Home মির্জা সায়ান মুগ্ধ মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৮

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৮

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৮
jannatul firdaus mithila

“ প্রাডার পেটে!”
আশ্চর্য মাহি! মনে জেগেছে অবাধ প্রশ্ন। ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকা মেইডেনের পানে একপলক নিস্তব্ধ দৃষ্টি ফেলে পরক্ষণেই জানতে চাইলো,
“ মানে? তাকেও কী মেরে ফেলেছে রাক্ষসটা?”
হুট করেই চেহারায় পরিবর্তন নামল মেইডেনের। তাকে অস্থির দেখাচ্ছে বেশ। এলেমেলো দৃষ্টিতে এদিক-ওদিক তাকিয়ে, নিজেকে সামলানোর ব্যাপক প্রয়াসে মত্ত মধ্যবয়সী। মাহি দেখল মধ্যবয়সীর চিকচিক করতে থাকা লুকনো চোখজোড়া, কিয়তক্ষন নিরব হয়ে বসে রইল উত্তরের অপেক্ষায়। তবে মেইডেন জবাব দেয়নি মেয়েটার উত্থাপিত কৌতূহলে। উল্টো প্রসঙ্গ এড়াতে খানিক গলা খাঁকারি দিয়ে বলে ওঠে,

“ ওসব বাদ দাও! চলো তারাতাড়ি ওঠো, তোমার এখন তৈরী হতে হবে।”
এতক্ষণের ওতো সওয়াল-জবাবে একমুহূর্তের জন্য ঘটনা প্রবাহ ভুলেই বসেছিল মাহি। তবে এরইমধ্যে মেইডেনের এহেন কথায় সম্বিৎ ফিরল তার। তক্ষুনি ভয়ার্ত ঢোক গিলে আমতা আমতা সুরে বলে ওঠে,
“ আমি… পারবোনা মেইডেন।”
মেইডেন আর শুনলোই না মেয়েটার অনুনয়! তৎক্ষনাৎ দু’হাতে চেপে ধরলেন মাহির বাহু। ধীরে ধীরে নিজের গায়ে ভর দিয়ে দাঁড় করালেন মেয়েটাকে। কপট গম্ভীর কন্ঠে বললেন,
“ চলো!”
মাহি দাঁড়িয়েছে কোনরকম। একহাতে কোমর চেপে ধরে, ব্যথায় মুখ কুঁচকে রেখেছে সপ্তদশী। মেইডেনের কথা শেষ হতে না হতেই হড়বড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ কোথায়?”

মেইডেন গাম্ভীর্যের ছাপ ফোটালেন মুখমণ্ডলে। মেয়েটাকে ধরে ধরে এগুতে লাগলেন কক্ষের বাইরে। মাহি হতবাক! চাপা স্বরে একের পর এক প্রশ্ন করেই যাচ্ছে মেইডেনকে অথচ মেইডেনকে দেখো! মুখে বুঝি কুলুপ এঁটেছে হঠাৎ! কিয়তক্ষন বাদেই মেইডেন মাহিকে ধরে ধরে নিয়ে এলো অন্য একটি কামরার সম্মুখে। মাহি হা করে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ! একি! আগের কক্ষের মতো হুবহু একইরকম দেখতে দরজাটা, এখানেও দু’জন গার্ড মাথানত করে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের হাতে থাকা রাইফেলগুলো অন্যদিকে মুখ করে রাখা। মাহি হতবিহ্বলের ন্যায় তক্ষুনি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় মেইডেনের পানে। মেইডেন বুঝি মেয়েটার এহেন চাহনির কারণটা বুঝে গেলেন। তিনি কেমন স্মিত হেসে আলতো করে বললেন,

“ ভেতরে চলো। আজকে থেকে এটা তোমার নতুন কক্ষ! আগেরটা তো পুড়িয়ে ফেলেছে মনস্টার।”
শেষ কথাটুকু বড্ড হতাশ কন্ঠে বললেন মেইডেন। এদিকে তার এহেন কথায় বাকহারা মাহি। ক্ষনে ক্ষনে ঢোক গিললো সামান্য। মেইডেন আর কথা না বাড়িয়ে পা বাড়ালেন ঘরের ভেতর। মাহিও ঢুকলো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। এরইমধ্যে মেইডেন হঠাৎ গম্ভীর মুখে বলে ওঠেন,
“ যাও, ড্রেস চেঞ্জ করে ফেলো।”
মাহি মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে রইল একমুহূর্ত। একহাতে কোমর চেপে রেখেই উদাস কন্ঠে বলল,
“ কিভাবে ড্রেস চেঞ্জ করব? আমার কাছে কি আর কাপড় আছে? তাও যা এনেছিল রাক্ষসটা, সবতো রাগের বশে পুড়িয়ে ছারখার করে ফেললো।”
এরূপ কথায় মেইডেন আচমকা ফিক করে হেসে দিলেন মনে হচ্ছে! মাহি আলগোছে ঘাড় বাকিয়ে দেখল তা। ভ্রু-দ্বয়ের মাঝে গোটাকতক ভাঁজ ফেলে আওড়াল,
“ হাসছেন কেনো?”

মেইডেন এখনো নিঃশব্দে হাসছেন। তার ওমন নিরব হাসির কারণ জানা নেই মাহির। মাহি কেবল গাল ফুলালো। কোমরটা একহাতে চেপে রেখে একটু একটু করে পা বাড়ালো সম্মুখে। পেছন থেকে মেইডেন তখন খপ করে চেপে ধরে মাহির ডানহাতের কব্জি। মাহির পা জোড়া থামল, তবে সে তাকালো না পেছনে। একপ্রকার মিছে অভিমান নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল ঠায়। মেইডেন ইরা এক-কদম এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন মাহির একদম নিকটে। একহাতে আলতো করে মাহির কাঁধ জড়িয়ে, তাকে নিয়ে এগোলেন কক্ষের ডানপাশে। মাহি এপর্যায়ে নিরব! মেইডেনের সাথে তাল মিলিয়েছে পায়ের। বিশালাকার কক্ষের ডানপাশে মোটা একখানা আয়না। আয়নার একপাশে গোলাকার ভারী কারুকার্যে শোভিত হেন্ডেল জাতীয় কিছু। মেইডেন এগিয়ে এসে চুপচাপ হেন্ডেলের ওপর হাত রেখে একটুখানি ধাক্কা দিলেন ভেতরের দিকে। মুহুর্তেই উম্মুক্ত হলো অন্ধকারে নিমজ্জিত একখানা গোপন কামরা! মাহি হা হয়ে গেল যেন। মেইডেন তার হাত ধরে ভেতরে ঢুকতে চাইলেই তক্ষুনি হাত ছাড়িয়ে নেয় মাহি। ভয়ার্ত ঢোক গিলে বলে,
“ আমি যাব না ভেতরে। কি আছে এখানে?”

মেইডেন স্মিত হাসলেন এপর্যায়ে। মাহিকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে নিজে ঢুকলেন ভেতরে। কিছুটা এগিয়ে গিয়ে বোর্ডে সুইচ টিপতেই আলোকিত হলো চারপাশ! উন্মোচিত হলো সাদা এবং সোনালী আলোয় চিকচিক করতে থাকা সম্পূর্ণ কাঁচের তৈরী ক্লজেট রুমটা। মাহি বুঝি এবার জ্ঞান হারাবে এরূপ সৌন্দর্যে। সম্পূর্ণ ভয়ডর ভুলে মেয়েটা নিজে থেকেই দেয়াল ধরে ধরে এগুতে লাগলো ক্লজেট রুমে। চারপাশে কাঁচের তৈরী দেয়াল! প্রতিটি দেয়ালের ওপাশে নানারকম কালেকশনের মেয়েলী ড্রেস। বাইরে থেকে স্পষ্ট চক্ষুগোচর সব! মাহি হতবাক চোখে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। ইচ্ছে করছে আরেকটু এগিয়ে গিয়ে দেখতে পুরো রুমটা। তবে কোমর আজ সায় দিচ্ছে না তার সঙ্গে! দেখতে দিচ্ছেনা সম্পূর্ণ কাঁচের তৈরী এহেন সৌন্দর্যমন্ডিত ক্লজেটের বাদবাকি রুপ। মাহি যখন হতবাক হয়ে এদিক-ওদিক দেখতে ব্যস্ত ঠিক তখনি মেইডেন কেমন ঠান্ডা স্বরে বলে ওঠেন,
“ এখানে যা যা দেখছো, সব তোমার! ভেতরে আরও আছে। পায়ের জুতো হতে শুরু করে চুলের সামান্য ক্ল-ক্লিপ অব্ধি, সব আছে। বলতে পারো — গোটা শপিংমলটাই তুলে আনা হয়েছে তোমার জন্য। আর তুমি কি-না ঐ অল্প কিছু কাপড় পোড়াতে দেখে ধরে নিলে ওটুকুই শেষ? ”
হতবাক মাহি মুখ নাড়িয়ে কথা বলতে পারলোনা আর। শুধু চেয়ে রইল হতভম্বের ন্যায়। এদিকে মেইডেন তখন ক্ষুদ্র নিশ্বাস ফেলে ফের বললেন,

“ যাও! এবার পছন্দসই কাপড় পরে তৈরী হয়ে নাও রাতের জন্য। মনস্টার আজ খুব ক্ষুধার্থ, সঙ্গে তার প্রাডাও। যথাসম্ভব নিজেকে প্রস্তুত করো ডিয়ার।”
তক্ষুনি আতঙ্কে হড়বড়িয়ে ওঠে মাহি। মেইডেন তাকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলেই ভয়ার্ত মাহি তৎক্ষনাৎ পেছন থেকে কব্জি টেনে ধরে মেইডেনের। মেইডেন থমকালেন। ঘাড় বাকিয়ে পেছনে তাকাতেই খেয়াল করলেন — মাহির কাঁদো কাঁদো অসহায় মুখখানা। মেইডেনের বড্ড মায়া হলো এপর্যায়ে। তিনি আলগোছে নিজের হাত থেকে মাহির হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলতে লাগলেন,
“ এতো মায়া বাড়াবে না মেয়ে! তা নাহলে তোমার অনুপস্থিতিতে আজ ভেঙে পড়তে হবে আমায়।”
মাহি অসহায়! ফুপিয়ে ফুপিয়ে বড্ড অসহায় কন্ঠে বলতে লাগলো,

“ দয়া করে উনাকে আজ আটঁকান। আমার কোমরটা ব্যাথায় ছিঁড়ে যাচ্ছে! এই দেখুন, আপনার গায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াতে হচ্ছে আমার। আপনি প্লিজ উনাকে বলুন, আজ যেন সে অন্য কারো কাছে যায়। আপনি তো বললেন, তারজন্য না-কি রোজ কাউকে না কাউকে আনা হয়। সে নাহয় আজ রাতটা তাদের সঙ্গে কাটাঁক। বিশ্বাস করুন, সারারাত ভর উনার পশুত্বের সামনে চিৎকার করার মত এক চিলতে শক্তিও অবশিষ্ট নেই আমার গায়ে!”
মেইডেন দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললেন বোধহয়। মাহির কাঁধে আলতো করে হাত রেখে নিচু স্বরে বললেন,
“ কোন রাতে কার কাছে যাবে সেটা তো মনস্টারের ইচ্ছে মেয়ে! সেখানে আমি তাকে আটকানোর কে? সামান্য একটা মেইডেন হয়ে তার সামনে মুখ খুলে থোড়াই জ*বাই হবো আমি?”
কন্ঠরোধ হলো মাহির। বুকটা ভরে গেল ব্যাথায়। চোখদুটো ছলছল করে তাকিয়ে রইল একপলক। এরইমধ্যে ক্লজেটের দরজার কাছে হন্তদন্ত পায়ে ছুটে আসে মিলা। মেয়েটা কেমন হাঁপাতে হাঁপাতে জানায়,

“ মেইডেন! অতিদ্রুত মেয়েটাকে নিয়ে নিচে নামুন।”
হতভম্ব মেইডেন! তক্ষুনি ঘাড় ঘোরালেন পেছনে। অবাক কন্ঠে আওড়ালেন,
“ নিচে কোথায়?”
“ ডাইনিং রুমে।”
এরূপ উত্তরে ভ্রু গোটালেন মেইডেন। হুটহাট মেয়েটাকে নিয়ে ডাইনিং রুমে কেনো যাবেন তিনি? যেখানে মনস্টার আজ নিজে আসবে তার কাছে। মেইডেন ইরা তৎক্ষনাৎ দু-কদম এগিয়ে এসে সন্দিহান গলায় প্রশ্ন ছুঁড়লেন,
“ কে বলেছে ওকে নিয়ে নামতে?”
মিলা ঢোক গিললো সামান্য। লম্বা লম্বা নিশ্বাস ফেলে জবাবে বলল,
“ মনস্টারের আদেশ!”
কথাটা ব’লেই থামল মিলা। একপলক জড়সড় মাহির দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে পরক্ষণেই সে দৃষ্টি সরিয়ে আনল মেইডেনের ওপর। আরেকদফা ভয়ে ভয়ে জানাল,

“ লিভিং রুমের বেসমেন্টের মূল দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে মেইডেন। মাংসাশী হাঙ্গর গুলো মানুষের গন্ধ পেয়ে রীতিমতো লাফাচ্ছে! জানি না আজ আবার কাকে ওদের খাবার বানানো হবে!”
কথাটা কর্ণকুহরে পৌঁছান মাত্রই ভয়ে আত্মা উড়ে যাবার যোগাড় মেইডেনের। তিনি সঙ্গে সঙ্গে ভয়ার্ত চাহনিতে পেছনে ঘুরলেন। তার ওমন চাহনিতে ভড়কায় মাহি। ভড়কে যাওয়া কন্ঠে রয়েসয়ে জিজ্ঞেস করে,
“ এরমানে কি আজ আমি……?”
বাকিটা বলতে সাহসে কুলচ্ছে না মেয়েটার। নিশ্বাস হচ্ছে ক্রমাগত ভারী। ক্ষুদ্র বদনখানি কাঁপছে তার। পাদু’টো টলমল! বেশিক্ষণ নিজ পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনি সপ্তদশী, টলতে টলতে মেঝেতে পড়ে যেতে লাগলেই মেইডেন ছুটে এসে ঝাপটে ধরল তাকে। মাহিও নিজেকে তার বুকের মাঝে একটুকরো শিমুল তুলোর ন্যায় গুটিয়ে নেয়। জুড়িয়ে আসা কন্ঠে বলে,
“ আমিও তবে আজ মরতে যাচ্ছি!”

গায়ে জড়ানো সাদা একখানা সিল্কের লং গাউন, মাথার চুলগুলো উষ্কখুষ্ক হয়ে এদিক ওদিক উড়ছে। মুখমণ্ডলে নেই কোনো প্রসাধনীর ছাপ! আছে কেবল একরাশ ভয়, আতঙ্ক। কাপড় পাল্টানোর ফর্মালিটি মেনে কোনরকম নতুন কাপড় গায়ে জড়িয়েছে মাহি। একহাতে কোমর চেপে, আরেকহাতে মেইডেনের গায়ে ভর দিয়ে বেরুচ্ছে এলিভেটর থেকে। ওতোবড় পাচঁ তলা প্যালেস! তিন তলা থেকে নিচে নামতেও বাড়িতে রয়েছে ব্যাক্তিগত এলিভেটর। কোমরে ভীষণ চোট থাকায় এলিভেটর দিয়ে নেমেছে মাহি। পা গুনে গুনে কোনমতে হাঁটছে মেইডেনের সাথে। গোলাকার লিভিং রুম পেরিয়ে ডাইনিং জোনে যেতে হয় বৈকি! মাহি থরথর করে কাঁপছে আর হাঁটছে। ভুলেও চোখ তুলে নিচতলার লিভিং রুমে তাকাচ্ছে না মেয়েটা! ওসব ভয়ানক দৃশ্য কি আর চোখে দেখা যায়? মেইডেন হাঁটার মাঝেই একপলক ঘাড় বাকিয়ে তাকান নিচে। কয়েকটা সিঁড়ি নামলে লিভিং রুমের গ্রাউন্ড ফ্লোর। সুইমিংপুলের একাংশ আজ খুলে রাখা! হিংস্র মাছগুলো লাফাচ্ছে বেশ, বেরুতে চাচ্ছে বারংবার। তবে পারছেনা সুইমিংপুলের ওপরে থাকা এসএসের ঝালরযুক্ত দেয়ালের জন্য। মাছগুলোর অতিরিক্ত লাফানোতে পানি ভেসে যাচ্ছে পুরো লিভিং গ্রাউন্ড জুড়ে। মেইডেন তৎক্ষনাৎ নজর সরালেন অন্যত্র। মাহিকে নিয়ে অবশেষে চলে গেলেন ডাইনিং স্পেসের দিকে।

৪০টি আসনের রাজকীয় ডাইনিং টেবিল! ভারী কারুকার্যে শোভিত প্রতিটি চেয়ার। পুরো টেবিল জুড়ে দামী দামী ক্রোকারিজ! সিলিংয়ে ঝুলছে বিশাল একখানা ক্রিস্টালের ঝাড়বাতি। হলদেটে আলোয় চারপাশ সেজেছে এক নৈসর্গিক সৌন্দর্যে। মাহি এবার আর অবাক হয়নি। ক্লজেটের একটুখানি ঝলক পেয়েই মেয়েটা বুঝে গিয়েছে — রাক্ষসের টেস্ট কেমন হতে পারে। মেইডেন মাহিকে ধরে ধরে বসাতে চাইলেন হেড অফ দা টেবিলের একদম পাশের চেয়ারটায় কিন্তু মাহি বাঁধ সাধলো তাতে। চোখমুখ কুঁচকে শক্ত গলায় বলল,
“ আমি উনার পাশে বসব না।”
মেইডেন ফোঁস করে নিশ্বাস ফেললেন আলগোছে। মেয়েটার কথার দাম দিয়ে তাকে নিয়ে বসালো দুটো চেয়ারের পরের আসনে। মাহিও চুপচাপ মাথা ঝুঁকিয়ে বসল, ডাইনিং এর চারদিকটা কেমন মো মো করছে খাবারের সুঘ্রাণে! এতে বুঝি পেট মুচড়ে উঠল মাহির। খাবারের সুঘ্রাণে খিদে বেড়ে গেল তার। তবু্ও নিজের এহেন উপচে পড়া ক্ষুধাকে কোনরকমে দমিয়ে রাখল মেয়েটা। বসে রইল নিজের সর্বনাশের অপেক্ষায়!

গা উদোম, কোমরের বেশ নিচে ঝুলছে ঢিলেঢালা ট্রাউজারের রাবার। ফর্সা লোমহীন বুকখানা কেমন হা করে উম্মুক্ত হয়ে আছে! ফুলেফেঁপে থাকা দু’হাতের মাসেলস হালকা নড়াতেই কেমন টানটান হয়ে যাচ্ছে! ঘাড় সমান উল্ফ কাট দেয়া বাদামী চুলগুলো ভিজে চুপেচুপে হয়ে আছে। কপাল অব্ধি ছেয়ে আছে ভেজা চুলে। ঘাড় থেকে চুলের পানি চুইয়ে পড়ছে বদনে। সেদিকে বিন্দুমাত্র উদ্বেগ নেই যুবকের। সে দাম্ভিক কদমে এগিয়ে আসছে ডাইনিং স্পেসে। তার কদমের প্রতিটি শব্দ কানে পৌঁছাতেই মাথা নুইয়ে ফেলল কর্মরত সবাই। মেইডেন তক্ষুনি চলে গেলেন ডাইনিং ছেড়ে। মাহি মুখ কুঁচকে তাকিয়ে আছে অন্যত্র। মেয়েটার তেমন হেলদোল নেই! ওমন চরিত্রহীন, লম্পটকে দেখতে বিন্দুমাত্র উদ্বেগ নেই তার মধ্যে। কিয়তক্ষন বাদেই সে টের পেল চেয়ার টানার কর্কশ শব্দ। বুঝল, লোকটা এসে বসেছে হেড অফ দা ওনার চেয়ারে। মাহি তখনো ঘাড় বাকিয়ে রইল অন্যত্র।

এদিকে নিজ আসনে বেশ দাম্ভিকতার সাথে বসেছে মুগ্ধ। গম্ভীর মুখাবয়ব, দৃঢ় চোয়াল! লিপ এবং আইভ্রোতে এখনো ঝুলছে প্লাটিনাম রিং। মুগ্ধ হাত বাড়িয়ে টেবিলের ওপর পড়ে থাকা ঘন্টিটায় মৃদুভাবে হাত রাখতেই ঢংঢং শব্দ বাজল কোথাও। তক্ষুনি সে শব্দ শুনে একে একে ছুটে এলো বারোজন সার্ভেন্ট। একজন মুগ্ধের সামনে উপুড় হয়ে থাকা প্লেটটা তুলে দিলো, তো আরেকজন ন্যাপকিন খুলে দিলো! কেউ বেড়ে দিল খাবার, কেউ এগিয়ে দিলো তা। ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে গম্ভীর পুরুষ এখানকার রাজা, আর বাদবাকি তারা রাজার সেবায় নিয়োজিত রাজকর্মচারী। এদের মধ্যে ইলিয়াডও রয়েছে। বেচারা আজ অন্যমনস্ক! পানির গ্লাসে পানি ঢালতে গেলেই হাত কাঁপছে তার। ফলাফল স্বরুপ, পানি গ্লাসে না পড়ে পড়ছে অন্যত্র। আর কেউ এহেন ঘটনা পরোখ করুক কিংবা না করুক — একজোড়া বাদামী চোখের বাজপাখির ন্যায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ঠিকই দেখল তাকে। ইলিয়াড প্রায় কিছুক্ষণ ধরে পানি ঢাললো গ্লাসে। হাতের কাজ শেষ হতেই গ্লাসটা তুলে মনস্টারের দিকে এগিয়ে দিতে উদ্যত হতেই ইলিয়াডের কানে ভেসে এলো মনস্টারের গম্ভীর অথচ কঠিন কন্ঠ!
“ হেভ ইট!”
থমকায় ইলিয়াডসহ আশেপাশের সকলে। অথচ মুগ্ধ এখনো ফর্কের আগায় খাবার তুলে খেয়ে যাচ্ছে একে একে। ইলিয়াড অবোধের সুরে মাথা নুইয়ে রেখে জিজ্ঞেস করল,
“ বুঝিনি মনস্টার!”

গালের পাশে একটুকরো ভেজিস ঢুকিয়েছে মুগ্ধ। একহাতে ছোট্ট চাকু, আরেকহাত বড়সড় কাটাঁ চামচ যেটাকে ইংরেজিতে ফর্ক বলে। মুগ্ধের দৃষ্টি ঠায় নিজের প্লেটের পানে। ভীষণ পটুত্বে খাবার চিবুতে ব্যস্ত যুবক। এরই ফাঁকে হালকা নুইয়ে থাকা ইলিয়াড ধীরে ধীরে নিজের এপ্রনের পকেটে হাত ঢোকায়। ধারালো কিছু একটা হাতড়ে বের করে আনতেই যাবে ওমনি তার কণ্ঠনালী বরাবর সপাটে ফর্কের আগা দিয়ে আঘাত করে বসে মুগ্ধ। প্রথম আঘাতেই থামেনি সে, একইভাবে দু’বার, তিনবার, পরপর বেশ কয়েকবার আঘাত করতে থাকে শক্তিশালী পুরুষ। অথচ তার দৃষ্টি এখনো নিজের খাবার পানে নিবদ্ধ, তবে হাত চলছে দৃঢ়তায়। এদিকে খেতে বসে এহেন নৃশংসতা দেখে গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিয়ে ওঠে মাহি। তৎক্ষনাৎ নিজের দু’হাতে মাথার দু’পাশ চেপে ধরে মেয়েটা। মুগ্ধের হাত তখনো চলছে ইলিয়াডের কণ্ঠনালী বরাবর। একের পর এক হিংস্র আঘাতে বিধ্বস্ত ইলিয়াডের কন্ঠা! বিধ্বস্ত গলদেশ থেকে চারপাশে ছিটকে যাচ্ছে লহু। মুগ্ধের মুখমণ্ডল, খাবার প্লেটও রঞ্জিত হয়েছে লাল তরলে। অথচ তার হাতের গতি থামছেনা এখনো। প্রায় বেশ কিছুক্ষণ পর, বিধ্বস্ত ইলিয়াডের নি*থ*র দেহ মেঝেতে লুটিয়ে পড়তেই থামল মুগ্ধ। হাতের ফর্কটা এগিয়ে এনে নিজের র*ক্তাক্ত প্লেটের একপাশে রেখে কঠিন গলায় হুংকার ছুঁড়ে বলল,

“ ওকে ফেলে দিয়ে আয় বেসমেন্টে!”
আঁতকে উঠে মাহি। তৎক্ষনাৎ ভয়ার্ত ঢোক গিলে তাকায় সম্মুখে। র*ক্তে মাখামাখি মুগ্ধের ফর্সা মুখ, উদোম গা। অথচ যুবক কেমন নির্বিকার ভঙ্গিতে বসে আছে দেখো! পাশ থেকে দু-তিনজন এগিয়ে এসে ইলিয়াডের দেহটা তুলে নিয়েছে। দুলতে দুলতে তারা এগিয়ে যাচ্ছে বেসমেন্টের দিকে। মাহি তক্ষুনি চেঁচিয়ে ওঠে, বারবার মুগ্ধের উদ্দেশ্যে বলে ওঠে,
“ ওদের থামান। প্লিজ ওদের থামান। মানুষটার মৃ*তদেহটা অন্তত অক্ষত থাকতে দিন। ওরা….”
বাকিটা বলার আগেই তার পানে ক্রুর দৃষ্টিতে তাকায় মুগ্ধ। মাহি থমকায়! এতক্ষণের নৃ*শং*সতার চাইতেও মুগ্ধের ঐ আগুন চোখদুটো যেন বড্ড ঘায়েল করল তাকে। মনে জাগালো অসম্ভব ভয়! মাহি ভয়াতুর ঢোক গিলতেই মুগ্ধ সময় নিয়ে বা-হাতের ছুরিটা উঠিয়ে নিজ ঠোঁটের ওপর চেপে ধরে বোঝালো,

“ হুঁশশশ!”
মাহি নিশ্চুপ হলো এপর্যায়ে! বুকের ওঠা-নামার গতি বাড়ল তীব্রভাবে। ভয়ে নিশ্বাস জুড়িয়ে আসছে তার। চোখের সামনে সবটা হয়ে যাচ্ছে ঘোলাটে। এরইমধ্যে মেয়েটার কানে ভেসে আসে তীব্র দাবড়ানোর শব্দ! হিং*স্র ক্ষুধার্ত মাছগুলো বুঝি বহুদিন পর পছন্দের খাবার পেয়ে উল্লাসে আটখানা! মাহি আর সইতে পারলোনা এহেন হি*স্র*তা। তক্ষুনি মেয়েটা জ্ঞান হারিয়ে মাথা লুটালো টেবিলের ওপর। এহেন কান্ডে নির্বিকার মুগ্ধ। আলতো করে সম্মুখের র*ক্তা*ক্ত প্লেটটা ঠেলে দিয়ে দূরে সরিয়ে রাখল। পরক্ষণে আরেকটা প্লেট তুলে নিজ হাতে সেথায় আরও কিছু ভেজিস নিয়ে, একটা একটা করে মুখে পুরতে লাগল। এ যেন সাক্ষাৎ কোনো ভয়ানক দৃশ্য! সারা গা, মুখ লেপ্টে আছে লহুতে, অথচ মানুষটা কি-না নির্বিকার ভঙ্গিতে আয়েশ করে খাবার চিবুচ্ছে! যদিওবা মনস্টারের জন্য এমনটা মোটেও ইম্পসিবল নয়। বিকজ দিস ম্যান হিমসেল্ফ ইজ আ বিস্ট!

অজ্ঞান মাহি! মাথাটা লুটিয়ে আছে টেবিলের ওপর। তার ঠিক পাশে বিরক্ত মুখে দাঁড়িয়ে আছে মুগ্ধ! কপালে গোটাকতক ভাঁজ পড়েছে বিরক্তির! একটা মেয়ে মানুষ এতোবার জ্ঞান হারায় কিভাবে? বারবার জ্ঞান না হারিয়ে, একেবারে মরে যেতে পারেনা মেয়েটা? ম*রলেও তো সে কিছুটা শান্তি পেতো! ইদানীং যা জ্বালাচ্ছে না পুঁচকে মেয়েটা! মুগ্ধ দাঁত কিড়মিড় করতে করতে ভাবছে কতকিছু! গায়েতে তার শুকনো লহুর দাগ। সে তক্ষুনি কঠিন গলায় ডাকল,
“ মেইডেন!”
মাত্র একখানা ডাক! এতেই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন মেইডেন। মাথাটা নুইয়ে রেখে ভয়ার্ত কন্ঠে আওড়ালেন,
“ জ্বি মনস্টার?”
মুগ্ধ দাঁতে দাঁত চেপে মুখ ঘুরিয়েছে অন্যত্র। আদেশ ছুড়েঁ জানায়,
“ ওকে ঘরে নিয়ে যান। আমি আসছি!”
মেইডেন আলতো করে ঘাড় কাত করলেন। জ্ঞানহারা মেয়েটার দিকে একটুখানি এগিয়ে এসে পরক্ষণেই জানালেন,

“ ওর তো জ্ঞান নেই মনস্টার। আমি একা একা কিভাবে… ”
“ যেভাবে ইচ্ছে নিয়ে যান। জাস্ট নিয়ে যান আমার আসার আগে।”
মেইডেন তক্ষুনি মাথা নুইয়ে দু-কদম পিছিয়ে এলেন। কন্ঠ উঁচিয়ে ডাকলেন আরেক মেইডকে। কিয়তক্ষনের মধ্যেই অপর মেইড চলে আসায় দু’জন এবার ধরাধরি করে অচেতন মাহিকে কোনমতে তুলে দাঁড় করালেন। তবে এতেই ঘটল আরেক অঘটন! অচেতন মাহির ছেড়ে দেওয়া শরীরটা খুব বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারলোনা নিজ পায়ে। টলমল পায়ে সে তৎক্ষনাৎ গড়িয়ে পড়ল মুগ্ধের গায়ের ওপর। ঘটনার আকস্মিকতায় হতবাক মুগ্ধ সাথে সাথে একহাতে আগলে ধরে মাহিকে। ক্ষুদ্র বদনের মেয়েটা তার উম্মুক্ত বক্ষে লেপ্টে আছে পেজাঁতুলোর ন্যায়। তার শীতল হাতের স্পর্শ গুলো মুগ্ধের গায়ে কাটাঁ ধরিয়ে দিচ্ছে যেন। একমুহূর্তের জন্য ছেলেটা বেশ টের পেল — তার বুক কাঁপছে! হ্যাঁ হ্যাঁ তার হৃদয় স্পন্দিত হচ্ছে জোরালো গতিতে। হৃদয়টা এক অদ্ভুত শীতলতায় ছেয়ে যাচ্ছে ক্রমশঃ। এহেন অনুভূতি প্রথম টের পাচ্ছে মুগ্ধ! এসব তার অজানা, সে জানেনা হুটহাট এমন কেন হচ্ছে তার সাথে। সে শুধু জানে — তার হৃদয় থমকেছে। নিজ হতভম্বতায় মুগ্ধের একহাত মেয়েটার পিঠে উঠে আসতে চাইলেই মস্তিষ্ক আবারও ধিক্কার জানায় তার এহেন কান্ডে! চিৎকার দিয়ে জানায় — শত্রুর মেয়েকে বুকে নিয়ে রেখেছিস? এতো তারাতাড়ি ভুলে গেলি মায়ের কথা? মায়ের প্রতিশোধের কথা? নিজের সাথে হওয়া অন্যায় গুলোর কথা? কথাগুলো হঠাৎ মনে পরতেই ত্বরিত সম্বিত ফিরে মুগ্ধের। রাগী মানব ফের চলে এলো নিজের হিংস্র অবয়বে। সে তৎক্ষনাৎ দু’হাতে মাহিকে বুক থেকে ছুঁড়ে ফেলল অদূরে। ভাগ্যিস, দুপাশে মেইডরা ছিল! নাহলে মেয়েটা আজ অচেতন অবস্থাতেই পটল তুলত নিশ্চিত। মুগ্ধ কেমন দাঁত চিড়বিড়িয়ে কঠিন হুংকারে বলে ওঠে,

“ এই জানোয়ারের বাচ্চাটাকে এক্ষুণি সরা আমার দুচোখের সামনে থেকে!”
এহেন গর্জনে কেঁপে ওঠে সবাই। তক্ষুনি মাহিকে ধরে-টরে হাঁটা ধরলো উল্টো পথে। এদিকে মুগ্ধ এবার ভীষণ অস্থির! সারা শরীর রাগে থরথর করে কাঁপছে তার। কেন বারবার মেয়েটার কাছে গেলে এমন লাগে তার? কেন একমুহূর্তের জন্য দিনদুনিয়া ভুলে বেভুলা হয়ে যায় সে? কেন? কেন? কেন? মন-মস্তিষ্কের হুটহাট দোলাচালে জর্জরিত নির্দয় মানব। এবারেও মস্তিষ্ক জিতল সকল তর্কে। সে গটগটিয়ে ফের হাঁটা ধরল এলিভেটরের দিকে। এলিভেটরে ঢুকেই বোতাম চাপল টপ ফ্লোরের। অতঃপর ধীরে ধীরে বন্ধ হলো কাঁচের দরজাটা। টান উঠল এলিভেটরের চেইনে!

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৭

❝ মনস্টার প্যারাডাইস ❞ এর টপ ফ্লোরে রয়েছে ছাঁদ। তবে এ ছাঁদের সৌন্দর্য একটু ভিন্ন! বিশাল ছাঁদ জুড়ে তৈরী হয়েছে সুইমিংপুল। চারপাশে স্রেফ কাঁচের তৈরী দেয়াল, তাও আবার অর্ধেক! এলিভেটর থেকে বেরিয়ে এসেই নীল নদের ন্যায় স্বচ্ছ পানিতে একলাফে ঝাপিয়ে পড়ে মুগ্ধ। মথাসহ পুরো শরীর পানিতে ডুবিয়ে সাতাঁর কাটতে কাটতে চলে যায় ছাঁদের একদম কর্নারে। প্রায় সেকেন্ড চল্লিশেক সময় লাগল তার ওপারে পৌঁছাতে। এর পরপরই সে কেমন মাথা উঠিয়ে আনলো পানি হতে। শক্ত চোয়ালে তীব্র ক্ষেপে গিয়ে নিজের সর্বাঙ্গ দু’হাতে ঘষতে ঘষতে বিড়বিড়িয়ে আওড়ায়,
“ ব্লাডি বি*চ! আমি ঘৃণা করি ওকে! ঘৃণা করি ঐ জানোয়ারের বাচ্চাকে!”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৯

1 COMMENT

Comments are closed.