মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২৯
ফারহানা নিঝুম
গাড়িটি ফেইরি ল্যান্ডের গেটের সম্মুখে এসে স্থির হতেই জিয়ান তীক্ষ্ণ কণ্ঠে উচ্চারণ করল,
“আজ যা বলেছি, তাই-ই হবে!”
হিউন জে তৎক্ষণাৎ সমর্থনসূচক ভঙ্গিতে বলল,
“হ্যাঁ। আজ মাশাকে আমাদের সঙ্গেই নিতে হবে। এই গ্যাদারিং তো মূলত শয্য আর ঝুমঝুমের জন্যই আয়োজন করা হয়েছে।”
ঠিক সেই মুহূর্তেই সতর্ক অথচ উত্তেজিত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল মেহবুব,
“ব্রাদার, ওই দেখ! মাশা! দেখে তো মনে হচ্ছে ইউনিভার্সিটিতে যাচ্ছে!”
বাক্যটি উচ্চারিত হওয়ামাত্র সকলের দৃষ্টি তীক্ষ্ণভাবে সেই দিকেই নিবদ্ধ হলো।
ঝুমঝুম তখন ব্যাগ কাঁধে নিয়ে দ্রুত পদক্ষেপে বেরিয়ে আসছে। তার সঙ্গে সর্বদা সঙ্গী সেই ক্ষুদ্র কাঠবিড়ালী, পিউনিও।
হিউন জে অস্থির স্বরে বলল,
“এবার কী হবে? মাশা তো চলে যাচ্ছে!”
জিয়ান হতাশার সুরে উচ্চারণ করল,
“তার মানে আমাদের পরিকল্পনা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হতে চলেছে। যাকে বলে ফ্লপ খেয়েছি।”
কিন্তু মেহবুব তখনও নিশ্চুপ নয়। তার চোখে এক ধরনের কুটিল দৃঢ়তা।
“নো ওয়ে, ব্রাদার। অ্যাটলিস্ট মেহবুব থাকতে এটা অসম্ভব।”
বলে সে দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। পরমুহূর্তেই এমন ভান করল যেন ঝুমঝুম কিছু ভুলে গেছে এই অজুহাতে সে পুনরায় বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল।
কিন্তু তার দৃষ্টি তখন ঝুমঝুমের সাইকেলের উপর স্থির।
তার ঠোঁটে কুটিল হাসি ফুটে উঠল।
“ইয়েস।”
মুহূর্তমাত্র বিলম্ব না করে পকেট থেকে একটি ক্ষুদ্র যন্ত্র বের করে সাইকেলের টায়ারে গোপনে ছিদ্র সৃষ্টি করল।
অন্যদিকে শয্য তড়িৎ গতিতে গাড়ির দিকে অগ্রসর হচ্ছিল।
জিয়ান চোখের ইশারায় সংকেত দিল, মেহবুবও নিঃশব্দে মাথা নাড়ল অল ডান।
মেহবুব ধীর কণ্ঠে বলে উঠল,
“মাশার কী হয়েছে? ও দাঁড়িয়ে আছে কেন?”
এই কথা বলতে বলতে সে ঝুমঝুমের দিকে এগিয়ে গেল।
সাইকেলের বিকল চাকা দেখে ঝুমঝুমের মুখমণ্ডলে ক্ষণিকের জন্য হতাশার ছায়া নেমে এলো। সে গাড়ি চালাতে জানে না, আর সাইকেলটিও অকেজো।
“হোয়াট হ্যাপেন্ড, মাশা?”
মেহবুব কণ্ঠে কৃত্রিম উদ্বেগ ফুটিয়ে তুলল। ঝুমঝুম চমকে তাকাল। ততক্ষণে বাকিরা একে একে এসে উপস্থিত হয়েছে শুধু শয্য ব্যতীত।
সে বিনীত স্বরে বলল,
“আপনারা কেমন আছেন সবাই?”
সকলেই একযোগে উত্তর দিল,
“ভালো।”
হিউন জে সামান্য নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
“ইউনিভার্সিটিতে যাচ্ছো, বুঝি?”
ঝুমঝুম মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল,
“হ্যাঁ, কিন্তু সাইকেলটা পাংচার হয়ে গেছে।”
মেহবুব অন্তরে কুটিল তৃপ্তিতে হাসল। ঠিক সেই মুহূর্তে দূর থেকে ভেসে এলো শয্যের কঠোর কণ্ঠ,
“তোরা কি আসবি? উই আর গেটিং লেট।”
হঠাৎই চোখাচোখি হলো ঝুমঝুম ও শয্যের। এক মুহূর্তেই দৃষ্টি যুগল স্থির হলো দুজনের।
ঝুমঝুমের মনে জেগে উঠল তীব্র অস্বস্তি এই পুরুষটির স্বভাব, তার নির্মমতা, তার অপ্রত্যাশিত রূঢ়তা সবকিছুই তাকে ভেতর থেকে কাঁপিয়ে তোলে।
মেহবুব নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
“ইশ্, এখন তুমি যাবে কীভাবে?”
জিয়ান দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল,
“নো প্যানিক। আমরা গাড়ি নিয়ে এসেছি। আর শয্যও এসেছে। তুমি বরং ওর সঙ্গে চলে যাও।”
শয্যের নাম উচ্চারিত হওয়ামাত্র ঝুমঝুম তীব্র ভয়ে চিৎকার করে উঠল,
“না!”
সকলেই বিস্মিত হয়ে তার দিকে তাকাল। ঝুমঝুম দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“আমি,, আমি বলতে চেয়েছি, প্রয়োজন নেই।”
হিউন জে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“না বললে চলবে না, মাশা। আমরা তো তোমাকে একা যেতে দিতে পারি না। তুমি বরং শয্যকে গিয়ে বলো।”
ঝুমঝুম অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে রইল। তার মস্তিষ্কে ভেসে উঠল সকালের ঘটনাটি শয্যের রূঢ় আচরণ।
তবুও সবার চাপের মুখে তাকে এগোতেই হলো।
ধীর পদক্ষেপে গাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে। হৃদস্পন্দন তীব্র হয়ে উঠেছে। সামনে সেই পুরুষ শয্য।
তার হ্যাজেলবর্ণ দৃষ্টির সামনে পড়তেই ঝুমঝুম যেন মুহূর্তে স্থবির হয়ে গেল। কষ্টে নিজেকে সামলে কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“ইয়ে,,, আমাকে কি আর্ট ইউনিভার্সিটিতে ড্রপ করে দেবেন, ভাইয়া?”
শয্য হঠাৎ সোজা হয়ে দাঁড়াল। দাঁত চেপে, কর্কশ কণ্ঠে বলল,
“তোর কী মনে হয়, মাশা? আমি কি তোর মতো ফ্রি ঘুরে বেড়াই? আমার কি কোনো কাজ নেই?”
এই বাক্য শোনামাত্র ঝুমঝুমের ভিতরে ক্ষোভের সঞ্চার হলো। সে মুহূর্তের আবেগে গাড়ির দিকে হালকা লাথি বসিয়ে দিল। ঝুমঝুমের চোখে তখন অগ্নিশিখা।
“আপনি জানেন আপনি কতটা অকৃতজ্ঞ? খুবই বাজে একজন মানুষ!”
শয্য কেবল ঠান্ডা হাসল।
“তো?”
এই নিস্পৃহ প্রতিক্রিয়াই ঝুমঝুমের ক্রোধ বহুগুণ বাড়িয়ে দিল।
“আপনি ভীষণ অভদ্র! একটুও ভদ্রতা নেই আপনার মধ্যে!”
শয্য ধীর, ব্যঙ্গাত্মক হাসি হেসে বলল,
“অভদ্রের কাছ থেকে ভদ্রতা আশা করছিস? ইন্টারেস্টিং।”
তারপর দুই কদম এগিয়ে এসে আঙ্গুল দেখিয়ে শাসিয়ে কর্কশ স্বরে বলল,
“জাস্ট স্টে অ্যাওয়ে ফ্রম মি।”
অতঃপর উচ্চস্বরে টিম আলফার উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলল,
“তোরা কি আসবি? নাকি আমি একাই চলে যাবো?”
মেহবুব তৎক্ষণাৎ বলল,
“তুই ওকে ড্রপ করবি না?”
“নো।”
এককথায় জবাব দিল শয্য।মেহবুবের চোখে ক্ষোভ ফুটে উঠল। কিন্তু পরিস্থিতি তীব্র হয়ে ওঠায় সে আর কিছু বলল না।
“ওকে ফাইন। তাহলে আমিই ওকে ড্রপ করব।”
শয্য এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। গাড়িতে উঠে দ্রুত প্রস্থান করল যেন এই স্থান, এই মুহূর্ত আর সহ্য করতে পারছে না। ঝুমঝুম অসহায় কণ্ঠে বলল,
“আপনারা শুধু শুধু আমার জন্য চিন্তা করছেন,,
জিয়ান হালকা হাসল।
“চিল। তুমি বরং প্রিয়াকে কল করো।”
ঝুমঝুম ভ্রু কুঁচকে বলল,
“প্রিয়া?”
জিয়ান মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ। এখন ওরই দরকার।”
“আজকে আমার ভীষণভাবে মায়ের কথা মনে পড়ছে!”
রাকিবের কণ্ঠে উচ্চারিত বাক্যটি যেন নিঃশব্দ কোনো শলাকার মতো বিদ্ধ করল মেহরিমার অন্তঃস্থল। মুহূর্তেই তার বক্ষগহ্বর ধক করে উঠল। বহুদিন চেপে রাখা বিষাদ যেন পুনরায় রক্তক্ষরণ শুরু করল।
বাদশাহ পরিবার থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর কত ঋতু পেরিয়ে গেছে! অথচ একবারের জন্যও কেউ তাদের খোঁজ নেয়নি।
কেউ না। না রাজিব বাদশাহ,না জেসমিন বাদশাহ।
যেখানে রাকিব ছিল তারা বাদশাহর আদরের পুত্রসন্তান, আর মেহরিমা জেসমিন বাদশাহর হৃদয়ের অত্যন্ত স্নেহধন্য কন্যা। কিন্তু তাদের অপরাধ? তারা পরস্পরকে ভালোবেসেছিল। শুধু এইটুকুই।
রাজিব বাদশাহ কোনোদিনই পরিবার-সম্পর্কের ভেতর এমন সম্পর্ককে স্বীকৃতি দেননি। তার কাছে কাজিনদের মধ্যকার সম্পর্ক পবিত্র ভাই বোনের বন্ধন সেখানে দাম্পত্যের কোনো অবকাশ নেই। আর সবচেয়ে বড় অভিযোগ, তারা কেন পরিবারকে না জানিয়ে বিয়ে করল?
কেন গোপন করল? মেহরিমা কষ্ট চেপে মৃদু হাসল। সেই হাসির অন্তরালে ছিল ক্ষতবিক্ষত অভিমান।
“আমারও ওদের খুব মনে পড়ে, রাকিব কিন্তু এখন আর কিছু করার নেই। আমরা তো;”
কথা সমাপ্ত হওয়ার পূর্বেই আচমকা ক্যাফের কাচের দরজা প্রচণ্ড শব্দে খুলে গেল। হনহনিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল শয্য।
তার পদক্ষেপে এমন এক তীব্রতা ছিল, যেন প্রতিটি ধাপে জমাট রাগ মেঝেতে আছড়ে পড়ছে।
মেহরিমা ও রাকিব দুজনেই বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেল।
“শ,,, শয্য ভাইয়া!”
মেহরিমার কণ্ঠ কেঁপে উঠল। শয্য কোনো উত্তর দিল না।
সে সরাসরি গিয়ে ধপাস করে একটি চেয়ারে বসে পড়ল। মুখমণ্ডল কঠিন, চোয়াল শক্ত, হ্যাজেলবর্ণ চোখদুটো অদ্ভুতভাবে দপদপ করছে।
রাকিব কিঞ্চিৎ অস্বস্তি নিয়েও হাসিমুখে বলল,
“কেমন আছো, ভাইয়া?”
শয্য অন্যমনস্ক স্বরে বলল,
“ফাইন, তোমরা?”
মেহরিমা মুচকি হাসল।
“আমরাও ভালো আছি। তোমার জন্যই।”
শয্য গভীর, উত্তপ্ত নিঃশ্বাস ত্যাগ করল। মনে হচ্ছিল তার মস্তিষ্কের ভেতর যেন কোনো অগ্নিঝড় তাণ্ডব চালাচ্ছে।
মেহরিমা দ্রুত উঠে গিয়ে ঠান্ডা শরবত এনে রাখল তার সামনে। ঠিক তখনই রাকিব প্রশ্ন করল,
“আচ্ছা ভাইয়া, সেদিন কী হয়েছিল?”
শয্যের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।
“মানে?”
মেহরিমা ধীরস্বরে বলল,
“সেদিন তুমি বলেছিলে মাশাকে সারাদিন আমাদের কাছে রাখতে!”
এই কথাটুকুই যেন আবারও আগুনে ঘি ঢেলে দিল। শয্য অস্থিরভাবে নড়েচড়ে বসল। তার কপালের রগ স্পষ্ট ফুলে উঠেছে। মস্তিষ্ক যেন দপদপ করে জ্বলছে।
কারণ তার চোখের সামনে মাশা নির্দ্বিধায় মেহবুবের গাড়িতে ওঠার জন্য সম্মতি দিয়েছে! হাউ ডেয়ার শি?
ঈর্ষা, রাগ, অধিকারবোধ সবকিছু একসাথে বিষা’ক্ত লাভার মতো ফুটছে তার অন্তরে। হঠাৎই সে কড়া স্বরে বলে উঠল,
“মেহু, মাশাকে কল করো, রাইট নাও । জিজ্ঞেস কর কোথায় আছে।”
মেহরিমা হতভম্ব হয়ে রাকিবের দিকে তাকাল।
“ও তো সম্ভবত ক্লাসে আছে এখন।”
“নো। এখনই কল করো।”
শয্যের কণ্ঠে এমন এক আদেশাত্মক কঠোরতা ছিল, যা অমান্য করার সাহস কারও নেই। রাকিব দ্রুত ফোন বের করে কল দিল। দু’বার রিং হতেই ওপাশে ফোন রিসিভ হলো।
মেহরিমা উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে বলল,
“এই মাশা, তুই কোথায়?”
ওপাশে ঝুমঝুমের কণ্ঠ ভেসে এলো,
“আর বলো না আপু, ভার্সিটিতে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু যাইনি!”
এইটুকু শুনেই শয্য আচমকা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
তার চোখে মুহূর্তে জ্বলে উঠল তীব্র ক্রোধের উষ্মা। ভার্সিটিতে যায়নি? তাহলে কোথায় গেছে? মেহরিমা তৎক্ষণাৎ জিজ্ঞেস করল,
“তাহলে কোথায় আছিস?”
ঝুমঝুম বলতে যাচ্ছিল,
“আসলে আমি মেহবু,,,
কিন্তু তার আগেই ফোনের ওপাশে ভেসে এলো এক পুরুষালী কণ্ঠস্বর। গভীর। আত্মবিশ্বাসী।
“তোমাকে আজ ভীষণ সুইট দেখাচ্ছে, মাশা। এদিকে এসো।”
মুহূর্তেই শয্যের মুখমণ্ডল ভয়ংকর হয়ে উঠল।
মেহবুব। ওটা মেহবুবের কণ্ঠ। পরক্ষণেই কল কেটে গেল।
কয়েক সেকেন্ড নিস্তব্ধতা।
তারপর শয্য এমনভাবে দাঁতে দাঁত চেপে উঠল, যেন নিজেকেই সংবরণ করতে পারছে না।
“আজ আমি মাশাকে মে’রেই ফেলব, আই জাস্ট কিল হার।”
তার কণ্ঠে ছিল উন্মত্ত অধিকারবোধের হিংস্রতা। পরমুহূর্তেই ঝড়ের বেগে ক্যাফে ত্যাগ করল সে। কাচের দরজা সজোরে আছড়ে বন্ধ হলো। মেহরিমা স্তম্ভিত হয়ে রইল। সে হতভম্ব চোখে রাকিবের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“এটা,,এটা কী হলো?”
রাকিবও নির্বাক। ধীরে ধীরে বলল,
“কি জানি!”
উন্মত্ত ঝঞ্ঝার ন্যায় গাড়ি ছুটিয়ে চলেছে শয্য। সিউল সিটির দীপ্ত নিয়ন আলোকচ্ছটা, সুউচ্চ স্কাইস্ক্র্যাপারের কাঁচঘেরা প্রতিফলন, ব্যস্ত এক্সপ্রেসওয়ের অবিরাম যানপ্রবাহ কোনো কিছুই যেন তার দৃষ্টিসীমায় প্রবেশ করছে না। তার মস্তিষ্কে এখন একটিমাত্র নাম।
মাশা। ঝুমঝুম। স্টিয়ারিংয়ে চেপে থাকা তার আঙুলের গিঁটগুলো ক্রমশ সাদা হয়ে উঠছে। চোয়াল এতটাই শক্ত হয়ে আছে যেন সামান্য চাপেই দাঁত ভেঙে যাবে। হ্যাজেলবর্ণ চোখদ্বয়ে জ্বলছে অদ্ভুত এক দহন অধিকার, ঈর্ষা আর নিয়ন্ত্রণহীন ক্রোধের মিশ্র বিস্ফোরণ।
গাড়ির স্পিডোমিটারের কাঁটা বিপজ্জনক গতিসীমা অতিক্রম করলেও শয্যের হুঁশ নেই। ঠিক তখনই
সম্মুখবর্তী সিগন্যালে লাল বাতি প্রজ্বলিত হলো।
প্রচণ্ড বিরক্তিতে ব্রেক কষতে বাধ্য হলো সে। টায়ারের কর্কশ ঘর্ষণধ্বনি রাত্রির নিস্তব্ধতাকে ছিন্নভিন্ন করে দিল।
শয্য স্টিয়ারিংয়ে মুষ্টাঘাত করল।
তার শিরাগুলো ক্রমশ স্ফীত হয়ে উঠছে। মনে হচ্ছে রাগে মস্তিষ্কের প্রতিটি স্নায়ু দাউদাউ করে জ্বলছে।
গভীর, হিংস্র স্বরে ফিসফিস করে উঠল সে,
“তুই আমার,,শুধু আমার।”
পরক্ষণেই ঠোঁটে বিকৃত হাসি ফুটে উঠল।
“বিশ্বাস কর আজ তোকে হাতের কাছে পেলে মে’রেই ফেলব আমি! আই রিপিট জাস্ট শ্যুট করব।”
বাক্যগুলো উচ্চারণের সময় তার কণ্ঠে এমন এক বিপজ্জনক স্থিরতা ছিল, যা ক্রোধের চেয়েও ভয়ঙ্কর।
সিগন্যাল সবুজ হওয়া মাত্রই পুনরায় গর্জে উঠল গাড়ির ইঞ্জিন। ভ্রূউউম। শয্য অ্যাক্সিলারেটরে চাপ বাড়িয়ে দিল।
কালো রোলস রয়েসটি বিদ্যুৎগতিতে ছুটে চলল সিউলের অভিজাত গ্যাংনাম ডিস্ট্রিক্টের দিকে যেখানে আজকের প্রাইভেট গ্যাদারিংয়ের আয়োজন করা হয়েছে।
সেটি কোনো সাধারণ পার্টি নয়। সেখানে উপস্থিত রয়েছে কয়েকজন জনপ্রিয় কে-পপ আইডল, মিডিয়া-ফেস, এবং শহরের তথাকথিত এলিট সার্কেলের মানুষজন।
আজ সেখানে আনন্দের চেয়ে ভয়ঙ্কর কিছু ঘটতে চলেছে। কারণ শয্য এখন আর স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। তার ভিতরের সমস্ত সংযম, ধৈর্য, সভ্যতা ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। তার মাথার ভেতর কেবল একটাই দৃশ্য বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে মেহবুবের কণ্ঠস্বর।
“তোমাকে আজ ভীষণ সুইট দেখাচ্ছে, মাশা!”
মুহূর্তেই শয্যের দৃষ্টি আরও অন্ধকার হয়ে উঠল।
তার বুকের ভেতর যেন হিংস্র কোনো পশু গর্জন করছে।
আর সেই গর্জনের পরিণতি আজ কেউই হয়তো সামলাতে পারবে না।
“ড্যাড, এবার কিন্তু তোমাকে শয্যের সঙ্গে কথা বলতেই হবে! আর মাত্র একদিন বাকি আমার বার্থডের। অ্যান্ড দিস টাইম, আই ওয়ান্ট শয্য অ্যাজ মাই বার্থডে গিফট!”
কন্যার আবদারপূর্ণ বাক্য শ্রবণমাত্র কায়দার খানের ওষ্ঠপ্রান্তে প্রশস্ত হাসির রেখা প্রস্ফুটিত হলো। তার দৃষ্টি জুড়ে স্পষ্ট হয়ে উঠল উচ্চাভিলাষী সন্তুষ্টি।
শয্য বাদশাহ সিউলের অন্যতম জনপ্রিয় কেপপ আইডল। অসংখ্য তরুণীর হৃদস্পন্দনের কেন্দ্রবিন্দু। মিডিয়া, ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি, বিজনেস সার্কেল সর্বত্র যার নাম প্রভাব বিস্তার করে।
এমন একজন যুবক যদি তার জামাতা হয় ভাবনাটিই কায়দার খানের অন্তরে অদ্ভুত এক অহংমিশ্রিত আনন্দের সঞ্চার করল। তিনি স্নেহভরে সুরাইয়ার গালে আলতো স্পর্শ বুলিয়ে দিলেন। কণ্ঠস্বর কোমল, আশ্বাসপূর্ণ।
“রিল্যাক্স, সুইটহার্ট। অবশ্যই তুমি শয্যকে পাবে। তবে প্রতিটি মূল্যবান জিনিস অর্জন করতে সামান্য পেশেন্স দরকার হয়।”
সুরাইয়া ঠোঁট ফুলিয়ে সামান্য অভিমানী স্বরে বলল,
“আর কতদিন, ড্যাড? তুমি তো জানো আমি শয্যকে কতটা ভালোবাসি!”
সুরাইয়ার চোখদুটি তখন কল্পনাময় দীপ্তিতে উজ্জ্বল।
“আই লাভ শয্য বাদশাহ!”
কায়দার খান নিম্নস্বরে হেসে উঠলেন।
“জাস্ট কয়েকটা দিন ধৈর্য ধরো।”
সুরাইয়া ধীরে ধীরে জানালার দিকে এগিয়ে গেল। সিউল শহরের রাত্রিকালীন আলোকচ্ছটা তার মুখাবয়বে পড়ে এক ধরনের স্বপ্নময় আভা সৃষ্টি করেছে। তার কল্পনায় এখন কেবল একটিই দৃশ্য শয্য তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
মিডিয়ার ফ্ল্যাশ জ্বলছে চারদিকে। আর সে শয্য বাদশাহর হাত আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে সকলের সামনে।
আর মাত্র একদিন পর তার জন্মদিন। সেই বিশেষ রজনীতেই সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিজের মনের সমস্ত অনুভূতি উজাড় করে শয্যকে প্রপোজ করবে।
তার বিশ্বাস যে পুরুষকে সে এতটা গভীরভাবে ভালোবাসে, সেই পুরুষও একদিন না একদিন তাকে ভালোবেসে ফেলবেই। কারণ সুরাইয়ার ধারণা তার মতো কাউকে উপেক্ষা করা অসম্ভব।
“ঝুম কোথায়?”
শয্যের কণ্ঠস্বর সমগ্র প্র্যাকটিস রুমজুড়ে বজ্রপাতের ন্যায় প্রতিধ্বনিত হলো। পরমুহূর্তেই সে পুনরায় গর্জে উঠল,
“আই অ্যাম আস্কিং হোয়্যার ইজ ঝুম?”
কথাটি উচ্চারণ করেই অতর্কিতে জিয়ানের কলার মুষ্টিবদ্ধ করে টেনে ধরল সে। ঘটনাটির আকস্মিকতায় উপস্থিত সকলে সম্পূর্ণ হতবাক হয়ে গেল। সিউলের অভিজাত ড্যান্স-স্টুডিওটি, যেখানে সাধারণত উচ্চস্বরে বিট, হাসাহাসি আর প্র্যাকটিসের কোলাহল বিরাজ করে সেই স্থান মুহূর্তেই এক দমবন্ধ নীরবতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল।
শয্যের চোখদুটি তখন অগ্নিদীপ্ত। শিরাগুলো টানটান হয়ে উঠেছে। মনে হচ্ছে, সামান্য উস্কানিতেই সে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলবে। সে খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রায় উন্মাদের ন্যায় ছুটে এসেছে এখানে। কিন্তু এসে কী দেখল?
একগাদা পিৎজার বাক্স ছড়িয়ে রয়েছে। সবাই নির্লিপ্তভাবে বসে আছে। অথচ ঝুমঝুম নেই। এই অনুপস্থিতিই যেন তার অন্তর্গত সমস্ত সংযম ভস্মীভূত করে দিয়েছে। হিউন জে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে আছে। জিয়ান কষ্টে ঢোক গিলে আমতা আমতা করে বলল,
“ঝুম? ওকে দিয়ে তোর কী কাজ? আর তুই এখানে কেন?”
শয্যের মেজাজ তখন সীমালঙ্ঘন করেছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে উঠল,
“বল! ঝুম কোথায়? আর মেহবুব কোথায়?!”
ঠিক সেই মুহূর্তেই ভেতরের রুম থেকে বেরিয়ে এলো মেহবুব। সে গোল গোল চোখ করে নাটকীয় বিস্ময়ভরে বলল,
“একি শয্য? তুই এখানে কেন?”
বাক্যটি শেষ হওয়ার আগেই শয্য ঝড়ের বেগে তেড়ে গেল তার দিকে।ধাম! এক প্রচণ্ড ঘুষি গিয়ে আ’ঘাত হানল মেহবুবের পেটে। আকস্মিক আঘা’তে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেল সে। জিয়ান ও হিউন জে একসাথে চিৎকার করে উঠল,
“আরে ভাই! পাগল হয়েছিস নাকি?কী করছিস তুই?”
শয্য যেন কারও কথাই শুনছে না। তার চোখে তখন উন্মত্ত ঈর্ষার হিংস্র ছায়া। সে মেহবুবের কলার চেপে ধরে গর্জে উঠল
“ঝুমঝুম কোথায়?তোর সাহস হয় কী করে ওকে এখানে নিয়ে আসিস? হাউ ডেয়ার ইউ?”
মেহবুব ব্যথায় কুঁকড়ে গেলেও থামল না। বরং কটাক্ষমিশ্রিত স্বরে বলে উঠল
“তো? প্রবলেম কোথায়? তুই তো ওকে বোন হিসেবেও মানিস না! ওকে ড্রপ করতেও চাসনা, এদিকে আমার সাথে এলেও তোর প্রবলেম।তোর এত প্রবলেম কেন ভাই?”
এই বাক্যটি যেন বিষাক্ত তীরের মতো বিদ্ধ করল শয্যকে।
তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
“আমি জানতে চাই ঝুম কোথায়।”
মেহবুব এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে অসহায় ভঙ্গিতে বলল,
“ওয়ার্ডরোবে গিয়ে দেখ। ওখানেই লুকিয়ে রেখেছি।”
রসিকতাটুকু উপস্থিত অন্যদের ঠোঁটে ক্ষীণ হাসির রেখা আনলেও শয্যের পাথুরে মুখাবয়বে কোনো পরিবর্তন এলো না। বরং সে আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল। সে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল,
“ও আমার,,,
বাক্যটি অসম্পূর্ণ থেকে গেল। ঠিক তখনই পেছন দিক থেকে ভেসে এলো এক মেয়েলি, রিনরিনে কণ্ঠস্বর।
“শয্য ভাইয়া,,আপনি?”
সমস্ত কক্ষ যেন মুহূর্তেই স্থির হয়ে গেল। শয্য ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল। আর পরক্ষণেই তার হৃদস্পন্দন যেন ক্ষণিকের জন্য থেমে গেল। ঝুমঝুম দাঁড়িয়ে আছে। পুতুলের মতো দেখতে এক ড্রেস পরিহিতা। লম্বা, ঢেউ খেলানো কেশরাশি কাঁধ বেয়ে নেমে এসেছে। মুখে বিস্ময়, চোখে নিরীহ স্নিগ্ধতা।
তার পেছনে একই ধরনের পোশাক পরে দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রিয়া। কিন্তু শয্যের দৃষ্টি কেবল স্থির রইল ঝুমঝুমের উপরেই। এই কারণেই কি মেহবুব বলেছিল,
“তোমাকে ভীষণ কিউট দেখাচ্ছে!”
ভাবনাটি মাথায় আসতেই পুনরায় হিংস্র রাগ গ্রাস করল তাকে। দুমদাম পা ফেলে এগিয়ে গেল সে। আর কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই ঠাস! সজোরে একটি চড় বসিয়ে দিল ঝুমঝুমের গালে। আঘা’তের তীব্রতায় টাল সামলাতে না পেরে দেয়ালে গিয়ে ধাক্কা খেল কন্যাটি। সঙ্গে সঙ্গে পুরো রুম চিৎকারে ফেটে পড়ল,
“পাগল হয়েছিস তুই, শয্য? হোয়াট’স রং উইথ ইউ?”
কিন্তু শয্য কারও দিকে ফিরেও তাকাল না। সে ঝুমঝুমের নরম কব্জি নির্মমভাবে চেপে ধরল। তার কণ্ঠস্বর তখন কর্কশ, বিপজ্জনক।
“আমার কথার বাইরে যাওয়ার সাহস হয় কীভাবে তোর?”
সে আরও ঝুঁকে এল।
“ভয় নেই? আমাকে ভয় হয় না তোর?”
ঝুমঝুম হুহু করে কেঁদে উঠল। অথচ শয্যের মধ্যে বিন্দুমাত্র করুণা জাগল না। বরং দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে বলল,
“জানের ভয় নেই হ্যাঁ? এখানে এসে কলিজা খুব বড় হয়ে গেছে হ্যাঁ? আজকে তোর কলিজা আমি টেনে বের করে দেখব কত বড় হয়েছে!”
মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২৮
ঝুমঝুম ভয়ে ঠকঠক করে কেঁপে উঠলো। কব্জির তীব্র ব্যথায় চোখ ঝাপসা হচ্ছে ক্রমশ।
“আজ আমি তোকে মে’রেই ফেলব।”
বাক্যটি উচ্চারণ করেই সে ঝুমঝুমকে টানতে টানতে রুমের বাইরে নিয়ে চলে গেল। আর পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা বাকিরা স্তম্ভিত। নির্বাক।
