রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ১০
রিক্তা ইসলাম মায়া
বাম হাতের কবজিতে রোলেক্সের ঘড়ি জড়াতে জড়াতে রিদ বিরক্তি চোখে খালি ঘরটার দিকে তাকাল। সকালে ঘুম থেকে উঠে বেয়াদব বউটাকে সে দেখতে পায়নি। এখনো নিরুদ্দেশ বেয়াদব নারী। রিদ কতবার বেয়াদব নারীকে বলেছে তার ঘুম না ভাঙা অবধি যেন বিছানা ছেড়ে না উঠে। অথচ এই নারী তার কথা শুনলে তো? এই নারীর বাইরে কী কাজ থাকতে পারে স্বামী ছাড়া? বাসায় কাজের জন্য সার্ভেন্ট আছে, রিদের মা সুফিয়া আছেন, তাঁরা কখনো মায়াকে বলবেন না যে সকাল সকাল রিদকে ছেড়ে রান্নাঘরে হাজিরা দিতে। রিদ যতটুকু জানে বাসার কাজ সার্ভেন্ট করে সুফিয়া খানের নির্দেশনায়।
সেখানে মায়ার কোনো কাজ নেই সুফিয়া খানের পিছু পিছু ঘুরঘুর করা ছাড়া। রিদ সারাদিন বাসায় থাকে না। সে রাতে বাসায় ফেরে তাহলে সকালটা কি বেয়াদব নারী তার সাথে কাটাতে পারে না? অন্য সময় হলে একশো বার এসে রিদকে অকারণে বিরক্ত করে যাবে। অথচ যখন রিদ নিজে বেয়াদব নারীর সঙ্গে সুন্দর মুহূর্ত কাটাতে চায় তখনই এই নারী লাপাত্তা হয়ে বসে থাকে। রিদ বিরক্তি নিয়ে হাতে ঘড়ি জড়াল। মায়া সকালে ঘর থেকে বেরোনোর আগে রিদের কাপড়চোপড় নামিয়ে গুছিয়ে রেখে গেছে যেন রিদ ঘুম থেকে উঠে রেডি হতে তার অসুবিধা না হয়। রিদ ঘুম থেকে উঠেছে আরও মিনিট চল্লিশ আগে। এখন সকাল ৪:৪৭। রিদ শার্টের হাতা দুটো টেনে কনুই অবধি গুটিয়ে বাম হাতের গায়ের কোট ভাঁজ করে রেখে বেরোল ঘর ছেড়ে। রিদকে বেশিরভাগ সময় কালো ড্রেসআপে দেখা যায়। আজও তাই পরেছে। ফর্সা গায়ে কালো প্যান্টের সঙ্গে কালো শার্ট ইন করে জড়িয়েছে।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
রিদের এক্সিডেন্টের পর পাওয়ারফুল মেডিসিনে কারণে রিদ বেশ মোটা হয়েছে। দুই বাহুর পেশি ফুলে শার্ট ছিঁড়ে ফিকরে বেরোতে চায়। সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে রিদ মায়াকে দেখল ড্রয়িংরুমের মেইন দরজায় দাঁড়িয়ে বাইরে উঁকিঝুঁকি মারছে বারবার। মায়াকে দেখে মনে হচ্ছে সে কোনো কিছুর অপেক্ষায় দরজায় দাঁড়িয়ে। রিদ সোজা সেদিকে এগোল। মায়ার পিঠ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে এক হাতে মায়ার মাথা চেপে নিজের দিকে ঘোরাতে ঘোরাতে ভ্রু কুঁচকে বলল…
‘কী ম্যাডাম এখানে কী আপনার? ঘরে স্বামী রেখে বাইরে কী করেন?
হঠাৎ রিদের উপস্থিতিতে মায়া থতমত খেয়ে নত মস্তকে দাঁড়িয়ে মিনমিন করে বলল…
‘আয়ন ভাইয়া জুইকে নিয়ে আসবে সেজন্য এখানে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলাম।
রিদ মায়ার মাথা ছেড়ে থুতনি ধরে মায়ার মুখটা উঁচিয়ে বলল…
‘বোন আসবে ভালো কথা। স্বামীকে ভুলে বোনের জন্য অপেক্ষা করাটা কোন ধরণের ভদ্রতা শুনি?
‘আমি তো আপনার কাপড় গুছিয়ে রেখে এসেছিলাম রুমে।
‘কাপড় গুছিয়ে রেখে আসলে দায়িত্ব শেষ ম্যাডাম? আপনার স্বামীর আর কোনো প্রয়োজন থাকতে পারে না বউয়ের কাছে? আপনি না বলেছিলেন সংসার করতে চান? তাহলে শেষ সংসার করা?
‘করছি তো সংসার।
‘কীভাবে করছেন শুনি? আমি তো আপনার উন্নতি দেখছি না ম্যাডাম। শুনুন ম্যাডাম। আমার সাথে সংসার করতে হলে আমার বউ পুরোটাই চাই। আমি আমার মতো কাউকে চাই না। আমি জানি আমি খারাপ এবং হার্টলেস। তাই আমি আমার মতো আরেকটা খারাপ, হার্টলেস মানুষ চাই না। আমি চাই আমার বউয়ের সময় শুধু আমার জন্য থাকবে। আমি সময় দিতে না পারলেও সে আমার থেকে সময় করে নেবে। নেক্সট টাইম আমি ঘুম থেকে না ওঠা অবধি বিছানা ছেড়ে ওঠা যাবে না। বিয়ে করেছি বউকে দিয়ে বাসার কাজ করানোর জন্য নয়। তুমি বেলা অবধি আমার সাথে ঘুমিয়ে থাকলেও কেউ বলবে না কেন দেরি করে ঘুম থেকে উঠেছো? তাই নেক্সট টাইম ঘর থেকে না বেরিয়ে আমাকে রেডি করিয়ে দ্যান আমার সাথে ঘর থেকে বেরোবে মনে থাকবে?
রিদের আদেশে মায়া নত মস্তকে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিল। রিদ মায়ার দিকে আংশিক ঝুঁকে মায়ার থুতনি চেপে মুখটা ফের উপরে তুলে বলল…
‘লুক অ্যাট মি।
মায়া চোখ উঁচিয়ে রিদের দিকে তাকাতে চাইলে মুহূর্তেই চোখাচোখি হয়ে যায় রিদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সঙ্গে। মায়া লজ্জায় তৎক্ষণাৎ দৃষ্টি নত করতেই রিদ কপাল কুঁচকে বলল…
‘তুমি কি কোনোভাবে আমাকে লজ্জা পাচ্ছ রিত??
মায়া উত্তর করল না। বরং নত মস্তিষ্ক আরও নত করে নিল। রিদ মায়ার আড়ষ্ট অঙ্গভঙ্গি আর নত মস্তকের লাজুক মুখটা দেখে সে সিওর হলো মায়া রিদকে ভীষণ লজ্জা পাচ্ছে। হয়তো দুজনের রাতের ব্যাপারটায় লজ্জা পাচ্ছে মায়া। রিদ রাতে কী এমন করেছে যেটা সে আগে করেনি মায়ার সঙ্গে। এটা তাদের প্রথমবার ছিল না এই নিয়ে বেশ কয়েকবার দুজনের কাছে আসা হয়েছে তাহলে এখন নতুন করে লজ্জা পাওয়ার কি আছে আজব? রিদ মায়ার লাল ওষ্ঠের দিকে তাকাল। মায়ার ঠোঁটের বাম পাশটা বেশ কেটে গেছে। রিদ মায়ার ঠোঁটে কাটা স্থানে বৃদ্ধাঙ্গুলি চেপে বলল…
‘রুমে আসো। মর্নিং কিস করব একটা।
রিদের কথায় মায়া তৎক্ষনাৎ লজ্জায় পিঠ বেঁকিয়ে দাঁড়াল যার অর্থ মায়া যাবে না ঘরে। মায়া পিঠ মুড়ে দাঁড়াতে রিদ ফের মায়ার বাহু টেনে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলল…
‘ পিঠ বাঁকাতে বলিনি। রুমে চলো।
‘যাব না।
‘কোন দুঃখে ম্যাডাম?
‘আপনি ব্যথা দেন।
‘ ব্যথার কথা আগে মনে ছিল না? সংসার করার অফারটা কে দিয়েছিল? আমি না আপনি?
‘ অফার শেষ। আর দেব না।
‘আপনি বললে তো শেষ হবে না ম্যাডাম। অফার আমি এক্সেপ্ট করেছি তাই আমার রাইট আছে নিজের ইচ্ছামতো যেভাবে খুশি সেভাবে অফারটা ইউজ করার। এতে অফারদাতার কথা মানা হবে না। রুমে চলেন, আমি আমার অফার কাজে লাগাব।
‘আমি যাব না।
কথা বলেই মায়া রিদের দুই হাতের ফাঁকে বেরিয়ে পালিয়ে যেতে চাইলে রিদ তৎক্ষণাৎ পেছন থেকে মায়ার ওড়না টেনে ধরতে মায়ার মাথায় পেঁচিয়ে রাখা ওড়না খুলে যেতেই রিদের চোখে দৃশ্যমান হলো মায়ার গলায় থাকা লালচে দাগগুলো। মায়া চমকে উঠে তৎক্ষণাৎ ওড়নাটা গায়ে মাথায় পেঁচাল। রিদ তখনো মায়ার ওড়নার এক পাশ চেপে কপাল কুঁচকে তাকিয়ে মায়ার দিকে। মায়া রিদের হাত থেকে ওড়না টানতে চাইলে সেখানে উপস্থিত হন আরাফ খান। তিনি রিদকে কটাক্ষ করে বললেন…
‘এই তুই ওর ওড়না ধরে টানছিস কেন? মতলব কী বল তো? মেয়েমানুষ দেখলেই হুশ থাকে না, ওড়না ধরে টানতে হয়?
আরাফ খান সুযোগ পেয়ে রিদকে খোঁচা মেরে কথাটা বললেন। রিদের সঙ্গে আরাফ খানের একটা খোঁচাখোঁচির সম্পর্ক আছে। রিদকে সবসময় সুযোগে পাওয়া যায় না। যখন সুযোগে পাই তখন আবার রিদের সঙ্গে কথায় পেরে উঠেন না তিনি। তারপরও রিদকে হারানোর অধর্ম চেষ্টা কখনোই যাবে না আরাফ খানের। রিদ মায়ার ওড়নাটা হাতের মুঠোয় পেঁচিয়ে বিরক্তি চোখে তাকাল আরাফ খানের দিকে। বলল…
‘তোমার টাইমিং সেন্স আর ভালো হবে না দাদাভাই। সবসময় ভুল জায়গায় ভুল এন্ট্রি নাও তুমি।
আরাফ খানের খোঁচা মারা কথায় রিদও কথাটা খোঁচা মেরে কটাক্ষ করে বলল। আরাফ খান ক্ষেপে গিয়ে বলল…
‘আমি ভুল এন্ট্রি নেই?
‘সন্দেহ আছে?
আরাফ খান ফের খোঁচা মেরে বলল…
‘তাহলে তুই যে মেয়েমানুষের ওড়না ধরে টানিস সেটার কী হবে শুনি? আমিতো তোর মতো এতো অভদ্র না। সভ্যলোক। সেজন্য ঐ টাইমিং সেন্স অবধি সীমাবদ্ধ থাকি বেশি আগায় না।
আরাফ খানের কথায় রিদ কপাল কুঁচকে বলল…
‘এখানে মেয়েমানুষ কোথায় পেলে তুমি?
‘কেন তোর মায়াকে মেয়েমানুষ মনে হয় না?
‘না।
‘তাহলে কী মনে হয়?
‘আমার বউ মনে হয়।
‘তোর মতো বউ কি আমাদের ঘরে নাই? কই আমরা তো তোর মতো বউয়ের ওড়না ধরে চলি??
‘তোমার মুডের এক্সপায়ার ডেট হয়ে গেছে দাদাভাই। বউয়ের ওড়না ধরে টানার জন্য অভদ্রলোকেরই প্রয়োজন হয় সভ্যলোকের না। আর তুমি আমার মতো ইয়াং নও। বুড়ো হয়ে গেছ তাই ফিলিংস বুঝ না। বুড়ো শরীরে ঝং আসে তারপরও ফিলিংস আসে না বুঝেছ?
রিদের কথায় আরাফ খান বেশ তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে রিদকে আঙুল তুলে শাসিয়ে বললেন…
‘খবরদার রিদ। তুই আমাকে বুড়ো বলবি না। বুড়ো হবে তোর বাপ। আমি এখনো জোয়ান আছি। চার বাচ্চা বাপ আমি।
‘ চার বাচ্চার বাপ হয়ে কি এমন জয় করেছো শুনি?
‘ সেটা তুই আর তোর বাপ মিলে করতে পারিস নি সেটাই জয় করেছি বুঝেছিস?
‘ এজন্য তোমাকে সুইট সিক্সটিন বলব?
‘বলতে পারিস। আই ডোন্ট মাইন্ড।
আরাফ খানের সঙ্গে খোঁচাখোঁচি কথায় রিদ থেমে যায়। তাঁকে এই মূহুর্তে বাইরে যেতে হবে অথচ রিদ যে কাজে এসেছে সেটাই হচ্ছে না আরাফ খানের সঙ্গে কথা বাড়াতে গিয়ে। রিদ বিরক্তির চোখে আরাফ খানের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে মায়াকে ধমকে বলল….
‘রুমে আসো রিত কুইক।
মায়া কিছু বলবে তার আগেই আরাফ খান বাধা দিয়ে বললেন…
‘কেন মায়া রুমে যাবে কেন? ও এখন আমাকে সময় দেবে। আসো তো মায়া আমি তোমাকে নিয়ে একটা মেহমানের লিস্ট বানাব। আসো আসো।
রিদ কটমট করে মায়ার দিকে তাকাতে মায়া রিদের রাগান্বিত দৃষ্টি বুঝে এগিয়ে এসে আরাফ খানকে বলল…
‘আপনি ডাইনিং টেবিলে যান দাদাভাই। আম্মু সবাইকে ডাকছে খেতে। সবার খাওয়াদাওয়া শেষে আমি সময় করে আপনাকে মেহমানদের লিস্ট তৈরি করে দিব।
আরাফ খান মায়াকে কিছু বলতে গিয়েও বললেন না। বরং যেতে যেতে রিদকে ক্ষেপিয়ে দিয়ে ফের বলল….
‘আমি তোর বউকে তালা মেরে রেখে দেব রিদ, যেন আর খুঁজে না পাস দেখিস। বউ পাগল একটা।
আরাফ খান চলে যেতে মায়া রিদের মুখোমুখি হয়ে দাঁড়াল। রিদের মুঠো থেকে নিজের ওড়না ছাড়িয়ে রিদের বুকের কাছটায় দুহাত বাড়াল। রিদের লাগিয়ে রাখা শার্টের বোতামগুলো মায়া একবার খুলে পুনরায় লাগাতে লাগাতে বলল…
‘কালো ড্রেসআপে আপনাকে হেব্বি জোস লাগে নেতা সাহেব। দাদাভাই তো শুধু শুধু আপনাকে বদনাম দেয় বউ পাগল বলে। আসলে উনি তো জানেন না আপনার বউ যে জামাই পাগল সেটা। জানলে নিশ্চয়ই আপনাকে বদনাম দিতেন না তাই না?
শক্তপোক্ত মানুষগুলো যখন কাউকে ভালোবাসে তখন ভালোবাসার মানুষের মুখে একটু ভালোবাসাময় কথা শুনলেই তাঁরা রাগ ভুলে নরম হয়ে যায়। রিদের ক্ষেত্রেও তাই হলো। এতক্ষণ যে রিদ রেগেমেগে ফায়ার হয়ে ছিল সেই রিদ মায়ার একটু ভালোবাসাময় কথা শুনতে রাগ ভুলে মূহুর্তে গলে নরম হয়ে গেল। রিদের চেহারায় খেলে গেল নরম উষ্ণতা। মায়া ফের বলল…
‘এবার থেকে আমি রোজ আপনার কথা শুনব। আর কখনোই অবাধ্য হবো না। যার এমন একটা হ্যান্ডসাম জামাই আছে সে কি তার হ্যান্ডসাম জামাইর কথা না শুনে পারে বলুন? আমার পাপ হবে না?
মায়ার বাড়াবাড়ি রকমের ভালোবাসায় রিদ কপাল কুঁচকে মায়াকে বলল…
‘ এবার বেশি হয়ে যাচ্ছে না তেল মালিশ করাটা?
মায়া একই সুর টেনে ফের রিদকে বলল…
‘দশটা না পাঁচটা আমার একটা মাত্র হ্যান্ডসাম জামাই আপনি, আপনাকে তেলমালিশ করলেও সওয়াব আছে আমার বুঝেছেন। আল্লাহ নেকি দিবে। এবার আসুন একটু আদর করে দিই তাহলে রাগ ভেঙে যাবে আপনার।
মায়া দুপা উঁচিয়ে রিদকে গালে চুমু খেতে চাইলে রিদ নিজের মাথা পিছনে সরিয়ে নিল। মায়ার মাথা চেপে মায়াকে পিছনে ঠেলে দেয়। রিদের ব্যক্তিগত মুহূর্ত পাবলিকলি করা পছন্দ নয়। বউ তার ব্যক্তিগত জিনিস। বউয়ের সাথে সামান্য রোমান্সও তার ব্যক্তিগত আর সেটা হবে বন্ধ দরজার ভিতরে। এইভাবে খোলা ড্রয়িংরুমে সবার সামনে নয়। রিদ মায়ার মস্তিষ্ক চেপে পিছনে সরিয়ে দিয়ে বলল…
‘ভণ্ডামি ভালোই শিখেছেন ম্যাডাম। স্বয়ং রিদ খানও ফেল আপনার ভণ্ডামিতে। তবে আপনার ভণ্ডামির লেভেল অন্য একদিন পরীক্ষা করব আজ তোলা রইল। এখন চলেন খাবেন।
‘ তাহলে আপনি আমার উপর রাগ করে নেই তো?
‘না।
‘সত্যি?
রিদ মায়ার কপালে দুই আঙুলে টোকা দিতে দিতে বলল…
‘দুপুরে বোরকা পরে রেডি থাকবে। গাড়ি পাঠাব আমি। সাথে চাদর কিংবা ওভারকোট নিয়ে নেবে। রাতে আমাদের ফ্লাইট আছে।
রিদ হঠাৎ প্রসঙ্গ পাল্টে এই কথাটা বলল। মায়া চমকে উঠে রিদকে শুধিয়ে জানতে চেয়ে বলল…
‘ফ্লাইট মানে? কোথায় যাব আমরা?
রিদ পাল্টা প্রশ্ন করে বলল…
‘কোথায় গেলে খুশি হবে তুমি?
মায়া অধৈর্য্যের নেয় রিদকে শুধিয়ে বলল…
‘ প্লিজ বলুন না কোথায় যাব আমরা?
‘ আপাতত সিঙ্গাপুরে যাব শপিংয়ের জন্য?
মায়া অবাক চোখে তাকিয়ে বলল…
‘বিয়ের শপিংয়ের জন্য আপনি আমাকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাবেন?
রিদ মায়ার কথাটা মায়াকে ফেরত দিয়ে বলল…
‘গেলাম। সমস্যা কোথায়? দশটা না পাঁচটা একটা মাত্র বউ আমার। আর বউয়ের এতটুকু শখ পূরণ করার মতোন এবিলিটি আল্লাহ আমাকে দিয়েছেন। দুপুরে রেডি থেকো রাতে আমাদের ফ্লাইট আছে।
মায়া চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল….
‘অনুষ্ঠানের আর মাত্র ছয় দিন বাকি। এখন দেশের বাইরে গেলে আসব কখন আমরা?
‘রাতের ফ্লাইটে যাব। সকালে দুজন ঘুমাব, বিকালে তোমাকে শপিংয়ে নিয়ে বেরুব। শপিং শেষে পরশুদিন দিনের ফ্লাইটে বাংলাদেশে ব্যাক করব। দুই দিনে হয়ে যাবে। চলবে না?
মায়া তৎক্ষনাৎ মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিয়ে বলল…
‘চলবে।
‘এই তো আমার লক্ষ্মী বউ। এইভাবে স্বামীর কথা শুনে থাকবে তাহলে যত্ন করে রাখব বুঝেছ??
‘আচ্ছা।
রিদ মায়ার কাঁধ চেপে ডাইনিংয়ের দিকে এগোল। আরাফ খান মায়াকে নিজের পাশে বসতে বললে মায়া রিদ ও আরাফ খানের মধ্যস্থতায় চেয়ার টেনে বসল। হেনা খান, নিহাল খান, রাদিফ এর পরপরই এসে বসল ডাইনিং টেবিলে। সুফিয়া খান সার্ভেন্ট দিয়ে ডাইনিং টেবিল সাজালেন খাবারে। সকলে যার যার প্লেটে নাস্তা তুলে নিচ্ছে। রিদ মায়ার প্লেটে খাবার তুলে সেও নিল। সুফিয়া খান নিহাল খানের পাশে চেয়ারে বসতে বসতে রিদকে গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করে বললেন…
‘আজ রাতের ফ্লাইটে সিঙ্গাপুর যাচ্ছো তোমরা?
‘জি।
‘কয়দিন লাগবে?
‘দুই থেকে তিনদিন।
‘তিনদিনে ম্যানেজ করতে পারবে? নাকি অনুষ্ঠানের ডেট পিছাব?
‘প্রয়োজন পড়বে না। ম্যানেজ হয়ে যাবে।
রিদের খবর কারও কাছে নেই। রিদ সিঙ্গাপুরে যাবে সেটা খান বাড়ির কেউ জানে না এমনকি রাদিফও না। অথচ সুফিয়া খানের কাছে রিদের খবর আছে। তিনি কীভাবে জানেন কেউ জানে না। তবে রাদিফ রিদের সম্মতিতে উৎসাহে বলল…
‘ভাই তাহলে আমার জন্য কয়েকটা ব্র্যান্ডের ঘড়ি নিয়ে এসো তো।
‘ ওকে।
রাদিফের কথায় আরাফ খান বললেন…
‘তোরা কি শপিংয়ের জন্য যাচ্ছিস রিদ??
‘হুম।
‘তাহলে আমিও যাব তোদের সাথে।
আরাফ খান কথাটা অতি উৎসাহে বলে ফেলেছেন কিন্তু হেনা খান তৎক্ষণাৎ বাধা দিয়ে বললেন…
‘তুমি এই বয়সে ওদের সাথে গিয়ে কী করবে? শেষ বয়সে এত জার্নি তোমার শরীরের জন্য ভালো হবে না। ওরা বিয়ের শপিং করতে যাচ্ছে রেস্ট নিতে নয়।
হেনা খান সরাসরি আরাফ খানকে বুড়ো বলায় বেশ গায়ে লেগেছে উনার। কিছুক্ষণ আগে রিদ উনাকে বুড়ো বলায় উনি বেশ ক্ষেপে গিয়েছিলেন রিদের উপর। এই নিয়ে রিদকে বেশ উঁচু গলায় কথাও শুনিয়েছেন, এখন সেই রিদের সামনেই উনার মুখটা ছোট হয়ে গেল উনার বউয়ের জন্য। আরাফ খান থমথমে মুখে মুখটা চুপসে নিতে রাদিফ হঠাৎ মনে করার মতো করে বলল…
‘ আচ্ছা ভাই, তোমার জন্মদিন পরশু দিন না? ১৫ই জুন?
মায়া অবাক চোখে রিদের দিকে তাকাল। রিদের জন্মদিন যে ১৫ই জুন সেটা মায়া তো আজ অবধি জানতে পারল না। রাদিফের কথায় রিদ বিরক্তি চোখে তাকিয়ে পুনরায় খাওয়ায় মনোযোগ দিল। সে এসব জন্মদিন পালনে বিশ্বাসী নয় আর না এসব পছন্দ করে। অথচ মায়া অবাক গলায় রিদকে শুধিয়ে বলল…
‘সত্যি আপনার জন্মদিন ১৫ই জুন?
রিদ মায়াকেও উত্তর করল না। যেন সে শুনতে পায়নি কথাটা। রাদিফ সিওর হওয়ার জন্য সুফিয়া খানকে প্রশ্ন করে বলল…
‘আম্মু তুমি বলোতো, রিদ ভাইয়ের জন্মদিন ১৫ই জুন না?
‘হুম।
সুফিয়া খানের সম্মতিতে মায়া রিদের দিকে তাকাল। রাদিফ ফের রিদকে বলল…
‘ভাই তুমি পরশু দিন বাংলাদেশে যেভাবেই হোক চলে আসবে তাহলে আমরা ছোটখাটো একটা সেলিব্রেশন করব।
‘নট ইন্টারেস্টেড।
রিদের গম্ভীর গলায় ছোট উত্তর করলো। রাদিফ আপত্তি জানিয়ে কিছু বলবে তার আগেই সুফিয়া খান রাদিফকে থামিয়ে বললেন…
‘আমি তোমার বিয়ের কথা ভাবছিলাম রাদিফ। মেয়ে আমার পছন্দের। যেহেতু তোমার কোনো পছন্দ নেই তাই আমার পছন্দের মেয়েকে একবার দেখতে পারো। আশা করছি মায়ের পছন্দে ঠকবে না তুমি।
রিদ বাদে উপস্থিত সকলের মাঝে বিস্ফোরণ ঘটল সুফিয়া খানের কথায়। সুফিয়া খান প্রথমে রিদের বিয়ের অনুষ্ঠান রাখলেন কাউকে না জানিয়ে, এখন আবার রাদিফের জন্য মেয়েও পছন্দ করে ফেলেছেন অথচ কেউ জানলই না? নিহাল খান ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন সুফিয়া খানের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে। সুফিয়া খানের ফাঁকে এক পলক নিহাল খানের সঙ্গেও চোখাচোখি হয়ে গেল। রাদিফের সবে মন ভেঙেছে। দীর্ঘ তিন বছরের রিলেশনশিপ ভেঙে নতুন করে কাউকে মনে জায়গা দেওয়ার মতো মানসিকতা রাদিফের নেই। সে সবার সাথে আপাতত নিজেকে মানিয়ে নিতে সুফিয়া খানের ভয়ে খান বাড়িতে থাকছে নয়তো সে এখনো মুরাদপুরের ফ্ল্যাটে বসে মন ভাঙার দুঃখবিলাস করত। রাদিফের হাসিমুখটা মূহুর্তে চুপসে গিয়ে বলল…
‘আমার তোমার পছন্দে বিয়ে করতে আপত্তি নেই আম্মু তবে সেটা পাঁচ বছর পর করব। আমি আপাতত নিজেকে গুছিয়ে নিতে চাই। পাশাপাশি আব্বুকেও রাজনৈতিকভাবে সময় দিতে চাই।
‘ বাবাকে সময় দিতে চাও ভালো কথা। কিন্তু বিয়ের জন্য তোমার পাঁচ বছর লাগবে কেন শুনি?
‘আমি সেটেল হয়ে বিয়ে করব আম্মু।
‘তুমি পড়াশোনা জানা শিক্ষিত একটা ছেলে। ডাক্তারি করতে না চাও তাহলে রাজনীতির পাশাপাশি খান পরিবারের পারিবারিক ব্যবসায় জড়িত হয়ে যাও। এতেই তোমার লাইফ সেটেল। এখানে আলাদাভাবে সেটেল হওয়ার কিছু দেখছি না রাদিফ।
সুফিয়া খানের কথাটা বেশ যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু রাদিফ এই মূহুর্তে আপাতত বিয়ের জন্য প্রস্তুত না। সে আরও কিছুটা সময় চাই নিজেকে গুছিয়ে তুলতে। রাদিফ বেশ বিনীত স্বরে সুফিয়া খানকে বলল….
‘ আমি বিয়ে করব আম্মু। তবে প্লিজ আমাকে আরও একটু সময় দাও। কারও দায়িত্ব নেওয়ার মতো মানসিকতা আমি এই মূহুর্তে পাচ্ছি না। আমি বেশ ডিস্টার্ব।
রাদিফের মনের জটিলতা বুঝে সুফিয়া খান চুপ করে গেলেন। তিনি আর আগ বাড়িয়ে রাদিফকে কোনো কিছুর জন্য প্রশ্ন করলেন না। রাদিফের মন ভাঙার বিষয়টা মাথায় রেখেই সুফিয়া খান রাদিফের বিয়ের বিষয়টা ভেবেছেন। রাদিফ উনার ছোট ছেলে। বেশ আদুরের এবং মানসিকতা বেশ নাজুক রাদিফ। রাদিফ ছোটখাটো বিষয়ে খুব দ্রুত কষ্ট পেয়ে যায়। সেজন্য তিনি রাদিফের জন্য সবসময় বেশ চিন্তিত থাকেন। রাদিফ রিলেশনের ব্যাপারে কষ্ট পাচ্ছে ভেবেই তিনি দ্রুত রাদিফের বিয়ে দিয়ে বউ আনতে চাচ্ছেন। জীবনসঙ্গী থাকলে রাদিফ কষ্ট পাওয়ার সুযোগ পাবে না।
রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ৯
সুফিয়া খান আপাতত রাদিফকে কিছু না বললেও রাদিফের জন্য ঠিক করা মেয়েকে রিদ-মায়ার বিয়ের মেজবানে দাওয়াত করে রেখেছেন। সেদিন দুজনের মুখোমুখি হলে হয়তো রাদিফ মেয়েটিকে দেখে নিল এক ঝলক। আয়ন জুইকে নিয়ে খান বাড়িতে পৌঁছাল দুপুরের পরে। ততক্ষণে মায়া রিদের পাঠানো গাড়িতে উঠে চলে গেছে চট্টগ্রাম এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে। সেখান হতে রিদ মায়াকে নিয়ে প্রথমে ঢাকা আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্টে পৌঁছায় তারপর সেখান হতে রাত বারোটার ফ্লাইটে সিঙ্গাপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। রিদ মায়া একাই শপিংয়ে বেরিয়েছে সিঙ্গাপুরের উদ্দেশ্যে, আসিফ আপাতত ঢাকা আছে রিদের কোম্পানির কাজে। সে রিদ দেশে ফিরলে চট্টগ্রামে ফিরে যাবে।
