Home ম্যারিড লাইফ্ ‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ১২

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ১২

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ১২
‎রঙ্গনা মৈত্র ঊর্মি

যখন দুপুরের রোদ একটু নরম হতে শুরু করেছে, শহরতলির পুরোনো রাস্তা পেরিয়ে সাদা গাড়িটা ধীরে ধীরে এসে থামে তালুকদার বাড়ির সামনে। বড় লোহার গেটটার গায়ে এখনো সেই পুরোনো রঙের ছাপ, সামনের বাগানে জবা আর শিউলি গাছগুলো আগের মতোই দাঁড়িয়ে আছে। হালকা বাতাসে পাতাগুলো দুলছে। বাড়িটা দেখলেই একটা পরিচিত গন্ধ মনে আসে—শৈশবের, নিরাপত্তার, নিজের মানুষের।
‎গাড়ি থামতেই ভেতর থেকে দরজা খুলে বেরিয়ে এল আয়েশা।
‎মেয়েকে দেখার জন্য সেই সকাল থেকেই বসে ছিল সে। বারবার ঘড়ি দেখেছে, বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, আবার ভেতরে এসেছে। যেন এতদিন পর তার বুকের একটা অংশ ফিরে আসছে।
‎মুগ্ধা গাড়ি থেকে নামতেই আয়েশা আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

‎“মুগ্ধা মা!”
‎ডাকটা কেমন কেঁপে গেল।
‎মুগ্ধা তাকাতেই আয়েশা দ্রুত এগিয়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল। এমনভাবে, যেন একটু ঢিলে করলেই মেয়েটা আবার দূরে চলে যাবে।
‎“আল্লাহ… আমার মেয়েটা…”
‎গলাটা ধরে এল তার।
‎মুগ্ধা প্রথমে একটু স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তারপর ধীরে ধীরে সেও মাকে জড়িয়ে ধরল। পরিচিত সেই গন্ধ—মায়ের শরীরের, আঁচলের, নিরাপত্তার—মুহূর্তেই বুকের ভেতর জমে থাকা শক্ত পাথরটাকে নরম করে দিল।
‎আয়েশা চোখ মুছতে মুছতে বলল,

‎“কত শুকায়ে গেছিস রে… ঠিকমতো খাস না?”
‎মুগ্ধা হালকা হাসল।
‎“এই তো আছি।”
‎কিন্তু সেই হাসির ভেতরেও ক্লান্তি ছিল। পেছনে দাঁড়িয়ে পুরো দৃশ্যটা দেখছিল রেজোওয়ান তালুকদার। মুখে শান্ত একটা হাসি। মেয়েকে দেখে তার চোখেও আলাদা একটা প্রশান্তি ফুটে উঠেছে, যদিও তিনি সেটা খুব একটা প্রকাশ করলেন না।
‎“যাক,বাড়িটা আবার একটু মানুষ মানুষ লাগতেছে।”
‎—হালকা গলায় বললেন তিনি। মুগ্ধা তাকিয়ে নরম করে হাসল।
‎বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই সেই পুরোনো অনুভূতিটা তাকে ঘিরে ধরল। পরিচিত দেয়াল, পরিচিত গন্ধ, পরিচিত শব্দ। রান্নাঘর থেকে সেই পরিচিত গন্ধ আসছে, কোথাও একটা ফ্যান ঘুরে কটকট শব্দ করছে, দূরে কারো বাসার টিভির আওয়াজ ভেসে আসছে। সবকিছু এত চেনা! এত আপন!

‎আয়েশা তার গাল ছুঁয়ে বলল,
‎“যা, আগে ফ্রেশ হয়ে আয়। তারপর খেতে দিব।”
‎মুগ্ধা মাথা নাড়ল।
‎“স্নিগ্ধা?”
‎“কলেজে গেছে। আসতে একটু দেরি হবে।”
‎মুগ্ধা ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে লাগল।
‎প্রতিটি ধাপ যেন তাকে একটু একটু করে পুরোনো সময়ে ফিরিয়ে নিচ্ছে। নিজের ঘরের সামনে এসে সে থেমে গেল। দরজাটা আধখোলা।
‎সে ধীরে ধীরে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
‎আর মুহূর্তেই বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল।
‎ঘরটা একদম আগের মতোই আছে। ঠিক যেমনটা সে বিয়ের আগে রেখে গিয়েছিল।
‎জানালার পাশে ছোট বুকশেলফটা এখনো একই জায়গায়। টেবিলের ওপর তার পুরোনো কলমদানি, কিছু বই, দেয়ালে ঝোলানো ছোট্ট ফেইরি লাইট। বিছানার চাদরটাও পরিচিত—হালকা আকাশি রঙের, ছোট ছোট সাদা ফুল আঁকা।

‎জানালার পাশে পাতলা পর্দা হালকা বাতাসে দুলছে। রোদেলা উষ্ণ আলো এসে ঘরের মেঝেতে নরম ছায়া ফেলেছে।
‎ঘরের একটা আলাদা গন্ধ আছে—পুরোনো বই, ট্যালকম পাউডার আর মুগ্ধার নিজের অস্তিত্বের মিশ্রণ।
‎মুগ্ধা ধীরে ধীরে ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। তার মনে হল, যেন সময় এখানে থেমে আছে।
‎সে শুধু বদলে গেছে।
‎ধীরে ধীরে আলমারির সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
‎আলমারি খুলতেই সারি সারি জামাকাপড় চোখে পড়ল। কত রঙের, কত ডিজাইনের। কিছু হয়তো বহুদিন পর দেখছে। আয়েশা সব যত্ন করে গুছিয়ে রেখেছে। একটা নরম কটন গেঞ্জি বের করল সে। সঙ্গে একটা প্লাজু।

‎কাপড়গুলো হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
‎এগুলোই তো সে পরত সবসময়। এই ঘরে, এই বাড়িতে, এই জীবনে। কত সহজ ছিল সব।
‎ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এল কিছুক্ষণ পর।
‎ভেজা চুল কাঁধ ছুঁয়ে আছে। পরনে ঢিলেঢালা গেঞ্জি আর প্লাজু। গলায় হালকা করে একটা ওড়না ঝুলিয়ে নিয়েছে অভ্যাসবশত।
‎আয়নার সামনে এসে দাঁড়াতেই সে নিজেকে কিছুক্ষণ দেখল। ঠিক আগের সেই মুগ্ধা। একই মুখ। একই চোখ। একই এলোমেলো ভেজা চুল।
‎শুধু কয়েকটা জিনিস বদলেছে। নাকের ছোট্ট অলংকার। আর তার জীবনে ইখতিয়ারের উপস্থিতি।
‎এই দুটোই যেন নতুন। বাকিটা সব আগের মতো।
‎কিন্তু তবুও কোথাও একটা অদৃশ্য পরিবর্তন আছে।
‎আগের মুগ্ধা এত চুপচাপ ছিল না। তার চোখে এমন ভারী নীরবতা ছিল না। এমন চাপা কষ্টও ছিল না। সে ছিল চঞ্চল, উড্ডীন ঠিক যেন চড়ুইপাখির।

‎সে ধীরে ধীরে বিছানায় গিয়ে বসে পড়ল।
‎হাত বাড়িয়ে বালিশটা ছুঁল। মনে পড়ল কত রাত এখানে শুয়ে ফোনে গল্প করেছে স্নিগ্ধার সাথে। কত হাসাহাসি, কত প্ল্যান, কত ছোট ছোট স্বপ্ন।
‎আর এখন?
‎এখন তার ভেতরে অন্য একজন মানুষ বাস করে।
‎যে মানুষটার উপর রাগ করে, অভিমান করে, অপেক্ষা করে। ইখতিয়ার।
‎নামটা মাথায় আসতেই বুকের ভেতর হালকা টান লাগল। সে দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল আয়না থেকে।
‎জানালার বাইরে তাকাল।
‎বিকেলের আলো ধীরে ধীরে নরম হচ্ছে। দূরে পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। সবকিছু এত শান্ত।
‎কিন্তু এই শান্তির মাঝেও তার ভেতরে একটা মানুষ নিঃশব্দে রয়ে গেছে।
‎যাকে সে পিছনে ফেলে এসেছে।
‎তবুও পুরোপুরি ফেলে আসতে পারেনি। নিয়ে এসেছে নিজের অস্তিত্ব জুড়ে।

‎ঘরটার ভেতর তখনকার সেই নিস্তব্ধতা জমে আছে। জানালার ফাঁক গলে ঢুকে পড়া রোদের রেখাগুলো মেঝেতে লম্বা হয়ে পড়ে আছে। বাতাস নেই বললেই চলে। বন্ধ ঘরে এক ধরনের দমবন্ধ ভারী ভাব। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কাপড়, মেঝেতে পড়ে থাকা বই, উল্টে যাওয়া চেয়ার—সবকিছু মিলিয়ে মনে হচ্ছে কিছুক্ষণ আগেই এখানে একটা ঝড় বয়ে গেছে।
‎আর সেই ঝড়ের ঠিক মাঝখানে, বিছানার পাশে বসে আছে ইখতিয়ার।
‎একদম নিথর।
‎দুই হাত হাঁটুর ওপর। মাথা নিচু। কপালের চুল এলোমেলো হয়ে চোখের উপর নেমে এসেছে। ডান হাতের গিঁট ফেটে শুকনো রক্ত জমে কালচে হয়ে আছে। তবুও সে যেন ব্যথা অনুভব করছে না। ঘড়ির টিকটিক শব্দ পর্যন্ত স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।
‎সময় যেন থেমে গেছে।

‎অনেকক্ষণ একইভাবে বসে থাকার পর হঠাৎ ইখতিয়ারের মাথা একটু নড়ল। যেন অন্ধকারের ভেতর হঠাৎ একটা চিন্তা বিদ্যুতের মতো ঝলসে উঠেছে।
‎ফোন? মুহূর্তেই সে পকেট থেকে ফোন বের করল। এত দ্রুত যেন দেরি হয়ে গেছে ইতোমধ্যেই। কাঁপা আঙুলে স্ক্রিন অন করতেই মুগ্ধার নামটা চোখে পড়ল। ”মুগ্ধা।”
‎একটা অতিসাধারণ নাম। কিন্তু এই মুহূর্তে নামটার ওজন যেন পুরো পৃথিবীর সমান।
‎ইখতিয়ার এক সেকেন্ডও অপেক্ষা করল না। দ্রুত কল দিল। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
‎এক সেকেন্ড। দুই সেকেন্ড।
‎তারপর—

‎“দুঃখিত, আপনি যে নাম্বারে কল করেছেন সেটি এই মুহূর্তে বন্ধ আছে।”
‎যান্ত্রিক ঠান্ডা গলাটা পুরো ঘরের ভেতর কেমন নিষ্ঠুরভাবে প্রতিধ্বনি হয়ে বাজল।
‎ইখতিয়ারের ভ্রু কুঁচকে গেল।
‎সে আবার কল দিল।
‎আবার। আবার। একই উত্তর।
‎তার বুকের ভেতর ধীরে ধীরে অস্বস্তির কালো ধোঁয়া জমতে শুরু করল। শ্বাস ভারী হয়ে এলো। মনে হচ্ছে কিছু একটা ঠিক নেই। খুব বেশি ঠিক নেই।
‎সে দ্রুত ম্যাসেঞ্জারে ঢুকল। চ্যাট ওপেন করতেই হাত থেমে গেল।
‎স্ক্রিনের ওপর ছোট্ট একটা লেখা।
‎“ইউ কান্ট রিপ্লে টু দিজ কনভার্সন.”
‎.মুহূর্তেই ইখতিয়ারের চোখ বড় হয়ে গেল।
‎যেন কেউ হঠাৎ তার বুকের মাঝখানে আঘাত করেছে।
‎“না… এসব কি মুগ্ধা? ইট ইজ নট ফেয়ার, আই হ্যাভ টু টক উইথ ইউ”
‎ফিসফিস করে শব্দগুলো বের হলো তার ঠোঁট থেকে।
‎অসম্ভব। মুগ্ধা এমন করবে?
‎সে তাড়াহুড়ো করে হোয়াটসঅ্যাপে গেল। কিন্তু সেখানেও একই শূন্যতা। প্রোফাইল নেই।
‎ছবি নেই। লাস্ট সিন নেই। মেসেজের পাশে শুধু একটা টিক। একটা।
‎ইখতিয়ারের বুকের ভেতরটা ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে আসতে লাগল।

‎“না… না… না…”
‎সে দ্রুত ইন্সটাগ্রামে গেল। সার্চ দিল। লেখা উঠল,
‎“নাথিং ফাউন্ড”
‎আরেকটা আইডি দিয়ে খুঁজল। তবুও না।
‎এইবার সত্যিটা ধীরে ধীরে তার মাথার ভেতর ঢুকতে শুরু করল।
‎মুগ্ধা তাকে সব জায়গা থেকে ব্লক করেছে।
‎সবজায়গা..
‎যেন মুগ্ধার চারপাশে একটা অদৃশ্য দরজা তুলে দিয়েছে । আর সেই দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে ইখতিয়ার—একা।
‎ফোনটা ধীরে ধীরে তার হাত থেকে নিচে নেমে এলো। তার চোখ স্থির হয়ে আছে স্ক্রিনে, কিন্তু দৃষ্টি যেন অনেক দূরে।
‎ঘরের বাতাস হঠাৎ ভারী লাগতে শুরু করল।
‎সে দাঁড়িয়ে গেল। তারপর হাঁটতে শুরু করল ঘরের একপাশ থেকে আরেকপাশে। অস্থির। বিক্ষিপ্ত।

‎তার নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে উঠছে। বুক উঠানামা করছে ভারীভাবে। মনে হচ্ছে চারপাশের দেয়ালগুলো ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসছে।
‎সে আবার কল দিল। বন্ধ।
‎আবার দিল। বন্ধ।
‎হঠাৎ রাগে, অসহায়তায় ফোনটা বিছানার উপর ছুঁড়ে মারল।
‎“ইউ কান্ট..কান্ট!”
‎তার গলার আওয়াজ কর্কশ হয়ে বের হলো।
‎পরক্ষণেই দু’হাতে নিজের মাথা চেপে ধরল সে।
‎এ মেয়ের সাথে যোগাযোগ করবে কীভাবে সে?
‎কীভাবে?

‎কীভাবে বলবে—সে ইচ্ছে করে এমন করেনি?
‎কীভাবে বুঝাবে—তার রাগ ছিল, কষ্ট ছিল… কিন্তু মুগ্ধাকে হারানোর কথা সে এক সেকেন্ডের জন্যও ভাবেনি? ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা আবারও ফিরে এলো। কিন্তু এবার আর সেটা শান্ত না।
‎দমবন্ধ করা।
‎ইখতিয়ার ধীরে ধীরে বিছানায় বসে পড়ল। তার চোখ পড়ল পাশের বালিশটায়।
‎মুগ্ধার বালিশ। এখনও হালকা একটা গন্ধ আছে সেখানে। খুব চেনা, খুব পরিচিত।
‎সে কাঁপা হাতে বালিশটা টেনে নিল নিজের কাছে।
‎কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ তাকিয়ে রইল।
‎তারপর মাথা নিচু করল।
‎চোখ বন্ধ করল শক্ত করে। কিন্তু ভেতরের ঝড় থামল না।
‎বরং আরও জোরে আছড়ে পড়তে লাগল তার উপর।
‎কারণ এই প্রথমবার ইখতিয়ার বুঝল—
‎মুগ্ধা শুধু রাগ করে দূরে যায়নি। সে এবার সত্যিই নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে তার থেকে , তার জীবন থেকে।

‎সময় গড়িয়েছে অনেকক্ষণ।
‎দুপুর পেরিয়ে বিকেলের আলো ধীরে ধীরে নরম হয়ে এসেছে। ড্রয়িংরুমের বড় জানালা দিয়ে কমলা রঙের আলো ঢুকে মেঝের উপর লম্বা ছায়া ফেলছে। ঘরের ফ্যানটা ঘুরছে ধীর গতিতে, তার একঘেয়ে শব্দ নিস্তব্ধতার মাঝে আরও বেশি স্পষ্ট শোনাচ্ছে।
‎ড্রয়িংরুমের মাঝখানের টেবিলের সামনে বসে আছে ইশতিয়াক।
‎এক পা আরেক পায়ের উপর তুলে আরাম করে হেলান দিয়ে বসেছে সে। সামনে ফলের ঝুড়ি, পাশে টিভি চলছে মিউট করে। কিন্তু তার চোখ টিভিতে না—ফোনের স্ক্রিনে।
‎মুগ্ধার নাম্বারের দিকে তাকিয়ে হালকা একটা হাসি খেলল তার ঠোঁটে। সে কল দিল। একবার রিং।
‎দুইবার রিং। তারপরই ফোন রিসিভ।
‎ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
‎তারপর মুগ্ধার গলা—

‎ “কি?”
‎গলাটা শুনেই ইশতিয়াকের ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।
‎“ওমা! এই কণ্ঠ শুনে তো মনে হচ্ছে আমাকে খুব মিস করতেছিস।”
‎মুগ্ধা বিরক্ত স্বরে বলল,
‎ “চুপ কর। কি দরকার বল?”
‎“দরকার?”
‎ইশতিয়াক তারপর নাটকীয় গলায় বলল,
‎“তুই বাড়ি ছেড়ে পালায়ে গেলি, তোর এই গরীব দেবরটার কথা একবারও ভাবলি না?”
‎“নাটক কম কর।”
‎ইশতিয়াক এবার সিরিয়াস হল।
‎“আচ্ছা সত্যি বল, হঠাৎ বাপের বাড়ি কেন গেলি?”
‎ওপাশে কিছুক্ষণ চুপ থেকে মুগ্ধা খুব ত্যাড়া গলায় বলল,
‎ “পরকীয়া করতে ইচ্ছা হয়েছে। তাই।”

‎এক সেকেন্ড চুপ। তারপর ইশতিয়াক এমনভাবে হেসে উঠল যেন এই উত্তরটাই সে আশা করছিল।
‎“ওহহ! অবশেষে! এই তো চাই! আচ্ছা শুন—ভালো দেখে একটা দুলাভাই খুঁজিস এবার। একটু ভদ্র, শান্তশিষ্ট টাইপ। আমার ওই রোবট ভাইটার মতো না।”
‎মুগ্ধা হেসে ফেলল চাপা স্বরে।
‎ইশতিয়াক থামল না। আবার চিন্তিত হয়ে বলল,
‎“ বুঝলি আমিও ভাবতেছি একটা নরমসরম ভাবি খোঁজা শুরু করি। যে আমাকে আদর করে খাওয়াবে, গিফট দিবে, রাতে লুকায়া টাকা পাঠাবে…”
‎“ইশতিয়াক!”
‎“কি? আমি তো ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করতেছি!”
‎“তোরে আমি একদিন খু’ন করব।”
‎“কিন্তু তার আগে দুলাভাই ঠিক করিস প্লিজ।”
‎মুগ্ধা এবার বিরক্ত হয়ে গালি দিল,
‎“হারা’মজাদা, ফোন রাখ।”
‎বলেই কটাস করে ফোন কেটে দিল। এক মুহূর্ত নীরবতা।
‎তারপর পুরো ড্রয়িংরুম জুড়ে ইশতিয়াকের হাসি ছড়িয়ে পড়ল।
‎সে মাথা পেছনে হেলিয়ে হেসে উঠল।

‎“এই মেয়েটা একদম পাগল… বাট বাট বাট.. শেখ বাড়ির বড় ছেলের কপালে এবার দূর্ভোগ আছে, আহারে আমার ভাইয়াটা..”
‎তার চোখে তখন দুষ্টু আনন্দ। কারণ সে জানে—মুগ্ধা রাগ দেখালেও মনটা পুরোপুরি ভাঙেনি এখনো।
‎ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার শব্দ হলো।
‎ইশতিয়াক মাথা ঘুরিয়ে তাকাল।
‎ইখতিয়ার।
‎ধীরে ধীরে নিচে নামছে সে।
‎মুখটা ক্লান্ত। চোখের নিচে কুচকানো ছাপ। চুল এলোমেলো। কিন্তু সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো জিনিস—তার চোখদুটো।
‎অস্থির।

‎ভেতরে কিছু একটা তোলপাড় হচ্ছে, কিন্তু সে জোর করে সেটা চেপে রেখেছে।
‎ইশতিয়াক ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে রাখল ।ইখতিয়ার এসে টেবিলের সামনে দাঁড়াল।
‎কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,
‎“তোর ফোনটা দে।”
‎ইশতিয়াক ভ্রু তুলল।
‎“কেন?”
‎“আমার ফোনে চার্জ নাই। একটা ইম্পর্ট্যান্ট কল দিতে হবে।”
‎ইশতিয়াকের মুখে ধীরে ধীরে এমন একটা হাসি ফুটল, যেটা দেখে যে কেউ বুঝবে—সে সব বুঝে গেছে।
‎কিন্তু সে কিছু বুঝেনি এমন ভান করল।
‎“ইম্পর্ট্যান্ট কল?”
‎সে অবাক হওয়ার অভিনয় করল। তারপর বলল,
‎“কাকে? প্রধানমন্ত্রী নাকি?”
‎ইখতিয়ারের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।

‎“ফোনটা দে।”
‎“আরে ভাই, চার্জার তো উপরে—”
‎“ইশতিয়াক।”
‎এইবার গলাটা একটু কঠিন।
‎ইশতিয়াক ভেতরে ভেতরে হাসতে লাগল। এত বছর ধরে ভাইটাকে চেনে সে। এই গলাটা মানে—লোকটা এখন ধৈর্যের শেষ সীমায় আছে।
‎তবুও সে মজা নেয়া বন্ধ করল না।
‎ফোনটা নিজের বুকের কাছে টেনে নিয়ে বলল,
‎ “না দিলে কি মারবি?”
‎ইখতিয়ার এবার সরাসরি তার হাত থেকে ফোনটা টেনে নিল।
‎“ড্রামা করিস না।”
‎ইশতিয়াক নাটকীয়ভাবে বুক চেপে ধরল।
‎“আহ! নিজের ভাইয়ের উপর অত্যাচার! এই দিনও দেখতে হলো!”
‎ইখতিয়ার কোনো উত্তর দিল না।
‎সে দ্রুত ফোন আনলক করতে গিয়ে থেমে গেল।
‎“পাসওয়ার্ড?”
‎ইশতিয়াক সোফায় আরাম করে হেলান দিল।
‎ঠোঁটের কোণে শয়তানি হাসি।
‎“কেন? ইম্পর্ট্যান্ট কল দিবি না?”

‎ইখতিয়ার এবার চোখ তুলে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে বিরক্তি, অস্থিরতা আর চাপা রাগ একসাথে মিশে আছে।
‎ইশতিয়াক আর হাসি আটকাতে পারল না।
‎হেসে বলল,
‎“আচ্ছা আচ্ছা, বলতেছি। ১১২২।”
‎ইখতিয়ার দ্রুত পাসওয়ার্ড দিয়ে ফোন খুলল।
‎তার আঙুলের গতি এত দ্রুত যেন কয়েক সেকেন্ড দেরি মানেই পৃথিবী শেষ হয়ে যাবে। ইশতিয়াক চুপচাপ তাকিয়ে রইল।
‎তার ভাইয়ের মুখের দিকে।
‎কঠিন, শান্ত, নিয়ন্ত্রিত ইখতিয়ারকে সে অনেকবার দেখেছে। কিন্তু এই ইখতিয়ার আলাদা।
‎এই লোকটা স্পষ্টই ভেঙে পড়েছে। ইখতিয়ার দ্রুত পায়ে ফোন নিয়ে উপরে চলে গেল। যেন তার ফ্লাইট আছে কিছুক্ষণের মধ্যে।

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ১১

‎ইশতিয়াক টেবিলের ফলের ঝুড়ির দিকে হাত বাড়াল। একটা লাল আপেল তুলে নিল।
‎তারপর সিনেমার নায়কদের মতো নাটকীয় ভঙ্গিতে আপেলটার দিকে তাকাল। সোফায় হেলান দিয়ে বসে আপেল খেতে খেতে মনে মনে হাসছে। ছোটবেলা থেকেই চিনে সে মুগ্ধা কে। তার সবথেকে প্রিয় বন্ধু। ঐ মেয়ে তার শান্তশিষ্ট ভাবি হলো কেমনে? এতো সহজে পোষ মানল? ভালোবাসায় কিনা হয়! ইশতিয়াক অবাক হয়েছিল বেশ।
‎কিন্তু এবার সে হাসল। মুগ্ধা ফিরেছে। ফিরেছে তার পুরানো জেদে। তার ভাই এবার মানতে বাধ্য।বিরবির করল ইশতিয়াক,
‎“ খুব দামী জিনিস ফ্রীতে পেয়ে অবহেলা করলে? এবার তার দাম চুকাতে গিয়ে পাগল হয়ে যাবা,তবু পাবা না। হাড়েহাড়ে বুঝে যাবা হোয়াট আ্য পিস সি ইজ! হাহাহা”

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ১৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here