Home মেঘের ওপারে আলো মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬৬

মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬৬

মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬৬
Tahmina Akhter

— ওখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন বউমা? তাড়াতাড়ি এসো।
তৌহিদ সাহেব এর ডাক শুনে আলো তড়িঘড়ি করে নেমে এলো। মেঘালয় আড়চোখে আলোর দিকে তাকায়৷ আলো কিছু শুনতে পেলো কি?
আলো খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে তৌহিদ সাহেব আর মেঘালয়ের প্লেটে নাশতা তুলে দিলো। মেঘালয় রুটি ছিড়তে ছিড়তে আলোকে বলল,
— দাঁড়িয়ে আছ কেন? নাশতা খেয়ে নাও। আজ ক্লাস নেই?
— ক্লাস আছে। তবে মধ্য দুপুরের দিকে। এত তাড়াতাড়ি যেতে ইচ্ছে করছে না।
চেয়ার টেনে বসতে বসতে কথা বলল আলো। আলো প্লেটে নাশতা নেবার সময় মেঘালয় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায়। আলো হকচকিয়ে যায়। তারপর, মৃদু স্বরে বলল,

— কি হয়েছে?
— রুটি একটা কেন?
— খেতে ভালো লাগে না।
আমতাআমতা করে বলল আলো। মেঘালয় ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে হাত বাড়িয়ে আরও একটি রুটি নিয়ে আলোর প্লেটে তুলে দেয়। আলো কিছু বলার আগেই মেঘালয়ের চোখ রাঙানো দেখে চুপচাপ রুটি গলাধঃকরণ করে।
এদের দু’জনের কারবার দেখে তৌহিদ সাহেব মুচকি হাসেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দু’জনের অন্তরের সকল শূণ্যতা পূরণ হয়ে যাবে। আগের মত সব ঠিক হয়ে যাবে। কারণ, প্রকৃতি শূণ্যতা পছন্দ করে না।
খাওয়াদাওয়া শেষ করার পর তৌহিদ সাহেব ড্রইংরুমের সোফায় বসে মেঘালয়ের জন্য অপেক্ষা করছে। এদিকে মেঘালয় কালো শার্ট, কালো প্যান্ট, হাতে রিচ ওয়াচ, চোখে কালো সানগ্লাস লাগিয়ে হাত দিয়ে এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে মোবাইল হাতে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে সোজা চলে গেল রিনির ঘরে। রিনির ঘরের দরজা নক করার পরও আলোর সাড়া পায় না মেঘালয়। দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করার পর ঘরের কোথাও আলোকে দেখতে না পেয়ে মেঘালয় বেশ কয়েকবার ডাক দেয়। এমন সময় ব্যালকনি থেকে ঘরে প্রবেশ করল আলো। আলোকে দেখে মেঘালয় স্তব্ধ হয়ে যায়। আচমকা চোখের সামনে কোনো চোখ ধাধানো রুপের সঙ্গে চোখাচোখি হলে যেমন লাগে মেঘালয়ের আপাতত তেমনই লাগছে৷ লাল পাড়ের সাদা শাড়িতে আলোকে দেখে মেঘালয় তার চারপাশ ভুলে গেছে। আলো ধীরে ধীরে মেঘালয়ের সামনে এসে দাঁড়ায়। মেঘালয়ের চোখদুটো অস্থির হয়ে আলোকে ঘুরেফিরে দেখছে বারবার। আলো খানিকটা লজ্জা পায়। চোখ নামিয়ে আরও একবার মেঘালয়ের মুখের দিকে চোখ তুলে তাকায়।

— চোখের কাজল লেপ্টে গেছে তোমার…
এতটুকু বলে থেমে যায় মেঘালয়। তারপর, তাড়াহুড়ো করে পকেট থেকে টিস্যু বের করে আলো’র হাতে তুলে দেয়। টিস্যু হাতে নিয়ে আলো ড্রেসিংটেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। তারপর অতি যত্ন করে চোখের লেপ্টে যাওয়া কাজল মুছে আবারও গাঢ় করে চোখে কাজল রেখা এঁকে মেঘালয়ের দিকে ফিরে বলল,
— এবার ঠিক আছে?
মেঘালয় কিছু বলল না। হঠাৎ করে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। আলো’র হাসোজ্জল মুখটায় ঘোর অন্ধকার নেমে আসে৷ আয়নায় তাকিয়ে রইল। তারপর চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস শ্বাস ফেলে আয়নায় তাকাতেই পেছনে ডাক্তার সাহেব এর অস্তিত্ব খুঁজে পায়। অবাক হয়ে পেছনে তাকাবার আগেই মেঘালয় আলোর চুলের খোঁপা খুলে ফেলল। রেশমি চুলগুলো ঝরঝর করে পুরো পিঠে জুড়ে কোমড় অব্দি ছড়িয়ে যায়।
— কি করছেন?
— হুশশ্! কথা বলো না, প্লিজ?
মেঘালয় একটা লাল গোলাপ আলোর কানে গুঁজে দেয়ার পর আলোর কাছে থেকে দূরে সরে দাঁড়ায়। অতঃপর, আয়নায় ফুটে ওঠা আলোর প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে বলল,
— এবার ঠিক আছে।
আয়নায় নিজেকে দেখে আলো অবাক হয়। অবাকের রেশ কাটিয়ে পেছনে ফিরে মেঘালয়ে জিজ্ঞেস করে,
— আপনি ফুল পেলেন কোথায়?
— আমার বারান্দায় একটা লাল গোলাপের চারা আছে। গত ছয়মাস ধরে গাছটাকে ভীষণ যত্ন করেছি। বেশ কিছুদিন হলো গাছে ফুল ফুটেছে। ফুলটা কাকে দেব ভাবছিলাম এতদিন। কিন্তু, কাকে দেব? শেষমেষ ফুলটা ঝড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। কিন্তু, আজ অবশেষে আমার ঝড়ে না যাওয়া গোলাপের ঠাঁই হলো তোমার কাছে।
আলো মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় তার প্রিয়তমের কথা শুনছে। মেঘালয়ের দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকায়। সময় হয়ে গেছে এবার বের হতে হবে৷ কিন্তু, আলোকে রেখে…

আলো’র সামনে এলে সব কিছু উলোটপালোট হয়ে যায়। রাগ দেখাতে গিয়ে যত্ন করছে। আলো কি মেঘালয়ের অন্তরালের ভালোবাসা টের পেয়ে গেছে? এই একটা মানুষের সামনে সে না রুঢ় আচরণ করতে পারে আর না রাগ দেখাতে পারে। অথচ, আলোকে সর্বোচ্চ রাগ দেখানোর কথা… ভালোবাসা জাহির করার কথা না!!
আলো আয়নায় তাকিয়ে শাড়ির আঁচল খুব সুন্দর করে ভাজ করে পিন দিয়ে আটকায়। তারপর, চুলগুলো একপাশে এনে রাখল৷ এবার বেশ লাগছে৷ ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে লিপস্টিক নিয়ে ঠোঁটে লাগাবে ঠিক তখনি পেছন থেকে মেঘালয়ের ডাক শুনে তাকায়। আলো মেঘালয়কে দেখে ভ্রু কুচকে ফেলল। কারণ সে এতক্ষণ ভেবেছিল মেঘালয় চলে গেছে।

— কিছু বলবেন?
— তুমি কি এভাবেই ভার্সিটিতে যাবে?
মেঘালয়ের প্রশ্ন শুনে আলো’র হাসি পাচ্ছে। আয়নার দিকে ফিরে বলল,
— এভাবে গেলে কোন সমস্যা? না মানে ভার্সিটির অথরিটি কিছু বলবে?
— না ; কিছু বলবে না।
—আপনার দেরি হচ্ছে। আপনি চলে যান। তৌহিদ চাচা আপনার জন্য অপেক্ষা করছে নিশ্চয়ই?
কথাটি বলে আলো ঠোঁটে লিপস্টিক আঁকতে শুরু করল। মেঘালয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘর থেকে বের হয়ে গেছে।
মেঘালয় নীচে গিয়ে তৌহিদ সাহেবকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে গেল। রিনির শ্বশুরবাড়ির সামনে এসে তৌহিদ সাহেবকে নামিয়ে গাড়ির নিয়ে চলে আসার সময় পথিমধ্যে রিনির কল আসে৷ মেঘালয় রাস্তার একপাশে গাড়ি সাইড করে রেখে কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে রিনির কান্না শুনে মেঘালয় হকচকিয়ে বলল,
— কি হয়েছে, রিনি? কান্না করছো কেন?
— এক আমার বাবা ছাড়া আমার কেউ নেই।
রিনির কান্নার কারন বুঝতে পারছে মেঘালয়। আসলেই রিনিকে না দেখে এভাবে চলে আসা উচিত হয়নি।
— কে বলল কেউ নেই? আজ সন্ধ্যায় আমি আর আলো দুজনেই আসব। প্লিজ মন খারাপ করবে না রিনি। ভার্সিটিতে আজ আমার জরুরি একটা ক্লাস আছে। সময়মত এটেন্ড করতে হবে। অলরেডি দুইমিনিট দেরি হয়ে গেছে। আমার চাকরিজীবনের এই প্রথম আমার নিয়মানুবর্তিতা পরিবর্তন হয়ে গেছে।
মেঘালয়ের কথাগুলো শোনার পর রিনির হাসতে হাসতে বলল,

— নিশ্চয়ই এর পেছনে আলো’র হাত আছে?
আলোর নাম শুনে মেঘালয় সীটে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ঠোঁটে লিপস্টিক আঁকা আলোকে নিয়ে আবারও ভাবতে ভাবতে মেঘালয়ের হৃৎস্পন্দন দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। এই অবাধ্য হৃদয়ের গতি থামানোর উপায় কি….
— অবশ্যই ওর হাত আছে। ওর জন্য দিনকে দিন আমার হৃদয় দূর্বল হয়ে যাচ্ছে। কবে জানি আমার হার্ট ফেলওর হয়?
মেঘালয়ের কথা শুনে রিনির খিলখিল করে হেসে ফেলল রিনির৷ রিনির হাসি শুনে মেঘালয় বলল,
— মোটেও হাসির কিছু বলিনি আমি! এভাবে হাসছ কেন তুমি? আমার জন্য তোমার মায়া হয় না?
মেঘালয়ের শেষের কথাটি শোনামাত্র রিনি হাসি থামিয়ে চুপ হয়ে যায়।
—কে বলল তোমার জন্য আমার মায়া হয় না! আমার পৃথিবী জুড়ে যত মায়া আমি তোমায় দিতে চেয়েছিলাম একসময়! কিন্তু, তুমি আমার ভাগ্যে নেই….
রিনির কথা শুনে মেঘালয় স্তব্ধ হয়ে গেছে। কয়েকদিনের ব্যস্ততায় হোক কিংবা আলোর আগমনের জন্য মেঘালয়ের মাথা থেকে রিনির কথা সম্পূর্ণ মাথা থেকে বেড়িয়ে গিয়েছিল। মেঘালয় স্টিয়ারিং হাত রেখে আদর মাখা সুরে বলল,

— পৃথিবীর সব মায়া শুধু মায়ার নাম দিয়ে চালিয়ে দেয়া যায় না, রিনি। কিছু কিছু অনুভূতিকে আমরা মায়ার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলি। অথচ, সে-সব অনুভূতি মায়া নয় কাউকে করুনা দান করা। তোমার অনূভুতিকে আমি শ্রদ্ধা করি। এই কয়েকদিনে তুমি কি ভেবে দেখেছ, আমি তোমার কোথাও নেই! মানে তোমাকে ঘিরে থাকা সকল গুরত্বপূর্ণ মানুষদের মধ্যে তুমি আমার কথা কয়বার ভেবেছ? আট-দশটা কাজিনের মধ্যে যেমন স্বাভাবিক সম্পর্ক থাকে এই কয়েকদিন আমাদের মধ্যে তাই ছিল রিনি। অভারঅল এত বছর তুমি আমার পেছনে যেই অনূভুতিকে পুঁজি করে সময় ব্যয় করছিলে তার নাম শুধুই মায়া আর তোমার আমার প্রতি সাময়িক ভালোলাগা।
মেঘালয়ের কথাগুলো শুনতে শুনতে রিনি অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা আরাফাতকে দেখছে বারবার। মানুষটা মন্দ না। খুব সাধারণ একটা মানুষ। কিন্তু, তার উপস্থিতি, তার দুয়েকটা বাক্য যেন রিনিকে জন্মান্তরের জন্য এই সম্পর্কের মায়াজালে বেঁধে ফেলেছে। তবে কি মানুষটা খুবই ক্ষমতাধর? ক্ষমতাধর না হলে রিনি এত দ্রুত এতবছর ধরে জিইয়ে রাখা অনুভূতিকে কি করে ভুলে গেল? তবে কি মেঘালয়ের কথা সত্য নাকি আরাফাতের বিশেষ ক্ষমতা আছে?
ভাবতে ভাবতেই উত্তর মিলে যায়। আরাফাতের দিকে তাকিয়ে রিনি মুচকি হাসে। মেঘালয়কে উদ্দেশ্য করে ফিসফিসিয়ে বলল,

— তুমি আমার স্পেশাল কেউই নও মেঘালয়। আজ এতগুলো বছর পর টের পেলাম আমি। যে একটা মানুষ আচমকা এসে আমার জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারে সেই আমার স্পেশাল মানুষ। আরাফাত আমার জীবনের একমাত্র স্পেশাল মানুষ।
মেঘালয় রিনির কথা শুনে হাসতে হাসতে কল কেটে দেয়। যাক অবশেষে পাগলিটার সুবুদ্ধি হলো তবে। গাড়ি এবার বাড়ির দিকে ফেরায়৷ তারপর, ভার্সিটির অথরিটির কাছে কল করে জানাল যে, ক্লাসের সময়সীমা আধঘন্টা পিছিয়ে দেয়া হোক। সে একটা গুরত্বপূর্ণ কাজে আটকা পরেছে। অথরিটির লোকজন মেঘালয়কে অন্ধবিশ্বাস করে। কারণ, মেঘালয় এতবছর ধরে তাদের কোনোরকম অভিযোগ করার সুযোগ দেয়নি। তাই তার কথা অথরিটির লোক বিশ্বাস করল। মেঘালয় কল কেটে দেয়ার পর গ্যালারি ঘেঁটে বহু বছর পুরনো আলোর একটা ছবি বের করল। ছবিটা তাদের গায়ে হলুদের রাতে তোলা। মধ্যরাতে শুনশান রাস্তায় দাঁড়িয়ে আলোর সঙ্গে তার প্রথম ছবি তোলা এজ এ কাপল।
ছবিটির দিকে তাকিয়ে মেঘালয় বিস্মিত হয়ে বলল,
— তুমি না আসলেই মায়াজালের মায়াবিনী! তোমাকে রেখে আমার কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না। মনে হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু আমার হাত থেকে ছুটে যাচ্ছে! আমার কি এখনও সেই পাগলামি করার বয়স আছে!! একদিন যেমন অস্বস্তি হচ্ছে অন্যদিকে মনে হচ্ছে এটাই তো জীবনের অংশ।

আলো ভিডিওকলে ইতির সঙ্গে কথা বলছিল। বাইরে থেকে গাড়ির শব্দ শুনে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই ডাক্তার সাহেব এর গাড়িটাকে গেটের সামনে দেখে ভ্রু কুঁচকে ফেলল। পরক্ষণেই ভয় জন্মায় এই ভেবে যে ডাক্তার সাহেবের শরীর খারাপ করল কিনা এই ভেবে!! আলো কল কেটে দিয়ে তড়িঘড়ি করে ঘর থেকে বের হয়ে সিঁড়ির কাছে আসতেই মেঘালয়ের মুখোমুখি হলো। মেঘালয় আলোকে দেখে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় আলো মেঘালয়ের ডানবাহু আঁকড়ে ধরল। মেঘালয় পেছন ঘাড় ফিরিয়ে বলল,
— কি হয়েছে আপনার? অফিসে যাননি….
— ঠিক আছি, আমি৷
কথাটি বলেই মেঘালয় আলোকে ইশারা করল হাত ছেড়ে দেবার জন্য। আলো হাত ছেড়ে দেয়। মেঘালয় নিজের ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেয়। আলো দেয়ালের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বুকে দুই হাত ক্রস করে রেখে মেঘালয়ের বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। মিনিট পাঁচেক পর মেঘালয় দরজা খুলে বের হলো। মেঘালয়কে দেখে আলো ভীষণ ভীষণ অবাক হয়। অবাকের রেশ কাটার আগেই মেঘালয় আলোর সামনে এসে দাঁড়িয়ে কনফিউজড হয়ে বলল,

— মানিয়েছে আমায় এই পাঞ্জাবিতে?
আলো মেঘালয়ের মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখে মুচকি হেসে বলল,
— আপনাকে হট দেখা…
আলো কথাটি সম্পূর্ণ করার আগেই নিজেই নিজের মুখ হাত দিয়ে চেপে ধরল। মেঘালয় আলোর কথা শুনে এহেম এহেম দুটো গলা খাঁকারি দিয়ে অন্যদিকে ফিরে নিজের হাসি আঁটকে রাখার চেষ্টা করছে। আলো নিজের কপালে একহাত রেখে অসহায়ের মত বলল,।
— আসলে আমি ওভাবে বলতে চাইনি। আপনাকে এই পাঞ্জাবি
— তুমি বদলে গেছো আলো!!
— আমি মোটেও বদলে যাইনি!! আমি তো বলতে চেয়েছিলাম আপনাকে পাঞ্জাবিতে অনেক চোখে লাগছে মানে সুন্দর লাগছে।
আমতাআমতা করে বলল আলো। মেঘালয় এমন একটা ভাব ফুটিয়ে তুলেছে যেন আলোর এহেন অধঃপতন সে মানতে পারছে না। আলো তো ভেতরে ভেতরে শেষ হয়ে যাচ্ছে। কেন যে প্রতিবার ডাক্তার সাহেব এর সামনে সে নিজের বদ প্রতিভাগুলো তুলে ধরে…
— তুমি অনেক বদলে গেছ? তোমার সরলতা হারিয়ে গেছে। তুমি কেমন বড় হয়ে যাবার ভান করছ! অথচ, তোমাকে আমি এভাবে মেনে নিতে পারি না। অষ্টাদশী আলোকে আমি অনেক অনেক মিস করছি ইদানিং।
উপরোক্ত কথাগুলো আলোকে বলতে গিয়ে বলল না মেঘালয়। বলে বা কি লাভ! মানুষ পরিবর্তনশীল। তাছাড়া, আলো’র বয়স বাড়ছে। পরিণত মানসিকতা যথেষ্ট তৈরি হয়েছে ওর৷ মেঘালয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে আলোর দিকে তাকিয়ে বলল,

— এস আমার সঙ্গে। তোমাকে ভার্সিটিতে নামিয়ে দেব।
— এত তাড়াতাড়ি যাব কে…
আলো কথা সম্পূর্ণ করার আগেই মেঘালয় খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে তাকায়। আলো আর কিছুই বলার সাহস পায় না। কারণ, ডাক্তারের চোখের ভাষা ভিন্ন কিছু বলছে।
মেঘালয় আগে পেছনে আলো হাঁটছে। গাড়ির সামনে এসে আলো মেঘালয়কে জিজ্ঞেস করল,
— হঠাৎ পাঞ্জাবি পরার কারণ কি?
— নিজে পুরোদস্তুর বাঙালি বউ সেজে এসে আমাকে বলছে পাঞ্জাবি পরেছি কেন? আমার বউ শাড়ি পরেছে তাই আমিও পাঞ্জাবি পরেছি। কোন সমস্যা?

মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬৫

কথাগুলো ঠিক এভাবে বলা দরকার ছিল। কিন্তু মাথামোটা আলোকে বলে লাভ নেই। তাকে মোটা মোটা সাইকোলজিক্যাল বই দিক সেগুলো পড়ে শেষ করতে পারবে । রুগীদের মানসিক সমস্যা এক চুটকিতে সমাধান করতে পারবে কিন্তু নিজের স্বামীর সমস্যা তো তার চোখে পরে না। অন্ধ নারী। রিডিকিউলাস!!!
মেঘালয় জবাব না দিয়ে গাড়িতে উঠে বসল। আলো মেঘালয়ের এমন অযথা রাগ হজম করার চেষ্টা মোটেও করছে না। করুক গিয়ে সে রাগ। কি হয় একবার বললে যে, “আলো আমি তোমার শাড়ির সঙ্গে মিলিয়ে পাঞ্জাবি পরেছি।”
তিলে তিলে গড়ে ওঠা রাগ আর আত্মাভিমানের দেয়াল ভাঙবে কেমন করে? মানুষটার চোখমুখ শক্ত করা দেখলে আত্মার পানির শুকিয়ে যায়। অথচ, কে বলবে আগে এই মানুষটাকে দেখলে কেবল আদর আদর লাগত!

মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬৭