মোহশৃঙ্খল পর্ব ২৩
মাহা আয়মাত
অর্তিহা আধশোয়া হয়ে বেডে বসে আছে। চোখে-মুখে বিরক্তির ছাপ। কিছুতেই তার মন বসছে না। বাইরে যেতে ভালো লাগছে না, আবার ঘরের ভেতর থাকতেও ভাল লাগছে না। রুম থেকে বের হতেও ইচ্ছে করছে না, আবার রুমে বসে থাকতেও বিরক্ত লাগছে। এই বিরক্তির মাঝেই তার হাত গিয়ে পেটে ঠেকে। স্পর্শ করতেই মনটা একটু নরম হয়ে আসে। শরীরের ভেতর দিয়ে হালকা সুখ ছড়িয়ে যায়। মনে অদ্ভুত এক মাতৃত্বের অনুভূতি জাগে।
অর্তিহা পেটে হাত বুলিয়ে মনে মনে ভাবে, তার এই ছোট পেটের ভেতর কি সত্যিই একটা ছোট্ট অংশ বেড়ে উঠছে? আর কিছুদিন পর সে দুনিয়ায় আসবে? সে তাকে মা বলে ডাকবে? সে কি সত্যিই মা হয়ে যাচ্ছে? ভাবতেই তার ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে ওঠে।শত কষ্টের মাঝে এই জিনিটা তার মনটা খুশি করে তুলে। পেটে হাত রেখে অনাগত সন্তানকে অনুভব করার চেষ্টা করতে থাকে। কিন্তু এখনো কোনো নড়াচড়া টের পাচ্ছে না।
অবশ্য পাওয়ার কথাও না। বাচ্চা তো মাত্র ১৪ সপ্তাহ। এত তাড়াতাড়ি নড়াচড়া অনুভব করা যায় না। ঠিক তখনি ওয়াশরুমের দরজা খুলে যায়। আদ্রিক শাওয়ার নিয়ে বের হয়। আদ্রিকের গায়ে শুধু কোমর পেঁচানো টাওয়াল। অর্তিহার মনোযোগ পেট থেকে সরে ওয়াশরুমের দিকে যায়। সঙ্গে সঙ্গে লজ্জায় অর্তিহা চোখ নামিয়ে ফেলে।
অর্তিহা মাথা নিচু করে লজ্জা মাখা কণ্ঠে বলে,
— এভাবে কাপড় ছাড়া বের হয়েছেন কেন?
আদ্রিক আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে দুষ্টু হেসে বলে,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
— তোকে সিডিউস করার জন্য!
অর্তিহা চোখমুখ কুঁচকে বলে,
— ছিহ! কিসব বলছেন!
আদ্রিক আয়নার সামনে থেকে সরে এসে বেডের পাশে দাঁড়ায়। এক হাত বেডের ওপরে, আরেক হাত অর্তিহার বাম পাশে রেখে অর্তিহাকে নিজের দুই হাতের মাঝে আটকে ফেলে। অর্তিহার দিকে একটু ঝুঁকে বলে,
— বলছি কোথায়? দেখাচ্ছি তোকে! দেখে
আদ্রিককে নিজের এতো কাছে দেখে অর্তিহা থমকে যায়। অর্তিহা কাঁপা কণ্ঠে বলে,
— প্লিজ সরে দাড়ান।
— সি, বেবিডল! আই’ম ড্যাম হট!
— কি করছেন আপনি?
আদ্রিক ঠোঁট কামড়ে, চোখে মাতাল আকুলতা নিয়ে বলে,
— একটু অভদ্র মন হতে চাচ্ছে! আসো না মেলে দিয়ে তোমারি সেই চুল, করে ফেলি দু’জনা কিছু আবেগি ভুল!
আদ্রিকের কণ্ঠ আর কথায় অর্তিহার শরীর দিয়ে যেন শীতল বাতাস বয়ে যায়। অর্তিহার শ্বাস ভারী হয়ে ওঠে। অর্তিহা ঢোক গিলে বলে,
— কি…কি…করছ…করছেন!
আদ্রিক আগের ভঙ্গিতেই বলে,
— ও মাই ডলি ডলি,
ইউ আর মাই ভিটামিন কি গোলি!
অর্তিহা মুহূর্তেই চোখ বন্ধ করে ফেলে। লজ্জায় অর্তিহার পুরো শরীর কেঁপে ওঠে। একদিকে আদ্রিকের এসব কথা অন্যদিকে এত কাছে খালি গা দেখে অর্তিহা লজ্জায় মরেই যাচ্ছে। অর্তিহাকে চোখ বন্ধ করতে দেখে আদ্রিক ঠোঁট চেপে হেসে ফেলে। অর্তিহার অবস্থা দেখে সে ভীষণ মজা পাচ্ছে।
আদ্রিক মুচকি হেসে বলে,
— চোখ বন্ধ করে ফেললি কেন? দেখছিস না কেন?
তাকায় না অর্তিহা। আদ্রিক অর্তিহার আরও কাছে এসে বলে,
— তাকা আমার দিকে! তাকা অর্তি!
অর্তিহা এবারও চোখ খুলে না। হঠাৎ আদ্রিক জোরে বলে,
— এই অর্তি, আমার টাওয়াল খুলে গেলো!
ভয়ে অর্তিহা তড়িঘড়ি চোখ খুলে নিচের দিকে তাকায়। দেখে, আদ্রিকের টাওয়াল একদম ঠিকই আছে। অর্তিহা চোখ তুলে তাকাতেই আদ্রিকের বাকা হাসি চোখে পড়ে। অর্তিহা বুঝে যায়, চোখ খুলানোর জন্যই আদ্রিক মিথ্যে বলেছে।
আদ্রিক বাকা হেসে বলে,
— টাওয়াল খুলে গেছে শুনে নিচের দিকে তাকালি কেন?
অর্তিহা কাঁপা গলায় বলে,
— আপনিই তো বললেন টাওয়াল খুলে গেছে! এজন্য আমি দেখতে…
বলতে বলতেই থেমে যায়। আদ্রিক ভ্রু উঁচিয়ে বাকা হাসিতে বলে,
— কি দেখতে চাচ্ছিলি তুই?
অর্তিহা লজ্জায় চুপ হয়ে যায়। মুখ ঘুরিয়ে জোর কণ্ঠে বলে,
— কিছু না!
আদ্রিক হেসে বলে,
— আমি কিন্তু ঠিকই বুঝেছি অর্তি! তুই দেখতে চাইছিস? ওকে, খুলে দেখাচ্ছি!
অর্তিহা পাল্টা চমকে ওঠে। দ্রুত মাথা নাড়িয়ে আদ্রিকের বুকে হাত রেখে বলে,
— না না, প্লিজ!
আদ্রিক প্রথমে তার বুকে থাকা অর্তিহার হাতটা দেখে। তারপর অর্তিহার দিকে তাকিয়ে বাকা হেসে বলে,
— অর্তি, তুই কিন্তু আমাকে বেড টাচ করছিস!
অর্তিহা তড়িঘড়ি করে হাত সরিয়ে নিজের বুকে চেপে ধরে মিইয়ে যাওয়া কণ্ঠে বলে,
— তাহলে আপনি সরে দাঁড়ান!
আদ্রিক মাতাল চোখে তাকিয়ে আকুল সুরে গেয়ে ওঠে,
— অভদ্র হয়েছি আমি তোমারি প্রেমে, তাই কাছে আসো না আরো কাছে আসো না।
অর্তিহা কাঁপা গলায় কিছু বলতে যায়। কিন্তু তার আগেই আদ্রিক তর্জনী ঠোঁটে চেপে ধরে বলে,
— শ্শ্… কথা বোলো না, কোনো কথা বোলো না।
অর্তিহা কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলে,
— আমি কিন্তু কেঁদে দিবো!
আদ্রিক হালকা মুচকি হেসে বলে,
— অকারণে কাঁদবি কেন? আয়, তোকে ব্যালিড রিজনে কাঁদায়!
অর্তিহা দ্রুত বলে ওঠে,
— না না, আমি কাঁদছি না! আর কাঁদবোও না! আপনি একটু সরে দাঁড়ান! আমার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে!
আদ্রিক কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সরে দাঁড়ায়। অর্তিহা গভীর শ্বাস ফেলে।
— এখন ঠিক আছে?
অর্তিহা হালকা মাথা নেড়ে হ্যাঁ বোঝায়।
— তোর শ্বাস কেন বন্ধ হয়ে যায়, আমি কাছে আসলেই?
অর্তিহা মাথা নিচু রেখে তাকায়, কিন্তু কিছু বলে না। আদ্রিক ঘুরে কাভার্ডের দিকে যায়, কাপড় বের করতে বের করতে বলে,
— বাই দা ওয়ে, বেবিডল, হানিমুনে কোথায় যাবে?
হানিমুনের নাম শুনে অর্তিহার শরীর কেঁপে ওঠে। ঘাম আবার ছুটতে শুরু করে কিন্তু অর্তিহা কিছু বলে না।
আদ্রিক হেসে বলে,
— আপাতত যেহেতু আমার বেবিডল প্রেগন্যান্ট, তাই দূরে কোথাও যাচ্ছি না!
— যেখানে আমি প্রেগন্যান্ট, সেখানে হানিমুনের কথা আসে কোথা থেকে?
আদ্রিক অর্তিহার দিকে তাকিয়ে বলে,
— বাহ! আমার বেবিডল কথা বলছে!
অর্তিহা আবার চুপ হয়ে যায়। আদ্রিক বলে,
— প্রেগন্যান্ট বানিয়েছি ঠিক আছে, তবে সেটা বাসরের মধ্যে পড়েছে। যেহেতু হানিমুন করিনি, তাই হানিমুনে যাবো।
আদ্রিক থেমে অর্তিহাকে জিজ্ঞেস করে,
— বুঝেছিস?
অর্তিহা কোনো উত্তর দেয় না। আদ্রিক সোফায় বসে প্যান্ট পরতে থাকে। অর্তিহা লজ্জায় দ্রুত চোখ সরিয়ে নেয়। প্যান্ট পড়া শেষে আদ্রিক দাঁড়িয়ে চেইন লাগাতে থাকে।
অর্তিহা চিন্তিত কন্ঠে বলে,
— বিয়ে তো হলো, এখন বেবি…
আদ্রিক গায়ে শার্ট পড়তে পড়তে বলে,
— অর্তি, আপাতত যেটা পেটে আছে, সেটা আগে বের হওয়া উচিত। তারপর আরেকটার জন্য এপ্লাই করবো। সময় তো শেষ হয়ে যাচ্ছে, বেবিডল! এখন আরেকটা বেবি সম্ভব না।
অর্তিহা চোখমুখ কুচকে ফেলে। সে বলতে চেয়েছে একটা কথা, কিন্তু আদ্রিক তা অন্য দিকে ঘুরিয়ে বাজে কথা করছে। অর্তিহা বিরক্ত হয়ে বলে,
— আমি বলছিলাম, বেবির কথা বাসায় কখন জানাবেন?
— জানাবো যখন ইচ্ছে হবে।
— আপনার সেই ইচ্ছে কখন হবে?
— বলতে চাচ্ছি না।
অর্তিহার রাগ বেড়ে যায়। অর্তিহা কিছুটা রেগে বলে,
— এমন গা ছাড়া ভঙ্গিতে উত্তর দিচ্ছেন কেন?
আদ্রিক স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,
— তুই গা ছাড়া ভঙ্গিতে যে চলছিস?
আদ্রিকের কথায় অর্তিহা হতবাক হয়ে যায়।
— আমি গা ছাড়া ভঙ্গিতে চলছি? কি করেছি আমি?
— বাসর রাতে যে গিফটগুলো দিয়েছিলাম, তারপর লাগেজগুলো খুলে দেখেছিস?
অর্তিহা আস্তে করে উত্তর দেয়,
— না!
— বরের প্রতি কোনো খেয়াল নেই তাই না? বর যে জিনিসগুলো পছন্দ করে আনলো, মানুষ তো কৌতূহল থেকেও একবার দেখতে চায়।
— এগুলো কথা মাথায় ছিলো না!
আদ্রিক আর বেশি কথা বাড়ায় না। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রেডি হতে হতে বলে,
— কালকে ডক্টরের কাছে যাবো তোকে চেক-আপ করাতে।
— বাসায় সবাইকে কি বলবেন?
— আমি আমার বউকে নিয়ে বের হলে বাসায় বলতে হবে কেন?
— না বলে গেলে বেয়াদবি হবে।
— তো এটা আমাকে বলে কি হবে? আমি এসব মানি?
অর্তিহা চুপ হয়ে যায়। মুখ ঘুরিয়ে বলে,
— হুম, ভুলে গেছিলাম।
আদ্রিক রেডি হয়ে অর্তিহার কাছে ঝুঁকে গালে কামড় মারে। অর্তিহা ব্যথায় আহ্ করে ওঠে। কামড়টা খুব জোরে না হলেও আস্তে অন্তত ছিলো না। নরম গালে তুলনামূলক জোরেই ছিল। অর্তিহা বুঝতেই পারেনি আদ্রিক তাকে কামড় দেবে! আদ্রিক গাল ছেড়ে মাথা তুলে হেসে তাকায় অর্তিহার দিকে।
অর্তিহা গাল চেপে ধরে বলে,
— কামড় দিলেন কেন?
আদ্রিক হেসে দাঁত দেখিয়ে বলে,
— দাঁতগুলো শিরশির করছিলো তোকে কামড় দেওয়ার জন্য!
অর্তিহা রাগে হাত ওঠিয়ে হঠাৎ আদ্রিকের দাঁতে টুকনি মারে।
আদ্রিক চোখ ছোট করে ফেলে।
— হোয়াট দা ফাচ! এটা কি হলো?
— আমার হাতও নিশপিশ করছিলো আপনার সাদা দাঁতের টুকনির জন্য!
আদ্রিক বাকা হেসে অর্তিহার মুখের কাছে মুখ নিয়ে বলে,
— ওকে, রেডি থাকিস। রাতে খেলা হবে, বেবিডল!
— কি খেলা?
— আমি কামড়, তুই টুকনি। যে যত কামড় আর টুকনি দিতে পারে!
— আমি এসব খেলায় নেই!
— ওকে, তোর খেলতে হবে না। আমি একাই খেলবো, তুই মাঠে থাকলেই হবে।
অর্তিহার কান লাল হয়ে যায় এসব কথা শুনে। লজ্জায় মিইয়ে যায়। কিন্তু আদ্রিকের চোখে কোনো লজ্জার ছাপ নেই। অর্তিহা ভেবে পায় না একটা মানুষ এতো নিলজ্জ হয় কিভাবে।
— একটু বাইরে যাচ্ছি। মেইডকে বলে দিবো রুমে লাঞ্চ পাঠাতে। খেয়ে নিস।
বলেই অর্তিহার ঠোঁটে হালকা কিস, তারপর পেটের কাছে নামিয়ে বলে,
মোহশৃঙ্খল পর্ব ২২
— মাম, পাপা বাইরে যাচ্ছি। তুমি খেয়ে নিও মাম্মার সাথে।
এরপর উঠে দাঁড়িয়ে বলে,
— গেলাম।
আদ্রিক চলে যাওয়ার পর অর্তিহা আবার গাল ঘষতে থাকে। হালকা চিনচিন ব্যথা করছে। গালে কামড়ের দাগ পড়েছে কিনা সেটা দেখার কৌতূহলে অর্তিহা আয়নার কাছে যায়। আয়নায় নিজের গাল স্পষ্ট কামড়ের দাগ দেখে!
অর্তিহা রাগে নাক ফুলিয়ে বলে,
— রাক্ষসটা একদিন আমাকে খেয়েই ফেলবে!
