Home মির্জা সায়ান মুগ্ধ মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫৫

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫৫

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫৫
jannatul firdaus mithila

“ বাড়িতে জায়গার অভাব পড়েছে আপনার মতো পাড়ার কুচুটে মহিলার? আমার ঘরে কি করব না করব, ওপেনলি করব না আঁটকে করব, তা বলার আপনি কোন ভেড়ার বা*ল? যাক কষ্ট করে এসেছেন যখন কাছে আসেন। আমি এখন ফুল মুডে আছি, আপনার সামনেই নাহয় রঙ্গলিলাটা শুরু করি। এতে অনেককিছু লাইভ শিখতে পারবেন আপনি। বুড়ো বয়সে কাজে দিবে! এটলিস্ট ভীমরতি বাড়বে।”
সহসা জিভের তলায় দাঁত চলে গেল মধ্যবয়সী সুদীপা রায়ের। বেয়াদব ছেলেটার ওমন বেফাঁস কথাবার্তায় বিরক্তিতে কুঁচকে নিলেন মুখ। চোয়ালের পেশি টানটান করে নিয়ে তক্ষুনি দাঁত কিড়মিড়িয়ে শুধালেন,
“ ছিহঃ ছিহঃ ছিহঃ শেষমেশ জমিদার বাড়ির সে-কি দূর্ভাগ্য এলো! এভাবে খুল্লাম খুল্লাম নোংরামো করতে একটুও বাধছেনা তোমাদের?”
লজ্জায় বাকরুদ্ধ মাহি! আলগোছে নামিয়ে নিয়েছে চিবুক। যুবকের কোল থেকে নামার বৃথা প্রয়াসে খানিকটা মত্ত হতেই হাতের বাঁধন গাঢ় করলেন রূঢ় মানব। কাপড়ের পাতলা আবরণের ওপর দিয়েই খামচে ধরলেন রমণীর নরম উরুর ত্বক। সহসা মৃদু ব্যথার জেরে মুখ বিকৃত হলো সপ্তদশীর। কন্ঠ ফুঁড়ে অস্ফুটে বেরিয়ে এলো একটুখানি ব্যথাতুর ধ্বনি!

“ উহঃ!”
মুগ্ধ প্রতিক্রিয়াহীন! বাদামী চোখদুটোতে নামিয়েছে একরাশ প্রগাঢ়তা। রমণীর পেলব মুখখানার পানে অটুট দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে, বলিষ্ঠ ডানহাতটা আলগোছে উঠিয়ে আনলো রমণীর নরম ঘাড়ের ত্বকে। সেথায় এবার আলতো চাপ প্রয়োগ করছে রূঢ় মানব। ধীরলয়ে নিজ সুশ্রী মুখমণ্ডলের অত্যন্ত সন্নিকটে টেনে আনছে রমণীর পেলব মুখখানা। অথচ সপ্তদশী বড্ড চঞ্চলা! যুবকের লাগামহীন কর্মকাণ্ডের পূর্বাভাস পেয়ে, হরিণী চোখদুটোয় ঘৃণার প্রকট ছাপ ফুটিয়ে চিড়বিড়িয়ে চাপা কন্ঠে আওড়াল —
“ এতটা নির্লজ্জ হবেন না বিস্ট! আপনার লজ্জা না থাকতে পারে, তবে আমার রয়েছে!”
তক্ষুনি অধর কামড়ে বাঁকা হাসলো মুগ্ধ। মাহি’র ক্ষুদ্র মুখখানা বড্ড কাছে টেনে এনে চোখে রাখল চোখ। তার রুক্ষ অধরযুগল ছুঁই ছুঁই সপ্তদশীর তুলতুলে ওষ্ঠপুট! ভাবস্রোতে খানিক দুষ্টুমি লেপ্টে পরপরই গমগমে গলায় আওড়াল —

“ আপাতত তোর সকল লাজ-লজ্জা গরম পানিতে ফুটিয়ে, ঠান্ডা করে ঢকঢক করে গিলে নে পিচ্চি! কজ আমি এখন আরো নির্লজ্জ হবো।”
মুখাবয়বে বোধগম্যহীনতার ছাপ ফুটলো মাহি’র। ভ্রু যুগল খানিকটা কুঞ্চিত হতেই অধর বরাবর অতর্কিত আক্রমণ বসালেন নির্লজ্জ মাফিয়া বিস্ট। রমণীর তুলতুলে ওষ্ঠপুটে বেগতিক আশ্লেষী ভঙ্গিতে আধিপত্য বিস্তারে মত্ত হলেন তিনি। রমণী হতভম্ব! সে-ই সঙ্গে লজ্জিত বড্ড। ওষ্ঠপুটে চলমান আগ্রাসী হামলায় গা সইতে না সইতেই তার ক্ষুদ্র বদনে লেপ্টে গেলো রূঢ় মানবের শক্তপোক্ত বাহাতের বেপরোয়া স্পর্শ! তক্ষুনি নিঃশ্বাস আঁটকে যাবার উপক্রম মাহি’র। চোখদুটো খিঁচে নিয়েছে একপ্রকার। নরম হাতদুটোর মখমলি আঙুলের ডগাগুলো ততক্ষণে দেবে গিয়েছে বলিষ্ঠের রুক্ষ বক্ষভাঁজে। বসাচ্ছে নিজেদের নখর চিহ্ন! অথচ সেদিকে ভ্রুক্ষেপহীন মুগ্ধ। ডানহাতের রুক্ষ তালুতে রমণীর তুলতুলে ঘাড়ের পেশী আঁটকে রেখে, বাহাতের উৎকট স্পর্শে ভেঙ্গে দিচ্ছে রমণীর ক্ষুদ্র লাজের দরজা। মাহি দূর্বল হচ্ছে ক্রমশ! যুদ্ধে পরাস্ত সৈনিকের তকমা পাবার পূর্বে বীরাঙ্গনার ন্যায় ফের মোচড়ে উঠল রমণী। বলিষ্ঠের শক্ত বাঁধনে আঁটকে থেকেও ডানা ঝাঁপটালো বারকয়েক। রমণীর এরূপ ব্যর্থ প্রয়াস উপলব্ধ হতেই চুম্বনের নিবিড়তা বাড়ালেন অভদ্র মাফিয়া বিস্ট। বাড়ালেন রুক্ষ হাতের বেপরোয়া স্পর্শের গভীরতা।
ওদিকে দু – কপোত-কপোতীর এহেন বেলাজা কর্মকাণ্ড দেখে নাকমুখ কুঁচকে বসেছেন সুদীপা রায়। তড়িঘড়ি করে মুখ লুকোলেন শাড়ির আঁচলে। মুখাবয়বে চরম মাত্রার অসন্তোষ্টির ছাপ ফুটিয়ে মুখ ঝামটি দিয়ে সরে গেলেন দুয়ারের কাছ থেকে। পা চালাতে চালাতে দাঁত খিঁচে আওড়ালেন,
“ নষ্ট ছেলে কোথাকার! অথচ এর গায়ে নাকি রাশিয়ার ওতো বড়ো মানুষটার র ক্ত বইছে!”

চুম্বনের দীর্ঘ আবেশ কাটিয়ে সদ্য অধরযুগল বিচ্ছিন্ন করলেন সুদর্শন। পরপরই মিলন ঘটালেন সপ্তদশীর নিবুনিবু আঁখিদ্বয়ের সনে। দূর্বল রমণী ভীত! সামান্য গভীর চুম্বনের আবেশে কুণ্ঠিত। বদন কাঁপছে ক্ষণে ক্ষণে! মুগ্ধ আলতো হাসলো বোধহয়। দাঁত বসালো নিম্নাংশের অধরকোণে। ধীরলয়ে রমণীর তুলতুলে ঘাড়ের ত্বক হতে গড়িয়ে নামছে রূঢ় মানবের রুক্ষ আঙুলগুলো। মুহুর্তব্যয়ে তারা আঁচানক ছুঁয়ে দিলো মাহি’র তিরতির করে কাঁপতে থাকা সিক্ত ওষ্ঠপুট। জখমের ওপর জখম পড়ায় দাগ বসেছে সেথায়। তাজা লহুর ক্ষীণতম উপস্থিতি স্পষ্ট! যুবকের রুক্ষ বৃদ্ধা আঙুলখানা আলতো করে ঘষে দিলো জায়গাটুকু। হুটহাট ব্যথার উপশমে মুহুর্তেই রমণীর ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে অস্ফুটে বেরিয়ে এলো ব্যথাতুর ধ্বনি! যুবক মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় শুনলো শব্দটুকু। গভীর দৃষ্টে অপলকভাবে তাকিয়ে রইলো মেয়েটার আহত ওষ্ঠপুট পানে। কন্ঠে ব্যাপক শান্ত ভাব ঢেলে শুধালো,

“ আমি বড়ো বিধ্বংসী পিচ্চি! যার সন্নিকটে এলে বিধ্বস্ত হওয়াটা বড্ড স্বাভাবিক!”
অশ্রুসজল চোখদুটো রমণীর! নত হয়ে আছে সে-ই কখন থেকে। যুবকের বোধহয় ইচ্ছে হলো রমণীর ছলছলে চোখদুটোয় ডুব দিতে। যার ভাবাবেগে সে তৎক্ষনাৎ আঁকড়ে ধরল মাহি’র নরম সরম চোয়ালখানা। মুহুর্তেই জমে গেল মাহি! নাকের পাটা ফুলিয়ে একত্রিত করল নিজ ঘোলাটে দৃষ্টিজোড়া। নির্দয়ের মুখ অভিব্যক্তি তক্ষুনি রং পাল্টালো। এক অদৃশ্য আধিপত্যের জানান দিয়ে ফের হিসহিসিয়ে আওড়াল,
“ আমি বড্ড রূঢ় সিগনোরা। ভীষণ খারাপ আমি! একটুখানি ছুঁয়ে দিলে তীব্র ব্যথায় জর্জরিত যে হতেই হবে! বাট ডোন্ট ওয়ারি মা’ই গার্ল, যতবার আমার স্পর্শে তোর বদনে ক্ষত হবে, ঠিক ততবার তোর ঐ ক্ষততে মলম হিসেবে নাহয় আমি লেপ্টে যাবো।”

সহসা ফুপিয়ে ওঠে মাহি! অন্তঃকোণের উদ্ভট বেয়াদবির রেশে আঁটকা পড়ে, সদ্য কর্তিত লাউলতার ডগার ন্যায় মুষড়ে পড়ল রূঢ় মানবের রোমহীন প্রশস্ত বক্ষে। সহসা ঢুলে পড়া দূর্বল মানবীকে বলিষ্ঠ দু’হাতের দৃঢ়বন্ধনে আগলে নেয় লোকমুখে চর্চিত হার্টলেস মাফিয়া বিস্ট! আঁটকে নেয় নিজ রুক্ষ বক্ষপিঞ্জরে। নিষ্পাপ রমণী অশ্রু বিসর্জনে মত্ত! কেঁদেকুটে ভাসাচ্ছে রূঢ় মানবের লোমহীন উম্মুক্ত বুক। মুগ্ধ থামালো না মেয়েটাকে। উল্টো আলগোছে জড়িয়ে রাখলো নিজের সনে। কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তোলবার যোগাড় হয়েছে মাহি’র। তা টের পেতেই যুবকের উদ্বিগ্নতা বাড়ল বোধহয়। সে তড়িঘড়ি করে হাত উঠিয়ে আনলো ক্রন্দনরত রমণীর মাথার ওপর। উদ্বিগ্ন ভারী কন্ঠে আওড়াল,
“ হুঁশ! কাঁদে না। নয়তো মাথাব্যথা করবে। আমি এখন ফুল মুডে আছি সিগনোরা! এক্ষুণি একটু-আধটু হ্যাংকি-প্যাংকি করতে না পারলে শান্তি হচ্ছে না আমার! তাই এখনি কাঁদিস না। কান্নাটুকু জমিয়ে রাখ, আরেকটু পর এমনিতেই কাঁদতে হবে।”
তৎক্ষনাৎ কান্নার বেগ বেড়ে গেল সপ্তদশীর। রূঢ় মানবের বলিষ্ঠ হাতদুটো গা থেকে সরানোর প্রয়াসে ক্ষুদ্র বদনে তুললো ঝংকার। কিন্তু বালাইষাট! লোকটার ইস্পাত-দৃঢ় হাতদুটো থোড়াই নড়ল জায়গা থেকে। মাহি অতিষ্ঠ এপর্যায়ে। নাক টেনে টেনে ঝাঁঝিয়ে আওড়াল,

“ হাত সরান আমার গা থেকে!”
কথাটা মোটেও কানে তোলেনি মুগ্ধ। উল্টো নরম তালে আকিঁবুকিঁ চালাতে লাগল মাহি’র মাথার ওপর। বোকা মানবী শান্ত হতে গিয়েও হচ্ছে না যেন। নাক ফুলিয়ে মোটা কন্ঠে ফের বলে বসল,
“ ছাড়ুন আমায়।”
সহসা গালের ভাঁজে জিভ ঠেলল মুগ্ধ। একমুহূর্ত মৌন থেকে পরক্ষণেই গমগমে গলায় শুধালো,
“ তুই কি জানিস? তুই রেগে তোকে ঠিক কতটা হট এন্ড সে ক সি লাগে? এ্যাই ওয়েট ওয়েট! এটা আগেভাগে টের পেয়েই কি তুই আমায় সিডিউস করতে চাচ্ছিস পিচ্চি?”
ত্বরিত নাকমুখ কুঁচকে গেল মাহি’র। ঝাঁঝ ছড়িয়ে গেল ক্ষুদ্র পেলব মুখখানায়। তিতিবিরক্ত মেজাজে তেতোঁ কন্ঠে পরপরই শুধালো,

“ ছিহঃ!”
“ ষিহ!”
রমণীর কথার পিঠে ব্যাঙ্গাত্মক স্বর আওড়াল রূঢ় মানব। দাঁত পিষে হাসল পরক্ষণেই। রয়েসয়ে ভরাট কন্ঠে বলে উঠল,
“ চল সিগনোরা!”
অবোধ মাহি! ভ্রুযুগল অলক্ষ্যে কুঁচকে নিয়ে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়েঁ সপ্তদশী,
“ কোথায়?”
বাঁকা হাসে মুগ্ধ। ধীরলয়ে শক্তপোক্ত হাতখানা নামিয়ে আনে মেয়েটার মেদহীন বাঁকানো কোমর বরাবর। সেথায় খানিক রুষ্ট চাপ বসিয়ে হুট করেই দুষ্ট কন্ঠে শুধালো,
“ বেড কাঁপাতে!”
বোধগম্যহীনের ন্যায় ঠোঁট উল্টায় মাহি। বোকাসোকা ভাবভঙ্গিমায় ধীরলয়ে মাথাটা সামান্য উঁচিয়ে দৃষ্টি তাক করল মুগ্ধের পানে। হতভম্ব কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,

“ মানে?”
তৎক্ষনাৎ প্রতুত্তর করেনি মুগ্ধ। নির্বিকার ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইলো খানিকক্ষণ। বোকা রমণীর উৎসুক দৃষ্টিজোড়া তার পানে নিবদ্ধ। বোধহয় কাঙ্ক্ষিত উত্তরের অপেক্ষায়! মুগ্ধ আলগোছে জিভ ঠেলে অধর ভেজালো। দৃষ্টিজোড়া সরু করে নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ বুঝিসনি?”
নির্বোধের ন্যায় দু’ধারে মাথা নাড়ায় মাহি। তা দেখে জনাবের দুষ্টুভঙ্গিমা বাড়ল বোধহয়। তৎক্ষনাৎ বিজ্ঞের ন্যায় অভিব্যক্তি ধরে রেখে শুধালো,
“ ওয়েট! লেট মি শো ইউ।”
উত্তর জানতে বড্ড আগ্রহী মাহি! কৌতুহলী চোখদুটো মানবের পানে নিবদ্ধ। এরইমধ্যে নিজ বলিষ্ঠ হাতদুটো সম্মুখে নিয়ে আসে মুগ্ধ। রমণীকে দেখিয়ে দেখিয়ে বাহাতের বৃদ্ধা এবং তর্জনীর সাহায্যে একখানা গোলাকৃতি বানিয়ে, অপর হাতের মধ্যমা তাক করল তাতে। মুহুর্তের কৌশলে ইঙ্গিত দেখালো বাজে কিছুর! ওমনি বিস্ফোরিত রূপ ধরল মাহি’র চোখদুটো। বিষিয়ে গেল মন। ঘৃণায় গা গুলিয়ে উঠার উপক্রম বেচারির। নাকমুখ কুঁচকে, দাঁত খিঁচে বলে ওঠে,

“ জানোয়ার লোক একটা! সকাল সকাল হতে না হতেই শুরু হয়ে গেল আপনার লুচুগিরী? অসভ্য, বেয়াদব লোক!”
গালি খেয়েও ঠোঁটের কোণে হাসি ধরে রাখার সুকৌশলে কৌশলী মুগ্ধ! বেয়াদবের ন্যায় ঠোঁট কামড়ে হাসছে আর দুষ্ট দৃষ্টে তাকিয়ে আছে মেয়েটার পানে। মাহি দাঁত কিড়মিড় করছে এপর্যায়ে। ঝাঁঝ দেখিয়ে ফের বলে ওঠে,
“ চোখ নামান অসভ্য লোক! আমার দিকে মোটেও এমন অসভ্য নজরে তাকাবেন না।”
গা-ছাড়া ভাব ধরলেন যুবক। ধীরলয়ে শক্তপোক্ত হাতটা ঘুরিয়ে এনে রাখল নিজ মাথার নিচে। দৃষ্টিজোড়া অপরিবর্তিত রেখে, গমগমে গলায় বলে ওঠে,
“ তোকে ছাড়া আর কার দিকে এমন করে তাকাবাে শুনি?”
যথাতথা ক্ষুদ্র মুখখানা গম্ভীর হলো সপ্তদশীর। লাজুক বদনে নামলো খানিক স্থিরতা। রয়েসয়ে রূঢ় মানবের কোলে উঠে বসলেন বোকা মানবী। নজর রাখলেন ঝুঁকিয়ে! কন্ঠে ভারী গাম্ভীর্যের ছাপ ফুটিয়ে সময় নিয়ে আওড়ালেন,

“ মানুষের অভাব আছে আপনার?”
“ দুয়েকটা উদাহরণ দে দেখি!”
এক লহমায় স্থবির হলো মাহি! ক্ষুদ্র চোয়ালের পেশি টানটান করে নিয়ে ঝাঁঝাল কন্ঠে পরপরই শুধালো,
“ শুনলাম কে না-কি মিসেস টু-বি অধীর রায় হতে যাচ্ছে!”
তড়াক বাদামী চোখদুটোয় তীক্ষ্ণতা ভর করল রূঢ় মানবের। অজানা উপলব্ধিতে বিস্ময় লেপ্টে গেল সম্পূর্ণ মুখমণ্ডলে। একমুহূর্ত মৌন থেকে ছেলেটা হুট করেই ভ্রু বাঁকালো। কন্ঠে সন্দিহান ভাবভঙ্গি ফুটিয়ে শুধালো,
“ জ্বলে?”
তক্ষুনি দৃষ্টি উঁচায় মাহি! একপ্রকার থতমত খেয়ে আমতা আমতা স্বরে প্রতুত্তর করে,
“ কি? কি জ্বলবার কথা বলছেন আপনি?”
রূঢ় মানব বড্ড বেয়াদব! মেয়েটার মনের অবস্থা খানিক টের পেতেই জ্বালাতন বাড়ালেন তিনি। বিজ্ঞের ন্যায় এদিক-ওদিক নাক বাড়িয়ে টানলেন জোরালো নিশ্বাস। সময় নিয়ে সন্দিগ্ধ গলায় আওড়ালেন,
“ তেমন কিছু না। কোত্থেকে যেন ভীষণ পোড়া পোড়া গন্ধ পাচ্ছি মনে হচ্ছে! তাই জিজ্ঞেস করলাম — জ্বলছে না-কি কিছু?”

নাক ফোলায় মাহি! মুখ ঝামটি দিয়ে বলে ওঠে,
“ হোয়াট ননসেন্স! আপনার নাকে নির্ঘাত সমস্যা দেখা দিয়েছে। ডাক্তার দেখান গিয়ে, যান!”
হাসলো মুগ্ধ! মুক্ত হাতটা আলগোছে বাড়িয়ে দিলো মেয়েটার দিকে। রমণীর নরম তুলতুলে কব্জিসন্ধি আঁকড়ে ধরে বলতে লাগলো,
“ ডাক্তারের কি দরকার? তুই আছিস না? তুই থাকতে…”
“ আহ!”
মুহুর্তেই বাক আটকালো মুগ্ধের। চোখদুটো বিস্ফোরিত হলো পরপরই। মেয়েটা ওভাবে গোঙালো কেনো? কি হয়েছে ওর হাতে? উৎকন্ঠায় তক্ষুনি রমণীর নরম হাতখানা সম্মুখে তুলে ধরে মুগ্ধ। ওমনি দৃশ্যপটে দৃশ্যমান হলো — সদ্য ফোঁসকা পড়া রমণীর দু’টো আঙুল। লালচে ভাব ধরেছে সম্পূর্ণ হাতের তালুতে। তৎক্ষনাৎ মুখ অভিব্যক্তি পাল্টে গেল মাফিয়া বিস্টের। চোখদুটোতে ছড়িয়ে গেল আগুন! সে তক্ষুনি এক ঝটকায় উঠে বসল শোয়া ছেড়ে। একহাতে মানবীর কোমর আঁকড়ে রেখে অন্যহাতে আলতো করে চেপে রাখল ফোস্কা পড়া হাতটা। বিশাল হুংকার ছুঁড়ে আওড়াল,

“ কি হয়েছে তোর হাতে? ফোস্কা পড়ল কিভাবে? কি করেছিস তুই? কোথায় গিয়েছিলি? উত্তর দে সিগনোরা! তাড়াতাড়ি উত্তর দে।”
রূঢ় মানবের বিকট হুংকারে কেঁপে ওঠে মাহি! ভয়ার্ত ঢোক গিলে আমতা আমতা করে কোনমতে শুধায়,
“ ঘরের ওয়াশবেসিনের ফসেট থেকে গ-গরম পানি বের হচ্ছিল।”
মুহুর্তেই চোয়াল শক্ত হলো মাফিয়া বিস্টের। রাগে থরথর করে কাঁপতে লাগল শুভ্র মুখশ্রী। সাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করতে ফের ক্ষুব্ধ বাঘের ন্যায় গর্জন তুলে বলে ওঠে,
“ কোন বাস্টা’র্ডের এত ইচ্ছে হলো আমার হাতে ম’রার? চল..”
বলতে বলতেই হালকা ওজনের রমণীকে এক ঝটকায় কাঁধে তুললেন রূঢ় মানব। পায়ের গতিতে লম্বা লম্বা টান বসিয়ে বেরুলেন কক্ষ ছেড়ে!

চারিদিকে হুলস্থুল কান্ড! মানুষের ভীড়ের নিপীড়নে পা ফেলা দ্বায় যেন! বাতাসের তীব্রতায় ভেসে আসছে আশেপাশের মানুষজনের কানাঘুঁষার ফিসফিসানো। অদূরে ঘরের দরজার নিকট বিধ্বস্ত অবস্থায় পড়ে আছেন এক অপ্সরা! ফোলা ফোলা পেটটা তার কোনমতে ঢেকে-ঢুঁকে রাখা শাড়ির পাতলা আবরণে। অপ্সরার মাথার সন্নিকটে বসে আছেন বেশ ক’জন পৌঢ়া। হায় হায় শব্দ ধ্বনিতে মুখরিত তাদের কন্ঠস্বর! উদ্বিগ্নতায় পানি ঢালছেন অচেতন অপ্সরার মাথার তালুতে। কয়েক জোড়া ব্যস্ত কদম এহেন উৎসুক জনতার ভীড় ঠেলে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো বিশাল এক কারুকার্যে শোভিত কাঠের দরজার পানে। ঠেলেঠুলে কোনমতে কক্ষে প্রবেশ করলেন তারা। নেত্র ঠেকালেন সম্মুখে! তাদের চোখদুটোতে ঘোর আমাবস্যা! কেউ কেউ হাত থেকে অস্ত্র ফেলে দিয়ে কাঁদছে অঝোরে। কেউ কেউ হাঁটুর দূর্বলতায় মেঝেতে গড়িয়ে কাঁদছেন। কেউ কেউ দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে দাঁড়িয়ে আছেন স্তব্ধ হয়ে। এরইমধ্যে সন্দিগ্ধ অস্থিরতায় জোরপূর্বক উৎসুক জনতার ভীর ঠেলে কক্ষে ঢুকলেন এক যুবক। দূর থেকে ছুটে আসার দরুন বড্ড হাঁপাচ্ছেন তিনি। হোঁচট খেতে গিয়েও এক সুহৃদয়বান সাহায্যকারী হাতের জন্য বেঁচে গেলেন কোনমতে। যুবক বেশ অস্থির! বিচলিত কায়দায় সম্মুখে নেত্র ঠেকাতেই থমকালেন তিনি। টের পেলেন তার হৃৎস্পন্দন আঁটকে গিয়েছে মাঝপথে। নিঃশ্বাস ফেলতে কষ্ট হচ্ছে ভারী।

পরনে তার একখানা লাল রঙা ধূতি, সঙ্গে রয়েছে সফেদ রঙা বোতাম খোলা কুর্তা! মাথাভর্তি ঝাঁকড়া চুলগুলো পাখির বাসার ন্যায় এলোমেলো। শ্যামবরণ মুখখানায় মুহুর্তেই নেমে গিয়েছে এক আকাশসম ভঙ্গুর ছাপ। অদূরেই কক্ষের ঠিক মাঝ বরাবর সিলিং হতে মোটা একখানা দ ড়ি গ লা য় দি য়ে ঝুলছে ভিনদেশী বলিষ্ঠদেহী এক সুদর্শন! ফর্সা মুখশ্রীটা ফ্যাকাশে রূপ ধরেছে ইতোমধ্যে। মাথাভর্তি বাদামী চুলগুলো এলোমেলো হয়ে লেপ্টে আছে ললাটে! চোখদুটো কেমন অনড়ভাবে হা করে খুলে রাখা তার! কার্নিশে জমেছে দু-তিন ফোঁটা অশ্রু। আগত যুবক আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কেবল। সে বাকরুদ্ধ! বুকটা দুমড়েমুচড়ে ছিঁড়ে যাচ্ছে তার। তন্মধ্যে কে যেন তাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল ঘর ছেড়ে। যেতে যেতে ভঙ্গুর কন্ঠে আওড়ে গেল,

“ ভিনসেন্ট ইজ নো মোর! হি কমিটেড আ ব্লা’ডি হেল সুই সাইড! ওহ গড!”
যুবক তক্ষুনি নিজ শুকনো অধরজোড়া নাড়ালো। ঘোলাটে দৃষ্টিযুগল সম্মুখে তাক করে রেখে কাপঁতে কাঁপতে অস্ফুটে আওড়াল,
“ ভিনসেন্ট…মির্জা …. রোমেনিও। ভিনসেন্ট, ভিনসেন্ট!”
ঘামাচ্ছেন হিমাংশু রায়! কল্পনার মানসপটে ভেসে ওঠা অতীতের টুকরোগুলো আজও জ্বালাচ্ছে তাকে। অস্থিরতায় দু’হাতে খামচে ধরেছে গায়ের ব্ল্যাঙ্কেটটা। চোখদুটো বুঁজে রেখেই একনাগাড়ে আওড়ে যাচ্ছেন —
“ ভিনসেন্ট! রোমেন, রোমেন।”
এদিকে, সদ্য শোবার কক্ষে পা রাখলেন সুদীপা রায়। তিতিবিরক্ত মেজাজে বিড়বিড়িয়ে যাচ্ছেন কতকিছু। গটগট পায়ে বিছানার ধারে এগিয়ে আসতেই দৃষ্টিজোড়া হুট করে থমকালো তার। হিমাংশু রায়ের ওমন ঘুমের ঘোরে প্রলাপ দেখে তক্ষুনি বিচলিত হলেন কর্তাগিন্নি। নিজ তিতিবিরক্তিতা ভুলে গিয়ে মুহুর্তেই ছুটে এলেন স্বামীর পানে। চটজলদি দু’হাতে কর্তার গা ধাক্কা দিতে দিতে অস্থির কন্ঠে ডাকলেন,
“ নিরুর বাবা? ও নিরুর বাবা? বলি কি হলো তোমার? এমন ঘুমের ঘোরে বিড়বিড় করছো কেনো? নিরুর বাবা!”

সহসা ঘুম ভাঙল মধ্যবয়স্ক হিমাংশু রায়ের। ছলছল চোখজোড়া তার হুট করেই সরালো নিজেদের পর্দা। বুকের ওঠানামার গতি বড্ড অগোছালো তার, মুখ হা করে টানছেন নিঃশ্বাস। সম্মুখে অস্থির সুদীপা রায়! তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এসে স্বামীর বুকের ওপর হাত দিয়ে মালিশ করতে লাগলেন অনবরত। অস্থির গলায় শুধালেন,
“ কতবার করে বলেছি, রাতে শোবার আগে ঘুমের ঔষধগুলো খেয়ে তারপর ঘুমাবে। কিন্তু নাহ! আমার কথা থোড়াই শুনবে তুমি।”
অস্থিরতায় ঘেমে-নেয়ে একাকার হিমাংশু রায়। বুক করছে ধড়ফড়। ধীরলয়ে শোয়া ছেড়ে উঠলেন তিনি। শুকনো ঢোক গিলে হাতের ইশারায় স্ত্রীকে বোঝালেন পানি দিতে। যথাতথা আজ্ঞাকারী পত্নী সুদীপা রায়। তড়িঘড়ি করে বেডসাইড টেবিল হতে পানিভর্তি গ্লাসটা তুলে এনে আলগোছে বাড়িয়ে দিলেন স্বামীর পানে। কাঁপা কাঁপা হাতে গ্লাসটা কোনমতে ঠোঁটের আগায় তুললেন হিমাংশু রায়। এক ঢোকে গিলে ফেললেন প্রায় অর্ধেকটা পানি। পরক্ষণে কিছুটা শান্ত হয়ে বসে রইলেন গম্ভীর মুখে। পাশ থেকে সুদীপা রায় আলতো করে হাত রাখলেন স্বামীর কাঁধে। সন্দিহান গলায় আওড়ালেন,

“ আবারও ঐ দুঃস্বপ্ন দেখেছো?”
কপাল এখনো ঘামের আবরণ লেপ্টে আছে হিমাংশু রায়ের। কন্ঠ ভারী দূর্বল! সিক্ত অধরজোড়া কোনমতে নাড়িয়ে চাড়িয়ে আওড়ালেন তিনি।
“ বরাবরের ন্যায়!”
সহসা বুক চিঁড়ে একফালি দীর্ঘ নিশ্বাস বেরিয়ে এলো কর্তাগিন্নির। মুখে কুলুপ এঁটে বসে রইলেন চুপচাপ। হিমাংশু রায় ফের পানির গ্লাসে চুমুক বসালেন। ঠিক তখনি অন্দরমহলের প্রশস্ত অঙ্গন হতে ধেয়ে এলো কারো বিকট হুংকার!
“ কোন বাস্টা’র্ড এ বাড়িতে প্লাম্বিংয়ের কাজ করেছে? জাস্ট আন্সার মি ইউ্য ব্লা’ডি এসহোল!”
এহেন বিকট হুংকার ধ্বনি কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই নাকেমুখে উঠে যাচ্ছে তা-ই অবস্থা হিমাংশু রায়ের। কাশতে কাশতে বেচারা বুক চেপে ধরলেন তক্ষুনি। ভড়কানো কন্ঠে অবোধের ন্যায় শুধালেন,

“ কি হলো? অধীর এভাবে চেঁচাচ্ছে কেনো?”
অলক্ষ্যে শুকনো ঢোক গিললেন সুদীপা রায়। মুখটা করলেন কাচুমাচু। তা বুঝি আড়দৃষ্টে বেশ খেয়াল করলেন হিমাংশু রায়। বিচক্ষণের ন্যায় হুট করেই সন্দিহান গলায় প্রশ্ন ছুড়ঁলেন,
“ তুমি আবার কোনো অকাজ করোনি তো?”
চোর ধরা পড়ে গেলে যেমনটা মুখভঙ্গি প্রকাশ করে, ঠিক তেমন ভাবই ধরলেন সুদীপা রায়। নতমুখে চিবুক ঠেকালেন গলার কাছে। ওদিকে ক্ষুব্ধ বাঘের ন্যায় একাধারে গর্জে যাচ্ছে মুগ্ধ। সে কণ্ঠধ্বনি কানে পৌছুঁতেই উদ্বিগ্ন হলেন হিমাংশু রায়। স্ত্রীর পানে কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে দাঁত খিঁচে আওড়ালেন,
“ তোমার এসব আগাম কাজকর্মগুলো আমার কাছে একদম বিষাক্ত লাগে সুদীপা! কোনদিন যেন এসবের জন্য অধীরের হাতে অকালে প্রাণটা খোয়াও!”

পান থেকে চুন খসলেই ইদানীং রায় জমিদার বাড়িতে বেচারা কতগুলো চিকিৎসকদের ধরে বেঁধে নিয়ে আসা হয়! এ নিয়ে বিরক্তির শেষ নেই চিকিৎসকদের। তবে মুখ ফুটে বিরক্তি প্রকাশ করে থোড়াই যার যার গর্দান দিবে!
মিনিট বিশেকের জরুরী তলবে ফের এক রমণীর চিকিৎসায় ব্যস্ত হলেন কলকাতার দক্ষ চিকিৎসকেরা। সামান্য দুটো আঙুলে ফোস্কার চিকিৎসায় সে-কি ব্যস্ততা তাদের। মুখভর্তি বিরক্তির ছাপ নিয়েই করে যাচ্ছেন চুপচাপ। ভীতসন্ত্রস্ত মাহি! নতমুখে রাণীর ন্যায় বসে আছে মখমলি বিছানার একদম মাঝামাঝি। তার চারপাশে দক্ষ চিকিৎসকদের ভীর। টুকটাক সেবাশুশ্রূষায় দু-তিনজন মত্ত থাকলেও, বাকিরা কাজের অভাবে মশা তাড়াচ্ছেন দাঁড়িয়ে থেকে। জোরপূর্বক তুলে আনায় সে-কি বেহাল দশা তাদের। কক্ষের বাইরে পাহারারত সশস্ত্র গার্ডস! যাদের ভয়ে কুণ্ঠিত চিকিৎসকেরা। খোলা দুয়ার হতে ভেসে আসছে রূঢ় মানবের গর্জনধ্বনি! কি যে করছে তিনি কে জানে। মাহি বিরক্ত! লোকটার এহেন মাত্রাতিরিক্ত পাগলামিতে বিরক্ত সে। নাকমুখ কুঁচকে বসে আছে চুপচাপ।

“ আ’ম আস্কিং ইউ সামথিং বাস্টা’র্ড! বাড়িতে প্লাম্বিংয়ের কাজ কে করেছে?”
লহুতে মাখামাখি অবস্থা কানাইয়ের শ্যামলা মুখশ্রী! ললাটের উপরিভাগ ফেটে যাচ্ছে তা-ই অবস্থা হয়েছে! বেচারা কেমন নিবুনিবু চোখে পলক ফেলছে। দূর্বলতায় অসার তার দেহ! মুগ্ধ হিং স্র হয়েছে ফের। ধৈর্য্যের অভাবে আবারও নিজ শক্তপোক্ত হাতের জোরালো পাঞ্চ বসালো কানাইয়ের নাকমুখ বরাবর। ওমনি বেচারা আহতের নাক-মুখ থেঁতলে গেল বোধহয়! ছিটকে বেরুলো লহু। অন্দরমহলের প্রশস্ত করিডর থেকে তক্ষুনি ভেসে এলো কানাইয়ের স্ত্রীর আত্মচিৎকার! স্বামীর ওমন বেগতিক দশা দেখে কেঁদেকেটে একাকার অবস্থা তার। এগোতে পারছেন না সশস্ত্র গার্ডদের ভয়ে। ততক্ষণে অন্দরমহলে গটগটিয়ে পা রাখলেন হিমাংশু রায়। হতভম্ব চোখে আশেপাশে দেখলেন বারকয়েক। প্রশস্ত খোলা অঙ্গনে রীতিমতো ঝড় বয়ে গিয়েছে যেন। ক্ষুব্ধ বাঘের ন্যায় হিং স্রতায় মত্ত রূঢ় মানব। চারপাশে সাজিয়ে রাখা এন্টিক গৃহসজ্জার বস্তুগুলো ভেঙে গুড়িয়ে ছেড়েছে ইতোমধ্যে। হিমাংশু রায় তক্ষুণি ভড়কে তাকালেন মুগ্ধের পানে। দৃষ্টিজোড়া কানাইয়ের পানে নিবদ্ধ হতেই আঁতকে ওঠেন তিনি। সহসা পায়ের গতি বাড়িয়ে এগিয়ে এলেন মুগ্ধের সন্নিকটে। হতবুদ্ধির ন্যায় বলিষ্ঠের হাতটা সামান্য ধরতে গেলেই আচমকা হাত ঝাড়া দিয়ে ওঠে মুগ্ধ! সে-ই ঘটনার আকস্মিকতায় বেচারা মধ্যবয়স্ক কেমন ছিটকে সরে গেল কয়েক-কদম পেছনে। নিজেকে সামলানোর প্রয়াস চালানোর পূর্বেই কর্ণকুহরে ভেসে এলো মুগ্ধের ক্ষুব্ধ গর্জন!

“ ডোন্ট ইউ ডেয়ার টু টাচ মি বান্দীর ছেলে! দূর থেকে কথা বল!”
বাকরুদ্ধ হিমাংশু রায়। নির্বাক ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইলেন কেবল। মুগ্ধ ফের হাত উঠালো কানাইয়ের দিকে। এতক্ষণে বেচারা কানাই মুখ খুলল। কাঁপতে কাঁপতে দূর্বল কন্ঠে আওড়াল,
“ শিবু…শিবু এ বাড়ির পুরাতন প্লাম্বার।”
কথাটা জিভ খসতে না খসতেই অদূরের করিডর দিয়ে হুট করেই বাতাসের বেগে ছুট লাগালো কেউ। কে গেলো ওমন করে? মাফিয়া বিস্টের বাজপাখির ন্যায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিজোড়া মুহুর্তেই তাক হলো সেথায়। দৈবাৎ শক্তিতে ঘাড়টা সামান্য বাঁকিয়ে হুংকার ছুঁড়লেন গার্ডদের উদ্দেশ্যে,
“ ওকে নিয়ে আয়!”
যত্রতত্র ছুটলেন গার্ডেরা। দক্ষ এথলেটের ন্যায় দৌড়ে গেলেন শিবুর পেছনে। এদিকে মুগ্ধ মহাশয় খানিক স্থির হলেন। দম্ভীর ন্যায় পাহাড়সম দেহটা খানিক নাড়িয়ে চাড়িয়ে দাঁড়ালেন অঙ্গনের ঠিক মাঝামাঝিতে। পেটানো দেহখানা উম্মুক্ত তার, নাভিকমলের বড্ড নিচে ট্রাউজারের কাঁধ! বলিষ্ঠ হাতদুটো আলগোছে পকেটে গুঁজে নিয়ে গর্জন তুলে গার্ডদের উদ্দেশ্যে আওড়ালেন,

“ এই সিগার দে!”
সহসা নতমুখে এগিয়ে এলেন দু’জন। কাঁপা কাঁপা হাতে একজন সিগার তুলে দিলেন রূঢ় মানবের রুক্ষ ঠোঁটের ডগায়, আরেকজন ধরিয়ে দিলেন লাইটার! কাজ শেষ হতেই দ্রুত বেগে সরে গেলেন তারা। মুগ্ধ দাঁড়িয়ে রইলো ঠায়! ফুঁকতে লাগলো সিগার।
সময়ের কাটা গুনে গুনে মিনিট তিনেক পার হতেই আচানক সম্মুখ থেকে এক ছিমছাম গায়ের গড়নের কৃষ্ণবরণ ছেলে কেমন হুমড়ি খেয়ে পড়ল রূঢ় মানবের পায়ের কাছে। অদূরে দাঁড়িয়ে আছে বাধ্য গার্ডস। হাঁপাচ্ছে ভীষণ! মুগ্ধ তখন আলগোছে ঘাড় বাকিয়ে তাকায় পায়ের কাছে পড়ে থাকা ছেলেটার পানে। ঠোঁটের ফাঁকে সিগার চেপে রেখেই মেরুদণ্ড বাঁকান মাফিয়া বিস্ট। শক্ত হাতের রুক্ষ তালুতে আচমকা টেনে ধরে শিবুর মাথার চুলগুলো। ব্যথায় তক্ষুনি মুখ কুঁচকে নেয় শিবু। চুলে অসহ্য টান পরতেই ধীরলয়ে উঠে দাঁড়ায় সে। পাহাড়সম বলিষ্ঠের পানে তাকায় ঘাড় উঁচিয়ে। দু’হাত ত্রস্ত জোর করে অনুনয়ের সুরে বলে,

“ আমি কিছু করিনি দাদাবাবু। আমার কোনো দোষ নেই।”
সহসা বাঁকা হাসল মুগ্ধ। অন্যহাতে ঠোঁটের কোণ থেকে সিগারটা নামিয়ে এনে তা মুহুর্তেই চেপে ধরল শিবুর বুক বরাবর। এহেন হিং স্র কর্মকাণ্ডে আত্মচিৎকারে ফেটে পড়ে শিবু। অথচ রূঢ় মানব কেমন ঠান্ডা কন্ঠে শুধালো,
“ তাহলে পালালি কেনো?”
মুখে বাক নেই শিবুর! কর্তাগিন্নির বড্ড উপকার রয়েছে তার ওপর। কৃতজ্ঞতায় থোড়াই জাহির করবে তার নাম! বেচারা চুপ করে সয়ে গেলো বুকের জ্বলুনি। কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তুলছে প্রায়। মুগ্ধ তখন ফের হুংকার ছুঁড়ল!
“ সব নিয়ে আয়!”

বিচক্ষণি গার্ডস! ছুটলেন মুহুর্তব্যয়ে। ফিরে এলেন পরপরই। সঙ্গে নিয়ে এলেন বেশ বড়সড় একখানা সিলভারের পাত্র। কয়েকজনের হাতে বেশকিছু জার। পাত্রটা রাখা হলো অদূরে! তাতে রয়েসয়ে ঢালা হলো জার ভর্তি তরলগুলো। উম্মুক্ত বাতাসের সংস্পর্শে আসতেই তরল থেকে কেমন এক ধরনের উটকো গন্ধ বেরুচ্ছে! ধোঁয়াও বেরুচ্ছে বেশ। মুগ্ধ পা চালালো তক্ষুনি! শিবুর চুলগুলো হাতের মুঠোয় চেপে রেখে এগোচ্ছে সে। তরল ভর্তি সিলভারের পাতের সন্নিকটে এসে আচানক শিবুর বাহাতটা টেনে ধরে চুবিয়ে দিলো তরলে। ওমনি বেচারার আত্মচিৎকারে কম্পিত হলো রায় জমিদার বাড়ির প্রতিটি দেয়াল। উদ্বিগ্ন মাহি তৎক্ষনাৎ নিজ কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে এলো। রেলিঙের দ্বার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থেকে নিচে চোখ ফেলতেই দেখল — মাফিয়া বিস্টের হিং স্রতার নিদর্শন। সহসা কেঁপে ওঠে মাহি। ভয়ে তটস্থ হয় তার সর্বাঙ্গ। পাদু’টো অসারতায় ডুবতে চাইলেও রমণী ছুটলো ত্রস্ত কদমে।

এদিকে, মুগ্ধের হিং স্র তা চলমান! বেচারা শিবুর বাহাতটা একপ্রকার ঝলসে গিয়েছে এসিডের ঘনত্বে। ডানহাতটাও ইতোমধ্যে ডুবেছে উটকো তরলে। বেচারা গলা ফাটিয়ে চেচাচ্ছে ভীষণ। কাঁদতে কাঁদতে বেহাল দশা! অথচ তার এহেন দহনে মোটেও মায়া হলোনা নির্দয় মানবের। উল্টো শক্ত হাতে শিবুর ঘাড় চেপে ধরল কেমন! জোরালো শক্তিতে শিবুর মাথাটা তরলে ডোবাতে উদ্যোত রূঢ় মানব। ঠিক তখনি হাওয়ার বেগে ছুটে এলো দু’টো নরম তুলতুলে হাত। ঝুঁকে থাকা নির্দয় মানবের ক্লিন শেইভড রুক্ষ গালে আচমকা বসালো দু’টো শীতল হাতের পরশ। মুহুর্তেই থমকালো পরিবেশ! থমকালো মাফিয়া বিস্টের জোরালো হাতের শক্তি! অগ্নিদৃষ্টিযুগল সম্মুখে তাক হতেই দেখা গেল— সপ্তদশীর পেলব মুখখানা! কর্ণকুহরে তখন ভেসে এলো রমণীর হৃদয় নিঙড়ানো বাক্যদুটো!
“ বিস্ট! আমার বিস্ট!”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫৪ (২)

থমকায় মুগ্ধ! থমকায় তার সকল হিং স্র তা। একমুহূর্তের জন্য থেমে গেলো তার হৃৎস্পন্দন। দৃষ্টিযুগল থেকে সরে গেল অদৃশ্য অগ্নি স্পৃহা! শক্ত হাতের রুক্ষ তালু বোধহয় ঢিলে হলো তার। সুযোগটা কাজে লাগায় শিবু। ত্রস্ত সরে গেল পেছনে। এদিকে মাহি শান্ত! ধীরলয়ে রূঢ় মানবের গালে হাত বুলাতেই আবেশে চোখদুটো আপনাআপনি বুঁজে নিলো নির্দয় বিস্ট। শুকনো অধরজোড়া জিভ ঠেলে খানিক ভিজিয়ে নিয়ে ফের ঘাড় বাকিয়ে আচ্ছন্ন দৃষ্টে তাকালো মেয়েটার পানে। মাহি নাক টানলো। কেমন ভগ্ন কন্ঠে আওড়াল,
“ এতোটা হিং স্র হতে নেই বিস্ট! আপনাকে আমার ভীষণ ভয় করছে!”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫৫ (২)