রাগে অনুরাগে পর্ব ১৪
সুহাসিনি ফাতেহা
ফারাজের কথা শুনেও তিতলি চোখ তুলে তাকাচ্ছে না। আজকে প্রায় এক সাপ্তাহ সে ফারাজের দিকে তাকায় না। কালও দূর থেকে ভালো করে তাকায় নি। ভুলবসত চোখ গেছে। উনার দিকে ফারিন ম্যাডাম তাকিয়ে থাকুক, কলেজের সব মেয়েরা তাকাক! তিতলি কিছু বলবে না। তাকে কেন তাকাতে বলছে? তিতলি তাকাবে না।
তিতলির ভাবনার মাঝেই ফারাজ রেগে গিয়ে বলে,
–“বেয়াদব কথা কানে যায় না?”
–“কথাটা বলার পর ও তিতলিকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ফারাজের মস্তিষ্ক জ্বলে উঠলো। যুবক রাগে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“আমাকে রাগাচ্ছো কেন?”
তিতলি তাও কিছু বলে না। মনে মনে অনেক শান্তি অনুভব করছে। আহ কি শান্তি। একসময় তিতলির সাথেও এমন করছে! এখন তিতলিও এমন করবে। মনে মনে বলে, “ভাল্লুক স্যার কোথাকার!”
ফারাজ আকাশসম রাগ নিয়ে আলগোছে নিজের ডানহাতের রুক্ষ তর্জনী এগোলো সপ্তদশীর মোলায়েম মুখপানে। পরক্ষণেই শক্ত হাতে চেপে ধরলো মেয়েটার থুতনি। মুখ উপরে তুলতে চাইলে, তিতলি ঠাঁয় নামিয়ে নিচ্ছে একইভাবে।
মেয়েটা না চাইতেও কন্ঠে একপ্রকার রাগ জেদ সব মিশিয়ে বলল,
“কি সমস্যা আপনার? বিরক্ত করছেন কেন?”
ফারাজ মনে মনে ভাবে যদি কোনো অধিকার থাকতো তারপর বুঝাতো কি সমস্যা? বিরক্ত করছে? একসময় তো ঠিকই পেছনে পড়ে থাকতো। এখন তার দিকে তাকাচ্ছে না কেন? তাকাতে হবে। না হলে আজ ফারাজ ছাড়বে না এই বেয়াদব মেয়েটাকে। বেয়াদব মেয়ের এত্ত জেদ ! তাকে ইগনোর করছে? নিজের আকাশসম ইগো, রাগ সব দূরে ঠেলে গলার স্বরে নরম করে বলল,
“আমার দিকে তাকাতে সমস্যা? চোখ তুল বলছি!”
“আমি তাকাবো না।”
ফারাজ রেগে বলে,
” কেন তাকাবি না আমার দিকে?” উত্তর দে?”
তিতলি উত্তর দেয় না। তিতলি গলবে না। একদম গলবে না। নিজের থুতনি থেকে ফারাজের হাত সরাতে চেয়ে চেঁচিয়ে বলল
” হাত সরান! ”
“সরাবো না।”
” আমি..আমি চেঁচাবো কিন্তু….”
“যত ইচ্ছে চেঁচা! আমি আছি চেঁচামি বন্ধ করার জন্য।”
“ছাড়ুন! ছাড়ুন!”
ফারাজ জোর করে তিতলির মুখ উপরে তুলতে চেয়ে শক্ত মুখাবয়বে কঠিন গলায় চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
“আগে তাকা!”
তিতলির ডিজে গান চালিয়ে নাচতে ইচ্ছে করছে। এত খুশি লাগতেছে! মনে হয় ফারিন ম্যাডাম ছ্যাকা দিয়েছে! দিবে তো! তিতলির বোদদোয়া লেগেছে না? দিনরাত শুয়ে বসে বোদদোয়া দিছে। ইশশ মনে হয় কাজে লেগেছে। যদিও সে জানে ফারিন ম্যাডামের সাথে ফারাজের কোনো সম্পর্ক নেই। তার রাগ কেন ফারিন ম্যাডামের সাথে সেদিন হেসে হেসে কথা বললো? কই তার সাথে কখনো মুচকি হাসি দিয়েও কথা বলে নি। উল্টো বেয়াদব মেয়ে বলে ধমকায়। তাই সে অভিমান করে বলে বেড়ায় ফারিন ম্যাডামের সাথে প্রেম করে। এবার থেকে বলবে ছ্যাকা খেয়েছে।
মেয়েটা রেগে বলল,
“না….না না…না!”
এতক্ষণে এসে ফারাজের অভিব্যক্তি থমকায়। শিথিল হয় মোটা ভ্রু। স্পষ্ট বোঝা গেল তার বদলে যাওয়া চিবুক। কিছুক্ষণ অমত্ত চেয়ে রইল সে। আসলে এসব তার সাথে যায় না। তাও কেন করছে এসব? নিজে ও বুঝতে পারছে না। মেয়েটা তাকাচ্ছে না, না তাকালে গোল্লায় যাক! তার তো ভালো লাগার কথা ছিলো। কিন্তু কেন এত রাগ হচ্ছে। ইচ্ছে করছে সব ভেঙে পেলতে।
ফারাজ কে চুপ হয়ে যেতে দেখে তিতলি পাশ
কেটে যেতে নিলে ফারাজ ফের হাত টেনে ধরে নিজের সামনে দাঁড় করিয়ে বলে,
“আমার কথা এখনো শেষ হয় নি।”
ফারাজের গলার সুর নরম শুনালো। কিন্তু চোয়াল শক্তই রইলো।
তিতলি এত সহজে রাগ ভাঙাবে না। সে রাগ নিয়ে একমাস ফারাজের সামনে হাঁটবে নাচবে ঘুরবে খাবে। তাই কিছু বলে না।
ফারাজ শেষমেষ না পেরে বলল,
“নোট নিয়ে যাও!”
তিতলি নোট ও নিবে না। জোর করে দিলেও ময়লার ডাস্টবিনে ছু’ড়ে ফেলে দিবে।
তাই বলল,
“আপনার নোটের আমার দরকার নেই। আপনার নোট ধুয়ে ধুয়ে আপনি পানি খান।”
বলে ফারাজের শক্ত হাতের মুঠো থেকে টেনে হিঁচরে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে চলে যেতে থাকে।
ফারাজ রেগেমেগে ফ্লোরে এক লা*থি দেয়। বেয়াদব মেয়েটাকে বুঝিয়েই ছাড়বে ফারাজ খানকে ইগনোর করার ফল কতটা ভয়ঙ্কর!
বিড়বিড় করে শক্ত মেজাজে আওড়ালো,
“নোট ধুয়ে ধুয়ে পানি কে খাবে সেটা সময় হলেই টের পাবেন! তোর নোট ধুয়ে যদি তোকে আমি পানি না খাওয়াচ্ছি তাহলে আমি ফারাজ খান নয়। মাইন্ড ইট!”
তিতলি একে একে সবগুলো ক্লাস করলো। কিন্তু ফারাজের দিকে ভুলে করে ও তাকায় নি। আশেপাশে হেঁটেছে সবার সাথে হেসে হেসে কথা বলেছে কিন্তু ফারাজের দিকে ফিরেও তাকায় নি। তিতলি মোবাইল থেকে জেনেছে কেউ দেখতে না পারলে তাকে কিভাবে নিজের প্রতি আকর্ষন করতে পারবে এমন কয়েকটা টিপস শিখেছে।
প্রথম টিপস: কথা বললেও ইগনোর করে চলা।
দ্বিতীয় টিপস: সামনে দিয়ে হেঁটে চলে যাবে কিন্তু একদম তাকানো যাবে না। যেন সে কোনো ফারাজ টারাজ কে চিনেও না।
তৃতীয় টিপস: অন্যের সাথে হেসে হেসে কথা বলা। কিন্তু ফারাজ স্যারকে দেখলেই মুখ ঘুরিয়ে নেওয়া।
এভাবে করলে নাকি মানুষের ইগোতে লাগে।
আপাতত সেগুলো করছে। মনে হয় কাজে লাগছে। কলেজ থেকে বাড়ি ফিরে গোসল করে একেবারে দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য নিচে নামলো।
সবাই তিতলির জন্য ডাইনিং টেবিলে অপেক্ষা করছে। তিতলি চেয়ার টেনে বসতেই আলেয়া শেখ খাবার বেড়ে দিলেন সবাইকে। তুষার খেতে খেতে তিতলিকে বলল,
“ফারাজ ভাইয়ের থেকে নোট গুলো নিয়েছিস?”
তিতলি খেতে নিয়ে কেশে উঠলো। ভয়ে গলা শুকিয়ে এলো। ভাই যদি জানতে পারে সে নোট নেয় নি। উল্টো মুখের উপর বলে এসেছে আপনার নোট ধুয়ে আপনি পানি খান। ভাই অনেক বকা দিবে সাথে আব্বুও। কত বড় একটা কথা বলে এসেছে।
তৌসিফ শেখ গ্লাসে পানি ঢেলে এগিয়ে দিয়ে বলেন,
“আস্তে করে খাও আম্মু! গলায় আটকে যাবে তো।”
“জ্বি আব্বু!” বলে তিতলি সাথে সাথে সব পানি একটানে খেয়ে নিলো।
তুষার ফের বলল,
“ওই নোট গুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ! পরিক্ষায় ১০০% এর ৭০% সেখান থেকে আসবে।”
তিতলি হেসে নিলো যাতে ভাই একটুও সন্দেহ না করে তাই বলল,
“নিয়েছি ভাইয়া! অর্ধেক তো ক্লাসে পড়েই মুখস্থ করে ফেলেছি।”
“ভালো করেছিস?”
তিতলি মনে মনে বললো,
“হুমম একদম ভালো করেছি।” ভাল্লুকের থেকে নেয় নি তো কি হয়েছে নিধির থেকে নিয়ে নিজে করে নিবে।
ফরিদা বানু আগেই খেয়ে ফেলছেন। তিনি সোফায় বসে বসে পান চিবুচ্ছেন। ওখান থেকেই তৌসিফ শেখের উদ্দেশ্য বললেন,
“মাইয়া মানুষরে বেশি পড়াইয়া লাভ নাই আব্বা। সেই শশুড় বাড়ি গিয়া থালাবাসন মাজন লাগে। নাতিনডারে ভালো পোলা দেখে বিয়া দিয়ে দাও!”
তিতলি পানি খেতে গিয়েই দ্বিতীয় বারের মতো কেশে উঠলো। তার দাদি মনে হয় তাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। দাদা তো নেই মন চাইলে দাদি আরেকটা বিয়ে করে নিতে পারে। তাকে কেন বিয়ে দিতে চাচ্ছে? তিতলির ভাবনার মাঝেই তৌসিফ শেখ বললেন,
“আম্মা তিতলি এখনো অনেক ছোট। এখন বিয়ে দিবো না। আগে বড় হোক তারপর ভেবে দেখা যাবে।”
“আমি নাতনির ভালোর লাইগাই বলি বাপ!”
তিতলি আড়চোখে দাদির দিকে তাকালো। বিয়ে দিয়ে দিলে আসলে মন্দ হয় না। দাদিকে কিছু বলবে। মেয়েটার মুখে কিছুই আটকায় না। দাদিকে খোঁচা মেরে বলল,
“আমার ভালোর জন্য আমাকে বিয়া দেওয়া লাগবে না দাদু! তোমার ভালোর জন্য তুমি একটা বিয়ে করে নাও!” —-বলে তিতলি উঠে চলে যাচ্ছে।
আলেয়া শেখ রেগে তৌসিফ শেখকে বললেন,
“দেখছেন ! মেয়েকে আরো কাঁধে তুলে আদর করেন। কাকে কি বলতে হয় কিছুই জানে না। এত বড় হয়ছে এখনো জ্ঞান বুদ্ধি কিছু হয় নি।”
তৌসিফ শেখ খাওয়া শেষ করে উঠতে উঠতে বললেন,
“আরে থামো! ছোট মেয়ে কি বলছে বুঝতে পারে নাই।”
আলেয়া শেখ ডাইনিং টেবিল হতে এঁটো প্লেট গুলো তুলে বেসিনের দিকে যেতে যেতে বলে গেলেন,
“সবসময় ছাড় দেন তাই বেশি লাফাচ্ছে।”
তৌসিফ শেখ প্রত্যুত্তরে কিছুই বললেন না।
তিতলি রুমে এসে মোবাইল হাতে নিলো। একঘন্টা পর টিউটর এসে পড়বে। তার তিতলি নিধিকে কল করলো। নোট গুলো সত্যি নেওয়া দরকার। টানা কয়েকবার রিং হওয়ার পর রিসিভ হলো।
নিধি: “হ্যালো?”
তিতলি: “কি করিস?”
নিধি: “ঘুম যাবো।” তুই?
তিতলি: “ঘুম পরে যাইস ! আগে আমাকে গত দুদিনের পদার্থ বিজ্ঞান ২য় পত্রের নোট গুলোর পিক তুলে পাঠাও।”
নিধি: “ওগুলো তো ফারাজ স্যারের।”
তিতলি: “আমি তোকে নোট দিতে বলছি স্যারের নাম বলতে বলি নাই।”
নিধি: “দাড়া! ”
তিতলি: “বসে আছি দাড়াতে পারবো না।”
রাগে অনুরাগে পর্ব ১৩
৫ মিনিট পর নিধি হোয়াটসআ্যাপ এ পিক তুলে পাঠালো। তিতলি কল কেটে দিয়ে পিক গুলো ডাউনলোড করে ফেসবুকে ডুকলো। ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে ফারাজের একটা পোস্ট সামনে এলো। কভার ফটো চেঞ্জ করছে। ১০ মিনিট আগে। কালো শার্ট প্যান্ট পড়া। তিতলির মনে হলো পিকটা তার দিকে তাকিয়ে আছে। তাকিয়ে থাকুক! তিতলি ভাল্লুকের খাঁচায় পা দিবে না।
তিতলি ও নিজের একটা ফটো আপলোড দিলো। মুখ দেখা যাচ্ছে না ভালো করে। ক্যাপশন হিসাবে লিখলো,
❝ শাহ সিমেন্ট দিয়ে মন শক্ত করছি এবার আসিও মন ভাঙাতে, গোলামের–পুত ।❞
