিকারে উঠে দাঁড়ালেন বসা ছেড়ে। হাতের তালুতে টবেকো পাইপখানা চেপে রেখে এগোলেন লিভিং এরিয়ার দিকে। তবে পথিমধ্যেই তার আড়দৃষ্টি গিয়ে আচমকা ঠেকল অদূরের সোফার এককোণে, যেথায় গায়ের ওপর ব্ল্যাঙ্কেট জড়িয়ে জড়সড়ভাব নিয়ে বসে আছে রুশ স্লাট রমণী। তাকে দেখামাত্রই নারীলিপ্সুক মানবের অভ্যন্তরে আবেদনের বিদ্যুৎ ঝলকে উঠল যেন। সে তক্ষুনি বাঁকা হেসে কদম বাড়াল রমণীর দিকে। রমণী ভীত! কিছুক্ষণ আগেই স্বচক্ষে দেখেছে ওতোবড় দূর্ঘটনা। তাইতো কেমন তটস্থ সে। নিক এগিয়ে এলো চুপচাপ! চোখেমুখে একপ্রকার লিপ্সা লেপ্টে ঠোঁট কামড়ে চেয়ে রইল মেয়েটার পানে। ভীত রমণীর রক্তিম মুখখানা আপাদমস্তক পরোখ করতেই যুবক কেমন হিসহিসিয়ে শুধালো,
“ দামিয়ানের টেস্ট ছিলো বলতে হবে!”
কথাটা বলেই যুবক তৎক্ষনাৎ দু’হাতে সজোরে ধাক্কা দিয়ে বসল রুশ স্লাট রমণীর গায়ে। এহেন অতর্কিত আক্রমণে দিশাহীন রমণী! আচমকা হেলে পড়ল সোফার নরম কোলে। লিপ্সুক নিক তার পানে ঝুঁকে এসে, গা থেকে ব্ল্যাঙ্কেটখানা টেনে সরাতে চাইলেই রমণী ভীত সন্ত্রস্ত কন্ঠে আওড়াল,
“ নো নো নো! নট নাও।”
নিষিদ্ধ অনুভূতিতে টলমল নিক! থোড়াই শুনল রমণীর নাকচ। সে উল্টো একহাতে তক্ষুনি রমণীর গা থেকে ব্ল্যাঙ্কেটটা টেনে এনে ছুঁড়ে ফেলল মেঝেতে। মুহুর্তেই উম্মুক্ত হলো রুশ রমণীর দেহসৌষ্ঠব। নারীলিপ্সুক যুবক কেমন বাঁকা চোখে দেখে যাচ্ছে মেয়েটাকে। রমণী নিজেকে ঢাকতে চাইলেই যুবক হাত রাখল নিজ প্যান্টের অগ্রভাগে। অতঃপর রমণীর হাজার বাঁধ দেয়া স্বত্বেও খারাপ পুরুষ লিপ্ত হলো নিষিদ্ধ আদিম কাজে! এরইমধ্যে লিভিং এরিয়ায় হাজির গ্যাব্রিয়েল। অস্থির উচাটনে কি যেন বিড়বিড়িয়ে যাচ্ছে সে। আনমনে বা-দিকে দৃষ্টি উঁচিয়ে তাকাতেই ওমনি ফের থতমত খেল গম্ভীর পুরুষ! তড়িঘড়ি করে নজর ঝুঁকিয়ে প্রস্থান ঘটাতে উদ্যোত হতেই কর্নকুহরে ভেসে এলো নিকের শীৎকার ধ্বনিতে আওড়ান বাক্য,
“ আ ফা’কিং বা’স্টার্ড মনস্তার! শুনে রাখ, খুব শীঘ্রই তোর দূর্বলতা থাকবে এই স্লাটের জায়গায়! আর আমি? রোজ, না না প্রতিমুহূর্তে তাকে নিলামে তুলব! আই প্রমিস, শহরের সবচেয়ে দামী স্টেজে ওর দাম উঠাব আমি। আহ ফা’ক!”
অন্ধকারে নিমজ্জিত কামরা! যেথায় চোখ যাচ্ছে সেথায় ধু ধু অন্ধকার। সপ্তদশীর কক্ষের দুয়ার পানে দাঁড়িয়ে আছে মিলা। চিন্তায় কপালের চামড়ায় পড়েছে ভাঁজের ছাপ। তরুণী আর একমুহূর্তও সময় নষ্ট না করে তক্ষুনি পা ছোটালো কক্ষে। বিচলিত কন্ঠে আওড়াল,
“ মুনলাইট? মুনলাইট কোথায় তুমি?”
অন্ধকারে পা টিপে টিপে হাঁটছে মিলা। হাঁটার পথিমধ্যে হুট করেই তার পাদু’টো স্পর্শ পেলো কারো শীতল অঙ্গের। তক্ষুনি ভড়কায় মিলা। হাঁটা থামিয়ে তড়িঘড়ি করে হাঁটু ভেঙে বসল মেঝেতে। অন্ধকার হাতড়ে মেঝেতে পড়ে থাকা মানবীর গায়ে আলতো করে ছুঁয়ে দিয়ে উদ্বিগ্ন কন্ঠে আওড়াল,
“ মুনলাইট? কি হয়েছে তোমার? এভাবে মেঝেতে শুয়ে আছো কেনো? এই মেয়ে!”
সপ্তদশী সজাগ! তবুও দূর্বল কন্ঠফুঁড়ে কথা বেরুচ্ছে না তার। মিলা আরও অস্থির হলো। একনাগাড়ে বেশক’বার ডাকার দরুন নিরব কান্নায় জর্জরিত মেয়েটা অস্ফুটে থেমে থেমে বলল,
“ কি হয়েছে?”
রমণীর সাড়া পেয়ে হাঁফ ছাড়ল মিলা। খানিকটা স্বস্তিতে মুদে আচমকা সর্তক কন্ঠে আওড়াল,
“ ওঠো ওঠো! কেউ তোমার অপেক্ষা করছে!”
হকচকিয়ে ওঠে মাহি। অবোধ কন্ঠে জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ কে?”
অন্ধকারে মিলার মুখ অভিব্যাক্তি স্পষ্ট নয়। কেবল শোনা গেল তরুণীর সুরম্য কন্ঠ!
“ তোমার পাগল পুরুষ!”
“ দু’দিনের একটা মেয়ে! জাস্ট দু’দিনের। কাল এসে আজকেই দ্য শ্যাডো মনস্টারকে নিজের আঙুলের ডগায় ঘোরাচ্ছে। আজ তার মিথ্যে এবং বানোয়াট কথার জের ধরে মনস্তার তোমাদের সবাইকে কুকুর পেটা করেছে! তারপরও তোমরা চুপ করে থাকবে? ওকে এতো সহজে ছেড়ে দিবে? তোমরা কি ভুলে গেলে মনস্তার তোমাদের বলেছিল — যে একে-অপরকে মে’রে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারবে, কেবলমাত্র সে-ই এই প্যালেস থেকে বের হতে পারবে। অথচ তোমরা কি করলে?”
প্যালেসের টর্চার সেল! যেথায় মনস্তারের আদেশে একত্র করা হয়েছে সকল মেইডদের। গম্ভীর মুখো এলেক্সের ওমন বিতর্কিত বাক্যবাণে দোলাচালে পড়লেন সকল মেইডস। বারবার একে-অপরের পানে তাকাচ্ছেন আড়দৃষ্টে। ওদিকে অলক্ষ্যে বাঁকা হাসছে এলেক্স। ধূর্ত শেয়ালের ন্যায় মাহি’র বিরুদ্ধে বিষ ঢালছে সকলের মনে। প্রথম বাক্যবাণে সকলকে ওমন ভাবনায় পড়তে দেখে, ধূর্ত মানব ফের গম্ভীর কন্ঠে মুখ খুললেন,
“ তোমরা সবাই যেমন বন্দী, ওই মেয়ে তো বন্দী! তাহলে তোমাদের সাথে এমন ব্যাবহার, আর ওর সাথে আলাদা এটা কেনো হবে? তোমরা কি এখনো বুঝতে পারছো না? ঐ মেয়ে ঠিক কতটা চালাক! ও ঠিকই নিজের রুপ এবং কথার জালে মনস্তারকে ভুলিয়ে দিচ্ছে আর তোমাদের ওপর অত্যাচার বাড়াচ্ছে। এখনো চুপ করে থাকলে ও মনস্তারকে দিয়ে তোমাদের সবাইকে মে’রে ফেলবে!”
একযোগে আঁতকে উঠে সকলে। কেউ কেউ আগ বাড়িয়ে বলেই বসে,
“ না না! ঐ মেয়েকে আর বাড়তে দেয়া যাবে না। ওর খেল এপর্যন্তই।”
সহসা রহস্যময় বাঁকা হাসির রেশ ফুটলো এলেক্সের ঠোঁটের কোণে। গম্ভীর মুখো মানব শক্ত চোয়ালে পিঠ ঘুরিয়ে দাঁড়ায় এবার। নিজের শেষ চাল চেলে বলে ওঠে,
“ শোনো সবাই! যে ব্যাক্তি ঐ মেয়েকে সরিয়ে ফেলতে পারবে, তাকে আমি নিজ দায়িত্বে এ প্যালেস থেকে পরিত্রাণ দেব। কথা দিচ্ছি!”
সুযোগ! এ যে বন্দীদের নিকট নিজ আজাদী হাসিলের সবচেয়ে বড়ো সুযোগ। তা কি আর ওতো সহজে কেউ হাতছাড়া করে? প্রত্যেকের চোখেমুখে আচমকা ফুটে উঠল একপ্রকার বিদ্বেষ! যে বিদ্বেষের দোষী কারাগারে স্থান পেয়েছে — নিষ্পাপ সপ্তদশী! কে জানে এখন তার ভাগ্যে আর কি কি আছে!
মাথার ওপর তীব্র তুষারপাত! কোমল সপ্তদশী কাঁপা কাঁপা বদনে এসে দাঁড়িয়েছে প্যালেসের উল্টোদিকের দুয়ার পানে। তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে মিলা! সর্তক দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে এদিক-ওদিক। ভীত সপ্তদশী কেমন ঢোক গিলছে বারংবার। দোনোমোনোয় হুট করেই জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ এতো রাতে এভাবে ওপেনলি দেখা করাটা আদৌও ঠিক মিলা? বিস্ট যদি দেখে ফেলে?”
তক্ষুনি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় মিলা। মুখে এক অদ্ভুত শান্ত হাসির রেশ টেনে, একহাতে আলতো করে জড়িয়ে ধরে মাহি’র কাঁধ। সস্নেহে শুধায়,
“ আরে ধূর পাগল! আমি আছি না? এতো টেনশন নিচ্ছো কেনো? তুমি নির্বিঘ্নে কথা বলো তোমার পাগল পুরুষের সাথে। আমি এখানেই… মানে ব্যাক ইয়ার্ডে দাঁড়িয়ে আছি। আমি নজর রাখব কেউ এখানে আসি কি-না! তুমি যাও। হেভ আ গ্রেট কোয়ালিটি টাইম ডিয়ার!”
বলেই মিলা কাঁধ ছাড়ল মাহি’র। সপ্তদশীকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে তড়িঘড়ি করে পা ঘোরালো উল্টোপথে। এদিকে দ্বিধায় জর্জরিত মাহি! হঠাৎ বুক কাঁপছে তার। মনে হচ্ছে খারাপ কিছু একটা ঘটতে চলেছে! মাহি’র উদ্বিগ্নতা বাড়ছে ক্রমশঃ অভ্যন্তরীণ চিন্তায় বুদ থেকে মেয়েটা যে-ই না চলে যেতে উদ্যোত হবে ওমনি অদূরের অন্ধকার জঙ্গলের আদ্যপ্রান্ত হতে ভেসে এলো অল্প পরিচিত এক ডাক!
“ সানবার্ড!”
সহসা থমকায় সপ্তদশীর পদযুগল! ছলাৎ করে উঠল বুক। ঠায় দাঁড়িয়ে রইবার কালে পেছন থেকে ফের ফিসফিসিয়ে ডেকে ওঠে যুবক,
“ এই সানবার্ড! দেখা না করেই চলে যাবে?”
শুকনো ঢোক গিলল মাহি। রয়েসয়ে ঘুরে দাঁড়াল সে। কদম দু’টো সম্মুখে বাড়াতে গেলেই যুবক আচমকা সর্তক কন্ঠে বলে ওঠে,
“ স্টপ! যেখানে আছো সেখানেই থাকো। কাছে এলে বিপদ হতে পারে।”
মাহি থামল। সরু দৃষ্টি আলগোছে উঁচিয়ে তাক করল সম্মুখে। অদূরে স্রেফ অন্ধকার! সেথায় আদৌও কেউ দাঁড়িয়ে আছে কি-না তা বোঝা মুশকিল। সপ্তদশী কাঁপা কাঁপা কন্ঠে অস্ফুটে জিজ্ঞেস করল,
“ কিছু বলবেন?”
অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা কমান্ডার মায়াঙ্ক কেবল গভীর দৃষ্টে অবলোকন করে যাচ্ছে মেয়েটাকে। কন্ঠে রা নেই তার। চোখদুটো তৃষ্ণা মেটাতে ব্যস্ত! যেন কতদিন ধরে প্রিয় মানুষের দর্শনের অপেক্ষায় ছিলো তারা। এদিকে মাহি’র সর্বাঙ্গ কাঁপছে ঠান্ডায়! দেহের হাড়গুঁলো বারি খাচ্ছে একে-অপরের সনে। মেয়েটা ফের ব্যস্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
“ কিছু বলবেন?”
মায়াঙ্ক মৃদু হাসল। কন্ঠে নমনীয়তা ঢেলে আওড়াল,
“ বলতে তো অনেককিছুই চাই! তবে সময় আর সুযোগের অপেক্ষা। যাকগে সেসব কথা! তা বলো তো সানবার্ড! তুমি আমায় ডাকলে কেনো? কিছু কি হয়েছে?”
হুট করেই পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল মাহি’র। অভ্যন্তরে হোঁচট খেতে গিয়েও কোনমতে রক্ষে পেলো সে। কপালে উদয় হলো সন্দিগ্ধ ভাঁজ! তড়িঘড়ি করে ব্যস্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“ মানে? আমি কখন ডাকলাম আপনাকে? আপনিই তো আমাকে ডাকলেন?”
“ কিহ? আমি? কখন? আমি তো….”
বাকিটা বলতে গিয়েই জিভ আটকালো মায়াঙ্কের। আনমনে তার দৃষ্টি গিয়ে থমকাল মাহি’র ঠিক মাথার ওপর। প্যালেসের টাওয়ারের ছাঁদ থেকে ধীরে ধীরে গড়াচ্ছে একখানা বিশাল বরফের স্তুপ! যা মেয়েটার মাথার ওপর পড়লে হয় মাথা ফাটবে, নয়তো বড় কোনো ধরণের দূর্ঘটনা ঘটবে নিশ্চিত! মায়াঙ্ক অস্থির হলো। তক্ষুনি মাহি’কে সর্তক করে দেবার ভঙ্গিতে আওড়াল,
“ সানবার্ড সরো! বরফ পড়ছে!”
বুঝলো না মাহি! চশমার আড়ালে চোখদুটো ক্ষুদ্র করে নিয়ে সন্দিহান কন্ঠে পরপরই জিজ্ঞেস করল,
“ কী? কি পড়বে?”
মায়াঙ্কের অস্থিরতা বাড়ছে ক্রমশ। সর্তক দৃষ্টি আবারও গিয়ে তাক হলো মেয়েটার মাথার ওপর। বরফটা বড্ড বেঁকে এসেছে। যেকোনো সময় ঘটবে দূর্ঘটনা। মায়াঙ্ক কেমন দিকবিদিকশুন্যের ন্যায় ফের আওড়াল,
“ সরো সানবার্ড! মাথার ওপর খেয়াল করো!”
হতভম্ব মাহি! কি বলছে কমান্ডার লোকটা? বারবার সরতে বলছে কেনো? আর মাথার ওপরেই বা কী? ভাবতে ভাবতেই রমণী আলগোছে মাথা তুলে তাকাল। ওমনি দৃষ্টি থমকাল সপ্তদশীর! চোখের সামনে ওতো ওপর থেকে ধসে পড়ছে একখানা বরফ স্তুপ! হতবুদ্ধির ন্যায় নিশ্চল হয়ে গেল রমণী। তড়িঘড়ি করে দু’হাতে নিজের মুখ ঢাকতে গেলেই আচানক একজোড়া শক্তপোক্ত হাতের হেঁচকা টানে সপ্তদশী ক্ষুদ্র বদনখানি টলে উঠল বেশ! চোখের পলকে সে হাতজোড়ার বলিষ্ঠ মালিক নিজ পাহাড়সম দেহের আড়ালে আড়াল রমণীর ক্ষুদ্র টলমল বদন। জোরালো ধাক্কায় দু’জন গিয়ে আছড়ে পড়ল বরফের তুলতুলে গায়ে। থমকায় চারপাশ! থমকায় সপ্তদশী। এলোমেলো সন্ত্রস্ত ভঙ্গি তার। চোখ থেকে সরে গিয়েছে চশমা। সে অবস্থাতেই কপাল কুঁচকে সম্মুখে তাকাল মাহি। পরমুহূর্তেই নিজেকে আবিষ্কার করল — বড্ড ঘৃণিত মানুষটার বুক পিঞ্জরে।
মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪৯
মানবের বলিষ্ঠ দেহখানা তাকে আগলে রেখেছে। মাহি ধীরে ধীরে চোখ উঁচায়। বলিষ্ঠ পুরুষের সুশ্রী উদ্বিগ্ন মুখপানে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতেই আচমকা তার গাল বরাবর চুইয়ে পড়ল উষ্ণ তরল জাতীয় কিছু। মাহি ভড়কায়! তড়িঘড়ি করে দৃষ্টি নিখাঁদ করতেই দেখে — রূঢ় মানবের ঘাড়ের পেছন থেকে অবলীলায় গড়াচ্ছে উষ্ণ তাজা লহু। তবুও মানবের চোখেমুখে ব্যথার লেশমাত্রও নেই। সেথায় লেপ্টে আছে আকাশসম উদ্বিগ্নতা। যা তার কন্ঠে ফুটে উঠল মাত্র একটি কথায়!
“ আর ইউ্য ওকে সিগনোরা?”
