মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬২
Tahmina Akhter
— মাথা ফুলে টমেটোর মত হয়ে আছে! ওতবড় ছেলে তুমি! সাবধানে চলাচল করলে কি হয় মেঘালয়?
তৌহিদ সাহেবের আফসোস এর সুরে বলা কথাগুলো শুনে মাথা নীচু করে ফেলল মেঘালয়। লজ্জায় তার মাথা কাটা যাচ্ছে। এদিকে আলো মেঘালয়ের এবং তার মাঝের অদৃশ্য দেয়াল পেরিয়ে মেঘালয়ের ফোলা কপালটাকে ছুঁয়ে দিতে পারছে না।
রিনি আপাতত দুজনের কান্ডকারখানা দেখছে। প্রচন্ড হাসি পাচ্ছে তার অথচ হাসতে পারছে না। জীবনে প্রথমবার এমন অভিজ্ঞতা হলো। হাসির দমকে শ্বাস আঁটকে আসছে বারবার অথচ হাসতে পারছে না।
— বউমা?
— জি, চাচা?
আলো হকচকিয়ে তৌহিদ সাহেব এর ডাকে সাড়া দেয়।
— ফ্রিজ থেকে কয়েক টুকরো বরফ এনে একটা ছোট কাপড়ের মাঝে পেঁচিয়ে মেঘালয়ের কপালে চেপে ধরো।
তৌহিদ সাহেব এর কথাগুলো যেন পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো আদিম ভাষায় বলা। আলো বোঝার চেষ্টা করছিল কথাগুলো আদৌও সত্য কিনা? এদিকে মেঘালয় আড়চোখে বারবার আলোর দিকে তাকাচ্ছে। আলো রিনির দিকে ফিরতেই রিনি আলোর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। বেচারি আলো চাচা শ্বশুরের আদেশ রক্ষার্থে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। এদিকে রিনি ঠাট্টার সুরে মেঘালয়কে উদ্দেশ্য করে বলল,
— বিষে বিষক্ষয়।
মেঘালয় চোখ পাকিয়ে তাকায় কিন্তু রিনির তাতে কি! সে তো মোবাইল ফোন করে ভিডিও অন করে বসে আছে। দুটো পাগলের এমন একটা মূহুর্তকে হাতছাড়া করা সম্ভব? আলো সত্যি কয়েক টুকরো বরফ আর ছোট কাপড় নিয়ে এল। তৌহিদ সাহেব এবার নিজের মুখের নিউজপেপার ধরলেন৷ আলো আমতাআমতা করে মেঘালয়ের চেয়ারটার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। আলোর গায়ের গন্ধ মেঘালয়ের নাসরন্ধ্রে প্রবেশ করা মাত্রই চোখ বন্ধ করে ফেলল। বুকের ভেতরে কালবৈশাখের তান্ডব শুরু হয়ে গেছে। মেঘালয়ের নির্লিপ্ততা নিয়ে আলোর মাথাব্যাথা নেই৷ সে অস্বস্তি নিয়ে বাম হাতে মেঘালয়ের থুতনি ধরে ডানহাত দিয়ে বরফ পেঁচানো টুকরো কাপড় চেপে ধরল মেঘালয়ের কপালের ফোলা অংশে। আচমকা শিরশিরে অনুভূত হবার কারণে মেঘালয় কপাল কুঁচকে ফেলল। আলো সেই দৃশ্য দেখার পর বরফ পেচানো কামড়টা আলগা করে ধরল। মেঘালয় চোখ খুলতেই আলোর শুকনো মুখটা দেখতে পায়। মেরুন রঙা কামিজ, কালো রঙের সাদা ওড়না আর পায়জামা পরনে আলোকে এতকাছ থেকে দেখার পরও চিনতে বড্ড অসুবিধা হচ্ছে। এ কোন আলো? মেঘালয়ের অস্থির চোখজোড়া কি যেন খুঁজে বেড়ায়!
আলো এসবের কিছুটি টের পেলো কি? হয়তো না। যদি টের পেত তবে কি এত সহজ ভাবে মেঘালয়ের যত্নআত্তি করতে পারত!!
— আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।
কথাটি বলে আর দেরি করল না মেঘালয়৷ আলোর হাতটি সরিয়ে দিয়ে উঠে চলে গেল। তৌহিদ সাহেব সেই একইভাবে নিউজপেপার বুঁদ হয়ে আছেন। রিনি ভিডিও অফ করে আলোর দিকে তাকালো। আলো মেঘালয়ের চলে যাওয়ার দৃশ্য দেখছে। তারপর বরফ গলে ভিজে যাওয়া কাপড়ের টুকরোর দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,
— আপনার রাগ ঠিক এভাবেই কবে গলে পরবে, ডাক্তার সাহেব?
মেঘালয় চোখের সামনে থেকে আড়াল হয়ে যাবার পর আলো কাপড়টা হাতে নিয়ে দোতলার উদ্দেশ্য হাঁটতে শুরু করল। রিনি আলোর চলে যাওয়ার দৃশ্য দেখে নিজের বাবাকে বলল,
— বাবা, আমার কি মনে হয় জানো? সবার আগে তোমার ভাতিজার রাগ গলে পরবে! সে শুধু শুধু নিজেই কষ্ট পাচ্ছে এবং আলোকে কষ্ট দিচ্ছে।
মেয়ের কথা শুনে তৌহিদ সাহেব নিউজপেপার ভাজ করে টেবিলের ওপরে রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— মেঘালয়ের রাগের আড়ালে ভালোবাসাটুকু পরিমাপ করতে পারবি, রিনি? গত আটবছর ধরে ছেলেটা কেমন হালে ছিল একমাত্র তার কাছের মানুষগুলো জানে। আমরা জানি। বিনা অপরাধে শাস্তি পাওয়া কি মেঘালয়ের প্রাপ্য? তবুও তো সে শাস্তি ভোগ করেছে৷ এখন এতবছর পর আলো এসেছে বলে, গত আটবছরের যন্ত্রণা ভুলে যাবে! কেবল ভালোবেসেছে বলে হাজারটা দোষ-ত্রুটি মাফ করে দেয়া যায়? হয়ত দোষ-ত্রুটি মাফ করা যায়। কিন্তু, এক আকাশসম ভালোবাসার পরও প্রত্যাখাত হবার পর মনে হয় না এত তাড়াতাড়ি মাফ পাওয়া যাবে। অন্তত আমি এই ব্যাপারে একমত না।
কথাগুলো শেষ হবার পর পরই তৌহিদ সাহেব চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। আর রিনি একগালে হাত রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— তুমি নিজেই একজন পুরুষ বলে এই কথাগুলো বলতে পারলে বাবা! তাছাড়া, মেঘালয় তোমার ভাতিজা বলেই কিনা….
তৌহিদ সাহেব মেয়ের কথা শুনে মুচকি হেসে বললেন,
— পুরুষ মানুষের ভালোবাসা বড্ড বিচিত্র রে মা! তারা ভালোবেসে খড়কুটোর ঘর যেমন করে বানাতে পারে। ঠিক তেমন করে সেই যত্নে বানানো খড়কুটোর ঘরে আগুন ধরিয়ে দিতে পারে।
আলো রিনির ঘরটায় গিয়ে বিছানায় বসে আছে। আজ থেকে ক্লাসে জয়েন করার কথা কিন্তু যেতে ইচ্ছে করছে না। মনটা গিয়ে পরে আছে ডাক্তার সাহেব এর কাছে। নতুন নতুন বিয়ে হবার পর ঠিক যেমন করে সারাদিন সারাটা সময় ধরে মানুষটার আশেপাশে থাকতে ইচ্ছে করত ঠিক তেমনি করে আজ এত বছর পর মানুষটার পাশাপাশি থাকতে ইচ্ছে করছে! এ কেমন অনূভুতি! মনটা নতুন করে সবকিছু শুরু করতে চাইছে।
দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল রিনি। রিনিকে দেখে আলো মন খারাপের সুরে বলল,
— আমার কিছুই ভালো লাগছে না।
— ভালো লাগার কথাও না।
কথাটি বলেই চুপ হয়ে যায় রিনি। আলো মাথা নীচু করে বসে রইল। কিছু সময় অতিবাহিত হবার পর রিনি উঠে দাঁড়ায়। তারপর, আলোর সামনে দাঁড়িয়ে আলোর মাথায় একহাত রেখে বলল,
— ভালোবাসা জয় করবে ঠিক আছে। কিন্তু পড়াশোনা সম্পূর্ণ করতে হবে তো নাকি?
— আজ যেতে ইচ্ছে করছে না।
— আজই যেতে হবে। এসো আমার সঙ্গে।
রিনি আলো জোর করে টেনে দাঁড় করালো। তারপর, আলোকে একপাশে জড়িয়ে ধরে বলল,
— তোমার জন্য বিশাল এক সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে।
— কেমন সারপ্রাইজ!!
— সময় হলে টের পাবে।
আলো পোশাক পরিবর্তন করেনি তবে কোমড় সমান চুলগুলোকে পাঞ্চ ক্লিপ দিয়ে খোঁপায় আঁটকে ফেলল। কান এবং গালের দুপাশে কয়েকগাছি ছোট চুল দোল খাচ্ছে। গলায় চিকন সোনার চেন, কানে সিম্পল সোনার দুল। আর দু’হাতে সোনার চিকন চুড়ি। ব্যস আলো এবার নিজেকে আরও একবার আয়নায় দেখে নিলো। পার্ফেক্ট! এমন সময় তার পেছনে আয়নার ভেতরে রিনির প্রতিবিম্ব ফুটে ওঠে। রিনি আলোর পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
— চুলগুলো ছেড়ে দিলে আরও সুন্দর লাগত তোমায়!!
— কেন এভাবে কি বাজে দেখাচ্ছে?
— মোটেও না৷ তোমাকে দেখে আমার হিংসে হচ্ছে বুঝলে। কারণ, ভার্সিটিতে আজ আমাকে কেউ দেখবে না। ঘুরে ঘুরে আমার পাশের জনকে দেখবে।
কথাগুলো বলতে বলতে রিনি আলোর এক গাল টিপ দিলো। আলো ব্যথা পাওয়ার ভঙ্গিতে বলল,
— ব্যাথা পাচ্ছি আমি।
রিনি তৎক্ষনাৎ সরে দাঁড়ায়। তারপর আলোকে বলল,
— আমাকে কেমন দেখাচ্ছে?
নীল পাড়ের সাদা রঙা জামদানি শাড়ি। কানে ব্লু স্টোনের ঝুমকা। কাঁধ অব্দি চুলগুলো ছেড়ে দেয়া। ঠোঁটজোড়া থেকে গোলাপি আভা ছড়াচ্ছে। চোখ দুটোতে কি সুন্দর করে কাজল টেনে দেয়া। ঠোঁটের নীচে কি চমৎকার একটা গাড় কালো তিল!
রিনিকে আপাদমস্তক দেখে আলো উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল,
—আমাকে ভার্সিটিতে রেখে শ্বশুরবাড়িতে চলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে বের হচ্ছো নাকি?
আলোর কথা শুনে রিনি আমতাআমতা করে বলল
— আসলে…. আরাফাত… আমাকে নিয়ে লাঞ্চে যাবে। তাই!!!!
— হয়েছে। হয়েছে। এতে লজ্জা পাবার কি আছে? এবার বের হতে হবে তো।
রিনি পার্স হাতে নিয়ে আলোকে সঙ্গে করে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে।
রিনি গাড়ির সিটে হেলান দিয়ে বসে আলোর দিকে তাকাল।
— তুমি কি একটা ব্যাপারে জানো?
আলো বিরক্ত গলায় বলল,
— তুমি বললেই তো জানব!
রিনি মুচকি হাসল।
— Imperial College London। নাম শুনেছো? আমিও সেখানকার স্টুডেন্ট। তারমানে কি দাঁড়াল? তোমার আর আমার রোজ দেখা হবে এখন থেকে।
নামটা শুনে আলো একটু থমকে গেল। নামটা অচেনা না… বরং খুব পরিচিত। কারণ, আলো এই কলেজের স্কলারশিপ পেয়েছে। আলো ধরে যাওয়া গলায় রিনিকে বলল,
— এটা তো… খুব নামকরা, তাই না?
আলোর প্রশ্ন শুনে রিনি জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
— শুধু নামকরা না। মেডিক্যাল, সায়েন্স, রিসার্চ। সবকিছুর জন্য বিশ্বের সেরাদের মধ্যে একটা জায়গা। এখানে প্রবেশ মানে… স্বপ্ন ছুঁয়ে ফেলা।
আলো চুপ করে গেল। কিছুক্ষণ পর গাড়িটা ধীরে ধীরে থামল। সামনে বিশাল গেট। সাদা আর হালকা ধূসর রঙের আধুনিক স্থাপত্য… কাঁচের দেয়ালগুলোতে সূর্যের আলো পড়ে চকচক করছে। চারপাশে সবুজ লন, পরিপাটি করে ছাঁটা গাছ, আর মাঝে মাঝে রঙিন ফুলের বাগান।
আলো গাড়ি থেকে নামতেই থমকে দাঁড়িয়ে গেল। এই জায়গাটা যেন বইয়ের পাতার বাইরে বেরিয়ে আসা কোনো স্বপ্ন।
উঁচু বিল্ডিংগুলোর দিকে তাকিয়ে তার মনে হচ্ছিল— সে যেন খুব ছোট হয়ে গেছে। চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ছাত্রছাত্রীদের ভিড়। কেউ দ্রুত হেঁটে যাচ্ছে হাতে বই নিয়ে, কেউ বেঞ্চে বসে ল্যাপটপে কাজ করছে, কেউবা হালকা হাসি-আড্ডায় মগ্ন। বাতাসে একটা আলাদা গন্ধ মিশে আছে জ্ঞান, স্বপ্ন আর প্রতিযোগিতার মিশ্রণ।
রিনি আলো’র পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
— কেমন লাগছে?
আলো ধীরে ধীরে বলল,
— মনে হচ্ছে… আমি এখানে মানাচ্ছে না।
রিনি হালকা ধমকের সুরে বলল,
— ভুল ভাবছো। এখানে যারা দাঁড়িয়ে আছে, তারা সবাই একসময় তোমার মতোই ভেবেছিল।
তারা দুজন ভেতরের দিকে হাঁটতে লাগল।
লম্বা করিডোর। সাদা দেয়াল, দেয়ালে ঝোলানো বিভিন্ন মেডিক্যাল পোস্টার মানবদেহের অ্যানাটমি, রিসার্চ চার্ট… সবকিছু এত নিখুঁত আর গোছানো।
ক্লাসরুমের সামনে এসে রিনি থামল।
ক্লাসের ভেতরে তাকাতেই আলোর চোখ আটকে গেল। বড় একটা লেকচার হল।
সামনের দিকে প্রজেক্টর স্ক্রিন, যেখানে কোনো জটিল মেডিক্যাল ডায়াগ্রাম দেখানো হচ্ছে। সারি সারি বেঞ্চে বসে আছে ছাত্রছাত্রীরা। কেউ মনোযোগ দিয়ে নোট নিচ্ছে, কেউ ল্যাপটপে টাইপ করছে, কেউ প্রশ্ন করছে শিক্ষকের কাছে।
শিক্ষক বোর্ডে কিছু লিখছেন। পুরো পরিবেশটা এমন, যেন এখানে সময় নষ্ট করার কোনো সুযোগ নেই। প্রতিটা সেকেন্ডই গুরুত্বপূর্ণ।
রিনি আস্তে করে বলল—
— এই হচ্ছে তোমার জায়গা, আলো। তোমার ক্লাসরুম।
আলো চমকে তার দিকে তাকাল।
— আমার…?
রিনি শুধু হেসে বলল,
— হ্যাঁ।
আলোর চোখ আবার ক্লাসরুমের ভেতরে চলে গেল।
তার বুকের ভেতরে ধুকপুকানি বাড়ছে।
ভয়, স্বপ্ন, আর অচেনা এক টান সব একসাথে মিশে গেছে। সে জানে না সামনে কী অপেক্ষা করছে! কিন্তু এটুকু বুঝতে পারছে, তার জীবনটা এখান থেকেই আবার নতুন করে শুরু হতে যাচ্ছে।
রিনি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মুচকি হেসে বলল।
— ভেতরে যাও।
আলো কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেলে দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
আলো ক্লাসরুমে ঢুকতেই কয়েকজন ছাত্রছাত্রী তাকায়।
সামনে শিক্ষক বোর্ডে কিছু লিখছিলেন। দরজার শব্দে থেমে গিয়ে ঘুরে তাকালেন।
— Yes?
আলো একটু থেমে বলল
— May I come in, sir?
— Come in.
আলো ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকে একপাশে দাঁড়াল। মনে হচ্ছে, তার নিজের হৃদস্পন্দনটা সবাই শুনতে পাচ্ছে।
শিক্ষক বললেন—
— You are late today.
— I’m sorry, sir…
আলো মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
হঠাৎ শিক্ষক একটু গভীরভাবে তাকালেন তার দিকে। তারপর বললেন,
— Wait… you are—
এক সেকেন্ডের নীরবতা। তারপর তিনি মুচকি হেসে বললেন,,
— You are Alo Rahman, right? From Bangladesh?
পুরো ক্লাস যেন একসাথে চুপ হয়ে গেল।
আলোর আঙুলগুলো শক্ত হয়ে গেল।
— Yes… sir.
শিক্ষক এবার পুরো ক্লাসের দিকে ফিরে বললেন,,
— Everyone, she is one of our international scholarship students. Entrance evaluation-এ she achieved one of the highest scores.
মুহূর্তেই ক্লাসের মধ্যে ফিসফাস শুরু হয়ে গেল।
— “Wow” “That’s impressive” “From Bangladesh?”
কিছু চোখে বিস্ময়, কিছু চোখে সম্মান।
আলো দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তার মনে হচ্ছে মাটি ফেটে গেলে সে তাতে ঢুকে যেত। এত লজ্জা লাগছে তার!! এই স্বীকৃতি সে চেয়েছিল। কিন্তু এমন হঠাৎ করে নয়।
শিক্ষক আবার কোমল গলায় বললেন,
— You don’t have to be nervous. We are proud to have you here.।
আলোর বুকের ভেতরটা আনন্দে কেঁপে উঠল। এতদিনের কষ্ট, রাত জেগে পড়া, সবকিছু যেন এক মুহূর্তে চোখের সামনে ভেসে উঠল।
— Thank you, sir…।
আলোর গলার স্বরটা একটু কাঁপছে।
— Take your seat.
আলো ধীরে ধীরে একটা সিটে গিয়ে বসে পড়ল। পাশের একজন মেয়ে মুচকি হেসে বলল—
— Hi… I’m Emma.
আলো মৃদু হেসে বলল,,
— I’m Alo.
ক্লাস আবার শুরু হয়ে গেল।
বোর্ডে লেখা, প্রজেক্টরে ডায়াগ্রাম, শিক্ষকের ব্যাখ্যা—সবকিছু আগের মতোই চলছে। , আলো ভাবছপ সে সত্যিই এখানে belongs করে।
তার ভেতরের ভয় ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছে… আর জায়গা নিচ্ছে আত্মবিশ্বাস।
আলো খাতা খুলে প্রথম লাইনটা লিখল,
“New beginning.”
ক্লাস শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে ছাত্রছাত্রীরা বেরিয়ে যেতে লাগল।
হালকা কথাবার্তা, হাসি সব মিলিয়ে একটা ব্যস্ত পরিবেশ।
আলো কিছুক্ষণ নিজের সিটেই বসে রইল। খাতার পাতায় লেখা
“New beginning.” শব্দ দুটোতেই তার চোখ আটকে আছে। হঠাৎ মনে হলো,
এই দুটো শব্দের ভেতরেই তার পুরো জীবনটা লুকিয়ে আছে।
— বের হবে না?
পরিচিত কণ্ঠ শুনে মাথা তুলে তাকাল আলো। রিনি দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে, ঠোঁটে সেই চিরচেনা মুচকি হাসি।
আলো ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
দুজন একসাথে করিডোর দিয়ে হাঁটতে লাগল। কিছুক্ষণ চুপচাপ হাঁটার পর আলো আস্তে করে বলল,,
— আমি পারব তো?
রিনি থেমে গেল। আলোও থামল তার পাশে।
— হঠাৎ এই প্রশ্ন?
আলো নিচু গলায় বলল,
— সবাই এত স্মার্ট… এত কনফিডেন্ট। আমি… আমি যেন তাদের মতো না।
রিনি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে আলোর কাঁধে হাত রাখল।
— তুমি জানো, সবচেয়ে বড় ভুলটা কী?
আলো চুপ করে রইল।
— তুমি নিজেকে অন্যদের সাথে তুলনা করছো। অথচ তুমি জানো না, ওদের মধ্যে অনেকেই তোমার জায়গায় থাকতে চেয়েছিল।
আলো বিস্ময়ে তাকাল রিনির কথা শুনে।
— তুমি স্কলারশিপে এখানে এসেছো, আলো। এটা কোনো সাধারণ ব্যাপার না।
আলোর চোখে জল চিকচিক করে উঠল। তারপর, ধরা কন্ঠে বলল,
— কিন্তু ভয় লাগছে…
রিনি মৃদু হেসে আলোর একটু কাছে ঝুঁকে বলল,
— ভয় থাকা খারাপ না। ভয় মানে তুমি জিনিসটাকে সিরিয়াসলি নিচ্ছো আর একটা কথা মনে রাখবে, তুমি একা না।
আলো চুপ করে রইল। রিনি এবার মজা করে বলল
— আমি আছি, বুঝলে? আর আমি কিন্তু খুব ভয়ংকর মানুষ!
আলো হেসে ফেলল রিনির কথা শুনে, তারপর, ব্যঙ্গ সুরে বলল,
— তুমি ভয়ংকর?
— অবশ্যই! কেউ যদি তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করে, আমি সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করে দিবো!
রিনি নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল কথাগুলো। আলো এবার একটু জোরে হেসে ফেলল।
তার ভেতরের ভারটা যেন হালকা হয়ে গেল।
Imperial College London–এর বিশাল ক্যাম্পাস পেছনে ফেলে রিনি আর আলো ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে। গেট পার হতেই রিনি হালকা নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
— আজকের দিনটা সত্যই তোমার জন্য অনেক বড় ছিল, না?
আলো একটু চুপ করে হাঁটতে হাঁটতে মাথা নাড়ল।
— মনে হচ্ছে… আমি স্বপ্নের মধ্যে ছিলাম।
রিনি হেসে বলল,
— স্বপ্ন না, বাস্তব। আর এখন তোমাকে এই বাস্তবের সাথে মানিয়ে নিতে হবে।
ভার্সিটির গেইট পেরিয়ে পার্কিং এরিয়ায় যেতেই রিনি এবং আলোর মুখোমুখি হলো মেঘালয়। রিনির পাশে আলোকে দেখে ভ্রু কুঁচকে ফেলল মেঘালয়। মেঘালয়ের কুঁচকে যাওয়া কপাল দেখে আলো বিড়বিড় করে বলল
— Mr. Arrogant…..
মেঘালয় রিনির সামনে এসে দাঁড়িয়ে আড়চোখে আলোকে একপলক দেখে রিনিকে প্রশ্ন করল….
— আজ তো তোমার ক্লাস নেই? এখানে আসার কারন….
— আমার ক্লাস নেই। কিন্তু আমার পাশের জনের আজ প্রথম ক্লাস ছিল।
কথাগুলো বলতে বলতে আলোর দিকে রিনি আড়চোখে তাকায়। আলো’র এই আলাপে ইন্টারেস্ট নেই বোঝা যাচ্ছে।
মেঘালয় চোখের ইশারায় রিনিকে কিছু জিজ্ঞেস করে কিন্তু রিনি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বোঝালো, সে এখনও কিছু বলেনি।
মেঘালয় আলোর দিকে তাকাতেই দেখতে পায় আলো অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। আলোর দৃষ্টি অনুসরণ করে মেঘালয় এবং রিনিও তাকায়। অদূরে কয়েকজন ছেলে এবং মেয়ে হৈ-হুল্লোড় করছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে সূদর্শন একজন ছেলে গিটার বাজিয়ে গান গাইছে তাও আবার বাংলা গান। ছেলেটা হয়তো কলকাতার কিংবা বাংলাদেশের। আলো কৌতূহল বাড়ছে। ইচ্ছে করল সেখানটায় যেতে।
এদিকে রিনি মুচকি হাসছে কারণ মেঘালয়ের চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। বেচারা!! তার বউটা তার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে অন্যকাউকে দেখছে!!!
— রিনি আমি একটু ওখানে যাই?
আলোর আদুরে সুরে বলা আবদার শুনে রিনি গলে যায়। আলোর থুতনিতে হাত রেখে বলল,
— যাও।
আলো অনুমতি পাওয়া মাত্রই একপ্রকার ছুটে গেল সেখানে। সেখানে গিয়ে ভিড় সরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই দেখতে পেলো চিরচেনা মানুষটাকে। অশান্ত ওরফে শান্তকে। শান্ত গিটারে সুর তোলা বন্ধ করে ওপরের দিকে তাকাতেই দেখতে পায় তার হৃদয়েশ্বরীকে। যাকে দেখতে না পেলে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। যেই রক্তক্ষরণ কেবল অনুভব করা যায়। পৃথিবীর কোনো মেশিনে তার এই রক্তক্ষরণের দৃশ্য ক্যাপচার করতে পারবে না।
শান্ত গিটারটা পাশে দাঁড়ানো একটা ছেলের কাছে দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। তারপর, আলোর মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ালো। আলোর চোখজোড়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
— তোমাকে দেখতে না পেয়ে মনে হচ্ছিল দম আঁটকে মরে যাব। তাই আমি চলে এলাম।
— কিন্তু তুমি তো স্কলারশিপ পাওয়ার পর বলেছিল তুমি আসবে না!!!
আলো বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করে। শান্ত’র চোখজোড়ায় জল টলমল করছে। সামান্য এগিয়ে এসে আলোর চুলে আঁটকে থাকা শুকনো পাতাকে ফেলে দিয়ে বলল,
— তোমার জন্য আমি পৃথিবীর বাইরে গিয়ে থাকতে পারব, আলো। আর সেখানে তো লন্ডন একটা দেশ মাত্র।
আলো কিছু বলার সাহস পায় না। কারণ, শান্ত একটা পাগল। পাগল না হলে কেউ এমন অহেতুক চেষ্টা করে!! আলো কিছু না বলেই চলে আসছিল ঠিক তখনি শান্ত আলোর হাত ধরে আটকাতে যাচ্ছিল কিন্তু ঠিক তখনি শান্ত’র হাত সরিয়ে দিয়ে আলো’র হাতটা শক্ত করে ধরল কেউ। আলো অবাক হয়ে তাকায় কারণ মানুষটা অন্যকেউ নয়। আলো’র ডাক্তার সাহেব।
আলো’র অবাকের রেশ কাটার আগেই মেঘালয় নরম সুরে আলোকে উদ্দেশ্য করে বলল,
মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬১
— গাড়িতে গিয়ে বসো। একা বাড়িতে ফিরতে পারবে না। কারণ আরাফাত এসে রিনিকে সঙ্গে করে নিয়ে গেছে।
এ যেন মেঘ না চাইতে জল। যেই মানুষটা গত সাতদিন ধরে একটা টু শব্দ করেনি সেই মানুষটা কি না হাত ধরে ১৬টা শব্দ বলে ফেলেছে!! আবার কিনা বলছে একসাথে একগাড়িতে করে বাড়িতে ফিরবে!!!
আলো’র যে কি হলো হঠাৎ করে!! এত এত আনন্দঘন মূহুর্ত হজম করতে পারছে না। মনে হচ্ছে বাস্তব আর কল্পনার দেশের মাঝামাঝি কোনো অংশে সে আঁটকে পরেছে! আলো হঠাৎ করে সেন্সলেস হয়ে লুটিয়ে পরল মেঘালয়ের বুকের ওপর। শান্ত এগিয়ে আসে তবে মেঘালয় তাকে দেখেও না দেখার ভান করে আলোকে কোলে তুলে নিয়ে গাড়ির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। হেঁটে যেতে যেতেই মেঘালয় আলোর অচেতন মুখটার দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
— পৃথিবীর একমাত্র ডাক্তার বোধহয় আমি যে কিনা রোগী অজ্ঞান হয়ে যাবার পর দারুণ আনন্দিত হই। কারণ, রোগী হয়তো আমার স্ত্রী বলে কিনা…
