Home ম্যারিড লাইফ্ ‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ১১

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ১১

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ১১
‎রঙ্গনা মৈত্র ঊর্মি

আকাশজুড়ে ঘন মেঘ। সূর্যের আলো পুরোপুরি ওঠেনি, তবু চারপাশ ফ্যাকাশে ধূসর আলোয় ভরে আছে। বাতাসে বৃষ্টির আগের গন্ধ। দূরে কোথাও মেঘ গর্জে উঠছে খুব আস্তে। গাছের পাতাগুলোও তার দিয়ে নাচছে ।
‎শেখ বাড়ির সকালও আজ কেমন শান্ত।
‎শুক্রবার বলে নিচতলায় সেই তাড়াহুড়ো নেই। দূরে মসজিদ থেকে কোরআন তিলাওয়াত ভেসে আসছে নিম্নস্বরে।
‎ইখতিয়ারদের ঘরের ভেতরটা আধো অন্ধকার।
‎জানালার পর্দা টানা নেই পুরোপুরি। মেঘলা সকালের নিস্তেজ আলো এসে পড়েছে ঘরের একপাশে।
‎মুগ্ধা এখনো ঘুমিয়ে।
‎রাতের কান্না যেন মুখের উপরই রয়ে গেছে।
‎ইখতিয়ার রাত অনেক দেরিতে ঘরে ফিরেছিল।ছাদে কতক্ষণ ছিল— সে নিজেও জানে না।

‎ঘরে ঢুকেই প্রথমে সে মুগ্ধাকে দেখতে পায়নি ঠিকমতো।
‎লাইট জ্বলছিল শুধু টেবিল ল্যাম্পের। সেই ম্লান আলোয় মুগ্ধাকে দেখে তার বুক কেমন থেমে গিয়েছিল এক মুহূর্ত। মেয়েটা টেবিলেই ঘুমিয়ে পড়েছে। অস্বস্তিকরভাবে।
‎গালটা হাতের উপর চেপে আছে। চুল এলোমেলো হয়ে মুখ ঢেকে ফেলেছে অর্ধেক। চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট।
‎ইখতিয়ার অনেকক্ষণ দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল। নিঃশব্দে।
‎তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এসেছিল কাছে।
‎টেবিলের উপর রাখা কাগজটা চোখে পড়েছিল তার। সে পড়েনি।
‎শুধু একবার তাকিয়েছিল। তারপর চোখ চলে গিয়েছিল মুগ্ধার দিকে। কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল এভাবে— হিসেব নেই। হয়তো আধা ঘণ্টা। মেয়েটার মুখে প্রচুর মায়া।

‎ঘরের বাইরে তখন রাত গভীর হচ্ছিল। দূরে কুকুর ডাকছিল মাঝে মাঝে। সিলিং ফ্যানের শব্দ ছাড়া পুরো ঘর নিস্তব্ধ। ইখতিয়ার ধীরে হাত বাড়িয়ে মুগ্ধার কপালের উপর পড়ে থাকা চুল সরিয়ে দিয়েছিল।
‎খুব সাবধানে। যেন ঘুম না ভেঙে যায়। তারপর কিছুক্ষণ স্থির চোখে তাকিয়ে ছিল। এই মেয়েটা এত কাঁদল কেন? শুধু একটা পুরোনো চিঠির জন্য?
‎নাকি… তার জন্য?
‎ভাবনাটা মাথায় আসতেই ইখতিয়ার ধীরে চোখ নামিয়ে নিয়েছিল। তার বুকের ভেতর কেমন চাপা ভার জমছিল।
‎সে কখনো কাউকে নিজের জীবনের এত কাছে আনতে চায়নি। কিন্তু মুগ্ধা অদ্ভুতভাবে সব এলোমেলো করে দিচ্ছে।
‎তার শান্ত, নিয়ন্ত্রিত জীবনের ভেতর শব্দ তুলে ফেলছে। ইখতিয়ার খুব আস্তে মুগ্ধাকে কোলে তুলে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছিল। মুগ্ধা ঘুমের মধ্যেই কেঁপে উঠেছিল সামান্য। ভ্রু কুঁচকে গিয়েছিল হালকা।
‎ইখতিয়ারের হাত থেমে গিয়েছিল এক মুহূর্ত।তারপর ধীরে কম্বল টেনে দিয়েছিল গায়ে। নিজে আর বিছানায় শোয়নি। দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে মেঝেতেই বসেছিল।
‎চোখ বন্ধ করেছিল শুধু। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল বুঝতেই পারেনি।

‎সকালে ঘুম ভাঙতেই আকাশ আরও মেঘলা।
‎ঘড়িতে তখন সাতটা পেরিয়েছে একটু। ইখতিয়ার ধীরে চোখ খুলল। ঘাড়ে ব্যথা জমেছে। সামনে বিছানায় মুগ্ধা এখনো ঘুমিয়ে। মুখটা শান্ত। তবে কান্নার ক্লান্তি এখনো রয়ে গেছে চোখের চারপাশে।
‎ইখতিয়ার কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল।
‎তারপর ধীরে উঠে দাঁড়াল।
‎আজ শুক্রবার।
‎সাধারণত এইদিন সে একটু দেরি করে ঘুমায়। বাসায় থাকে। কাজের চাপ না থাকলে কোথাও বেরও হয় না। তবু আজ যেন ঘরের ভেতর থাকতে পারছে না। অদ্ভুত দমবন্ধ লাগছে।

‎সে আলমারি খুলে দ্রুত কাপড় বদলাল। তারপর টেবিলের ড্রয়ার থেকে কিছু কাগজপত্র বের করল।
‎ফাইলের পাতাগুলো গুছাতে গুছাতে একবার চোখ গেল মুগ্ধার দিকে।
‎শুধু ধীরে শ্বাস নিয়ে চোখ সরিয়ে নিল।
‎মুগ্ধা তখনও ঘুমিয়ে।
‎জানালার বাইরে হাওয়া একটু জোরে বইতে শুরু করেছে। মেঘে ঢেকে গেছে পুরো আকাশ। মনে হচ্ছে যেকোনো সময় বৃষ্টি নামবে।
‎ইখতিয়ার দরজার কাছে গিয়ে আবার থামল।
‎পেছনে ফিরে তাকাল একবার। ঘুমন্ত মুগ্ধা। এলোমেলো চুল। ভেজা চোখের ক্লান্তি। তার বুকের ভেতর আবার সেই চাপা টানটা অনুভব হলো।
‎কিন্তু কিছু না বলে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল সে।
‎শুধু ঘরজুড়ে রয়ে গেল মেঘলা সকালের নিঃশব্দ ভার।

‎ইখতিয়ারের যাওয়ার পরপরই মুগ্ধা হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে বসে। চোখ কুঁচকে চারপাশটা ভালো করে দেখে সে। মাথাটা ভারী লাগছে, একটু ঝিমঝিম করছে। মনে হচ্ছে যেন অনেকক্ষণ গভীর ঘুমে ছিল, হঠাৎ করেই টেনে তোলা হয়েছে। সে চেষ্টা করে মনে করতে—সে তো টেবিলের উপরেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। তাহলে এখানে বিছানায় এলো কীভাবে?
‎মুগ্ধা ধীরে ধীরে উঠে বসে। ঘরের চারপাশ একবার দেখে নেয়। অস্বাভাবিক নীরবতা তাকে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। পাশে তাকাতেই বুঝতে পারে—ইখতিয়ার নেই। বুকের ভেতর অচেনা এক ধাক্কা লাগে। তাহলে কি সে কাল রাতে ঘরে আসেনি? যদি আসত, তাহলে তো ঘরেই থাকত। শুক্রবারে সে সাধারণত আটটার আগে ওঠেই না। তার রুটিন খুবই নির্দিষ্ট, বদলায় না বললেই চলে।

‎মুগ্ধা ধীরে ধীরে পা ফেলে ওয়াশরুমের দিকে যায়। মাথার ঝিমঝিম ভাবটা কাটানোর জন্য মুখে পানি দেয়। দাঁত ব্রাশ করতে গিয়ে হঠাৎ থেমে যায় সে।
‎ইখতিয়ারের ব্রাশটা ভেজা।
‎এক মুহূর্তের জন্য সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। চোখে বিস্ময়। ব্রাশের ব্রিসলে এখনো পানি লেগে আছে, যেন অল্প কিছুক্ষণ আগেই ব্যবহার করা হয়েছে। এই ছোট্ট জিনিসটাই তার সব প্রশ্নের উত্তর একদিকে নিয়ে যায়—সে এসেছিল।
‎সে এসেছিল, কিন্তু সে কিছুই বুঝতে পারেনি।
‎মুগ্ধার বুকের ভেতর একধরনের খারাপ লাগা জমে ওঠে। সে এখানে ছিল, অথচ সে টেরই পেল না। কোনো কথা হলো না, কোনো দেখা হলো না। এসে আবার চলে গেছে—একটা ছায়ার মতো, নিঃশব্দে।
‎সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে। চোখে ঘুমের ভার, মুখে ক্লান্তি। কিন্তু তার ভেতরের অস্বস্তিটা ঘুম নিয়ে নয়—এটা অন্য কিছু। দূরত্বের অনুভূতি। কাছাকাছি থেকেও যেন অনেক দূরে থাকার অনুভূতি।
‎মুগ্ধা ধীরে ধীরে ঘরে ফিরে আসে। একবার পুরো ঘরটা ভালো করে দেখ।
‎বিছানার একপাশটা খালি। সেই অংশটা আজ অদ্ভুতভাবে ফাঁকা ফাঁকা লাগছে তার কাছে।
‎সে চুপচাপ বিছানার কিনারায় বসে পড়ে। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে নিজের অজান্তেই। মনটা খারাপ হয়ে যায়, কিন্তু সেটা রাগ না—একটা অদ্ভুত শূন্যতা। একটু অভিমান, একটু না বলা কষ্ট, আর অল্প একটু অপেক্ষা।

সকালের আলোটা তখনও পুরোপুরি ঘরে ঢোকেনি। হালকা এক ধরনের শান্ত পরিবেশ চারপাশে ছড়িয়ে আছে।
‎মুগ্ধা ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামে। প্রতিটি ধাপে তার মনটা একটু একটু করে ভারী হতে থাকে। মাথার ভেতরে অনেক চিন্তা, কিন্তু মুখে কোনো কথা নেই।
‎নিচে এসে সে দেখে—ইশতিয়াক আর ইসরাফিল শেখ ইতিমধ্যেই বাজারে চলে গেছেন। তাদের যাওয়ার কথা আগেই শুনেছিল, তবুও ঘরটা ফাঁকা লাগছে তাদের অনুপস্থিতিতে। সোফার এক কোণে রহিমা বসে আছেন। পাশে রাফেয়া আর ইন্তিয়া গল্প করছে খুব হালকা স্বরে। টিভি চললেও কেউ খুব মনোযোগ দিচ্ছে না। আর একটু দূরে ইসরায়েল শেখ বসে আছেন, কাগজপত্রের মতো কিছু একটা দেখছেন।
‎মুগ্ধা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে দরজার কাছেই। যেন বুঝে নিচ্ছে—কোথায় যাবে, কাকে আগে দেখবে, কী বলবে। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। কারও পাশে গিয়ে চুপচাপ বসে পড়ে।
‎কিছুক্ষণ কেউ খেয়াল করে না তার আগমন।তারপর রাফেয়া প্রথমে তাকায়।

‎“ওহ, মুগ্ধা, উঠেছো?”
‎মুগ্ধা হালকা মাথা নাড়ে।
‎ “হ্যাঁ।”
‎তার গলায় খুব বেশি শক্তি নেই। কথাগুলো যেন ভেতর থেকে আসছে না, শুধু অভ্যাসের মতো বের হচ্ছে।
‎ইসরায়েল শেখ পত্রিকা নামিয়ে তার দিকে তাকান। “কি হয়েছে? মুখটা এমন কেন?”
‎মুগ্ধা একটু থামে। তারপর ধীরে বলে,
‎ “একটা কথা ছিল…আব্বু”
‎ঘরের সবাই একটু নড়েচড়ে বসে। মনোযোগ তার দিকে চলে আসে। মুগ্ধা হাতের আঙুলগুলো একে অপরের সাথে জড়িয়ে নেয়। তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করে—
‎“আমার দুই মাস পর পরীক্ষা। এখন সময়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ। পড়াশোনার অনেক চাপ। কিন্তু এখানে… আমি ঠিকভাবে পড়তে পারছি না।”
‎একটু থামে সে। শব্দগুলো গুছিয়ে নিতে চেষ্টা করে।
‎“সবাই আমাকে খুব ভালোবাসে, খুব খেয়াল রাখে। কিন্তু আমি হয়তো একটু শান্ত পরিবেশ চাই। তাই আমি ভাবছিলাম… এই দুই মাস আমি বাপের বাড়ি থাকলে ভালো হয়।”

‎ঘরে এক মুহূর্ত নিস্তব্ধতা নেমে আসে।
‎ইন্তিয়া ভ্রু কুঁচকে তাকায়।
‎ “হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত কেন? কোনো সমস্যা হয়েছে?”
‎মুগ্ধা মাথা নিচু করে।
‎ “না, সমস্যা না। শুধু পড়াশোনার জন্য।”
‎রফেয়া একটু নরম গলায় বলেন,
‎“ইখতিয়ার জানে?”
‎এই প্রশ্নটা শোনার সাথে সাথে মুগ্ধা একটু স্থির হয়ে যায়। চোখের সামনে একটা মুহূর্ত ভেসে ওঠে—
‎সে ধীরে বলে,
‎“হ্যাঁ, জানে।”
‎মিথ্যে বলে মুগ্ধা। তার তো ইখতিয়ার কে দেখার সৌভাগ্য ই হয়নি। কথাটা বলার পর তার গলায় কোনো কম্পন থাকে না, কিন্তু চোখে একটা ভারী চাপ জমে থাকে।
‎ইসরায়েল শেখ একটু চিন্তিতভাবে বলেন,
‎“ঠিক আছে, যদি দুজনেরই ঠিক থাকে তাহলে সমস্যা নেই। কিন্তু হঠাৎ করে না জানিয়ে গেলে তো…”
‎মুগ্ধা দ্রুত বলে,

‎ “আমি জানিয়েছি।”
‎তার কণ্ঠে এবার একটু দৃঢ়তা আসে। যেন নিজের সিদ্ধান্তটা সে ধরে রাখতে চায়।
‎কিছুক্ষণ সবাই চুপ থাকে। তারপর ইসরাফিল শেখের না থাকার কারণে সিদ্ধান্তটা সহজ হয়ে যায়। কেউ আর খুব বেশি আপত্তি তোলে না। শেষ পর্যন্ত সবাই একভাবে মাথা নাড়ে।
‎“ঠিক আছে, যদি পড়াশোনার সুবিধা হয় তাহলে যাও।”
‎এই কথাটুকু শোনার পর মুগ্ধা চোখ নামিয়ে ফেলে। ভেতরে কোনো আনন্দ নেই, শুধু একটা অদ্ভুত স্বস্তি আর শূন্যতা একসাথে মিশে থাকে।
‎ঠিক তখনই হঠাৎ ইসরায়েল শেখের ফোন বেজে ওঠে। তিনি ফোন তুলে একটু দূরে যান। কিছুক্ষণ কথা শোনার পর আবার ঘরে ফিরে আসেন।
‎“রেজোয়ান তালুকদার ফোন করেছিল,”
‎তিনি বলেন।

‎“বলছে সে বাড়ির মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুগ্ধা যাবে কি এখন?”
‎ঘরের পরিবেশ একটু দ্রুত বদলে যায়। সিদ্ধান্ত যেন আর অপেক্ষা করতে চায় না।
‎ইসরায়েল শেখ কি ভাবলেন । ইশারা করলেন সবাইকে। উঠে দাঁড়ালেন। বললেন,
‎ “চলো, আমি দিয়ে আসি।”
‎মুগ্ধা একটু চমকে যায়।
‎ “আচ্ছা?”
‎“হ্যাঁ,।”
‎মুগ্ধা ধীরে ধীরে মাথা নাড়ে।সে উঠে দাঁড়ায়। ঘরের ভেতর একবার চারপাশ দেখে। তারপর ধীরে ধীরে নিজের ঘরের দিকে যায়।
‎উপরে ওঠার সময় তার প্রতিটি পদক্ষেপ ভারী লাগে। যেন পা আর শরীর একসাথে কাজ করছে না। ঘরে ঢুকে সে খুব ধীরে ধীরে জিনিসপত্র গোছাতে শুরু করে। বই, কিছু কাপড়, প্রয়োজনীয় কাগজ—সবকিছু খুব যত্ন নিয়ে ব্যাগে রাখে।
‎কিন্তু তার মন কোথাও নেই। মনটা যেন বারবার পিছনের ঘরে ফিরে যাচ্ছে।
‎কিছুক্ষণ পর সে ব্যাগ নিয়ে আবার নিচে নামে।
‎নিচে সবাই অপেক্ষা করছে। রাফেয়া উঠে দাঁড়ায়। “খেয়াল রেখো নিজের।”
‎ইন্তিয়া এগিয়ে এসে বলে, “, তাড়াতাড়ি ফিরে এসো, আমাদের মন খারাপ করবে কিন্তু আম্মু ।”
‎মুগ্ধা হালকা করে হাসে।
‎,“হ্যাঁ, আসব।”
‎রহিমা ধীরে ধীরে তার কাছে এগিয়ে আসেন। চোখে একটা অদ্ভুত মায়া।
‎“সাবধানে যেয়ো,”
‎তিনমাসে এই দ্বিতীয় বার মুগ্ধা বাপের বাড়ি যাচ্ছে। রহিমা আবার বলেন,
‎ “শরীরের খেয়াল রেখো। যেমন বউ পাঠাচ্ছি, তেমন বউ যেন আমাদের কাছে ফিরে আসে।”

‎মুগ্ধার বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে যায়। সে কিছু বলে না। শুধু নিচু হয়ে রহিমার পা ছুঁয়ে সালাম করে।
‎রহিমা তার মাথায় হাত রাখেন।
‎ “দোয়া করি, ভালো থাকো।”
‎মুগ্ধার চোখের কোণে জল জমে আসে, কিন্তু সে সেটা পড়তে দেয় না। দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নেয়।
‎সবাই তাকে বিদায় জানায়। কেউ বলে “তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে”, কেউ বলে “খেয়াল রেখো”, কেউ শুধু চুপচাপ তাকিয়ে থাকে।
‎মুগ্ধা ব্যাগ হাতে নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। ইসরায়েল শেখ তার পাশে পাশে হাঁটেন।
‎বাইরে বেরোনোর সময় হালকা বাতাস লাগে মুখে। আকাশটা পরিষ্কার, কিন্তু মুগ্ধার ভেতরটা ভারী।
‎সে একবার পেছনে তাকায়।
‎উপরে তার ঘরের জানালাটা দেখা যায়। সেই ঘর, যেখানে কিছুক্ষণ আগেও সে ছিল। যেখানে ইখতিয়ার নেই, কিন্তু তার অনুপস্থিতি এখনো ভর করে আছে।
‎হঠাৎ তার চোখে পানি চলে আসে। এক ফোঁটা, তারপর আরেকটা—নীরবে গড়িয়ে পড়ে।

‎বাইরের উঠোনে রোদ যেন আগুনের মতো ঝরে পড়ছে। টিনের চালার ওপর তাপ কাঁপছে, দূরের গাছের পাতাগুলোও যেন ক্লান্ত। কিন্তু এই সব স্বাভাবিকতার মাঝেও ভেতরের বাড়িটা একটু আলাদা—একটা অদৃশ্য শূন্যতা ঘুরে বেড়াচ্ছে, যেটা কেউ স্পষ্ট করে ধরতে পারছে না, শুধু অনুভব করছে।
‎এই সময়েই ইশতিয়াক বাড়ির ভেতরে ঢুকল।
‎“এই ভাবি নামক ছেড়ি,কামরাঙা মাখা আনছি নিয়ে যা”
‎ইন্তিয়া বেগম রান্নাঘরে থেকে বেরিয়েলেন। বললেন,
‎”মুগ্ধা আব্বুর ওখানে গেছে,”
‎”ও আচ্ছা ”
‎সে আর কিছু জানতে চাইল না । সে বুঝেছে কিছু না কিছু ঝামেলা হয়েছে। সোজা নিজের ঘরে চলে গেল।

‎ কিছুক্ষণ পর বাড়িতে ঢুকল ইখতিয়ার।
‎সে তখন পুরো ঘামে ভেজা। গলায় রোদে পোড়া ক্লান্তি, শার্ট শরীরের সাথে লেগে আছে, চুল এলোমেলো। বাইরে টানা রোদে দীর্ঘ সময় কাটানোর ছাপ তার পুরো শরীরে।
‎কিন্তু তার চেয়ে বেশি স্পষ্ট ছিল তার চোখ—অস্থির, দ্রুত খুঁজে চলছে কিছু।
‎সে এক মুহূর্তও দেরি করল না। সোজা উপরের দিকে উঠে গেল।
‎সিঁড়ির প্রতিটি ধাপে তার ভেতরের অস্থিরতা যেন বাড়ছিল। প্রতিটি পা ফেলায় মনে হচ্ছিল, কিছু একটা তার সামনে হারিয়ে যাচ্ছে।
‎উপরে উঠে প্রথমেই সে ঘরের দরজার দিকে তাকাল। খোলা। সে থমকে গেল।

‎ঘরটা গোছানো। বিছানা টানটান, বালিশ ঠিক জায়গায়, কোথাও কোনো এলোমেলো ভাব নেই। যেন কেউ খুব যত্ন করে সবকিছু গুছিয়ে রেখে গেছে। কিন্তু মুগ্ধা নেই।
‎তার চোখ এক মুহূর্তে স্থির হয়ে গেল।
‎সে ধীরে ধীরে পুরো ঘরটা খুঁজে দেখল—বারান্দা, ওয়াশরুম, পাশের ঘর। কোথাও না।
‎এক ধরনের চাপা শূন্যতা তার বুকের ভেতর নেমে এল, কিন্তু মুখে সেটা প্রকাশ পেল না।
‎ঠিক তখনই ইন্তিয়ার কণ্ঠ শোনা গেল নিচ থেকে।
‎ইখতিয়ার নিচে নামল।
‎ইন্তিয়া সোফার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,
‎”আম্মু মুগ্ধা কই?”
‎“তুই জানিস না? ও তো দুই মাসের জন্য বাপের বাড়ি গেছে, ও যে বলল তোরে বলেছে।”

‎এক মুহূর্ত।
‎শুধু এক মুহূর্তে পুরো পৃথিবী যেন থেমে গেল ইখতিয়ারের।
‎ইখতিয়ারের চোখ স্থির হয়ে গেল, কিন্তু সে সেটা প্রকাশ করতে দিল না। মুখটা আগের মতোই রেখে দিল—নরম, নিরপেক্ষ, যেন সে আগে থেকেই জানে।
‎“আচ্ছা,”
‎—শুধু এই একটা শব্দ আওড়ালো। আর শক্তি নেই। শব্দ নেই।
‎তারপর আর কিছু না বলে সে আবার উপরের দিকে চলে গেল। কিন্তু তার ভেতরের কিছু একটা তখনই ভেঙে পড়ছিল।
‎ঘরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করল।
‎“ঠাস!”
‎শব্দটা বন্ধ দরজার ভেতরে আটকে গেল।
‎ঘরটা যেন হঠাৎ ছোট হয়ে গেল, বাতাস ভারী হয়ে উঠল। ইখতিয়ার কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল।
‎তারপর ধীরে ধীরে বিছানার দিকে এগোল।
‎চোখ তার পড়ল বালিশের পাশে রাখা একটা কাগজে। সে সেটা তুলল।

‎হাতের মধ্যে কাগজটা যেন অস্বাভাবিক ভারী লাগছিল। সাহস নেই যেন তার পড়তে। তবু পড়ল।
‎চিঠিটা পড়ার সাথে সাথে তার চোখ থমকে গেল।
‎একবার পড়ল। তারপর আবার।
‎প্রতিটি শব্দ যেন তার বুকের ভেতর গেঁথে যাচ্ছিল।
‎তার আঙুল কেঁপে উঠল। কাগজটা ধীরে ধীরে হাত থেকে নেমে গেল। মুগ্ধা তাকে ভালোবেসে ফেলেছে এটা তার অজানা নয় তবে এই চিঠির মানে কি? সে কি হারিয়ে ফেলল শেষ অবলম্বনটাও?
‎হাৎ ই উঠে দাঁড়ালো ইখতিয়ার। তাকালো পুরো ঘরজুড়ে। ঘরের প্রতিটি জিনিস তার চোখে যেন অপরিচিত হয়ে উঠল।
‎বিছানা,টেবিল,আলমারি,সবকিছু।
‎ পরিচিত ঘরটা মুহূর্তেই তার কাছে অচেনা হয়ে গেল।
‎সে হঠাৎ টেবিলের বইগুলো এক ঝটকায় ফেলে দিল। বইগুলো ছড়িয়ে পড়ল মেঝেতে, পাতাগুলো উল্টে উল্টে শব্দ করল।

‎তারপর আলমারির দরজা খুলে কাপড়গুলো টেনে বের করল—একটার পর একটা, রাগে, অস্থিরতায়।
‎কিছুই গুছিয়ে ফেলার চেষ্টা নেই—শুধু ভাঙা, ছড়ানো, এলোমেলো।
‎ঘরটা ধীরে ধীরে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছিল যেন। এখন এই ঘরে কেউ ঢুকলে চিনতে পারত না এটা ইকতিয়ারের ঘর! সব তছনছ! লন্ডভন্ড।
‎কিন্তু ইখতিয়ারের ভেতরের অস্থিরতা তবুও কমছিল না।
‎সে থেমে গেল হঠাৎ। দুই হাত মুঠো করে ধরল।
‎শ্বাস ভারী। তারপর ধীরে ধীরে দেয়ালের দিকে তাকাল। একটা মুহূর্তের দ্বিধা নেই।
‎একটা জোরে ঘুষি। দেয়ালে ধাক্কা লাগার শব্দটা যেন পুরো ঘরের ভেতর কেঁপে উঠল।
‎তার হাত থেমে গেল না। অনবরত দেয়ালে আঘাত করল। রক্ত বের হতে শুরু করল।
‎লাল রংটা ধীরে ধীরে তার আঙুল বেয়ে নামতে লাগল।
‎কিন্তু সে তাকাল না। না ব্যথায়, না রক্তে। সে ধীরে ধীরে মাটিতে বসে পড়ল। ঘরের মাঝখানে।

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ১০

‎তার মাথা নিচু। চুল দু’হাতে শক্ত করে ধরে আছে। খামচে ধরেছে। যেন চুলের গোড়া আগলা হলো বলে। অস্পষ্ট স্বরে আওড়ালো,
‎“আই হেট ইউ ইখতিয়ার, আই হেট মাইসেল্ফ, ইউ আর আ্যা গুড ফর নাথিং, ইউ কান্ট ডিজার্ভ এনি ওয়ান, ইউ আর আ্যা লুজার, লুজার!!”
‎চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। কাঁদল বোধ হয়। কেন? মুগ্ধার জন্য? নাকি নিজের জন্য?

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ১২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here