Home ম্যারিড লাইফ্ ‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৭

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৭

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৭
‎রঙ্গনা মৈত্র ঊর্মি

তখন দুপুর গড়িয়ে বারোটার কাছাকাছি। বাইরে রোদের তেজ এখনো কমেনি, তবে বাড়িটার ভেতরে একধরনের অলস শান্তি নেমে এসেছে। যে যার কাজ শেষে গল্পে মশগুল। সকালের এত ঘোরাঘুরি, শপিং, মানুষের ভিড়—সব মিলিয়ে ইখতিয়ার মোটামুটি ক্লান্ত।

‎বাড়িতে ঢুকেই ইখতিয়ার একদম সোজা নিজের ঘরে চলে গিয়েছিল। হাতে থাকা শপিং ব্যাগগুলো দরজার পাশে রেখে শার্ট খুলে বিছানায় ছুড়ে দিয়েছে। চলে গেছে গেছে ওয়াশরুমে। কোনমতে ফ্রেশ হয়েছে। তারপর আর কিছু না ভেবেই বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছে। চোখ বন্ধ করার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘুম তাকে গ্রাস করেছে। ঢলে পড়েছে এক কাল্পনিক জগতে।
‎আর মুগ্ধা?
‎সে যেন এখনো শপিংমলের আলো ঝলমলে পরিবেশের মাঝেই আছে। রুমে ঢুকে কোনোরকমে জামাকাপড় চেঞ্জ করেছে। ওড়নাটা তাড়াহুড়ো করে কাঁধে জড়িয়ে, চুলগুলো হাত দিয়ে এলোমেলো করেই উপরে ক্লিপের সাহায্য আটকে একের পর এক ব্যাগ হাতে নিচে নেমে এসেছে।

‎নিচতলার বড় ড্রয়িংরুমে তখন সবাই বসে।
‎রহিমা সোফার কোণে হেলান দিয়ে পান চিবুচ্ছে। ইন্তিয়া আর রাফিয়া গল্প করছে আর চাল বা বাছছে। ইশতিয়াক আধশোয়া হয়ে সোফায় পড়ে আছে, মুখে চিরচেনা আলসেমি মাখানো ভাব চোখ স্নিগ্ধার পানে। আর স্নিগ্ধা রাফেয়া-ইন্তিয়ার পাশে চুপচাপ বসে সব দেখছিল।
‎মুগ্ধা ঢুকতেই পুরো ঘর যেন হঠাৎ প্রাণ ফিরে পেল।
‎“সবাই বসো বসো! আমি কি কিনছি দেখায়!”
‎তার উত্তেজিত গলায় রাফিয়া হেসে উঠল। ইন্ডিয়া চালের থালা সাইডে রেখে বলল,
‎“দাঁড়া দাঁড়া আসতেছি।”
‎মুগ্ধা কার্পেটের ওপর বসে একে একে ব্যাগ খুলতে লাগল। তার চোখেমুখে এমন উচ্ছ্বাস যেন ঈদের শপিং দেখাচ্ছে।
‎প্রথমেই একটা কালো গেঞ্জি বের করল সে। তার দিকে তাকিয়ে থাকা ইশতিয়াকের দিকে তাকিয়ে বলল,
‎“বলতো এটা কার?”
‎ইইয়াক হায় তুলে গালে হাত দিলো। অলস ভঙ্গিতে বলল,

‎”তোর বোবা বরের”
‎মুগ্ধা চোখ সরু করে তাকালো। তার বরকে এমন বলা! ইন্তিয়া জিজ্ঞেস করল,
‎”কার এটা?”
‎“এইটা ইশতিয়াকের জন্য।”
‎ইশতিয়াক ভ্রু তুলে তাকাল।
‎“আমার জন্য? আমি তো ভাবছিলাম তুই আমারে ভুলে গেছিস।”
‎“ভাবিরে তুমি করে বলতে হয় হা রামি।”
‎মুগ্ধা রেগে বলল। গেঞ্জিটা ইশতিয়াকের দিকে ছুঁড়ে মারল।
‎ “দেখ পছন্দ হয় কিনা।”
‎ইশতিয়াক গম্ভীর মুখ করে গেঞ্জিটা সামনে ধরল। তারপর নাটকীয়ভাবে মাথা নাড়ল।
‎“খুব সুন্দর। এখন আমি আরও হ্যান্ডসাম লাগমু।”
‎“তুই এমনিতেই বান্দরের মতো।”
‎“দেখছ সবাই? মানুষরে গিফট দিয়ে আবার অপমানও করে! জুতো মেরে গরু দান”

‎ঘরে হাসির রোল উঠল।
‎স্নিগ্ধা চুপচাপ বসে আছে। তার ঠোঁটের কোণেও ছোট্ট হাসি। এই বাড়িটার ব্যাপারটাই আলাদা।
‎এখানে সবাই সবসময় শব্দ করে। কেউ কাউকে ঠিকমতো কথা শেষ করতে দেয় না। একে অপরকে খেপায়, ঝগড়া করে, হাসে। কিন্তু এই বিশৃঙ্খলার মাঝেও অদ্ভুত উষ্ণতা আছে।তাদের বাড়ি এত আলাদা। সেখানে শুধু সে, মুগ্ধা, তাদের বাবা রেজওয়ান তালুকদার আর মা আয়েশা বেগম।
‎বড় বাড়ি থাকত। পরিপাটি। শান্ত।
‎কিন্তু কখনো এমন হইচই হয় না। কেউ এভাবে একে অপরকে জ্বালায় না। একসাথে বসে এত হাসাহাসি হয় না। স্নিগ্ধার বুকের ভেতর হঠাৎ নরম একটা অনুভূতি জমল। খুব ভালো লাগছে তার।

‎মুগ্ধা এবার আরেকটা ছোট্ট বক্স বের করল।
‎“এইটা স্নিগ্ধা তোর জন্য , তোয ভাইয়া পছন্দ করেছে।”
‎স্নিগ্ধা একটু অবাক হলো।
‎“আমার? আমার আবার কেন?”
‎“হুম। খুলে দেখ, পছন্দ হয় কি না!!”
‎ছোট্ট বক্সটা খুলতেই ভেতরে চিকন স্ট্র্যাপের সুন্দর একটা ঘড়ি। রূপালি রঙের।
‎খুব বেশি জমকালো না, কিন্তু ভীষণ এলিগেন্ট।
‎স্নিগ্ধার চোখ চিকচিক করে উঠল।
‎ “অনেক সুন্দর…”
‎মুগ্ধা সাথে সাথে উজ্জ্বল হয়ে গেল।
‎ “পছন্দ হইছে?”
‎স্নিগ্ধা মাথা নাড়ল।

‎“খুব।”
‎তার গলায় সত্যিকারের মুগ্ধতা ছিল।
‎মুগ্ধা খুশিতে যেন আরো চনমনে হয়ে উঠল।
‎এরপর সে দুইটা স্কার্ফ বের করল।
‎“এইটা আম্মুর । আর এইটা চাচিম্মুর।”
‎রফেয়া বলল,
‎”আমাদের জন্য আবার কেন?”
‎ইন্তিয়া বলল,
‎”ওরা কত কষ্ট করে নিয়ে আসছে, নে”
‎দুজনেই একসাথে নিল। ওদের বেশ পছন্দ হলো।
‎উ্ধা আনন্দে বলল,
‎”সবার পছন্দ হয়েছে?”
‎”হুম, তোর পছন্দ সবার পছন্দ হতে বাধ্য”
‎রাফেয়া বলল।
‎ মুগ্ধা লজ্জা পেল।
‎ইশতিয়াক সুযোগ পেয়ে আবার শুরু করল। “দেখছস? পুরো পরিবার জানে ব্যাপারটা, সেই জন্যই তো ভাইয়ারে পছন্দ করছোস।”
‎“চুপ থাক।”
‎“না থাকমু না। আমি সত্যের পথে।”
‎মুগ্ধা এবার নিজের জন্য কেনা দুইটা থ্রিপিস বের করল।
‎একটা হালকা নীল, অন্যটা সাদা আর বেগুনি মিশ্রিত।
‎সে একেকটা কাপড় সামনে ধরে সবাইকে দেখাচ্ছে, আবার নিজেই বলছে কোথায় পরবে।
‎“এইটা বাইরে গেলে পরমু। আর এইটা কলেজে।”

‎ইন্তিয়া বেগম মুগ্ধার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
‎মেয়েটা কত সহজে সবাইকে আপন করে নিতে পারে। কত সহজে একটা ঘর ভরে যায় তার উপস্থিতিতে।
‎ঠিক তখনই মুগ্ধা শেষ প্যাকেটটার দিকে হাত বাড়াল।
‎“আরে এইটাতে কি আছে?”
‎সে নিজেই যেন ভুলে গিয়েছিল।
‎প্যাকেট খুলতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো হলুদ রঙের একটা গাউন।
‎নরম ঝরঝরে কাপড়। হাতায় সূক্ষ্ম এমব্রয়ডারি। আলো পড়তেই হালকা ঝিলমিল করছে।
‎মুগ্ধা থেমে গেল। একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। তার চোখ বড় হয়ে গেছে।
‎আঙুল দিয়ে আলতো করে কাপড়টা ছুঁয়ে দেখল।
‎তারপর অস্পষ্ট স্বরে বলল,

‎“এটা তো…”
‎ঘরের সবাই তাকিয়ে আছে এখন।
‎মুগ্ধা যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না।
‎“এটা তো আমি পছন্দ করছিলাম… কিন্তু নেইনি…”
‎সে ধীরে মাথা তুলল।
‎“এটা এলো কোথা থেকে?”
‎ইশতিয়াক কথাটা শুনেই সোজা হয়ে বসল।
‎তারপর মুখে বিশাল দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।
‎“ওওও!”
‎মুগ্ধা তাকাল তার দিকে।
‎ইশতিয়াক নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
‎ “দ্যাখ! তোর বর তোরে কত ভালুপাশে!”
‎“চুপ!”
‎“তুই আমারে ভাইয়ার নামে মিথ্যা অপবাদ দিস! ছ ছি ছি!”

‎মুহূর্তের মধ্যে মুগ্ধার গাল লাল হয়ে গেল। লজ্জায় বোধ হয়।
‎তার মাথায় দোকানের সেই মুহূর্তটা ভেসে উঠল।
‎সে কতক্ষণ গাউনটার সামনে দাঁড়িয়েছিল। খুব পছন্দ হয়েছিল। কিন্তু দাম দেখে রেখে দিয়েছিল।
‎আর ইখতিয়ার…লোকটা পোশাকটা কিনেছে?কখন?কিভাবে? তার বুকের ভেতর কেমন উষ্ণ কাঁপুনি ছড়িয়ে পড়ল।
‎কিছু না বলে গাউনটা বুকের সাথে চেপে ধরে সে প্রায় দৌড়ে সিঁড়ির দিকে চলে গেল।
‎পেছন থেকে ইশতিয়াক চিৎকার করল,
‎“এইভাবে পালাইস না! আমরা কিছু বুঝি নাই!”
‎পুরো ঘরে হাসির রোল উঠল।
‎এতক্ষণে সবাই ব্যাপারটা বুঝে গেছে।
‎তাদের গম্ভীর, কম কথার ছেলেটা আস্তে আস্তে ফাঁসছে।

‎ রহিমাও মুচকি হেসে ফেলল।
‎ইশতিয়াক সাথে সাথে তাকাল তার দিকে।
‎ “বুড়ি তুই হাসছিস কেন?”
‎রহিমা নির্বিকার মুখে বলল,
‎ “শোক লেগেছে তাই।”
‎এক মুহূর্ত নীরবতা।
‎তারপর পুরো ঘর ফেটে পড়ল হাসিতে।

‎এদিকে মুগ্ধা প্রায় দৌড়ে ঘরে ঢুকল।
‎ঘরের ভেতরে হালকা অন্ধকার। পর্দা টানা। এসির ঠান্ডা বাতাসে চারপাশে ঘুমঘুম পরিবেশ।
‎ইখতিয়ার বিছানায় আধশোয়া হয়ে ঘুমাচ্ছে। এক হাত চোখের ওপর রাখা। চুল এলোমেলো।
‎মুগ্ধা আনন্দে প্রায় লাফাতে লাফাতে তার কাছে গেল।
‎“ইখতিয়ার!”
‎লোকটা নড়ল না।
‎“এই উঠেন!”
‎সে দুই হাতে ইখতিয়ারের কাঁধ ঝাঁকাল।
‎ইখতিয়ার বিরক্ত মুখে ভ্রু কুঁচকে ধীরে চোখ খুলল। “হুম…”
‎ঘুমে ভারী গলায় বলল,
‎“কি হইছে?”
‎মুগ্ধা তার সামনে গাউনটা মেলে ধরল।
‎ “এইটা!”
‎ইখতিয়ার কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। তারপর সব বুঝে ঠোঁটের কোণে ছোট্ট হাসি ফুটল।

‎“ও।”
‎“ও মানে?”
‎মুগ্ধা অবিশ্বাস নিয়ে বলল।
‎“কখন কিনছেন?”
‎ইখতিয়ার ধীরে উঠে বসল। ঘুমঘুম চোখে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
‎“তুমি যখন অন্য ড্রেস দেখতেছিলা।”
‎“আমি তো বুঝিই নাই!”
‎“বুঝার জন্য কিনি নাই তো।”
‎মুগ্ধা হাঁ করে তাকিয়ে রইল।লোকটা এত শান্তভাবে কথা বলে কিভাবে? এমনভাবে যেন এটা খুব সাধারণ কিছু। কিন্তু তার কাছে? তার বুকের ভেতর আনন্দে সবকিছু কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
‎“আপনি জানেন আমি কত পছন্দ করছিলাম এটা?”
‎“জানি।”
‎“কেমনে?”
‎“তোমার চোখ দেখলেই বুঝা যায়।”
‎কথাটা এত স্বাভাবিকভাবে বলল ইখতিয়ার যে মুগ্ধা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
‎তারপর হঠাৎ খুশিতে বলে উঠল,
‎“আমি আরেকবার ট্রায়াল দিয়ে আসি!”
‎ইখতিয়ার মাথা নাড়ল।

‎ “হুম। যাও।”
‎মুহূর্তের মধ্যে মুগ্ধা ওয়াশরুমে দৌড়ে ঢুকে গেল।
‎কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে বের হলো সে।
‎হলুদ গাউনটা পরে।
‎গাউনটা তার গায়ে অপূর্ব মানিয়েছে। নরম কাপড়টা হাঁটার সাথে সাথে দুলছে। মুখভরা আনন্দ। চোখ চকচক করছে।
‎সে সোজা আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
‎একবার ডানদিকে ঘুরছে। আবার বামদিকে।
‎কখনো হাতা ঠিক করছে, কখনো গাউনটা ছড়িয়ে ধরছে।
‎“উফফ…”
‎নিজেকেই বলল, “কিতনি সুন্দর লাগ রাহি হু মে! আআ!”
‎তারপর ঠোঁট কামড়ে নিজেকেই দেখে হাসল।
‎মুগ্ধা একসময় গুনগুন করে গান ধরল।
‎খুব আস্তে। খুব আনন্দ নিয়ে। তার সেই গুনগুনে পুরো ঘরটা যেন নরম উষ্ণতায় ভরে গেল।
‎ইখতিয়ার কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। ঠোঁটের কোণে কিঞ্চিত হাঁসি। একটা গোপন কাজ করল সে। তারপর আবার শুয়ে পড়ল। পাড়ি দিলো ঘুমের নগরীতে। এদিকে মুগ্ধা বামে ডানে ঘুরে গুনগুনিয়ে যায়।

‎২০২০ সালের ২৯ শেষ ফেব্রুয়ারি। সকাল এগারোটার প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়টা যেন আলাদা এক পৃথিবী। বিশাল ক্যাম্পাসজুড়ে তরুণ প্রাণের ব্যস্ততা, শব্দ আর স্বপ্নের মিশ্রণে তৈরি এক অদ্ভুত জীবন্ত আবহাওয়া। লাল ইটের রঙীন একাডেমিক ভবনগুলোর গায়ে রোদের ঝলক চিকচিক করছে। কোথাও ক্লাস শেষ হওয়ার ঘণ্টা, কোথাও ল্যাবের সামনে দাঁড়িয়ে তর্কে মত্ত কয়েকজন ছাত্র। কারও হাতে ড্রইং শিট, কারও বগলের নিচে মোটা মোটা বই। দূরে মেকানিক্যাল ওয়ার্কশপের দিক থেকে ধাতব শব্দ ভেসে আসছে—টাং! টাং! টাং!

‎ক্যাম্পাসের মাঝখানের বড় রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে শত শত ছাত্র-ছাত্রী। কেউ দল বেঁধে হেসে কথা বলছে, কেউ তাড়াহুড়ো করে ক্লাসে যাচ্ছে। ফুচকার দোকানের সামনে ছোট্ট ভিড়। গরম তেলে সিঙ্গারা ভাজার গন্ধ বাতাসে মিশে আছে। রোদের তাপ খুব বেশি না, তবে সাদা আলোয় পুরো ক্যাম্পাস ঝকঝক করছে। সবকিছুই ছিল স্বাভাবিক।
‎যতক্ষণ না একটা চিৎকার পুরো পরিবেশটা ছিন্নভিন্ন করে দিল।
‎“ওই দেখ! ছাদে কেউ দাঁড়িয়ে আছে!”
‎মুহূর্তের মধ্যেই মানুষের চলাফেরা থেমে গেল। কথাবার্তার শব্দ স্তব্ধ হয়ে এলো। শত শত চোখ একসাথে ঘুরে গেল পাঁচতলা একাডেমিক বিল্ডিংটার দিকে।

‎ছাদের একদম কার্নিশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে একটা মেয়ে। হাওয়ায় তার গোল কালচে নীল ফ্রকটা বারবার উড়ে উঠছে। মাথার কালো হিজাব পেছনের দিকে দুলছে বাতাসে। দূর থেকে মুখ স্পষ্ট দেখা না গেলেও বোঝা যাচ্ছে—তার চোখ আকাশের দিকে স্থির। অস্বাভাবিক স্থির।
‎নিচে দাঁড়ানো মানুষগুলোর বুক ধকধক করতে লাগল।
‎একজন শিক্ষক দৌড়ে বেরিয়ে এলেন ডিপার্টমেন্ট থেকে।
‎“কে ওখানে? কেউ উপরে যাও!”
‎কয়েকজন ছাত্র সিঁড়ির দিকে দৌড় দিল। কারও হাতে ফোন কাঁপছে। কেউ ভিডিও করতে গিয়েও থেমে গেছে ভয়ে। পুরো ক্যাম্পাসের ওপর যেন হঠাৎ এক চাপা আতঙ্ক নেমে এসেছে।
‎মেয়েটা নড়ল। খুব ধীরে। এক পা… দুই পা…
‎সে সামান্য পেছাতে শুরু করল।
‎নিচে দাঁড়ানো কয়েকটা মেয়ে চিৎকার করে উঠল। “না! প্লিজ না”

‎আর এক পা গেলেই শেষ। সব শেষ হবে।
‎রোদটা হঠাৎ যেন আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। বাতাসের শব্দও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। ছাদের ওপরে দাঁড়ানো মেয়েটার পোশাক উড়ছে, কিন্তু সে একদম শান্ত। অদ্ভুত শান্ত। যেন এই বিশাল পৃথিবীর সব কোলাহল থেকে অনেক দূরে চলে গেছে।
‎তার চোখ আকাশের দিকে।
‎নীল আকাশে ভেসে থাকা সাদা মেঘগুলোর দিকে।
‎হয়তো সে শেষবারের মতো পৃথিবীটাকে দেখছে।
‎নিচে দাঁড়ানো মানুষের ভিড় বাড়তেই থাকল। কেউ কাঁদছে, কেউ দোয়া পড়ছে। এক স্যার মোবাইল কানে নিয়ে কাঁপা গলায় অ্যাম্বুলেন্স ডাকছেন। কিন্তু কারও সাহস হচ্ছে না আরেকটু জোরে চিৎকার করার। মনে হচ্ছে সামান্য শব্দেও মেয়েটা পড়ে যাবে।
‎কারণ মেয়েটা ঠিক কার্নিশের কিনারায় দাঁড়িয়ে।
‎একটুখানি ভুল।এক ইঞ্চি পেছনে।তারপর শুধু সমাপ্তি। মেয়েটা তাকাল না কোনদিকে।
‎তার ঠোঁট কাঁপছে সামান্য। চোখ দুটো ধীরে বন্ধ হয়ে এল। তারপর বুকভরা একটা দীর্ঘ শ্বাস নিল সে। বাতাস থেমে গেছে যেন।
‎নিচে দাঁড়ানো শত শত মানুষ নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে আছে। মেয়েটার ঠোঁট নড়ল।

‎“আই লাভ ইউ…”
‎গলাটা কেঁপে গেল।
‎“আই লাভ ইউ ইখতিয়ার…”
‎নিচের ভিড়ের মধ্যে চাপা গুঞ্জন উঠল।
‎ইখতিয়ার? কে ইখতিয়ার? কেউ একজন অবাক হয়ে বলল,
‎ “ও কি ইখতিয়ারের নাম বলল?”
‎মেয়েটার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে এখন। কিন্তু মুখে অদ্ভুত এক হাসি। ভাঙা হৃদয় কষ্টে ভরা।
‎হাসল বৃহৎ। বলল,
‎“বড্ড ভালোবাসি তোমাকে…”
‎এক মুহূর্ত থামল সে। তারপর খুব আস্তে বলল,

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৬

‎“এই পৃথিবীকে…”
‎কথাটা বলার সময় তার চোখে এমন এক মায়া ফুটে উঠল, যেন সে সত্যিই বাঁচতে চেয়েছিল। এই রোদ, এই আকাশ, এই ব্যস্ত ক্যাম্পাস, ক্লাসের বিরক্তি, বন্ধুদের আড্ডা—সবকিছু নিয়েই বাঁচতে চেয়েছিল। কিন্তু কোথাও যেন ভীষণ ক্লান্ত হয়ে গেছে।
‎এক ফোঁটা অশ্রু নিচে পড়ে গেল পাঁচতলার ওপর থেকে।
‎তারপর—
‎সে এক পা পেছালো। শেষ..
‎ঠিক সেই মুহূর্তে ছাদের দরজার দিক থেকে একটা কাঁপা, ভাঙা গর্জন শোনা গেল—
‎“মুনতাহা…?”

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here