রুপুর বিয়ে পর্ব ৩৫
Bobita Ray
“পালিয়ে এসেছ মানে? তোমার কী মাথা খারাপ হয়ে গেছে? তুমি যে কতবড় বোকামি করেছ। তা তুমি কী বুঝতে পারছ? তোমার মা যদি ভুলেও জানতে পারে। কতবড় সর্বনাশ হয়ে যাবে। তুমি কী একবারও ভেবে দেখেছ?”
বহুকষ্টে মেজাজ ধরে রেখেছে রুপু। আর সম্ভব হচ্ছে না। ইচ্ছে করছে এখুনি বিনয়কে কঠিন কিছু কথা শুনিতে দিতে। বিনয়ের মা যদি ভুল করেও জানে, বিনয় আর কোথাও না। রুপুর কাছে এসেছে। তাহলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। শুধু তাই নয়। সব ঝড়ঝাপ্টা রুপুর উপর দিয়েই যাবে। অথচ বিনয়ের এখানে আসার আগ পর্যন্ত রুপুর সাথে বিনয়ের কোনরকম যোগাযোগই ছিল না।
রুপু বিনয়ের হাত ধরে পুকুর পাড়ে নিয়ে গেল। চাপা কণ্ঠে বলল,
“তুমি এখুনি চলে যাও।”
বিনয় আঁতকে উঠল। হড়বড় করে বলল,
“চলে যাব মানে? আমি তো একা যাওয়ার জন্য এখানে আসিনি।”
রুপুর এখন প্রচণ্ড বিরক্ত লাগছে। রাগী কণ্ঠে বলল,
“তুমি আমার এখানে কিছুতেই থাকতে পারবে না।”
“বেশ তাহলে তুমি আমার সাথে চলো।”
“তোমার মাথা ঠিক নেই।”
বিনয় চট করে রুপুর দুহাত চেপে ধরল। ভেজা কণ্ঠে বলল,
“তুমি চলে আসার পর সত্যিই আমার মাথা এলোমেলো হয়ে গেছে রুপু। তুমি এত পাষাণ কেন? কতবার কত নম্বর থেকে তোমাকে ফোন করেছি। মেসেজ করেছি। তুমি ভুলেও আমার ফোন ধরোনি। মেসেজের রিপ্লে দাওনি। আমি তোমাকে ছাড়া আর একমুহূর্ত থাকতে পারব না রুপু।”
“এতদিন বেশ তো ছিলে।”
রুপুর কণ্ঠে কী অভিমান না অনুরাগ? ঠিক বোঝা গেল না। বিনয় মাটির দিকে তাকিয়ে লজ্জিত ভঙ্গিতে বিড়বিড় করে বলল,
“আমার প্রচণ্ড খিদে লেগেছে রুপু।”
রুপুর খুব মায়া লাগল। মানুষটা কতটা সময় না খেয়ে আছে, কে জানে। রুপু কোনরকম আবেগ দেখাল না। চোখে-মুখে কাঠিন্য ফুটিয়ে বলল,
“তুমি এইখানটায় দাঁড়াও। আমি খাবার নিয়ে আসছি।”
বিনয় রেগে গেল। চাপা কণ্ঠে গর্জে উঠে বলল,
“আমাকে কী তোমার ভিক্ষুক বলে মনে হচ্ছে? খবরদার রুপু, তুমি এখানে খাবার আনবে না।”
রুপু বেশ বেকায়দায় পড়ল। ঠাম্মির সামনে বিনয়কে নিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে না। আবার মানুষটা খিদেয় ছটফট করছে। সেটাও সহ্য হচ্ছে না। রুপু যে কক্ষে ক্লাস করায়। সেই কক্ষ তো এখন ফাঁকা। বিনয়কে সেখানে নিয়ে গেলে কেমন হয়? রুপু ভেবেচিন্তে বলল,
“চলো আমার সাথে।”
বিনয় রুপুর পিছুপিছু হেঁটে গেল। ক্যাটারিং কক্ষের সামনে গিয়ে ঈশান স্যারের সাথে রুপুর মুখোমুখি দেখা হলো। স্যার কম্পিউটারে কী সব দরকারি কাজ করছিল দেখে, ছুটির পরও বাসায় যেতে পারেনি। রুপুর পিছুপিছু একজন ভদ্রলোককে আসতে দেখে, বেশ অবাক হলো ঈশান। তবে কিছু জিজ্ঞেস করল না। মাথা নিচু করে চলে গেল। লোকটা রুপুর পিছুপিছু ঘরে ঢুকে সশব্দে দরজা বন্ধ করল। ঈশান চমকে উঠে খুব অল্প সময়ের জন্য শুধু একবার পেছন ফিরে তাকাল। তারপর দ্রুত পায়ে চলে গেল।
বিনয়ের ভাবগতিক রুপুর মোটেও ভালো লাগছে না। দরজা বন্ধ করার শব্দে রুপু ভ্রু কুঁচকে তাকাল। বলল,
“অসভ্যের মতো দরজা আটকালে কেন?”
বিনয় একগুঁয়ের মতো বলল,
“আমার ইচ্ছে। আর আমি তো এতক্ষণ খেয়ালই করিনি। তুমি শাঁখা-সিঁদুর খুলে ফেলেছ কেন? বিয়ের পরও তোমার খুব কুমারী সাজার শখ হয়েছে, তাই না?”
“আমার এখন তোমার সাথে মোটেও ঝগড়া করতে
ইচ্ছে করছে না। তুমি একটু অপেক্ষা করো। আমি খাবার নিয়ে আসছি।”
“তুমি থাকো কোথায়? আমাকে সেখানে নিয়ে চলো। এইঘরে এত গরম কেন? আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।”
“যেভাবে দরজা আটকেছ। দম বন্ধ তো হবেই। দরজা খুলে দাও।”
বিনয় দরজা খুলে দিল। রুপু বলল,
“একটু অপেক্ষা করো। আমি এখুনি আসছি।”
“আমিও তোমার সাথে যাব।”
“আমার সাথে যাব বললেই তো যাওয়া যাবে না। আর তখন থেকে তোমার ফোন বাজছে। ফোনটা রিসিভ করছ না কেন?”
বিনয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আমার এখন মায়ের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।”
“ফোনটা রিসিভ করে কথা বলো। তোমার মা তোমাকে না দেখতে পেয়ে হয়তো খুব চিন্তা করছে। কষ্টও পাচ্ছে খুব। কে জানে, হয়তো এতক্ষণে অজ্ঞান-টজ্ঞান হয়ে গেছে।”
রুপুর কথাশুনে বিনয়ের একটু ভয় ভয় লাগছে। তবে ভয়কে মোটেও পাত্তা দিল না বিনয়। অভিমানী কণ্ঠে বলল,
“করুক চিন্তা। পাক কষ্ট। মাতো আমার কষ্ট বুঝল না। আমি কেন এখন মায়ের কষ্ট বুঝব।”
রুপুর খুব আশ্চর্য লাগছে। মা ভক্ত ছেলে মায়ের আঁচল ছেড়ে এতটা বেপরোয়া হয়ে এতদূর যে ছুটে এসেছে। ভাবতেই রুপুর খুব অবাক লাগছে। রুপু সন্দিহান কণ্ঠে বলল,
“এখানের ঠিকানা কোথায় পেলে সত্যি করে বলোতো?”
বিনয় রহস্য করে হাসল। রুপুর কৌতূহল মিটল না। বলল,
“একটু অপেক্ষা করো। আমি খাবার নিয়ে এখুনি আসছি।”
বিনয়কে আর কোনকথা বলার সুযোগ না দিয়ে খাবার আনতে চলে গেল রুপু।
বিনয় হাত-মুখ ধুয়ে ভাত মেখে গপাগপ খাচ্ছে। বিনয়ের শার্টের হাতায় মাছের ঝোল মেখে একাকার অবস্থা। রুপু বলল,
“আস্তেধীরে খাও।”
“আর একটু ভাত দাও তো রুপু। প্রচুর খিদে লেগেছে।”
রুপু যত্ন করে বিনয়ের পাতে ভাত-তরকারি তুলে দিল।
বিনয় ভাত মেখে খেতে খেতে খুশি খুশি গলায় বলল,
“চটজলদি আমাকে একটা বিছানা করে দাও। অনেকগুলো দিন আমি শান্তি মতো ঘুমাই না। আজ লম্বা একটা ঘুম দেব।”
বিনয় চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে বসল। তারপর পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরাল। সিগারেটে কায়দা করে টান দিয়ে শূণ্যে ধোঁয়া ছাড়ল। বিনয়ের কাণ্ড দেখে রুপু হতবাক হয়ে গেল। বলল,
“সিগারেট খাওয়া ধরলে কবে থেকে?”
বিনয় মনের আনন্দে সিগারেটে সুখটান দিল। বিষাদমাখা কণ্ঠে বলল,
“তুমি চলে আসার পর থেকে।”
“তোমার মা কিছু বলেনি?”
“প্রথমদিনই মায়ের কাছে ধরে পড়ে গেলাম। মা কঠিন বকা দিল। কেঁদেকেটে দিব্যি-টিব্যি দিয়ে অস্থির।
এরপর থেকে বাড়িতে আর সিগারেট খাই না।”
“এত তাড়াতাড়ি তোমার পরিবর্তন দেখে তোমার মা ঘাবড়ে যায়নি?”
বিনয় হেসে ফেলল। বলল,
“সে আর বলতে। মায়ের ধারণা তুমি দূরে গিয়েও আমাকে একদণ্ড শান্তিতে থাকতে দিচ্ছ না। পুরোপুরি বশ করে ফেলেছ আমাকে।”
“আমার ঠিকানা তোমাকে কে দিয়েছে বাবা না অয়ন?”
“বলতেই হবে?”
“বাবা দিয়েছে?”
“হুঁ।”
“তুমি চাইলে আর বাবা তোমাকে ঠিকানা দিয়ে দিল?”
“আরেহ্ না। আমি তো জানতামই না। বাবা তোমার ঠিকানা জানে। তুমি চলে আসার পরে আমি অতিরিক্ত চিন্তায় অসু্স্থ হয়ে গেলাম। এতটাই অসুস্থ হলাম। হাসপাতালে ভর্তি পর্যন্ত হতে হলো। কড়া ডোজের ঘুমের ঔষধ খেয়েও রাতে ঘুমাতে পারি না। ঠিকমতো খেতে পারি না। শো-রুমে যেতেও ভালো লাগে না। সারাদিন রাস্তায় রাস্তায় হেঁটে বেড়াই। তোমাদের বাসায় গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকি। আমার মাকে দেখলেই পাগলামি করি। মা আমার পাগলামি দেখে কাঁদে। আর আমি হাসি। মা আমার মাথায় হাত রেখে প্রতিশ্রুতি দেয়। তোমাকে যে করেই হোক আমার জীবনে ফিরিয়ে আনবে। আমি মাকে বিশ্বাস করে তোমার ফিরে আসার দিন গুনি। আর মা ছোট মাসির সাথে আমার বিয়ের ব্যাপারে পরামর্শ করে। মায়ের ধারণা আমাকে আবার নতুন করে বিয়ে দিলেই আমি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাব। বাবা দিনকে দিন আমার অবনতি দেখে, মায়ের অগোচরে আমার হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বলল,
“এই ঠিকানায় গেলে তুই রুপুকে পাবি। তোর ইচ্ছে হলে তুই রুপুর কাছে যেতে পারিস। আর ইচ্ছে নাহলে তোর মায়ের পছন্দ করা মেয়েকে বিয়ে করতে পারিস। আমার কোনকিছুতেই আপত্তি নেই। শুধু যা করবি। খুব ভেবেচিন্তে করবি।”
বাবার কথাশুনে আমি তোমার ঠিকানা নিয়ে বড় আশা করে মায়ের কাছে গেলাম। মা ভয়ংকর রেগে গেল। মা কিছুতেই তোমাকে আর ও-ই বাড়িতে ফিরিয়ে নিতে চায় না। কাগজটা আমার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে কুচিকুচি করে ছিঁড়ে ফেলল। আর তোমাকে ভুলে যেতে বলল। মায়ের ব্যবহারে জীবনে প্রথমবারের মতো আমি প্রচণ্ড কষ্ট পেলাম৷ মা যে আমার সাথে এমন একটা কাণ্ড করবে। আমি ভাবতেই পারিনি। তোমার কাছে আসার যখন প্রায় সবরকম পথ বন্ধ। তখন পালিয়ে আসা ছাড়া আমার আর কোন উপায় ছিল না।”
বিনয়ের মুখে এত দুঃখের কাহিনী শুনে কেন যেন রুপুর খুব হাসি পেল। রুপুকে অকারণে হাসতে দেখলে বিনয় রেগে যাবে দেখে, রুপু অন্যদিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে হাসল। মুখের হাসি চট করে লুকিয়ে চোখে-মুখে গাম্ভীর্য ফুটিয়ে বলল,
“তুমি এখুনি তোমার মাকে ফোন করো।”
বিনয় ভীতু কণ্ঠে বলল,
“না। আমি ফোন করব না।”
“আমি যখন ফোন করতে বলেছি। তুমি অবশ্যই ফোন করবে।”
বিনয় অসহায় হয়ে পড়ল। করুন কণ্ঠে বলল,
“রুপু প্লিজ..”
“তোমার মাকে ফোন করো। তারপর ফোনটা আমার হাতে দাও। আমি কথা বলব।”
বিনয় ভীতু কণ্ঠে বলল,
“কোন দরকার নেই। তুমি.. তুমি কী কথা বলবে।”
রুপু বিনয়ের হাত থেকে জোর করে ফোনটা নিয়ে নিল। তারপর বিনয়ের কাছ থেকে সরে গিয়ে বীথি রানীকে ফোন করল৷ ফোনটা বোধহয় বীথি রানীর হাতেই ছিল। রিং হতেই বীথি রানী ফোন রিসিভ করে কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলল,
“তুই এখন কোথায় বাবা? আমার ভুল হয়ে গেছে। এরকম ভুল আর জীবনেও হবে না রে বাবা। তুই যেখানেই থাকিস না কেন! শিগগিরই আমার কাছে ফিরে আয়। তোর চিন্তায় অস্থিরতায় আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।”
রুপু বীথি রানীর কাঁদো কাঁদো কণ্ঠ হুবহু নকল করে বলল,
“আপনার আদরের ছেলে তো এখন আমার কাছে মা…”
বীথি রানী চমকে উঠল। অস্থির হয়ে বলল,
“হ্যালো হ্যালো কে বলছ?”
“রুপু বলছি মা।”
রাগে, হতাশায়, জেদে বীথি রানীর গা জ্বলে গেল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“তুমি..”
“আমি কী মা?”
“আমার ছেলেকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়ার সাহস তোমাকে কে দিল? আমি ঠিকই ধরেছিলাম। তুমি আমার ছেলেকে কঠিন ভাবে বশ করেছ। নাহলে সোনার টুকরো ছেলে আমার। ওর জন্মের পর থেকে আজ পর্যন্ত কোনদিন আমার কথার বিরুদ্ধে যায়নি। সেই ছেলে আমার কাউকে কিছু না বলে..”
“এত অস্থির হবেন নাতো মা। শেষে হ্যার্ট অ্যাটাক ফ্যাটাক করে ফেলবেন৷ আপনি এত তাড়াতাড়ি মারা গেলে আপনার সোনার টুকরো ছেলেকে কে দেখবে?”
“কতবড় সাহস তোমার। তুমি তুমি আমাকে ভয় দেখাচ্ছ। ফোনটা এখুনি বিনয়ের কাছে দাও। আমি তোমার সাথে কথা বলতে চাই না।”
“সেকি এত তাড়াতাড়িই শখ মিটে গেল? অথচ আমি ভাবলাম…”
“কী কী ভাবলে তুমি?”
“কী ভাবছি সেটা বড় কথা না। বড় কথা হলো; আমার বাবার বাড়ি শ্বশুরবাড়ির এলাকায় আপনি আমার নামে গুজব ছড়িয়েছেন কেন? আমি যদি সত্যি সত্যিই পরপুরুষের হাত ধরে বের হয়ে যেতাম। তাহলে কী আপনার ছেলে আমার কাছে আসতে পারত? ছেলেকে বড়লোক বাড়িতে বিয়ে করাবেন ভালো কথা। তারজন্য আমার নামে এলাকায় মিথ্যা রটনা রটাতে হবে কেন? এখন আমি যদি আপনার ছেলের হাত ধরে আপনার সংসারে ফিরে আসি। আপনার কেমন লাগবে মা?”
বীথি রানী স্তব্ধ হয়ে গেল। এই মেয়েটা এতকথা জানল কীভাবে? অতিরিক্ত টেনশনে বীথি রানীর প্রেশার বেড়ে যাচ্ছে। শরীর কুলকুল করে ঘামছে।
তার অতি আদরের ছেলেটা কেন এতবড় বোকামি করল? এখন কি করে রুপুর কাছ থেকে বিনয়কে ফিরিয়ে আনবে বীথি রানী।
“মা শুনুন, আপনার ছেলে আবেগের বশে আমার কাছে চলে এসেছে। আমার ধারণা এই আবেগ ওর বেশিক্ষণ থাকবে না। আপনি ওর সাথে ফোনে বা সামনাসামনি কথা বললেই আশা করি ওর আবেগ মোহ কেটে যাবে। যেভাবে ছুটতে ছুটতে আমার কাছে এসেছে। তার থেকেও দ্বিগুণ উৎসাহে রকেটের গতিতে ছুটতে ছুটতে আপনার কাছে ফিরে যাবে। তারজন্য অবশ্যই আপনাকে ঠিকঠাক অভিনয় করতে হবে। এখন আপনি কীভাবে কী বলে কতটা সময় ধরে অভিনয় করবেন। এটা নিশ্চয়ই আমাকে বলে দিতে হবে না। এখন রাখছি কেমন? আপনার ছেলে ঘুমাতে চাচ্ছে। তার আবদার আমাকেও তার সাথে ঘুমাতে হবে। আশা করছি, এখন আর ফোন দিয়ে আমাদের ডিস্টার্ব করবেন না।”
হতভম্ব বীথি রানীকে ফোনের ওপাশে রেখে ফোনের লাইন কেটে দিল রুপু।
রুপু ফোনে কথা বলা শেষ করে এসে দেখল, বিনয় চেয়ারে মাথা রেখেই ঘুমিয়ে গেছে। রুপুর খুব মায়া লাগছে। রুপু দরজা জানালা খুলে দিয়ে ফ্যান ফুল স্পিডে ছেড়ে দিল। পর পর কয়েকটা চেয়ার একসাথে করে বিনয়ের পা চেয়ারে তুলে দিল। কিছুক্ষণ আরাম করে ঘুমাক মানুষটা।
এই ফাঁকে রাতের রান্নাটা সেরে ফেলা যাক। রুপু নিজের ঘরে গিয়ে শাড়ি পাল্টে ফ্রেশ হয়ে নিল৷ প্রতিদিন বাজার করা সম্ভব না দেখে, রুপু একটা ছোট ফ্রিজ কিনে নিয়েছে। ফ্রিজে মাছ মাংস সবজি সবই আছে। রুপু মাছ মাংসের টোপলা বের করে জলে ভিজাতে দিল। ঠাম্মি অসময়ে রুপুকে সবজি কুটতে দেখে এগিয়ে এলো। রুপুর পাশে চেয়ার টেনে বসে বলল,
“একটা ছোকরা নাকি তোমাকে সিঁড়ির সামনে জাপ্টে ধরেছিল?”
রুপু চমকে উঠে মাথানিচু করে ফেলল। ঠাম্মি হেসে ফেলল। বলল,
“এই ছোকরাই কী সেই ছোকরা রুপু?”
রুপু হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল। ঠাম্মি বলল,
“তোমার কথাশুনে আমার ধারণা হয়েছিল। ছোকরা একটা ভীতুর ডিম। এতটা সাহস দেখে সত্যিই খুব অবাক লাগছে।”
রুপু হেসে ফেলল। বলল,
“ভীতুর ডিমই ঠাম্মি। নাহলে মায়ের ভয়ে বউয়ের কাছে কেউ পালিয়ে আসে?”
ঠাম্মি অবাক হয়ে বলল,
“কী সর্বনেশে কথা। তা ছোকরাটা এখন কোথায়?”
“নীচতলার একটা রুমে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে।”
“আজই কী ফিরে যাবে?”
“হাবভাব দেখে তো মনে হচ্ছে না।”
ঠাম্মি বলল,
“ছোকরার ঘুম ভাঙলে ছোকরাকে তোমার ঘরে নিয়ে আসবে। বেচারা আরাম করে ঘুমাক একটু।”
রুপুর একটু একটু লজ্জা লাগছে। তারপরও মাথা নেড়ে আচ্ছা বলল।
বিনয়ের ঘুম ভাঙল রাত আটটায়৷ ঘুম থেকে উঠে বিনয় বোকা বনে গেল। জায়গাটা কোথায় কয়েক সেকেন্ড চিনতেই পারল না। আস্তে আস্তে মনে পড়তেই আপনমনে হেসে ফেলল। মনের আনন্দে প্রকল্পের প্রতিটা কক্ষ ঘুরে ঘুরে দেখল। সিঁড়ির সামনে গিয়ে দেখল, রুপু সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে আছে। বিনয়কে ইশারায় কাছে ডাকছে।
রুপুর ঘরে গিয়ে হাত-পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিয়ে আরাম করে শুয়ে পড়ল বিনয়। বলল,
“তুমি তো বেশ সুখেই আছো দেখছি।”
“তোমার কী ধারণা, তোমাকে ছেড়ে এসে আমি খুব অ-সুখে থাকব?”
“মায়ের সেরকমই ধারণা ছিল। মা প্রায়ই বলতো, একটু ধৈর্য ধর। দেখবি, রুপু চোখের জল নাকের জল এক করে তোর কাছে ফিরে এসেছে। এত আরাম আয়েশ আর কোথায় পাবে। তখন আসল খেলা দেখবি। সংসারটা টিকিয়ে রাখার জন্য তোর পায়ে পর্যন্ত ধরবে।”
“চোখের জল নাকের জল এক করে ফিরে গিয়ে তোমাদের মা ছেলের পায়ে ধরিনি দেখে কী তোমার খুব আফসোস লাগছে?”
বিনয় লজ্জিত ভঙ্গিতে বলল,
“ধুর..”
“আকাশের অবস্থা ভালো না। দেখে মনে হচ্ছে ঝড়বৃষ্টি হবে। কারেন্ট থাকতে থাকতে ভাত খেয়ে নাও।”
“এখন ভাত খাব না। পরে খাব। আর তুমি এতদূরে দাঁড়িয়ে আছো কেন? কাছে এসে আমার পাশে বসো।”
বিনয়ের মনের ছটফটানি বুঝতে পেরে রুপু চোখে-মুখে বিরক্তি ফুটিয়ে বলল,
“আমাকে এখন মোটেও বিরক্ত করবে না।”
বিনয় সেকথা শুনলে তো। রুপুকে হ্যাচকা টানে বিছানায় এনে ফেলল। রুপুর গায়ের উপরে শরীরের সমস্ত ভরটুকু ছেড়ে দিতেই রুপু ছটফটিয়ে উঠল। রাগী কণ্ঠে বলল,
“দেখি ছাড়ো। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে আমার।”
বিনয় আবেগঘন কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
“আসুক।”
“তোমার গায়ে ঘামের গন্ধ। অসহ্য লাগছে আমার।”
“লাগুক।”
“আমার এখন মুড নেই।”
“আমার আছে।”
“ছাড়ো বলছি।”
“না।”
রুপুকে আরকিছু বলার সুযোগ দিল না বিনয়। অন্যভাবে রুপুর মুখ বন্ধ করে দিল। তখনই বিনয়ের ফোনটা তারস্বরে বেজে উঠল। অনাঙ্ক্ষিত শব্দে দুজনই ভয় পেয়ে চমকে উঠল। রুপু বিনয়ের বাহুডোর থেকে নিজেকে জোর করে ছাড়িয়ে নিয়ে তড়িঘড়ি করে উঠে বসল। বলল,
“ফোনটা ধরো।”
অনিচ্ছা সত্ত্বেও বিনয় ফোন রিসিভ করল। ফোনের ওপাশ থেকে যা বলল। তা শুনে বিনয়ের অন্তরআত্মা কেঁপে উঠল। মুখটা রক্তশূণ্য হয়ে গেল। চোখের জল মুছতে মুছতে বলল,
“আমি এখুনি আসছি।”
বিনয় দ্রুত হাতে শার্ট পরতে গিয়ে শার্টের বোতাম এলোমেলো করে লাগাল। রুপু চিন্তিতমুখে বলল,
“কী হয়েছে তোমার? হঠাৎ শার্ট পরছ কেন? এতরাতে কোথায় যাবে তুমি?”
বিনয় অস্ফুট স্বরে বলল,
“আমাকে এখুনি যেতে হবে রুপু।”
“এতরাতে কোথাও যাওয়ার দরকার নেই।”
বিনয় চিৎকার করে বলল,
“বললাম তো আমি এখুনি যাব। তুমিও চলো আমার সাথে।”
রুপু চোখে-মুখে কাঠিন্য ফুটিয়ে বলল,
“আমি এখন কোথাও যাব না।”
রুপুর বিয়ে পর্ব ৩৪
“এত পাষাণ হইয়ো না রুপু। একটু দয়া করো আমাকে। বেশ তুমি এখন না যাও। না যাবে। কিন্তু আমাকে এখন যেতেই হবে। আমি এখন না গেলে সর্বনাশ হয়ে যাবে রুপু।” কথাগুলো বলতে বলতে ঝরঝর করে কেঁদে দিল বিনয়। তারপর রুপুর ডাক উপেক্ষা করে উভ্রান্তের মতো ছুটে গেল। ভুলেও পেছন ফিরে তাকাল না। ইশ, বিনয় যদি ভুল করেও একবার পেছন ফিরে তাকাতো…
