Home ম্যারিড লাইফ্ ‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৩৬

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৩৬

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৩৬
‎রঙ্গনা মৈত্র ঊর্মি

ইশতিয়াককে বোঝাতে বোঝাতে একসময় ইখতিয়ারের কণ্ঠস্বরও ধীরে ধীরে ক্লান্ত হয়ে এলো। সারাদিনের অফিস, একের পর এক মিটিং, কাজের চাপ, তারপর রাস্তাঘাটের দৌড়ঝাঁপ—সব মিলিয়ে শরীরটা যেন বিশ্রামের জন্য আকুতি জানাচ্ছে। অথচ সে সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করার মানুষ নয়।
ইশতিয়াকের বেডের পাশে বসে কতক্ষণ ধরে যে ভাইকে বোঝাচ্ছিল, নিজেও জানে না।
বলতে বলতেই একসময় ইশতিয়াকের বেডের পাশে হেলান দিয়ে বসে পড়েছিল ইখতিয়ার। চোখ দুটো বুজে এসেছিল অজান্তেই। তারপর?

কখন যে চোখের পাতায় ঘুম এসে বসেছে, সে নিজেও টের পায়নি।
নয়তো সে কি ঘরে তার প্রেয়সীকে অপেক্ষায় রেখে এখানে ঘুমিয়ে পড়ার মতো মানুষ?
মোটেও না।
মুগ্ধাকে অপেক্ষায় রেখে রাত কাটানো তো তার কাছে নিজের অজান্তে অপরাধ করে ফেলার মতো। অথচ আজ শরীরের কাছে মনও যেন হার মেনে গেল।
ইশতিয়াক কিছুক্ষণ চুপচাপ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল এক চিলতে হাসি।
ভাইয়া ঘুমিয়ে গেছে! তার মানে সে জিতে গেছে।
মুখের সেই মুচকি হাসিটা যেন বলছিল—‘দ্যাখো, কেমন লাগে!’
স্নিগ্ধা যে তার সঙ্গে একদমই কথা বলছে না!
কতবার কল করেছে। কতবার মেসেজ পাঠিয়েছে। শেষে তো মহারানী তাকে ব্লক লিস্টেই পাঠিয়ে দিয়েছে।
ইশতিয়াকও এরপর আর বেশি জ্বালাতন করেনি। বেচারীর পরীক্ষা চলছে। এই সময়টায় বিরক্ত করা ঠিক হবে না—নিজেকে প্রতিদিন এই কথাটাই বুঝিয়েছে সে। কিন্তু মনের ভেতরকার প্রশ্নগুলো কি আর এত সহজে চুপ থাকে?
পরশুদিন আয়েশা বেগমকে ফোন করেছিল সে। কথায় কথায় আয়েশা বেগমই বলেছিলেন—
ইখতিয়ার পরশুদিন বিকেলে স্নিগ্ধাদের বাড়িতে গিয়েছিল। স্নিগ্ধার জন্য অনেক কিছু নিয়ে। পড়াশোনা নিয়ে নানারকম উপদেশও দিয়েছে।

আর তারপর থেকেই স্নিগ্ধার এই অদ্ভুত আচরণ।
ইশতিয়াকের ভ্রু কুঁচকে গেল। নির্ঘাত ভাইয়া স্নিগ্ধাকে এমন কিছু বলেছে!
নয়তো মেয়েটা হঠাৎ এমন করছে কেন? পরীক্ষার জন্য? না, সেটা ইশতিয়াকের বিশ্বাস হচ্ছিল না।
টেস্ট পরীক্ষার সময়ও তো স্নিগ্ধা রাত জেগে পড়ত। রাত তিনটে-চারটে বেজে গেলেও কল দিত। ক্লান্ত গলায় গল্প করত। কখনো পড়ার ফাঁকে পাঁচ মিনিট, কখনো দশ মিনিট—তবু কথা বলত।
আর এখন?
একটা ফোনও নয়। একটা মেসেজের উত্তরও নয়।
মনে হলো কেউ যেন ইশতিয়াকের বুকের ভেতর থেকে হঠাৎ করে আলোটা নিভিয়ে দিল।
মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।
বুকের কোথাও চিনচিনে একটা ব্যথা উঠল। সে ধীরে ধীরে ভাইয়ের দিকে তাকাল।
ইখতিয়ারের মুখে তখন গভীর ঘুমের ছাপ। সারাদিনের ক্লান্তি মুখের রেখাগুলোকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। তবু ঘুমন্ত মুখটায় অদ্ভুত এক প্রশান্তি। ইশতিয়াকের বুকটা আরও ভারী হয়ে উঠল।
ভাইয়াকে এভাবে নিয়ে এসে কি ঠিক করেছে সে?মুগ্ধা নিশ্চয়ই অপেক্ষা করছে। হয়তো বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছে। হয়তো ফোনের স্ক্রিন জ্বেলে দেখছে। হয়তো অভিমান করে চুপচাপ বসে আছে।

ভাবনাটা মাথায় আসতেই ইশতিয়াকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। সে নিঃশব্দে উঠে দাঁড়াল। বেডের পাশে রাখা চেয়ারটা সামান্যও শব্দ না করে সরিয়ে দিল। একবার ঘুমন্ত ইখতিয়ারের দিকে তাকাল। তারপর পা টিপে টিপে এগিয়ে গেল বারান্দার দিকে। বেলকনির দরজা খুলতেই রাতের ঠান্ডা বাতাস এসে মুখে আছড়ে পড়ল।
বাইরে শহরটা তখনও দিব্যি জেগে আছে। যেন তার কোন ক্লান্তি নেই। কোন দৈববলে সে সবসময়ই সতেজ।
দূরের রাস্তায় গাড়ির আলো ছুটে যাচ্ছে—কখনো জোনাকির মতো, কখনো অন্ধকার ভেদ করে ছুটে চলা কোনো অস্থির নক্ষত্রের মতো। বাড়ির চারপাশে একটা চাপা নীরবতা, অথচ সেই নীরবতার বুক চিরে কোথাও কোথাও ভেসে আসছে কত অদ্ভুত সব শব্দ।

ইশতিয়াক রেলিংয়ে দু’হাত রাখল। কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে পকেট থেকে ফোনটা বের করল। স্ক্রিন জ্বলে উঠতেই স্নিগ্ধার নামটা চোখে পড়ল। নামটার দিকে তাকিয়ে তার বুকের ভেতরটা আবার কেমন করে উঠল।
আঙুলটা অজান্তেই কল অপশনের দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু থেমে গেল।
‘ নাম্বার ব্লক।’
মনে পড়তেই ঠোঁটের কোণে তিক্ত হাসি ফুটে উঠল।
কিন্তু পরক্ষণেই হাসিটা মিলিয়ে গেল।তার মনে হলো, স্নিগ্ধা তাকে এড়িয়ে যাচ্ছে শুধু অভিমান থেকে নয়। এর পেছনে অন্য কিছু আছে।
আর হয়ত সেই ‘অন্য কিছু’-এর কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে তারই প্রাণপ্রিয় ভাইয়া। ইশতিয়াক ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল। হয়তো তার ভালোর জন্যই। তার ভাইয়া কখনোই তার খারাপ চায়না। তাকে অত্যান্ত ভালোবাসে। নয়তো কি এই ক্লান্তি নিয়েও মুগ্ধা কে ছেড়ে তার ঘরে তাকে পড়াতে আসতো? অবশ্যই না। কিন্তু এতে কি ইশতিয়াক ভালো আছে? এতে কি ইশতিয়াক শান্তিতে আছে? না। অবাধ্য যন্ত্রণারা জাপ্টে ধরেছে তাকে। গলা টি’পে ধরেছে যেন। ইশতিয়াক জোরে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।
দমকা বাতাসে চুলগুলো এলোমেলো হয়ে গেল ইশতিয়াকের । অথচ তার ভেতরের অস্থিরতা একটুও কমল না।
শেষে পারল না। ইন্সটাগ্রামে গিয়ে কল দিল স্নিগ্ধার কাছে। সব খারাপ লাগা সাইডে রেখে নিজের ফুরফুরে ইমেজে ফিরে এলো। কিছুক্ষণ যেতেই স্নিগ্ধা ফোন রিসিভ করল। হয়তো মেয়েটাও এর জন্য অপেক্ষা করছিল। একটু গলার স্বর শোনার জন্য। ইশতিয়াক বেজায় খুশি হলো।
ফোন ধরতেই ছেলেটা হালকা কেশে ভুলভাল সুরে গান গাইল,
“সুন্দরীরে আয় করিরে তোর কাছে কবুল,
মনেতে যা যা আছে আজ!
কুলফি হয়ে জমছে মনে টাটকা গোলাপ ফুল দু’চোখে নবাবী মেজাজ,
মোটতুলি সেলফিস কেন হাতছানি তুই দিছ, ছুতে গেলেই ছ্যাকা!”
অমনি শব্দ করে ফোন কেটে গেল। ছেলেটার মুখ বাংলার পাঁচের মতো ঝুলে রইল। একটু তো কথা বলতে পারত। এত অবিচার কেন ওর নামে? ও থানায় কেস করবে। এত অন্যায় মানা যায় না। আর সহ্য হয়না। বিষন্ন মনে ঠোঁট নাড়িয়ে শেষ লাইন টুকু শেষ করল ছেলেটা,
“কখন বাজে বারোটা, আমার বাজে বারোটা। ”

সকাল থেকেই শেখবাড়িতে যেন ছোটখাটো উৎসবের আমেজ। উঠোন থেকে বারান্দা, বারান্দা থেকে ঘরের ভেতর—সবখানেই মানুষের ছোটাছুটি। কারও হাতে কাপড়ের ব্যাগ, কেউ আবার শেষ মুহূর্তে আলমারি খুলে জামাকাপড় খুঁজছেন। কোথাও ব্যাগের চেইন খোলার শব্দ, কোথাও আবার কে কোন জিনিসটা নেবে তা নিয়ে মৃদু তর্ক। বাড়িটা যেন হঠাৎ করেই নিজের চেনা ছন্দ হারিয়ে ব্যস্ততার এক নতুন সুরে মেতে উঠেছে।

আজ সবাই গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হবে। গ্রামের বাড়িতে চাচাতো ভাইয়ের মেয়ের বিয়ে। তাই শেখবাড়ির প্রায় সবাইকেই যেতে হবে। আর এই সুযোগে রহিমাকেও বোগলদাবা করে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। অনেকদিন হলো তারও গ্রামে যাওয়া হয় না। তার ওপর প্রাইভেট গাড়ি আছে, তাই পথের ঝামেলা নিয়ে চিন্তা নেই।
রহিমা অবশ্য সকাল থেকেই নিজের ব্যাগ গোছাতে গোছাতে একবার বিয়ের কথা বলছেন, আবার দশবার গ্রামের বাড়ির কথা। তার এই বয়সে বিন্ধদুাত্র ক্লান্তি নেই, যেন উঠতি বয়সের অষ্টাদশী।
রহিমা ব্যাগ গোছাতে গোছাতে বললেন,
“আমার ওই পুরোনো শাড়িটা কোথায় গেল রে? ওই যে সবুজ পাড়ওয়ালা শাড়িটা!”
রান্নাঘর থেকে কেউ একজন উত্তর দিল,
“আপনার শাড়ি তো কালই বের করে রেখেছি!”
“ওহ, তাই নাকি! আমি তো খুঁজেই পাচ্ছিলাম না।”

বলেই আবার ব্যাগের ভেতর হাত ঢুকিয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করলেন তিনি।
সবাই যাচ্ছে। শুধু যাচ্ছে না মুগ্ধা ইশতিয়াক আর ইখতিয়ার। এই একটা ব্যাপারই যেন সকালটার সমস্ত আনন্দের মধ্যে তার কাছে এক চামচ তেতো স্বাদ মিশিয়ে দিয়েছে।
ড্রয়িংরুমের একপাশে মুখ বেজার করে বসে আছে মুগ্ধা। সামনে খোলা বই, পাশে কলম, কিন্তু পড়ার প্রতি তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। বইয়ের পাতায় চোখ রাখা, অথচ মনটা যেন বহু দূরের কোনো গ্রামের মেঠোপথে হাঁটছে।
তার পাশে বসে আছে ইশতিয়াক। তার অবস্থাও খুব একটা ভিন্ন নয়। বরং বলা যায়, সে মুগ্ধার থেকেও বেশি নিশ্চিন্ত।
চেহারা দেখে মনে হচ্ছে, পরীক্ষা নামের জিনিসটা পৃথিবীতে কখনো ছিলই না। তাকে ঘুরতে যেতেই হবে । মুগ্ধা একবার পাশ ফিরে তাকিয়ে বলল,
“তুই যাচ্ছিস না?”

ইশতিয়াক নির্বিকার গলায় বলল,
“যাব।”
“পরীক্ষা কে দিবে?”
“ওটাও হবে না হয়।”
“কীভাবে?”
ইশতিয়াক ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ ভাবার ভান করে বলল,
“দেখা যাবে।”
মুগ্ধা চোখ বড় বড় করে তাকাল।
“দেখা যাবে মানে?”
“মানে… পরীক্ষার হলে গিয়ে দেখা যাবে। কয়দিন গ্যাপ আছে তো”
মুগ্ধা বিরক্ত হয়ে বইটা বন্ধ করে দিল।
“তুই না একটা অসহ্য মানুষ!”
ইশতিয়াক হেসে ফেলল।
“তোর পাশে এতক্ষন বসে আছি অসহ্য হওয়ারই কথা।”

দূর থেকে কথাগুলো শুনে রাফিয়া হেসে উঠলেন।
“ওদের দুজনকে দেখেছ? একজন পরীক্ষা নিয়ে দুশ্চিন্তায় মরছে, আরেকজন পরীক্ষা দেবে কি না সেই চিন্তাই করছে না!”

ইন্তিয়া বেগম তখন মুগ্ধার সামনে এসে বসলেন। মুখে মায়া, কণ্ঠে সেই চিরচেনা মাতৃসুলভ কঠোরতা।
“মুগ্ধা, শোনো মা। আমরা কয়েকদিনের জন্য যাচ্ছি। তুমি কিন্তু পড়াশোনায় কোনো ফাঁকি দেবে না।”
“জি, আম্মু।”
“আর একটা কথা—পরীক্ষার সময় কোনো ভারী কাজ করবে না। রান্নাঘরের ধারে-কাছেও যাবে না।”
মুগ্ধা মৃদু হেসে বলল,
“আম্মু, আমি তো এমনিতেই রান্না করি না।”
“সেটা জানি। তবুও বলে রাখছি।”

রাফিয়া পাশ থেকে হেসে বললেন,
“ভাবি, আপনি মুগ্ধাকে এমনভাবে সাবধান করছেন যেন ওকে আমরা বাড়িতে না, যুদ্ধের ময়দানে রেখে যাচ্ছি!”
ইন্তিয়া বেগম চোখ রাঙালেন।
“তুই হাসিস না রাফিয়া। পরীক্ষার সময় মেয়েটার একটু যত্ন দরকার।”

“আচ্ছা আচ্ছা, বুঝেছি। মুগ্ধা আমাদের জাতীয় সম্পদ। একে কোনোভাবেই ক্ষতি হতে দেওয়া যাবে না।”
ইশতিয়াক মুখ ভেঙিয়ে বলল। মুগ্ধা এবার লজ্জায় হেসে ফেলল।
ইন্তিয়া বেগম আবার বললেন,
“রুমি আপু আসবে। ওকে কয়েকদিনের জন্য রান্নাবান্নার কাজ বুঝিয়ে দিয়েছি। তোমাদের খাওয়া-দাওয়ার কোনো সমস্যা হবে না। তুমি শুধু পড়বে। আর ইশতিয়াক—”
“জি?”
“তুইও কিন্তু ওকে বিরক্ত করবি না।”

ইশতিয়াক সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর মুখ করে বলল,
“আমি? আমি তো খুব শান্ত ছেলে।”
মুগ্ধা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
“হ্যাঁ, পৃথিবীর সবচেয়ে শান্ত! তোরে এবার শান্তিতে নোবেল দেওয়া হবে”
রাফিয়া আবার হেসে উঠলেন।
“এই শান্ত ছেলেটা যে মুগ্ধার পড়ার সময় পাঁচ মিনিট পরপর পানি খেতে যায়, সেটা কিন্তু আমি জানি! এটা ওটা বলে পিছে লাগে”
ইশতিয়াক মুখ গম্ভীর করে বলল,
“পানি খাওয়া কি অপরাধ?”
“না, কিন্তু অপ্রয়োজনে একই বোতল থেকে দশবার পানি খাওয়া অপরাধের কাছাকাছি।”

ঘরজুড়ে হাসির রোল উঠল। সবকিছুর মাঝেও একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল ইখতিয়ার। হাতে ধোঁয়া ওঠা কফির মগ। চোখে তার সেই চেনা স্থিরতা। কাউকে কিছু বলছে না, শুধু দেখছে।
কফির মগে চুমুক দিতে দিতে তার ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটল।
মুগ্ধা আবার মুখ ভার করে জানালার দিকে তাকিয়ে আছে। ইখতিয়ারের চোখ গিয়ে থামল সেখানেই।মেয়েটার মুখটা এমন হয়েছে, যেন তার কাছ থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। অথচ সত্যিটা খুব সাধারণ—কয়েকদিনের জন্য গ্রামের বাড়ি যাওয়া হচ্ছে, আর সে পরীক্ষার কারণে যেতে পারছে না।
তবু মানুষের মন যুক্তির হিসাব মানে কই? কখনো কখনো কয়েকটা দিনের দূরত্বও দীর্ঘশ্বাসের কাছে কয়েক বছরের সমান হয়ে দাঁড়ায়।

সেই সাতসকালেই শেখবাড়ির সবাই গ্রামের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়েছে। বাড়িটা হঠাৎ করেই যেন অদ্ভুত নির্জন হয়ে গেছে। এত মানুষের কোলাহলে যে বাড়িটা প্রতিদিন মুখর থাকে, আজ সেখানে বাতাসের শব্দটাও যেন একটু বেশি স্পষ্ট।
বাড়িতে রয়ে গেছে শুধু ইখতিয়ার আর মুগ্ধা। ইশতিয়াকটা বোধ হয় বাইরে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে গেছে। বাড়ি নেই সে।

সকাল থেকেই আকাশটার মুখ ভার। কালচে মেঘগুলো একটার পর একটা এসে সূর্যের মুখ ঢেকে দিচ্ছে। দূরের আকাশে মাঝে মাঝে মেঘের গর্জন শোনা যাচ্ছে—যেন বৃষ্টি আসার আগে প্রকৃতি নিজেই কোনো গোপন বার্তা পাঠাচ্ছে।
মুগ্ধা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ এক ফোঁটা বৃষ্টি এসে পড়ল তার গালে।
মুগ্ধার ঠোঁটের কোণে সঙ্গে সঙ্গে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।সে ঘুরে তাকাল ইখতিয়ারের দিকে।
“বৃষ্টি আসছে!”

ইখতিয়ার তখন সোফায় বসে ফোন দেখছিল। মুগ্ধার কণ্ঠ শুনে একবার চোখ তুলে তাকাল।
“হুম, আসুক”
“আমি ভিজব।”
ইখতিয়ার ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“না।”

একটা মাত্র শব্দ। অথচ তাতেই যেন সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা। মুগ্ধা মুখ ফুলিয়ে বলল,
“কেন?”
“বৃষ্টিতে ভিজলে ঠান্ডা লাগবে। পরীক্ষা চলে তোমার”
“লাগবে না। কিচ্ছু হবে না”
“বায়না ধরো না,লাগবে।”
” লাগবে না বলছি তো।”
“মুগ্ধা!”

মুগ্ধা আর কোনো উত্তর দিল না। শুধু ঠোঁট বাঁকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর হঠাৎ ইখতিয়ারের হাত ধরে টান দিল।
“চলেন”
“কোথায়?”
“ছাদে।”
“আমি যাচ্ছি না।”
“আপনাকে যেতে হবে।”
“কেন?”
“চলেন তো এত কেন কথা বলেন”
ইখতিয়ার কিছু বলার আগেই মুগ্ধা তাকে টেনে নিয়ে সিঁড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল। তার সেই শিশুসুলভ জেদের কাছে শেষ পর্যন্ত ইখতিয়ারের সমস্ত আপত্তি হার মানল।
ছাদে উঠতেই যেন অন্য এক পৃথিবী।
মেঘে ঢাকা আকাশ। চারপাশে শীতল বাতাস। দূরের গাছগুলো বৃষ্টির আগমনী হাওয়ায় দুলছে। তারপর আচমকাই ঝুমঝুম করে বৃষ্টি নামল।
মুগ্ধা দু’হাত মেলে দাঁড়িয়ে গেল। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো তার চুলে, কপালে, চোখের পাতায় এসে জমতে লাগল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই চুল ভিজে কপালের পাশে লেপ্টে গেল। অথচ তার মুখে তখন এমন এক আনন্দ—যেন বহুদিন পর নিজের হারিয়ে যাওয়া কোনো ঋতুকে ফিরে পেয়েছে।
সে ঘুরে ঘুরে নাচতে লাগল।
কোনো গান নেই, কোনো সুর নেই—শুধু বৃষ্টির শব্দ।
তবুও মনে হলো, মুগ্ধার প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে বৃষ্টি যেন নিজেই তাল দিচ্ছে।

ইখতিয়ার একটু দূরে দাঁড়িয়ে রইল। এক হাত বুকের ওপর ভাঁজ করা, অন্য হাতটাও ধীর ভঙ্গিতে বুকের কাছে। ঠোঁটের কোণে লেগে আছে অতি ক্ষীণ এক মুচকি হাসি।
তার চোখে মুগ্ধা তখন শুধু তার স্ত্রী নয়। সে যেন বৃষ্টিভেজা কোনো কবিতা—যার প্রতিটি শব্দ ইখতিয়ার নীরবে পড়ে যাচ্ছে।
মুগ্ধা হঠাৎ ঘুরে তাকাল। চোখে চোখ পড়তেই ইখতিয়ারের হাসিটা আরও স্পষ্ট হলো।
“এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?”

ইখতিয়ার ধীর গলায় বলল,
“দেখছি।”
“কী?”

কিছুক্ষণ চুপ থেকে ইখতিয়ার বলল,
“আমার বউ বৃষ্টিতে ভিজলে কেমন লাগে।”

মুগ্ধার গাল মুহূর্তেই লাল হয়ে উঠল। বৃষ্টির জলের সঙ্গে সেই লজ্জার রং মিশে গিয়ে যেন সন্ধ্যার আকাশের মতো কোমল হয়ে উঠল তার মুখ।
সে আবার মুখ ফিরিয়ে নিল।
আর ইখতিয়ার? সে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল।
বৃষ্টির ফোঁটা তার শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছিল, অথচ তার চোখে তখন বৃষ্টির চেয়েও সুন্দর এক দৃশ্য—মুগ্ধার হাসি। কিছু মুহূর্ত জীবনে আসে খুব নিঃশব্দে।
কোনো ঘোষণা ছাড়াই।
ইখতিয়ার প্রেয়সীর পানে তাকিয়ে নিজের অজান্তেই গুনগুনিয়ে উঠল,

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৩৫

” a mausum ki baarish..
a baarish ka pani
a pani ki boonde
Tu jhe hi tho dhoonde
Ye milne thwahish
Ye khwahish purani.
Ho poori tujhi se
Meri ye Kahani.. ”

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৩৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here